ফন্ট সাইজ:
থিম:
ফালাক (সিজন ২)

১ম পর্ব

লেখক: ইনায়া জারিশ

( 🚫কেউ গল্প কপি করে কারো পেজে দিবেন না! আর কোনো youtube চ্যানেল ও না,, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে তাহলে,, already নেওয়া হয়েছে! ❌)

লাল গোলাপের পাঁপড়ি ছিটানো বিছানায় লাল বেনারসি শাড়ি পড়ে বসে আছে ফালাক। । জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা যেখানে হওয়ার কথা, সেখানে ঘরের নীরবতাটা তার কাছে কেমন যেন ভারী ঠেকছে!
হঠাৎ করেই দরজা ঢেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল এক জোড়া টলমল পা। দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল সাদ। তার এক হাতে মদের বোতল, চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে রক্তবর্ণ। 
ফালাকের বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই ছ্যাঁৎ করে উঠল। সাদের পা স্থির ছিল না; ঘরের আলোয় তার চেহারার হিংস্রতা ভেতরের অস্থিরতা স্পষ্ট ফুটে উঠছে!
কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাদের হাতের একটা ঝটকায় টি-টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের ফুলদানিটা বিকট শব্দে মেঝেতে আছড়ে পড়ে চুরমার হয়ে গেল।
ভয়ে শিউরে উঠে শাড়িটা চেপে ধরল ফালাক। থরথর করে কাঁপতে থাকা শরীর নিয়ে সে বিছানার আরও কোণে সেঁটে গেল। সাদের চোখমুখের রাগ আর ভাঙচুরের তান্ডব দেখে ফালাকের মনে হলো, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কোনো এক অনিয়ন্ত্রিত ঝড়। একের পর এক ড্রেসিং টেবিলের প্রসাধনী, কোণের ফ্লাওয়ার ভাজ ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে লাগল সাদ। চারপাশের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গোলাপের পাঁপড়ির মাঝেই পড়ে রইল ধারালো কাঁচের টুকরো।
ভাঙচুর শেষে সাদ টলতে টলতে এগিয়ে এলো বিছানার দিকে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে ফালাকের যেন মৃত্যুর মতো ভয় কড়া নাড়ছিল।
ঠিক ফালাকের মুখের কাছাকাছি এসে ঝুঁকলো সাদ!
 সাদের নিশ্বাসে তীক্ষ্ণ মদের গন্ধ বিষের মতো ফালাকের নাকে এসে বিঁধল যেন! একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল সাদের ঠোঁটে। ফালাকের ভয়ার্ত চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বিষাক্ত গলায় বলে উঠল,
"কী ? খুব তো নবাবজাদী সেজে বসে আছিস! ভেবেছিস খুব বড় জয় পেয়ে গেলি, তাই না? বড়লোকের ঘরের ছেলে দেখে একদম গলায় ঝুলে পড়েছিস! তোর এই নিষ্পাপ মুখের আড়ালে কতটা লোভ লুকিয়ে আছে, তা আমার খুব ভালো করে জানা আছে। টাকার মোহে নিজেকে বিক্রি করতে তোর একটুও বাঁধল না, তাই না?"
 
সাদের প্রতিটা শব্দ চাবুকের মতো এসে বিঁধল ফালাকের বুকে। চোখের কোণ বেয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ল , কিন্তু সাদের বিষাক্ত চোখের সামনে একটা প্রতিবাদী শব্দও ফালাকের গলা দিয়ে বের হলো না। 
সাদের ছুঁড়ে দেওয়া বিষাক্ত কথাগুলো যেন ফালাকের বুকের ভেতর কাঁচের টুকরোর মতোই বিঁধে রইল।
সাদ ফালাকের দিকে এক পা এগিয়ে এসে তীব্র তাচ্ছিল্যের সাথে গর্জে উঠল,
"মনে রাখিস, এই বিয়ে আমি মানি না! আর তোকেও কোনোদিন, আমার এই জীবনে কোনোদিন মেনে নেব না!"
কথাগুলো শেষ করেই সাদ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। দ্রিঘল পায়ে হেঁটে সোজা ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দায় চলে গেল। হাতে মদের বোতল। গ্লাসে ঢালার কোনো প্রয়োজনও মনে করল না বোতলটাই মুখে তুলে এক ঢোকে অনেকখানি গিলে নিল। রাতের ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে দূর আকাশে তাকিয়ে রইলো। ভেতরের অজানা এক আক্রোশ।
ফালাকের দু'চোখ বেয়ে অবিরত জল গড়িয়ে পড়ছে। পরনের বেনারসি, হাতে পরা চুড়ি,চারপাশে ছড়িয়ে থাকা গোলাপের পাঁপড়িগুলো যেন তাকে বিদ্রূপ করছে। হাঁটুতে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল। মনের মনিকোঠায় ভেসে উঠতে লাগল কয়েক দিন আগের সেই ঘটনাটি ... যে ঘটনাটি আজ তার জীবনটাকে এভাবে ওলটপালট করে দিল।
ফ্ল্যাশব্যাক: ✨
শপিং মলের সামনে ব্যস্ত রাস্তা। গাড়ির হর্ন আর মানুষের চেঁচামেচিতে চত্বরটা বেশ কোলাহলপূর্ণ।
সেদিন কেনাকাটা শেষ করে মল থেকে বের হয়েছিলেন সাদের মা, নাফিসা মির্জা! তিনি ফুটপাত ধরে হেঁটে নিজের গাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তা পার হওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মনটা অন্যমনস্ক থাকায় তিনি খেয়ালই করেননি যে দূর থেকে বেপরোয়া গতিতে একটা গাড়ি সাঁ সাঁ করে তাঁর দিকেই ধেয়ে আসছে!
ঠিক সেই সময় রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল ফালাক। সাধারণ একটা সুতি সালোয়ার-কামিজ পরা, চোখেমুখে একরাশ অমলিন সরলতা মেয়েটার । দূর থেকে দ্রুতগতির গাড়ি আর অনমনীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যবয়সী মহিলাটিকে দেখে ফালাকের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল।
চিন্তা করার মতো এক সেকেন্ড সময়ও ছিল না। ফালাক চিৎকার দিয়ে এক দৌড়ে নাফিসা মির্জার গায়ের ওপর গিয়ে পড়ল!
"আন্টি, সরুন!"
মুহূর্তের মধ্যে ফালাক নাফিসা মির্জাকে নিয়ে রাস্তার ফুটপাতের ওপর গড়িয়ে পড়ল। ঠিক তার পর মুহূর্তেই বিকট শব্দে গাড়িটি পাশ কাটিয়ে চলে গেল। অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন দুজন।
রাস্তার পাশে ইটের ওপর গিয়ে পড়ে দুজনই কিছুটা আঘাত পেল! কনুইয়ে, হাঁটুতে ছিলে গিয়ে ফালাকের রক্ত বের হতে লাগল, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়ালই ছিল না। ফালাক তড়িঘড়ি করে উঠে বসে নাফিসা মির্জার হাত দুটো শক্ত করে ধরে আকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
"আন্টি! আন্টি, আপনি ঠিক আছেন? কোথাও বেশি লেগেছে আপনার?"
নাফিসা মির্জা তখনও বুকের ভেতর হাত দিয়ে হাঁপাচ্ছিলেন। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার ধাক্কাটা সামলে নিয়ে তিনি সামনে বসা এই অচেনা মেয়েটির দিকে তাকালেন। কোনো চেনা-জানা নেই, অথচ নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে তাকে বাঁচালো এই মেয়েটা!
ফালাক নিজ হাতে উড়না নাফিসা মির্জার কপালের ঘাম মুছে দিল,তাকে দাঁড়াতে সাহায্য করল।
নাফিসা মির্জা মুগ্ধ, আবেগপ্লুত দৃষ্টিতে ফালাকের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
"তুমি... তুমি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাকে বাঁচালে মা? এই যুগে অচেনা মানুষের জন্য কেউ এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে?"
"তোমাকে অনেক ধন্যবাদ মেয়ে!
"মানুষ তো মানুষের জন্যই আন্টি। আপনার জায়গায় আমার মা থাকলেও তো আমি একই কাজ করতাম।""
কথাটি বলেই ফালাক তাকে গাড়িতে উঠতে সাহায্য করল। নাফিসা মির্জার মনটা এক নিমেষেই এই মায়াবী, ভদ্র,শান্ত মেয়েটার প্রতি এক গভীর মমতায় ভরে গেল। মেয়েটির সরল হাসি আর চোখের ভেতরের অমলিন পবিত্রতা তাঁর মন কেড়ে নিল।
গাড়িতে ওঠার পর নাফিসা মির্জা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন, "আজকের দিনে এত চমৎকার আর ভালো মনের মেয়েও আছে!"
গাড়িতে বসেই তিনি ড্রাইভারকে ডেকে কড়া নির্দেশ দিলেন,
"গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার দরকার নেই। আগে ওই মেয়েটা কোন দিকে যাচ্ছে খেয়াল করো। ওর ব্যাপারে যাবতীয় সব তথ্য দু'দিনের মধ্যে আমার চাই। ও কোথায় থাকে, ওর পরিবারে কে কে আছে—সব!
[দুই দিন পর]
ড্রাইভার এসে নাফিসা মির্জার কাছে খোঁজ জানালেন!। খোঁজ নিয়ে জানা গেল এক বিষাদময় বাস্তবতা—
ফালাকের নিজের মা ছোটবেলাতেই মারা গেছেন। আর যার ছায়ায় সে বড় হচ্ছিল, সেই বাবাও প্রায় দুই বছর আগে মারা যান। বর্তমানে ফালাক তার সৎ মা আর ছোট সৎ ভাইয়ের সাথেই একই ছাদের নিচে থাকে। সংসারে তার কোনো মূল্য নেই; বরং সৎ মায়ের অবহেলা আর অনাদরের মাঝেই প্রতিটা দিন নিঃশব্দে সহ্য করে বেঁচে আছে মেয়েটি।
সব শোনার পর নাফিসা মির্জার চোখে জল এসে গেল। তিনি মনে মনে এক শক্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন—"যে মেয়েটা এত কষ্ট পাওয়ার পরেও অপরের জন্য নিজের প্রাণ বাজি রাখতে পারে, তাকে আমি আমার ঘরের লক্ষ্মী করে আনব। আমার ছেলে সাদের অগোছালো জীবনের হাল ধরার জন্য এই ফালাকই সেরা পছন্দ।
[ফ্ল্যাশব্যাক শেষ]
ফালাক জানে না, নাফিসা মির্জার এই স্নেহময়ী সিদ্ধান্তই আজ তার জন্য এমন এক নরকযন্ত্রণা হয়ে দাঁড়াবে। সাদ তাকে ভালোবাসবে তো দূরের কথা, কোনোদিন স্ত্রী বলে মেনেও নেবে না!
মদের বোতলটা শেষ করে টলমল পায়ে ঘরের ভেতর ফিরে এল সাদ। তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো স্বাভাবিকতা নেই; লাল রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে চোখ। মদের নেশা, ভেতরের জমে থাকা অনিয়ন্ত্রিত রাগ কোনো এক অজানা আক্রোশ তার বিবেককে পুরোপুরি গ্রাস করে নিয়েছে।
বিছানার এক কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে নিঃশব্দে কাঁদছিল ফালাক। সাদের ভারী অসংলগ্ন পদক্ষেপের শব্দ পেতেই ফালাক থমকে গেল। আতঙ্কে বুকের স্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য যেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। ফালাক ভিজে যাওয়া চোখ দুটো তুলে সাদের দিকে তাকাল—সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির হিংস্র বেপরোয়া চেহারা দেখে পুরো শরীর হিম হয়ে এল।
সাদ টলতে টলতে গিয়ে সোজা ফালাকের দু'টি বাহু শক্ত করে চেপে ধরল।
ফালাকের মুখ থেকে আর্জি বের হওয়ার আগেই সাদ তাকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এল।
ফালাক প্রাণপণে চেষ্টা করল নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার, কিন্তু সাদের মদ্যপ শক্তি,একগুঁয়েমির সামনে তার সামান্য জোরটুকু কিছুই ছিল না। সাদের নিশ্বাসে ভেসে আসা মদের তীব্র গন্ধ ফালাকের নাকে এসে আছড়ে পড়ল। সাদ ফালাকের ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে এক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ধমকে উঠল,
"কী হলো? ভয় পাচ্ছিস কেন? বড়লোকের বউ হওয়ার শখ পূরণ করেছিস না? এখন এই অধিকারটুকু তো আমাকে দিতেই হবে!"
"আপনি নেশার ঘোরে আছেন, দয়া করে এমন করবেন না... প্লিজ!"
কিন্তু সাদের কানে তখন ফালাকের কোনো আকুতিই পৌঁছাল না। আবেগের চেয়েও সেখানে বেশি কাজ করছিল সাদের ভেতরের জেদ, রাগ,অহংকার। ফালাকের কোনো বারণ না শুনে, ফালাকের অশ্রুকে উপেক্ষা করেই জোর খাটিয়ে ফালাকের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ল। ফালাকের সমস্ত শারীরিক ও মানসিক প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল এক রাতের কালবৈশাখী ঝড়ের মতো । ফালাকের চোখের জলের ফোঁটাগুলো লাল বেনারসির কাপড়ে মিশে যেতে লাগল নিঃশব্দে।
সাদের আঙুলগুলো ফালাকের লাল বেনারসির আঁচলে গিয়ে পড়ল। এক ঝটকায় বেনারসির আঁচলটা ফালাকের কাঁধ থেকে নিচে ফেলে দিল। ফালাক দু'হাতে নিজেকে ঢাকার চেষ্টা করতেই সাদ ফালাকের দুটো হাত মাথার ওপর চেপে ধরল। ফালাকের কোনো বাধাই আজ সাদের মদ্যপ শক্তিকে থামানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না।
সাদ ফালাকের পিঠের দিকে হাত বাড়িয়ে লাল রেশমি বেনারসির সাথে ম্যাচিং করা ব্লাউজের ডোরি আর হুকগুলোতে হাত দিলো।ব্লাউজ এর একের পর এক হুক খুলে যেতে লাগল। প্রতিটি হুক খোলার শব্দ যেন ফালাকের বুকের ভেতর একেকটা আত্মসম্মানের ওপর চাবুকের মতো গিয়ে বিঁধছিল।
 এক মুহূর্তে ব্লাউজের বাঁধন শিথিল হয়ে ফালাকের অনাবৃত কাঁধ থেকে নিচে নেমে এল।
ফালাক চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। লজ্জায়, অপমানে কষ্টে তার চোখ বেয়ে আবার নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সাদের ভেতরে কোনো অনুশোচনা তৈরি হলো না। ভেতরের একগুঁয়েমি আর রাগের ঘোরে সে ফালাকের সমস্ত আকুতি আর শারীরিক প্রতিরোধ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
পরের পুরোটা সময় জুড়ে রেশমি লাল বেনারসি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গোলাপের পাঁপড়ির মাঝেই চলল একতরফা অধিকার দেখানোর তাণ্ডব। ফালাকের নিঃশব্দ কান্না ঘরের চার দেয়ালে আছড়ে পড়ে এক বিষাক্ত নীরবতায় মিলিয়ে গেল।
ভোর বেলায় শাওয়ারের নিচে ঠান্ডা পানির ধারার সামনে বসে আছে ফালাক। ওপর থেকে নেমে আসা অঝোর পানির সাথে মিশে যাচ্ছিল তার চোখের নোনা জল। পানির ঝরনাও যেন ফালাকের গায়ের ওপর তৈরি হওয়া বিষাক্ত ছোঁয়াগুলোকে ধুয়ে মুছে সাফ করতে পারছে না । কাল রাতের প্রতিটা স্মৃতি, সাদের পশুর মতো আক্রমণ, অপমানের শব্দগুলো ফালাকের মাথায় চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছে। হাঁটু দুটো বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নীরবে ফুঁপিয়ে কাঁদছে । পুরো শরীর জুড়ে ছড়িয়ে আছে এক অসহ্য যন্ত্রণা,বুকের ভেতর জমাট বাঁধা তীব্র ঘৃণা। 
বেশ কিছুক্ষণ নিজেকে সামলানোর পর ফালাক বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল। আলমারির দিকে এগোল। কাল রাতে নাফিসা মির্জা তার হাতে একটি সুন্দর কুসুম হলুদ রঙের সুতি শাড়ি তুলে দিয়ে বলেছিলেন, বেনারসির ভারী শাড়িটা বদলে এই হালকা শাড়িটা পড়ে নিও, আরাম পাবে।"
 ফালাকের মনে মনে এক তিক্ত হাসি ফুটল—শাশুড়ির দেওয়া স্বস্তির সুযোগটুকুও কাল রাতে তাকে পেতে দেয়নি সাদ!
আলমারি থেকে কুসুম হলুদ রঙের শাড়িটা বের করে খুব যত্ন করে পরে নিল। শাড়ির আঁচলটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে যখন ঘরে ফিরে এল, তার চোখ গেল বিশাল বিছানাটার দিকে।
সেখানে অগোছালোভাবে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সাদ। এক হাত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, চুলগুলো উস্কোখুস্কো। মানুষটা এখন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে! ফালাক নিস্তব্ধ হয়ে সাদের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। 
"কেন এই মানুষটা ফালাকের সাথে এমন করল! নিজের ইচ্ছেয় তো সে এই বিয়ে করেনি, তা তো স্পষ্ট। কিন্তু এত আক্রোশ কিসের? নিশ্চয়ই জীবনে অন্য কেউ আছে... হয়তো কোনো প্রেমিকা, যাকে সে ভালোবাসে! কিংবা পরিবারের চাপে পড়ে এই বিয়েটা করতে বাধ্য হয়েছে বলে সব রাগ এসে পড়ল ফালাকের ওপর!
ভাবতে ভাবতে ফালাক ঘরের চতুর্দিকের দিকে তাকাল। ঘরের অবস্থা ভীষণ করুণ। ড্রেসিং টেবিলের কাঁচের টুকরো, প্রসাধনী, কোণের ফ্লাওয়ার ভাজ আর বিছানা থেকে গড়িয়ে পড়া গোলাপের পাঁপড়ি—সব যেন কাল রাতের তাণ্ডবের সাক্ষ্য দিচ্ছে। ফালাক নিজের কষ্টগুলোকে ভেতরে চেপে রেখে হাতে একটা ঝাড়ু তুলে নিল। ঘরটাকে পরিষ্কার করা শুরু করল সে, যেন কাঁচের টুকরোগুলোর সাথেই নিজের মন ভেঙে যাওয়া স্মৃতিগুলোকেও কুড়িয়ে একপাশে সরিয়ে দেওয়া যায়।
ঠিক তখনই ঘরের দরজায় মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
নাফিসা মির্জার কণ্ঠ ভেসে এল বাইরে থেকে, 
ফালাক তাড়াহুড়ো করে ঝাড়ুটা একপাশে রেখে শাড়ির আঁচলটা মাথায় ঠিক করে নিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলল। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন নাফিসা মির্জা, মুখে মিষ্টি এক চিলতে হাসি। কিন্তু ফালাকের ফ্যাকাসে চেহারা আর চোখের নিচের ফোলা ভাব দেখে নাফিসা মির্জার হাসির রেখা খানিকটা মিলিয়ে গেল। ফালাক নিজের ভেতরের সব কষ্ট আড়াল করে খুব সাধারণ গলায় বলল,
"হ্যাঁ আন্টি... মানে, আম্মা। 
নাফিসা মির্জা ফালাককে নিচে নিয়ে এলো । কিন্তু ফালাকের থমথমে মুখ, চোখের নিচে স্পষ্ট কালচে দাগ দেখে নাফিসা মির্জার মাতৃহৃদয় মোটেও শান্ত থাকতে পারল না। তিনি ফালাক কে জিজ্ঞেস করলেন,
"মা, সাদ কি তোমার সাথে কোনো খারাপ আচরণ করেছে? রাতে কোনো গণ্ডগোল হয়েছে?"
ফালাকের বুকের ভেতর কাল রাতের তাণ্ডবের দৃশ্যগুলো মুহূর্তে ভেসে উঠল। গলার কাছে এক দলা কান্না এসে আটকে গেল , কিন্তু ফালাক চোখ নিচু করে খুব সাবধানে কান্না চেপে রাখল। শাশুড়ির চোখের দিকে না তাকিয়ে বলল,
"না, আম্মা... তেমন কিছু হয়নি। আমি আসলে নতুন পরিবেশ তো, 
নাফিসা মির্জা অভিজ্ঞ নারী। ফালাকের ভেতরের বিষাদ তাঁর নজর এড়াল না। তিনি বুঝে গেলেন ফালাক কিছু একটা লুকিয়ে যাচ্ছে, হয়তো সাদের দেওয়া কোনো বড় কষ্ট মুখ বুজে সহ্য করছে। তবুও নতুন বউয়ের ওপর কোনো চাপ না দিয়ে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষয়টিকে আর সামনে বাড়ালেন না, তবে মনে মনে সাদের প্রতি তাঁর রাগ আরও ঘনীভূত হলো।
ঠিক ঘণ্টা দুই পর।
ফালাক নিচেই আছে । হঠাৎই সিড়ি থেকে একটা শৃঙ্খলিত, ভারী বুট জুতোর গম্ভীর আওয়াজ নিচে নেমে আসতে লাগল।
ফালাক সেদিকে তাকাল।
সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছে সাদ। কাল রাতের সেই নেশাগ্রস্ত, টলমল,হিংস্র সাদের সাথে আজকের এই সাদের যেন বিন্দুমাত্র মিল নেই! আজ সে সম্পূর্ণ আলাদা এক ব্যক্তিত্ব।
পরনে তার গাঢ় কুচকুচে কালো রঙের প্রফেশনাল পোশাক—লম্বা হাতা গুটানো কালো শার্ট, সাথে প্যান্ট! চেহারায় এক বিন্দু হাসির ছোঁয়া নেই; পাথরের মতো কঠোর, গম্ভীর অনমনীয় অভিব্যক্তি। সুগঠিত চওড়া কাঁধ, তীক্ষ্ণ চোয়াল আর প্রায় ৬ ফুট লম্বা এক সুদর্শন ভয়ংকর আকর্ষণীয় পুরুষ সে। তার পুরো অবয়ব জুড়ে এমন এক আধিপত্য আর আভিজাত্যের ছাপ, যা যে কাউকে এক নিমেষে থমকে দিতে বাধ্য করে।সাদের পরনে রয়েছে ধবধবে সাদা ডাক্তারি অ্যাপ্রন! হাতে স্ট্রেথোস্কোপ!
সাদের এই বদলে যাওয়া চেহারা দেখে ফালাকের চোখ আটকে গেল। কাল রাতের মাতাল রূপের আড়ালে যে এমন এক প্রখর ব্যক্তিত্বের মানুষ লুকিয়ে ছিল, তা যেন ফালাকের কল্পনারও বাইরে ছিল। ফালাক বুঝতে পারলো সাদ আসলে একজন ডক্টর!
সাদ কাউকেই কোনো পাত্তা না দিয়ে একপ্রকার হনহন করে প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
নাফিসা মির্জা তড়িঘড়ি করে এসে পথ আটকে দাঁড়ালেন। শক্ত গলায় বললেন,
"সাদ! দাঁড়াও! কালকে রাতে তোমার বিয়ে হয়েছে, আজ তুমি হাসপাতালে যাওয়ার জন্য রেডি হয়েছ মানে? আমি তোমাকে না কড়া নির্দেশ দিয়েছিলাম আজ ছুটি নিতে?"
সাদ এক মুহূর্তের জন্য থামল। ঘড়ির দিকে এক পলক নজর বুলিয়ে ঠান্ডা, বরফশীতল কণ্ঠে জবাব দিল,
 অহেতুক নাটক পছন্দ করি না, ড্যাড ভালো করেই জানেন। আর তাছাড়া আমার আজকের দিনটা নষ্ট করার মতো কোনো ইচ্ছে নেই।"
নাফিসা মির্জা রেগে গিয়ে বললেন,
"নাটক মানে? ফালাক এই ঘরের বউ! তুমি ওকে এভাবে ফেলে রেখে অফিসে চলে যাবে? লোকজন কী বলবে?"
সাদ একবার ফালাকের দিকে বিষাক্ত চোখে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল চরম অবহেলা। তারপর মায়ের দিকে ফিরে তাচ্ছিল্যের সাথে বলল,
"যার পছন্দ অনুযায়ী এই ঘরে বউ এসেছে, দায়িত্বটাও তার থাকা উচিত।"
কথাটি বলেই সাদ আর এক সেকেন্ডের জন্য দাঁড়াল না। নিজের গাড়ির চাবিটা পকেট থেকে বের করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে তার গাড়ির স্টার্ট নেওয়ার ও বিকট শব্দে বেরিয়ে যাওয়ার আওয়াজ পাওয়া গেল।
ঘরের ভেতর ছড়িয়ে রইল কেবল এক বরফশীতল নীরবতা আর ফালাকের বুকের ভেতর আরও একধাপ চেপে বসা অসীম কষ্ট।
চলবে........
#ফালাক_সিজন_২
#লেখিকা_ইনায়া_জারিশ 
#পর্ব_____১
#উপন্যাস #উপন্যাসপ্রেমী #গল্পফ্যাক্ট #গল্পপ্রেমী

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন