ফন্ট সাইজ:
থিম:
ফালাক (সিজন ২)

১১তম পর্ব

লেখক: ইনায়া জারিশ

#ফালাক_সিজন_২

#লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব____১১
​গাড়ি ড্রাইভ করার সময়ও সাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে ফালাকের যত্ন করে সুপ খাইয়ে দেওয়ার মুহূর্তটা! সাদের মতো কঠিন স্বভাবের পুরুষের হৃদয়েও অনাবিষ্কৃত মোহাচ্ছন্নতা তৈরি করেছিল। ফালাকের এই নিবেদিত রূপটা সাদকে ধীরে ধীরে এক গভীর অতলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে , যেখান থেকে ফেরা হয়তো আর সম্ভব নয়।
​গাড়িটা সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ করেই সাদের চোখ চলে গেল রাস্তার পাশের ফুটপাতে।
​মুহূর্তের জন্য সাদের হাতের স্টিয়ারিংয়ের ওপর ধরা আঙুলগুলো শক্ত হয়ে গেল। হৃদস্পন্দন যেন দ্বিগুণ গতিতে লাফিয়ে উঠল!
​ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছে ফালাক। কিন্তু সে একা নয়! ফালাকের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছে এক, লম্বা-ছিপছিপে গড়নের তরুণ। ছেলেটার মুখে হাসি, আর ফালাকও তার দিকে তাকিয়ে কথা বলছে।
​সাদের চোখের মণি দুটো নিমেষে রক্তবর্ণ ধারণ করল। সাদের তীক্ষ্ণ চোয়ালের রগগুলো মুহূর্তে ভেসে উঠল, । সাদের মাথায় যেন বজ্রপাত হলো। তার ভেতরের ভয়ংকর, হিংস্র সত্তা সজাগ হয়ে উঠল।
​‘ফালাক অন্য কোনো পুরুষের সাথে? 
​কোনো কিছু না ভেবে সাদ বিকট শব্দে ব্রেক কষে গাড়িটা সোজা ফুটপাতের গা ঘেঁষে থামাল। গাড়ির দরজাটা এমনভাবে সজোরে বন্ধ করল যে পাশের পথচারীরা চমকে উঠল। সাদ বড় বড় পা ফেলে বুনো বাঘের মতো ধেয়ে গেল ফালাকদের দিকে।
​ফালাক কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাদের বিশাল, চওড়া অবয়বটা এসে তাদের সামনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। ফালাক চমকে উঠে তাকাল—
"আপনি এখানে—"
​ফালাকের কথা শেষ হওয়ার সুযোগ দিল না সাদ। সাদের চোখ দিয়ে যেন হিংস্র আগুনের ফুলকি ঠিকরে বের হচ্ছে । সাদ ফালাকের কথাকে তোয়াক্কা না করে এক ওই তরুণের শার্টের কলারটা নিজের লোহার মতো শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল!
​হঠাৎ করে কলার চেপে ধরায় ছেলেটা চমকে উঠে উঠে —
​"এ-এই Mister, আপনি কে? কলার ছাড়ুন!"
​"শাট আপ! একদম মুখ বন্ধ রাখবি!" — সাদের গর্জন শুনে আশপাশের মানুষ থমকে গেল। সাদ কলারটা আরও শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে ছেলেটার একদম মুখের কাছে নিজের রক্তবর্ণ চোখ দুটো নিয়ে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
 "কাকে দেখে হাসছিস তুই? জানিস এই মেয়েটা কে? শি ইজ মাই ওয়াইফ! ডক্টর সাদ মির্জার বউ সে!
 আরেকবার যদিতোকে ওর সাথে দেখি , তো তোকে পুঁতে ফেলব!"
​ফালাক আতঙ্কে তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কান্নাজড়ানো কণ্ঠে সাদের হাতটা ধরে ছাড়ানোর জন্য আকুল হয়ে উঠল—
​"! প্লিজ ছাড়ুন ওকে! আপনি ভুল বুঝছেন! উনি আমার—"
​"একদম এক পা এগোবি না ফালাক!" — সাদ বাঘের মতো হুংকার দিয়ে ফালাকের দিকে তাকাল। সেই চোখে এত উগ্র রাগ ছিল, যে ফালাক শিউরে উঠে দুই পা পিছিয়ে গেল।
​সাদ এক ধাক্কায় ওই তরুণকে ফুটপাতে ফেলে দিয়ে ফালাকের কবজিটা নিজের মুঠোয় চেপে ধরল। ফালাকের হাত যেন মচকে যাওয়ার উপক্রম হলো। সাদ একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে ফালাককে সেখান থেকে কিছুদূর নির্জন রাস্তার দিকে নিয়ে এলো।
​ফালাক ব্যথায় ও যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে কাঁদতে লাগল—
​" আমার হাত ব্যথা করছে! ছাড়ুন প্লিজ! আমার কথাটা তো অন্তত শুনুন—"
​সাদ ফালাককে একটা দেয়ালের সাথে সজোরে ঠেসে ধরে তার একদম মুখোমুখি হলো। সাদের তপ্ত, নিশ্বাস ফালাকের গালে আছড়ে পড়তে লাগল। 
​"শুনব? আর কী শুনব ফালাক, হ্যাঁ?" — সাদের গলার স্বর বিষাক্ত তীরের মতো ফালাকের বুকে গিয়ে বিঁধল।
 "বিয়ের পরও অন্য পুরুষের সাথে রঙ ঢং? অন্য পুরুষের সাথে গোপনে দেখা করা? এই জন্যই বুঝি সারারাত জেগে আমার গায়ে জলপট্টি দিয়ে সতীসাধ্বী স্ত্রী হওয়ার নাটক করছিলে? যাতে আমার নজর এড়িয়ে সহজেই অন্য কারো হাত ধরে পালিয়ে যেতে পারো?"
​ফালাকের বুকের ভেতরটা যেন এক লহমায় হাজার টুকরো হয়ে গেল। সাদের মুখ থেকে এমন জঘন্য ও সন্দেহ শুনে ফালাকের নিশ্বাস আটকে এলো।
 
​"আপনি... আপনি আমাকে এত নিচু মনে করেন? উনি আমার এলাকার চেনা ভাই সুজন! উনি হঠাৎ রাস্তায় দেখে দাঁড় করিয়ে কথা বলছিলেন... আপনি আমাকে এভাবে অপমান করতে পারলেন?"
​সাদ ফালাকের কোনো কথাই কানে তুলল না। সাদ ফালাকের থুতনিটা চেপে ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল—
​"ভাই? বাহ্! খুব সুন্দর গল্প ফান্দা শিখছ! 
​ফালাক আর সহ্য করতে পারল না। সাদের এই অন্যায্য, জঘন্য সন্দেহের কাছে ফালাকের হৃদয়ের সবটুকু যেন মুহূর্তের মধ্যে কান্নায় ভেঙে পড়ল। ফালাক নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে সাদকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
​ফালাকের চোখের জল গাল বেয়ে অঝোর ধারায় ঝরছে । ফালাক সাদের চোখের দিকে তাকিয়ে তীব্র ঘৃণায় ও কষ্টে চিৎকার করে উঠল—
​"আমার কথা যখন আপনি শুনবেনই না, তখন আর কোনোদিন আমার সামনে আসবেন না! আমি ঘৃণা করিআপনাকে ! ঘৃণা করি আপনাকে!"
​কথাটা বলেই ফালাক আঁচল দিয়ে মুখ চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে সেখান থেকে চলে গেল। ফুটপাত দিয়ে দৌড়ে পালানো ফালাকের অবয়বটার দিকে সাদ কিছুক্ষণ অপলক নজরে তাকিয়ে রইল। ফালাকের মুখের ‘ঘৃণা করি আপনাকে’ শব্দটা সাদের মাথার বারবার প্রতিধ্বনি হতে লাগল।
​সাদের ভেতরের শয়তানটা যেন এক মুহূর্তে স্তম্ভিত হয়ে গেল। কিন্তু রাগের মাথায় সাদ নিজের অনুশোচনাকে পাত্তা দিল না। সে হনহন করে হেঁটে গিয়ে নিজের গাড়িতে গিয়ে বসল।
​গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখতেই সাদের মাথার রক্ত উঠে গেছে । তীব্র আক্রোশে সাদ নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে ডান হাতের মুষ্টি পাকিয়ে স্টিয়ারিংয়ের ওপর সজোরে এক ঘুষি মারল!
​"ড্যাম ইট! ড্যাম ইট ফালাক!"
​হাতের চামড়া ফেটে রক্ত ছিটকে বের হয়ে এলেও সাদের কোনো অনুভূতি হলো না। সাদ এক্সিলারেটরে পা চেপে গাড়িটাকে বাতাসের বেগে ছুটিয়ে নিয়ে গেল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।
​হাসপাতালে পৌঁছানোর পর সাদের চেহারার ভয়াল রূপ দেখে নার্স ও জুনিয়র ডাক্তারদের বুক কেঁপে উঠল। কেউ সাদের সামনে আসার সাহস পাচ্ছিল না। সাদ নিজের পার্সোনাল কেবিনে ঢুকে ভেতর থেকে সজোরে দরজাটা লক করে দিল।
​ ভেতরে পা রাখতেই সাদের মাথার ভেতরের সমস্ত রগ ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। চোখের সামনে কেবল ফালাকের ওই তরুণের দিকে তাকিয়ে থাকা আর ফালাকের বলে যাওয়া ‘ঘৃণা করি আপনাকে’ শব্দ দুটো ঘুরপাক খাচ্ছিল।
​"আহহহহহহহ!"
​সাদ উন্মত্ত পশুর মতো গর্জন করে উঠল। কেবিনের এক্সিকিউটিভ কাঠের বড় টেবিলটার ওপর রাখা ডক্টর কন্টেইনার, দামি ফাউন্টেন পেন, প্রেসক্রিপশনের প্যাডগুলো এক ঝটকায় ফ্লোরে ফেলে দিল। কাঁচের পানির জগ আর গ্লাসটা দেওয়ালে আছড়ে ফেলে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল। কাঁচের টুকরোগুলো চটকা দিয়ে পুরো কেবিনের মেঝেময় ছড়িয়ে পড়ল।
​
​পুরো কেবিনে যেন এক তাণ্ডবলীলা নেমে এলো। সাদের হাতের ক্ষত থেকে টকটকে লাল রক্ত ফ্লোরের কাঁচের টুকরো আর ছেঁড়া কাগজের ওপর ফোঁটা ফোঁটা হয়ে ঝরে পড়ছে , কিন্তু সাদের শারীরিক কষ্টের চেয়ে তার বুকের ভেতরের ভয়ংকর হিংসা হারানোর ভীতি বহুগুণে বেশি জ্বালাচ্ছিল।
​সাদ কেবিনের সোফাটায় বসে দু-হাতে নিজের চুল খামচে ধরে হাপাতে লাগল। রক্তে রাঙানো হাত, লাল হয়ে থাকা উগ্র চোখ দুমড়েমুচড়ে যাওয়া পুরো কেবিনটার মাঝে ডক্টর সাদ মির্জা এক বিষাদগ্রস্ত, বন্য প্রেমিক হিসেবে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। সাদের এই ভাঙচুর আর ক্ষোভের আগুন কীভাবে শান্ত হবে, নাকি এই ঝড় তাদের দুজনকে চিরতরে ছারখার করে দেবে—তা কেবল সময়ই বলতে পারে!
রাত তখন প্রায় এগারোটা।
হাসপাতালের কেবিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিঃশব্দে কাটিয়ে দেওয়ার পর সাদ শেষমেশ বাসায় ফিরলো। 
পুরো ফ্ল্যাট অন্ধকারে ডুবে আছে। এক অদ্ভুত, থমথমে নীরবতা গোগ্রাসে গিলে খাচ্ছে চারপাশটা। কোনো আলোর রেখা নেই, রান্নাঘর থেকে কোনো রান্নার সুবাস নেই, 
"ফালাক?"
সাদ সোজা লিভিং রুমের আলোটা জ্বালিয়ে দিল। কোনো সাড়া নেই। সাদের বুকের ভেতরটা অজানা এক আশঙ্কায় হঠাৎ চাবুক মারার মতো সজোরে মোচড় দিয়ে উঠল। বড় বড় পায়ে সোজা তাদের বেডরুমের দিকে ছুটে গেল।
 "ফালাক! ফালাক, কোথায় তুমি?" — ।
বেডরুমের দরজায় ধাক্কা দিয়ে আলো জ্বালাল । রুমটা খালি, বিছানাটা একদম পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখা। সাদ উন্মাদের মতো ড্রেসিং টেবিলের দিকে তাকাল। সেখানে ফালাকের অর্নামেন্টস বক্স, প্রসাধনী—সব আগের মতোই পড়ে আছে। সাদ ওয়ার্ডরোবের দরজা এক ঝটকায় খুলে ফেলল। ফালাকের নিত্যদিনের কয়েকটা শাড়ি আর জামাকাপড় সেখান থেকে গায়েব!
সাদ দুই হাতে নিজের চুল খামচে ধরে আবার লিভিং রুমে ধেয়ে এলো। এমন সময় ডাইনিং টেবিলে রাখা একটা কাঁচের পেপারওয়েটের নিচে চাপা দেওয়া সাদা কাগজের টুকরোটা সাদের নজরে পড়ল।
সাদের পা দুটো যেন শতমন ওজনের মতো ভারী হয়ে গেল। সে ধীর পায়ে টেবিলের কাছে এগিয়ে গেল। কাঁপাকাঁপা হাতে পেপারওয়েটটা সরিয়ে কাগজটা তুলে নিল। ফালাকের হাতের লেখায় ফুটে উঠছে কতগুলো বিষাক্ত বাক্য—
"ডক্টর সাদ মির্জা,
আমি জানি, আপনার এই চিঠিটা পড়ার মতো ধৈর্য হয়তো নেই। কিন্তু তাও লিখে যাচ্ছি। আপনি ঠিকই ভেবেছিলেন—আমার এই দমবন্ধ করা খাঁচায় আর থাকার এক মুহূর্তের ইচ্ছাও ছিল না। কিন্তু আপনি যা ভেবেছেন, সেই জঘন্য চরিত্রহীনতার কারণে আমি আপনাকে ছেড়ে যাচ্ছি না। আমি যাচ্ছি আপনার এই অন্যায্য সন্দেহ, উগ্রতা অবিশ্বাসের হাত থেকে নিজের আত্মসম্মান বাঁচাতে।
 যে মানুষটা স্ত্রীর সততাকে বিশ্বাস করতে পারে না, যে মানুষটা একটুতেই আমাকে অন্যের সাথে জড়িয়ে অপমান করতে পারে—তার সাথে কোনো ছাদের নিচে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনি তো ভেবেছিলেন আমি আপনার থেকে মুক্ত হতে চাই? হ্যাঁ, আজ থেকে আমি আপনাকে সেই মুক্তি দিলাম।
আমাকে আর খোঁজার চেষ্টা করবেন না। 
ভাল থাকবেন।"
-- ফালাক
চিঠিটার প্রতিটি শব্দ পড়ার পর সাদের মনে হলো কেউ যেন তার বুকের ভেতর ঢুকে হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে রাখা কলিজাটা এক টানে ছিঁড়ে বাইরে ফেলে দিল!
সাদের হাতের মুঠোয় কাগজটা দুমড়েমুচড়ে একাকার হয়ে গেল। সাদের চোখ দুটি নিমেষে রক্তবর্ণ ধারণ করল, কিন্তু এবার সেই চোখে রাগের চেয়ে বেশি জায়গা করে নিল, অতল শূন্যতা! সাদ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ডাইনিং রুমের মার্বেল ফ্লোরে।
সাদ দুই হাতে মাথা চেপে ধরে ফ্লোরে বসে রইল। ফালাক সত্যি সত্যি তাকে ছেড়ে চলে গেছে!
চলবে ........ 
#উপন্যাস #উপন্যাসপ্রেমী #গল্পফ্যাক্ট

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন