ফন্ট সাইজ:
থিম:
শুধু বলো ভালোবাসি

৪৮তম পর্ব

লেখক: মুহসানাত নুসাইবা
#শুধু_বলো_ভালোবাসি
#মুহসানাত_নুসাইবা
৪৮.
পরিশিষ্ট..
ছাদের  উপরে বড়ো মাদুর বিছিয়ে তাতে বসে আছে সবাই। পুরো ছাদ জুরে বসেছে সবাই। সকলে মিলে আড্ডা দিচ্ছে। এতোক্ষন সকলে নিচে ছিলো। সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মাত্রই এখানে এসে বসেছে সকলে। সবার মধ্যবিন্দু হলো উজান আর রুহানী। বাচ্চারা সকলে ইতিমধ্যে ঘুমিয়ে পরেছে। ইজান আজ দাদা দাদির সাথে থাকছে। রুহি অভ্রর ঘরে ঘুমিয়েছে। আয়েশা তাকে নিজের কাছে রাখছে। অনেক্ষন গল্প করা হলে মাঝ দিয়ে রুহানীকে ঘরে নিয়ে গেলো মেয়েরা মিলে। উজান উপরেই রইলো। আর কিছুক্ষন পর উজান নিজের ঘরের সামনে আসতেই থমকে দাঁড়ালো। তার পেছন পেছন তুহিন, রাসেল, তাহের, সুমাইয়া, ইসরাত, ইরা, সামিয়া আয়েশা সকলে এসে থামলো। উজান দরজার দিকে একবার কপাল কুঁচকে তাকিয়ে পেছনে ফিরে সবার দিকে দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,
"সমস্যা কি?"
সকলে এক জোটে বলে উঠলো,
"কি সমস্যা, ভাইয়ায়ায়া?"  
শেষের 'ভাইয়া'টা অনেকটা টেনে টেনে বলল।
উজান বিরক্ত হয়ে বললো, "সেটাই তো। সমস্যা কি? আমার ঘরে তালা দেওয়া কেনো?"
তুহিন বললো, "টাকা না দিলে এই তালা খুলবে না।"
উজান ভ্রু কুঁচকে বললো, "কিসের টাকা?"
সে বুঝেও না বুঝার ভান ধরলো।
রাসেল বললো, "আমরা গেট ধরেছি। টাকা না দিলে এই দরজা খুলবে না।"
"দরজা খোলার জন্য আমি কেনো টাকা দেবো?"
তাহের বললো, "কারন তোমাকে ভেতরে ঢুকতে হবে।"
উজান বুকে হাত ভাজ করে আরাম করে দাঁড়িয়ে বললো, "আমি ঢুকবো না ভেতরে।"
তুহিন বিরবির করলো, "একটু পরে নিজেই বউ ছাড়া থাকতে পারবে নানে।"
উজান এক ভ্রু তুলে তুহিনের দিকে তাকাতেই তুহিন হকচকিয়ে উঠলো। শুনে ফেলেছে নাকি?
উজান বললো, "আমার বউ আমাকে দিয়ে দে, আমি অন্য কোথাও চলে যাচ্ছি।"
রাসেল দুই হাতে বারি দিয়ে বলল,
"এর জন্যেই তোমার বউকে ভেতরে আটকে রাখছি যাতে টাকা গুলো সসম্মানে দিয়ে দাও। আপাতত ধরে নাও, আমরা কিডন্যাপার আর তোমার বউকে আটকে রেখেছি, এখন টাকা না দিলে তোমার বউকে তোমরা পাচ্ছো না।"
উজান আঙুল উঁচিয়ে বললো, "তোরা না সবাই রুহানীর বড়ো ভাই?"
সবাই এক জোগে বলে উঠলো, "রুহানী কে?"
তুহিন বললো, "আমরা কোনো রুহানীকে চিনি না। আমরা শুধু সাফওয়ান উজান মাহতাব কে চিনি।"
উজান গম্ভীর কন্ঠে বললো, "কতো টাকা?"
সুমাইয়া বললো,
"বেশি না মাত্র ত্রিশ হাজার।"
উজান চোখ কপালে তুলে  আশ্চর্য হয়ে বললো, 
"বিকালেই ত্রিশ হাজার দিয়ে আসলাম আবার ত্রিশ হাজার! এই তোরা এমন ছোটোলোকিপানা করছিস কেনো? সব কটা ফকিন্নির দল।"
সবাই এক জোটে বলে উঠলো,  "আমরা কোনো কথা মানবো না। আমাদের টাকা দাও।"
উজান বললো, "আমার টাকা ঘরের ভেতরে।"
রাসেল বললো, "যদি ঘরে গিয়ে আর না দাও?"
"দেবো। দরজা খোল।"
দরজা খোলার কথা শুনতেই রুহানী দ্রুত দরজার থেকে কান সরিয়ে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরলো। সে এতোক্ষন দরজার কান পেতে সবটা শুনছিলো।
তুহিন দরজা খুলে সাথে সাথে ঘরে ঢুকে গেলো। তুহিনের পেছন পেছন বাকি সবাইও ঘরে ঢুকে আসলো। উজান বিরক্তিতে আস্তেধীরে ঘরে ঢুকলো। 
তুহিন বললো, "টাকা না দিলে আমরা কেও ঘর থেকে বের হবো না।"
উজান বাঁকা চোখে একবার তাকিয়ে টাকা এনে ওদের দিয়ে বললো,
"তোরা ফকিন্নি হতে পারিস তবে আমি না। এবার সব কটা বের হ রুম থেকে।"
সবাই বের হতেই উজান দরজা আটকাতে যাবে এমন সময় রফিকুল সাহেবের ডাক আসলো। উজানকে ডাকছেন তিনি। উজান বিরক্তিতে বেরিয়ে গেলো। উজান বেরোতেই সুমাইয়া ঢুকে পরলো ঘরে। ফুলে সাজানো বিছানায় বসে পা ঝুলাতে ঝুলাতে বলে উঠলো,
"ভাইয়ের ভাব সাব এমন, মনে হচ্ছে প্রথমবার বাসর ঘরে ঢুকছে, অথচ দুই বাচ্চার বাপ উনি।" বলেই হো হো করে হেসে উঠলো। সুমাইয়ার সাথে রুহানীও হেসে উঠলো।
বেশ কিছুক্ষন কথা বলার পর সুমাইয়া দুঃখি দুঃখি ভাব নিয়ে বলে উঠলো,
"ভেবেছিলাম তোর বরের সাথে একটা গান গাবো। কিন্ত তুই তো উজান ভাইরে বিয়ে করলি। এই দুঃখ কেমনে ভুলি আমি, বল?" 
রুহানী কপাল কুঁচকে বললো,
"কি গান?"
"এইযে ওই গানটা,
দুলা ভাই, দুলা ভাই, ও আমার দুলা ভাই, চলো না সিনেমা দেখিতে আজিই যাই। সিনেমার নাম নাকি তোমাকে চাই, দুলা ভাই।"
এমন সময় উজান ঘরে ঢুকলো। উজান গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো, 
"তোর পড়া নাই?"
সুমাইয়া চমকে পেছনে তাকিয়ে উজানকে দেখে তার আত্মমা লাফিয়ে উঠলো। মুখ ফসকে বেরিয়ে আসলো,
"লা হাওলা ওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আযীম।"
উজান আবার বললো,
"তোর পড়াশোনা নাই?"
সুমাইয়া অবাক হয়ে বললো, 
"আজকে কে পড়তে বসে!"
"কেনো আজ কি?"
"আজ না আপনাদের বিয়ে।"
"বিয়ে আমাদের তোকে পড়তে কে বাঁধা দিয়েছে? যা পড়তে বস।"
শেষের কথাটা উজান ধমকের সুরে বললো। সুমাইয়া চমকে উঠে দ্রুত এক প্রকার দৌঁড় দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রুহানী অট্টহাসিতে ফেটে উঠলো। উজান সেদিকে তাকিয়ে ধমকে উঠলো,
"এবার তোকেও পড়তে বসাবো।"
রুহানীর হাসি বন্ধ হয়ে গেলো। এ কেমন আজব কথাবার্তা! তারা দু'জন ওজু করে এসে দুই রাকাআত সুন্নত নামাজ আদায় করলো। নামাজ শেষে রুহানী বললো,
"বাচ্চাদের ছাড়া ভালো লাগছে না।"
উজান তার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, "তাহলে নিয়ে আয় ওদের।"
"নিয়ে আসবো?"
"হ্যাঁ। যা নিয়ে আয়।"
রুহানী উজানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ঘাড় কাত করে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বললো,
"নিয়ে আসবো?"
উজান তার মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করে বললো,
"না।"
উজানের 'না' শুনে রুহানী হো হো করে হেসে উঠলো। উজান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। রুহানী আজ বেশি হাসছে। অনেক খুশি নাকি আজ সে? উজান আচমকা তাকে কোলে তুলে নিলো। রুহানী তবুও হাসতে লাগলো। উজান রুহানীকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞেস করলো,
"তুই এতো হাসছিস কেনো?"
রুহানী হাসতে হাসতে জবাব দিলো, "খুশিতে।"
"কিসের খুশি?" উজান যেনেও জিজ্ঞেস করলো।
"আপনাকে পাওয়ার খুশিতে।"
উজান তাকিয়ে রইলো রুহানীর হাসিরত চোখের দিকে। রুহানী হাসি থামিয়ে বললো,
"আপনি কিন্ত এখনো 'ভালোবাসি' বলেননি আমাকে।"
উজান কিছু বলতে গেলে রুহানী আঙুল চেপে ধরলো উজানের ঠোঁটে। শাসানো সরে বললো,
"খবরদার। আপনার মুখ থেকে একমাত্র 'ভালোবাসি' শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ যেনো বের না হয়।"
একটু থেকে আবার বললো, "শুধু বলো ভালোবাসি। আর কিছু শুনতে চাই না, শুধু বলো ভালোবাসি।"
উজান কিছুক্ষন রুহানীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে খুব যন্ত করে তার ঠোঁটে একটা চুমু দিলো। আবার দিলো, আবার দিলো। পরপর কয়েকবার দিয়ে আস্তে করে ফিসসিয়ে বলে উঠলো,
"ভালোবাসি। আমার পুতুলকে আমি
ভিষণ ভালোবাসি।"
রুহানী আবার খিলখিল করে হেসে উঠলো। এবার হাসতে হাসতে কেঁদে উঠলো। তবে মুখে হাসি লেখে থাকলো। চোখে জল মুখে হাসি নিয়ে বললো,
"আমিও আপনাকে ভালোবাসি। ভিষণ ভালোবাসি।"
নরম আলোয় ভরা করিডোরটা ভীষণ শান্ত। নিস্তব্ধ ভোরে হাসপাতালের করিডোরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অভ্র। মুঠো দুটো শক্ত করে চেপে রাখা, চোখদু'টো উত্তেজনা আর উদ্বেগে কাঁপছে। আয়েশাকে অপারেশন থিয়েটারের নেওয়া হয়েছে।বড় সাদা দরজাটা একটু আগেই খুলে সিস্টার এসে বলেছিল, "রোগী প্রস্তুত, সিজার হবে।"
অভ্র সেই থেকে চাতক পাখির নেয় তাকিয়ে আছে দরজাটার দিকে। শান্ত থাকার চেষ্টা করছে সে, কিন্তু বুকের ভেতরটা উথাল-পাতাল ঢেউয়ের মতো ওঠানামা করছে। আশেপাশেই উজান, তুহিন, রায়হান, সুমাইয়া, রুহানী হামিদা সবাই দাঁড়িয়ে আছে। ইসরাত, সুরাইয়া, তামান্না আর হাফসা বাড়িতে থেকে গিয়েছে বাচ্চাদের দেখতে। 
আচমকা রুহানীর চোখের সামনে একে একে কিছু পুরোনো স্মৃতি ভেসে উঠছে। তার সিজারের সময় উজান পাশে ছিলো না। উজানও সেদিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করছিলো। কতো পাগলামি সে করেছিলো সেদিন। উজানের জ্ঞান না ফেরার কারনে সে কিভাবে কান্না করেছিলো, কিভাবে আহাজারি করেছিলো সব চোখের পাতায় আবার ধরা দিচ্ছে। রুহানীর চোখে জল জমে উঠলো। সে ঠোঁট চেপে কান্না আটকে আস্তে করো মাথা ঘুরিয়ে উজানের দিকে তাকালো। উজান তার দিকেই তাকিয়ে আছে। উজানকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না। ঠোঁট ফুলিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। তার কান্নায় সকলে হকচকিয়ে উঠলো। উজান এগিয়ে এসে তাকে জরিয়ে ধরলো। উজান জরিয়ে ধরতেই রুহানীর কান্নার বেগ আরো বাড়লো। সে শক্ত করে জরিয়ে ধরলো উজানকে। উজান তাকে কাঁদতে নিষেধ করলো না। সে ধীরে ধীরে রুহানীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। সে বুঝতে পারছে রুহানীর কান্নার কারন কি।
ছেলে বাবু হয়েছে অভ্রর। নার্স এসে অভ্রর কোলে বাচ্চাটাকে দিয়ে গেলো। অভ্র বাচ্চাটাকে আলতো করে জরিয়ে ধরলো। তার হাত কাঁপছে। রফিকুল মাহতাব এগিয়ে আসলেন। বাচ্চাটাকে দেখে বলে উঠলেন,
"মাশাআল্লাহ। দুই অভদ্রের দুই পুত্রসন্তান হয়েছে। এবার এরা বড়ো হলে বুঝবে তোমরা দু'জন কতো জ্বালানো জ্বালিয়েছো আমাকে।"
বাচ্চা পাওয়ার খুঁশিতে রফিকুল মাহতাবের কথায় অভ্র কোনো পাত্তা না দিলেও পাশ থেকে উজান বাঁকা চোখে তাকালো বাবার দিকে। থমথমে কন্ঠে বলে উঠলো,
"তারমানে তুমিও নিশ্চয়ই যুবক বয়সে এমন ছিলে যার কারনে আমি এমন হয়েছি।"
উজানের কথায় তুহিন আর রুহানী ফিক করে হেসে উঠলো। সুমাইয়া হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাসি আড়াল করার চেষ্টা করলো। রফিকুল মাহিতাব তাদের দিকে একবার দৃষ্টি দিয়ে ফের উজানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
"আমি কেনো যুবক বয়সে তোমাদের মতো অভদ্র হতে যাবো? তোমাকে রাস্তায় খুটে পেয়েছিলাম আর নিশ্চয়ই অভ্রকে হাসপাতাল থেকে পালটে এনেছি যার কারনে তোমরা এমন অভদ্র। আমাদের বংশে তোমাদের মতো অভদ্র আর একটাও নাই।"
বাবার যুক্তিতে উজান ফের বললো,
"তাহলে কালই আমার আসল বাবা-মায়ের খোঁজ শুরু করবো।"
আয়েশাকে কেবিনে আনা হয়েছে। একে একে সকলে আয়েশাকে দেখে গেলো। সবাই বেরিয়ে যেতেই অভ্র আস্তে করে আয়েশার পাশে গিয়ে বসলো। আয়েশা মাথা ঘুরিয়ে অভ্রর দিকে তাকালো। অভ্রর কোলে তাদের দুইজনের ছেলে। অভ্র নিচু হয়ে আয়েশার কপালে বেশ কিছুক্ষন সময় আগিয়ে একটা চুমু খেলো। অভ্র ঠোঁট সরিয়ে মাথা তুলতে গেলে আচমকা আয়েশা বলে উঠলো, 
"ভালোবাসি।"
আয়েশার মুখ থেকে বের হওয়া এই একটা শব্দে সে থমকে গেলো। সে অসম্ভব শান্ত মুখ নিয়ে আয়েশার দিকে তাকালো। তাকে যতটা শান্ত দেখাচ্ছে আসলে সে ততটা শান্ত নেই ভেতর দিয়ে। সে আরেকটু নিচু হয়ে আয়েশার গালের সাথে গাল মিশিয়ে অত্যন্ত শান্ত আর ধীর কন্ঠে বললো,
"আমিও, ভালোবাসি।"
____
কিছু বছর পর....
আকাশে চাঁদ উঠেছে। তারমানে কাল ঈদ। 
কাল ঈদ ঘোষণা হতেই মাহতাব বাড়ি জুরে আনন্দের ঢেউ উঠেছে। সকলে উঠানে এসে বাজি ফুটাচ্ছে। পাঁচ বছরের রুহি ছুটাছুটি করছে। তার পেছনে ছুটছে ইজান। ইজানের পেছনে ছুটছে তালহা। মূলত রুহি ইজানের থেকে তার খেলনা গাড়ি নিয়ে পালিয়েছে। যার কারনে ইজান রুহিকে ধরার জন্য ছুটছে। ইজান ধরে ফেললো রুহিকে। রুহি ছলছল চোখে তাকালো, তবে ইজান সেটায় কোনো পাত্তা না দিয়ে রুহির পিঠে একটা কিল মা রতে গেলে তালহা ধরে ফেললো ইজানকে। বলে উঠলো,
"মেরো না। আমাদের বোন হয় না? ব্যাথা পাবে।"
ইজান তালহার কথা শুনে রুহিকে ছেড়ে দিলো। তবে রুহি ইজানকে একটা কিল মে রে আবার দৌঁড়ে গেলো। ইজান তালহার দিকে ফিরে বললো,
"দেখেছো? এর জন্যেই ওকে আমি মারি।"
তালহা অসহায় ভাবে তাকালো। প্রতিবার সে রুহিকে বাঁচাতে গেলে রুহি একটা না একটা কান্ড করে বসে। সে আবার বললো,
"থাক মেরো না।"
   
                                     ***
রুহানীকে টেনে বাইরে নিয়ে আসলো উজান। রুহানী বললো,
"বাসায় অনেক কাজ রয়েছে। এখন বাইরে গেলে সবাই কি মনে করবে?"
উজান বাইকে বসতে বসতে জবাব দিলো, "কেও কিছু মনে করবে না। দেখি কাছে আয়।"
রুহানী এগিয়ে যেতেই উজান রুহানীকে হেলমেট পরিয়ে দিলো। রুহানী বাইকের পেছনে উঠে বসলো। রুহানী আবার বললো,
"বাচ্চারা যদি খোঁজে আমাদের?"
"আব্বু আম্মু দেখে নেবে।"
উজান বাইক টান দিয়ে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। তারা বেশ রাত করে ঘুরলো সারা শহর। অবশেষে বাড়ি ফিরলো রফিকুল মাহতাবের ফোন কলে।
____
সকাল সকাল মাহতাব বাড়িতে ব্যাস্ততার দিন শুরু হয়েছে। রান্না ঘরে রুহানী, আয়েশা, ইসরাত, তামান্না, হামিদা, সুরাইয়া সহ হাফসা কাজ করছে। সেমাই, নুডলস সহ আরো বিভিন্ন আইটেম বানানো হলো। সেই ফাকে হামিদা বেগম বলে উঠলেন,
"রুহানী, ইসরাত, আয়েশা, তামান্না তোমরা যাও ঘরে। দেখো তোমাদের জামাইর কি লাগে না লাগে।"
ওরা সবাই বেরিয়ে আসলো। আয়েশা ঘরে এসে দেখলো অভ্র কেবল গোসল করে বেরিয়েছে। গায়ের পাঞ্জাবিটা পরছে এখন। আয়েশা গিয়ে পাশে দাঁড়ালো। অভ্র এক পলক তাকিয়ে হাতে ঘড়ি পরতে লাগলো। তাদের ছেলে অয়ন এখনো ঘুম। আয়েশা বললো,
"ছেলেকে উঠিয়ে দেই? সাথে করে নিয়ে যান। ঈদের নামাজ পরে আসুক।"
"দাও উঠিয়ে। নিয়ে যাই। তালহা আর ইজান তো আছেও দেখার জন্য।"
আয়েশা অয়নকে উঠিয়ে রেডি করে দিলো। সাদা পাঞ্জাবি পরিয়ে দিলো। অভ্র আয়েশার কপালে একটা চুমু খেয়ে ছেলেকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে আসলো।
              
                                     ***
রুহানী ঘরে এসে উজানের সব কিছু গুছিয়ে রাখলো। ইজানের গোসল শেষ। 
রুহানী ইজানকে পাঞ্জাবি পরিয়ে রেডি করে দিলো। রুহির কোনো খোঁজ নেই। সে সারাবাড়ি ছোটাছুটি করছে।
কিছুক্ষনের ভেতরে উজান গোসল করে বেরিয়ে আসলো। পাঞ্জাবি পরে চুল সেট করে হাতে ঘড়ি পরলো। গায়ে সুগন্ধি লাগালো। ইজান এসে বাবার হাত ধরলো। উজান রুহানীর দিকে এগিয়ে এসে তার কপালে একটা চুমু খেয়ে বললো,
"রেডি হয়ে থাকিস।"
রুহানী মাথা নাড়িয়ে 'হ্যাঁ' বুঝালো। উজান ছেলের হাত ধরে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। 
নিচে সকলে একত্রে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা চাচারা ভাইরা সকলে একে অপরের সাথে কোলাকুলি করলো। একে অপরকে ঈদ মোবারক জানালো। পরবর্তীতে সেমাই খেয়ে সকলে ঈদের নামাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলো। সবাই বেরিয়ে যেতেই রুহানীরা আবার রান্না ঘরে এসে টুকটাক কাজ করার পর হামিদা তাদের ঘরে পাঠিয়ে দিলো তৈরি হয়ে নিতে। এমনিতেও অনেক কাজ এগিয়ে রাখা হয়েছে গতকালকেই। আজ বেশি কাজ নেই। যেটুকু আছে সেটা তারা তিন বউ মিলে করে ফেলতে পারবে।
রুহানীরা ঘরে এসে সবার আগে রুহিকে রেডি করাতে লাগলো। রুহিকে মেরুন রঙের থ্রিপিস পরালো। চুল ছেড়ে দিলো। পিঠ পযন্ত চুল তার। সাজানো সময় কি যে নড়াচড়া করছে মেয়েটা। রুহানী ভিষন ধৈয্য নিয়ে রুহিকে তৈরি করে দিলো।
রুহানী মাঝে মাঝে নিজের উপর ভিষন অনাক হয়। বিয়ের আগে না বিয়ের পরে এতো ধৈয্য তার কোনো কালেই ছিলো না যতোটা ধৈয্য নিয়ে সে এখন এই ছেলে মেয়েকে পালছে। এটাকেই বুঝি 'মা' বলে? বাচ্চাদের পালতে গিয়ে তার মাঝে মাঝে নিজের মায়ের কথা ভিষণ মনে পরে। মায়ের আদরের কথা তেমন একটা তার মনে নেই। তবে নিশ্চয়ই তার মা'ও তাকে এভাবেই ভালোবাসতো? এভাবেই আগলিয়ে রাখতো? 
রুহির রেডি হওয়া শেষ হতেই এবার সে তৈরি হচ্ছে। সেও আজ মেরুন রঙের একটা থ্রিপিস পরলো। এটা উজান তাকে পছন্দ করে কিনে দিয়েছে। চুল ছেড়ে দিলো। ঠোঁটে মেরুন রঙের লিপস্টিক লাগালো। মুখে হালকা মেকআপ করলো। তার রেডি হতে হতে ততক্ষনে উজান চলে আসলো। বাবাকে দেখেই রুহি লাফ দিয়ে বাবার কোলে চলে বসলো। উজান মেয়েকে কোলে নিয়ে বললো,
"ঈদ মোবারক, আম্মাজান।"
রুহি খিলখিল করে হেসে বললো, "ঈদ মোবারক, বাবা। আমার সালামি দাও।"
উজান পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সেখান থেকে এক হাজারের নোট বের করে দিলো মেয়েকে। টাকা পেয়ে রুহি খুশিতে লাফ দিয়ে বাবার কোল থেকে নেমে পরলো। দৌঁড়ে বাইরে চলে গেলো তার ভাইদের সেটা দেখাতে। রুহানী ডেকে উঠলো,
"রুহি টাকা আমার কাছে দিয়ে যাও তুমি হারিয়ে ফেলবে।"
তবে রুহি রুহানীর কোনো কথাই শুনলো না। সে ছুটে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। উজান এগিয়ে আসলো রুহানীর কাছে। রুহানীকে আগাগোড়া পরখ করে বললো,
"সুন্দর লাগছে।"
উজান শুধু বলেছে 'সুন্দর লাগছে' আর এতেই রুহানীর গাল লাল হয়ে উঠলো। সে লজ্জার মাথা নিচু করে হেসে উঠলো। উজান তাকিয়ে রইলো সেই হাসির দিকে। রুহানী আবার মাথা উঁচিয়ে বললো,
"ঈদ মোবারক।"
উজান এগিয়ে এসে কোমর জরিয়ে ধরে বললো,
"ঈদ মোবারক।"
রুহানী এবার সালাম দিলো, "আসসালামু আলাইকুম। এবার আমার সালামি দিন।"
সে হাত পেতে দিলো উজানের সামনে। উজান সালামের জবাব দিয়ে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে কয়েকটা হাজার টাকার নোট বের করে দিলো। টাকা পেয়ে তো রুহানী সেই খুশি। সে উজানকে জরিয়ে ধরলো। উজানও তাকে জরিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। 
উজান-রুহানী, অভ্র-আয়েশা, তুহিন-ইসরাত, রায়হান-তামান্না এরা সকলে ঘুরতে বেরিয়ে গেলো।  ইজান, তালহা আর রুহিকে নিয়ে সুমন আর হাফিজ বেরিয়েছে। অয়ন রয়েছে হামিদার কাছে। 
রুহানী একটা ফুচকার দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো। এক প্লেট ফুচকা নিয়ে দুইজনে খেলো। বিকাল গরিয়ে রাত হলে অন্যরা সবাই বাড়ি ফিরলেও উজান আর রুহানীর ফেরার নাম নেই। 
                                     _____
বারান্দায় একে ওপরকে জরিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে রুহানী আর উজান। তাদের কারো মুখে কোনো কথা নেই। শুধুই একে-ওপরকে উপভোগ করছে। রুহানী উজানের দিকে ফিরে দাঁড়ালো। তখনও উজান রুহানীর কোমর জরিয়ে। উজান সরাসরি রুহানীর চোখের দিকে তাকালো। রুহানী সে চোখে তাকিয়ে নেশাগ্রস্তের নেয় বলে উঠলো,
"আপনার চোখ গুলো অনেক সুন্দর।"
উজান চোখ দিয়ে হাসলো যেনো। রুহানী এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই চোখে। আনমনা হয়ে মনে মনে বলে চললো,
তাদের প্রশ্ন করেছিলাম, সব থেকে ভয়ংকর নেশা কোনটি?
তারা উত্তর দিয়েছিলো, আফিম..কোকেন..
আমি মুচকি হেসে বলেছিলাম, আমার উজানের চোখ দেখোছো তোমরা?
                                      °°°°
এই গল্পের সমাপ্তি টানতে আমার মন টানছে না। তাই গল্পের 'সমাপ্ত' আমি লেখবো না। ওদের জীবন, ওদের সংসার এভাবেই চলবে কোনো সমাপ্ত ছাড়া। কোনো একদিন বুড়ো হলে তাদের আয়ু ফুরিয়ে গেলে তারাও ফুরিয়ে যাবে তবে গল্পের সমাপ্ত আমি দিতে পারছি না। তবে আরেকটা কথা, ওরা কিন্ত আবার আসবে নতুন ভাবে নতুন রুপে। অপেক্ষা করুন খুব শীঘ্রই ওদের নিয়ে ফিরবো।
                          ( সমাপ্ত)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন