🚫যারা উগ্র বেপরোয়া সাইকো টাইপ নায়ক পছন্দ করেন তাদের জন্য শুধু এই গল্প।
সাইকো রোমান্টিক থ্রিলার জনরা।
#হিয়া_জ্বলে_পিয়ার_দরদে
#নুসরাত_জাহান_ইভা
#পর্ব_৩২
টানা চার ঘণ্টা পর দরজার ওপর জ্বলতে থাকা লাল আলোটা নিভে যেতেই মিরার বুকটা ধক করে ওঠে। একটু পরেই ওটি (OT) থেকে ক্লান্ত পায়ে বেরিয়ে আসেন ডক্টর।
মিরা টলমল পায়ে এগিয়ে যেতেই ডক্টর নিজের মুখে মাস্কটা নামিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
- শি ইজ আউট অফ ডেঞ্জার। হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট সফল হয়েছে। ভয়ের আর কিছু নেই, কিছুক্ষণ পরই আমরা উনাকে কেবিনে শিফট করব।
কথাটা শুনে মিরার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল বটে, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না। মিরা অবশ পায়ে গিয়ে করিডোরের সেই চেনা প্লাস্টিকের চেয়ারটায় আবারও বসে পড়ল। তার শূন্য, নিষ্প্রাণ চোখ দুটো সামনের দেয়ালে স্থির।
মেহেক যখন নতুন জীবনের আনন্দে ভাসছে, ঠিক তখনই হাসপাতালের অন্য এক কোণে, হিমঘরের অন্ধকার ঘরে পড়ে আছে রায়হানের নিথর দেহটা। মিরা জানে, রায়হানের বুক থেকে স্পন্দিত হওয়া সেই হৃদপিণ্ডটাই এখন মেহেকের শরীরে নতুন করে স্পন্দন ছড়াচ্ছে।
রায়হান তার শেষ ইচ্ছেটুকু মিরাকে বলে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে বলেছিল
- মেহেক যদি আমাকে শেষবারের মতো দেখতে চায়, তাহলে ওকে আমার লাশটা দেখাবেন মিরা।
আর মিরাও রায়হানের সব কথা রেখেছে আজ।
ওটিতে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তটা মিরার চোখের সামনে ভেসে ওঠে একবার। রায়হান তার কাঁপতে থাকা হাত থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ মিরার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল,
- এটা আমার সুহাসিনীকে দিবেন, মিরা। আর হ্যাঁ আপনি অনেক সুখী হবেন, অনেক! আপনার জীবনে এমন কেউ একজন ঠিক আসবে, যে আপনাকে আপনার নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসবে। আমি আপনার সাথে অনেক অন্যায় করেছি। অনেক কষ্ট দিয়েছি আপনাকে। তার জন্য আমায় ক্ষমা করে দিবেন ত মিরা? যদি ক্ষমা না করেন তাতেও চলবে শুধু আমার একটা ছোট্ট অনুরোধ আমাকে একদম ভুলে যাবেন না মিরা। এই অধমটাকে সবসময় মনে রাখবেন কিন্তু।
বলেই রায়হান তার জীবনের শেষ ও সবচেয়ে সুন্দর হাসিটা হেসে ডাক্তারের সাথে ওটিতে ঢুকে গিয়েছিল।
মিরা চাইলেই পারত তখন রায়হানকে শেষবারের মতো শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলতে পারত
- তোমাকে ভুলে যাব আমি??? এই দেহে যতদিন প্রাণ থাকবে সেই প্রাণ তোমারই নাম জপবে রায়হান। প্লিজ যেও না! আমায় একা করে যেও না রায়হান।
কিন্তু মিরা তা করেনি। আজ মিরা কোনো জোর খাটায়নি, কোনো অধিকার ফলায়নি। শুধু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিল রায়হানের চলে যাওয়ার পথের দিকে। মিরা শেষবারের মতো, প্রাণভরে দেখে নিয়েছিল তার সেই ভালোবাসাকে যাকে সে তীব্রভাবে চেয়েও কোনোদিন নিজের করে পায়নি।
আজ মেহেক নতুন জীবন পেল, আর রায়হান রয়ে গেল এক টুকরো চিরস্থায়ী নীরবতা হয়ে, মিরার বুকের গভীরে।
মিরা ভাবতে ভাবতেই চেয়ারে হেলান দিল।
…………………………………
মেহেক যখন চোখ খুলল, হাসপাতালের চেনা সাদা সিলিং আর ওষুধের তীব্র গন্ধটা যেন মেহেককে স্বাগত জানাল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন অদ্ভুত খালি খালি লাগছে, অথচ একটা অদ্ভুত সতেজ অনুভূতি। মেহেক আলতো করে পাশ ফিরতেই দেখতে পেল পাশে দাঁড়িয়ে আছে মিরা। মিরাকে দেখে মেহেকের কপালটা কুঁচকে গেল, চোখের কোণে একরাশ বিস্ময় আর প্রশ্ন।
মিরা কোনো কথা না বলে এগিয়ে এসে পরম মমতায় মেহেকের ঠান্ডা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। কিছুক্ষণ পুরো কেবিনে এক পিনপতন নীরবতা। মেহেক শুধু একদৃষ্টিতে মিরার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন তার চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করছে।
মেহেকের সেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে মিরা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। মিরা ভাঙা গলায়, এক এক করে সব বলতে শুরু করল। সেই কালরাতের ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে কীভাবে সে রায়হান আর মেহেককে এই হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল, কীভাবে প্রতিটা মুহূর্ত মৃত্যুর সাথে লড়াই করতে হয়েছে মেহেককে।
মিরার কথাগুলো শুনতে শুনতেই হঠাৎ মেহেকের মস্তিস্কে তীব্র এক বিদ্যুৎ চমকের মতো শেষ রাতের সব স্মৃতি ভেসে উঠল। রায়হানের রক্তাক্ত পা,,নিলয়ের বিভৎসতা,, সব! আতঙ্কে, আশঙ্কায় মেহেক ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসার চেষ্টা করল।
মিরা তাকে বাধা দিল।
- মেহেক, উঠো না! তোমার শরীর এখনো খুব দুর্বল।
কিন্তু মেহেক তখন অন্য কোনো জগতে। সে মিরার হাতটা খপ করে ধরে মরিয়া হয়ে চিৎকার করে উঠল,
- রায়হান কোথায়, মিরা? রায়হান কোথায়?! ও ভালো আছে তো? ও কোথায়, আমাকে বলো!
মিরা কিছুই বলতে পারল না। তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। মিরা শুধু অসহায়ভাবে মাথা নিচু করে রইল, চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
মিরার চোখে পানি দেখে মেহেক আরও বেশি ছটফট করতে লাগল,
- তুমি কাঁদছ কেন, মিরা? কথা বলছো না কেন? রায়হানের কী হয়েছে? প্লিজ, বলো আমাকে!
মেহেকের জোড়াজুড়ি আর আর্তনাদ সহ্য করার মতো ক্ষমতা তখন মিরার ছিল না। মিরা একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে নিজের প্যান্টের পকেট থেকে সেই যত্ন করে রাখা, ভাঁজ করা কাগজটা বের করল। কাঁপা কাঁপা হাতে সেটা মেহেকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত মৃদুস্বরে বলল,
- এইটা পড়ো মেহেক তোমার সব প্রশ্নের উত্তর এখানে আছে। সব বুঝতে পারবে।
বলেই মিরা আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। নিজের উপচে পড়া কান্না লুকাতে প্রায় ছুটে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
মেহেক স্তম্ভিত হয়ে মিরার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনের ভেতর হাজারটা সন্দেহ আর আশঙ্কার মেঘ দানা বাঁধছে। মেহেক ধীরে ধীরে নিজের হাতের তালুতে থাকা কাগজটার দিকে তাকাল।
- কী এইটা? এতে আমার সব উত্তর পাব মানে? রায়হান কোথায়? সে নিজে কেন এল না?
নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল মেহেক।
বুকের ভেতরটা অজানা এক ভয়ে দুরুদুরু কাঁপছে। মেহেক খানিকটা সময় নিয়ে, অত্যন্ত সতর্কতায় কাগজের ভাঁজটা খুলল। দীর্ঘদিনের চেনা সেই হাতের লেখাটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই তার বুকটা ধক করে উঠল।
আমার সুহাসিনী
বহুদূর পথ ভীষণ আঁকাবাঁকা
চলতে ভীষণ ভয়
তুমি এসে বলে দেও আছি আমি পাশে
করো না কিছু নেই ভয়
কখনো ভাবি নি ফিরে যাবে তুমি
আমাকে এভাবে কাদিয়ে
কখনো ভাবি নি ফিরে আসবে না
আমার পৃথিবী রাঙিয়ে
সুহাসিনী যখন তুমি এই চিঠিটা পড়বে তখন আমি তোমার থেকে অনেক, অনেক দূরে। এতটাই দূরে যে তুমি চাইলেও আর আমার কাছে পৌঁছাতে পারবে না, আর আমি চাইলেও কোনোদিন তোমার পিছু নিতে পারব না।
সুহাসিনী,আমার এই পোড়া কপালে আমি শুধু তোমাকে চেয়েই গেলাম কিন্তু পেলাম আর কই বলো? লোকে বলে, এক জীবনে নাকি এত আক্ষেপ রাখতে নেই। তাহলে আমি কেন এত বুকভরা আক্ষেপ আর না-পাওয়ার যন্ত্রণা নিয়েই এই দুনিয়া ছাড়লাম? ও আমার সুহাসিনী... আর কী করলে তুমি আবার আমায় ভালোবাসতে? আর কী করলে তুমি আবার আগের মতো আমার বুকে ফিরে আসতে?
জানো সুহাসিনী, আজ ডক্টরের মুখে যখন শুনলাম তুমি প্রেগন্যান্ট, নিকোলাসের সন্তান তোমার পেটে তখন আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। আমি বুঝে গিয়েছিলাম, আমার মেহেক আমার থেকে বহু আলোকবর্ষ দূরে চলে গেছে। যাকে আমি নিজের চেয়েও বেশি আগলে রেখেছিলাম, সে আজ অন্য কারও। কিন্তু বোকা আমি, সব বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকতে চেয়েছিলাম। তোমাকে হারানোর সত্যিটা মেনে নেওয়ার ক্ষমতা যে আমার ছিল না! আফসোস আমি তোমাকে তাও পেলাম না! ভালবাসা কতটা ভয়ংকর একবার ভাবো।
তারপর যখন ডাক্তার বলল, তোমাকে বাঁচাতে হলে দ্রুত হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে হবে, তখন একটা মুহূর্তের জন্যও আমার বুক কাঁপেনি। আমি কোনো কিছু না ভেবেই ডাক্তারকে বলে দিয়েছিলাম আমার হার্ট দিয়ে হলেও যেন তোমাকে বাঁচানো হয়। কারণ কী জানো? আমার একটাই জেদ ছিল, একটাই উদ্দেশ্য ছিল আমাকে জিততে হবে। আর আমার সুহাসিনীর কাছে আমাকে যে যেকোনো মূল্যে জিততেই হতো!
সুহাসিনী মনে আছে তোমার ? সেদিন ক্যাফেতে তোমাকে জোর গলায় বলেছিলাম আমি তোমার হৃদয়ে জায়গা করেই ছাড়ব!! দেখো মেহেক, আজ আমি সত্যিই তোমার হৃদয়ের ঠিক মাঝখানটায় জায়গা করে নিয়েছি। তোমার প্রতিটা রক্তকণিকায়, তোমার প্রতিটা বুকধড়ফড়ানিতে এখন শুধু আমি। যাইহোক জিতটা কিন্তু শেষমেশ আমারই হলো, তাই না??
সুহাসিনী, আমি হয়তো মাঝপথে তোমাকে এভাবে একা ফেলে পালিয়ে গেলাম। একটু স্বার্থপরের মতোই চলে গেলাম আজ। কিন্তু আমি জানি, আমার মেহেক মোটেও ভীতু নয়, আমার মেহেক এত দুর্বলও নয়। তুমি পারবে মেহেক। এই শ্বাসরুদ্ধকর খেলার চূড়ান্ত পর্যায়ে তোমাকে একাই লড়তে হবে। তবে তুমি কখনো ভেবো না যে তুমি একা! আমি থাকব তোমার হৃদয়ের গভীরতম গহীনে। তুমি চোখ বন্ধ করে বুকে হাত দিলেই আমার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারবে। হয়তো তোমার কাছে আমার এই জোর করে থেকে যাওয়াটা বিরক্তিকর লাগবে, হয়তো রেগে যাবে। কিন্তু আমার জন্য এর চেয়ে আনন্দের আর কিছু হতে পারে না।
চারটিখানি কথা নাকি! আমার সুহাসিনীর হৃদস্পন্দন হয়ে আমি বেঁচে থাকব সারাজীবন! মৃত্যুর ওপারে দাঁড়িয়ে তোমার বুকে আমার নাম শোনার চেয়ে সুখকর আর কী-ই বা হতে পারে এই অভাগার জন্য?
সুহাসিনী আমার একটা কথা রাখবে? আমার লাশটা দেশে পাঠানোর ব্যাবস্থা করো। আমি আমার দেশের মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হতে চাই। আর কি বলা যায় তোমায়??? বলি আজ। আজকেই নাহয় একটু জ্বালাব তোমায়!
তুমি ভালো থেকো আমার সুহাসিনী। নিজের খেয়াল রেখো। তোমার ভেতরে বেড়ে ওঠা ওই নতুন প্রাণটাকে সযত্নে আগলে রেখো৷ মনে রেখো সে একটা পবিত্র ফুল। আর আমি ত আছিই। দূর আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটা হয়ে তোমাকে আজীবন দেখে রাখব। কাগজ শেষের পথে আর একটু খানি জায়গা আছে। ভাবছি আর কি লিখা যায়!! উম ভালবাসি এই কথাটাই শুধু লিখা যাবে এখন আর। আচ্ছা তাহলে এটাই লিখি। আমি তোমায় ভালবাসি সুহাসিনী। তুমি বলেছিলে মরে গিয়ে প্রমাণ করতে আমি তোমায় কতটা ভালবাসি। আমি তোমার কথা রেখেছি সুহাসিনী আমি কথা রেখেছি।
ইতি,
তোমার সুদর্শ……
চিঠির শেষ লাইনটা আর লিখা হলো না। হয়ত কাগজ না থাকায় রায়হান নিজের নামটা আর লিখতে পারে নি। কি অভাগা কপাল তার!! মেহেকের মনে ত জায়গা হলো না ইই আবার মেহেকের জন্য তার লিখা চিঠিতেও রায়হান তার নামটা লিখতে পারল না শুধুমাত্র কাগজের অভাবে!!
মেহেকের হাত দুটো কাঁপতে লাগল। এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর যে ধকধকানিটা মেহেক অনুভব করছিল, সেটা অন্য কারও নয় স্বয়ং রায়হানের! মেহেকের চোখের জল বাঁধ ভেঙে কাগজের ওপর আছড়ে পড়ল।
মেহেক চিঠিটা দুইহাতে জাপটে ধরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। ভেতরের সমস্ত যন্ত্রণা যেন একটা আর্তনাদ হয়ে কেবিন জুড়ে আছড়ে পড়ল।
- কেন রায়হান, কেন? কেন আমার জন্য নিজেকে এভাবে শেষ করে দিলে তুমি? আমি তো তোমার এই ভালোবাসার যোগ্য ছিলাম না! আমি একটা অকৃতজ্ঞ, রায়হান আমি একটা অকৃতজ্ঞ!
মেহেকের কান্নায় হাসপাতালের দেয়ালগুলোও যেন ভারী হয়ে উঠছিল।
এদিকে কেবিনের বাইরে, সুনসান করিডোরে মিরা অস্থির পায়ে পায়চারি করছিল। তার মাথায় তখনো ঘুরপাক খাচ্ছিল ওটিতে ঢোকার আগে রায়হানের বলা শেষ কথাগুলো। রায়হানের সেই আকুল অনুরোধ, সেই শেষ হাসি মিরার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছিল।
হঠাৎ করেই কেবিনের ভেতর থেকে মেহেকের তীব্র চিৎকার আর ভাঙচুরের শব্দে মিরার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। মেহেকের এমন পাগলামি দেখে মিরা আর এক মুহূর্তও বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। এক ছুটে মিরা কেবিনের ভেতরে ঢুকে দেখল, মেহেক নিজের গায়ের স্যালাইনের সুচ, মনিটরের তার সব টেনেহিঁচড়ে খুলে ফেলার চেষ্টা করছে।
- মেহেক! একী করছো তুমি? শান্ত হও!
মিরা দৌড়ে গিয়ে মেহেককে জাপটে ধরল।
কিন্তু মেহেক চরম উন্মাদনায়, সমস্ত শক্তি দিয়ে মিরাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তার চোখে তখন চেনা মেহেকের কোনো অস্তিত্ব নেই, সেখানে শুধু এক বুক হাহাকার আর তীব্র আক্রোশ।
- ছুবে না আমাকে, মিরা! একদম ছুবে না!
মেহেক চিৎকার করে উঠল।
- তুমি তো সব জানতে, তাই না? তুমি জানতে ও কী করতে যাচ্ছে! তাহলে কেন রায়হানকে আটকালে না?
মিরা আর নিজের কান্না চেপে রাখতে পারল না। সেও ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
- তোমার কী মনে হয় মেহেক, আমি ওকে আটকাইনি? আমি ওর পায়ে পর্যন্ত ধরেছিলাম, অনেক কেঁদেছিলাম! কিন্তু ও শোনেনি। ও শুধু বলেছিল, তোমায় বাঁচানোই ওর জীবনের শেষ জেদ!
খানিক আগের মুহুর্ত…………
মিরা যখন আর্তনাদ করে রায়হানের পা জড়িয়ে ধরে পাগলের মত চেচাচ্ছিল তখন রায়হান কোনোকিছু ভাবার মধ্যে ছিল না।
- রায়হান, একটা বার ভাবো! আমার ভালোবাসার কি কোনো মূল্য নেই? মেহেক ত তোমায় ভালবাসে না তাহলে কেন তুমি মেহেকের জন্য নিজের প্রাণ দিবে রায়হান?
মিরার কথায় রায়হান মিরাকে টেনে তুলে বিড়বিড় করল
- ভালোবাসা মানে তো শুধু পাওয়া নয় মিরা, ভালোবাসা মানে প্রিয় মানুষের বেঁচে থাকার নিঃশ্বাস হওয়া। আজ আমার ভেতরে যে প্রাণ আছে, তা যদি কাল মেহেকের বুকে স্পন্দিত হয় তবে আমি তো ওর মধ্যেই বেঁচে থাকব সারাজীবন।
………………………………………
মিরার মুখে রায়হানের এমন কথা শুনে মেহেকের সমস্ত শরীর কাঁপছিল। মেহেক মিরার কাঁধ দুটো খপ করে ধরে মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করল,
- রায়হান কোথায়, মিরা? আমি ওকে দেখতে চাই। প্লিজ মিরা, আমাকে বলো না যে ও আর এখানে নেই! প্লিজ বলো ও এখনো আছে!
মেহেকের এই করুণ আকুতি দেখে মিরা চোখের জল মুছতে মুছতে ভাঙা গলায় বলল, - না মেহেক রায়হান এখনো যায়নি। ও এখানেই আছে এই হাসপাতালের মর্গেই রাখা হয়েছে।
কথাটা শোনামাত্রই মেহেক দুই হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠল,
- আল্লাহ!! সহায় সও তুমি সহায় হও।মিরা, আমাকে নিয়ে চলো ওর কাছে। আমি রায়হানকে দেখব। আমাকে নিয়ে চলো।
মিরা আর বাধা দিল না। আলতো করে মাথা নাড়িয়ে মেহেককে বেড থেকে নামাল। মেহেকের শরীর দুর্বল হলেও, মনের ভেতর জ্বলতে থাকা আগুনটা তাকে টেনে নিয়ে চলল। মিরাকে আঁকড়ে ধরে মেহেক ধীর পায়ে হাসপাতালের সেই অন্ধকার, শীতল করিডোর পার হয়ে হিমঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। হাতে তখনও রায়হানের দেয়া শেষ চিঠিটা।
হিমঘরের ভারী লোহার দরজাটা খুলতেই একটা তীব্র, কনকনে ঠান্ডা বাতাস তাদের গ্রাস করল। সেই ঠান্ডার চেয়েও বেশি মেহেকের বুকের ভেতরের ধকপুকানিটা হাজার গুণ বেড়ে গেল। তার নিজের হৃৎপিণ্ডটা যেটা আসলে রায়হানের সেটা যেন পাঁজরের ভেতর তীব্রভাবে লাফাচ্ছিল। মেহেক আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিল না, তার পা দুটো অবশ হয়ে আসছিল।
হিমঘরের দায়িত্বে থাকা লোকটা একটা বড় স্টিলের ড্রয়ার টেনে বের করতেই কাপড়ে ঢাকা রায়হানের নিথর দেহটা বেরিয়ে এল। সাদা চাদরটা সরাতেই চেনা মুখটা ভেসে উঠল।
মেহেক যেন এক জীবন্ত লাশ হয়ে ধীর পায়ে আরও সামনে এগিয়ে গেল। স্তব্ধ, পাথর হয়ে মেহেক কতক্ষণ তাকিয়ে রইল রায়হানের দিকে। চিরকাল যে মানুষটার মুখে একটা চঞ্চল হাসি থাকত, আজ তার সারা মুখ ফ্যাকাশে, বরফের মতো ঠান্ডা।
মেহেক কাঁপতে থাকা হাতটা বাড়িয়ে রায়হানের গালে রাখল। সেই স্পর্শে কোনো ওম নেই, শুধু তীব্র এক শীতলতা। মেহেক কিছুটা ঝুঁকে এল রায়হানের মুখের ওপর। তার বুক ফেটে কান্না আসছিল, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। তীব্র শোকে মানুষের কান্নাও বুঝি হারিয়ে যায়!
মেহেক একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে, অত্যন্ত চেনা আদুরে সুরে ফিসফিস করে ডাকতে লাগল,
- রায়হান,,এই রায়হান! এই সুদর্শন পুরুষ চোখ খোলো না একবার? দেখো, তোমার সুহাসিনী তোমায় ডাকছে! তুমি না আমার একটা ডাকও কখনো ফেলতে না? আজ কেন শুনছো না?
কিন্তু রায়হান চোখ খুলল না। সে তার চিরন্তন নীরবতা ভাঙল না আজ।
মেহেক নিজের ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। তারপর পরম মমতায় রায়হানের মাথার সেই চেনা ঝাঁকড়া চুলগুলোর ভেতর নিজের আঙুল চালিয়ে বিলি কেটে দিতে লাগল। পাশে দাঁড়িয়ে মিরা তখন মুখে হাত দিয়ে শব্দহীন ফুপিয়ে কাঁদছিল।
কিন্তু হঠাৎ করেই মেহেকের চোখের সব পানি শুকিয়ে গেল। তার কান্নার জায়গায় রুপ নিল এক ভয়ঙ্কর, শীতল স্থিরতা। মেহেকের চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল। মেহেক ঝুকে রায়হানের কানের একদম কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গেল।
অত্যন্ত ঠান্ডা, নিখাদ আর নির্মম গলায় ফিসফিস করে বলতে লাগল মেহেক।
- তুমি দেখে নিও রায়হান যারা আমাদের এই হাল করেছে, যারা তোমাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে, তাদের কাউকে আমি ছাড়ব না। আমি নিজ হাতে সবাইকে শাস্তি দেব। সবাইকে টেনে হিঁচড়ে তোমার কাছে পাঠাব আমি। এমনকি আমার সন্তানের বাবাকেও ছাড়ব না। এই দুহাতে শেষ করব আমি কথা দিলাম তোমায়। এই সুহাসিনীর হৃদয়ে যেহেতু তুমি আছ, এই হৃদয়ের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে আমি প্রতিশোধ নেব রায়হান আমি প্রতিশোধ নেব।
হিমঘরের সেই তীব্র ঠান্ডাতেও মেহেকের গলার স্বর যেন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মতো শোনাল তখন। কিন্তু পরমুহূর্তেই আবারও রায়হানের নীল রক্তহীন মুখটা দেখে আবারও ডুকরে কেদে উঠল মেহেক।
- কেন আসলে তুমি এখানে? কেন নিজের সুন্দর ভবিষ্যৎ ছেড়ে আমার জন্য এই দেশে আসলে তুমি রায়হান? আমি ত তোমাকে কথার কথা বলে ফেলেছিলাম মরে গিয়ে প্রমাণ করতে তুমি আমায় ভালবাসো! এইটাকে এতটা গুরুত্ব দিলে রায়হান???
মেহেক কাদতে কাদতে রায়হানের চুলে মুখে অনবরত হাত ছুয়াচ্ছে।
- যখন তুমি জানতেই যে তুমি ভুল ট্রেনে উঠে পরেছো তখন তোমার উচিৎ ছিল সবচেয়ে কাছের স্টেশনে নেমে যাওয়া। কারণ সফর যত লম্বা হবে ফিরে আসাটাও ঠিক ততই ব্যায়বহুল হবে রায়হান। কেন তুমি আমার জন্য নিজের সবকিছু বিসর্জন দিলে?? এমন পাগল প্রেমিকও হওয়া যায়??
মেহেক রায়হানের মুখের সামনে ঝুকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
অদুর থেকে দুটো গানের লাইন ভেসে আসছে যেন
কোন ভুলে তুমি শুলে বলো
এই ফুল সজ্জায়
স্বপ্নের লাশ কাধে নিয়ে
ওরা কেন চলে যায়
জীবন পথে চলতে শেখা
ওই হাতেরই ছোয়ায়
আজ ভাঙা বুক খুজে হাসিমুখ
দেখি জ্বলে সেই চিতায়
প্রেম আমার ওওও প্রেম আমার
চলবে,,,
🙂🙂