#Har_golden_voice
#মিহিরিমা_তুহা
#পর্বসংখ্যা_৩
রাত প্রায় নয়টা। বারান্দায় বসে সুরেকে স্কুলের জুতোগুলো একজোড়া একজোড়া করে গুছিয়ে রাখছিল।
হঠাৎই কোনো এক অজানা কারণে তার চোখ চলে গেল বারান্দার গ্রিলের ওপাশে। সামনের দৃশ্যটা প্রতিদিনের মতোই পরিচিত।
এক পাশে ব্যস্ত মেইন রোড—ঝলমলে বড় বড় স্ট্রিটলাইটের আলোয় আলোকিত। একের পর এক গাড়ি ছুটে যাচ্ছে, হর্নের শব্দ ভেসে আসছে দূর থেকে। রাস্তার ওপাশে সারি সারি উঁচু বিল্ডিং, দোকানপাট আর মানুষের আনাগোনা। অন্যদিকে ছোট ছোট গলিগুলো যেন সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে আলো কম, অন্ধকারটা বেশ ঘন।
ফ্লোরা অন্যমনস্কভাবে চারপাশ দেখছিল। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল মেইন রোডের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাড়ির দিকে।
একটা বিশাল কালো গাড়ি। দেখেই বোঝা যায়, সাধারণ কোনো গাড়ি নয়।ফ্লোরার কে-ড্রামা দেখার অভ্যাসটা এমন যে, কোনো বড় কালো গাড়ি দেখলেই তার মাথায় প্রথমেই আসে—নিশ্চয়ই কোনো ধনী, সুদর্শন হিরো এখন নামবে!
তাই কৌতূহলী হয়ে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল সে। কয়েক সেকেন্ড পর গাড়ির দরজাটা খুলে গেল।
আর তারপর...
গাড়ি থেকে নামল একজন যুবক।
ফ্লোরার চোখ মুহূর্তেই বড় বড় হয়ে গেল।
ছেলেটা অসম্ভব সুদর্শন।
পরনে স্ট্রেটকার্ড নীল জিন্স, সাদা স্নিকার্স আর হালকা পিত রঙের শার্ট। শার্টের হাতা ফোল্ড করা । লম্বা, সুঠাম শরীর। গাড়ি থেকে নামার সময় তার চুলগুলো বাতাসে হালকা নড়ে উঠল।
এক মুহূর্তের জন্য ফ্লোরার মনে হলো— এটা কি সত্যিই কোনো কে-ড্রামার হিরো?
ছেলেটার মুখের গড়ন এতটাই নিখুঁত যে দূর থেকেও আলাদা করে চোখে পড়ছে। লম্বা নাক, স্পষ্ট জ-লাইন, শান্ত অথচ আত্মবিশ্বাসী অভিব্যক্তি।
ফ্লোরা যেন চোখের পলক ফেলতেই ভুলে গেল । তারপরই হঠাৎ তার দৃষ্টি গেল ছেলেটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজনের দিকে।ফ্লোরার বুকটা ধক করে উঠল।
ওই লোকটা! তার সেই রহস্যময় বডিগার্ড ! সেই লোকটাই দাঁড়িয়ে আছে ওই সুদর্শন ছেলেটার সামনে।
আর... তারা কথা বলছে!
ফ্লোরা অবাক হয়ে দুই হাত দিয়ে বারান্দার গ্রিল শক্ত করে ধরে ফেলল।
এই প্রথম সে লোকটাকে কারও সঙ্গে কথা বলতে দেখছে। তাও আবার এমন একজনের সঙ্গে, যে এতক্ষণে তার কল্পনার কোনো এক কে-ড্রামার চরিত্র হয়ে গেছে!
—এরা আবার কে?
নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে উঠল ফ্লোরা। কী নিয়ে কথা বলছে তারা? কেনই বা ওই লোকটা এতদিন ধরে তার আশেপাশে ঘুরছে? আর এই ছেলেটাই বা কে?
প্রশ্নগুলো একসঙ্গে মাথায় ঘুরতে লাগল। আর কৌতূহল সামলাতে না পেরে ছুটে গেল ঘরের দিকে। দোতলার সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নেমে পাশের বাসায় গিয়ে দরজায় একের পর এক বেল দিতে লাগল। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল আয়াত।
—কী হয়েছে? এত রাতে—
ফ্লোরা কোনো কথা না শুনেই বলল,
—সর! সর সামনে থেকে! তোকে কিছু দেখাব!
—কী দেখাবি?
—আগে সর!
আয়াত কিছুই বুঝতে না পেরে এক পাশে সরে দাঁড়াল।
ফ্লোরা তাকে প্রায় টেনে নিয়ে ছুটে গেল বারান্দার দিকে। আয়াতও বাধ্য হয়ে তার পেছন পেছন গেল।কিন্তু বারান্দায় পৌঁছে দুজনেই থমকে গেল।রাস্তার ওপাশে... কিছুই নেই। কালো গাড়িটাও নেই। ছেলেটাও নেই । এমনকি ফ্লোরার সেই বডিগার্ডও নেই।
আয়াত অবাক হয়ে বলল,
—কী হয়েছে তোর?
ফ্লোরা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
—তুই জানিস কী হইছে?
—কী?
—ওই যে আমার বডিগার্ডটা আছে না...
আয়াত ভ্রু কুঁচকে বলল,
—হ্যাঁ, তারপর?
—এখানে একটা বিশাল কালো গাড়ি ছিল। ওই গাড়ি থেকে একটা অসম্ভব সুন্দর ছেলে নামল! একদম কে-ড্রামার হিরোর মতো! তারপর...
ফ্লোরা নাটকীয়ভাবে একটু থামল।
—তারপর ওই ছেলেটা আমার বডিগার্ডটার সাথে কথা বলতেছিল!
আয়াত চোখ বড় বড় করে তাকাল।
—কী! ওই লোকটার সঙ্গে কথা বলছিল?
—হ্যাঁ!
—সত্যি?
ফ্লোরা গম্ভীর হয়ে বলল,
—আমি কি কখনো তোকে মিথ্যা বলছি?
আয়াত চুপ করে গেল।
সত্যিই তো।
ফ্লোরা তার জীবনের প্রায় সব কথাই আয়াতের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। আর আয়াতও জানে, ফ্লোরা কখনো তাকে মিথ্যা বলে না।
ফ্লোরা আবার বলল,
—কিন্তু ছেলেটা কে, সেটা জানতে খুব ইচ্ছা করতেছে। এত সুন্দর মানুষ আমি জীবনে দেখি নাই!
আয়াত মুচকি হেসে বলল,
—চল, বাইরে গিয়ে দেখি। হয়তো এখনো আশেপাশে আছে।
দুজন দ্রুত ওড়না গায়ে জড়িয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে মেইন রোডের দিকে গেল।
কিন্তু সেখানে পৌঁছে হতাশ হতে হলো। রাস্তা আগের মতোই ব্যস্ত। গাড়ি চলছে, মানুষজন হাঁটছে...
কিন্তু সেই বিশাল কালো গাড়ির কোনো চিহ্ন নেই।ছেলেটাও নেই। বডিগার্ডটাও নেই।
ফ্লোরা হতাশ মুখে চারপাশে তাকিয়ে বলল,
—ইশ! চলে গেছে।
আয়াত হেসে বলল,
—তুই এমন করছিস কেন যেন সত্যিই প্রেমে পড়ে গেছিস!
ফ্লোরা গাল ফুলিয়ে বলল,
—আরে না! কিন্তু ছেলেটা অনেক সুন্দর দেখতে ছিল। আমার তো একটাই প্রশ্ন—ওই লোকটার সঙ্গে কী কথা বলছিল?
আয়াত হেসে মাথা নাড়ল।
—দেখ, মনে হয় তোর প্রিন্স এসে গেছে।
ফ্লোরা মিটমিট করে হেসে বলল,
—যদি ওইটাই আমার প্রিন্স হয়, তাহলে তোকে আমি আমার ক্যাসেলে রাঁধুনি হিসেবে চাকরি দিয়ে দেব।
—আইছে! ভাগ্যশালী!
দুজনেই হেসে উঠল।
হাসতে হাসতেই তারা আবার বাসার ভেতরে চলে গেল।
মেইন রোডে তখনো গাড়ির কোলাহল। একটার পর একটা গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। হর্নের শব্দ, মানুষের কথাবার্তা—সব মিলিয়ে চারপাশে বেশ ব্যস্ততা।
অথচ সেই বিশাল বিলাসবহুল কালো গাড়িটির ভেতরে যেন অন্য এক পৃথিবী। বাইরের কোনো শব্দই কাঁচ ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করতে পারছে না। নিস্তব্ধ গাড়ির ভেতরে বসে আছে সেই সুদর্শন যুবক—ফ্লোরার চোখে দেখা সেই কে-ড্রামার হিরো। তার সামনে বসে আছে ফ্লোরার রহস্যময় বডিগার্ড।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সুন্দর ছেলেটা হঠাৎ মৃদু হেসে বলল,
—আজকে তো একটুর জন্য ধরা পড়ে যেতাম।
তার ঠোঁটের কোণে তখনো হাসি।
বডিগার্ড শান্ত গলায় উত্তর দিল,
—তাতেও বাকি ম্যাম কিছু বুঝতে পারত না।
ছেলেটা ভ্রু তুলে তাকাল।
—“Absolutely not. He is very clever.”
বডিগার্ড আর কিছু বলল না।
তার পাশে বসে থাকা আরেকজন যুবক এবার চুপচাপ কথাগুলো শুনছিল। পরনে একেবারে নিখুঁত ফর্মাল স্যুট। শ্যামলা গায়ের রঙের সঙ্গে তীক্ষ্ণ মুখের কাটিং। চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা, যা তার ব্যক্তিত্বে আরও গম্ভীর একটা ভাব এনে দিয়েছে।
কিছুক্ষণ পর সে শান্ত গলায় বলল,
—কিন্তু স্যার, আপনি এভাবে কতদিন দূরে দূরে থাকবেন?
সুন্দর ছেলেটা তার দিকে তাকাল। চোখে কয়েক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত একটা ভাব ফুটে উঠল।
—ইচ্ছা তো নেই।
মাত্র তিনটি শব্দ। তারপরই আবার ফোনের স্ক্রিনে চোখ নামিয়ে নিল সে।আঙুলের স্পর্শে স্ক্রিনে কিছু একটা করতে লাগল।
গাড়ির ভেতর আবার নেমে এলো নীরবতা।
কিছুক্ষণ পর সুন্দর ছেলেটা হঠাৎ ঠোঁটের কোণে মৃদু বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
—আমি যদি আজ ওকে না দেখতাম...
কথাটা অসম্পূর্ণ রেখে সে কয়েক সেকেন্ড থামল।
তারপর হাসতে হাসতেই বলল,
—তাহলে তো এখন ওকে তার বান্ধবীর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিতে হতো।
পাশে বসা দুজনের কেউ কিছু বলল না। তবে কথাটার অর্থ তারা দুজনেই বুঝতে পারল।
কয়েক মিনিট আগের দৃশ্যটা যেন আবার তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠল।
ফ্লোরা যখন তাদের দুজনকে দেখছি তখন ফ্লোরাকে বাঁকা চোখে খেয়াল করেছিল সুন্দর ছেলেটা । ফ্লোরা বারান্দা থেকে চলে যেতেই তারা গাড়িতে উঠে সেখান থেকে গাড়ি সরে ফেলেছিল ।
বডিগার্ডটা কিছুক্ষণ পর গাড়ির দরজা খুলে নেমে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে গাড়ির ভেতর আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
চশমা পরা ছেলেটা—আরিফ—সামান্য নড়েচড়ে বসল। তারপর পাশের সিটে থাকা সুন্দর ছেলেটার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
—ইভান, এভাবে আর কতদিন চলবে? তোমাকে এবার চিকিৎসা নিতে হবে।
ইভান ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলল না।
—আরিফ, I don’t want to talk about this right now.
কণ্ঠটা শান্ত হলেও সেখানে এমন একটা দৃঢ়তা ছিল যে, আরিফ আর তর্ক করল না।
কয়েক সেকেন্ড পর ইভান ধীরে বলল,
—এখন শুধু আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো।
সামনের সিটে বসে থাকা ড্রাইভার নির্দেশটা শুনে ইঞ্জিন চালু করল।
গাড়িটা ধীরে ধীরে রাস্তার ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।
---
অন্যদিকে...
নিজের ঘরে ফিরে এসেও যেন শান্তি পাচ্ছিল না ফ্লোরা।
বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছে সে। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠছে সেই ছেলেটার মুখ।
সেই সুন্দর চেহারা... চুলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস... আর সেই অদ্ভুত সুন্দর হাসি।
ফ্লোরা বিরক্ত হয়ে উঠে বসল। কয়েক সেকেন্ড সোজা হয়ে বসে থেকে আবার ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর আবার উঠে বসল। তারপর আবার শুয়ে পড়ল।
এভাবেই চলছে বেশ কিছুক্ষণ। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিল সে। কয়েক মিনিট ফোনে এদিক-ওদিক ঘাঁটাঘাঁটি করার পর হঠাৎ তার মাথায় একটা চিন্তা এলো।ফ্লোরা চোখ বড় বড় করে নিজেকেই ফিসফিস করে বলল,
—আমার কি... লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট হয়ে গেছে নাকি?
কথাটা মুখ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিজেই আঁতকে উঠল।
—না! না! না! এমন হতে পারে না!
তাড়াতাড়ি ফোনটা পাশে রেখে চাদরটা মাথার ওপর টেনে নিল। কিন্তু চাদরের নিচে গিয়েও সেই ছেলেটার মুখটা মাথা থেকে বের হলো না।কিছুক্ষণ পর আবার চাদর সরিয়ে উঠে বসল ফ্লোরা।নিজের দিকে আঙুল তুলে খুব সিরিয়াস মুখে বলল,
—আমি কি পাগল হয়ে গেছি?
কয়েক সেকেন্ড নিজের দিকেই তাকিয়ে রইল।তারপর নিজেকেই বোঝাতে শুরু করল,
—আমি কেন একটা অচেনা মানুষের কথা ভাবছি? গিয়ে দেখব, ওই ছেলের দুইটা বাচ্চা আছে, চারটা বউ আছে!
কথাটা ভেবে নিজেই একটু থেমে গেল। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
—না না! এসব ভাববি না। ভুলে যা ফ্লোরা। একদম ভুলে যা!
চাদরটা আবার মাথার ওপর টেনে নিয়ে চোখ শক্ত করে বন্ধ করল সে।
—ভুলে যা... ভুলে যা...
কিন্তু মনকে কি আর এত সহজে বোঝানো যায়?চোখ বন্ধ করলেই আবার সেই মুখটাই ভেসে উঠছে।অচেনা একজন মানুষ।যার নামও সে জানে না।তবুও সেই রাতের পর থেকে অদ্ভুতভাবে তার সমস্ত চিন্তার জায়গা দখল করে বসে রইল সেই অপরিচিত যুবকটি।
চলবে.......