ফন্ট সাইজ:
থিম:
আত্মার টানে

৩য় পর্ব

লেখক: Nadia aktar

--- ঝামেলা।

শেহযানের বিড়বিড় করে বলা শেষ শব্দটা শুনেও প্রাণেশা বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। ও উল্টো পা নাচাতে নাচাতে ওভাবেই চেয়ারটায় বসে কর্ন চিপস মুখে পুরতে লাগল। 
শেহযান চোখ-মুখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে পিচ্চি পাকা মেয়ে প্রাণেশার দিকে। ধমক দিলে বা ভয় দেখালে আর দশটা বাচ্চা যেখানে ভয়ে হাত-পা ছুড়ে কাঁদে সেখানে এই দেড় ফুট পিচ্চিটা নাকি দোল খাওয়ার বায়না ধরছে! কালে কালে আরও কত কি যে দেখতে হবে তা একমাত্র খোদাতায়ালা জানেন। 
শেহযান কি করবে ভেবে পেল না। কি করলে এই বাচ্চা মেয়েটাকে চুপ করানো যাবে তাও ও জানে না। বিরক্তি চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে শেহযান প্রাণেশার উদ্দেশ্যে শান্ত কণ্ঠে বলল,
--- শেষবারের মতো বলছি, আমার চেয়ার থেকে নামবে কি না?
প্রাণেশা আসমানি-নীলাভ দুটো চোখ পিটপিট করে শেহযানের দিকে তাকাল। শেহযানের এমন কড়া মেজাজ দেখেও ওর মধ্যে ভয় পাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। উল্টো হাতের কর্ন চিপসের বাটিটা শেহযানের দিকে ঠেলে দিয়ে আধো আধো গলায় বলল,
--- আম ভাইয়া, তিপচ থাবে? (আম ভাইয়া, চিপস খাবে?)
এহেন কথা শুনে শেহযানের কপাল জুড়ে যেন একগুচ্ছ অদৃশ্য বলিরেখা ফুটে উঠল। ও হাত ঝেড়ে ফেলার ভঙ্গি করে গম্ভীর গলায় বলল,
--- নো থ্যাঙ্কস। আমি তোমার মতো বাচ্চাদের চিপস খাই না। আর ওসব স্টুপিড নামে একদম ডাকবে না আমাকে। আই হ্যাভ আ প্রপার নেম।
শেহযানের পুরো কথার অর্থ বুঝতে পারল না প্রাণেশা। গোলগোল চোখে শেহযানের গম্ভীর মুখ দেখে ভাবল ভাইয়াটা হয়তো রেগে আছে। প্রাণেশা ভাবুক হয়ে ঠোঁট উল্টে বলল, 
--- ‌ভাইয়া, তোমাল এত লাগ তেনো? (তোমার এত রাগ কেন?)
প্রাণেশা ঠোঁট দুটোকে গোল করে অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল শেহযানের দিকে। শেহযান কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। এই পুঁচকেটার সঙ্গে কথা বলতে গেলেই বিপদ। শেহযান আর কিছু বলল না। বিরক্তি নিয়ে অন্য একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল।
___________________________
চৌধুরী প্যালেসের বিশাল ডাইনিং টেবিলে এক রাজকীয় আমেজ। পরিবারের সবাই মিলে একসাথে ব্রেকফাস্ট করতে বসেছে। বেশ অনেক কসরত করে আসলাম চৌধুরীকে খাবার টেবিলে নিয়ে আসা হয়েছে। ভদ্রলোক কিছুতেই আসতে চাইছিলেন না, কারণটা অবশ্য সবারই জানা। ছোট ছেলের কাণ্ডে যে বড়ই হতাশ হয়েছেন তিনি। উনার নাতনি হয়েছে এমন একটা কথা কীভাবে লুকিয়ে রাখল উনার ছোট পুত্র! উনার তো রেগে থাকারই কথা। ভদ্রলোক কত আশা নিয়ে বসেছিলেন, একটা নাতনি হলে গোটা দেশবাসীকে জানিয়ে, বিশাল অনুষ্ঠান করে নাতনিকে ঘরে তুলবেন তিনি। তা না, ছেলেটা উনার বেদ্দপী কাজ করে বসে আছে! 
বাড়ির সবাই মিলে বাবা-ছেলের মনোমালিন্য মিটিয়ে দিয়েছেন যদিও। তবুও আসলাম চৌধুরীর রাগ এখনো পুরোটা পড়েনি। গম্ভীর মুখে বসে রয়েছেন তিনি। 
একে একে সবাই জড়ো হচ্ছে ডাইনিং টেবিলে। যে যার মতো চেয়ার টেনে বসে পড়েছে। ইয়া বড় আয়তাকৃতির টেবিলের এক পাশের চেয়ারগুলোতে আমান চৌধুরী, আহিল চৌধুরী, আরিফ চৌধুরী বসেছেন, ওপর পাশের চেয়ারে সৃদিত, সৃজান, শেহযান এবং আরেক পাশে একা বসে আছেন আসলাম চৌধুরী। পুরো ডাইনিং টেবিল নানারকম সুস্বাদু খাবার আর ফলমূলে ভরপুর। 
সবার পাতে খাবার তুলে দিচ্ছেন বাড়ির তিন বধূ। জাইফা চৌধুরীও বড় দুই জা-এর সঙ্গে কাজে হাত মেলাচ্ছেন। 
টেবিলের একপাশে দাঁড়িয়ে সবাইকে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম লুচি বেড়ে দিচ্ছেন তিনি। বড় ও মেজো বধূ নীহার চৌধুরী ও সাইমা চৌধুরী জাইফা চৌধুরীকে কাজ করতে নিষেধ করেছিলেন। এবাড়িতে প্রথমবার এসেছেন জাইফা। সবকিছুই নতুন। এমন নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে একটু সময় তো লাগবেই। কিন্তু যতই নতুন হোন না কেন তিনি তো এবাড়ির বউ। জা-রা কাজ করবেন আর তিনি বসে থাকবেন সেটাতো বেমানান দেখায়। তাই জা-দের নিষেধাজ্ঞা ভেঙে জাইফা চৌধুরী কাজে যোগ দিয়েছেন। ছোট বউয়ের যত্নশীল রূপ দেখে নীহার চৌধুরী আর সাইমা চৌধুরী মুচকি হাসছেন। 
জাইফা চৌধুরী শেহযানের প্লেটে খাবার বেড়ে দিচ্ছিলেন। তখনই আনমনে শেহযানের দৃষ্টি গিয়ে আটকালো জাইফা চৌধুরীর চোখের ওপর। ভদ্রমহিলার ডাগর চোখ দুটো স্পষ্ট আসমানি-নীলাভ রঙের। ঠিক যেমনটা ছোট্ট প্রাণেশার। শেহযান মনে মনে হিসাব মেলাতে লাগল। ওহ! তাহলে এই চোখ ও ওর আম্মুর কাছ থেকে পেয়েছে! 
শেহযানকে অপলক তাকিয়ে থাকতে দেখে জাইফা চৌধুরী মৃদু হাসলেন। নিচু কণ্ঠে শোধালেন,
--- শেহযান, আরেকটা ব্রেড দেব আব্বু?
তৎক্ষণাৎ নিজের দৃষ্টি সরিয়ে আনল শেহযান। খাবারের প্লেটে দৃষ্টি রেখে মৃদু গলায় বলল,
--- লাগবে না, ছোটআম্মি। 
জাইফা চৌধুরী স্মিত হেসে সৃজানের পাতে ব্রেড দিতে গেলেন। সবার পাতে খাবার তুলে দেওয়া শেষ হলে তিন বধূও টেবিলে বসে পড়লেন নাস্তা সারতে। 
•••
শেহযানের নীল রঙ একদম সহ্য হয় না। কেমন যেন এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর বিরক্তি কাজ করে নীল রঙের প্রতি। আর ঠিক এই কারণেই প্রাণেশাকে শেহযানের আরও বেশি অপছন্দ। ওই নীল চোখ দুটো শেহযানের চোখের সামনে এলেই ওর মেজাজ বিগড়ে যায়। এটা কেন হয় শেহযান নিজেও সে সম্বন্ধে অবগত নয়। সবাই শুধু জানে চৌধুরী বাড়ির ছোট ছেলে শেহযানের নীল রঙ একদমই পছন্দ না। নীল রঙ সে সহ্যই করতে পারে না। তবে তার পেছনের রহস্য কি, সেটা কেউ আজও জানতে পারেনি। 
