ফন্ট সাইজ:
থিম:
শুধু বলো ভালোবাসি

১৪তম পর্ব

লেখক: মুহসানাত নুসাইবা
#শুধু_বলো_ভালোবাসি
#মুহসানাত_নুসাইবা
১৪.
পরীক্ষা শেষে রুহানী বাড়ি ফিরেই ফাইলটা বিরক্তিভরে বিছানায় ছুড়ে ফেলল। মাথার ভেতরটা এলোমেলো হয়ে গেছে। গত পঁচিশ দিন ধরে উজান নেই। কিন্তু তার সাথে একবারও কথা হয়নি! না সে ফোন করেছে, না রুহানীর ফোন ধরেছে।
প্রথমে রাগ হয়েছিলো, তারপর কষ্ট, আর এখন সেটা এক ধরনের হাহাকার আর অভিমান হয়ে বুকের ভেতরে গেঁথে বসেছে।
পড়াশোনায় মন বসছে না, পরীক্ষার মন বসছে না। আজকের পরীক্ষাটাও একেবারে বাজে গেছে। কার দোষ? রুহানীর চোখে এর একটাই কারণ, উজান ভাই।
নিজের মনেই গজগজ করতে করতে রুহানী হঠাৎ স্থির করল, এবার বড়ো খালাকে বিচার দিতেই হবে। আজকে এই ব্যাপারের একটা বিহিত করিয়ে ছাড়বে সে।
দ্রুত নিচে নেমে এল সে। রান্নাঘরে ঢুকতেই দেখতে পেলো, খালা হামিদা আর সুরাইয়া একসাথে আড্ডা দিচ্ছেন।
সে সোজা গিয়ে হামিদার সামনে দাঁড়াল, চোখে অভিমান নিয়ে বলে উঠলো,
 "খালামনি, আজকে তোমাকে এর বিচার করতেই হবে।"
হঠাৎ এমন তীব্র স্বরে কথা শুনে হামিদা চমকে তাকালেন। চোখ-মুখে কৌতূহল আর কিছুটা উদ্বেগ।
"কিসের বিচার? আবার কি হলো?"
রুহানী বিন্দুমাত্র দেরি না করে অভিযোগের ঢাল নামিয়ে দিলো,
"তোমার ছেলে আজকে কতোদিন হলো গিয়েছে? পঁচিশ দিন! এর মধ্যে আমার সাথে একবারও কথা বলেনি। আমি ফোন দিয়েছি অসংখ্যবার, কিন্তু সে ধরে না। এ কেমন ব্যবহার বলো?"
হামিদার ভ্রু কুঁচকে গেলো,
"কি বলিস? একবারও কথা হয়নি?"
রুহানী বিরক্তিভরে বলে উঠলো,
"কথা হয়নি বইলো না, তোমার ছেলে কথা বলেনি। হাজার বার, কোটি বার ফোন দিছি আমি, আমার ফোন ধরে না সে!"
হামিদা ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
"তোদের মধ্যে ঝগড়া হইছিলো?"
প্রশ্নটা শুনে রুহানী এবার মিয়িয়ে গেলো। তারপর আবার চোখের রাগ উসকে উঠে বললো,
"কিসের ঝগড়া হ্যাঁ? তোমার ছেলের সাথে আমার কোনো ঝগড়া হয়নি, ভুল করে হয়তো কিছু একটা বলে দিছিলাম সেই থেকে তার কথা বলা বন্ধ! অথচ আমাকে এই নিয়ে কিছুই বললো না, আর আমি বুঝিওনি তখন!"
হামিদা এবার হেসে ফেললেন। তার এই ছেলেটা এমন, সে যদি অভিমান করে, তাহলে মুখে কিছু বলে না, কিন্তু তার আচরণে বোঝানো শুরু করবে।
"আচ্ছা, তুই ঘরে যা। ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নে, আমি দেখি।"
রাগে-অভিমানে মুখ গোমড়া করে রুহানী গটগট করে চলে গেলো।
ওর চলে যেতেই হামিদা সুরাইয়ার দিকে তাকালেন, দুজনের চোখাচোখি হতেই একসাথে হো হো করে হেসে উঠলেন।
সুরাইয়া হাসতে হাসতে বললো,
"যাও, যাও, তোমার ছেলেকে একটু বোঝাও।"
হামিদা হেসে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। 
ঘরে ঢুকেই তিনি ফোন বের করে উজানকে কল দিলেন।
ফোন ধরতেই উজানের স্বাভাবিক গম্ভীর গলায় শুনা গেলো,
"হ্যাঁ মা, বলো।"
হামিদা এবার প্রায় শাসানোর সুরে বললেন,
"আমার বউমার সাথে তুমি কি করছো, শুনি?"
উজান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
"কি করেছি?"
"তুমি ওর সাথে কথা বলছো না কেনো? আমার বউমার বুঝি কষ্ট হয় না?"
উজানের ভ্রু সোজা হয়ে গেলো। জিজ্ঞেস করলো,
 "কি বলেছে ও?"
"তোমার নামে অভিযোগ করলো, তুমি নাকি এখান থেকে যাওয়ার পর তার সাথে একবারও কথা বলোনি। এটা কেমন ব্যাবহার?"
উজানের ঠোঁটে হালকা হাসি খেলল। গলায় এক ধরনের শুষ্কতা,
"এখন আমাকে কি করতে হবে শুনি?"
"এখনই ওর সাথে কথা বলবে।"
উজান কণ্ঠের দৃঢ়তা আরো বাড়িয়ে বললো,
"তোমার বউমাকে বলে দাও, তার স্বামী এখন তার সাথে কথা বলবে না। শুধু তা-ই না, এক মাস নয়, চার মাসের আগে দেশেও ফিরবো না।"
হামিদা বিস্ময়ে চমকে উঠলেন,
"এমা! কি বলিস এগুলা? চার মাস মানে? এতো দেরি কেনো?"
"আমার ইচ্ছা।"
এই বলে ফোন কেটে দিলো উজান।
হামিদা ফোন হাতে নিয়ে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে রইলো। মুখে হতাশা, চোখে বিরক্তি ফুটে উঠলো। এই ছেলে একেবারে অসভ্য হয়ে গেছে। কারো কথা শোনে না।
এখন সে তার বউমাকে কি জবাব দেবেন? বউমা যেন না ভাবে, তার শাশুড়ীও ব্যর্থ হয়ে গেছে তার স্বামীকে বোঝাতে! 
____
ইসরাতের ঘরে বিছানার ওপর গোল হয়ে বসে আছে রুহানী, ইসরাত আর সুমাইয়া। তিনজনের মুখে গম্ভীর ভাব, আলোচনার মূল বিষয়, স্বামীদের নিয়ে।
ইসরাতের মুখে অভিমান জমে আছে। তুহিনের সঙ্গে সকালবেলা সামান্য ঝগড়া হয়েছে। রাগের মাথায় তুহিন যতবার ফোন করেছে, ইসরাত একবারও ধরেনি। কিন্তু শেষমেশ নিজের মনকে আর সামলাতে না পেরে ফোন ব্যাক দেয় সে। তুহিনও কি কম যায়? এবার সেও ফোন ধরছে না ! ইসরাত ফোনের পর ফোন দিয়ে যাচ্ছে, তবুও কোনো সাড়া নেই। বুকের ভেতর কেমন হাহাকার জমে উঠছে। সেই কখন থেকে ছটফট করে যাচ্ছে সে। তুহিনের সঙ্গে কথা না বলে সে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না।
এই গম্ভীরতার মাঝেই সুমাইয়া হঠাৎ বলে উঠলো,
"তোমাদের দুইজনের ভাতারই এখন কাতার। তোমাদের উচিত এখন ওই গানটা গাওয়া।"
কথাটা বলেই সে গেয়ে উঠে,
"ভাতার আমার কাতার গেছে চাকরি করিতে। 
একলা বিছানায় ঘুম আসে না ছটফটাই রাতে!"
রুহানী দুম করে সুমাইয়ার পিঠে একটা কিল মারলো। মুখে হাত দিয়ে বললো, "ছি! কি অশ্লীল গান!"
ইসরাত মন খারাপের মাঝেও জোরে হেসে উঠলো।
সুমাইয়া চোখ উল্টিয়ে বলে উঠলো, "ছি কেনো! কতো সুন্দর একটা গান। তোদের অবস্থা হুবহু মিলে গেছে। এখন তোদের উচিত গানের শিল্পীকে নোবেল দেওয়া।"
একটু থেমে দুষ্টু হেসে আবার বললো,
"রুহানীর সাথে এই লাইনটা মিলে যাবে, দাঁড়া বলি।"
বলেই নতুন উদ্যমে গাইতে শুরু করলো,
"কাম কাজেতে মন বসে না, ভাবি বসে তাহার কথা। শীতের রাইরে মিটে না, দিয়া গায়ে কাঁথা! 
কইরা গেছে বন্ধু আমায় কঠিনও হুকুম।
আল্লাহ তুমি দাওয়া আমায় চোখে একটু ঘুম।"
রুহানী চেঁচিয়ে উঠলো, "সুমাইয়া থামবি তুই!"
সুমাইয়া আড় চোখে তাকিয়ে বলে উঠলো, "যাহ শালি! সত্যি কথার দাম নাই!"
"তোর সত্যি কথার, মায়রে বাপ। বাইর হ এখান থেকে।"
"যাবো না আমি। কি করার কর তুই?"
রাগে ফেটে পড়ে রুহানী সুমাইয়ার বেনী করা লম্বা চুল এক ঝটকায় টেনে ধরলো। সুমাইয়াও ছাড়ার পাত্রী নয়, সেও রুহানীর খোলা চুল দুই হাত দিয়ে শক্ত করে খামচে ধরলো। মুহূর্তেই শুরু হয়ে গেলো চুল টানাটানি!
তাদের হঠাৎ এমন কাণ্ডে ইসরাত ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। বিছানার ওপর ঝুঁকে দুইজনকে আলাদা করার চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করলো,
"আরেহ! আরেহ! কি করছো তোমরা! ছাড়ো, ছাড়ো!"
অনেক কষ্টে অবশেষে দু’জনকে আলাদা করলো সে। এখন তারা দুই প্রান্তে বসে, একে অপরের দিকে আগুন-ঝরা চোখে তাকিয়ে আছে। আরেকটু কিছু হলেই পরের মুহূর্তেই আবার ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিয়ে!
রুহানী আগুন ঝরা চোখে তাকিয়ে বলে উঠলো, "তোর মতো ননদ শত্রুরও না হোক।"
সুমাইয়াও প্রতি উত্তর করে উঠলো, "তোর মতো ভাবিও আমার লাগবে না। আমি উজান ভাইকে আবার বিয়ে দেওয়াবো।"
রুহানী রাগে হিসহিসিয়ে উঠলো, "পারলে বিয়ে দিয়ে দেখা।"
রুহানীর পরিক্ষা শেষ কিন্ত টেনশন শেষের নামই নাই! কি এক জ্বালা দিয়ে গেলো উজান ভাই। ওর নাওয়া খাওয়া সব শেষ! উজান ভাইয়ের অভিমানটা ঠিক কত বড়ো, তা এখনো বুঝে উঠতে পারছে না সে। গত এক মাস ধরে একবারের জন্যও কথা বলেনি উজান। 
বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাতের অন্ধকারে আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখে পানি জমে আসে রুহানীর। মনে হয়, আকাশের ওই তারাগুলোও তাকে প্রশ্ন করছে
"এতটা কি অন্যায় করেছিলি তুই, রুহানী? যে, উজান তোর সাথে কথা বলবে না?"
হঠাৎ হাত কেঁপে উঠে তার। একরকম অস্থিরতায় তুহিনকে ফোন দিলো সে। ফোন ধরতেই কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
"আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া।"
তুহিন মিষ্টি হেসে জবাব দিলো,
"ওয়ালাইকুমুস সালাম। কেমন আছিস, রে?"
"আলহামদুলিল্লাহ ভালো। কি করেন ভাইয়া?"
"আমি শুয়ে আছি। কাজ থেকে ফিরলাম একটু আগেই।"
রুহানীর বুকের ভেতরটা যেনো ধুকপুক করতে লাগলো। সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করলো,
"ভাইয়া, দেশে কবে আসবে?"
তুহিন হেসে বললো,
"আমি আসবো দুইদিন পরেই, ইনশাআল্লাহ।"
এই উত্তর শুনে রুহানীর মুখে হালকা হাসি ফুটলো বটে, কিন্তু পরক্ষণেই বুকের ভেতর একটা আশঙ্কা কেঁপে উঠলো। শুধু তুহিন ভাইয়া একা আসবে? উজান ভাইয়া সত্যি আসবে না?
আতঙ্ক আর দ্বিধার ভেতরেই আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলো সে,
"মানে... তুমি একাই আসবে?"
তুহিন হালকা দুষ্টুমি মেশানো স্বরে উত্তর দিলো,
"হ্যাঁ, একাই আসবো।"
রুহানীর গলা শুকিয়ে গেলো। বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে বললো,
"মানে... উজান ভাইয়া আসবে না?"
তুহিন একটু ভেবে ঠোঁট টিপে হাসলো। তারপর মজা করে বললো,
"উম্... না। উজান ভাইয়া থাকছে আরো কিছুদিন।"
"কেনো? উনার ওখানে কি কাজ?"
"কি আর করবে বল তো? তুই তো পাত্তা দিচ্ছিস না, তাই হয়তো নতুন কাউকে খুঁজছে।"
তুহিনের কণ্ঠে মজা থাকলেও সেই মজা রুহানীর কানে বাজলো বজ্রাঘাতের মতো। বুকের ভেতরটা ধ্বসে পড়লো যেনো। চোখে পানি ভরে উঠলো। শব্দ আটকে গেলো গলায়। কষ্টে, কান্না চেপে একটাই শব্দ বের হলো,
"ভাইয়া!"
তুহিন সঙ্গে সঙ্গেই তার কণ্ঠের কাঁপুনি টের পেলো। হেসে বলে উঠলো,
"আরে পাগলি! মজা করছিলাম। ভাইয়ার হয়তো কোনো কাজ আছে বলেই থাকতে হচ্ছে।"
রুহানীর উড়ে যাওয়া জান আবার ফিরে আসলো। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা বুকটা যেনো আবার হাওয়ায় ভরে উঠলো। একটা লম্বা শ্বাস টেনে নিলো। নরম গলায় বললো,
"উজান ভাইয়া... এখন কোথায়?"
"ভাইয়া ভাইয়ার ঘরে, আমি আমার ঘরে।"
"আচ্ছা ভাইয়া, রাখছি।"
রুহানী ফোন রেখে দিতেই তুহিন উজানের দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠলো। 
সে এতক্ষণ ছাদে বসে ছিলো উজানের সাথে। ফোনটা ছিলো লাউডস্পিকারে, সবকিছুই উজান শুনেছে। হাসতে হাসতে তুহিন গড়াগড়ি খাওয়ার উপক্রম হলো।
"ভাই! ভাই, তোমার মায়ালতার অবস্থা ভয়ংকর! দয়া করে, প্লিজ, এবার একটু কথা বলো।"
উজান গম্ভীর মুখে, ঠোঁট শক্ত করে বসে রইলো। চোখ দুটোয় গভীর অন্ধকার, বুকের ভেতর অনল। শোনার পরও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। শুধু নিঃশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিলো। হয়তো মুখে হালকা হাসির রেখাও দেখা দিলো? 
হাতের সিগারেটের কয়েকটা টান দিয়ে দূরে ফেলে দিলো। দুই হাত পেছনে ভর দিয়ে পেছনের দিকে হেলে বসলো। দুই পা সামনে মেলে রাখা। আকাশের দিকে তাকিয়ে সুর তুলে গেয়ে উঠলো,
~~আমি ডাকি তুই পাখি থাকিস না দূরে,
আমার এ জীবনটা চলে তোর অনুসারে।
তুই যদি বলিস আমায় প্রেম অপরাধী,
তোরে লিখে দিতাম আমার এ দুটি আখি!
ভালো যদি বাসতি আমায়, দেখতিস কি আদরে রাখি।
____
ইসরাতের দেওয়া প্ল্যানটা মনে মনে ভেবে রুহানী অবশেষে সাহস করে লাল রঙের জমকালো জামদানী শাড়িটা হাতে নিয়ে হাজির হলো ইসরাতের রুমে। দরজার কাছে দাঁড়ানো রুহানীকে দেখে প্রথমেই সুমাইয়া ফেটে পড়লো হাসিতে।
হাসতে হাসতে সে এতটাই কাবু হয়ে গেলো যে একসময় বিছানায় গড়াগড়ি করতে করতে নিচেই পড়ে গেলো। হাত-পা ছুঁড়ে অট্টহাসি দিতে লাগলো। ইসরাতও হেসে উঠলো, কিন্তু মুখে হাত চেপে রেখেছিলো।
রুহানী রাগে গরম হয়ে তাকিয়ে রইলো সুমাইয়ার দিকে। ঝলসে যাওয়া চোখে আগুন বের হচ্ছে। এই মেয়েটা আজকাল তাকে নিয়ে খুব মজা নিচ্ছে! সব দোষ ওই উজাইন্নার! একবার খালি দেশে আসুক তখন বুঝাবে, কতো ধানে কতো চাল!
ইসরাত তখন ডাক দিলো,
"আরে, ওর কান্ডে কান দিও না তো! আমার কাছে আসো, আমি শাড়ি পরিয়ে দিচ্ছি।"
সুমাইয়া আবার খোঁচা দিলো, "হ্যাঁ হ্যাঁ, সুন্দর করে পরিয়ে দেন। এমনভাবে সাজান যেনো এক দেখাতেই উজান ভাই বেচারা পাগল হয়ে সেকেন্ডের ভেতর তার সামনে হাজির হয়ে যায়!"
রুহানী দাঁতে দাঁত চেপে কিছু না বলে ইসরাতের কাছে গেলো। ইসরাত ধীরে ধীরে যত্ন করে শাড়ি পরিয়ে দিলো। কুচিটা সুন্দর করে ভাঁজ করে দিলো, আঁচল মাথায় টেনে দিলো। তারপর রুহানীকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে আয়নায় তাকিয়ে বলে উঠলো,
"মাশাআল্লাহ! মাশাআল্লাহ! একদম নতুন বউ! কতো সুন্দর লাগছে তোমাকে, রুহানী। শুধু একটা জিনিস মিসিং… যদি নাকে একটা নাকফুল থাকতো, তাহলে একদম আসল গিন্নি-গিন্নি লাগতো!"
রুহানীর গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে গেলো। লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো।
সুমাইয়া এগিয়ে এসে রুহানীর চিবুক উঁচু করে দিলো, তারপর মুগ্ধ হয়ে বললো,
"আসলেই! রুহানী, তোকে তো দারুণ লাগছে। নাকফুল থাকলে তো একেবারে নতুন কনের মতো লাগতো।"
রুহানী একটু মন খারাপ করে বললো,
"আসলেই?"
তারপর  আবদার করলো,
"আমি নাক ফোড়াবো!"
সুমাইয়া হাততালি দিয়ে উঠলো,
"চল, কালই নিয়ে যাবো তোকে পার্লারে। সেখানে নাক ফুড়াবি।"
রুহানী খুশিতে লাফ দিয়ে উঠলো,
"আচ্ছা আচ্ছা, কালকেই যাবো!"
মুহূর্তটা আরও প্রাণবন্ত হয়ে সুমাইয়া বললো,
"আচ্ছা, এখন দাঁড়া, সুন্দর সুন্দর পোজ দে। ছবি তুলে দেই।"
ইসরাত হেসে মাথা নাড়লো। রুহানী শাড়ির আঁচলটা হাতে নিয়ে লাজুক ভঙ্গিতে দাঁড়ালো। একেকটা পোজ দিচ্ছে, আর সুমাইয়া ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দে ছবি তুলে যাচ্ছে।
রাতের বেলা রুহানী বেছে বেছে সব থেকে সুন্দর সুন্দর পাঁচটা ছবি উজানকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিলো। বুক ধুকপুক করছে তার। 
এখন তার মনে একটা গানের কিছু লাইন মাথায় বিচরন করছে।
~~মন ভাসাইয়া প্রেমের সম্পানে,
মন থাকেরে তোমার সন্ধানে,
আগুন জ্বালাইয়া মনের লন্ঠনে
আছো লুকাইয়া তুমি কোন খানে?
নয়ন ঘুরাইয়া খুজি, তোমারে তোমারে।
অন্তরে বিছাইয়া খুজি তোমারে তোমারে।
____
মিটিং রুমে গম্ভীর মুখে বসেছিলো উজান। চারপাশে বড় বড় কর্পোরেট অফিসাররা। সবাই গভীর মনোযোগে আলোচনায় ব্যস্ত। 
সামনেই একজন বিদেশি ক্লায়েন্ট নিজের বক্তব্য পেশ করছে। উজান গম্ভীরমুখে শুনছে।
হঠাৎ তার মোবাইলটা হালকা কেঁপে উঠলো। হোয়াটসঅ্যাপ নোটিফিকেশনের শব্দ। এক ঝলক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখলো 'মায়ালতা' সেভ করা আইডি থেকে কিছু ছবি এসেছে। 
অবচেতনে ফোনটা তুলে নিলো। আইডি খুলতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠলো কয়েকটা ছবি।
হঠাৎ উজানের বুকের ভেতর যেনো বাজ পড়লো। চোখ স্থির হয়ে গেলো ছবির ওপর।
লাল জমকালো জামদানী শাড়ি পরা, কুচিটা নিখুঁতভাবে গোঁজা, আঁচল মাথার ওপর দিয়ে নামানো। যেনো আভিজাত্যে ভরা এক অনিন্দ্যসুন্দর রূপ। ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি।
উজানের গলা শুখিয়ে গেলো। হাতের তালু ঘেমে উঠলো। বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হলো তীব্রভাবে। এত ভিড়ের মাঝেও তার মনে হলো, চারপাশের শব্দ এক নিমিষে মিলিয়ে গেছে। শুধু ছবিটার ভেতরে আটকে গেলো সে।
একা একটা দীর্ঘশ্বাস বের হলো তার বুক ফুঁড়ে। চোখের সামনে যেনো হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলো রুহানী, ঠিক ওরকম ভঙ্গিতে, মাথায় আঁচল টেনে, লাজুক চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এইতো হাত বাড়ালেই তাকে ছোঁয়া যাবে।
তার ভেতরের কঠিন বরফ হঠাৎ টলমল করে উঠলো। এতদিনের অভিমান, রাগ, চুপচাপ থাকা, সবকিছু মিলিয়ে যেনো এক অদ্ভুত অস্থিরতা গ্রাস করলো তাকে।
চোখ নামিয়ে নিতে চাইলেও পারলো না। আবারো ছবিটা খুললো, বারবার জুম করে দেখলো। আঁচলের নিচে ঝলমলে কপাল, ঠোঁটের কোণে অল্প লাজুক হাসি সবকিছু তার বুকের ভেতর ঝড় তুললো।
মিটিং টেবিলের বক্তব্য দেওয়া ব্যাক্তিটি তার বক্তব্য শেষে বলে উঠলো,
"Mr. Ujan? Your opinion, please?"
কিন্তু উজানের কানে কিছুই পৌঁছালো না। তার হাতের আঙুল তখনো স্ক্রিনে আটকে আছে। এক মুহূর্তে তার মনে হলো, সব ফেলে, সবকিছু ছেড়ে সে শুধু দৌড়ে চলে যাক রুহানীর কাছে।
ঘোমটা মাথায় দেওয়া, দুই হাত দিয়ে ঘোমটা ধরে ক্যামেরার দিকে ঝলমল চোখে তাকিয়ে, ঠোঁটে লাজুক হাসি দিয়ে তোলা ছবিটা সাথে সাথে উজান নিজের ফোনের ওয়ালপেপারে সেভ করে রাখলো। 
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন