🚫এইটা কোনো উপন্যাস নয়। সাধারণ ফিকশনাল গল্প এটা। যারা পসেসিভ,, বেপরোয়া,, সাইকো টাইপ নায়ক পছন্দ করেন তাদের জন্য এই গল্প🚫
সাইকো রোমান্টিক থ্রিলার জনরা।
#হিয়া_জ্বলে_পিয়ার_দরদে
#নুসরাত_জাহান_ইভা
#পর্ব_২৭
ক্যাফের ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ দুটো অবহেলায় পড়ে আছে। বাইরের ঝুম বৃষ্টি আর ক্যাফের মৃদু জ্যাজ মিউজিকও মেহেকের ভেতরের অস্থিরতা কমাতে পারছে না। সে শূন্য চোখে জানলার বাইরে তাকিয়ে আছে, আর রায়হান নিবিষ্ট মনে লক্ষ্য করছে মেহেকের প্রতিটি সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি।
মেহেক ভাঙা গলায় প্রশ্ন করল,
- নিকোলাস কেন এত সাইকো, রায়হান? কেন বেছে বেছে শুধু বারবণিতাদেরই সে এভাবে শেষ করে দিচ্ছে?
রায়হান একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। তারপর শান্ত স্বরে উত্তর দিল
- নিকোলাস খুব ধূর্ত, মেহেক। সে আমাদের চেয়ে সবসময় এক ধাপ এগিয়ে থাকে। তার কাছে সমাজটা একটা ক্যানভাস, আর এই মেয়েগুলো শুধু রঙের ছিটেফোঁটা মাত্র।
মেহেক কিছুক্ষণ থামলো। তারপর হঠাৎই প্রশ্ন করল - কিন্তু উনি লা*শগুলো সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয় কেন?
মেহেকের কণ্ঠে আতঙ্ক দেখে রায়হান এবার একটু ঝুঁকে এল। তার চোখে এক অদ্ভুত শীতলতা। রায়হান ফিসফিস করে বলল,
- নিকোলাস তার ভিক্টিমদের মাটিতে পুতে ফেলে সবসময় ।
মেহেক ভ্রু কুঞ্চিত করলে রায়হান আবার বলতে শুরু করে
- আসলে ওই লা*শগুলো আমি মাটি খুঁড়ে বের করে এনে সমুদ্রের পাড়ে রেখেছি। যাতে পুলিশের নজরে আসে, যাতে এই বীভৎসতা ঢাকা পড়ে না থাকে। আমি চাই নিকোলাসের সর্বোচ্চ সাজা হোক।
মেহেক স্তব্ধ হয়ে গেল। রায়হানের এই দুঃসাহস আর ক্ষিপ্রতা তাকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। রায়হান যে কতটা গভীরে এই খেলা খেলছে, তা মেহেক ধারণাও করতে পারেনি।
কম্পিত কণ্ঠে মেহেক জানতে চাইল,
- তুমি তো জানো উনি কোথায় এসব করে। আমাকে নিয়ে চলো সেখানে।
মেহেকের এহেন কথায় রায়হান অবাক হয়ে তাকালো।
- তুমি সহ্য করতে পারবে না, মেহেক। নিকোলাস যেখানে এসব করে, সেটা নরকের চেয়েও ভয়াবহ। আমি তোমাকে যে ভিডিওটা পাঠিয়েছিলাম, সেখানে নিকোলাসের মুখ দেখা যায়নি বলে তুমি চিনতে পারোনি সেদিন। কিন্তু জায়গাটা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছো!! কতটা ভয়ংকর সেই জায়গাটা?!
মেহেকের মস্তিষ্কে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। সেই অস্পষ্ট ভিডিও, সেই যন্ত্রণার আর্তনাদ আর পেছনের সেই ছায়ামূর্তি! তাহলে ওটা নিকোলাস ছিল! আর ভিডিওটা রায়হান নিজেই তাকে পাঠিয়েছিল সজাগ করার জন্য।
............
মেহেকের জেদের কাছে হার মেনে রায়হান তাকে নিয়ে চলল শহরের সেই পরিত্যক্ত একতলা বাড়িটির দিকে।
দুপুরে মেহেকের জোড়াজুড়িতে রায়হান মেহেককে রাতে তৈরী থাকতে বললে মেহেকও তৈরী হয়ে অপেক্ষা করছিল রায়হানের। তারপর রায়হান আর মেহেক নিকোলাসের পরিত্যক্ত বাড়িটির সামনে আসে।
বৃষ্টির রাতে জায়গাটা যেন আরও বেশি অভিশপ্ত মনে হচ্ছে। লোনা বাতাস আর পচা মাংসের একটা উৎকট গন্ধ চারপাশটা ভারী করে তুলেছে।
ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য।মেহেক যেন জমে গেল সেখানেই। রায়হান আচমকা মেহেককে টান দিয়ে একটা টেবিলের নিচে বসে পরল। সেখান থেকেই মেহেক দেখতে লাগলো সামনের দৃশ্য।
এটি কোনো টর্চার সেল নয়, বরং দেখতে অনেকটা শৈল্পিক স্টুডিওর মতো। চারিদিকে শত শত পুতুল সাজানো। কোনোটার মাথা নেই, কোনোটার হাত উল্টো দিকে মোড়ানো।
ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা কাঠের টুলে বসে আছে নিকোলাস। গায়ে তার রক্তমাখা ধবধবে সাদা এপ্রোন। নিকোলাসের সমস্ত মনোযোগ তার সামনের টেবিলে। সে অত্যন্ত যত্ন সহকারে একটা মানুষের শরীরের চামড়া দিয়ে পুতুলের অবয়ব তৈরি করছে। তার হাত কাঁপছে না, বরং তাতে এক অদ্ভুত কুশলী শিল্পীর ছোঁয়া।
মেহেক দেখল, নিকোলাস পাশ থেকে দুটো কা*টা চোখের মণি তুলে নিল। তারপর সুঁই-সুতো দিয়ে খুব সাবধানে সেগুলো পুতুলের কোটরে বসাতে শুরু করল। মেহেকের মনে হতে লাগল প্রতিটি সেলাই যেন এক একটা আর্তনাদকে গেঁথে ফেলছে। মেহেক চোখ বুলিয়ে আশপাশে তাকালো। প্রতিটা টেবিলেই ক্যামিকেলের বয়াম আর তাতে মানুষের বিভিন্ন দেহাংশ৷
নিকোলাস মৃদু হাসল, যেন নিজের সৃষ্টিতে সে নিজেই মুগ্ধ। মেহেক অনুভব করল তার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। চারদিকের ওই পুতুলগুলোর প্লাস্টিকের চোখগুলো যেন জীবন্ত হয়ে তাকে দেখছে। ভয়ে হিম হয়ে যাওয়া মেহেক শুধু এটুকু বুঝতে পারল নিকোলাস কেবল মানুষ মা*রে না, সে মানুষের মৃত্যু দিয়ে নিজের এক বিভীষিকাময় জগৎ সাজায়।
রায়হান পাশে বসে নির্লিপ্তভাবে দেখছে। মেহেকের মনে হলো, এই পাশবিক দৃশ্যের চেয়েও রায়হানের এই শান্ত থাকাটা বেশি ভীতিজনক লাগছে এখন।
হঠাৎ নিকোলাসের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝতে পারছে তার এই "পবিত্র" শিল্পকর্মে কেউ বিঘ্ন ঘটাতে চাচ্ছে। নিকোলাস চামড়া সেলাই করা বন্ধ করে বিড়বিড় করে কী যেন বলতে লাগল, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। মেহেক শুনার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু হঠাৎ নিকোলাসের নড়াচড়া থেমে গেল।
নিকোলাস ধীরপায়ে হেঁটে সেই টেবিলটার দিকে এগিয়ে এল যেই টেবিলের নিচে মেহেক আর রায়হান বসে ছিল। তার বুটের আওয়াজ মেহেকের হৃদপিণ্ডের স্পন্দনের সাথে পাল্লা দিচ্ছে। হুট করেই নিকোলাস নিচু হয়ে টেবিলের তলায় লুকানো মেহেকের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল মাথা কাত করে। তার চোখ দুটো যেন আগুনের গোলক। শীতল, গম্ভীর গলায় নিকোলাস ফিসফিস করে বলে উঠল
- Cross my heart and hope to die Welcome to my dark side...I found you, my little mistress..
নিকোলসের এহেন স্বরে মেহেকের গলায় কোনো শব্দ ফুটল না যেন। এক তীব্র আতঙ্কে তার শরীর হিম হয়ে গেল, চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এল। তার শেষ মনে আছে নিকোলাসের সেই ধারালো হাসির ঝিলিক।
..…..…..…..…...…...…...…..…..….…
যখন মেহেকের জ্ঞান ফিরল, প্রথম অনুভব করল পিঠের নিচে বরফশীতল স্টিলের ছোঁয়া। তার হাত-পা শক্ত করে বেল্ট দিয়ে বাঁধা। নাকে আসছে কড়া কেমিক্যাল আর কাঁচা র*ক্তের উৎকট গন্ধ। চোখ মেলতেই মেহেক দেখল উপরে ঝুলে থাকা প্রকট হ্যালোজেন বাতি।
মেহেক শুয়ে আছে সেই ভয়ংকর ইলেকট্রিক বেডটিতে, যেখানে বসে নিকোলাস তার বীভৎসতা চালায়। পাশ ফিরতেই মেহেকের কলিজা কেঁপে উঠল। তার ঠিক পাশের চেয়ারেই রায়হানকে শক্ত করে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। রায়হানের কপালে কাটা চিহ্ন, সেখান দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু তার চোখগুলো এখনো নিকোলাসের দিকে স্থির।
মেহেকের চোখ যায় এবার নিকোলাসের দিকে৷ নিকোলাস তখন তার টেবিল থেকে একটা চকচকে স্ক্যাল্পেল হাতে নিয়ে মেহেকের দিকে এগিয়ে আসছে।
নিকোলাস গুনগুন করে গাইছে আর মেহেকের সামনে এগিয়ে আসছে।
মেহেকের বেডের কাছে এসে নিকোলাস ঝুঁকে দাঁড়াল। ছু*রির ডগাটা আলতো করে মেহেকের গালের ওপর বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
-Do you feel the cold steel, Mistress? It’s thirsty for the warmth under your skin. Today, I won’t just make a doll. I will make a masterpiece that lives forever in your pain.
রায়হান দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল
- নিকোলাস! ওকে ছেড়ে দিন। যা শাস্তি দেয়ার আমাকে দিন। আই উইল স্যারেন্ডার্ড। আমি মাথা পেত নিব সব। কিন্তু ভুলেও মেহেকের কিছু করবেন না।
রায়হানের কথায় নিকোলাস শব্দ করে হেসে উঠল। সেই হাসি রুমের প্রতিটি দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। নিকোলাস রায়হানের দিকে তাকিয়ে বলল,
- শাট আপ। একদম মুখ খুলবি না। মেহেক কেবল আমার মিস্ট্রেসই নয় ও আমার আত্মার অংশ। তুই তো একটা উচ্ছিষ্ট, যে মাঝখানে ঢুকে আমাদের এই স্বর্গীয় সম্পর্কটাকে নষ্ট করতে চাইছিস! মনে রাখিস, আমার আর মেহেকের মাঝখানে যে আসবে, তাকে আমি এই পুতুলগুলোর মতোই নির্বাক করে দেব। আজ থেকে এই পৃথিবীতে মেহেকের একটাই পরিচয় সে নিকোলাসের মিস্ট্রেস। তোর মতো তুচ্ছ একটা মানুষের সাথে ওর নাম জড়ানোর সাহসও করবি না আর। সাবধান করে দিচ্ছি, আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলাতে আসলে তোর কলিজাটা আমি এই পুতুলের ভেতরে পুরে দেব!
- নিক থামো তুমি। আমার আর রায়হানের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। সে আমার বন্ধু।
নিকোলাস মেহেকের চালাকি বুঝতে পেরে জোড়ে হাসতে লাগল। হাসতে হাসতেই বলে উঠল
- আমার মিস্ট্রেসের বন্ধুকেও আমি ছাড়বো না যদি সে আমার কলিজার দিকে হাত বাড়ায়!!
মেহেক বুঝতে পারল, সে এখন এমন এক মরণফাঁদে দাঁড়িয়ে আছে যেখান থেকে ফেরার পথ সম্ভবত রক্ত দিয়ে লেখা।
নিকোলাস আবার তাকালো মেহেকের দিকে।তারপর হাতে থাকা ছু*রিটা আরও একটু চেপে ধরল মেহেকের গলার কাছে। মেহেক এবার চোখ বন্ধ করে নিল। চোখের কার্নিশ বেয়ে জল গড়িয়ে পরলেও সে নিরব থাকলো যেন সে এই মুহুর্তে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কিন্তু হঠাৎ এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটে গেল। নিকোলাসের হাত থেকে রক্তমাখা ছু*রিটা মেঝেতে আছড়ে পড়ল। তার চোখের সেই পৈশাচিক উন্মাদনা নিমেষেই মিলিয়ে গিয়ে সেখানে এক অদ্ভুত হাহাকার জেগে উঠল।
নিকোলাস হিংস্রভাবে মেহেকের ওপর ঝুঁকে পড়ল, কিন্তু এবার কা*টার জন্য নয়। মুহুর্তেই মেহেককে পাগলের মতো চুমু খেতে শুরু করল নিকোলাস।
রায়হান চোখ বুজে নিল।
মেহেক হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, তার আর্তচিৎকারে ঘরটা ভারী হয়ে উঠছে। নিকোলাস এক হাত দিয়ে শক্ত করে মেহেকের মুখ চেপে ধরল, যাতে কোনো শব্দ বাইরে না যায়। তার স্পর্শে যতটা না ভালোবাসা ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল এক আদিম অধিকারবোধ। কিছুক্ষণ পর নিকোলাস মুখ সরিয়ে মেহেকের অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে তাকাল। তার নিজের চোখেও তখন জল।
নিকোলাস ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
- Mistress... তুমি ব্যাথা পেয়েছো! আমি... আমি একি করতে যাচ্ছিলাম? আমি মনে হয় সত্যি পাগল হয়ে যাচ্ছি! শীট..
নিকোলাস তড়িৎবেগে বিছানা থেকে দূরে সরে গেল। নিজের বুকের ওপর পাগলের মতো কিল-ঘুষি মারতে মারতে চিৎকার করে বলতে লাগল,
- কেন এখানে আসতে গেলে তুমি? কেন? এই অন্ধকার জগৎটা শুধু আমার। এখানে অন্য কারো প্রবেশ নিষেধ! আমার হৃদয়ের পবিত্র জগতে তোমাকে বসিয়েছিলাম আমি, কিন্তু কেন তুমি সেই সীমানা ছাড়িয়ে আমার এই নরকে পা রাখতে কেন গেলে?
হঠাৎ নিকোলাসের কান্নার সুর বদলে গেল। সে এক ঝটকায় মাথা তুলে পাশে বাঁধা রায়হানের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো আবার লাল হয়ে উঠল। চরম ঘৃণাভরা দুটো গালি দিয়ে নিকোলাস গর্জে উঠল,
- এই শয়তানটা তোমাকে সব বলেছে, তাই না মিস্ট্রেস? এই নরকটা তোমাকে দেখানোর সাহস ও পেল কোত্থেকে?
কথাটা শেষ করেই নিকোলাস সজোরে এক লাথি মারল রায়হানের বুকের ওপর। বাঁধনসহ চেয়ারটা উল্টে গিয়ে রায়হান সশব্দে মেঝেতে পড়ে গেল। রায়হানের মাথাটা আবার শক্ত মেঝেতে লেগে র*ক্ত বের হতে শুরু করল।
মেহেক গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠল, নাআআ! রায়হানকে মেরো না! ওকে ছেড়ে দাও নিক।
নিকোলাস হাহাকার করে হেসে উঠল। সে রায়হানের চুলের মুঠি ধরে মাথাটা টেনে তুলে মেহেকের দিকে তাকাল।
- তুমি ওর জন্য কাঁদছো মিস্ট্রেস? যে তোমাকে আমার এই বীভৎস রূপটা দেখিয়ে তোমার শান্তি কেড়ে নিয়েছে, তার জন্য তোমার এত মায়া? আজ এই ঘরে কেউ বাঁচবে না, হয়তো আমি নিজেও না! তবুও আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব আজ।
কিন্তু নিকোলাস আবার হাটু গেড়ে বসে পরল।
তারপর তার বুকের বাঁ দিকটা খামচে ধরে আর্তনাদ করতে থাকল।
- কেন আমার সেই সাজানো বাগানটা ভেঙে দিলে মিস্ট্রেস? আজ এই নোংরা ঘরে তুমি আমাকে দেখে ফেললে। এখন আমি তোমার চোখে শুধুই এক বিভৎস কসাই, তাই না? এই ঘৃণার ভার আমি বইবো কী করে? আমি তোমাকে ভালোবাসতাম একদম নিজের মতো করে যেখানে কোনো মিথ্যে ছিল না। কিন্তু এখন তোমার চোখে আমার জন্য কেবল ঘৃণা আর ভয়। এই ভয়টা আমাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারছে আজ।
মেহেক কান্নাভেজা চোখে নিকোলাসের এই পাগলামি দেখছিল। মানুষটা কতটা একা আর কতটা বিকারগ্রস্ত হলে একবার পাগলামি করছে ত আরেকবার বিভৎস রুপে ফিরে আসছে।
হঠাৎ নিকোলাস উঠে দাঁড়াল। তার চোখে পানি থাকলেও চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে ধীর পায়ে মেঝেতে পড়ে থাকা রায়হানের দিকে এগিয়ে গেল। রায়হানের কলার চেপে ধরে তাকে টেনে তুলল এবার। রায়হানের মুখ দিয়ে র*ক্ত গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু নিকোলাসের তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
নিকোলাস দাঁত কিড়মিড় করে রায়হানের কানের কাছে মুখ নিয়ে এল। নিকোলাসের কণ্ঠস্বর যেন এখন সাপের মতো হিসহিসে
- তোর সাহস তো কম না! তোকে আমি একবার ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম না? বলেছিলাম না এখান থেকে অনেক দূরে চলে যেতে? বলেছিলাম না আমাদের মাঝখানে আসিস না? তারপরও তোর সাহস হলো কী করে মিস্ট্রেসকে এখানে নিয়ে আসার? তুই জানতিস এটা ঘটলে কী হবে, তবুও তুই ওকে এই নরকে টেনে আনলি!
নিকোলাস রায়হানের মাথায় তার হাতের স্ক্যাল্পেলটা চেপে ধরল।
- তুই ওকে বাঁচানোর হিরো হতে চেয়েছিলি, তাই না? কিন্তু তুই আসলে ওর পৃথিবীটাকেই ধ্বংস করে দিলি। আজ থেকে ওর স্বপ্নে আর কোনো রূপকথা থাকবে না, থাকবে শুধু আমার এই রক্তমাখা হাত আর এই পুতুলগুলো। আর আমার মেহেককে এতটা কঠিন বানানোর অপরাধের শাস্তি তুই নিতে পারবি তো?
মেহেক চিৎকার করে উঠল, কিন্তু নিকোলাসের উন্মাদনা তখন আকাশচুম্বী। সে যেন রায়হানের রক্ত দিয়ে নিজের অপমানের প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে আজ।
নিকোলাস রায়হানের কলার ছেড়ে দিয়ে আবার সেই আধো-আলো ছায়ার ঘরে পায়চারি করতে লাগল। তার চোখ তখন দেয়ালে সাজানো পুতুলগুলোর ওপর স্থির। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
- তুমি কি জানো মিস্ট্রেস, এই শহরটা রাতে কতটা দুর্গন্ধময় হয়ে ওঠে? চারদিকে শুধু পাপ আর নোংরামি। বিশেষ করে এই মেয়েগুলো যারা নিজেদের শরীর বিলিয়ে দিয়ে সমাজটাকে একটা ডাস্টবিন বানিয়ে ফেলেছে। তারা তো মানুষ নয়, তারা হলো জ্যান্ত আবর্জনা।
নিকোলাস এবার একটা পুতুলের গালে হাত বুলিয়ে নিজের কাছে আনল।
- আমি যখন ওদের প্রাণ কেড়ে নেই, তখন আসলে আমি ওদের মুক্তি দেই। ওদের সেই অপবিত্র র*ক্ত ঝরিয়ে দিয়ে আমি যখন চামড়াগুলো দিয়ে এই পুতুল বানাই, তখন ওরা পবিত্র হয়। দেখেছো, এই পুতুলগুলো কত শান্ত, কত নিষ্পাপ? এদের কোনো চাহিদা নেই, এরা কাউকে ধোঁকা দেয় না। আমি আসলে এক একটা আবর্জনাকে শিল্পে রূপান্তর করি। এই পচনশীল সমাজকে আমি শুদ্ধ করছি, মিস্ট্রেস! আর এটাই কি আমার অপরাধ??
নিকোলাসের কণ্ঠে এক অদ্ভুত উন্মাদনা। তার কাছে এই বীভৎস হত্যাকাণ্ড কোনো অপরাধ নয়, বরং এক পবিত্র ধর্মযুদ্ধ। নিকোলাস মনে করে, সে একজন মহান শিল্পী যে নরকের উপাদান দিয়ে স্বর্গীয় পুতুল তৈরি করছে।
নিকোলাস এবার হুট করে মেহেকের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে তখন এক ঘোরগ্রস্ত দৃষ্টি।
- কিন্তু তুমি? তুমি তো আমার দেবী ছিলে মিস্ট্রেস!! তোমাকে কেন এই নোংরা পৃথিবীর সত্য দেখতে হলো? আমার এই পবিত্র গ্যালারিতে তোমার চোখের জল পড়ার কথা ছিল না। ওই রায়হান ওই কীটপতঙ্গটাই সব শেষ করে দিল আজ।
নিকোলাসের এই যুক্তিহীন এবং বিকৃত 'শুদ্ধি অভিযান' এর কথা শুনে মেহেকের মেরুদণ্ড দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। মেহেক বুঝতে পারল, নিকোলাস শুধু একজন খুনিই নয় বরং সে তার নিজের তৈরি করা এক বিভীষিকাময় আদর্শের দাস, যে আদর্শে মৃত্যু মানেই মুক্তি আর বিকৃতি মানেই সৌন্দর্য।
মেহেক এবার তাকালো নিকোলাসের দিকে।
- এইসব করে নিজেকে তুমি শিল্পী দাবী করছো নিক??
নিকোলাস স্থির হয়ে গেল। তার ঠোঁটের কোণে আবার সেই রহস্যময় হাসিটা ফিরে এল। সে ফিসফিস করে বলল,
- ভালো আর খারাপের মধ্যে পার্থক্য খুব সামান্য, মিস্ট্রেস। দুজনেই এক পথের পথিক। একজন আলো দেখায় ত অন্যজন অন্ধকার। আমি না হয় একজন খারাপ শিল্পীই হলাম। একজনের প্রাণ কেড়ে নিয়ে আবার নতুন করে সৃষ্টি করলাম!!
চলবে,,