কিন্তু অদ্ভুত এবং চরম সত্য বিষয় হলো শেহযান নীল রঙ ঘৃণা করলেও, পিচ্চি প্রাণেশার চোখে এক ফোঁটা পানিও ও সহ্য করতে পারে না। প্রাণেশার চোখের কোণে কান্না জমলে শেহযানের বুক কেঁপে ওঠে। বুকের খাঁচায় বন্দি থাকা অঙ্গটিতে যেন রক্তক্ষরণ হয়। মনে হয় পৃথিবীর আর যাই হোক, এই বিষাদমাখা অশ্রু ওই দুটো নিষ্পাপ চোখে অন্তত মানায় না। কেন এমন হয় সেটা তার অজানা। এই অনুভূতির কোনো ব্যাখ্যা শেহযানের জানা নেই। এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর দ্বিমুখী অনুভূতিতে শেহযানের নিজের ওপরই নিজের রাগ হয়।
••
চারদিক নীরব। কারোর মুখেই কথা নেই। আসলাম চৌধুরীর গম্ভীর মুখশ্রী দেখে কারোর সাহস হচ্ছে না টু-শব্দটি উচ্চারণ করার। যে যার মতো খাবার খাচ্ছে, নিঃশ্বাসের শব্দ আর চামচ নাড়ানোর শব্দ ছাড়া তৃতীয় কিছুরই শব্দ হচ্ছে না। তবে আশপাশের পরিবেশ স্বাভাবিক থাকলেও সবার নজর যে খাবারের প্লেটে তা কিন্তু নয়। 
সকলের নজর টেবিলের মাঝখানের এক মহাআশ্চর্য দৃশ্যের দিকে। আড়াই বছরের পুঁচকে প্রাণেশা কোনো চেয়ার-ফেয়ারে বসেনি, ও সোজা টেবিলের ওপর এক কোণে পা ছড়িয়ে জাঁকিয়ে বসে আছে। হাতে ওর বড় একটা আইসক্রিমের বক্স। ব্রেকফাস্টের পাউরুটি, জ্যাম, লুচি-মাংসের ভিড়ে প্রাণেশা আপন মনে আইসক্রিম খেয়ে যাচ্ছে। 
ওর ফর্সা কোমল গোলুমোলু গাল, চিবুক আর নাকের চিকন ডগায় গোলাপি রঙের ভ্যানিলা ক্রিম মাখামাখি হয়ে একাকার। তবে সেদিকে তার বিশেষ একটা খেয়াল নেই। ও নিজের মতো আইসক্রিম চেটে যাচ্ছে।  
খেতে খেতে শেহযান আড়চোখে টেবিলের ওপর বসে থাকা প্রাণেশার দিকে তাকাল। মুখ ভর্তি আইসক্রিম মেখে যেভাবে মেয়েটা চোখ গোল গোল করে চামচ চুষছে তা দেখে শেহযানের খাওয়া মাঝপথেই থেমে গেল। শেহযান ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে মনে মনে বলল,
--- একটা ট্যাবলেটের মতো দেখতে বাচ্চা এত আইসক্রিম খায় কীভাবে? সকালে মানুষের পেটে খিদে থাকে, আর এই ঝামেলাটা পেটে বোধহয় আইসক্রিমের কোল্ড স্টোরেজ বানিয়ে বসে আছে। ট্যাবলেট একটা।
প্রাণেশার আইসক্রিম খাওয়ার কাণ্ড দেখে আহিল চৌধুরী নিজের হাসিখান নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না। শব্দ করে হেসে উঠলেন তিনি। প্রাণবন্ত হেসে প্রাণেশাকে শুধালেন,
--- আমাদের রাজকুমারী, সকাল সকাল আইসক্রিম খেতে কেমন লাগছে আম্মাজান? খুব মজা, তাই না প্রাণ?
চামচ ভর্তি আইসক্রিম মুখে পুরে দিল প্রাণেশা। আহিল চৌধুরীর কথা শুনে আইসক্রিম বক্স থেকে মুখ তুলল ও। চোখ দুটো ঘুরিয়ে ডাইনিং টেবিলের সবাইকে এক নজর দেখে বেশ বড়দের মতো উত্তর দিল,
--- আইচতিরিম বুটিফুল।
ছোট্ট প্রাণেশার মুখে এমন আশ্চর্য শব্দ শুনে অবাক চোখে তাকালেন সকলে। সৃজান হু হু করে হাসতে নিলে কনুই দিয়ে গুতো মেরে ওর মুখ বন্ধ করাল সৃদিত। গুতো খেয়ে চুপ করে গেল সৃজান, পাছে দাদুমনি রেগে যান সেই ভয়ে হাসি আটকালো নিজের। 
মনোযোগ দিয়ে আদা-তুলসী দেওয়া চা খাচ্ছিলেন আসলাম চৌধুরী। নাতনির মুখে ‘বুটিফুল’ শুনে চা-এর কাপটা টেবিলে রেখে দিলেন। নাতনির দিকে তাকিয়ে হা-হা করে হেসে উঠলেন, 
--- হা-হা-হা! শোনো কথা শোনো। নাতনি আমার আইসক্রিম খেয়ে বলছে বিউটিফুল! আরিফ, তোর মেয়ে তো পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখার জন্য একাই যথেষ্ট রে। আমার সোনা দিদিভাই। 
সেকেন্ডের মধ্যে পুরো টেবিল জুড়ে হাসির রোল উঠল। আমান চৌধুরী, আহিল চৌধুরী, আরিফ চৌধুরী, নীহার চৌধুরী, সাইমা চৌধুরী একযোগে হেসে উঠলেন সকলে। হেসে একেকজনের গড়াগড়ি খাবার জোগাড়। জাইফা চৌধুরীও মেয়ের কান্ডে মুচকি হাসলেন। এ যাত্রায় সৃজানও আর বারণ মানলো না। বড়দের হাসি দেখে নিজেও হি হি করে হেসে উঠল। হাসল সৃদিতও। 
____________________________________
চৌধুরী বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে যেন। বাড়ির ভেতরে আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য রঙ-বেরঙের বেলুন। গেট থেকে শুরু করে ছাদ অবধি জ্বলজ্বল করছে রঙিন বাতি, নানান ধরনের ফুলেল সজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে গোটা চৌধুরী প্যালেস।
আজ সকালে খাবার টেবিলেই বাড়ির সবাইকে উদ্দেশ্য করে আজকের এই বিশেষ আয়োজনের কথা জানান আসলাম চৌধুরী। একমাত্র নাতনির আগমনকে একটুখানি আনন্দময় আর স্মরণীয় করে রাখতেই এমন উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। আসলাম চৌধুরীর এমন উদ্যোগে মুগ্ধ হয়েছেন বাড়ির প্রতিটা মানুষ। তখন থেকেই শুরু হয় আজকের দিনটি সুন্দর করে উদযাপন করার প্রস্তুতি। 
আসলাম চৌধুরী নিজের উদ্যোগে তিন বৌমার বাপের বাড়ির সব মানুষজনকে দাওয়াত দিয়েছেন। আরিফ চৌধুরীর শ্বশুরবাড়ি অর্থাৎ তাজওয়ারী বাড়ির মানুষজনকেও আসলাম চৌধুরী নিজে ফোন করে অত্যন্ত সম্মানের সাথে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। অতীত মুছে ফেলে পরিবারের সবাইকে এক ছাদের নিচে মেলানোর দারুণ উদ্যোগে মেতে উঠেছে পুরো চৌধুরী পরিবার।
মেহমানরা একে একে এসে উপস্থিত হয়েছেন চৌধুরী বাড়ির বিলাসবহুল ড্রইং রুমে। আত্মীয়স্বজনে আলোকময় চৌধুরী প্যালেস যেন এক উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। বাড়ির সর্বত্র জুড়ে গিজগিজ করছে মানুষজন। সবাই যেন আনন্দে আপ্লুত। হবে নাইবা কেন? আসলাম চৌধুরীর একমাত্র নাতনির আগমন হয়েছে বলে কথা! একটু আড়ম্ভরপূর্ণ পরিবেশ তো হবেই। তার মধ্যে চৌধুরী বাড়িতে প্রায় দুই যুগ পর কন্যাসন্তান হয়েছে তাই খুশির মাত্রা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। আসলাম চৌধুরীর গম্ভীর অবয়বে এখন শুধুই তৃপ্তির হাসির রেখা। সব অভিমান, রাগ ভুলে নাতনি আসার খুশিতে পুরো বাড়িময় ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি।
জাইফা চৌধুরীর বাপের বাড়ির লোকজনও এসে উপস্থিত হয়েছেন। আহিল চৌধুরী এবং আরিফ চৌধুরী মিলে তাজওয়ারী বাড়ির সদস্যদের রিসিভ করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে এসেছেন। ড্রয়িংরুমে একে অপরের সঙ্গে কুশল বিনিময় চলছে। আসলাম চৌধুরী বেয়াই মুরসালিন তাজওয়ারীর সঙ্গে কুলাকুলি করে দুই বেয়াই সোফায় গিয়ে বসলেন। শুরু হলো দুই বেয়াইয়ের মধ্যে আগেকার দিনের সব গল্প। 
ড্রইং রুমে বসে আছেন আরও কিছু মেহমান। জামিল তাজওয়ারী ও জাবের তাজওয়ারীর পাশে বসে আছে এক তরুণ। বয়স বোধ করি চৌদ্দ অথবা পনেরো। পরনে বয়সের সঙ্গে মানানসই নেভি-ব্লু রঙের ব্লেজার-স্যুট। শান্ত-শিষ্ট ভদ্র বাচ্চার মতো বাবা-চাচার পাশে বসে আছে সে। ক্ষণে ক্ষণে চোখ তুলে আশপাশে তাকাচ্ছে। পরিচিত মুখটার দেখা না পাওয়ায় মনটাও খারাপ হচ্ছে তার। কোথায় সে? সে কি তার আদু ভাইকে ভুলে গেছে নাকি? এই কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কি আস্ত একটা মানুষকে ভুলে যাওয়া যায়? 
মেহমানদের কোনো ধরনের সমস্যা হচ্ছে কিনা সেটা আহিল চৌধুরী ও আরিফ চৌধুরী তদারকি করছেন। আমান চৌধুরীও অন্যদিকটায় খেয়াল করছেন।।। চৌধুরী বাড়ির তিন বৌমাই আজ মার্জিত শাড়ি পরেছেন। আসলাম চৌধুরীর আদেশে বাড়ির সবাইই নতুন পোশাকে সেজে উঠেছে। সৃজান, সৃদিত, শেহযান ওরা তিন ভাইও ব্লেজার-স্যুট পরে তৈরি হয়েছে। সৃজান, সৃদিত বাড়িতে আসা ওদের বয়সী ছেলেদের সঙ্গে মিলে গল্পগুজব করছে।
বেশ কিছুক্ষণ আগে প্রাণেশাকে ঘুম পাড়িয়েছেন জাইফা চৌধুরী। মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে আলমারি থেকে শাড়ি নিয়ে মেজো জা-এর কাছে যান তিনি। একা একা শাড়ি পরার অভ্যাস নেই বিধায়ই জা-এর কাছে যাওয়া। সাইমা চৌধুরী পরিপাটি করে শাড়ি পরিয়ে দিয়েছেন ছোট জা জাইফা চৌধুরীকে। 
_____________________________
ঘুমঘুম চোখে বালিশ থেকে উঠে বসল প্রাণেশা। গায়ের উপর থেকে কসরত করে তুলতুলে সফেদ রঙের কম্ফোরটারটা ফেলে দিলো ও। চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে গাল ফোলাল। কাঁদো কাঁদো মুখ করে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল টাইলস খচিত মেঝেতে। চোখ কচলাতে কচলাতে আস্তে করে একবার ডাকল, 
--- মাম্মাম? 
 কোনো সারা পেল না। সারা না পেয়ে আরেকবার ডাকল,
--- বাবাই?
এবারেও কেউ সারা দিল না। প্রাণেশার রাগ হলো। চট করে ঠোঁট দুটো উল্টে ফেলল ও। এই বুঝি কেঁদে বাড়ি মাথায় তুলল। নাহ! কাঁদল না প্রাণেশা। গাল ফুলিয়ে ভেজানো দরজার দিকে এগিয়ে গেল। 
ছোট ছোট পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে ছোট্ট প্রাণেশা। গায়ে তার পেস্টেল গোলাপি রঙের পাফ স্লেভের বেবি ফ্রক। মুখটা রসগোল্লার মতো করে রেখেছে। মনে হচ্ছে ওকে একা রেখে যাওয়ায় মস্ত বড় অন্যায় করা হয়েছে ওর সঙ্গে। 
স্বচ্ছ কাচ দিয়ে ঘেরাও করা রেলিং ঘেঁষে করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল প্রাণেশা। সেখান থেকেই হঠাৎ করে নিচ তলার দিকে নজর পড়ল ওর। ড্রয়িংরুমে সোফায় ওর মামদের (মামাদের) দেখল ও। আদ্রিককেও সেখানে বসে থাকতে দেখল প্রাণেশা। ওর আদু ভাই এসেছে! চেনা মুখটার দেখা পাওয়া মাত্রই প্রাণেশার চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল। ফুলানো গাল দুটোতে ফুটে উঠল এক টুকরো মিষ্টি হাসি। খিলখিল করে হেসে উঠল প্রাণেশা। দোতলা থেকেই হাত পা নেড়ে লাফিয়ে চিৎকার করে ডেকে উঠল,
--- আদু ভাই। আদু ভাই, আমি এতানে। (আদ্র ভাই। আদ্র ভাই, আমি এখানে।)
ছোট্ট প্রাণেশার কণ্ঠস্বর পেয়ে চোখ তুলে সেদিকে তাকাল আদ্রিক। প্রাণেশাকে দেখে ঠোঁট প্রশস্থ হয়ে এলো ওর। আনমনেই হেসে উঠল ও। স্থান কাল না ভেবেই প্রাণেশার মতো আদ্রিকও ডেকে উঠল,
--- আদরিনী!
আদ্রিকের ডাক শুনে হাসির শব্দ আরও বেড়ে গেল প্রাণেশার। খিলখিল শব্দে হেসেই চলেছে ছোট্ট মেয়েটি। হাসির চোটে হেলেদুলে উঠছে তার ছোট্ট শরীরখানা। খুশি যেন ধরছেই না তার। রেলিং টপকে আদ্রিকের কাছে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে প্রাণেশা। 
দোতলা থেকেই আদ্রিকের কোলে উঠার পায়তারা করছে ছোট্ট মেয়েটি। প্রাণেশার কান্ডে কি করবে ভেবে পেল না আদ্রিক। তাই না বুঝেই হাত দুটো বাড়িয়ে দিল ও। অর্থাৎ ওও প্রাণেশার মতো দূর থেকেই ওকে কোলে তুলে নিচ্ছে। 
নিজের ঘরের দরজা থেকে এই অদ্ভুতুরে দৃশ্য দেখছিল শেহযান। রেডি হয়ে নিজের ঘর ছেড়ে বেরোনোর সময়ই হঠাৎ এমন একটা দৃশ্যের সাক্ষী হয় ও। শেহযানের মাথায় ঢুকছে না এই পুঁচকে বাচ্চাটা এমনভাবে চিৎকার করছে কেন? আর লাফাচ্ছেই বা কেন? 
একটা বাচ্চা যে এতটা চঞ্চল হতে পারে সেটা জানা ছিল না শেহযানের। ওর ভাষ্যমতে বাচ্চারা হবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, নম্র, ভদ্র এবং শান্ত-শিষ্ট। কিন্তু এই খরগোশছানার মধ্যে এমন কোনো বৈশিষ্ট্যই নেই। আস্ত উচ্ছৃঙ্খল একটা বাচ্চা! প্রাণেশার দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল শেহযান। 
এদিকে প্রাণেশার সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ানোর তর সইছে না। চঞ্চল পায়ে ও সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগলো। ওর মুখ জুড়ে ছড়িয়ে আছে রাজ্যের উচ্ছ্বাস আর আনন্দ। এমনভাবে হেলেদুলে সিঁড়ির দিকে ছুটে যাচ্ছে যেন পিঠে দুটো ডানা থাকলে এখনই ডানা মেলে উড়ে যেত আকাশে। 
--- প্রাণণ!
ঝড়ের বেগে ছুটে এসে কেউ আগলে নিলো প্রাণেশাকে। স্লিপ খেয়ে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল প্রাণেশা। বাচ্চা মেয়েটি বুঝতেই পারেনি কীভাবে কী হলো? আচমকা একজোড়া হাত খপ করে আগলে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো ওর ছোট্ট দেহখান।
প্রাণেশা ভয় পেয়ে চোখ খিচে ধরেছে। ওর ছোট ছোট হাত দুটো জড়িয়ে আছে মানবের কাঁধ। 
…চলবে…
# আত্মার_ টান
# সামিয়া
#পর্ব_৩

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন