#প্রণয়ের_বৃষ্টি
#writer_nazmin
#Part_39
🚫কপি করা নিষিদ্ধ
মেঘলা অন্যমনস্ক হয়ে ওর আর আরিয়ানের ঘরের দিকে হাঁটছে।বেশ রাত হয়ে গিয়েছে।রিসেপশনের অনুষ্ঠানও শেষ।আগত অতিথিদের একটি বড় অংশ চলে গেছে।কিছু নিকট আত্মীয়রা রয়ে গেছেন।তারা কাল পরশু যাবেন।মাহবুব আলমরাও চলে গেছেন। যদিও আরিয়ান ও ওর মা বাবা ওনাদের থেকে যেতে অনেক জোর করেছিল কিন্তু ওনারা শোনেননি।আসলে যত যাই হোক মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে বিয়ের পরপরই থাকাটা তো আমাদের সমাজ এত ভালো চোখে দেখে না।তার ওপর আবার কিছু অতিথিরাও আজ এ বাড়িতে অবস্থান করছে।সব বিবেচনা করেই ওনারা চলে গেছেন।তবে যাওয়ার আগে আরিয়ানকে তিনদিন পর মেঘলাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য পই পই করে বলে গেছেন।আসলে আড়াইউল্লার জন্য আজই তো মেঘলার বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল।তবে এভাবে হুট করে সব হওয়ায় বড়দের সিদ্ধান্তে তিনদিন পর এই অনুষ্ঠান পালিত হবে।
মেঘলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।একটু আগে নীলিমা ঘরে নিয়ে গিয়ে একান্তে ওকে অনেক বুঝিয়েছেন। বড় ফুপুর আচরণ যেন কষ্ট না পায় ও।তিনি আসলে এমন স্বভাবেরই তবে মানুষটা বেশ ভালো।ইশিতার তখনকার আচরণের ব্যাপারেও ওর থেকে মাফ চেয়েছেন। ইশিতার বিদেশে বড় হওয়ায় এবং আরিয়ানের সাথে ছোটবেলা থেকেই আপন ভাই বোনের মতো সম্পর্ক হওয়ায় এই আচরণ এও বলেছেন।ও অবশ্য নীলিমাকে কিছু বুঝতে দেয়নি।হাসি মুখে ওনার সব কথা মেনে নিয়েছে।তার মানে ইশিতা ও আরিয়ানের আগের সম্পর্কের ব্যাপারে পরিবারের কেউই কিছু জানে না! ওদের চোখে ওরা শুধুই কাজিন!কি হচ্ছে এসব!নাহ! সবার আগে ওকে আরিয়ানের সাথে কথা বলতে হবে।
মেঘলা তাড়াতাড়ি করে সামনে পা বাড়ালো এমন সময় ওর সামনে এসে দাঁড়ালো ইশিতা।ওর মুখে ঝুলছে বাঁকা হাসি।ওকে দেখে মেঘলার চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেলো।ও কঠোর গলায় বললো,
—আপনি!
ইশিতা কুটিল হেসে বললো,
—হ্যাঁ আমি।কেন আমাকে দেখে খুশি হওনি বুঝি?(ভ্রু উঁচিয়ে ঢং করে)
মেঘলা ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে ওকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে ধরলো।ঠিক তখনই ইশিতা বলে উঠলো,
—ভালোই তো প্ল্যান করেছ।
মেঘলা পিছন ফিরে ওর দিকে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে বললো,
—কি?
ইশিতা ওর দিকে ফিরে শয়তানি হেসে বললো,
—বলছি ভালোই তো প্ল্যান করেছ।পুরনো প্রেমিক এখন বিদেশ ফেরত আবার এত বড় কোম্পানির সিইও।তাকে ধরতে পারা তো আর চারটি খানি কথা নয়।
অপমানে মেঘলার মুখ লাল হয়ে উঠলো।ও এবার সামনে এগিয়ে এলো।ইশিতা ভেবেছিল ওর কথায় হয়তো মেঘলা ভেঙে পড়বে।কিন্তু মেঘলার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা তাচ্ছিল্যের হাসি দেখে ওর মুখের হাসিটাই খানিকটা ফিকে হয়ে গেল।
—আমার চিন্তা আপনার করতে হবে না আপু।আর যত যাই হোক প্রাক্তনের জীবনে আবার ঢোকার জন্য ষড়যন্ত্র আর ছ্যাঁচড়ামি তো করিনি।এতেই আমার শান্তি।
ইশিতার চোখ মুহূর্তেই সরু হয়ে এলো।ও দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
—হোয়াট ডু ইউ মিন?
মেঘলা ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে গেল। বাঁকা হেসে বললো,
—যেটা বুঝেছেন সেটাই মিন করেছি।
—কথা ঘুরিও না।
—আমি কথা ঘুরাচ্ছি না। তবে আপনার একটা অভ্যাস আছে।নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর।
ইশিতা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর হেসে উঠলো।
—তুমি কি ভাবছো? তুমি আরিয়ানকে বিয়ে করে জিতে গেছো?
—জেতা-হারার খেলায় আমি নামিনি।
—কিন্তু আমি নেমেছি।
ইশিতার কণ্ঠস্বর এবার ঠান্ডা হয়ে গেল।
—আরিয়ানকে আমি সাত বছর ধরে চিনি। ওর পছন্দ, অপছন্দ, দুর্বলতা, রাগ, অভিমান সব জানি। তুমি ওকে পেয়েছো ঠিকই, কিন্তু ওর হৃদয়ের একটা অংশ এখনও আমার কাছে আছে।
মেঘলা এবার সত্যিই হেসে ফেললো।সেই হাসিটা দেখে ইশিতা বিরক্ত হয়ে উঠলো।
—হাসছো কেন?
—কারণ আপনি নিজেই নিজের কল্পনার জগতে বাস করেন।
—এক্সকিউজ মি?
—আপনি ঠিকই শুনেছেন।
মেঘলার চোখদুটো এবার কঠিন হয়ে উঠলো।
—যে মানুষকে ভালোবাসা হয়, তাকে সুখী দেখতে ইচ্ছে করে।তার জীবন নষ্ট করতে না।আরিয়ানকে যদি সত্যিই ভালোবাসতেন,তাহলে ওর জীবনে বিষ ঢালার চেষ্টা করতেন না।
ইশিতার মুখের পেশি শক্ত হয়ে গেল।
—তুমি আমাকে শেখাবে ভালোবাসা?
—না।কারণ আপনি ভালোবাসার অর্থ বোঝেন না।
কথাটা শুনে ইশিতা রাগে ফুঁসে উঠলো।
—শাট আপ!
—কেন? সত্যি কথা শুনতে কষ্ট হচ্ছে?
—তুমি জানো না আমার আর আরিয়ানের মধ্যে কি ছিল।
মেঘলা শান্ত গলায় বললো,
—হয়তো জানতাম না। কিন্তু এখন জানি।
কথাটা বলেই মেঘলা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো।আর ঠিক তখনই প্রথমবারের মতো ইশিতার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।
—কি বলতে চাইছো তুমি?
—বলতে চাইছি আমি অনেক কিছুই জেনে গেছি।
ইশিতার মুখের রং একটু একটু করে বদলাতে শুরু করলো।
—ক...কিসের কথা বলছো?
মেঘলা এবার এক পা সামনে এগিয়ে এলো।
—বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। রাকিবের কথা। সেই এডিট করা ছবির কথা। ইচ্ছাকৃতভাবে আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরার কথা।গুজবের কথা।আর দুজন মানুষকে আলাদা করার জন্য করা সব নোংরা পরিকল্পনার কথা।
এক মুহূর্তে চারপাশের বাতাস যেন থমকে গেল।ইশিতার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠলো।ওর ঠোঁট নড়লো কিন্তু শব্দ বের হলো না।মেঘলা বুঝতে পারলো নিশানায় আঘাত লেগেছে।
—কি হলো? অবাক লাগছে?
ইশিতা দ্রুত নিজেকে সামলে নিল।
—আমি বুঝতে পারছি না তুমি কি বলছো।
—মিথ্যা বলতে থাকুন। আপনার তো অভ্যাস আছে।"
—কোনো প্রমাণ আছে তোমার কাছে?
—থাকলে কি করবেন?
—তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো?
মেঘলা মাথা নাড়লো। সামনে এগিয়ে এসে বলল,
—না। আমি শুধু জানিয়ে দিচ্ছি, আমি আগের সেই মেঘলা নই, যাকে সহজে ভাঙা যায়।
ইশিতা দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
—তুমি নিজেকে খুব শক্ত ভাবছো তাই না?
—আমি নিজেকে কিছুই ভাবি না। তবে নিজের সম্পর্ককে বিশ্বাস করি।
—বিশ্বাস?
ইশিতা বিদ্রূপের হাসি হাসলো।
—তুমি কি জানো আরিয়ান একসময় আমার জন্য পাগল ছিল?
—জানি।
মেঘলা এত সহজে উত্তর দেবে এটা ইশিতা আশা করেনি।
—তাহলে?
—তাহলে এটাও জানি, সেই মানুষটাকে আপনি নিজের হাতেই হারিয়েছেন।
ইশিতা চুপ করে গেলো।
—কেউ আপনার কাছ থেকে আরিয়ানকে কেড়ে নেয়নি আপু। আপনি নিজেই ছেড়ে দিয়েছিলেন।
—আমি ছেড়ে দিইনি!
ইশিতা প্রায় চিৎকার করে উঠলো।
—আমার পরিস্থিতিই এমন ছিল!
—আর আজ?
মেঘলা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।
—আজ কেন ফিরেছেন?
ইশিতা উত্তর দিল না।মেঘলা ধীরে বললো,
—কারণ আজ আরিয়ান সফল। প্রতিষ্ঠিত। আর তার জীবনে এমন একজন এসেছে যাকে সে ভালোবাসে। তাই আপনার জেদে লেগেছে।
—নো!
—ইয়েস।
মেঘলার কণ্ঠস্বর এবার অস্বাভাবিক দৃঢ়।
—এটা ভালোবাসা না। এটা অহংকার।
ইশিতা রাগে কাঁপতে লাগলো।
—তুমি জানো না আমি কি করতে পারি।
—হুমকি দিচ্ছেন?
—যদি প্রয়োজন হয় তাহলে হ্যাঁ।
মেঘলা স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো।
—তাহলে আমিও একটা কথা বলি।
—কি?
—আমি কাউকে কেড়ে নিই না। কিন্তু নিজের মানুষকে কাউকে কেড়ে নিতেও দিই না।
ইশিতা ওর দিকে তাকিয়ে রইলো।মেঘলা ধীরে ধীরে বললো,
—আপনি যদি ভাবেন আবার আগের মতো ষড়যন্ত্র করে আমাদের আলাদা করবেন, তাহলে ভুল ভাবছেন। কারণ এবার আমি সত্যিটা জানি। আর সবচেয়ে বড় কথা আরিয়ানও জানে আপনি ঠিক কি।
ইশিতার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
—চ্যালেঞ্জ নিচ্ছো তাহলে?
মেঘলা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বললো,
—হ্যাঁ।
—আমি আরিয়ানকে তোমার কাছ থেকে কেড়ে নেব।
মেঘলা মৃদু হেসে বললো,
—চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
—বাহ্!এত আত্মবিশ্বাস?
—কারণ ভালোবাসা আর জেদের পার্থক্য আমি জানি।
ইশিতা দাঁত চেপে রইলো।আর মেঘলা শেষবারের মতো ওর দিকে তাকিয়ে বললো,
—আর একটা কথা। এবার যদি আমার পরিবার, আমার সম্পর্ক বা আমার স্বামীকে নিয়ে কোনো খেলা খেলতে আসেন, তাহলে আগের মতো চুপ করে থাকবো না।
কথাটা বলে মেঘলা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। সোজা করিডোর ধরে সামনে হাঁটতে লাগলো।ইশিতা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।ওর মুখের হাসি অনেক আগেই মিলিয়ে গেছে।মেঘলার চলে যাওয়া পিঠের দিকে তাকিয়ে ও ধীরে ধীরে মুঠো পাকালো।চোখে জ্বলে উঠলো পুরনো সেই জেদ।
—গেম ওভার না, মেঘলা...(ফিসফিস করে বললো ও)গেম জাস্ট স্টার্টেড।
আর করিডোরের অন্যপ্রান্তে দ্রুত পা ফেলতে ফেলতে মেঘলার মাথায় তখন একটাই চিন্তা ঘুরছে আজই ওকে আরিয়ানের সাথে কথা বলতে হবে।সব সত্যি জানতে হবে,সবকিছু।
*****
মেঘলা দ্রুত পা ফেলে নিজেদের ঘরের সামনে এসে থামলো। করিডোরে ইশিতার সাথে হওয়া কথোপকথনটা এখনও মাথার ভেতর ঘুরছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপা অস্থিরতা জমে আছে। এতদিন যেসব প্রশ্ন ওকে তাড়া করে বেড়িয়েছে, আজ তার কিছু উত্তর পেলেও নতুন করে আরও অনেক প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে।কাঁপা হাতে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখলো আরিয়ান বারান্দার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। কোট খুলে ফেলেছে। সাদা শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো। এক হাতে কফির মগ। অন্য হাতটা পকেটে ঢোকানো। বাইরে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।মেঘলা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।তারপর ধীরে ডাকলো,
—আরিয়ান...
আরিয়ান ঘুরে তাকালো। ওর সাথে চোখাচোখি হতেই মেঘলার বুকটা ধক করে উঠলো।ওই চোখে কোনো রাগ নেই।কিন্তু কোনো উষ্ণতাও নেই।আরিয়ান শুধু নির্লিপ্ত গলায় বললো,
—কিছু বলবে?
মেঘলার গলা শুকিয়ে গেল।এমন আরিয়ানকে ও আগে কখনো দেখেনি।রাগী আরিয়ানকে সামলানো যায়।কিন্তু এমন ঠান্ডা আরিয়ানকে নয়।মেঘলা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।
—আমার তোমার সাথে কথা আছে।
—বলো।
—ইশিতার সাথে একটু আগে আমার কথা হয়েছে।
আরিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
—ওর ব্যাপারে আমি কোনো কথা বলতে চাই না।
—কিন্তু আমার জানা দরকার।
আরিয়ান তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।
—এখন?
মেঘলা থমকে গেল।
—মানে?
—এখন জানা দরকার?
মেঘলার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।ও বুঝতে পারছে কথাগুলো অন্যদিকে যাচ্ছে।
—আরিয়ান আমি শুধু...
—তুমি শুধু কি?
আরিয়ান এবার পুরোপুরি ওর দিকে ঘুরে দাঁড়ালো।
—সত্যি জানতে চাও?
—হ্যাঁ।
—সত্যি হলো আমি ক্লান্ত।
মেঘলা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।আরিয়ান হেসে ফেললো।তবে সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই।আছে শুধু তীব্র তিক্ততা।
—আজকে সবাই শুধু আমার কাছ থেকে উত্তর চায়। কেউ একবারও জিজ্ঞেস করে না আমি কেমন আছি।
—আমি তো...
—না মেঘলা।
আরিয়ান ওকে থামিয়ে দিল।ঘরটায় নীরবতা নেমে এলো।কয়েক মুহূর্ত পর আরিয়ান ধীরে ধীরে বললো,
—তুমি জানো আজকে তোমার সাথে বিয়ের পর আমার তৃতীয় রাত?
মেঘলা মাথা নিচু করলো।
—জানি।
—জানো?
আরিয়ান মৃদু হেসে বললো,
—তাহলে এটাও জানো আজকের দিনটা আমার কেমন হওয়ার কথা ছিল?
মেঘলা উত্তর দিতে পারলো না।
—আজকে আমার শুধু তোমাকে নিয়ে ভাবার কথা ছিল।
আরিয়ানের কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে এলো।
—কিন্তু সারাদিন ধরে আমি শুধু অতীতের জবাব দিয়ে যাচ্ছি।
মেঘলার চোখ ভিজে উঠলো।
—আমি ইচ্ছে করে করিনি।
—জানি।
—তাহলে?
আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো।তারপর ধীরে বললো,
—তুমি কি জানো তুমি চলে যাওয়ার পর আমার জীবনে কি হয়েছিল?
মেঘলা মাথা নিচু করে রইলো।আরিয়ান তাচ্ছিল্য করে বললো,
—জানো না।
আরিয়ান জানালার দিকে তাকালো।চোখে জমে উঠলো বহু বছরের ক্লান্তি।
—সেদিন তুমি যখন বলেছিলে আমাদের একটু দূরে থাকা উচিত...সেদিন আমি ভেবেছিলাম তুমি শুধু সময় চাচ্ছো।
মেঘলার বুকটা ধক করে উঠলো।
—আরিয়ান...
—কিন্তু তুমি চলে গেলে।
একটা দীর্ঘ নীরবতা দেখা দিল।
—একদিন...দুইদিন...এক সপ্তাহ...এক মাস...তারপরও তুমি ফিরে আসোনি।
মেঘলার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো।আরিয়ান যেন সেটা দেখেও দেখলো না।
প্রথম ছয় মাস আমি প্রতিদিন অপেক্ষা করেছি।প্রতিদিন প্রতিটা কল চেক করেছি।প্রতিটা মেসেজ দেখেছি।অসংখ্য অচেনা নাম্বারে ফোন করেছি এই আশায় যদি সেটা তোমার নম্বর হয়।মেঘলার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো।
—আমি জানতাম না...
—অবশ্যই জানতে না(আরিয়ানের গলায় তীব্র ব্যথা)কারণ তুমি ছিলে না।
কথাটা ছুরির মতো বিঁধলো মেঘলার বুকে।
—আমি অনেক কষ্টে ছিলাম।
মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বললো।
—আমিও ছিলাম।
আরিয়ান শান্ত স্বরে উত্তর দিল।
—কিন্তু পার্থক্য কি জানো?(মেঘলা কৌতুহলী চোখে তাকাতেই)তুমি নিজে দূরে সরে গিয়েছিলে।আর আমি না চেয়েও একা হয়ে গিয়েছিলাম।
মেঘলা এবার মুখ চেপে ধরে কাঁদতে লাগলো।আরিয়ান চোখ বন্ধ করলো।মনে হচ্ছে এতদিনের জমে থাকা কথাগুলো আজ বেরিয়ে আসছে।
—মা আমাকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল।রিদ্ম, তানভীর কেউ আমাকে সামলাতে পারতো না।আমি কাজে ডুবে গেলাম।দিনে ষোলো-সতেরো ঘণ্টা কাজ করতাম শুধু যাতে ভাবতে না হয়।শুধু যাতে তোমার কথা মনে না পড়ে।
মেঘলার পা কাঁপছে।
—স্টপ প্লিজ...
—না।
প্রথমবারের মতো আরিয়ানের গলায় রাগ ফুটে উঠলো।
—আজকে আমি থামবো না কারণ আজ পর্যন্ত আমি কখনো নিজের কথা বলিনি।(ওর চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে)তুমি জানো পাঁচ বছরে আমি কয়বার বাংলাদেশে ফিরেছি?"
মেঘলা মাথা নাড়লো।
—তিনবার।আর তিনবারই তোমার খোঁজ করেছি।
মেঘলার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
—কি?
—হ্যাঁ।তোমার পুরোনো ঠিকানায় গিয়েছি।তোমার খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছি।কিন্তু কোথাও তোমাকে পাইনি।
আরিয়ান তিক্ত হেসে বললো,
—মজার ব্যাপার কি জানো?তখনও আমি তোমার উপর রাগ করিনি।
মেঘলা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো।
—রাগ করিনি কারণ আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো ভালো নেই।হয়তো কোনো সমস্যায় আছো।হয়তো কোনো কারণ আছে।(আরিয়ান গভীর শ্বাস নিল)কিন্তু একসময়...
ওর দৃষ্টি সরাসরি মেঘলার চোখে গিয়ে থামলো।
—একসময় জানতে পারলাম তুমি আমাকে বিশ্বাসই করোনি।
মেঘলার পৃথিবীটা যেন থেমে গেল।
—আরিয়ান...
—এত সহজে তুমি বিশ্বাস করে নিয়েছিলে আমি তোমাকে ঠকাতে পারি।
কথাটা শুনে মেঘলা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না।বিছানার পাশে বসে পড়লো।ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।
—সরি...
আরিয়ান চোখ বন্ধ করলো।কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর ধীরে বললো,
—আমি তোমাকে ঘৃণা করি না।
মেঘলা মাথা তুললো।
—কিন্তু আমি এখনও পুরোপুরি ক্ষমা করতেও পারিনি।
মেঘলার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
—তাহলে আমাদের কি হবে?
আরিয়ান উত্তর দিল না।শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো।অনেকক্ষণ পর ধীরে বললো,
—জানি না।
এই দুটো শব্দ শুনেই মেঘলার চোখ দিয়ে নতুন করে জল গড়িয়ে পড়লো।কারণ এতক্ষণে ও বুঝেছে সমস্যা ইশিতা না।সমস্যা হলো পাঁচ বছরের সেই ক্ষত, যেটা এখনও পুরোপুরি শুকায়নি।আর সেই ক্ষত নিয়েই আজ তাদের নতুন সম্পর্কের শুরু।
চলবে...
💬 গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি লাইক কমেন্ট শেয়ার করবেন