ফন্ট সাইজ:
থিম:
শুধু বলো ভালোবাসি

২২তম পর্ব

লেখক: মুহসানাত নুসাইবা
#শুধু_বলো_ভালোবাসি
#মুহসানাত_নুসাইবা
২২
উজান ফোন রিসিভ করে কানে তুলেই বড়সড় একটা গালি দিতে যাচ্ছিলো, এমন সময় ওপাশ থেকে তুহিনের কণ্ঠ ভেসে এলো, 
"ভাইয়া? ভাইয়া শুনো।"
তুহিনের কণ্ঠে আতঙ্ক আর অস্থিরতা ভেসে আসতেই উজানের কপালে ভাঁজ পড়লো। সে দ্রুত রুহানীকে নিয়েই সোজা হয়ে বসলো।
"কি হয়েছে তুহিন?" 
চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো উজান।
ওপাশ থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে তুহিন বললো,
"ভাইয়া... ভাইয়া ইশু জ্ঞান হারিয়েছে!"
কথাটা শুনেই উজান হকচকিয়ে উঠলো। বিন্দুমাত্র দেরি না করে বলে উঠলো,
"দ্রুত পার্কিংয়ে নিয়ে আয়, আমি গাড়ির কাছেই আছি!"
বলেই ফোন কেটে দিলো।
রুহানী উৎকণ্ঠিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে ছিলো। ফোন কেটে যেতেই সে জিজ্ঞেস করলো,
"কি হয়েছে?"
"ইসরাত অজ্ঞান হয়ে গেছে।"
রুহানী মুখে হাত চেপে ধরলো, "কি বলেন! কিভাবে হলো?"
উজান বিরক্ত গলায় বললো,
"আজব! আমি কিভাবে জানবো?"
এরপরই গাড়ি থেকে তড়িঘড়ি নেমে গেলো দুজন। কিছুক্ষণ না যেতেই তুহিন ছুটে এলো। তার কোলে থাকা ইসরাত অচেতন হয়ে আছে। মুখটা ফ্যাকাশে। তুহিন নিজেও অস্থির হয়ে পড়েছে। তাদের পেছনে সুমাইয়া, রাসেল, অভ্র, আয়েশা, সুরাইয়া, হাফসা, হামিদা সবাই দৌড়ে এসেছে। উজান যদিও সবাইকে একসাথে না আসতে বারণ করেছিলো, তবু কেউ শোনেনি। সরাসরি সবাই ছুটে গেলো হাসপাতালে।
হাসপাতালের কেবিনে ইসরাতকে শুইয়ে দেওয়া হলো। সাদা আলোয় ভরা কেবিনে চারপাশে অস্বস্তির ছাপ। মহিলা ডাক্তার স্টেথোস্কোপ কানে গুঁজে একের পর এক পরীক্ষা করছেন। সবাই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। তুহিন কেঁদে দেবার মতো অবস্থা। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, হাত কাঁপছে। উজান পিঠে হাত রেখেছে তাকে শান্ত করার জন্য। পাশেই অভ্র, রাসেল দাঁড়িয়ে।
ডাক্তার কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
"পেশেন্টের হাজবেন্ড কে?"
তুহিন দ্রু সামনে এগিয়ে গেলো। কাঁপা কণ্ঠে বললো,
"আমি... আমি।"
ডাক্তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন, 
"মিষ্টি খাওয়ান জনাব, আপনি বাবা হতে যাচ্ছেন।"
এক মুহূর্তের জন্য সবাই হতবাক হয়ে গেলো। তুহিনের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। মুখ ফাঁকা হয়ে খুলে গেলো অবচেতনেই।
রাসেল হেসে উঠলো। সাথে সাথেই তুহিনের মুখ হাত দিয়ে চেপে বন্ধ করলো সে।
"আরে মুখ বন্ধ কর! মিষ্টির বদলে তো মশা ঢুকে যাবে!"
সবাই হেসে উঠলো। এমন সময় হামিদা বেগম চোখ ছলছল নিয়ে এগিয়ে গেলেন ডাক্তারের দিকে। গলা কেঁপে উঠলো তার,
"ডাক্তার... ডাক্তার, সত্যি বলছেন তো?"
ডাক্তার হেসে মাথা নাড়লেন।
"হ্যাঁ আন্টি, একদম সত্যি বলছি। পেশেন্টের জ্ঞান ফিরলে একবার চেকআপ করে যাবেন, কতদিন চলছে সেটা নিশ্চিত হয়ে নেবেন।"
হামিদা কিছু বলতে পারলেন না। হাত দুটো বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে রাখলেন।
ডাক্তার কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন। তুহিন তখন ইসরাতের বিছানার পাশে বসে তার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। চোখের কোণে আনন্দাশ্রু।
এ সময়ে তাদের একান্তে থাকার দরকার। তাই ধীরে ধীরে সবাই কেবিন ছেড়ে বাইরে চলে এলো। 
সবাই বেরিয়ে যেতেই তুহিন ইসরাতের উপর ঝুকে তার কপালে গভীর একটা চুমু দিলো। কিছুক্ষন ঠোঁট ছুঁয়িয়ে রাখলো কপালে। চোখ বেয়ে অশ্রু বের হলো। আজ সে সব দিক দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে। আল্লাহ তাকে সব দিক দিয়ে পরিপূর্ণতা দিয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ।
তুহিন কপাল থেকে নেমে ইসরাতের শুকনো ঠোঁটে আলতো করে চুমু খেয়েলো।
___
কেবিনের থেকে বের হতেই হামিদাকে জড়িয়ে ধরলো সুরাইয়া আর হাফসা।
হাফসা হেসে বলে উঠলো,
"আপা... আপা... আপা আমরা দাদি হচ্ছি!"
সুরাইয়া খুশির উচ্ছ্বাসে গলা কাঁপিয়ে বললো,
"আমরা প্রথমবারের মতো দাদি হচ্ছি, আপা!"
হামিদা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। কান্না ভেসে এলো আনন্দে। বারবার মাথা নাড়িয়ে বললেন,
"হ্যাঁ... হ্যাঁ, আমরা দাদি হচ্ছি!"
রুহানী ঝাঁপিয়ে পড়লো সুমাইয়ার দিকে। জড়িয়ে ধরে খুশিতে বলে উঠলো,
"সুমু বেবি! আমি ফুফু হচ্ছি!"
সুমাইয়া অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকালো। তাকে সরিয়ে দিলো ধাক্কা দিয়ে।
"তুই ফুফু হচ্ছিস কিভাবে? তুই তো হবি চাচি!"
রুহানী চোখ ছোট করে তাকালো, ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,
"চাচির আগে আমি ফুফু হবো!"
উজান ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। রুহানীর কথা শুনে ভ্রুদয় ভাজ পরলো তার। পাশ থেকে রাসেল উজানকে বলে উঠলো,
"তার মানে ভাই, তুমি চাচার বদলে ফুফা হচ্ছো?"
উজান বুকে হাত ভাজ করে আরাম করে দাঁড়িয়ে বললো, 
"কয়দিন পর বাপও হবো।"
রাসেল খোচা দিলো এবার, "এতোদিন কি করলা তুমি, ভাই? বিয়ে তো একসাথেই হয়েছিলো। বড়ো ভাই হয়েও, তোমার আগে ছোটো ভাই বাবা হয়ে যাচ্ছে! শেইম অন ইউ, ভাই। শেইম অন ইউ।"
নিজের সম্মানে আঘাত লাগায় উজান দাঁত কটমট করে রুহানীর দিকে তাকালো। ঠিক সেই সময় রুহানীও তাকালো। উজানকে নিজের দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকাতে দেখে রুহানী হকচকিয়ে উঠলো। এই উজান ভাইয়ের আবার হঠাৎ কি হলো?
রাসেল এবার গেলো অভ্রর কাছে। মাথা নাড়িয়ে বলে উঠলো, 
"জীবনে কি করলা, চাচা? তোমার ভাইপোর বাপ হয়ে যাচ্ছে, মানে দাদা হয়ে যাচ্ছো অথচ তুমি এখনো শুকনো মুখে বসে আছো। লজ্জা হওয়া উচিত।"
অভ্র আড় চোখে তাকিয়ে বলে উঠলো, "শুক্রবার খালি বিয়েটা একবার হতে দে। সামনের মাসেই তোদের সুখবর দিয়ে দিবো, ইনশাআল্লাহ।"
রাসেল বিরবির করলো, "সো ফাস্ট!"
কিছুক্ষনের ভেতরে হাত ভর্তি মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে হসপিটালের হাজির হলেন রফিকুল মাহতাব, রাফিদ মাহতাব আফতাব হোসাইন।
ইসরাতের জ্ঞান ফিরে সুখবর শুনে এক চোট কাঁদা হয়ে গিয়েছে তার। তার জ্ঞান ফিরতেই চেকআপ করিয়ে এনেছে তুহিন। রিপোর্ট কাল দিবে। রাত দশটা বাজলে সবাই বাড়ি ফিরে আসলো।
পরেরদিন তুহিন গিয়ে রিপোর্ট নিয়ে আসলো। রিপোর্টে দেখাচ্ছে ইসরাত দেড় মাসের প্রেগনেন্ট! 
বাড়িতে ডাবল খুশির জোয়ার এসেছে। কারো মুখ থেকে হাসি সরছেই না যেনো!
কিছুদিন ধরে সুমাইয়া আর রুহানী নাচ শিখছে হলুদে নাচার জন্য। তুহিন ভাইয়ের বিয়েতে রুহানী নাচতে পারেনি এই আফসোস তার কোনো দিনও যাবে না। 
সেই আফসোস কিছুটা কমানোর জন্য সে এবার পুরোদমে আনন্দ করছে, নাচ শিখছে। 
পরশুদিন গায়ে হলুদ। আরো অনেক টুকটাক কেনা কাটা বাকি আছে। সেগুলো কেনাকাটা করতে শুধু হামিদা, সুরাইয়া, হাফসা যাচ্ছেন এবার।
অভ্রর গায়ে হলুদ আজ। সকাল থেকেই এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। ঢাকার অন্যতম অভিজাত স্থান, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঝলমলে সাজে সেজে উঠেছে। চারদিকজুড়ে আলোর বাহার, ফুলের গন্ধ যেন চারপাশ মোহময় হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যেই আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, প্রভাবশালী অতিথিরা একে একে এসে পৌঁছে গেছেন।
শুধু অপেক্ষা বউয়ের আগমনের। আয়েশা, রুহানী, সুমাইয়া আর ইসরাত এখনো পার্লার থেকে ফেরেনি। তাদের ছাড়া সবকিছুই অপূর্ণ মনে হচ্ছে। তাদের সাথে সামিয়া, ইরাও আছে। দুইদিন আগে তুহিন আর রাসেল গিয়ে সামিয়া আর ইরাকে নিয়ে এসেছে।
স্টেজের পাশে দাঁড়িয়ে আছে অভ্র , সাথে উজান, তুহিন, রাসেল, তাহের, নাহিদ আর ওমর। সকলের পরনে হলুদ পাঞ্জাবি। তারা বিভিন্ন বিষয়ে গল্পে মশগুল। বর্তমানে গল্পের মুখ্য বিষয় হলো, মেয়েরা সময় সময় দেরি করে।
গেটের সামনে অতিথি আপ্যায়নের দায়িত্বে দাঁড়িয়ে আছেন রফিকুল সাহেব, রাফিদ মাহতাব এবং আফতাব হোসাইন। অতিথি প্রবেশ করলেই আন্তরিক অভ্যর্থনায় সাদর সম্ভাষণ জানাচ্ছেন তাঁরা। হোটেলের বাইরে ও ভেতরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভিআইপি অতিথিদের জন্য আলাদা প্রোটোকল নিশ্চিত করা হয়েছে।
ঠিক এমন সময় বাইরে এসে থামলো একটি অভিজাত কালো প্রাইভেট কার। গাড়ি থেকে প্রথমে নামলেন আইনমন্ত্রী জালাল শেখ। সাথে সাথেই রফিকুল সাহেব এগিয়ে গেলেন তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে। পরক্ষণেই গাড়ির দরজা থেকে নেমে এলো এক আলোকিত চেহারার তরুণী। হলুদ রঙের শাড়িতে অপরূপ লাগছে তাকে। সবার চোখ একে একে ঘুরে গেল তার দিকে।
আইনমন্ত্রী জালাল শেখের একমাত্র কন্যা, হায়াত জাহরা। সদ্য যৌবনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই তরুণী এখন অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। সৌন্দর্যে যেমন মনোমুগ্ধকর, আচরণে তেমনি ভদ্র ও মার্জিত। তার দেখা সহজে পাওয়া যায় না।
রফিকুল সাহেব এগিয়ে এসে জালাল শেখের সঙ্গে করমর্দন করলেন। উজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে জালাল শেখ মেয়ের দিকে তাকিয়ে গর্বভরে বললেন,
"এটা আমার একমাত্র রাজকন্যা, হায়াত জাহরা।" 
হায়াত মিষ্টি এক চিলতে হাসি মুখে এনে ভদ্রভাবে রফিকুল সাহেবকে সালাম জানালো।
"আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।"
সৌজন্যমাখা সেই সম্ভাষণ শুনে রফিকুল সাহেবও আপন স্নেহে জবাব দিলেন,
"ওয়া আলাইকুমুস সালাম, মা। কেমন আছো তুমি?"
"আলহামদুলিল্লাহ ভালো।"
জালাল শেখ বললেন, "আপনার মেয়েরা কোথায়? হায়াত তো এখানের কিছুই চেনে না, কারো সাথে পরিচয় নেই। ওদের সাথে হায়াত না হয়.."
জালাল শেখের কথা সম্পুর্ণ করার আগেই রফিকুল সাহেব বলে উঠলেন, 
"অবশ্যই.. অবশ্যই। ওরা তো এখনো পার্লার থেকে ফেরেনি। কিছুক্ষনের ভেতরেই চলে আসবে।"
অদের কথার মাঝের সেখান রুহানীদের গাড়ি এসে থাকলো। রফিকুল সাহেব সেদিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
"ওইতো আমার মেয়েরা চলে এসেছে।"
রুহানীরা বেরিয়ে আসলো গাড়ি থেকে। রফিকুল সাহেব ডাকলেন কাছে। হায়াত তাকিয়ে দেখলো ছয়টা মেয়েকে। মাঝেরটা বউ। তার সাঝেই বোঝা যাচ্ছে। তার পাশের মেয়ে গুলো একই শাড়ি পরা। একই সাজে। নাইস কম্বিনেশন। 
রুহানীরা এগিয়ে আসলে রফিকুল সাহেব পরিচয় করিয়ে দিলো সবার সাথে।
রুহানীকে বললো, "রুহানী, তোমাদের সাথে নিয়ে যাও হায়াতকে। তোমাদের বড়ো আপু হয়।"
রুহানী হেসে এগিয়ে এসে হায়াতের হাত ধরলো। রুহানী বললো,
"চলুন আমাদের সজ্ঞে।"
___
রাসেল বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,
"কিরে ভাই, বুঝি না! বর সেই কখন থেকে এসে বসে আছে, এদিকে বউয়ের কোনো খবর নাই। কারো সাজতে এত সময় লাগে নাকি?"
 তুহিন বললো,
"ওই তো, চলে এসেছে!"
সবার দৃষ্টি হঠাৎ সামনের দিকে চলে গেল। আলো-আঁধারের মিশেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে মেয়েরা। মাথা নিচু করে নরম পদক্ষেপে হাঁটছে আয়েশা। হলুদ শাড়িতে যেন এক হলুদ পরী হেটে আসছে। তার পাশে রুহানী, সুমাইয়া, ইসরাত, ইরা, সামিয়া আর হায়াত। হাসি-ঠাট্টায় মেতে সবাই এগিয়ে আসছে।
মুহূর্তের জন্য সময় থমকে গেলো। উজানের বুক ধড়ফড় করতে লাগলো রুহানীকে দেখে। তার ঠোঁটে অনিচ্ছাকৃত এক প্রশান্ত হাসি খেলে গেল। অভ্রর চোখ আটকে রইলো আয়েশার মায়াবী চাহনিতে। তুহিনও স্তব্ধ হয়ে গেলো ইসরাতকে দেখে।
তাদের এই নিঃশব্দ বিস্ময় ভেঙে দিলো রাসেল। হঠাৎ করেই সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলো,
"এই মাথা-মোটা টাকে তো আজ দারুণ সুন্দর লাগছে!"
তুহিন বিস্মিত দৃষ্টিতে রাসেলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
"মাথা মোটা? মাথা মোটাটা আবার কে?"
রাসেল হেসে উত্তর দিলো,
"আর কে হবে? সুমাইয়া!"
তুহিন হো হো করে হেসে উঠলো। তুহিনের হাসিতে মেয়েরা সবাই তাকিয়ে পরলো। রুহানীর চোখ আটকে গেলো উজানের উপর। উজান সচারাচর পাঞ্জাবি পরে না। সে যদি জানতো তাকে পাঞ্জাবিতে কতোটা স্নিগ্ধ লাগে, তাহলে হয়তো এমন অবহেলা করতো না পাঞ্জাবিকে। পাঞ্জাবির হাতাটা নিখুঁত ভাবে ভাজ করে কনুই পযন্ত গুছানো। এটা তার স্বামী! তার ব্যাক্তিগত পুরুষ। ভাবতেই শিউরে উঠলো রুহানী।
রুহানীরা এগিয়ে আসতেই অভ্র স্টেজে উঠে গেলো। আয়েশার দিকে হাত বারিয়ে ধরলো।
রুহানী আয়েশার হাত অভ্রর হাতে তুলে দিলো। অভ্র আলতো ভাবে হাত ধরে তাকে স্টেনে উঠালো।
আশেপাশের সকলে এক জোট হয়ে করতালি দিয়ে উঠলো। রাসেল, তুহিন, তাহের মুখ দিয়ে চিটি বাজালো। 
সাউন্ড বক্সে হলুদের গান বাজছে। সাইডে বাচ্চারা নাচানাচি করছে। 
অভ্র, আয়েশার ফোটো শুট হচ্ছে। ক্যামেরার ম্যান একের পর এক ক্লিক করেই যাচ্ছে। বিভিন্ন পোজে ছবি তুলছে দুইজন।
অভ্র, আয়েশা স্টেজে একসাথে বসে আছে। এবার সকলে একে একে উঠে হালকা একটু করে হলুদ ছুঁয়িয়ে দিয়ে আসছে দুইজনকে। 
রুহানী, ইসরাত, সুমাইয়া, সামিয়া, ইরা আর হায়াত দাঁড়িয়ে ছিলো একসাথে। তারাও ছবি তুলছে। তাদের সবার কাছে ফোন থাকলেও সবার ফোনের ক্যামেরা ওতো ভালো না। বিপত্তি বেধেছে এখানে। এতো সুন্দর সেজেছে কিন্ত ছবি ভালো উঠছে না। তাদের বাবা-মা নামে মাত্র একটা ফোন দিয়েছে তাদের। কথা ছিলো কলেজ শেষে তাদের দামি ফোন কিনে দিবে তার আগে শুধু ব্যাবহার করার জন্য একটা ধরিয়ে দিয়েছে। 
এতোক্ষনে হায়াত বলে উঠলো, "তোমরা চাইলে আমার ফোন নিতে পারো ছবি তোলার জন্য।"
সাথে সাথে রুহানী বলে উঠলো, "না না তার দরকার নেই, আপু।"
"আরেহ নাও সমস্যা নেই।"
সুমাইয়া বললো, "ধন্যবাদ আপু বলার জন্য। কিন্ত থাক আপু, আমি ভাইয়ার থেকে নিয়ে আসছি ফোন।"
সুমাইয়া রুহানীকে বললো, "রুহানী যা উজান ভাইয়ের থেকে ভাইয়ার ফোনটা একটু নিয়ে আয়।"
রুহানীর কলিজা লাফিয়ে উঠলো। হকচকিয়ে বলে উঠলো,
"পাগল নাকি! আমি যাবো ফোন আনতে? তোর দরকার হলে তুই যা।"
সুমাইয়া অনুরোধ করতে শুরু করলো, "যা বোন, একটু এনে দে প্লিজ। তুই গেলে ভাইয়া অবশ্যই দেবে। কিছু বলবে না।"
রুহানী বিরক্ত হয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগে হায়াত বলে উঠলো,
"আমি জাই?" 
সুমাইয়া তরাক করে তাকালো হায়াতের দিকে। ভ্রু কুঁচকে গেলো। এই মেয়ে যেতে চাচ্ছে কেন? পরপর মুখ ঠিক করে। হালকা হেসে বলে উঠলো,
"আরেহ কি যে বলেন আপু। আপনি আমাদের অতিথি আপনাকে দিয়ে কাজ করাবো আমরা? ছি, কি যে বলেন না!"
হায়াত হেসে বললো, "আরেহ না আমার কোনো সমস্যা হবে না। আমি যাই?"
বলে উজানকে খুজতে লাগলো হায়াত। দেখলো তাদের থেকে ঠিক সামনে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে উজান। রুহানী চোখ ছোটো ছোটো করে শিকারি নজরে হায়াতের দিকে তাকিয়ে রইলো। সুমাইয়া তাকালো রুহানীর দিকে। আবার তাকালো হায়াতের দিকে। হায়াত উজানের দিকে তাকিয়ে আছে। এবার সে উজানের দিকে জেতে গেলে সুমাইয়া হাত চেপে ধরলো হায়াতের। হায়াত থমকে গেলো। নিজের হাতের দিকে তাকালো। 
হায়াত সুমাইয়ার দিকে তাকাতেই অপ্রস্তুত হেসে উঠলো সুমাইয়া, 
"আপনার যেতে হবে না আপু। রুহানী যাচ্ছে তো। রুহানী গেলে উজান ভাইয়া কোনো জবাব চাইবে না, সাথে সাথে দিয়ে দিবে।"
হায়াত বললো, "আমি গেলে বুঝি দিবে না?"
"না না তা কেনো হবে! রুহানী থাকতে আপনি জাবেন কেনো বলেন।"
এবার সুমাইয়া হায়াতকে কথা বলার সুযোগ না দিকে রুহানীকে ঠেলে পাঠালো। রুহানী রাগে গজগজ করত করতে উজানের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। 
উজান নাহিদের সাথে কথা বলছিলো। 
রুহানীকে আসতে দেখে নাহির চোখের ইশারায় পেছনে তাকাতে বললো উজানকে।
উজান পেছনে ফিরে রুহানীকে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
"কি হয়েছে?"
"আপনার ফোনটা একটু দেন।"
উজান কোনো প্রশ্ন না করে পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোন বের করে রুহানীকে দিলো।
রুহানী ফোন নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "পাসওয়ার্ড কি?"
"ইংরেজিতে "রুহানী'।"
পাসওয়ার্ড শুনে রুহানীর চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেলোম। উজান  বললো,
"জা।"
রুহানী চলে আসলো। আসার পথে ফোনের লক খুলতে গিয়ে ফোনের লক স্ক্রিনে চোখ আটকে গেলো। সেখানেই স্তব্ধ  হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো সে। লক স্ক্রিনে তার আর উজানের একসাথে ছবি দেওয়া। তুহিনের গায়ে হলুদের সময় রাসেল যখন তাদের ছবি তুলতে ডাকলো, কিন্ত মাঝ পথে চলে গেলো। হঠাৎ উজান আর রুহানী দুইজন দুইজনের দিকে তাকিয়ে পরলো ঠিক সেই মুহূর্তের ছবি এটা! অদ্ভুত এক প্রশান্তি কাজ করলো রুহানীর মনে। সাথে সাথে লক খুললো ফোনের। এবার আরো চমকে উঠলো। ফোন স্ক্রিনে তার শাড়ি পড়া পিক। উজান বিদেশ থাকতে যেই ছবিগুলো সে দিয়েছিলো। তার ভেতরের একটা। রুহানী চট করে পেছনে ফিরে উজানের দিকে তাকালো। উজান নাহিদের সাথে কথা বলার ব্যাস্ত। রুহানীর ঠোঁট ফুরে হাসি বেরিয়ে আসলো। তার ইচ্ছে করলো এক্ষুনি ছুটে গিয়ে উজানকে ঝাপটে ধরতে।
ইশিতাও আসলো কিছুক্ষনের ভেতরে। ইশিতা এসে রুহানীদের সাথে যোগ হলো। তারা সবাই ছবি তোলায় ব্যাস্ত। 
_____
ডান্স ফ্লোরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে উজানরা সবাই। সবাই গল্পে মশগুল।
আচমকা সব আলো নিভে গেলো। হঠাৎ করে সবাই থমকে গেলো। হঠাৎ সব লাইট বন্ধ হয়ে গেলো কেনো বুঝতে পারছে না। উজান ফোনের ফ্লাস জ্বালাতে যাবে 
ঠিক তখনই, স্টেজের ওপর স্পটলাইট ঝলকে উঠলো। শুরু হলো তুমুল বিখ্যাত গান 
Hoye hoye hoye
Hoye hoye hoye
Hoye hoye hoye
hoye hoye hoye 
মিউজিকের বিটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্টেজের দুই পাশে থেকে ধীরে ধীরে হেঁটে এলো সুমাইয়া আর রুহানী। তারা হাঁটতে হাঁটতেই শাড়ির আঁচল পেছন থেকে সামনের দিকে এনে বাঁ পাশে কোমরে গুঁজে দিলো। 
তাদের আসতে দেখে একত্রে সবাই চেচিয়ে উঠলো। সিটি বাজাতে থাকলো। 
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা উজান স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে  বউয়ের কান্ডে।
মঞ্চের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েই শুরু হলো তাদের পারফর্মেন্স। 
~Saiyaan ched dewe
Nanad chutki leve
Sasural genda phool 
Saas gaari deve 
dewar samjha leve
Sasural genda phool
Chora babul ka angana 
Bhaave deraa piya ka ho
Saiyaan hai vypaari
Chale hain pardes
Sooratiyaan niharau, jiyara bhaari howe
Sasural genda phool
গানের তালে তালে দুইজনে কোমর দুলছে। নাচের প্রতিটা স্টেপ একদম নিখুঁতভাবে করছে। উজানের বুকে ব্যাথা উঠে গেলো। অজান্তেই ডান হাত চলে গেলো বুকের বাম পাশে। হাত দিয়ে ডলতে থাকলো। এই মেয়েটা তাকে একদিন পাগল বানিয়ে ছাড়বে! 
~Bushirt pahine, khayee ke bida paan
Poore raipur se alag hai
Saiyaan ji ki shaan
Sasural genda phool
Saiyaan ched dewe
Nanad chutki leve
Sasural genda phoon
Saas gaari deve 
dewar samjha leve
Sasural genda phool
গান শেষ হতেই চারিদিক থেকে করতালি বেজে উঠলো। তুহিন পাশে ভাইয়ের দিকে তাকালো। 
উজানের হাত আগের যায়গাতেই আছে। দৃষ্টি সামনে রুহানীর দিকে। তুহিন এক হাত দিয়ে হালকা ধাক্কা দিলো।
"ভাই? ও ভাই বাস্তবে আসো, নাচ শেষ।"
উজান হালকা গলায় বলে উঠলো, "এই মেয়ের জন্য আমার একদিন পাবনায় পাগলা গারদে ভর্তি হতে হবে দেখি!"
রাসেল, তুহিন, নাহিদ, তায়ের সবাই হেসে উঠলো।
রাসেল হাসতে হাসতে বললো, "ভাই তো আমার দেখছি,  বউয়ের প্রেমে একদম মজে গিয়েছে !"
উজান ঠোঁট কামড়ে হাসলো। রুহানীর দিকে তাকিয়েই জবাব দিলো, "একটা মাত্র বউ আমার।"
সবাই এক জোটে চেচিয়ে উঠলো, "ওহওহ!"
____
কিছুক্ষনপর আয়েশাকে ডান্স ফ্লোরের মাঝে চেয়ারে বসানো হলো। 'gallan goodiyaan' গান বেজে উঠলো। গানের তালে প্রথমে সুমাইয়া এগিয়ে আসলো। আয়েশার পাশ দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে গানের সাথে নাচের স্টেপ দিতে থাকলো।
~Main daalun taal pe bhangda 
Tu bhi gidda paa le
Chal aisa rang jama de hum ke bane sabhi matwale.
আয়েশার ডান পাশ দিয়ে ঘুরে সুমাইয়া চলে গেলো। বাম পাশ দিয়ে রুহানী আসলো। গানের পরবর্তী লাইনে এবার সে নাচলো,
~Mann kahe ki main le aaun, chaand aur taare saare
In haathon par main chaand rakhun is maang main bahr doon taare.
রুহানীও বাম পাশ দিয়ে চলে গেলো। এবার ডান পাশ দয়ে ইরা আসলো।
~Hello, hello, tu floor pe jab hai aayi
ইরাও সরে গেলো। এবার সামিয়া এগিয়ে আসলো।
~Yello, yello, bhdi solid masti chaayi
এবার আবার সুমাইয়া এগিয়ে আসলো,
 
~Hello, hello, too much hai tumne lagayi
পরবর্তী লাইনে রুহানী এগিয়ে আসলো।
Yello, yello, contron karo mere bhai!
এবার চারজন একসাথে আয়েশার চার পাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে গানের তালে তাল মিলিয়ে ধুমসে নেচে উঠলো,
~Dhak-dhak, dhak-dhak dhadke yeh dil
Chhan chhan dole amritsari choodiyaa. 
Raat badi hai maatani toh dilbar jaani karle gallan goodiyaan. 
এবার তুহিন, রাসেল, তাহের সবাই একসাথে ডান্স ফ্লোরে চলে আসলো। সবাই একসাথে নাচতে শুরু করলো। নাচের মাঝে তুহিন আর রাসেল গিয়ে উজান আর অভ্রকেও টেনে আনলো সেথায়। অভ্র আর আয়েশাকে মাঝে রেখে সবাই গোল হয়ে গেলো।
~Dhak-dhak, dhak-dhak dhadke yeh dil
Chhan chhan dole amritsari choodiyaa. 
Raat badi hai maatani toh dilbar jaani karle gallan goodiyaan.
নাচের ফ্লোর ভারি হয়ে উঠেছে। 
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন