#ছদ্মবেশ (পর্ব ১১)
#মেহেদী_হাসান_রিয়াদ
রুশান চুপচাপ বসে আছে মেঝেতে দুই পা ছড়িয়ে দিয়ে। আর সামনে দুই কান ধরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে রিমি। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দুই পায়ে ব্যথা ধরে গেছে তার। আবারও করুন চোখে রুশানের দিকে তাকিয়ে বলে,
"আর কখনো কোনো ছেলের সাথে আড্ডা দিবো না প্রমিস। আজকের মতো ছেড়ে দাও প্লিজ…"
রুশান ঐ অবস্থাতেই বলে,
"এই প্রমিসটা এর আগেও ৩ বার করেছিলি।"
"এইবারই শেষ প্রমিস করছি। আর কোনো ছেলে বন্ধুর সাথে কথাও বলবো না আমি।"
রুশান কিছু না বলে চুপচাপ বসে রইলো। তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এখনো রেগে আছে না স্বাভাবিক হয়েছে। ওই অবস্থাতেই খুব শান্তভাবে বলে,
"ছেলেটা তোর ঘাড়ে হাত দিয়েছিলো কেন?"
রিমি চট করে বলে,
"কই, ঘাড়ে হাত দেয়নি তো।"
রুশান রেগে বলে,
"তার মানে বলতে চাইছিস আমি মিথ্যা কথা বলছি?"
রিমি এবার আমতা আমতা করে বলে,
"ঘাড়ে একটা পোকা বসেছিলো। আমি ভয় পেয়েছিলাম দেখে সে ওটা তাড়িয়ে দিয়েছিলো।"
"সে কেন তোর গায়ে টাচ করবে? কে হয় সে তোর? আর তোর ঘাড় দেখা গেলো কেন? হিজাব কয়টা কিনে দিয়েছি তোকে?"
রিমি বিরক্তি নিয়ে বলে,
"গরমে আমার অসহ্য লাগে ওগুলো পরতে।"
রুশান এবার উঠে দাঁড়িয়ে একটু মুচকি হেসে বলে,
"আজ থেকে সব ভালো লাগবে। এতোটাই ভালো লাগবে যে ঘরের মাঝেও হিজাব পরে থাকবি।"
রুশানের কথাটা মাথায় ঢুকলো না রিমির। তাই ডেবডেব করে রুশানের দিকে চেয়ে আছে সে।
রুশান আর কিছু না বলে রিমির পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর এক হাত দিয়ে রিমির দুই হাত চেপে ধরে অন্য হাতে একটা চেয়ার টেনে রিমিকে ওটাতে বসিয়ে দিলো। তারপর পকেট থেকে একটা চিকন দড়ি বের করে রিমির হাত বেঁধে নিলো। রিমি ছোটার চেষ্টা করতে করতে বলে,
"কি করছো ভাইয়া? আজ কি আমাকে এভাবে বেঁধে মারবে নাকি?"
রুশান কিছু বললো না। চুপচাপ রিমিকে বেঁধে সামনে এসে দাঁড়ালো। তারপর টেবিলে রাখা মেহেদীটা নিলো। যেটা সে আসার সময় নিয়েই এসেছিলো। এরপর চুপচাপ রিমির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মেহেদীটা দিয়ে রিমির গলায় লিখে দিলো, "রুশানের বৌ"।
তারপর উঠে দাঁড়িয়ে মেহেদী শুকানো পর্যন্ত রিমিকে ওভাবে রেখে সামনে বসে থাকলো রুশান। ঘণ্টা কেটে যায়, তবুও রিমির মুক্তি মেলে না।অনেকক্ষণ পর মেহেদী পুরোপুরি শুকানোর পর রিমির বাঁধন খুলে দিলো রুশান। তারপর রাগি লুক নিয়ে বলে,
"চুপচাপ ফ্রেশ হয়ে পড়ার টেবিলে বসবি। দ্বিতীয় কোনো শব্দ যেন না শুনি আমি। আন্টিকে বলেছি নাস্তা তৈরি করতে। শেষ হলে এসে তোকে দিয়ে যাবে। আর আজকের প্রমিসের কথা যেন সারা জীবন মনে থাকে।"
বলেই রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো রুশান। রিমি দ্রুত আয়নার সামনে চলে যায় গলায় কি লিখেছে এটা দেখার জন্য। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই চোখ কপালে উঠে যায় তার। রিমি রাগে পেছন ফিরে চিৎকার দিতে যাবে তখনই রুশানকে দেখে ভয়ে মুখ অফ হয়ে গেলো। রুশান গাল টিপে ধরে বলে,
"বলেছি না, যেন দ্বিতীয় কোনো শব্দ না শুনি? আর আজকের পর থেকে তোর আশেপাশেও কোনো ছেলে দেখলে, তোর সাথে ওই ছেলের অবস্থাও খারাপ করে দিবো।"
রিমি এবার না পারছে কিছু বলতে, আর না পারছে বিষয়টা মানতে। ওয়াশরুমে চলে গেলো সে। গলাটা অনেকক্ষণ ঘষেও কোনো লাভ হলো না। লেখাটা ভালোভাবেই বসে গেছে। রাগে কান্না করতে ইচ্ছে করছে তার। কেন যে এমন একটা খালাতো ভাই তার কপালে জুটলো? বাবা মাও তাকে কিছু বলে না যে, বাবা মায়ের কাছে বিচার দিবে।
রাতে খাওয়ার সময় বাবার ডাকাডাকিতে বাধ্য সবার সাথে টেবিলে গিয়ে বসলো রিমি। তবে সকলের নজর খাওয়ার দিক থেকে সরিয়ে এবার রিমির দিকে পড়লো। কারণ খেতে এসেও হিজাব পরে আছে।
রুশান খেতে খেতে বলে,
"কিরে, আজ হঠাৎ তোর উপর জ্বিন-টিন ভর করলো নাকি?"
রুশানের দিকে চেয়ে ভেতর ভেতর রাগে কটমট করতে থাকে রিমি। এই রুশানকে এখন একটুও সহ্য হচ্ছে না তার। নিজেই সব করে এখন আবার খোচা দিচ্ছে।
তার মাঝে মা-ও বলে,
"কিরে মা, কি হয়েছে তোর? গায়ে জ্বরটর এসেছে নাকি?"
রিমি এবার জোরপূর্বক একটু হাসার চেষ্টা করে বলে,
"আসলে মা, আমি অনেক ভেবে দেখেছি মেয়েদের জীবনে পর্দা করাটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ।"
মা আবার বলে,
"তা ঠিক যে পর্দা করতে হবে। নিজেকে হেফাজত করতে হবে। তাই বলে ঘরেও হিজাব পরে থাকবি?"
"হ্যাঁ মা, যেন এই ভালো অভ্যাসটা তাড়াতাড়ি হয়ে যায়।
রিমি চুপচাপ বসে ছিলো তখন। আজ মাথাটা পুরাই গরম হয়ে আছে। রুশান অনেকক্ষণ আগেই বেড়িয়ে গেছে। তা ভেবে একটু হলেও মনে শান্তি আসলো।
কিছুক্ষণ পর ফোনে একটা মেসেজ আসে তার। রুশানের মেসেজ। যেখানে লেখা ছিলো,
"গলার লেখাটা যদি একটুও পরিবর্তন হয়, তাহলে একেবারে ট্যাটু করে লিখে দিবো।"
আবারও রাগ হলো রিমির। রাগে হাতটা আচমকাই গলায় চলে গেলো। আর রাগে ফুঁসতে থাকে।
.
.
আজ কলেজ থেকে ফেরার পর রাজের কোনো দেখা মিললো না। ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলেও বলে আজ একটা কাজে আসছি, ফিরতে রাত হবে।
ফোন রেখে রাজ উঠে ঝুড়ি থেকে একটা আপেল নিয়ে কিছুটা এগিয়ে গেলো। একটা লোককে ডেকে আপেলটা ওই লোকটার মাথার উপরে রেখে বলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। তারপর টেবিল থেকে একটা পিস্তল তুলে নিয়ে ওটার উপর হাত বুলাতে লাগলো। অনেক দিন হলো এটা হাতে তোলা হয় নি। টার্গেটটা ঠিক আছে কি না একটু চেক করতে লোকটার মাথায় আপেল রেখেছে সে। রাজ অনেকটা দূরে গিয়ে লোকটার দিকে পিস্তল তাক করে দাঁড়াতেই লোকটা একটা শুকনো ঢোক গিলে চোখ বন্ধ করে নিলো।
হঠাৎ একটা গুলির শব্দ হলো আর তার মাথার উপর আপেলটা কয়েক ভাগ হয়ে অনেকটা দূরে ছিটকে চলে গেলো। রাজ এবার লোকটার দিকে তাকিয়ে দেখে ইতিমধ্যে প্রস্রাব করে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলেছে লোকটা। রাজ একটু মুচকি হেসে পাশ থেকে জুসের গ্লাসটা তুলে নিয়ে তাতে চুমুক দিলো।
পশ্চিম আকাশে তাকিয়ে দেখে সূর্য ডুবে আকাশটা লাল হয়ে আছে। কিছুক্ষণের পরই সন্ধ্যা হয়ে আসবে। রাজ জুসটা অর্ধেক শেষ করে পাশে রেখে দিয়ে ভাইয়ার দিকে চেয়ে বলে,
"আজ আসি ভাইয়া। আবার কয়েকদিন পর দেখা হবে।"
রাজের ভাই উঠে রাজের কাঁধে এক হাত রেখে বলে,
"তুই যে কি করছিস তা কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না আমি। যেখানে ছোটবেলা থেকেই তোর জন্য সেবার জন্যই পার্সনালি কয়েকজন লোক রেখে এত আদর যত্নে বড় করেছি তোকে। আর সেই তুই কিনা, একটা ব্যাচেলর বাসায় থাকিস? তারা কি খায়, কিভাবে থাকে, ওসব পরিবেশ কি তোর জন্য?"
রাজ একটু হেসে ভাইয়ার দিকে চেয়ে বলে,
"কারণ আছে ভাইয়া। তা সময় হলে তোমাকে বলবো। এখন আসতে হবে আমাকে। আমার বন্ধুরা বারবার ফোন দিচ্ছে।"
রাজের ভাই এবার তাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
"সাবধানে থাকিস। আর বাবা ফোন দিয়েছিলো। বললো, তোকে বুঝিয়ে অস্ট্রেলিয়া পাঠিয়ে দিতে। ওখানে বাবার বিজনেসের দেখা-শোনা করবি। এতগুলো বিজনেস বাবার একার পক্ষে দেখা সম্ভব হচ্ছে না।"
রাজ বললো,
"তুমি কি বলেছো?"
আমি বলেছি রাজ যেটা ভালো মনে করে।
রাজ একটু হেসে বললো,
"ওকে ভাইয়া আসি।"
.
.
পরদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে একটা মেয়ে এসে নিলয়ের পাশে দাঁড়ায়। মেয়ে দেখে নিলয় হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলে মেয়েটা ডেকে বলে,
"তোমার সাথে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আছে।"
বলেই আলাদা নিয়ে গিয়ে বলে,
"তোমাদের একটা ফ্রেন্ড আছে না, তুষার?"
নিলয় মাথা নেড়ে বলে,
"হুম।"
মেয়েটা একটা কাগজ বের করে বলে,
"এটা গিয়ে তাকে দিবে। আমি দিই নি, আমার এক বান্ধবী পাঠিয়েছে। তুষারকে না দেখে তোমাকে দিলাম।"
নিলয় সেটা হাতে নিয়ে বলে,
"আচ্ছা দিবো।"
মেয়েটা এবার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলে,
"আচ্ছা, তুষার কলেজে আসে না কেন?"
নিলয় বলে,
"ও একটা রেস্টুরেন্টে জব করে, তাই প্রতিদিন আসতে পারে না। তবে আজ আসেনি একটা কারণ আছে।"
মেয়েটা আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলো,
"কি কারণ?"
নিলয় এবার চুপ করে গিয়ে বলে,
"না সেটা কাউকে বলতে নিষেধ করেছে। ওটা মেয়ে-ঘটিত ব্যাপার।"
মেয়েটা এবার দাঁড়িয়ে বললো,
"মেয়ে-ঘটিত ব্যাপার মানে? আমি যতদূর জানি, তুষার তো খুব ভদ্র একটা ছেলে।"
নিলয় এবার হেসে দিয়ে বলে,
"কচুর ভদ্র। পরশু একটা মেয়ের কাছে গিয়ে বিটলামি করলে, পরে ওই মেয়ের বয়ফ্রেন্ড তাকে সেই লেভেলের একটা মার দিলো। এক মারে গতকাল থেকেই বিছানায় পড়ে আছে। আর শুনো, তুমি আবার এসব কাউকে বলবে না।"
মেয়েটা এবার দাঁড়িয়ে গিয়ে বলে,
"তুষার কি আসলেই এমন? অথচ আমার বান্ধবী তাকে কত ভালো ভেবে এই চিঠিটা দিয়েছিলো।"
বলেই নিলয়ের কাছ থেকে ছোঁ মেরে চিঠিটা নিয়ে নিলো মেয়েটা।নিলয় অবাক হয়ে বলে,
"তুষারকে দিতে হবে না এটা?"
মেয়েটা ওটা ছিঁড়ে ফেলে বলে,
"লাগবে না। ওর মতো একটা লু** ছেলের কাছে কেন জেনে শুনে আমার বান্ধবীকে তুলে দিবো? সালা লু**র দল।"
To be continue…..
~ (রাজ-আরোহি) ওদের নিয়ে লিখছি না কেন? উত্তরটা এখন দিবো না। তবে হ্যাঁ, ওদের নিয়ে লিখবো, যখন আরোহি পুরোপুরি গল্পে ঢুকে যাবে। আর সে গল্পে এন্ট্রি নিবে ধীরে ধীরে।