🚫যারা উগ্র বেপরোয়া সাইকো টাইপ নায়ক পছন্দ করেন তাদের জন্য এই গল্প।
সাইকো রোমান্টিক থ্রিলার জনরা।
#হিয়া_জ্বলে_পিয়ার_দরদে
#নুসরাত_জাহান_ইভা
#পর্ব_৩১
নিকোলাস আজ বাড়িতে নেই। ইতালি গেছে। উদ্দেশ্য - ইতালির মাফিয়া ডনদের সাথে ক্যাসিনোতে বসবে আজ। ক্ষমতার দম্ভ আর রক্তের নেশা নিকোলাসকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে যেন নিয়ে নিচ্ছে অন্ধকারে। কিন্তু নিকোলাস সেটাকেই আলো ভেবে ছুটতে চাইছে।
নিকোলাস বাড়িতে না থাকায় মেহেক যেন স্বস্তির নিশ্বাস নিল।কিন্তু সকাল থেকেই মেহেকের শরীরটা ভাল লাগছিল না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে দিনটা পার করল মেহেক। বমিভাব আর তীব্র শারীরিক অস্বস্তি তাকে কাহিল করে দিলেও, মনের ভেতরের ঝড়টা ছিল আরও প্রকট।
মাঝে মাঝেই জানলার বাইরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে মেহেক বিড়বিড় করছিল। যেন দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোনো এক মোহগ্রস্ত পাগল, কিন্তু তার হাতের আঙুলগুলো যখন নিজের পেটের ওপর আলতো করে বুলিয়ে নিচ্ছিল, তখন সেই স্পর্শে ছিল এক করুণ প্রতিজ্ঞা। বিষাদ আর প্রতিশোধের নেশা তখন মেহেকের চোখের মণি দুটোকে স্থির করে দিয়েছে।
সন্ধ্যার আবছায়া যখন গাঢ় হলো, রায়হানের ফোনের একটি মাত্র সিগন্যালে মেহেকের জড়তা নিমেষেই কেটে গেল। মেহেক যেন এক জাদুমন্ত্রে পুনর্জীবিত এক শিকারী হয়ে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে শেষবারের মতো দেখল মেহেক। টাইট জিন্স আর লং কোটের নিচে ঢাকা পড়ে গেল তার দুর্বলতা। সতর্কতার সাথে দুটো ধারালো ছুরি গুঁজে নিল পিঠের আড়ালে। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহেক বিড়বিড় করল
- আজই শেষ রাত নিক।
রাত তখন ১০টা। অন্ধকার গলি আর রহস্যময় নীরবতা ভেদ করে রায়হান আর মেহেক এসে দাঁড়াল নিকোলাসের সেই কুখ্যাত ত্রাসের ঘরে। যে ঘরে রাখা আছে শত শত মানুষের ভাগ্য ছিনিয়ে নেওয়া জাল পাসপোর্ট, পাচার হওয়া অবৈধ মুদ্রার পাহাড় আর মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তারের সব নথিপত্র। আজ তারা এখানে এসেছে সবকিছু ভস্মীভূত করতে।
রায়হান আজ অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিল। নিলয়ের সিকিউরিটি আইডি হ্যাক করে রায়হান সমস্ত গার্ডদের বিভ্রান্ত করে পাঠিয়ে দিয়েছে শহরের অন্য প্রান্তে। মেহেক প্রতিটি কোণ পর্যবেক্ষণ করছিল, ক্যামেরার ফ্লাশে বন্দি করছিল নিকোলাসের সাম্রাজ্য পতনের সব অকাট্য প্রমাণ।
মেহেক আর রায়হান যখন প্রমাণের কাজ শেষ করে আগুনের লেলিহান শিখা জ্বালানোর উপক্রম করল, ঠিক তখনই অমানিশার আঁধার চিরে ধেয়ে এল এক বজ্রপাত। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি ভারি লোহার রডের আঘাতে রায়হানের গোড়ালি চূর্ণ হয়ে গেল। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে মুখ থুবড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল রায়হান।
মেহেক চমকে পেছনে ফিরতেই দেখল
নিলয়!
যার শান্ত চোখের গভীরে আজ নরকের আগুন জ্বলছে। নিলয় হাত থেকে রক্তমাখা রডটি ছাড়ল না, বরং প্রতিশোধের নেশায় সে আরও একবার আঘাত করল অক্ষম রায়হানকে।
- গদ্দারির সাজা জানিস তো রায়হান?
নিলয়ের কণ্ঠস্বর ছিল পাথরের মতো শক্ত।
মেহেক চিৎকার করে উঠল,
- ভাইয়া! না!
কিন্তু তার কণ্ঠস্বর পূর্ণতা পাওয়ার আগেই নিলয় এক ঝটকায় মেহেকের চুলের মুঠি ধরে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। তার চোখের বিষ আর অশ্লীল গালিগালাজ যেন বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধছিল মেহেকের গায়ে। নিকোলাসের অবর্তমানে তার তাসের ঘর আগলাতে এই নরপিশাচ যে এখানেই ওত পেতে ছিল, তা মেহেক আর রায়হান কল্পনাও করতে পারেনি।
মেহেক নিজেকে ছাড়াতে চাচ্ছে। যন্ত্রণায় মেহেকের মুখ নীল হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু নিলয়ের চোখের মণি দুটো উন্মত্ততায় বড় বড় হয়ে উঠেছে। মেহেকের চুলের মুঠি আরও শক্ত করে ধরে নিলয় চিৎকার করে বলতে লাগল,
- তুই আমার বোন না মেহেক, তুই আমার পথের কাঁটা! বোন হলে কি কেউ ভাইয়ের সাজানো বাগান এভাবে তছনছ করে? ছোটলোক মেয়ে একটা, এত ঢং কিসের তোর? শেষমেশ এই অপদার্থ রায়হানকে নিয়ে আমার সাম্রাজ্যে আগুন দিতে এলি? কুত্তার বাচ্চা আজ তোকে শেষ করে দিব আমি।
মেহেক নিজের অজান্তেই নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বলে ফেলল
- ভাইয়া!! তুমি সত্যিই আমার ভাই ত!!
নিলয় অট্টহাসি দিয়ে আবার বলতে থাকে
- নাহ আমি তোর ভাই না। আর টাকার মাঝখানে রক্তের কোনো সম্পর্ক আমি বরদাস্ত করি না। শুন নিক তোর জন্য পাগল, আর আমি সেই সুযোগটাই নিয়েছি। তোকে নিকের গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে আমি চেয়েছিলাম ওর পুরো রাজত্ব নিজের হাতের মুঠোয় নিতে। ভেবেছিলাম নিক তোকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে আর আমি হব এই জগতের রাজা। এইবার ভাব আমি নিজের জন্য কি কি করতে পারি??
মেহেক চুপ করে বিষ্ময়ে তাকিয়ে আছে নিলয়ের পানে। নিলয় আবারও বলে
- কিন্তু তুই সব নষ্ট করে দিলি! আজ নিক নেই, তোকে বাঁচানোর মতোও কেউ নেই। আজ তোকে ম*রতেই হবে বোন কিছু করার নেই।
ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নিলয় আর মেহেককে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তার হাতের ধারালো ছুরিটা মেহেকের বুকের বাম পাশের ঠিক উপরে সজোরে বসিয়ে দিল। মেহেকের গগনবিদারী আর্তনাদে সেই অন্ধকার ঘরটা যেন কেঁপে উঠল। সেই তীব্র চিৎকার রায়হানের কানে পৌঁছাতেই রায়হান জানোয়ারের মতো গর্জন করে উঠল। নিজের ভাঙা পা নিয়ে মাটিতে হাত দিয়ে আঘাত করতে লাগল মাটিকে।
মেহেক মাটিতে এপাশ ওপাশ ছটফট করতে করতেই নিস্তেজ হয়ে গেল।
রক্তাক্ত মেহেককে নিস্তেজ হয়ে পড়তে দেখে রায়হানের ভেতরে যেন এক আসুরিক শক্তি ভর করল।
- ফাইনালি এই সাম্রাজ্য আমার হবে এইবার। যেখানে নিকও থাকবে না। আমি এই রাজত্বের রাজা হতে এসেছি, প্রজা হয়ে থাকার সময় আমার ফুরিয়ে গেছে।
যে হাত আমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, সে হাত যারই হোক না কেন আমি তা সরিয়ে দেব। ব্যবসায়িক স্বার্থে বন্ধু বলে কিছু নেই, আছে শুধু অংশীদার অথবা পথের কাঁটা। আর নিক নিক ওই নিকোলাস হচ্ছে আমার পথের কাটা!!
নিলয় জোড়ে জোড়ে বলছিল আর অবজ্ঞার হাসি হাসছিল। হাসতে হাসতেই হাতের ছু* রিটা ঘুরাতে ঘুরাতে রায়হানকে শেষ আঘাত করতে এগিয়ে এল নিলয়। কিন্তু ঠিক তখনই রায়হান পকেট থেকে লুকিয়ে রাখা শেষ ছুরিটা জোড়ে বসিয়ে দিল নিলয়ের পায়ে।
হঠাৎ আক্রমনে নিলয় যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে কিছুটা দূরে সরে যেতেই রায়হান তার সমস্ত শক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিলয়ের ওপর। বুকের ওপর চেপে বসে রায়হান পাগলের মতো ছুরি চালাতে লাগল। নিলয়ের মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না, শুধু এক পৈশাচিক গোঙানি ভেসে আসছিল। ক্রোধে রায়হান বলতে শুরু করল
- জানোয়ারের বাচ্চা! নিজের বোনকে কেউ গুটির মতো ব্যবহার করে? তুই তো মানুষের পর্যায়েই পড়িস না। তোর মতো লোভী আর রক্তচোষার জায়গা এই দুনিয়ায় না, জাহান্নামে! তুই ভাবছিস টাকা দিয়ে সব কিনে নিবি? এই দেখ, তোর সাম্রাজ্য এখন আমাদের পায়ের নিচে। তোর টাকার পাহাড় আজ তোরই চিতায় আগুন জ্বালাবে, কুত্তার বাচ্চা!
"নিলয়! তোর কলিজা আমি খুবলে বের করব আজ! তুই মেহেকের গায়ে হাত তুললি? তোর মৃত্যু আজ আমার হাতেই লেখা। তোর মতো নরপিশাচকে যদি আজ আমি জ্যান্ত কবর না দেই, তবে আমার নামও রায়হান না! তোর এই অহংকার আর টাকার নেশা আজ আমি মাটির সাথে মিশিয়ে দেব, হারামজাদা!"
রায়হান হামাগুড়ি দিয়ে কিছু টাকা এনে নিলয়ের পুরো শরীরে ছড়িয়ে দিল। কিন্তু নিলয় ত জ্ঞানেই নেই। মৃত্যুর ধ্বনি কানে বাজছে তার।
- নে! এই নে তোর টাকার স্বাদ! এই নে তোর সাম্রাজ্যের নেশা! আজ তোর মাথা আর ধড় এক জায়গায় থাকবে না। তুই বোনকে বেচে ব্যবসা করতে চেয়েছিলি না? এখন যমরাজের সাথে গিয়ে সেই ব্যবসা কর!
রায়হানের চোখ তখন রক্তবর্ণ। পাশে পড়ে থাকা একটি ভারী কুড়াল দেখে সে সেটি তুলে নিল। প্রতিটি কোপ দেওয়ার সময় তার মনে পড়ছিল মেহেকের সেই আর্তনাদ। এক পর্যায়ে উন্মত্ত রায়হান কুড়ালের এক কোপে নিলয়ের ধর থেকে মাথাটা আলাদা করে ফেলল। চারদিকে রক্তের বন্যা বয়ে গেল, কিন্তু রায়হানের আক্রোশ যেন থামতেই চাইছিল না।
উন্মত্ত রায়হান যখন কুড়াল দিয়ে নিলয়ের শেষ চিহ্নটুকু মুছে দিচ্ছিল, তখন তার মুখ দিয়ে শুধু আগুনের মতো প্রতিহিংসার ভাষা বের হচ্ছিল। নিলয়ের নিথর দেহটা যখন নিস্তেজ হয়ে পড়ল, তখন রায়হান তার বিচ্ছিন্ন মাথার দিকে তাকিয়ে থুতু ছিটালো।
- নরকেও তোর জায়গা হবে না নরপিশাচ। যেভাবে আজ তোকে শেষ করেছি ঠিক সেভাবেই একদিন নিকোলাসকেও শেষ করেব আমি।
পায়ের ব্যাথায় রায়হান আর নিজেকে দাড় করিয়ে রাখতে পারল না। মাটিতে পরে গেল।
রায়হান কোনোমতে হামাগুড়ি দিয়ে মেহেকের কাছে পৌঁছাল। মেহেকের শরীর সাদা হয়ে আসছে। রায়হান নিজের ভাঙা পায়ের যন্ত্রণা উপেক্ষা করে মেহেককে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, দেয়ালে ভর দিয়ে রায়হান যখন ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল, তখন দেখল তাদের পালানোর একমাত্র সম্বল গাড়িটিতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। নিলয় আগে থেকেই সব পথ বন্ধ করে রেখেছিল।
- সুহাসিনী আমার চোখ খোলো। তোমাকে মরতে দেব না আমি!
রায়হান ডুকরে কেঁদে উঠল। এক পা এগোতেই তার শরীর ভেঙে আসছিল, কিন্তু মেহেকের নিস্পন্দ দেহটা তাকে থামতে দিচ্ছিল না। জনমানবহীন সেই রাস্তায় রায়হান যখন প্রায় হাল ছেড়ে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই হেডলাইটের তীব্র আলো এসে পড়ল রায়হানের চোখে। একটি গাড়ি ঝড়ের বেগে ধেয়ে আসছে তাদের দিকে।
রায়হান শেষ সম্বল টুকু দিয়ে চিৎকার করে গাড়িটি থামাতে বলল। টায়ার ঘষটানোর কর্কশ শব্দ করে গাড়িটি তাদের ঠিক সামনে এসে থামল। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে মিরা যখন রায়হান আর রক্তাক্ত মেহেককে দেখল, তার আত্মা যেন শুকিয়ে গেল।
- রায়হান! তোমার এই অবস্থা কেন? মেহেকের একি হয়েছে?
মিরার কণ্ঠস্বরে আকাশছোঁয়া আতঙ্ক।
রায়হান কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। সে শুধু ঝাপসা চোখে মিরার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
- ওকে বাঁচাও মিরাওকে বাঁচাও।
বলেই রায়হান মেহেকসহ মাটির ওপর লুটিয়ে পড়ল। রাতের নির্জনতায় তখন শুধু দূরে জ্বলতে থাকা গাড়ির চটচট শব্দ আর মিরার আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছিল।
………………………………………
ব্রিসবেনের হাসপাতালের করিডোরে মিরার পায়ের শব্দগুলো যেন এক একটা আর্তনাদ হয়ে বাজছিল। রায়হান আর মেহেককে কোনোমতে হাসপাতালে নিয়ে পৌঁছাতেই নার্সরা ক্ষিপ্র হাতে তাদের স্ট্রেচারে করে আলাদা করে নিয়ে যায়। মেহেককে যখন ওটি (OT) রুমে ঢোকানো হচ্ছিল, তার নিথর দেহটা দেখে মিরার বুকটা বারবার কেঁপে উঠছিল।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর যখন রায়হানের জ্ঞান ফিরল, রায়হান যেন এক বিভীষিকার মধ্যে জেগে উঠল। চোখ মেলেই রায়হানের মুখে প্রথম শব্দটা ছিল - মেহেক!
পাশেই মিরা বসে ছিল। মিরা দ্রুত রায়হানের হাত চেপে ধরে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে থাকে।
- রায়হান, শান্ত হও! তুমি এখনো সুস্থ নও। তোমার পা.........
কিন্তু রায়হান মিরাকে থামিয়ে দিল। রায়হান যেন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পরেছে। সে আজ নাছোড়বান্দা, তাকে মেহেকের কাছে যেতেই হবে এখন। তাই ব্যান্ডেজ বাঁধা পা নিয়েই রায়হান বেড থেকে নামার চেষ্টা করতে লাগল।
ক্ষতবিক্ষত পা নিয়েই রায়হান খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে করিডোরে এগোচ্ছিল মিরা পিছন পিছন আসতে আসতেই বলতে লাগল
- মেহেককে ওটিতে নিয়ে গেছে প্রায় তিন ঘণ্টা হতে চলল, এখনো কোনো খবর আসেনি রায়হান!
মিরার কথা শুনে রায়হানের ভেতরের বাঁধ ভেঙে গেল। সে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ওটির দরজার সামনে গিয়ে আছড়ে পড়ল। ঠিক তখনই ওটির দরজা খুলে ডক্টর বেরিয়ে এলেন। রায়হান পাগলের মতো ডক্টরের কলার চেপে ধরল,
- ডক্টর, মেহেক কেমন আছে? ও ঠিক আছে তো?
ডক্টর বিষণ্ণ মুখে মাথা নিচু করে খানিক পর বললেন,
- পেশেন্টের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তার হার্ট মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে। এই মুহূর্তে হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা ছাড়া তাকে বাঁচানোর আর কোনো পথ নেই। কিন্তু এত অল্প সময়ে আমরা হার্ট কোথায় পাব? সেটাই বড় চিন্তার বিষয়।
ডক্টরের কথা শুনে রায়হান যেন পাথরের মতো জমে গেল। পরক্ষণেই কোনোকিছু চিন্তা না করেই রায়হান বলে উঠল,
- আমি দেব! ডক্টর, আমার হার্ট নিয়ে নিন। যত দ্রুত সম্ভব কাজ শুরু করুন, শুধু মেহেককে বাঁচান।
ডক্টর বিস্ময়ে রায়হানের দিকে তাকাল একবার। রায়হান তখন উন্মাদের মত ডক্টরের পা জড়িয়ে ধরল। নিজের পায়ের ব্যাথা ভুলে প্রেয়সীর জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল রায়হান।ডক্টর শান্ত স্বরে বলতে লাগল,
- আগে দেখতে হবে আপনার হার্ট তার সাথে ম্যাচ করে কি না। কারণ পেশেন্ট গর্ভবতী, তাই ঝুঁকি অনেক বেশি।
মেহেক প্রেগন্যান্ট? কথাটা শুনে রায়হানের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। এক অদ্ভুত শূন্যতা তাকে গ্রাস করল। বুকের ভেতর কষ্টের পাহাড় চেপেও খানিক পর রায়হান ঠোঁটে এক চিমটি হাসি এনে বলল,
- আপনি আসুন ডক্টর। যদি ম্যাচ হয়, তবে এই হার্ট দিয়েই আমার মেহেককে আপনার সুস্থ করে তুলতে হবে। মেহেকের অনাগত সন্তানের জন্য হলেও তাকে বাঁচতে হবে।
মিরা আর সহ্য করতে পারল না। সে রায়হানকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠল,
- না রায়হান না! এই পাগলামি করো না। এসবের মানে কি রায়হান? আমরা একটু খুজে দেখি আগে? না পেলে পরেরটা পরে। কিন্তু তুমি মেহেকের জন্য নিজের জীবন দিতে পারো না। কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি রায়হান। তুমি না থাকলে আমার কী হবে একবার ভেবে দেখেছ?
রায়হান খুব ধীরে কিন্তু শক্ত হাতে মিরার হাত সরিয়ে দিল। একটু মুচকি হাসলো রায়হান।
- বাস্তবতাকে মেনে নিন মিরা। আমি আপনাকে কোনোদিন ভালোবাসতে পারিনি, আমি শুধু মেহেককেই ভালোবাসি। আর যাকে ভালোবাসা যায়, তার জন্য জীবন উৎসর্গ করাটা ত্যাগের নয়, পরম প্রাপ্তির বিষয়। আর আপনি আমার কাছে শুধুই একটা নাম মিরা ব্যাস এর বেশি আর কিছুই ছিলেন না আপনি আমার জীবনে।
মিরা হাসলো আজ। হাসতে হাসতে শরীর দুলিয়ে উঠল যেন। কিন্তু পরক্ষণেই হাসি গায়েব হয়ে সেখানে ধরা দিল বিষাদ।
- হয়তো তোমার কাছে আমি শুধুই একটা সাধারণ নাম, কিন্তু আমার কাছে তুমি ছিলে এক পশলা বৃষ্টির মতো যার জন্য আমি চাতকের মতো আজীবন তৃষ্ণার্ত হয়ে বসে থাকতাম। একবার বিশ্বাস করে দেখতে, তোমার প্রতিটি চোখের জল পড়ার আগেই আমি তা নিজের হাসিতে বদলে দিতাম।
- আমি পারলাম না আপনাকে ভালবাসতে মিরা। মাফ করবেন আমায়।
- আমায় ভাল কেন বাসলে না রায়হান? একটাবার ভালবেসে দেখতে পুরো দুনিয়া তোমার পায়ের সামনে এনে ফেলতাম আমি!৷
- আপনি যদি আমায় ভালবাসেন , তবে শেষ সময়ে একটা সাহায্য করবেন মিরা?!
মিরা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,
- বলো রায়হান, কী করতে হবে? আমি তোমার সব কথা রাখব।
রায়হান একটু ম্লান হেসে বলল,
- আমাকে শুধু একটা কলম আর একটা কাগজ এনে দিন।
বলেই রায়হান ডক্টরের সাথে ধীর পায়ে ওটির দিকে এগিয়ে গেল।
মিরা যেতে বাধা দিলেও রায়হান তা শুনল না। মিরা পাগলের মত মেঝেতে হাত দ্বারা আঘাত করতে লাগল। হাসপাতালের মেঝেতে বসে পড়ে উন্মাদের মতো কাঁদতে লাগল।
- আমার চোখের সামনে আজ ধূসর ভবিষ্যৎ, আর পেছনে ফেলে আসা এক অসমাপ্ত ভালোবাসা এই দুইয়ের মাঝখানে এনে কেন দাড় করালেন আমায়?? আল্লাহ, এই যে বুকের ভেতরটা প্রতিনিয়ত দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে, এই অসহ্য যন্ত্রণা আমি কার কাছে গিয়ে বলব? কেন আমার হৃদয়ে এমন একজনের জন্য এতোটা হাহাকার লিখে দিলে, যার পৃথিবীতে আমার কোনো অস্তিত্বই নেই? আমি যে এই বিরহের ভার আর সইতে পারছি না। যখন কেউ আমার না হয়েও আমার সবটুকু জুড়ে থাকে, তখন বেঁচে থাকাটা প্রতি মুহূর্তে এক একটা যুদ্ধের মতো মনে হয়। আমি আর পারছি না আমি সত্যিই আর পারছি না।
চলবে,,
( কালকের জন্য প্রস্তুত সবাই??🙂)