#শুধু_বলো_ভালোবাসি
#মুহসানাত_নুসাইবা
১৩.
আজ রুহানীর পরীক্ষা। সকাল থেকে বই সামনে খোলা, কলম হাতে ধরা, খাতা খুলা কিন্তু মনের পাতা একবারও খুলছে না। অক্ষরগুলো চোখে আসছে, কিন্তু মস্তিষ্কে ঢুকছে না একটাও। কারণ একটাই, উজান।
উজান চলে যাওয়ার পর থেকে কমপক্ষে হাজারবার ফোন করেছে সে উজানকে, কিন্তু প্রতিবারই ফোন বেজে বেজে কেটে গেছে, ফোন ধরেনি উজান। যতবার কল কেটে গেছে, ততবার মনে হয়েছে বুকের ভেতরের একটা অংশ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ছে।
মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেও পারছে না সে। বইয়ের পাতায় তাকালেই উজানের মুখ ভেসে ওঠে। চারপাশে সব স্বাভাবিক হলেও রুহানীর কাছে পুরো পৃথিবীটা অন্ধকার, ভারী, নিঃশ্বাস বন্ধ করা এক শূন্যতার মতো লাগছে।
অস্থিরতা যেন শরীরের প্রতিটি শিরায় ছড়িয়ে পড়েছে। মন বারবার বলতে চাইছে, এমনটা হওয়া উচিত হয়নি।
মাথার ভেতরে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, উজান ভাইয়া কি এতটা রাগ করেছে যে আর কখনো কথা বলবে না? নাকি ওকে একেবারেই জীবনের বাইরে ঠেলে দিয়েছে? এভাবে কি সব শেষ হয়ে যাবে?
রুহানীর মনে হচ্ছে, যদি এখনই উজান তার সামনে থাকতো, সে কিছু না ভেবে সব কথা ফেলে দিয়ে শুধু বলতো,
"আমাকে ক্ষমা করে দ্যান ভাই। আর জীবনেও আপনার সামনে সত্য কথা বলবো না।"
পরিক্ষার সময় হয়ে গিয়েছে। রুহানী আর সুমাইয়া বেরিয়ে পরলো পরিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে। যাওয়ার আগে অবশ্য বেশ কয়েকবার ফোন চেক করেছিলো রুহানী কিন্ত বরাবরের মতো আশাহত হয়েছে।
____
পরিক্ষা শুরু হয়েছে আজকে প্রায় এক সপ্তাহ। আজকের পরিক্ষার পর তিনদিন বন্ধ রুহানীর। কিছুক্ষন পড়ার পর উঠে ইসরাতের রুমে গেলো রুহানী। ইসরাতের সাথে ভালোই ভাব হয়েছে তাদের। মেয়েটা এমনই সবার সাথে খুব সহজে মিশে যায়। ইসরাতের পরিবার থেকে এখনো কেও যোগাযোগ করেনি তার সাথে। শুধু ছোটো ভাইটার সাথে মাঝে মাঝে একটু কথা হয় তার। মাঝে মাঝে খুব মন খারপ হলেও পরে তাদের করা কাজের কথা মনে পরলে সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। মেয়েটা এই বাড়ির সবার সাথে মিশে গিয়েছে। হামিদা তো ছোটো বউমা বলতেই পাগল!
রুহানী ইসরাতের ঘরে ঢুকতেই দেখলো ইসরাত ফোনে কথা বলছে। রুহানী আবার বেরিয়ে যেতে গেলে ইসরাত হাতের ইশারায় কাছে ডাকলো। ফোন কেটে দিলো সে।
রুহানী জিজ্ঞেস করলো, "ভাইয়ার সাথে কথা বলছিলেন?"
"হ্যাঁ তোমার ভাইয়ার সাথে কথা বলছিলাম।"
রুহানী এবার আমতাআমতা করে বলে উঠলো, "উজান ভাইয়ার কথা কিছু বলেছে?"
ইসরাত হালকা হেসে বললো, "না, উজান ভাইয়ার ব্যাপারে তো কিছু বলেনি। তোমার সাথে এখনো ভাইয়ার কথা হয়নি?"
রুহানী মন খারাপ হয়ে গেলো। আস্তে করে বলে উঠলো, "আমার ফোন এখনো ধরেনি।"
"ভিষণ রাগ করেছে দেখছি!"
"আমি কি করবো বলেন? আমার কি দোষ আমি কি বুঝেছিলাম নাকি যে উনি এভাবে হুট করে রেগে যাবেন! অথচ আমাকে কিছুই বললেন না, নিরবে একা একা রেগে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকলেন!"
ইসরাত হেসে উঠলো। জিজ্ঞেস করলো, "কি বলেছিলে তুমি ভাইয়াকে?"
রুহানী মাথা নিচু করে রইলো, কোনো জবাব দিলো না। ইসরাত বুঝলো রুহানী বলতে চাইছে না, তাই বলে উঠলো,
"আরেহ তুমি চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি বারবার ফোন দিতে থাকো, কতোকাল ফোন না ধরে থাকবে?"
রুহানী মাথা তুলে বললো, "এক সপ্তাহ ধরে একভাবে ফোন দিচ্ছি তাও ধরবে না একবারও? কিন্ত সময় মতো তো বাবা-মায়ের সাথে ঠিকই কথা বলে।"
ইসরাত রুহানীকে পরখ করতে থাকলো। তখন ঘরে ঢুকলো সুমাইয়া।
সুমাইয়া বলে উঠলো, "আমাকে ছাড়া একা একা কি কথা হচ্ছে শুনি?"
ইসরাত হেসে বলে উঠলো, "আমাদের ভাবির মন খারাপ, ভাইয়া ফোন তুলছে না বলে।"
ইসরাতের মুখে ভাবি ডাক শুনে চমকে উঠলো রুহানী। আসলেই তো! সে তো ইসরাত ভাবিরও ভাবি হয় সে! এটা তো আগে চিন্তা করেনি সে! তার মাথায় একটা লাইন ঘুড়ছে এখন, 'সম্পর্ক বদলে গেলো একটি পলকে!'
ইসরাতের কথায় সুমাইয়া মুখ কুঁচকে বলে উঠলো, "একদম ঠিক হইছে। ওর সাথে এমনই করা উচিত। এই মেয়ে কোন যায়গায় কি বলতে হয় এখনো কিছু যানে না!"
রুহানী মুখ ফুলিয়ে তাকালো সুমাইয়ার দিকে। সুমাইয়া ওর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, "মুখ ফুলিয়ে লাভ নেই, সোনা।"
ইসরাত হো হো করে হেসে উঠলো।
সুমাইয়া রুহানীর গা ঘেষে বসে পরলো। দুষ্টু হাসি মুখে ঝুলিয়ে বলে উঠলো, "স্বামীর কথা মনে পরছে বুঝি ভাবি? স্বামীর রাগ ভাঙাতে পারছো না এখনো? স্বামীকে অনেক মিস করছো? স্বামীকে ছাড়া ঘুম হচ্ছে না বুঝি?"
প্রতিটা কথায় 'স্বামী' 'স্বামী' করছে সুমাইয়া। রুহানী দুম করে ওর পিঠে একটা কিল দিলো।
সুমাইয়া চোখ উলটে বলে উঠলো, "সত্যি কথার ভাত নাই!"
হঠাৎ ইসরাত বলে উঠলো, "আমি একটা বুদ্ধি দিবো রুহানী?"
রুহানী আগ্রহ নিয়ে তাকালো। ছটফটিয়ে বলে উঠলো, "কি, কি?"
সুমাইয়া ঠোঁট চেপে বলে উঠলো, "বাহ, স্বামীর রাগ ভাঙানোর জন্য বউ কেমন উতলা হয়ে আছে!"
রুহানী বিরক্ত হয়ে বকে উঠলো, "ধুর বাল, চুপ কর তো।"
ইসরাত হেসে বললো, "শুনো তাহলে আমার কথা, উজান ভাইয়া শাড়ি খুব পছন্দ করে জানো? তুমি এক কাজ করতে পারো, তুমি সুন্দর করে শাড়ি পরে সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে পাঠিয়ে দাও উজান ভাইকে। তখন দেখবো ভাসুর আমার কিভাবে রাগ করে থাকে।"
রুহানী স্তব্ধ হয়ে গেলো ইসরাতের আইডিয়া শুনে। সে শাড়ি পরবে তাও উজান ভাইয়ার জন্য? তাদের সম্পর্ক কি আর দশটা দম্পতির মতো যে, রাগ করলে রাগ ভাঙানোর জন্য এমন পন্থা অবলম্বন করবে? সে জীবনেও এমন কাজ করতে পারবে না।
রুহানী বলে উঠলো, "আমার দ্বারা এটা কখনোই সম্ভব না, ভাবি। আমার লজ্জা করে।"
সুমাইয়া বলে উঠলো, "তোমার বালের লজ্জা করে। তোর আবার লজ্জা আছে!"
"শাট আপ!" রুহানী ধমকে উঠলো।
সুমাইয়া আবার বলে উঠলো, "দেখেছেন ভাবি, উজান ভাইয়ের সাথে থাকতে থাকতে উজান ভাইয়ের রোগে ধরেছে ওরে। সেও 'শাট আপ' বলা শিখে গেছে। এটাকেই বলে, স্বামীর শিক্ষা।"
পরপর আবার সন্দেহ নিয়ে ইসরাতের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে বললো, "এক মিনিট, আপনি জানলেন কেমনে উজান ভাইয়া শাড়ি পরা পছন্দ করে?"
ইসরাত অপ্রস্তুত হাসলো, "ওই...ইয়ে, তোমার ছোটো ভাইয়া বলেছিলো আমাকে।"
"ওহ আচ্ছা। আচ্ছা রুহানী তুই কিন্ত একবার ট্রাই করতে পারিস, বুঝলি?"
রুহানী বললো, "আমি পারবো না ভাই।"
____
রাতে তখন একটা বাজে। বিছানায় শুয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে রুহানী। কিছুতেই ঘুম আসছে না তার। সে বুঝতে পারছে না, উজান রাগ করেছে তাতে তার কি? সে কেনো এতো উতলা হয়ে আছে উজান ভাইয়ার জন্য? সে কেনো অস্থির হয়ে আছে উজান ভাইয়ের সাথে কথা বলার জন্য? তার কেনো সব উলোটপালোট লাগছে উজান ভাইয়াকে ছাড়া? মাথা কাজ করছে না রুহানী। হঠাৎ একা ঘুম আসছে না তার। প্রতিদিন রাতে ঘুমের ঘোরে উজানকে জরিয়ে ধরে ঘুমাতো সে। উজানের শরীর সব সময় অনেক গরম হয়ে থাকে স্বাভাবিকের তুলনায়। শীতের রাতে উজানকে ধরে ঘুমাতে আরামও লাগতো অনেক। সে টের পেলেও সরে আসতো না। ম্যানলি পারফিউমের ঘ্রাণে মহিত হয়ে যেতো। উজান আরো আগলে ধরতো তাকে। রুহানীর হঠাৎ শীত লাগতে শুরু করো। কম্বল মুরি দিয়ে শুয়ে রইলো। ফোন নিয়ে আবারও উজানের ওয়াটসঅ্যাপে ফোন দিলো।
____
মিটিং থেকে ফিরে লম্বা গোসল সেরে ঘরের সাথে কাচে ঘেরা প্রশস্ত বারান্দায় এসে বসল উজান। পাশেই গিটার পরে আছে। পকেট থেকে বেনসন অ্যান্ড হেজেস সিগারেটের প্যাকেট বের করলো। সেখান থেকে একটা নিয়ে মুখে নিলো।
তুহিন আসলো সেই সময়। উজানের পাশে এসে বসলো।
আচমকা পাশে পরে থাকা উজানের ফোন বেজে উঠলো। ভেসে উঠলো রুহানীর দাঁত বের করা হাস্যউজ্জ্বল ছবি। সেখানে জ্বলজ্বল করছে একটা নাম, মায়ালতা! উজান ফোন ধরলো না। বাজতে বাজতে বন্ধ হয়ে গেলো। কিছু সেকেন্ডে পর আবার বেজে উঠলো ফোন। তুহিন বললো,
"ফোন ধরছো না কেনো ভাইয়া? রুহানী বারবার ইশুর কাছে তোমার কথা জিজ্ঞেস করছে। ও অনেক গিল্টি ফিল করছে ওর করা কাজে। এবার অন্তত কথা বলো ওর সাথে।"
উজান কেমন করে বলে উঠলো, "ও আমাকে বুঝে না, তুহিন।"
উজানের কথায় তুহিনের বুক কেপে উঠলো।
"বুঝবে ভাইয়া, একটু সময় দাও। মানিয়ে নিতে সময় দাও। ছোটো মানুষ তো, একটু বোকা হয়। আর এমনিতেও মেয়ে মানুষ সব কিছুতে বেশি বুঝলেও কিছু কিছু জিনিসে ওরা আর কিছু বুঝে না। বলদ হয়ে যায়। রুহানীর মনেও তোমার জন্য কিছু একটা আছে, না হলে ও এতো অস্থির হতো না, ভাইয়া। কিন্ত ও ওর মনের কথা বুঝতে পারছে না।"
উজান কোনো জবাবই দিলো না। নিঃশব্দে, শীতল দৃষ্টিতে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে রইলো। ফোনটা এখনো বাজছে। এবার বন্ধ হয়ে গেলো। আর বাজলো না। তুহিন অসহায় চোখে চেয়ে রইলো তার প্রিয় ভাইয়ের দিকে। এই মানুষটার কষ্ট দেখলে তার মাথায় আর কোনো হিসাব চলে না। শুধু মনে হয়, যদি পারতো, তবে পুরো দুনিয়াটা এনে উজানের পায়ের কাছে রেখে দিতো, যেন ভাই ভালো থাকে।
রুহানীর জন্য উজানের করা পাগলামিগুলো তুহিন অসংখ্যবার নিজের চোখে দেখেছে। কত রাত নির্ঘুম কাটাতে দেখেছে তাকে। শুধু বসে সিগারেট টেনে যাচ্ছে, দৃষ্টি দূরে কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে।
যখন রুহানী সবার অগোচরে নাহিদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াল, তখন উজান প্রায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। কষ্টে, রাগে, অসহায়তায় সে নিজের ভেতরের সবকিছু হারিয়ে ফেলেছিলো। তুহিন কত কষ্টে তাকে সামলেছিলো, বুঝিয়েছিলো, এটা বয়সন্ধিকালের ভুল, সময় হলে রুহানী নিজেই সত্যিটা বুঝবে।
যেদিন প্রথমবার উজান রাগের মাথায় রুহানীকে হাত তুলেছিল, সেদিনই নিজের ভেতরেও আঘাত করেছিলো সে। সেই রাতে উজান একটুও ঘুমায়নি, একটুও খায়নি, শুধু চুপচাপ সিগারেট টেনে গেছে রাতভর। তার পাশে বসে থেকেছে তুহিন, কথায় না হলেও নীরব উপস্থিতিতে তাকে সঙ্গ দিয়েছে।
উজানের চোখে তখন যে বেদনার ছায়া ছিল, সেটা তুহিনের কাছে কোনো ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না।
উজানের এই রুপ একমাত্র সেই দেখেছে। অন্য কেও উজানকে এই অবস্থায় দেখলে বিশ্বাসই করতে চাইবে না, এটা সেই গম্ভীর, রাগি, বদমেজাজি লোকটা।
উজান ধীরে ধীরে হাতের সিগারেটটা শেষ টান দিয়ে নিভিয়ে পাশের অ্যাশট্রেতে ফেলে দিলো।
পাশে ঠেস দিয়ে রাখা গিটারটা তুলে নিলো সে। আঙুলগুলো আপন মনে ছুঁয়ে গেলো তারের উপর। প্রথমে ধীরে, তারপর ধীরে ধীরে স্পষ্ট সুরে ভেসে উঠলো মেলোডি। কাঠের গিটারের গভীর, উষ্ণ ধ্বনি ঘরের নিস্তব্ধতা ভেদ করে ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে। উজানের আঙুলে বয়ে যাচ্ছিলো সুরের সাথে এক অদ্ভুত যন্ত্রণা,
প্রতিটি স্ট্রাম যেন গোপন কোনো অনুভূতিকে কেটে বের করে আনছিলো।
গিটারের সুরের সাথে উজান গেয়ে উঠলো,
~~Kitni chahat hai dil mein tu jaane na,
Kase dil ko samjhaye dil maane na!
Baaton ko teri hum bhula na sake,
Hoke judaa hum na judaa ho sake.
Dil mein hai zinda har ghadi tu kahin,
Hoke judaa hum na judaa ho sak.
কিছুক্ষন থেমে আবার গেয়ে উঠলো,
~~Meri tammanaao ka ehsas tum, main kahin bhi rahun mere ass-paas tum.
Khuda jaane,
khuda jaane,
khuda jaane.
Ek pal bhi tumse door jaa na sake, hoke judaa hum na judaa ho sake!
Baaton ko teri hum bhula na sake,
Hoke judaa hum na judaa ho sake.
চলবে,,,
(উজানের গাওয়া গানটা একবার শুনবেন। তাহলে ওর গাওয়া গান ওর পরিস্থিতির সাথে অনুভব করতে পারবেন।)