#শুধু_বলো_ভালোবাসি
#মুহসানাত_নুসাইবা
৩৪.
উজান জ্ঞান হারিয়েছে বুঝতেই রুহানী আঁতকে উঠলো। বারবার ডাকতে শুরু করলো, কিন্ত উজান কোনো সাড়া দিচ্ছে না। আশেপাশের মানুষেরা এগিয়ে আসলো। রুহানী কাঁপা কাঁপা হাতে দ্রুত ফোন বের করে অভ্রকে ফোন দিয়ে জানালো। তিনটা লোক মিলে উজানকে একটা গাড়িতে উঠিয়ে দিলো। রুহানী উজানকে নিয়ে পাশেই একটা হসপিটালে উদ্দেশ্যে গেলো। রুহানীর কান্না থামছেই না। রুহানীর কোলে মাথা দিয়ে আছে উজান। এবার রুহানীর নজর গেলো উজানের ডান হাতে। রুহানীর হৃদপিণ্ড ছলকে উঠলো! হাতটায় ধরার মতো যায়গায় নেই! বাজে ভাবে পুড়ে গেছে, সাথে কেটে গিয়েছে। কেটে গিয়ে ভেতরের মাংসও বাজে ভাবে পুড়েছে! হাত ধরার মতো অবস্থায় নেই! রুহানী ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। উজানকে কেঁদে কেঁদে ডেকেই চলেছে, কিন্ত উজান কোনো সাড়া দিচ্ছে না। সব তার জন্যেই হয়েছে। না সে এতো রাতে বায়না ধরতো, আর না এতো বড়ো বিপদ হতো উজান ভাইয়ের সাথে।
উজান তাকে গাড়ি থেকে নামতে নিষেধ করলেও সে নেমেছিলো। সামনেই ছোটো একটা বাচ্চা বিড়াল দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি সে। বিড়ালটা রাস্তার ওপারে বসে ডাকছিলো। হালকা কমলা রঙের মারাত্মক সুন্দর একটা বিড়ালের বাচ্চা দেখে সাথে সাথে গাড়ি থেকে নেমে বাচ্চাটাকে ধরতে গিয়েছিলো সে। বাচ্চাটা তাকে দেখে ভয় পেয়ে কিছুটা পেছনে রাস্তার আড়ালে চলে যায়। রুহানীও তাকে ধরতে সেখানে যায়। বাচ্চাটার মন জয় করে সে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেয়। আদর পেয়ে বিড়ালটা রুহানীর সাথে মিশে যায়। সাথে সাথে পেছনে জোরে কিছুর আওয়াজ আসতেই রুহানী চমকে উঠে। দ্রুত আড়াল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় আসলে উজানকে এই অবস্থায় দেখে রুহানী থমকে গিয়েছিলো।
উজানকে হসপিটালে নেওয়ার কিছুক্ষনের ভেতরে মাহতাব বাড়ির সকলে চলে এসেছে। রুহানী কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। সে কান্না করেই যাচ্ছে। তাকে হামিদা সামলাচ্ছেন।
উজানকে কেবিনে নেওয়া হয়েছে। হাত ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। কিন্ত উজানের এখনো জ্ঞান ফেরেনি। ডাক্তার বলেছে প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে উজানের। প্যানিক অ্যাটাকের নাম শুনে পরিবারের সবাই চমকে উঠলো। উজানের এইসব কোনো দিনও ছিলো না। কতোটা না ভয় পেলে উজানের মতো শক্ত মানুষের প্যানিক অ্যাটাক হয়! উজানকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পারিয়ে রাখা হলো। তার এখন রেস্ট করা প্রয়োজন। রাতে উজানের পাশে রুহানী, অভ্র আর তুহিন থাকলো। হামিদা থাকতে চাইলেও অভ্র জোর করে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিলো। রুহানী রাস্তা থেকে বিড়ালটা এনেছিলো। সেই বিড়ালটা হামিদার কাছে পাঠিয়ে দিলো। রায়হানও এসে দেখে গেলো উজানকে।
উজানের পাশে চেয়ারে রুহানী উজানের বাম হাত ধরে বসে রইলো সারাটারাত। ডান হাত ধরার মতো অবস্থায় নেই। ডাক্তার বলেছে এটা ঠিক হতে অনেক সময় লাগবে।
সকালে একটু চোখ লেগে এসেছিলো রুহানীর, তখন উজানের হাত নড়ে উঠলো। সাথে সাথে রুহানী সজাগ হয়ে গেলো। উঠে উজানের মুখের উপরে ঝুঁকলো। উজান পিটপিট করে চোখ খুললো। মুখের উপর রুহানীকে দেখে ঠোঁট হালকা ছড়ালো। রুহানী কেঁদে উঠলো। উজান ডান হাত উঁচু করতে গিয়ে ব্যাথায় মুখ কুঁচকে উঠলো। তাকিয়ে দেখলো হাতে ব্যান্ডেজ করা। সে বাম হাত দিয়ে রুহানীকে জরিয়ে ধরলো।
"রুহানী, কাঁদিস না, জান।"
উজান রুহানীকে শান্ত করার চেষ্টা করলো।
রুহানী হেঁচকি তুলে বললো, "সব আমার জন্য হয়েছে, উজান ভাই। সব আমার জন্যে হয়েছে।"
"একদম চুপ। খবরদার কোনো কিছু নিজের ঘাড়ে নিবি না।"
উজান ধমকে উঠলো। এমন সময়ও ধমকের কারনে রুহানীর ভ্রুয়ে ভাজ পরলো। এই লোকটা সব সময় তাকে ধমকায়! রুহানী চুপটি করে উজানের বুকে মাথা রেখে শুয়ে রইলো।
এমন সময় হুট করে ভেতরে তুহিন ঢুকে আসলো। পেছন পেছন অভ্রও ঢুকলো।
আচমকা কোনো আগাম বাত্রা ছাড়া হুট করে দুইজন ভেতরে ঢুকায়, রুহানী ছিটকে সরে আসলো উজানের থেকে। তুহিন অভ্র সেখানেই দাঁড়িয়ে গেলো। রুহানী লজ্জায় অন্যদিকে মুখ করে রাখলো।
উজান দাঁত কটমট করে তুহিনের দিকে তাকালো। তুহিন বেচারা ভুল সময়ে, ভুল যায়গায় ঢুকে যাওয়ার কারনে মুখ কাচুমাচু করে তাকালো উজানের দিকে। অভ্র চোখ গুছিয়ে বিরক্ত চোখে তুহিনের দিকে তাকিয়ে আছে। এই ছেলেটাকে আর শিক্ষা দিতে পারলো না। হুট করে এভাবে ভেতরে ঢুকলো কেন? যদিও সেও ঢুকেছে, কিন্ত আগে তো এই অশিক্ষিত ছেলেটা ঢুকেছে।
অভ্র পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে উজানকে বললো,
"তোর শরীর এখন কেমন লাগছে? ভালো লাগছে কিছুটা?"
উজান মাথা নাড়িয়ে বললো, "আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। কিন্ত হাতে কি হয়েছে আমার?"
তুহিন অবাক হলো ভাইয়ের কথায়। যার হাতে এতো বড়ো জখম হলো আর সেই জানে না এর পেছনের কারন কি?
অভ্র বললো, "হাত পুড়ে গিয়েছে বাজে ভাবে, সাথে কাচে কেটে গিয়ে ভেতরেও অনেক জখম হয়েছে।"
"ডক্টর কি বলেছে? কতোদিন সময় লাগবে ঠিক হতে?" উজান আবার জিজ্ঞেস করলো।
"ডক্টর বলেছে হাত ঠিক হতে কিছুটা সময় লাগবে।" অভ্র জবাব দিলো। সে আবার বলে উঠলো,
"সেই ট্রাকের খোজ করা হচ্ছে। খুব শীগ্রই পেয়ে যাবো, ইনশাআল্লাহ।"
উজান অভ্রর দিকে তাকিয়ে বললো, "এটা কি এক্সিডেন্ট নাকি মার্ডার করার চেষ্টা?"
মার্ডারের নাম শুনে রুহানী থমকে গেলো। অবাক চোখে তাকালো উজানের দিকে। মার্ডার করার চেষ্টা! কিন্ত কে এমনটা করবে? তাদের সাথে কাদের এতো শত্রুতা যে তাদের মেরে ফেলার চেষ্টা করবে কেও?
উজানের প্রশ্নে অভ্র জবাব দিলো, "সেটা ট্রাক ড্রাইভারকে ধরতে পারলেই বেরিয়ে আসবে।"
অভ্র আর তুহিন আরো কিছুক্ষন কথা বলে বেরিয়ে গেলো। উজান রুহানীর দিকে তাকিয়ে ডেকে উঠলো,
অভ্র আর তুহিন আরো কিছুক্ষণ কথা বলে বেরিয়ে গেলো। উজান রুহানীর দিকে তাকিয়ে ডেকে উঠলো,
"রুহানী বেগম, কাছে আসো।"
উজানের ডাক শুনে রুহানী ছুটে এসে উজানের বুকে আছড়ে পরলো। উজান শক্ত করে জরিয়ে ধরলো রুহানীকে। উজানের বুক জোরে জোরে বিট করছে। রাতের সেই মুহুর্তের কথা মনে পরছে বারবার। কিভাবে হারাতে হারাতে পেয়েছে সে তার প্রেয়সীকে। ভাবতেই দম আটকে আসছে তার। রুহানীর থেকে সব শোনার পর বারবার আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছে সে। একটা বিড়ালের উছিলায় সে তার জান ফিরে পেয়েছে। হাজার শুকরিয়া আদায় করলেও মনে হচ্ছে কম হয়ে যাচ্ছে।
_____
অভ্র আর তুহিন পাগলের মতো খোজ শুরু করলো সেই ট্রাকের। ওই
রাস্তার আশেপাশের যতো সিসি ক্যামেরা ছিলো সব চেক করছে। অবশেষে ট্রাক খুজে পেয়েছে কিন্ত ট্রাকের মালিক উধাও। দুদিন পর ট্রাকের মালিককে একটা ড্রেনের ভেতরে পাওয়া গেলো লাশ হিসেবে! ট্রাকের মালিকের আচমকা হঠাৎ মৃত্যুর খবর শুনে উজানরা নিশ্চিত হয়ে গেলো, এটা আসলেই তাদের মার্ডার করার চেষ্টা করা হয়েছে। যে বা যারা এই কাজ করিয়েছে, সে এই দুনিয়া থেকে চিরতরে প্রমান সরিয়ে দিয়েছে।
ট্রাক ড্রাইভারের ফোন কল চেক করা হচ্ছে। গত এক মাসে সে, কোন কোন নাম্বারে কথা বলেছে সব বের করেছে। একটা নাম্বারে সে গত কিছুদিন ধরে কথা বলেছে। কিন্ত সেটা ল্যান্ডলাইন থেকে। এক্সিডেন্টের দুই ঘন্টা আগেও ল্যান্ডলাইন থেকে কথা বলেছে। যেই ল্যান্ডলাইন থেকে ফোন করা হয়েছে সেই ল্যান্ডলাইন খুজে বের করেছে তারা। সেখানের সিসি ক্যামেরা চেক করলো। অবশেষে একজন সন্দেহজনক লোককে পাওয়া গেলো। সেই রাতের যেই টাইমটাতে ড্রাইভারকে ফোন করা হয়েছিলো, ঠিক ওই সময়ে দেখা গেলো একটা লম্বা গড়নের লোক কথা বলছে। লোকটা পুরোটাই কালোয় মুরানো। কালো হুডি পরা। মুখে মাক্স,চোখে কালো চসমা।
উজান ভালো করে লোকটাকে ঘুরে ঘুরে দেখলো। লোকটার প্রতিটা জিনিস খুটে খুটে দেখলো। পা থেকে মাথা পযন্ত স্ক্যান করলো।
চলবে....