ফন্ট সাইজ:
থিম:
হিয়া জ্বলে পিয়ার দরদে

২৮তম পর্ব

লেখক: নুসরাত জাহান ইভা

🚫এইটা কোনো উপন্যাস নয়। সাধারণ ফিকশনাল গল্প। যারা উগ্র বেপরোয়া সাইকো টাইপ নায়ক পছন্দ করেন এই গল্পটা শুধু তাদের জন্য।

সাইকো রোমান্টিক থ্রিলার জনরা।

#হিয়া_জ্বলে_পিয়ার_দরদে

#নুসরাত_জাহান_ইভা

#পর্ব_২৮

রায়হানের গলার কাছে যখন ধারালো ছু*রিটা মরণপণ আক্রোশে ধেয়ে আসছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে এক জোড়া হাত বিদ্যুদ্বেগে সেটাকে আটকে দিল। থমকে গেল সময়। নিকোলাস তাকালো সেদিকে। নিলয়!!

​মেহেকের চোখের জল টপটপ করে পড়ছিল, সেই আর্তনাদ গলাতেই আটকে গেল। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির দিকে তাকিয়ে তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল।

​- নি নিলয় ভাইয়া? তুমি তুমি এখানে?

​নিলয় কোনো উত্তর দিল না। তার শীতল শান্ত চোখ দুটো নিকোলাসের দিকে নিবদ্ধ। সে নিকোলাসের হাত থেকে ছুরিটা সরিয়ে নিতে নিতে নিচু স্বরে বলল,

- শান্ত হ নিক। এখন মাথা গরমের সময় নয় এই মুহূর্তে এখানে কোনো লাশ পড়লে পুলিশ খুব সহজেই সূত্র পেয়ে যাবে। আমাদের সব পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। সামান্য একটা ছেলের জন্য নিশ্চয়ই এসব চাইবি না!!..

​নিলয়ের কণ্ঠের সেই পেশাদারিত্ব আর নিস্পৃহতা মেহেকের বুকে তীরের মতো বিঁধল। এতক্ষণে তার কাছে সব পরিষ্কার। যে মানুষটাকে মেহেক নিজের পরম আশ্রয় ভেবেছিল, সেই নিলয় আজ নিকোলাসের ছায়াসঙ্গী!

​- শেষ পর্যন্ত তুমিও ছিলে ভাইয়া? তুমিও এই নোংরামি এই বিভৎসতার ভাগিদার?

মেহেকের কণ্ঠে ঝরে পড়া ঘৃণা যেন বিষের মতো নীল হয়ে উঠল।

​নিলয় নিরুত্তর। নিলয় ঝুঁকে এসে মেহেকের হাতের বাঁধনগুলো একে একে খুলে দিতে লাগল। তার আঙুলগুলো ছিল বরফের মতো ঠান্ডা। মেহেক অসহ্য যন্ত্রণায় মুখ ফিরিয়ে নিল, যেন নিলয়ের ছোঁয়াও তাকে অপবিত্র করে দিচ্ছে।

​বাঁধন আলগা হতেই মেহেক বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। নিলয়ের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরে মেহেক চিৎকার করে উঠল

- বলো আমাকে ভাইয়া বলো এ সব কিছু মিথ্যা!! মিথ্যা জেনেও আমি তা মেনে নিব।

নিলয় নিরুত্তর। মেহেক রাগে কাপতে লাগল। মেহেক এবার নিলয়ের গালে সপাটে একটা চড় বসিয়ে দিল। নিলয় চোখ খিচে চুপ করেই রইল।

- সব জেনেও কী করে পারলে? এই অমানুষটার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করার সময় তোমার হাত কাঁপল না? তোমার বিবেক একবারও বাধা দিল না? কেন করলে আমার সাথে এরকমটা!! খুব ত ভাল ছিলাম আমি আমার জীবনে। কেন টেনে এনে নরকে দাড় করালে ভাইয়া!!

​নিলয় এবার মেহেকের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো অনুশোচনা নেই, আছে এক অদ্ভুত স্থিরতা। নিলয় ধীরস্বরে বলল

- মেহেক, নিক দুনিয়ার কাছে অমানুষ হতে পারে, কিন্তু তোর কাছে সে শুধুই একজন প্রেমিক। তার অন্ধকার দিকটা সবার জন্য, তোর জন্য শুধু ওর আলোটুকু বরাদ্দ। তুই শুধু সেই দিকটাই দেখ। তুই শুধু নিককে ভালবেসে যা তাহলে দেখবি নরকে নয় সে তোকে স্বর্গে ঘুরিয়ে আনবে।

​- চুপ করো! একদম চুপ করো!

মেহেক পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল।

- বড় বড় আদর্শের কথা বলে নিজের পাপ ঢাকতে চেয়ো না। তুমি একটা প্রতারক, বাটপার! কাকাজানকে ঠকাচ্ছো তুমি।

​মেহেক পাগলের মতো হাত-পা ছুড়তে লাগল, নিজের চারপাশের এই বীভৎস মায়া থেকে মুক্তি পেতে চাইল। তার কান্নার শব্দে ঘরের দেয়ালগুলোও যেন গুমরে উঠছিল, কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুই পাথরমানবের হৃদয়ে তার কোনো রেশ পৌঁছাল না। মেহেক আজ এমন এক খাঁচায় বন্দি, যার চাবিকাঠি তার সবচাইতে কাছের মানুষ গুলোর হাতেই।

নিলয়ের ওপর থেকে মেহেকের আজ শেষ শ্রদ্ধাবোধটুকুও কর্পূরের মতো উড়ে গেল। চারপাশের দেয়ালগুলো যেন বিদ্রূপ করছে তাকে। ভালোবাসা আর বিশ্বাসের এমন বীভৎস বলিদান মেহেক আগে কখনো দেখেনি। নিলয় আর নিকোলাস দুজনেই এখন মেহেকের কাছে এক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

নিলয় এবার নিচু হয়ে রায়হানের পায়ের বাঁধনগুলোও আলগা করে দিল। মেহেক তখনো অপমানে ফুঁসছে, আরও কিছু তীব্র বাক্যবাণ নিলয়ের দিকে ছুড়ে দিতে যাচ্ছিল সে কিন্তু ঠিক তখনই তার দৃষ্টি স্থির হলো রায়হানের ওপর। রায়হান কোনো কথা বলল না, শুধু এক পলক তাকিয়ে মাথা নেড়ে ইশারায় মেহেককে চুপ থাকতে বলল। সেই নিঃশব্দ অনুরোধে মেহেক যেন পাথরের মতো জমে গেল। মেহেক বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করে নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরিটাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করল।

​নিলয় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিকোলাসের দিকে তাকালো। রায়হান ঠিকমতো দাড়াতেও পারছে না।

- নিকোলাস, তুই মেহুকে নিয়ে এখনই এখান থেকে বেরিয়ে যা। আমি রায়হানকে বাইরে দিয়ে আসছি।

নিলয়ের এহেন কথায় ​নিকোলাস এক ঝটকায় ঘুরে তাকাল। তার চোখে তখন খুনি আর উন্মাদের এক মিশেল প্রতিচ্ছবি। দাঁতে দাঁত চেপে সে গর্জে উঠল এইবার

​- বাইরে মানে? একে বাইরে নয় নিলয়, একে নরকের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়ে আয়। মনে রাখিস, এই রায়হান যদি কালকের সূর্য দেখে, তবে আমি তোকেই জ্যান্ত কবরে পাঠিয়ে দেব ইডিয়ট। ভুলেও আমার বিরুদ্ধাচারণ করার চেষ্টা করিস না।

​বলেই রাগে গজ গজ করতে লাগল নিকোলাস। তারপর মেহেকের কোনো আপত্তির তোয়াক্কা না করে তাকে হিড়হিড় করে টেনে নিজের কোলে তুলে নিল। রায়হান তা দেখে আবারও চোখ বন্ধ করে ব্যাথা গিলে খেল।

মেহেক এবার আর চিৎকার করল না, কোনো বাধাও দিল না। বরং সুযোগ বুঝে মেঝেতে পড়ে থাকা ছোট একটি ছু*রি সন্তর্পণে তুলে নিয়ে নিজের বুকের কাছে লুকিয়ে ধরল।

মেহেকের মনে এখন একটাই চিন্তা নিকোলাস যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে, তবে আজ সে হয় নিজেকে নাহয় নিকোলাসকে শেষ করে দেবে।

​নিকোলাস যখন মেহেককে নিয়ে দরজার দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই মেহেকের কানে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে নিকোলাস বলে উঠল

​- আমার মিস্ট্রেস দেখি লুকোচুরি খেলছে! আমার কোলে শুয়ে আমারই বুকে ছু*রি চালানোর মতো বোকামি ভুলেও করবে না জান। মনে রেখো, তোমার এই একটা তুচ্ছ বোকামি রায়হানের জন্য যমদূত হয়ে দেখা দেবে। তুমি নিজেকে বা আমাকে আঘাত করলে, আমি রায়হানের কলিজাটা উপড়ে নিতে এক সেকেন্ডও ভাবব না।

​নিকোলাসের বরফশীতল কণ্ঠের সেই হুমকি মেহেকের মেরুদণ্ড দিয়ে এক হিমস্রোত বইয়ে দিল। রায়হানের জীবনের ভয়ে মেহেকের হাত দুটো অবশ হয়ে এল। মুহূর্তেই হাতের সেই গোপন অস্ত্রটা ঝনঝন শব্দ করে মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল।

​নিকোলাস তা দেখে তৃপ্তির হাসি হাসে। মেহেকের কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে গাঢ় স্বরে বলল,

- দ্যাটস মাই গার্ল! লক্ষ্মী হয়ে থাকলে পৃথিবীটা তোমার পায়ের নিচে এনে দেব, আর অবাধ্য হলে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেব।

মেহেক চুপচাপ সব সহ্য করে যাচ্ছে। ​অসহায় মেহেককে বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরে নিকোলাস অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল। পেছনে পড়ে রইল এক বুক হাহাকার আর বিশ্বাসঘাতকতার নিথর নীরবতা।

...…...…....…....…....…

কয়েকটা দিন পার হয়ে গেল। দিনগুলো যেন কাটে না, স্রেফ বিষাদের চাদর মুড়ি দিয়ে এক জায়গায় স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মেহেক জানালার ধারের বিছানায় নিথর হয়ে শুয়ে আছে। বাইরের আকাশটা নীল হলেও তার জীবনের আকাশটা নিকষ কালো বিশ্বাসঘাতকতায় ঢাকা। নিলয় আর নিকোলাসের বিশ্বাসঘাতকতায় মেহেক এখন মানসিকভাবে এক চরম ক্লান্তির শিখরে।

​ঠিক তখনই নীরবতা ভেঙে ওর মোবাইলট শব্দ করে বেজে উঠল। স্ক্রিনে একটা অচেনা নম্বর, কিন্তু বুকটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল তার। কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল পরিচিত সেই কণ্ঠস্বর। রায়হান!

​- মেহেক, আমার কথা খুব মন দিয়ে শোনো। হাতে সময় একদম নেই। কাল মাঝরাতে আটলান্টিকের ওপারে নিকোলাসের ড্রাগসের সবচেয়ে বড় চালানটা যাচ্ছে। কয়েকশো কোটি টাকার কারবার। এই সাপ্লাইটা যদি একবার পুলিশকে দিয়ে ভেস্তে দেওয়া যায়, তবে নিকোলাসের সাম্রাজ্যের ভিত কিছুটা হলেও নড়ে উঠবে। ওকে চিরতরে খতম করার এটাই আমাদের শেষ সুযোগ।

​মেহেকের হৃদপিণ্ড দ্রুত হতে শুরু করল। এতদিন যে প্রতিশোধের আগুনটা সে বুকের ভেতরে পুষে রেখেছিল, আজ যেন তাতে ঘি পড়ল। মেহেক কাঁপা গলায় বলল,

- রায়হান, আমি তোমার সাথে এখনই দেখা করতে চাই। এই নরক থেকে আমি মুক্তি চাই, রায়হান!

​ওপাশ থেকে রায়হান একটু সময় নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ধীর গলায় বলল,

- আমি কিছুটা সুস্থ এখন। হাটতেও সমস্যা হয় না আর। দেখা করা যেতে পারে। তাহলে আজ বিকেলে ব্রিজের নিচের ক্যাফেটায় থেকো। খুব সাবধানে আসবে, নিকোলাসের ছায়াও যেন তোমাকে পিছু না করে। দেখা হচ্ছে তবে।

​ফোনটা কেটে যাওয়ার পরও মেহেক অনেকক্ষণ হ্যান্ডসেটটা ধরে বসে রইল। তার চোখের কোণে এখন আর জল নেই, সেখানে এখন জ্বলছে নিকোলাসকে ধ্বংস করার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা। মেহেক জানে, সে একটা ভয়ানক আগুনের সাথে খেলতে যাচ্ছে। কিন্তু রায়হানের ওই একটা ফোন কল মেহেক কে নতুন করে লড়াই করার শক্তি জুগিয়েছে।

​বিকেলের সূর্যটা তখন লাল হয়ে পশ্চিম আকাশে ডুব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মেহেক আলমারি থেকে একটা কালো ওড়না বের করে ভালো করে মুখটা জড়িয়ে নিল।

- নিকোলাস, তোমার সাম্রাজ্যের পতন এবার আমার হাতেই শুরু হবে।

মেহেকে বলেই আর এক সেকেন্ডও সময় নিল না। মেহেক রুম থেকে বের হতেই হঠাৎ শব্দ করে নিকোলাস তার ল্যাপটপটা বন্ধ করে ফেলল।

- ফাক অফ!! জান ও জান আর কত হিংস্র হতে বাধ্য করবে আমায়??

নিকোলাস চেয়ারে মাথা হেলান দিয়ে বসে বিড়বিড় করতে লাগল। এক পর্যায়ে কপাল কুচকে চোখ বন্ধ করে চুলে হাত বুলাতে লাগল নিকোলাস।

ক্যাফের এক কোণে টিমটিমে আলোয় বসে ছিল মেহেক আর রায়হান। চারপাশের মৃদু গুঞ্জন ছাপিয়ে রায়হানের অস্থিরতা যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। সামনে রাখা কফির কাপটা শীতল হয়ে গেছে অনেক আগেই। মেহেক অত্যন্ত সতর্ক ভঙ্গিতে নিকোলাসের আগামীকালের ড্রাগ পাচারের রুট আর সময় নিয়ে আলোচনা করছিল। কিন্তু রায়হানের মনোযোগ সেখানে ছিল না। তার জ্বলন্ত দৃষ্টি স্থির হয়ে ছিল মেহেকের শান্ত মুখশ্রীর ওপর।

​হঠাৎ করেই কোনো সতর্কতা ছাড়াই রায়হান টেবিলের ওপর দিয়ে বাড়িয়ে মেহেকের হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। মেহেক চমকে উঠে হাত সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু রায়হানের আঙুলের বাঁধন ছিল ইস্পাতের মতো শক্ত। তার চোখের মণি তখন এক উন্মাদ প্রেমিকের মতো কাঁপছে।

​- মেহেক, একটা কথা সত্যি করে বলবে?

রায়হানের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ আবেগে কাঁপছিল।

- তুমি কি, তুমি কি নিকোলাসের সাথে একই বিছানায় থাকো?

​মেহেক এক মুহূর্ত চুপ থেকে সরাসরি রায়হানের চোখের দিকে তাকাল। কোনো দ্বিধা বা ভণিতা ছাড়াই শান্ত গলায় উত্তর দিল,

- হ্যা, থাকি।

​জবাবটা যেন তপ্ত শিসের মতো রায়হানের কানে বিঁধল। রায়হান আরও ঝুঁকে এল সামনের দিকে।

- সে কি তোমাকে ছুঁয়েছে, সুহাসিনী? সেই স্পর্শ কি তুমি সহ্য করতে পেরেছো?

​- হ্যা ছুঁয়।

​রায়হান যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। তার ভেতরে এক তীব্র দহন শুরু হয়েছে। সে পাগলের মতো আবারও প্রশ্ন করল,

- তুমি কি তার বুকে মাথা রাখো? তার সান্নিধ্য কি তোমাকে টানে?

​মেহেক এবারও শান্তভাবে বলল,

- রাখি।

​- সে কি তোমাকে আদর-সোহাগও করে?

- রায়হান, সে আমার স্বামী। আমাকে আদর করার কিংবা আমার সান্নিধ্য পাওয়ার সবটুকু হালাল অধিকার তার আছে।

​রায়হানের গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। সে মেহেকের হাতটা আরও জোরে জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করে উঠল,

- তোমাদের মধ্যে কি সবটুকু সম্পর্ক হয়েছে সুহাসিনী? সত্যি করে বলো!

​মেহেক এবার একটু কঠোর হলো।

- বিয়ে হয়েছে যখন, তখন বাকিটুকু আর গোপন রাখার কী আছে? যা হওয়ার তাই হয়েছে।

​রায়হান হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার উন্মাদনা তখন চরমে। সে মেহেকের হাতের ওপর নিজের কপাল ঠেকিয়ে বিড়বিড় করতে লাগল,

- আমার সাথে চলো সুহাসিনী। আমি সব জানি, সব বুঝি। সে তোমাকে ছুঁয়েছে, তোমার পবিত্রতা কলুষিত করেছে জেনেও আমি তোমাকেই চাই। আমি তোমাকেই ভালোবাসব। চলো আমরা এই অন্ধকার জগত থেকে পালিয়ে যাই!

​মেহেকের চোখে তখন কোনো করুণা নেই, বরং এক ধরনের বিতৃষ্ণা খেলা করে গেল। মেহেক এক ঝটকায় নিজের হাতটা রায়হানের কব্জা থেকে ছাড়িয়ে নিল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,

- অতীতের মায়া আর বর্তমানের বাস্তব এক নয়, রায়হান। নিজেকে সামলাও রায়হান।

- আচ্ছা সুহাসিনী সে কি তোমার চোখে চোখ রেখে কথা বলে যেমন করে আমি তোমার চোখে চোখ রাখি??

- নিকোলাস উন্মাদ রায়হান!! কতবার বলব সে আমাকে ভালবাসে পাগলের মত ভালবাসে!!

রায়হান হাসলো একটু। তারপর পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল। মেহেক তা দেখে প্রশ্ন করল

- তুমি কবে থেকে এসব খাও রায়হান!!

- আমার জীবন থেকে যেদিন চলে গেছো তুমি সেদিন থেকেই এই সিগারেটই আমার সঙ্গী।

- ফেলো ওটা তুমি জানো না ধোয়ায় আমার শ্বাসকষ্ট হয়!!

মেহেক হাত বাড়িয়ে নিতে চাইলে রায়হান পিছিয়ে যায়।

- ছাড়তে পারব না। যেই বিরহ তুমি দিয়েছো সেই বিরহ এই সিগারেট আমায় দেয় না। যেই জিনিস বিরহ দেয় না তাকে কিভাবে ছাড়ি!!

- রায়হান!! পাগল হয়ে গেছো তুমি।

পুরো কথা বলার আগেই মেহেক কাশতে লাগল। তা দেখে রায়হান কথা বাড়ালো না। সিগারেট টা মাটিতে ফেলে পায়ে পিষে ফেলল শুধু৷

খানিক নিরবতায় কেটে গেল কিছুক্ষণ। ক্যাফের আবছা আলোয় রায়হানের বিধ্বস্ত চেহারাটা আরও করুণ দেখাচ্ছিল। মেহেক যখন উঠে দাঁড়াল, রায়হান ভেজা চোখে শেষবারের মতো আকুতি জানিয়ে বলল,

- বেহায়ার মত আবারো বলছি সুহাসিনী তুমি কি আমায় আর একটুও চাও না ? আমাদের সেই পুরনো দিনগুলো কি তবে সব মিথ্যে ছিল?

​মেহেক স্থির হয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে এখন আর কোনো দ্বিধা নেই, বরং এক ধরনের কঠোর বাস্তববোধ কাজ করছে। মেহেক রায়হানের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,

- চাই রায়হান, তবে বন্ধু হিসেবে। এর বেশি কিছুর আশা করা এখন অর্থহীন। নিকোলাস আমার স্বামী। সে দুনিয়ার চোখে অমানুষ হতে পারে, হতে পারে চরম পাপী কিন্তু দিনশেষে সে-ই আমার সব। আমি তাকেই ভালোবাসি তাকেই আমার স্বামী বলে মানি।

​একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহেক আবার বলল,

- আমাদের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়ার মতো আর কিছু অবশিষ্ট নেই। বাস্তবটা মেনে নিতে শেখো রায়হান, অতীতকে আঁকড়ে ধরে বর্তমানকে নষ্ট করো না।

​রায়হান হঠাৎ শব্দ করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল কেবল এক বুক হাহাকার আর উন্মাদনা।

হাসতে হাসতেই বলল,

- তুমি দেখে নিও সুহাসিনী, একদিন ঠিকই আমি তোমার হৃদয়ে জায়গা করে নেব। তোমার ওই দেয়াল আমি ভাঙবই।

​মেহেক এবার তাচ্ছিল্যের সুরে উত্তর দিল,

- বেঁচে থাকতে সেটা আর সম্ভব নয় রায়হান। আমার হৃদয়ের প্রতিটি কোণে ওই কলুষিত মানুষটাই শিকড় গেড়ে বসে আছে। সেখানে অন্য কারো প্রবেশাধিকার নেই।

​রায়হানের ঠোঁটের কোণে এবার এক বিষণ্ণ আর রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে চেয়ারে হেলান দিয়ে মেহেকের চোখের দিকে তাকিয়ে গভীর কণ্ঠে বলল

​- বেঁচে থেকে যদি তোমার হৃদয়ে ঠাঁই না পাই, তবে ম*রে গিয়ে হলেও জায়গা করে নেব সুহাসিনী। আমার র*ক্ত দিয়ে হলেও তোমার ওই ভালোবাসার সিংহাসনে আমি ভাগ বসাবই বসাব। সেদিন তুমি চাইলেও আমায় আর অস্বীকার করতে পারবে না।

​কথাগুলো রায়হানের ভেতর থেকে যেন এক দীর্ঘশ্বাসের মতো বেরিয়ে এল। মেহেক শিউরে উঠলেও তা প্রকাশ করল না। ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও শেষবার পিছু ফিরে তাকাল।

​- তাহলে কালকের পরিকল্পনা অনুযায়ী ঠিক সময়ে দেখা হচ্ছে আমাদের। তৈরী থেকো।

মেহেক বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। ​রায়হান আর কোনো কথা বলল না, শুধু নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সায় দিল।

রায়হানের উত্তর পাওয়ার পর মুহুর্তেই রায়হানকে ক্যাফের সেই ধোঁয়াটে অন্ধকারে ফেলে রেখে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল মেহেক। তার ছায়াটা ক্রমশ দীর্ঘ হতে হতে রাস্তার ভিড়ে মিশে গেল।

চলবে,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন