ফন্ট সাইজ:
থিম:
হিয়া জ্বলে পিয়ার দরদে

১০ম পর্ব

লেখক: নুসরাত জাহান ইভা

যারা গল্পে নাইকার ন্যাকামি পছন্দ করেন তাদের জন্য এই গল্প না।

জনরা - রোমান্টিক,,সাইকো, থ্রিলার।

#হিয়া_জ্বলে_পিয়ার_দরদে

#নুসরাত_জাহান_ইভা

#পর্ব_১০

আরিয়ানা মেহেককে বার বার কল দিচ্ছে। কিন্তু মেহেক ত ধরবে না। সেও মোবাইল রেখে নিচের কাউচে এসে বসে আছে। এই বাড়িতে আজ ১৭ দিন। নিকোলাস বাড়ি নেই। আজ রাতে ফিরবে কিনা তারও নিশ্চয়তা নেই। বেশির ভাগই বাড়িতে থাকে না। কে জানে কোথায় যায় কি করে?!.

১ সপ্তাহ হয় মেহেক ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে৷ অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনেই একটা ভাল ভার্সিটিতে মেহেকের এডমিট করিয়েছে নিকোলাস। সপ্তাহে দুদিন ক্লাস। কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) মেহেকের সাব্জেক্ট।

মেহেক কি ভেবে যেন আবার নিজের রুমে গেল। তারপর ড্রয়ার থেকে একটা গিটার নিয়ে সোজা ছাদে চলে গেল। ছাদটা অনেক সুন্দর। চারপাশে নানা বিদেশী ফুলের সারি৷ তার মাঝখানেই বেতের সোফা। সোফাগুলোর মাঝেই একটা টি টেবিল। ছোট্ট ছোট্ট সফেদ রঙা মোমবাতি জ্বলছে। নিকোলাসের চয়েজ আছে বলতে হয়। এসব দেখেই বুঝা যায় ছেলেটা কত সৌখিন।

এখন সন্ধ্যা রাত। মেহেক বেতের সোফায় যেয়ে বসে। তারপর গিটারে সুর তুলে।

আবছায়া চলে যায় হিজলের দিন

অভিমান জমে জমে আমি ব্যাথাহীন

আহারে জীবন আহা জীবন

জলে ভাসা পদ্ম যেমন

বাতাসে মেহেকের চুল উড়ছে। পরনে টিশার্ট আর ট্রাওজার। নিতম্ব ছড়ানো চুল খুলো খোলা। একেক করে বেশ কয়েকটা গান গেল মেহেক৷

তুমি চিরদিন ভীষন কঠিন

তোমার ঘর ভেসে যায়

ওরা মুখ দেখে বুঝতে পারে না

ওরা এ মন কেমন বুঝে না

ওরা আসল কারণ খুজে না

মেহেক একসময় শুধু গিটারেই সুর তুললো। মুখে গাইল না। চোখ দিয়ে অশ্রুকণা গড়িয়ে পরছে। হয়ত গলা বসে যাচ্ছে তাই গাইতে চাচ্ছে না।

মেহেক আনমনে গিটার বাজাচ্ছে। অথচ সে জানেই না পিছনে নিকোলাস এতক্ষণ যাবৎ মেহেকের সব কর্মকান্ডই দেখছিল দরজায় হেলান দিয়ে। বুকে দুহাত বেধে ঠোটের কোনে একরাশ মুগ্ধতা টেনে তাকিয়ে আছে মেহেকের পানে। বেশ খানিকক্ষণ পর নিকোলাস যেয়ে মেহেকের বিপরীতে বসলো। আচমকা নিকোলাসকে দেখে মেহেক ভয় পেয়ে গিটার পিছনে নিয়ে নিল।

- তোমার গানের গলা ত অনেক সুন্দর মিস্ট্রেস!! প্রতিদিন আমায় একটা করে গান গেয়ে শুনাতেও ত পারো!!

- কাউকে শুনানোর জন্য গাই না। আমি নিজেকে ব্যাস্ত রাখার জন্য মাঝেমধ্যে গাই৷

- বাম হাত দিয়ে যে গিটারটা লুকিয়ে রেখেছো সেটা কি তোমার?

মেহেক এবার তাকালো গিটারের দিকে। কই আর লুকাতে পেরেছে! পুরোটাই দেখা যাচ্ছে।

- জ্বী না আমার একটা ফ্রেন্ডের। কাল ভার্সিটিতে সে গিটার নিয়ে এসেছিল তাই তার থেকেই চেয়ে এনেছি। পরশু ভার্সিটি গেলে দিয়ে দিব।

নিকোলাস মাথা নাড়ালো শুধু।

- খিদে পেয়েছে আমার। খাবার আছে কোনো? দেও না।

নিকোলাস মুখ পাউট করে মেহেকের দিকে তাকিয়ে আছে। মেহেক এবার চাইল নিকোলাসের পানে। ছেলেটা কালো লেদার জ্যাকেট পরে আছে। লম্বা সিল্কি চুলগুলো কপালের দুদিকে ভাজ করে রাখা৷ গলার অ্যাডাম অ্যাপোলসটা যেন একটু বেশিইই নজর কাড়ে মেহেকের। হাতে ব্রেসলেট, গলায় চেইন। মেহেক একপলক তাকিয়ে চোখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল।

- জ্বী খাবার আছে। আপনি বসুন আমি নিয়ে আসছি।

মেহেক বলেই সেখান থেকে চলে যায়। নিকোলাস মেহেকের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে। মেহেক চলে যেতেই নিকোলাসের ডান হাতের উল্টোপৃষ্ঠে থাকা রক্তের তরল অতি সতর্কে বাম হাত দ্বারা মুছে নেয় সে। মুখে তার ক্রুর হাসি।

মেহেক সিড়ি দিয়ে খাবার নিয়ে ছাদের দিকে যাচ্ছে। আচমকা সে থেমে যায়।

- হলোটা কি আমার? আমি কিনা ওই ছেলের জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছি?! আমি নিচে এসে খাবার নিয়ে যাচ্ছি অথচ এতক্ষণে হুশ আসলো আমার? এই ছেলে কি ম্যানিউপুলেট করতে জানে নাকি?? থাক শুধু খাবারই ত চেয়েছে। দেয়াই যায় এতে আর ভাবাভাবির দরকার নেই।

মেহেক ছাদের দরজায় পা দিল৷ হাতে খাবারের ট্রে। কিন্তু মেহেক একদৃষ্টে সামনে তাকিয়ে আছে। নিকোলাস ছাদের রেলিং এ দাঁড়িয়ে আছে মেহেকের দিকে মুখ করে। বাতাসে তার চুল গুলো উড়ছে। মেহেককে দেখে সে আস্তে আস্তে মেহেকের সামনে আসছে। মেহেক ত দেখেই যাচ্ছে নিকোলাসকে। মেহেক খেয়াল করল - নিকোলাস যখন হাটছে তখন চুলগুলোও তার সাথে তাল মিলিয়ে উড়ছে। নিকোলাসের মুখে হাসি। গালে টোল পরা হাসির সঙ্গে সঙ্গে যেন চোখও হাসছে। কালো জ্যাকেটে,, হাটার স্টাইলে নিকোলাসকে যেন এক স্বপ্ননায়ক মনে হচ্ছে।

নিকোলাস সামনে এলো। মেহেকের দিকে হাত বাড়াল খাবার নেওয়ার জন্য। বিধিবাম!! মেহেক তার দিকে তাকিয়েই আছে। চোখের পলকও পরছে না।

নিকোলাস এবার ঝুকলো মেহেকের পানে৷

- ঠোঁটে কথা না বললেও তোমার চোখ দুটো যেন সব না বলা গল্পের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। আমি সেই অকথিত গল্পের প্রতিটি শব্দ তোমার চোখের তারায় পড়তে চাই মিস্ট্রেস!.

মেহেক তাও চেয়েই আছে। নিকোলাস আবারও ঠোট নাড়ালো।

​- তোমার চোখে এক অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি আছে। যখনই তাকাই, মনে হয় এক নেশার জগতে ডুবে যাচ্ছি যেখান থেকে আর কোনোদিন ফিরে আসতে মন চায় না। এই নেশার নাম কি মিস্ট্রেস?!.

মেহেক এবার চোখ নামিয়ে নিল। সে কি করছিল এতক্ষণ?! লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যায় মেহেকের। নিকোলাস আবারও হাত বাড়ায় খাবার নেওয়ার জন্য। মেহেক এবার ট্রেটা নিকোলাসের হাতে দেয়। কিন্তু আবারও নিকোলাসের দিকে তাকায়। ততক্ষণে নিকোলাস খাবার নিয়ে সোফায় বসে পরেছে। কিন্তু তাও নিকোলাস বলে উঠে -

তুমি যখন চোখের পাতা নামিয়ে আলতো করে তাকাও, তখন আমার হৃদপিণ্ডের স্পন্দন যেন থমকে যায়। তোমার ওই এক পলকের চাহনিতেই আমি হাজারবার ঘায়েল হতে রাজি মিস্ট্রেস।

বলেই নিকোলাস চামচ দিয়ে খাবার নাড়াচাড়া করছে। হঠাৎ মেহেকের কথায় মেহেকের দিকে ফিরে তাকায়।

- আপনার ধ্বংস দেখেন না বুঝি!! আমি ত ভাবি আপনি হয়ত আমার চোখে আপনার হারটাই দেখতে পান।

নিকোলাস শব্দ করে হাসলো। সাথে যেন শরীরটাও দুলে উঠলো।

- আমি ত হার মেনেই বসে আছি মিস্ট্রেস। আমি ত প্রতিটা পদে পদেই তোমার কাছে হার মেনে মাথা নুয়াই। তোমার তীক্ষ্ণ চাউনি যখন আমার মনের দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দেয়, তখন আমি স্বেচ্ছায় হার মেনে নেই। তোমার ওই চোখের কাছে হেরে যাওয়ার মধ্যেই যেন পরম সুখ আমার।

মেহেক আর কথা বাড়ালো না। সে জানে নিকোলাস আগে থেকেই কথা সাজিয়ে রেখেছে। মেহেক যা ই বলবে তাতে ই কথা ছুড়বে একেকটা। সোফা থেকে গিটার নিয়ে চলে গেল নিজের রুমে। নিকোলাস সেখানেই একা একা বসে খাবার খেল। মুখে তার অদ্ভুত হাসি। হাসি যেন সরছেই না।

মেহেক আজ ভার্সিটি থেকে এসেছে। এসেছে বললে ভুল হবে। নিকোলাস নিয়ে এসেছে৷ মেহেক ক্লাস শেষে বাইরে এসে দেখে নিকোলাস আগে থেকেই গাড়ি নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে। মেহেক না চাইতেও গাড়িতে যেয়ে বসে। নিকোলাস মুচকি হেসে গাড়ি ড্রাইভ করে বাসায় আসে।

মেহেক সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে নিলেই নিকোলাস পিছু ডাকে।

- তোমার জন্য একটা গিফট আছে। তোমার রুমের আলমারির ৩ নম্বর ড্রয়ারে আছে তা। দেখো ত পছন্দ হয় কিনা!!

মেহেক অবাক হলো। কি এমন গিফট দিল নিকোলাস মেহেককে? মেহেক মাথা নাড়িয়ে উপরে চলে গেল। আগে ফ্রেশ হলো। তারপর যেয়ে ড্রয়ার খুললো। বিশাল বড় একটা প্যাকেট। মেহেক প্যাকেট উঠাতে যেয়ে বুঝলো ওজন অনেক। তাও খাটে এনে রাখল প্যাকেটটা। তারপর খুললো। মেহেকের ত অবাকে চোখ গোল গোল হয়ে আছে।

গিটার!!! তাও একটা না দুটো না পাচ পাচটা গিটার!! মেহেক হাতে নিয়ে গিটার গুলো দেখতে লাগলো। একেকটা গিটার একেক ব্র‍্যান্ডের। মেহেকের খুব সখ ছিল গিটারের। সে তার বাবা হুমায়ন খানকে বলত। কিন্তু তিনি এসব গান বাজনা পছন্দ করতেন না। তাইতো কখনোই গিটার কিনা হয় নি মেহেকের৷ মেহেকের মুখে হাসি ফুটে উঠল। যেই আবদার তার বাবা পুরণ করেন নি সেটা তার স্বামী পুরণ করেছে। ওয়েট! স্বামী?? না না সে স্বামী কম আসামি বেশি!...

নিকোলাস দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মেহেকের চোখ যায় নিকোলাসের দিকে। মেহেক খাট থেকে নেমে নিকোলাসের সামনে যেয়ে দাঁড়ায়।

- ধন্যবাদ। তবে এতগুলো গিটারের প্রয়োজন ছিল না।

- একেকটাতে একেকরকম এর সুর তুলবে। আর ধন্যবাদ না দিয়ে চাইলে একটা গান গেয়ে শুনাতে পারো!!

- জ্বী শুনাব তবে এখন না।

- আমিও এখন শুনতে চাইছি না। পরশু একটা বিশেষ দিন আছে। আমি চাই সেদিন তুমি আমায় গান গেয়ে শুনাবে।

মেহেক কিছু না বলে মাথা নাড়ায় শুধু। নিকোলাস তাকিয়ে আছে মেহেকের দিকে৷ পরনে কালো ট্রাওজার আর সাদা টিশার্ট৷ দু হাত পকেটে।

- মুখে বলতে পারো না?! মাথা নাড়িয়ে কি বুঝাতে চাও তুমি বোবা?

মেহেক এবার মুখ খুললো।

- না তা নয়। তবে আপনার সামনে আসলেই আমার সব কথা ফুরিয়ে যায় মিস্টার নিকোলাস অলদ্রিন।

নিকোলাস ঢোক গিলে অশান্ত মনকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টা চালায়।

- মিস্ট্রেস তুমি কেন বুঝো না তোমার এই মৌনতা যেন এক ধারালো তলোয়ার, যা প্রতি মুহূর্তে আমার হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে। তার চেয়ে বরং আমায় দগ্ধ করো তোমার তপ্ত কথার আগুণে, তাও অন্তত জানব আমি তোমার ভাবনায় আছি সবসময়।

মেহেক চুপ থাকে। নিকোলাস আবার বলতে শুরু করে - যদি পারতাম, তোমার ঠোঁটের ওই নীরবতাকে চুরি করে সেখানে একগুচ্ছ হাসির আল্পনা এঁকে দিতাম। তোমার চুপ থাকাটা যে আমার বেঁচে থাকার স্পন্দনকে থামিয়ে দেয় মিস্ট্রেস।

- তাহলে পুরো পৃথিবীটাও চুপ হয়ে যাক? কারণ আপনার স্পন্দন থেমে গেলে ত পৃথিবী থেকে আপনি নিশ্চিন্ন হয়ে যাবেন।

- এত সহজে তোমার মুক্তি মিলছে না মিস্ট্রেস বরং পুরো পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে যাক তাতে আমার ক্ষতি নেই, শুধু তুমি কথা বলো। তোমার কণ্ঠস্বর আমার অন্ধকার ঘরে জোছনার মতো আছড়ে পড়ুক। শুধু এটাই চাওয়া। আমি কি বেশি চেয়ে ফেলছি???

মেহেক কথার উত্তর দিল না। সে যেন আজ এক নিরব যুদ্ধে নেমেছে। যেই যুদ্ধে কথা না বলেই নিকোলাসকে ঘায়েল করার পসরা সাজানো হচ্ছে।

নিকোলাস তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে।

- মিস্ট্রেস ​তোমার চুপ থাকাটা দিন দিন বড্ড বেশি দামী হয়ে যাচ্ছে, আমি আমার সমস্ত শব্দ দিয়েও তা কিনতে পারছি না। একবার বলো তো, ঠিক কতটুকু ভালোবাসলে এই পাথর ভাঙা যাবে??

- তার উত্তরও জানা নেই।

মেহেকের সোজা কথা। নিকোলাস হার মানলো। পাথরের যদি কোনো একটা মন থাকতো সেটাও হয়ত গলে যেত নিকোলাসের ভালবাসায়। কিন্তু এই মেয়ে গলার নয়। নিকোলাস চলে যেতে নিয়েও আবার দাঁড়ায়৷

- পরশু সন্ধ্যায় রেডি থেকো আমার সঙ্গে যেতে হবে এক জায়গায়। আগেই বলে রাখছি কারণ আমি আজ রাতে বাসায় নাও ফিরতে পারি সেইজন্য।

- কোথায়? আর রাতে ফিরবেন না কেন??

মেহেকের প্রশ্নে নিকোলাস উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। পকেটে হাত রেখেই চলে গেল। মেহেক তার যাওয়ার পানেই তাকিয়ে রইল।

চলবে,,

( সুন্দর মন্তব্য করবেন।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন