#ফালাক_সিজন_২
#লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব_______২
( 🚫কেউ গল্প কপি করে কারো পেজে দিবেন না! আর কোনো youtube চ্যানেল ও না,, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে তাহলে,, already নেওয়া হয়েছে! ❌)
গভীর রাত,ফালাক ঘরের এক কোণে হাঁটু দুটো বুকের সাথে চেপে ধরে বসে আছে! কাল রাতের ট্রমা শারীরিক কষ্টে তার শরীরটা চরম ক্লান্ত। ফালাক মনে মনে প্রার্থনা করছিল, লোকটা যেন আজ রাতে আর কোনো তাণ্ডব না চালায়।
ঠিক তখনই ঘরের দরজাটা সজোরে ধাক্কা দিয়ে খুলে গেল।
ভেতরে প্রবেশ করল সাদ। পায়ে কোনো ভারসাম্য নেই, টলমল শরীরটা কোনোমতে দরজার চৌকাঠ ধরে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এক হাতে আধভাঙা এক মদের বোতল, অন্য হাতে শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা। চোখ দুটো যেন রক্তের মতো লাল, চেহারায় স্বাভাবিক কোনো মানুষের ছাপ নেই—কেবল এক হিংস্রতা ঝুলে আছে যেন!
ফালাকের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
সাদ মদের বোতলটা মেঝেতে আছড়ে ফেলে দিল না, বরং টলতে টলতে ফালাকের দিকেই এক পা এক পা করে এগিয়ে আসতে লাগল। জুতো থেকে আসা ভারী শব্দগুলো ফালাকের কানে মৃত্যুর ঘণ্টার মতো বাজছিল।
"কী রে... এত ভয় পাচ্ছিস কেন?"
ফালাক ভয়ে দেওয়ালের সাথে আরও বেশি সেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করল, "... প্লিজ, আজ অন্তত এমন করবেন না!, নেশার ঘোরে কোনো অন্যায় করবেন না..."
কিন্তু সাদের কানে তখন ফালাকের কোনো আকুতিই পৌঁছাল না। সাদের মস্তিষ্কে তখন কাজ করছে তীব্র আক্রোশ,একতরফা হিংস্রতা। সাদ এক ঝটকায় নিচে ঝুঁকে ফালাকের দুটো হাত কবজি থেকে শক্ত করে চেপে ধরে টেনে তুলে আনল। সাদের হাতের পশুর মতো শক্ত বাঁধন ফালাকের নরম চামড়ায় বিষাদের মতো বিঁধতে লাগল।
"আহ্! ছাড়ুন আমাকে!, ছাড়ুন!" ফালাক চিত্কার করে ওঠার চেষ্টা করতেই সাদ তার নিজের ভারী শরীর দিয়ে ফালাককে দেওয়ালের সাথে একদম পিষে ধরল।
তীব্র মদের গন্ধ,তপ্ত নিশ্বাস ফালাকের গলার কাছে এসে আছড়ে পড়ল। ফালাক নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে সাদের বুক ঠেলে দূরে সরানোর চেষ্টা করল। মাথা ঝাঁকিয়ে হাত-পা ছুঁড়ে বাঁচতে চাইল, কিন্তু সাদের মদ্যপ শক্তির সামনে তার ক্ষুদ্র প্রতিরোধ ধুলোয় মিশে গেল।
সাদের মুখে এক তাচ্ছিল্য নিষ্ঠুরতার তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। ফালাকের আকুল কান্নাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সাদ ফালাকের সুতি শাড়ির আঁচলটা ধরে এক টানে নিচে ফেলে দিল।
"অহংকার দেখাচ্ছিস? আমাকে আটকাবি তুই? তোর পরিবারের লোভ আর তোর এই নিষ্পাপ মুখটার দাম আমাকে চোকাতেই হবে! তোর শরীর, তোর এই অস্তিত্ব—সবকিছুর ওপর এখন শুধু আমার অধিকার!"
সাদ ফালাকের প্রতিটা বারণ অনুনয়-বিনয়কে তোয়াক্কা না করে হাত দিয়ে ফালাকের শাড়ির বাকি বাঁধন ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করল। ফালাক হাত দিয়ে নিজেকে ঢাকার চেষ্টা করলেও সাদের হিংস্র আঙুলগুলো তার ওপর কোনো করুণা করল না। ফালাকের গায়ের শাড়ি টেনে সরিয়ে দিয়ে সাদ জোর খাটিয়ে ফালাকের একদম কাছে ঘেষে এলো।
একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির মাঝে সাদ ফালাককে জোর করে বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। ধাক্কা লেগে ফালাকের মাথাটা বিছানার পাশে রাখা কাঠের কোণে বিকট শব্দে গিয়ে লাগল।
"আহ্..."ফালাকের মুখ থেকে এক বিষাদময় আর্তনাদ বের হয়ে এলো। কপাল কেটে এক ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ল গালের ওপর।
সাদের চোখ নেশা,জেদে পুরোপুরি অন্ধ! রক্তাক্ত ফালাককে দেখেও সাদের ভেতরের মানুষটা জেগে উঠল না। ফালাকের চোখের অঝোর জল কপালের রক্তকে উপেক্ষা করেই সাদ আবার ফালাকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফালাকের সমস্ত শারীরিক মানসিক প্রতিরোধ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল সাদের নির্মম, জোরজবরদস্তিমূলক অধিকার প্রকাশের কাছে।
ফালাক আর কোনো বাধা দিতে পারল না। শুধু চোখ দুটো বন্ধ করে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় নোনা জল গড়িয়ে বিছানার চাদরে মিশে যেতে লাগল। একটা ভালোবাসাহীন, হিংস্র রাতের কাছে ফালাকের আত্মসম্মান আজ আবার নিঃশব্দে হার মেনে নিল।
_______________
নেশার ঝোঁকটা কেটে আসতেই সাদের তীব্র মাথার যন্ত্রণা শুরু হলো। চোখের পাতা দুটো প্রচণ্ড ভারী ঠেকছিল । চোখ খোলার চেষ্টা করতেই ভোরের আবছা আলোয় ড্রেসিং টেবিলের ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো তার চোখে এসে বিঁধল। মাথার যন্ত্রণা সামলে নিয়ে সাদ বিছানায় উঠে বসতে গেল, কিন্তু তার দৃষ্টি আটকে গেল ঠিক তার ডান পাশে।
সেখানে বিছানার এক কোণে কুঁকড়ে শুয়ে আছে ফালাক।
ফালাকের আঁচলটা মেঝের ওপর গড়িয়ে পড়েছে, কাপড়-চোপড় উস্কোখুস্কো, সারা শরীরে কাল রাতের নির্মম ঝড় বয়ে যাওয়ার স্পষ্ট ছাপ। সাদের চোখ সবচেয়ে বেশি আটকে গেল ফালাকের চেহারার দিকে তাকাবামাত্রই। ফালাকের কপালের পাশটা কেটে রক্ত জমাট বেঁধে শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে, সেই রক্ত গড়িয়ে নেমে এসেছে গলার খাঁজ পর্যন্ত। চোখের কোণে কান্নার নোনা জল শুকিয়ে শুভ্র একটা দাগ হয়ে গেছে।
সাদের বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তের মধ্যে এক অজানা ধাক্কায় কেঁপে উঠল!
হঠাৎ করেই কাল রাতের আবছা অথচ হিংস্র স্মৃতিগুলো ঝড়ের বেগে তার মাথায় আছড়ে পড়তে লাগল—
সাদ স্তব্ধ হয়ে নিজের দু'টো হাতের দিকে তাকাল। যে হাত দিয়ে সে প্রতিদিন শত শত মানুষের জীবন বাঁচায়, একজন সম্মানীয় ডক্টর হিসেবে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়—সেই হাত দিয়ে কাল রাতে সে একটা নিঃসহায় মেয়ের ওপর এতটা পশুপাখির মতো আক্রোশ চালাল!
একটা অজানা শিউরানি সাদের রিড়র মধ্য দিয়ে বয়ে গেল। ভেতরে প্রথমবার এক তীব্র অনুশোচনা আর অপরাধবোধ আছড়ে পড়ল।
সাদের হাতের ছোঁয়া ফালাকের গায়ে লাগার আগেই ফালাকের চোখ দুটো খুলে গেল। তবে সেই চোখে আজ আর কাল রাতের মতো কোনো ভয় আতঙ্কের ছাপ নেই। নেই কোনো আকুতি কিংবা কান্নার এক ফোঁটা জল। ফালাকের চোখ দুটো একদম ফাঁকা, নিষ্প্রাণ আর বরফশীতল।
সাদের হাতটা শূন্যে থমকে গেল।
ফালাক এক মুহূর্তের জন্যও সাদের চোখের দিকে তাকাল না। অত্যন্ত শান্ত নিস্তব্ধ ভঙ্গিতে উঠে বসল। শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা থাকা সত্ত্বেও মুখে আজ আর কোনো কষ্টের অভিব্যক্তি ফুটে উঠল না। ফালাক যেন পুরোপুরি একটা পাথরের মূর্তিতে রূপ নিয়েছে।
মেঝে থেকে ছড়িয়ে থাকা কাপড়ের আঁচলটা কুড়িয়ে নিয়ে নিজের গায়ে জড়িয়ে ফালাক আস্তে আস্তে বাথরুমের দিকে হেঁটে চলে গেল। প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল এক নিঃশব্দ দূরত্ব।
ফালাক বাথরুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজাটা আটকে দিল। কিন্তু অন্যদিনের মতো ভেতর থেকে আজ কোনো ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ এলো না। জল পড়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু ফালাকের এই পাথরের মতো নিস্তব্ধতা সাদের বুকের ভেতরটা আরও বেশি তোলপাড় করে তুলতে লাগল।
সাদ বিছানায় বসে রইল মাথানিচু করে।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে বাথরুম থেকে বের হয়ে এল ফালাক। কপাল থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত ধুয়ে ফেললেও কাটা দাগটা এখনও লাল হয়ে আছে। ভেজা চুলে গাঢ় নীল রঙের একটা সুতি শাড়ি জড়িয়ে ফালাক এসে দাঁড়াল।
ফালাক বিছানায় ওপর চুপচাপ গিয়ে বসল।
কিছুক্ষন পর......
সাদ আলমারি থেকে নিজের আইরন করা ধবধবে সাদা শার্ট,, কালো প্যান্ট বের করে দ্রুত ড্রেসিংয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় নিজের রক্তবর্ণ চোখ আর কাল রাতের তাণ্ডবের চিহ্নগুলো দেখে সে একবার চোখ বন্ধ করল। নিজের ভেতরের অস্থিরতা ঢাকতে খুব নিখুঁতভাবে শার্টের বোতামগুলো লাগাল,
এরপর পড়ে নিলো ডক্টর’স অ্যাপ্রন—যার বুকে জ্বলজ্বল করছে "Dr. Saad Mirza" নাম লেখা মেটাল ব্যাজটি। হাতে স্ট্রেথোস্কোপ গুছিয়ে নিয়ে সাদ পুরোপুরি প্রফেশনাল, ডাক্তারের রূপ ধারণ করল।
ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ঘরের কোণে জড়সড় হয়ে বসে থাকা ফালাকের অবয়ব।
সাদ ঘড়ির দিকে তাকাল। দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
_____________
সিটি হাসপাতালের করিডোর দিয়ে হেঁটে চলেছে ডক্টর সাদ মির্জা। মুখে চিরাচরিত থমথমে, গম্ভীর এক্সপ্রেশন।
সাদ করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় দু'পাশের নার্স ও জুনিয়র ডাক্তাররা মাথা নিচু করে বিনীতভাবে সম্মান জানাচ্ছে—
"গুড মর্নিং, ডক্টর সাদ।"
সাদ কেবল হালকা মাথা নেড়ে তার গাম্ভীর্য বজায় রাখল। এই হসপিটালে সে কোনো একজন অত্যন্ত দক্ষ ও কঠোর -সার্জন।
নিজের সুবিশাল এসি কেবিনে ঢুকে চেয়ারে বসল সাদ। টেবিলে রাখা সিরিয়াস পেশেন্টদের ফাইলের ওপর চোখ বুলাতেই তার মন একদম ফোকাসড হয়ে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ঢুকে পড়ল অপারেটিং থিয়েটারে (OT)। একটা জটিল সার্জারি—অন্য যেকোনো ডাক্তারের হাত যেখানে কাঁপত, সেখানে সাদের নিখুঁত হাতে কাজ চালিয়ে গেল। অপারেশনের টেবিলে সাদ একজন, অতুলনীয় জাদুকর। তার প্রতিটি নির্দেশে ওটি-র জুনিয়র সার্জন আর নার্সরা তটস্থ।
দীর্ঘ তিন ঘণ্টার এক নিখুঁত অপারেশন শেষ করে সার্জিক্যাল গ্লাভস জোড়া ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলল সাদ। ওটি থেকে বের হতেই পেশেন্টের আত্মীয়স্বজনরা কাঁদতে লাগল কৃতজ্ঞতায়।
সাদ নিস্পৃহ মুখে ঠান্ডা গলায় বলল,
"থ্যাংকস দেওয়ার দরকার নেই, ইটস মাই জব। পেশেন্ট এখন আইসিইউ-তে অবজারভেশনে থাকবে।"
পেশেন্ট দেখা, ইন্টার্নদের রাফ ক্লাসে নেওয়া,জুনিয়রদের ভুল ধরে কড়া ঝাড়ি দেওয়া—সারাদিন এভাবেই একছত্র দাপটের সাথে নিজের কাজ চালিয়ে গেল সাদ।
বিকেল ঘনিয়ে এলে সাদ কেবিনে ফিরে নিজের গায়ের ল্যাব কোটটা খুলল। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসতেই ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে- "মা "
সাদ নির্বিকার মুখে কলটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরল,
"বলো, মা..."
অপর পাশ থেকে নাফিসা মির্জার গলার আওয়াজ ভেসে এল।
"সাদ, তোমার কি হাসপাতাল থেকে ফেরার কোনো নাম নেই? কাল রাতে তুমি কখন বাসায় ফিরেছ আর কী তাণ্ডব চালিয়েছ, সে হিসাব আমি পরে নিচ্ছি।, এখুনি বাসায় এসো।"
সাদ কপালে ভাঁজ ফেলে কিছু বলতে যাবে, কিন্তু তার আগেই নাফিসা মির্জা খট করে ফোনটা কেটে দিলেন।
সাদ ফোনের স্ক্রিনের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তার চোখমুখ এক মুহূর্তে আরও কঠোর হয়ে উঠল। মনে মনে ভাবল, ফালাক নিশ্চয়ই মায়ের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করেছে,অভিযোগ তুলেছে।
"মেয়েটার সাহস তো কম নয়! ভেবেছে মায়ের কাছে নালিশ করে আমাকে চাপে ফেলবে?" — মনে মনে একরাশ তাচ্ছিল্য,রাগ পুষে রেখে সাদ টেবিল থেকে গাড়ি চাবিটা তুলে নিল। কড়া পদক্ষেপে কেবিন থেকে বের হয়ে গেল।
সাদের কালো রঙের মার্সিডিজ এসে থামল মির্জা ভিলার বিশাল গেটের সামনে।
গাড়ি থেকে নেমে ড্রয়িংরুমে ঢুকলো সাদ। ভেবেছিল ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই নাফিসা মির্জার চিল্লাচিল্লি আর ফালাকের নাটকীয় কান্নাকাটি দেখতে পাবে। কিন্তু ঘরের ভেতরে ঢুকতেই দৃশ্যটা দেখে সাদের কদম থমকে গেল।
ড্রয়িংরুমের আবহাওয়া থমথমে, কিন্তু কোনো হৈচৈ নেই।
বিশাল সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন নাফিসা মির্জা। তাঁর মুখে চরম বিরক্তি ও রাগ। আর তার ঠিক কিছুটা দূরে, নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফালাক।
ফালাক এখনও সেই নীল শাড়িটা পরে আছে। কপালে কাটা দাগ আর রক্তের চিহ্ন স্পষ্ট। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, ফালাকের চোখে এক ফোঁটাও জল নেই। তার মুখটা একদম ভাবলেশহীন, যেন সে এই পৃথিবীর কোনো কিছুর সাথেই আর যুক্ত নেই।
সাদ ভেতরে ঢুকে এক হাত পকেটে রেখে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল,
"কী হয়েছে মা? অত জরুরি কলার কারণ কী? হাসপাতালে আমার বেশ কিছু শিডিউল বাকি ছিল।"
নাফিসা মির্জা সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। সাদের দিকে ধীর পায়ে হেঁটে এসে হঠাৎ করেই সাদের গালে ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিলেন!
বিশাল ড্রয়িংরুমে সেই চড়ের শব্দটা প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরল। সাদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, গালের চামড়া লাল হয়ে উঠল। হতভম্ব হয়ে মায়ের দিকে তাকাল,
"মা! হোয়াট ইজ দ্য মিনিং অফ দিস?"
নাফিসা মির্জা আঙুল উঁচিয়ে গর্জে উঠলেন,
"শব্দ একদম কম সাদ! তোকে আমি একজন বড় ডাক্তার বানিয়েছি, সমাজের বুকে সম্মান এনে দিয়েছিস—কিন্তু ভেতরে ভেতরে তুই যে এত বড় একটা পশুকে পুষে রেখেছিস, তা আমি জানতাম না! একটা নিষ্পাপ মেয়ের গায়ে হাত তুলতে তোর লজ্জা করল না?"
সাদ ফালাকের দিকে এক নজর হিংস্র চোখে তাকাল। তার ধারণা সত্য প্রমাণিত হয়েছে—মেয়েটা তার মায়ের কাছে নালিশ ঠুকেছে।
"ওহ, তো উনি অবশেষে নিজের আবদার আর নাটক নিয়ে আপনার কাছে গেছেন? কাল রাতের কান্নাকাটির শোধ তুলতে এসেছেন?"
নাফিসা মির্জা রেগে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন,
"মুখ সামলে কথা বলো সাদ! ফালাক আমাকে কিচ্ছু বলেনি! ও সকাল থেকে নিজের ঘরে চুপচাপ বসে ছিল। আমি নিজে ওর ঘরে গিয়ে ওর এই অবস্থা দেখেছি! ও তোমার বিরুদ্ধে একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি, এমনকি আমি হাজারবার জিজ্ঞেস করার পরও ও মিথ্যা করে বলেছে যে ও ড্রেসিং টেবিলের কোণে আঘাত পেয়ে পড়ে গিয়েছিল!"
নাফিসা মির্জার কথায় সাদ এবার সত্যিই স্তব্ধ হয়ে গেল।
ফালাক কোনো নালিশ করেনি? সে সাদের নাম আড়াল করার জন্য মিথ্যা বলল?
সাদ অবিশ্বাস ভরা চোখে ফালাকের দিকে তাকাল। কিন্তু ফালাক সাদের দিকে একবারের জন্য চোখ তুলে দেখল না। সে ঠিক আগের মতোই নিস্পৃহ, বরফশীতল মুখে দাঁড়িয়ে রইল।
নাফিসা মির্জা ফালাকের কাছে গিয়ে তার মাথায় হাত রেখে অত্যন্ত স্নেহে বললেন,
"ফালাক, মা... তুমি এই অসভ্য লোকটাকে আড়াল করার চেষ্টা কোরো না। ও ডক্টর হতে পারে, কিন্তু ও মানুষ হতে পারেনি।"
এরপর নাফিসা মির্জা সাদের দিকে ঘুরে কঠোর কণ্ঠে বললেন,
" সাদ... তুমি যদি ওর সাথে আর একবার কোনো খারাপ আচরণ করো, তাহলে অনেক খারাপ হবে।দিস ইজ মাই লাস্ট ওয়ার্নিং!"
কথাটা বলেই নাফিসা মির্জা ফালাককে সাথে নিয়ে ওপরে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে চলে গেলেন।
বিশাল ড্রয়িংরুমটায় একা দাঁড়িয়ে রইল ডক্টর সাদ মির্জা। তার অহংকার আর রাগের পারদ যেন ফুটন্ত আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলতে লাগল। ফালাকের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল—যে মেয়েটা কেঁদে কেটে তার কাছে ক্ষমা চাইবে ভেবেছিল, সে আজকে একটা শব্দ না বলেও সাদের রাজত্বে বড় আঘাত দিয়ে গেল!
সাদ ড্রয়িংরুমে একাই দাঁড়িয়ে রইল। তার সমস্ত শরীর রাগে,অপমানবোধে রি রি করে উঠছে।
নিজের মাকে সে ভালো করেই চেনে। নাফিসা মির্জা মুখে যা বলেন, তা শতভাগ বাস্তবায়িত করেন। কিন্তু সাদের মাথায় কোনোভাবেই এই হিসাব মিলছে না—ফালাক কোনো নালিশ করল না কেন? এত বড় একটা সুযোগ পেয়েও সাদের নামটা বলে দিলে না কেন? নালিশ করলে তো নাফিসা মির্জার সহানুভূতি আরও বেশি পেত!
"নাকি ও আমার ওপর করুণা দেখাচ্ছে? আমাকে নিচু দেখানোর জন্য এই ঢং করছে?" — ড্রেসিং টেবিলের কোণে আঘাত পাওয়ার মিথ্যা অজুহাতের পেছনে ফালাকের এই নিস্পৃহতা সাদকে যেন অদৃশ্য এক চাবুক মারল।
সাদ এক টানে তার এপ্রোন ছুড়ে ফেলে দিল সোফায়। সজোরে পা ফেলে সিড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গেল সে।
সাদ গিয়ে দাঁড়াল নাফিসা মির্জার ঘরের সামনে। দরজা কিছুটা খোলা ছিল। ভেতরে নাফিসা মির্জা ফালাকের কপালে ফার্স্ট এইড বক্স থেকে ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছেন।
ফালাক একদম চুপচাপ বসে আছে। ওষুধ লাগানোর সময় শরীরে যে একটু জ্বালা করার কথা, ফালাকের মুখে তার কোনো ছাপই নেই। একদম নিষ্পলক চোখে সামনের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। নাফিসা মির্জা যতবারই আদর করে কিছু বলছেন, ফালাক শুধু হালকা মাথা নেড়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিচ্ছে।
সাদ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা চোখে দৃশ্যটা দেখল। ফালাকের এই উদাসীনতা, কোনো অভিযোগ না থাকা—এটাই যেন সাদের মতো দাপুটে অহংকারী পুরুষকে সবচেয়ে বেশি অপমান করছে। কাঁদলে, অনুনয়-বিনয় করলে বা চিৎকার করলে সাদ তাকে দাবিয়ে রাখতে পারত। কিন্তু এই বরফশীতল নীরবতার সামনে সাদ যেন ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতায় ভুগতে লাগল।
সাদ নিজের রুমে ঢুকে ধপাস করে দরজা বন্ধ করে দিল।
রাতের খাবার টেবিলেও এক অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ। নাফিসা মির্জা ফালাককে নিজের পাশে বসিয়ে খাইয়ে দেওয়ার মতো আদর করছেন। সাদ টেবিলের অন্য মাথায় বসে প্লেটে চামচ নাড়ছে। সে আশা করেছিল ফালাক অন্তত তার দিকে লুকিয়ে হলেও এক নজর ভয়ের চোখে তাকাবে। কিন্তু না, ফালাক পুরোটা সময় সাদকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেল। সাদের মতো একজন নামজাদা সার্জন, যে হাসপাতালে শত শত মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে, এই ঘরে সে যেন ফালাকের কাছে একদম অদৃশ্য!
খাবার শেষ করে সাদ নিজের কেবিনেট থেকে এক বোতল কড়া ব্ল্যাক লেবেল বের করল। গ্লাসে ঢেলে এক চুমুকেই তা শেষ করল ।
রাত ১২টা।
সাদ রুমে পায়চারি করছে। মদ পানের পরও আজ তার ভেতরের রাগটা কমছে না, বরং ফালাকের চেহারাটা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সাদ সজোরে মদের গ্লাসটা দেয়ালে ছুঁড়ে মারল। কাঁচের গ্লাসটা ঝনঝন করে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল।
চোয়াল শক্ত করে, মাতাল হিংস্র কদম ফেলে সাদ নিজের রুম থেকে বের হয়ে ফালাকের যে গেস্ট রুমে আছে সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার হাতল ঘুরিয়ে কোনো নক ছাড়াই ধড়াম করে ঘরে ঢুকে পড়ল সাদ ।
চলবে..........
#উপন্যাস #গল্পফ্যাক্ট #উপন্যাসপ্রেমী