ফন্ট সাইজ:
থিম:
শুধু বলো ভালোবাসি

৩৫তম পর্ব

লেখক: মুহসানাত নুসাইবা
#শুধু_বলো_ভালোবাসি
#মুহসানাত_নুসাইবা
৩৫.
সব কাজ কাম শেষ করে, উজানের জন্য রাতের খাবার, প্লেটে করে নিয়ে রুমে আসলো রুহানী। বিছানায় হেলান দিয়ে বসে বাম হাত দিয়ে ফোন চালাচ্ছে উজান। রুহানী তার সামনে গিয়ে বসলো। ভাত মেখে উজানকে খায়িয়ে দিতে লাগলো। উজানের হাতের ব্যান্ডেজ এখনো খোলা হয়নি। রুহানী খায়িয়ে দেয় উজানকে। এর ভেতরে কেটে গিয়েছে বেশ কিছুদিন। উজান হন্যে হয়ে খুজছে অপরাধীকে। যতোক্ষন না অপরাধীকে সনাক্ত করা হবে ততক্ষন রুহানী আর সে বাহিরে একদমই নিরাপদ না। 
রুহানীকে কালকে ভার্সিটিতে যেতে হবে। ইম্পর্টেন্ট ক্লাস আছে কালকে তার। অনেক গাইগুই করে অবশেষে রুহানী মুখ খুললো,
"শুনেন।"
উজান তাকালো তার দিকে। রুহানী বললো,
"কালকে ভার্সিটি যেতে হবে। ইম্পর্টেন্ট ক্লাস আছে।"
"বাড়ি থেকে এক পাও বের হওয়া যাবে না তোর।" উজান সাফ সাফ মানা করে দিলো। 
"কিন্ত ক্লাসটা খুব ইম্পর্টেন্ট। স্যার যেতেই বলেছে। ক্লাস না করলে ওই সাবজেক্টের কিছুই বুঝবো না আমি।"  রুহানী আবারও বললো।
উজান বললো, "সুমাইয়ার থেকে পরে পড়া যেনে নিবি। দরকার হলে ওকে বলবো ক্লাস ভিডিও করে আনতে। কিন্ত এই সময়ে তোর বাহিরে যাওয়া সম্পুর্ণ নিষেধ।"
রুহানী হার মেনে নিলো। উজানের খাওয়া শেষ হতেই নিচে বাসন গুলো রেখে আসলো। 
রুহানী উঠে উজানের পাশে বসলো। উজানের ব্যান্ডেজ করা হাতটা নিজের দুই হাত দিয়ে আলতো করে ধরলো। উজান হাতের ফোনটা রেখে রুহানীকে জরিয়ে ধরলো। 
রুহানী বললো, "আর কোনো ক্লু পাননি?"
"না। অপরাধী অনেক চালাকি করেছে। কিন্ত খুব শীগ্রই ধরে ফেলবো, ইনশাআল্লাহ।"  উজান রুহানীর কপালে চুমু খেলো।
রুহানী আতংক কন্ঠে বললো, "তাহলে তো আপনারও বাহিরে যাওয়া নিরাপদ না। আপনি বাড়ি থেকে কোথাও যাবেন না প্লিজ।"
উজান বললো, "আমি বাহিরে না গেলে অপরাধী ধরবো কি করে?"
"অভ্র চাচ্চু আর তুহিন ভাইয়া তো আছে খোঁজার জন্য। এতো বিপদের ভেতরে আপনার বাহিরে বের হওয়া লাগবে না।"
"চিন্তার কিছু নেই। সে আমার কিছু করতে পারবে না। এতো টেনশনের কিছু নেই। আমি সব সময় তোর সামনে অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসবো।"
রুহানী উজানের দিকে তাকিয়ে বললো, "প্রমিজ?"
উজান টপ করে রুহানীর ঠোঁটে একটা চুমু খেলো। বললো,
"তিন প্রমিজ।"
উজান আবার বললো, "এবার আমাকে ছেড়ে বালিশে মাথা দে তো।"
"কেন? হাতে ব্যাথা পাচ্ছেন?"
উজান রুহানীকে নামিয়ে বিছানায় শুয়িয়ে দিলো। রুহানী পেট থেকে কামিজ সরিয়ে পেটের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। রুহানীর পেট অনেকটা ফুলে উঠেছে। প্রায় চার মাস চলে রুহানীর। তবুও একটু বেশি বড়ো লাগছে না? উজান গভীর একটা চুমু খেলো পেটের উপর। রুহানী শিউরে উঠলো। উজান অনেক্ষন ধরে ঠোঁট ছুঁয়িয়ে রাখলো। কিছুক্ষন পর ঠোঁট সরিয়ে নিজের মেয়ের সাথে কথা বলতে শুরু করলো।
____
"আজকাল থাকছো কোথায়? বাড়িতে তো সময় মতো পাওয়া যায় না তোমাকে? বিয়ে করতে চাচ্ছো না কেনো? বয়স তো কম হয়নি, এখনো বিয়ে করতে চাচ্ছো না কেনো?"
সকালে নাস্তার টেবিলে রায়হানের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন রফিকুল সাহেব। হাতের রুটি টুকু মুখে দিয়ে রায়হান বললো,
"এখনো দেরি আছে বিয়ে করার। বিয়ের চিন্তাভাবনা আপাতত করছিলো না।"
"তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে? বয়স কতো হয়েছে সেই খবর রেখেছো? তোমার ছোটো দুই ভাইয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে, তোমার চাচার বিয়ে হয়ে গিয়েছে, আর তুমি এখনো বিয়ে করছো না! আর কাজকামের হাত লাগাচ্ছো না কেনো? আমাদের বিজনেসেও হাত লাগাচ্ছো না কেনো?" রফিকুল সাহেব কিছুটা রেগে গেলেন।
রায়হান এবার রেগে গিয়ে বলে উঠলো, "ওরা বিয়ে করেছে বলে কি আমাকেও বিয়ে করতে হবে? ওরে কুরকুরানি বেশি, আমার এতো কুরকুরানি নেই।"
বাপ চাচাদের সামনে রায়হানের এমন লাগামহীন কথায় সবাই থমকে গেলো। 
উজান সিড়ি দিয়ে নামনে নামনে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো, 
"আমরা বিয়ে করে পবিত্রতা রক্ষা করেছি। তোমার মতো রাত বেরাতে কোনো বিবাহিত নারীর ঘরে ঢুকে যাইনি।"
উজানের কথায় পুরো বাড়ি যেনো বিস্ফোরণ ঘঠলো। সকলের চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেলো। সবার মনে প্রশ্ন ঘুরতে শুরু করলো, কার ঘরে ঢুকেছে রায়হান?
উজানের কথায় রুহানীর বুক ধক করে উঠলো। 
উজানের কথা শেষ হতেই রায়হান বাঁকা হাসলো। মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলে উঠলো, "কেমন পবিত্রতা রক্ষা করেছিস সেটা গোটা বাংলাদেশ জানে। রাত বেরারে নষ্টামি করতে গিয়ে ধরা খেয়ে বিয়ে দিয়ে দিছে, এটাকে পবিত্রতা রক্ষা করা বলে?"
রায়হান কথা শেষ করে হো হো করে হেসে উঠলো। উজানের পা থেকে মাথা অবদি জ্বলে উঠলো। সে দ্রুত কদমে রায়হানের সামনে এসে এক ঝাটকায় রায়হানের কলার ধরে ঝাঁকিয়ে উঠালো। চেয়ারে বসা সবাই চমকে উঠে দাঁড়ালো।
রফিকুল সাহেব বললেন, "উজান! কি হচ্ছে কি এগুলো?"
উজন দাঁত চেপে রায়হানকে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো, "তোর জবান বেশি চলছে। চোরের মায়ের বড়ো গলা তাই না? তোকে সেদিন ছেড়ে দিয়ে আমার চরম ভুল হয়েছিলো। তোকে সেদিন মেরে ফেলা উচিত ছিলো।"
আচমকা রায়হান উজানের মুখ বরাবর একটা ঘুষি দিলো। হামিদা মুখে হাত দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন,
"আল্লাহ! দুই ভাইয়ের ভেতরে একি শুরু হলো!"
রুহানী এগিয়ে গিয়ে উজানকে ধরতে গেলে উজান রুহানীকে ছাড়িয়ে উলটে রায়হানের মুখ বরাবর শক্ত করে ঘুষি দিলো। এবার এই দুইজনকে না ছাড়ালে মারামারি চরম আকারে পৌঁছাবে। রফিকুল সাহেব তুহিন গিয়ে দুজনকে আলাদা করলেন। রফিকুল সাহেব উজানকে কোষে একটা থাপ্পড় মারলেন। সবাই চমকে উঠলো। রুহানী মুখে হাত চেপে ধরলো। উজান অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালো রফিকুল সাহেবের দিকে। 
রফিকুল সাহেব রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, "এতো অদপতন হয়েছে যে ভাইয়ের সাথে এমন ব্যাবহার করো? তোমার সমস্যা কি, উজান? দুই ভাইয়ের এতো কিসের শত্রুতা? তোমাদের দুইজন কেনো মিলেমিশে থাকতে পারো না?"
উজান হিসহিসিয়ে বললো, "এই অমানুষের সাথে মিলেমিশে থাকবো আমি? তুমি একটা অমানুষ জন্ম দিয়েছো, বাবা।"
"হ্যাঁ। একদম ঠিক বলেছো তুমি। আসলেই আমি একটা অমানুষ জন্ম দিয়েছি। তোমার মতো একটা অমানুষ জন্ম দিয়েছি আমি।"
রফিকুল সাহেব রাগে চেঁচিয়ে উঠলেন।
রুহানী কেঁদে উঠলো। উজানকে টেনে বললো, "দোহাই লাগে, থামুন এবার। কি শুরু করলেন এগুলো!"
রুহানীর টানাটানিতে উজান এক পাও নড়লো না। 
হামিদা সবাইকে থামানোর চেষ্টা করছে। আয়েশা, ইসরাত, সুমাইয়া এক কোণে জড়োসড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার মুখে আতংকের ছাপ। আফসানা, সুরাইয়াও আতংক মুখে দাঁড়িয়ে আছে। এর আগে কখনো এই মাহতাব বাড়িতে এতো ঝগড়াঝাটি, মারামারি লাগেনি!
রায়হার ক্রুর হেসে উজানের দিকে তাকিয়ে আছে। 
উজান কিছু বলতে যাবে রফিকুল সাহেব চেঁচিয়ে উঠলেন, "বেরিয়ে যাও এক্ষুনি বাড়ি থেকে। তোমাকে যেনো আমার চোখের সামনে না দেখি।"
তুহিন বললো, "বাবা, শান্ত হও।"
"তুমি চুপ করো বেয়াদব ছেলে।" রফিকুল সাহেব ধমকে উঠলেন। আবার বললেন,
"দুই ভাই মিলে আমার মান সম্মান সব শেষ করেছো। নিজে বিবাহিত মেয়ে তুলে এনেছো। আর তোমার এই ভাই নির্লজ্জতামি করে বিয়ে করেছে। এই নিয়ে দুই দুইবার জেলে গিয়েছে। 
আমার সম্মানটা রাখলে কোথায় তোমরা? বলো? এখন মানুষের সামনে জেতেও লজ্জা করে আমার।"
ইসরাত আর রুহানীর মাথা নিচু হয়ে গেলো। ইসরাতের চোখে পানি জমে উঠলো। রুহানী কান্না থামাতে ঠোঁট কামড়ে ধরলো। 
উজান রাগে চোখ বন্ধ করে আবার খুলে বললো, "বাবা! তুমি পুরোনো কথা টানবে না, প্লিজ!"
"এটা পুরোনো কথা তাই না? শুনে রাখো উজান, এই কথা জীবনেও পুরোনো হবে না। তোমাদের বয়স একশো হয়ে গেলেও তোমাদের কর্মকান্ড তোমাদের পিছু ছাড়বে না। মৃত্যুর পরেও তোমাদের কথা সবার মনে থাকবে। হাজার চাইলেও এই বদনাম সরাতে পারবে না তোমরা।তোমাদের পরের প্রজন্মেরও এই কথা শুনতে হবে।"
আচমকা সামনের কাঁচের জগটা নিয়ে এক আছাড়ে ভেঙে ফেললো উজান। বাড়ির সবাই কেঁপে উঠলো। 
উজান পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো।
"নিজের মানুষেরাই যদি দিনভর এভাবে কথা শোনাতে থাকে, তাহলে বাহিরের মানুষের দরকার হয় না। তোমরাই যা খেল দেখাচ্ছো, তাতে অন্যের খেল দেখা লাগে না, বাবা!"
রুহানী উজানের হাত টেনে ধরে বললো 
"প্লিজ চলুন এখান থেকে। আর কথা বাড়াবেন না, প্লিজ।"
উজান এক পাও নড়লো না সেখান থেকে। রফিকুল সাহেব আবার চেঁচিয়ে উঠলেন,
"বের হও এক্ষুনি বাড়ি থেকে। তোমার মতো অসভ্য ছেলেকে আমি আমার চোখের সামনে দেখতে চাই না।"
উজান রাগে নিঃশ্বাস জোরে জোরে নিচ্ছে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে রুহানীর থেকে হাত ছাড়িয়ে গটগট পায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। রুহানী উজানের পেছনে পেছন দৌঁড়ে বের হলো। উজানকে আটকানোর চেষ্টা করলেও পারলো না। উজান বেরিয়ে যেতেই তুহিন অভ্রকে ফোন করে সবটা জানালো। এতোক্ষন অভ্র বাড়িতে উপস্থিত থাকলে, জল এতো দূর গড়াতো না। 
সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেলো। কিন্ত উজানের কোনো খোঁজ পাওয়া গেলো না। ক্রমাগত উজানের নাম্বারে সবাই ফোন দিয়েই চলেছে, কিন্ত উজানের ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে! তুহিন, অভ্র, রাসেল সবাই খুঁজে চলেছে উজানকে। কিন্ত উজানকে কেও খুঁজে পাচ্ছে না। যে নিজে থেকে লুকিয়ে থাকে তাকে কি সহজে খুঁজে পাওয়া যায়?
এদিকে রুহানী চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাদের অজ্ঞাত শত্রু রয়েছে। তারা যদি উজান ভাইয়ের কিছু করে ফেলে? যদি উজান ভাইয়ের কিছু হয়ে যায়? 
আবার সকালে না খেয়ে বেড়িয়েছিলো উজান। উজান হাত দিয়ে খেতে পারে না। রুহানী খায়িয়ে দেয়। এতোক্ষন কি কিছু খেয়েছে উজান ভাই? টেনশন মাথা ঘুরতে শুরু করলো রুহানীর। 
রাত হয়ে গেলো। কিন্ত উজান বাড়ি ফিরলো না। রুহানীর সারারাত ঘুম হলো না। সে সারাটা রাত জেগে থাকলো। ফোনের পর ফোন দিয়ে গেলো, কিন্ত উজানের ফোন বন্ধ। রাত তিনটার সময় জায়নামাজে বসে দুই রাতাক তাহাজ্জুদ নামাজ পরে কাঁন্নায় ভেঙে পরলো রুহানী। 
হাপিয়ে উঠলে সে জায়নামাজেই শুয়ে পরলো। প্রচুর ঘামতে শুরু করলো রুহানী। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। কতক্ষন শুয়ে রইলো। রাত চারটার দিকে ফোনে মেসেজের আওয়াজে চমকে উঠলো। দ্রুত ফোন হাতে নিয়ে মেসেজ চেক করলো। অপরিচিত আইডি থেকে মেসেজ এসেছে। মেসেজে ঢুকতেই তার দুনিয়া দুলে উঠলো। চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করলো। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলো। মনে হলো...মনে হলো সে কোনো স্বপ্নের রাজ্যে বাস করছে। ফোনটা বুকে সাথে শক্ত করে চেপে ধরলো। এটা সত্যি না হোক! এটা সত্যি না হোক!
তার হাত পা অনিয়ন্ত্রন ভাবে কাঁপতে শুরু করলো। দাঁতে দাঁত বারি খাচ্ছে। 
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন