ফন্ট সাইজ:
থিম:
ফালাক (সিজন ২)

১২তম পর্ব

লেখক: ইনায়া জারিশ

#ফালাক_সিজন_২

#লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব____১২
দেখতে দেখতে কেটে গেছে কিছুদিন।
সাদ এখন আবার আগের মতোই পুরোপুরি যান্ত্রিক আর কঠোর। প্রতিদিন নিয়ম করে সে হাসপাতালে যায়, টানা। বাহ্যিকভাবে সাদকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে তার বুকের ভেতরের পুরো জগৎটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে ছারখার হয়ে গেছে।
তবে পরিবর্তনটা বোঝা যায় সাদের ঘরে ফেরার পর। রাতের নীরবতায় বিশাল ফ্ল্যাটটায় সে একা পা রাখে, তখন তার চোখ দুটি অজান্তেই ডাইনিং টেবিল আর বেডরুমের আনাচে-কানাচে ফালাকের স্নিগ্ধ অবয়বটাকে খুঁজে বেড়ায়। দিনশেষে একজন সফল সার্জন হলেও, নিজের এই খাঁখাঁ করা শূন্যতার চিকিৎসায় সাদ মির্জা বড্ড অসহায়।
অন্যদিকে, কোলাহল থেকে অনেকটাই দূরে এক নির্জন এলাকায় শুরু হয়েছে ফালাকের সম্পূর্ণ নতুন এক লড়াই।
ফালাক একটা বাসা ভাড়া নিয়েছে। কম ভাড়ার এই বাসাটির বাড়িওয়ালা আর বাড়িওয়ালি দুজনই বয়স্ক মানুষ। সন্তানরা বিদেশে থাকার কারণে এই বৃদ্ধ দম্পতি একা থাকেন, যার ফলে ফালাকের এই নিরিবিলি ছোট মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুতে কোনো ঝামেলা নেই। বৃদ্ধা বাড়িওয়ালি ফালাকের শান্ত ও নরম স্বভাব দেখে তাকে নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করেন।
ফালাক এখন প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেছে। সকাল আর বিকেলে এই কচিকাঁচাদের পড়ালেখা করানো, —এসবের মাঝেই ফালাক নিজের জমাট বাঁধা কষ্টগুলোকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
ফালাকের সকাল শুরু হয় নির্দিষ্ট নিয়মে। প্রতিদিন ভোর হতে না হতেই তার দিনলিপি নতুন গতি পায়। নিজের ছোট ঘরটুকু পরিষ্কার করা, বৃদ্ধ বাড়িওয়ালির সাথে টুকটাক কথা বলা আর নিজের জন্য নাস্তা তৈরি করার পর ফালাক তৈরি হয়ে নেয় কলেজের উদ্দেশ্যে।
তবে দিনশেষে রাত নামলেই তার আত্মনিয়ন্ত্রণের বাঁধ ভেঙে যায়।
পড়াশোনা শেষ করে যখন ফালাক বিছানায় শুতে যায়, তখন একলা ঘরের নিরবতা তাকে গ্রাস করে। জানালার ওপাশে ফোটা চাঁদের আলোর দিকে তাকিয়ে ফালাকের অজান্তেই চোখে জল চলে আসে। 
____________________
সাদ ওয়ার্ডরোবের কবাটটা খুলল! ভেতরে তার নজর গেল কোণায় জমে থাকা ফালাকের শাড়িটার ওপর। যে শাড়িটা পরে ফালাক সেদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল খোপা করছিল... যে রূপ সাদের শিরার রক্তে দাবানল জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
সাদের দীর্ঘ, ফর্সা আঙুলগুলো শাড়িটা জড়িয়ে ধরল। শাড়িটা টেনে বের করে এনে সোজা মেঝের ওপর বসে পড়ল।
উচ্চবিত্ত, স্বনামধন্য সার্জন ডক্টর সাদ মির্জা আজ যেন এক নিঃস্ব দেবদাস!
সাদ শাড়িটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে সোজা নিজের মুখের কাছে নিয়ে এলো। শাড়ির ভাঁজে এখনও লেগে আছে ফালাকের গন্ধ সাদ চোখ বন্ধ করে শাড়িতে মুখ গুঁজে এক দীর্ঘ, উন্মাদের মতো নিশ্বাস টানল।।
সাদের বুকের ভেতরটা এক অসম্ভব যন্ত্রণায় দুমড়েমুচড়ে গেল। অন্ধকারে একা বসে রইলো শাড়ি টা নিয়ে! শাড়িটা নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বিছনার সাথে হেলান দিয়ে বসে রইল। সাদের মনে হতে লাগল, ফালাকের উপস্থিতি ছাড়া এই বিশাল রাজপ্রাসাদসম ফ্ল্যাটটা তার কাছে একটা অভিশপ্ত জ্যান্ত কবর ছাড়া আর কিছুই নয়।
সাদ ফালাকের শাড়িতে নাক টেনে পাগলের মতো ঘ্রান নিতে লাগলো!
_______________
দেখতে দেখতে সন্ধ্যার ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে পুরো এলাকা জুড়ে।
ফালাক শেষ প্রাইভেট টিউশনিটা শেষ করে যখন বাইরে বের হলো, তখন ঘড়িতে সাতটা বেজে গেছে। নির্জন, নিরিবিলি এই রাস্তার দু-পাশের স্ট্রিটলাইটের আলো ফিকফিক করে জ্বলছে। আশপাশে কোনো মানুষজনের চলাফেরা নেই বললেই চলে। বাতাসের সাথে একটা শীতল শিরশিরে ভাব মিশে আছে।
সারাদিনের টানা দৌড়ঝাঁপ, সকালে লোকাল বাসে চেপে কলেজে যাওয়া, দুপুরে ঠিকমতো না খাওয়া আর টানা তিনটা টিউশনি সামলানো—সব মিলিয়ে ফালাকের শরীর আজ একদম সাড়া দিচ্ছে না। তার মেদহীন, ফর্সা শরীরটা চরম ক্লান্তি ও পুষ্টিহীনতায় অবশ হয়ে আসছে।।
ফালাক আস্তে আস্তে হেঁটে নিজের ভাড়াবাসার দিকে এগোচ্ছিল। আচমকা তার চোখের সামনেটা ঘোলাটে হয়ে আসতে শুরু করল। মাথার ভেতরটা তীব্র ঘুর্ণির মতো চক্কর দিয়ে উঠল।
ফালাক রাস্তার পাশের দেয়ালটা ধরে এক মুহূর্ত দাঁড়ানোর চেষ্টা করল—
 "আমার... আমার এত মাথা ঘুরছে কেন? আমি কি..."
কথাটা শেষ করতে পারল না স। হাত থেকে বই-খাতার ব্যাগটা ফ্লোরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে গেল। ফালাকের দু-চোখের পাতা ভার হয়ে বুজে এলো,একমুহূর্তেই সংজ্ঞাহীন হয়ে ধপাস করে নির্জন পিচঢালা রাস্তার ওপর গড়িয়ে পড়ল! ফালাকের, রেশমি চুলগুলো ধুলোবালিমাখা রাস্তায় এলমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়ল।।
চারপাশ নিঃশব্দ, থমথমে। রাস্তাটা একদম ফাঁকা।
ঠিক তখনই বহুদূর থেকে একটা ভারী স্পোর্টস বাইকের ইঞ্জিনের বিকট গর্জন ভেসে এলো। অন্ধকারের বুক চিরে একটা জোরালো হেডলাইটের তীব্র আলো সোজা এসে পড়ল রাস্তায় অসাড় হয়ে পড়ে থাকা ফালাকের দেহের ওপর!
বাইকটা বিকট শব্দে ব্রেক কষে ফালাকের শরীর থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে গিয়ে থামল।
বাইক থেকে নেমে এলো এক দীর্ঘাঙ্গী, চওড়া ও অ্যাথলেটিক বডির তরুণ। তার গায়ে একটি কালো লেদার জ্যাকেট, মাথায় হেলমেট। 
কোনো দ্বিধা না করে তড়িঘড়ি করে নিজের মাথার হেলমেটটা খুলে বাইকের ওপর রাখল। আলো-আঁধারির মাঝে তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো সোজা গিয়ে পড়ল ফালাকের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া নিষ্পাপ মুখের ওপর।
কোনো সাড়া না পেয়ে তরুণটি ফালাকের নাড়ি পরীক্ষা করার জন্য হাত ছুঁইয়ে দেখল। শরীর প্রচণ্ড ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে, রক্তচাপ একদম নিচে নেমে গেছে।
তরুণটি আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। সে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফালাকের ছড়িয়ে থাকা ব্যাগটা এক হাতে তুলে নিয়ে নিজের কাঁধে ঝোলাল। তারপর ফালাকের, নিস্তেজ শরীরটাকে এক নিমেষে নিজের শক্ত, চওড়া দুই বাহুতে তুলে নিল!
অন্ধকারের মাঝে ফালাককে কোলে তুলে নিয়ে সেই রহস্যময় কালো জ্যাকেট পরা তরুণ সোজা নিজের বাইকের দিকে পা বাড়াল...
___________
পরদিন সকালে ধীরে ধীরে চোখ মেলতেই ফালাক নিজেকে দেখতে পেল তার নিজের পরিচিত বিছানায়!
ফালাক চট করে উঠে বসার চেষ্টা করতেই মাথায় তীব্র এক যন্ত্রণার ঢেউ খেলে গেল। মাথার ভেতরটা হালকা হালকা ঝিমঝিম করছে। এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে কাল সন্ধ্যার ঘটনাটা মনে করার চেষ্টা করল—টিউশনি শেষ করে নির্জন রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসার দৃশ্য, তীব্র মাথা ঘোরা, ধপাস করে রাস্তায় পড়ে যাওয়া...
‘তাহলে আমি নিজের ঘরে এলাম কীভাবে? কে নিয়ে এলো আমাকে?’ — ভেবেই ফালাকের বুকের ভেতরটা আতঙ্কে শিউরে উঠল!!
ঠিক তখনই ঘরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। ফালাক তড়িঘড়ি করে ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে দরজার দিকে তাকাল।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন বৃদ্ধা বাড়িওয়ালি। তাঁর হাতে এক বাটি গরম সুপ আর এক গ্লাস পানি। ফালাককে জেগে থাকতে দেখে তাঁর বিষণ্ণ মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।
 "আহা মা, উঠছো কেন? শুয়ে থাকো , শুয়ে থাকো ! তোমার শরীর এখনো বেশ দুর্বল।" — বাড়িওয়ালি বাটিটা পাশের ছোট টেবিলে রেখে ফালাকের কপালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা পরীক্ষা করলেন।
ফালাক জিজ্ঞেস করল—
 ", আমি... আমি কাল রাতে ঘরে এলাম কীভাবে? রাস্তায় তো আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম... আমাকে কে নিয়ে এসেছে এখানে?"
বাড়িওয়ালি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফালাকের পাশে বসলেন—
"কাল রাতে তোকে এক ছেলে কোলে করে নিয়ে এসেছিল । বাইক নিয়ে এসে সোজা ঘরে পৌঁছে দিয়ে গেল। বলল রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকতে দেখেছে। তোমাকে পৌঁছে দিয়েই ডাক্তারের পরামর্শমতো ওষুধ এনে দিল। 
ফালাকের কাজলকালো চোখ দুটো বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।
 "অপরিচিত এক ছেলে কাল সারারাত আমার যত্ন নিয়েছে!
চলবে...
#উপন্যাস #উপন্যাসপ্রেমী #গল্পফ্যাক্ট

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন