আজকে আগেই দিয়ে দিলাম। কারণ আর পাঠিকারা আমাকে মে**রেও ফেলতে পারে🥲💔
সাইকো রোমান্টিক থ্রিলার জনরা।
#হিয়া_জ্বলে_পিয়ার_দরদে
#নুসরাত_জাহান_ইভা
অন্তিম পর্ব প্রথমাংশ
জেলে কেটে যাওয়া ১৭টা দিন নিকোলাসের কাছে ১৭টা যুগের মতো মনে হচ্ছে। নিকোলাসের দম আটকে আসছে এই কারাগারে। নিকোলাস প্রথম প্রথম ভাবত হয়তো লোহার শিকের ওপাশে পরিচিত কোনো ছায়া এসে দাঁড়াবে। কিন্তু না, মেহেক আসে নি। একটা বারের জন্যও মেহেক এই পথ মাড়ায়নি।
অথচ মিরা এসেছে। এই ১৭ দিনে অন্তত ছয়-সাতবার মিরা এসে লোহা শিকের ওপাশে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবার মিরাকে দেখলেই নিকোলাস প্রশ্ন করত
- মিরা মেহেককে একটাবার বল আসতে। ও কি জানে না আমি এখানে কেমন আছি?
কিন্তু মিরা হাজার বোঝানোর পরও মেহেক তার সিদ্ধান্তে অটল। মেহেক আসে নি নিকোলাসকে দেখতে।
এসব ভাবতে ভাবতেই নিকোলাস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফ্লোরে বসে পড়ে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে শূন্য চোখে তাকায় ছাদের দিকে। আজ তার সেই আকাশচুম্বী অহংকার, সেই তীব্র দম্ভের কোথাও কোনো অস্তিত্ব নেই।
মেহেক প্রায়ই বলতো,
- অহংকার বেশিদিন টিকে থাকে না, নিক।
আজ নিয়তি যেন অক্ষরে অক্ষরে সেই কথাটাই প্রমাণ করে দিল। নিকোলাসের একসময়ের উজ্জ্বল চেহারাটা এখন মলিন, শুকিয়ে গেছে। সেই চেনা গোলাপি ঠোঁট দুটোতে কালশিটে দাগ। সযতনে আঁচড়ানো মসৃণ চুলগুলো ধুলো আর অবহেলায় জট পাকিয়ে গেছে। আর সবসময় নিখুঁতভাবে করা ক্লিন শেভের জায়গায় এখন গালভর্তি খসখসে খোঁচা খোঁচা দাড়ি।
হঠাৎ চেনা পায়ের শব্দে নিকোলাস ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে আসে।
— নিক!
একটা চেনা কণ্ঠস্বর। নিকোলাস সামনের দিকে তাকায়। মিরা দাঁড়িয়ে আছে সেলের বাইরে, লোহার শিকের ওপাশে। নিকোলাস দেয়াল ছেড়ে ধীরপায়ে উঠে এসে শিকের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তার চোখেমুখে এক বুক তৃষ্ণা।
- মিরা মেহেক ভালো আছে?
মিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
- না।মেহেক অসুস্থ।
নিকোলাসের বুকে যেন মোচড় দিয়ে ওঠে।
- কী হয়েছে মেহেকের? তুই ওর সাথে থাকিস তো? ও ঠিকমতো খাচ্ছে তো?
মিরা এবার নিকোলাসের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে অপরাধীর মতো বলতে থাকে
- মে মেহ মেহেক প্রেগন্যান্ট, নিক!
কথাটা যেন একটা বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ল সেলের ভেতর। 'মেহেক প্রেগন্যান্ট' শব্দ দুটো নিকোলাসের কান দিয়ে ঢুকে সোজা কলিজায় গিয়ে বিঁধল। নিকোলাস তীব্র এক অনুভূতিতে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। চারপাশের সব শব্দ যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। প্রায় মিনিট দুয়েক কাটল গভীর এক নীরবতায়। তারপর যখন নিকোলাস ধীরে ধীরে চোখ খুলল, তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত, বিষাদময় মুচকি হাসি। যে হাসিতে আনন্দের চেয়ে যন্ত্রণার ভাগটাই বেশি।
- মেহেক তোকে বলেছে আমাকে জানাতে?
মিরা মাথা নাড়ায়,
- না। মেহেক চায় না তুই এই সত্যিটা কখনো জানিস। সে চায়, তুই তোর নিজের সন্তানকে সারাজীবন চোখের দেখা না দেখতে পাস আর এটাই হবে তোর আসল শাস্তি। তুই ভেতরে ভেতরে ছটফট করবি, অনুতাপে পুড়বি, কিন্তু তোর নিজের রক্তকে ছুঁয়েও দেখতে পারবি না। মেহেক ঠিক এটাই চায়।
নিকোলাস এবার শব্দহীন হাসে। এক বুক ভাঙা হাসি। নিয়তির এই নিষ্ঠুর পরিহাসে তার আর কিছু বলার ভাষা নেই। নিকোলাস আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সেলের ভেতরের অন্ধকারের দিকে চলে যেতে নেয়। কিন্তু মাঝপথে গিয়ে আবার থেমে যায়। কেমন যেন একটা তাড়না অনুভব করে নিকোলাস। ঘাড় ঘুরিয়ে শান্ত চোখে তাকায় মিরার দিকে।
- একটা হেল্প করবি আমায় মিরা?
- বল।
- আমায় কয়েকটা সাদা কাগজ আর একটা কলম এনে দিতে পারবি?
কাগজ আর কলমের কথা শুনতেই মিরার বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে ওঠে। পলকেই তার মনে পড়ে যায় রায়হানের কথা। রায়হানও তো ঠিক এভাবেই!! তবে কি নিকোলাসও রায়হানের মতোই সেই পথ বেছে নেবে? এই নিঃসঙ্গ সেলে বসে সেও কি নিজের জীবনের ইতি টানার কোনো পরিকল্পনা করছে? মিরার চোখেমুখে আতঙ্ক ফুটে ওঠে।
- না, দেব না! তোর কী কাজ এসব দিয়ে? কোনো দরকার নেই।
নিকোলাস মিরার মনের ভয়টা বুঝতে পারে। তার মলিন ঠোঁটে আবার সেই ক্লান্ত হাসিটা ফিরে আসে।
- ডোন্ট ওর্যি, মিরা। তুই যা ভাবছিস, আমি তেমন কিছুই করব না। নিজেকে শেষ করার মতো সাহস এখন আর আমার নেই। আমি শুধু মেহেককে একটা চিঠি লিখতে চাচ্ছি। সে তো আর কোনোদিন আমার সামনে এসে সরাসরি কথা বলবে না। আমার এই বন্দি জীবনের একাকীত্বে, আমার অনুতাপের কথাগুলো অন্তত ওই কাগজের বুকেই জমা থাক। মেহেক না পড়ুক, তবুও চিঠিটা তো ওর ঠিকানায় পৌঁছাবে। দিবি না আমায় কয়েকটা কাগজ আর একটা কলম?
...………………………
পরেরদিন সকাল
মেহেকের সকালের ঘুমটা ভাঙল ফোনের কর্কশ আওয়াজে। ইদানীং শরীরটা একদমই ভালো যাচ্ছে না তার, রাতের পর রাত কেটে যায় বিছানায় ছটফট করে, চোখের পাতা এক করা যেন এক বিলাসিতা। মাত্র ভোরের দিকে চোখটা একটু লেগে এসেছিল, কিন্তু এই অসময়ের ফোনটায় ভীষণ বিরক্ত হয়ে মেহেক কলটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল
- আপনি নিকোলাস অলদ্রিনের ওয়াইফ মেহেক অলদ্রিন?
মেহেক ভাঙা গলায় জবাব দিল,
- জ্বী।
- আজ ভোরে সেন্ট্রাল জেলের লক-আপে নিকোলাস অলদ্রিন নিজের মাথায় নিজেই শ্যুট করে সুইসাইড করেছেন। তার দেহ এখন হাসপাতালের পোস্টমর্টেম রুমে আছে। পোস্টমর্টেম শেষ হলে লাশ এসে নিয়ে যাবেন।
পরের কথাগুলো কি আদৌ মেহেকের কান পর্যন্ত পৌঁছাল? চারপাশের সবকিছু যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল, মাথার ভেতর তীব্র একটা শূন্যতা এসে ভর করল। মেহেক নিজের অজান্তেই বুক ফাটানো এক চিৎকার দিয়ে উঠল,
- আল্লাহ, না!
মেহেক আর একটা মুহূর্তও দাঁড়াতে পারল না। পায়ে স্যান্ডেল আছে কি নেই, গায়ের ওড়নাটা ঠিকঠাক আছে কি না কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল কারাগার সংলগ্ন হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।
বুকের ভেতর তখন এক তীব্র ঝড়, যে ঝড় তাকে এক মুহূর্তও দম নিতে দিচ্ছে না।
হাসপাতালে পৌঁছাতেই মেহেকের চোখে পড়ল, একটা স্ট্রেচারে করে হিমশীতল একটা শরীর পোস্টমর্টেম রুম থেকে বের করা হচ্ছে।চারপাশের সাংবাদিকদের ভীড়। মেহেক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সমস্ত বাধা ঠেলে মেহেক দৌড়ে গেল স্ট্রেচারটার দিকে। কাঁপতে কাঁপতে সাদা কাপড়ের অংশটুকু সরাতেই বেরিয়ে এল নিকোলাসের মুখটা।
ঠিক রায়হানের মতোই অবস্থা! যে মানুষটার রূপ আর দম্ভের কোনো শেষ ছিল না, আজ তার ঠোঁট দুটো রক্তহীন, ফ্যাকাসে সাদা হয়ে গেছে। মাথার ডান পাশের চামড়াগুলো বুলেটের আঘাতে ঝুলে আছে, জমাট বাঁধা রক্তে চেনা মুখটা চেনা চেনা হয়েও বিভৎস লাগছে।
এই দৃশ্য দেখার জন্য মেহেক প্রস্তুত ছিল না। তার সমস্ত রাগ, সমস্ত অভিমান আর ঘৃণা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। মেহেক নিকোলাসের সেই নিথর, বরফের মতো ঠান্ডা বুকে মাথা রেখে পাগলের মতো চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।
- এই এই নিক! উঠুন আপনি, উঠুন বলছি! এত সহজ শাস্তি আপনি পেতে পারেন না! আপনি এভাবে চলে যেতে পারেন না! আপনি উঠুন। এইটুকুতেই এত হাঁপিয়ে গেলেন আপনি? আমি যে এক বুক বিরহ আর যন্ত্রণা নিয়ে এখনো বেঁচে আছি, আমার কথা একবারও ভাবলেন না আপনি?
মেহেক নিকোলাসের নিথর বুকটা খামচে ধরে ঝাঁকাতে লাগল, যেন তার হাতের স্পর্শে এই পাথরের মতো হয়ে যাওয়া শরীরটায় আবার প্রাণ ফিরে আসবে।
মেহেকের চোখের পানি নিকোলাসের বরফের মতো ঠান্ডা বুকের ওপর টপটপ করে পড়তে লাগল। সেই অশ্রু আজ যেন নিকোলাসের সমস্ত অপরাধ ধুয়ে দিতে চাইছে, কিন্তু ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তার আর নেই। মেহেক তার দুই হাতের মুঠোয় নিকোলাসের ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া গাল দুটো জড়িয়ে ধরে নিজের মুখের কাছে টেনে নিল।
- আপনি না বলেছিলেন, আমি ছাড়া আপনার এই জীবনে কোনো গতি নেই? তবে আজ আমাকে এই মাঝদরিয়ায় একা ফেলে কোন অভিমানে চলে গেলেন? আপনার মনে একটুও দয়া হলো না নিক? আমাদের অনাগত সন্তান যার আসার খবর শুনে আপনি কালকেও জেলের ওই সেলে বসে মুচকি হেসেছিলেন,তার মুখটা একটা বারের জন্যও দেখার ইচ্ছে হলো না আপনার? আপনি এত স্বার্থপর কীভাবে হলেন?
মেহেক নিকোলাসের কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। হাসপাতালের সাদা দেয়ালগুলো যেন তার এই তীব্র আর্তনাদে কেঁপে উঠছে।
- আমি তো শুধু চেয়েছিলাম আপনি আপনার ভুলগুলো বুঝতে পারুন। আমি চেয়েছিলাম আপনার ওই আকাশচুম্বী দম্ভটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাক, যাতে আপনি নতুন করে শুধু আমার হয়ে ফিরে আসতে পারেন। কিন্তু আপনি তো আমার ওপর প্রতিশোধ নিলেন নিক! নিজেকে শেষ করে দিয়ে আমাকে সারাজীবনের জন্য এক জীবন্ত লাশ বানিয়ে দিয়ে গেলেন! এই কি আপনার ভালোবাসা?
মেহেক আলতো করে নিকোলাসের খসখসে খোঁচা খোঁচা দাড়িতে হাত বুলিয়ে দিল। যে হাত একসময় নিকোলাস নিজের কপালে ছোঁয়াতে ব্যাকুল হতো, আজ সেই হাতের স্পর্শেও তার শরীরে কোনো কম্পন নেই।
- দেখুন, আমার সব রাগ শেষ হয়ে গেছে নিক। আমি আর কিচ্ছু মনে রাখিনি। আল্লাহর দোহাই লাগে, আর এভাবে আমাকে শাস্তি দেবেন না। চোখ দুটো খুলুন, আর আমার দিকে একটা বার শুধু ভালোবাসার চোখে তাকান। একটা বার ওই ঠোঁট দুটো ফুটিয়ে বলুন যে আপনি ভালো আছেন। আপনি তো জানতেন, আপনার এই মিস্ট্রেস বাইরে যতই শক্ত থাকুক না কেন, ভেতর থেকে সে কতটা দুর্বল! তাহলে আজ কোন সাহসে আমাকে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর বুকে একা রেখে গেলেন? আমি কাকে নিয়ে বাঁচব নিক? কাকে নিয়ে বাঁচব আমি?
মেহেকের গলার স্বর জড়িয়ে আসে, বুক ফাটানো কান্না এবার ক্লান্ত গোঙানিতে রূপ নেয়। মেহেক নিকোলাসের নিথর বুকের ওপর আছড়ে পড়ে রইল, যেন এই চলে যাওয়া মানুষটার হৃদস্পন্দন সে নিজের ভেতরে অনুভব করতে চাইছে। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া এলো না। নিকোলাস অলদ্রিন তার জীবনের শেষ কথাগুলো না বলেই এক অন্তহীন হাহাকার জমা রেখে চিরতরে শান্ত হয়ে গেছে আজ।
- নিক, উঠো না... প্লিজ উঠো! দেখো, তোমার মিস্ট্রেস তোমার কাছে এসেছে! সব অভিমান, সব জেদ ভুলে আজ আমি আবারও তোমার সামনে দাঁড়িয়েছি। তাকাও না একবার, দয়া করে একটা বার চোখ খুলে তাকাও!
কিন্তু নিকোলাস আজ তাকাচ্ছে না। যেই মেহেকের একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস শুনলে নিকোলাস অস্থির হয়ে যেত, যার একটু চোখের পানি দেখার ভয়ে সে পুরো দুনিয়া উল্টে দিতে পারত, আজ সেই মেহেকের এত আকুতি, এত বুকফাটা কান্নায় নিকোলাস কীভাবে এতটা চুপচাপ শুয়ে আছে?
মাত্র কয়েকটা মুহূর্তের ব্যবধানে মানুষটার ভেতরের সব ছটফটানি উধাও হয়ে গেল? এত ধৈর্য্য, এত অবহেলা এই মানুষটা কোথায় শিখল? আচ্ছা!! জেলের ওই অন্ধকূপ কি নিকোলাসের সব জেদ কেড়ে নিয়ে তাকে এমন এক পাথরে পরিণত করল, যাকে আর কোনো ভালোবাসাই স্পর্শ করতে পারছে না আজ?
হাসপাতালের করিডোরে মেহেকের গগনবিদারী কান্না বাতাসকে ভারী করে তুলল, কিন্তু যার জন্য এই কান্না, সে তখন সব অনুতাপ আর শাস্তির সীমানা পেরিয়ে অনেক দূরের এক শান্ত গন্তব্যে পাড়ি জমিয়েছে।
.………………………………
হাসপাতালের সেই অন্ধকার করিডোরে যখন মেহেকের আর্তনাদ বাতাসের ভারী হয়ে উঠেছিল, ঠিক তখনই সেখানে এসে পৌঁছায় মিরা, শুভ আর এলিনা। নিকোলাসের এই আকস্মিক আর বীভৎস পরিণতির খবর তারা কেউই মেনে নিতে পারছিল না। শুভ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, মিরা আর এলিনা ছুটে গিয়ে আছড়ে পড়ল মেহেকের ওপর।
মেহেক তখনো নিকোলাসের নিথর বুকটা খামচে ধরে পাগলের মতো ডেকে চলেছে। এলিনা পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করে, কান্নাভেজা গলায় বলে,
- মেহেক, নিজেকে সামলাও! তোমার ভেতরে আরেকটা প্রাণ আছে, অন্তত তার কথা ভাবো!
কিন্তু মেহেক তখন কোনো যুক্তি, কোনো সান্ত্বনার ঊর্ধ্বে। তার সমস্ত পৃথিবী তখন ওই একটা স্ট্রেচারেই থমকে গেছে। তীব্র মানসিক আঘাত আর কান্নার ধকল সহ্য করতে না পেরে একসময় মেহেকের শরীরটা এলিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চারদিকের শোরগোল আর কান্না ছাপিয়ে মেহেক সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
………………………………
যখন মেহেকের চোখের পাতা দুটো আবার ধীরে ধীরে খুলল, চারপাশটা তার কাছে ভীষণ অচেনা আর শূন্য মনে হলো। ঘরের মৃদু আলোয় মেহেক নিজেকে আবিষ্কার করল একটা বিছানায়। মাথাটা ভীষণ ভারী, বুকের ভেতরটা ফাঁকা।
চোখ পুরোপুরি মেলতেই মেহেক দেখতে পেল, বাড়ির উঠোনে নিকোলাসকে ইতোমধ্যে শেষ গোসল করানো শেষ হয়েছে। কাফনের সাদা কাপড়ে মুড়ে নিকোলাসকে শুইয়ে রাখা হয়েছে খাটিয়ায়। মেহেক বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার পায়ে আজ কোনো জোর নেই, চোখে কোনো পানি নেই কেমন যেন একটা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য, পাথর হয়ে যাওয়া চাউনি।
মেহেক ধীর পায়ে, প্রায় রোবটের মতো হেঁটে খাটিয়াটার সামনে গিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল।
শুভ, মিরা, এলিনাসহ উপস্থিত সবাই তখন নিঃশব্দে কাঁদছে। কিন্তু মেহেক শান্ত। সে পরম মায়ায়, প্রাণভরে নিকোলাসকে শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছে। যে মানুষটার চেহারায় একসময় অহংকার খেলা করতো, আজ শুভ্র কাফনের কাপড়ে তাকে কী ভীষণ শান্ত আর পবিত্র লাগছে! সমস্ত পৃথিবীর আলো-আঁধারি, ভুল-ত্রুটি আর অনুতাপের ঊর্ধ্বে চলে গেছে সে আজ । মেহেক আলতো করে কাফনের কাপড়ের ওপর দিয়ে নিকোলাসের বরফ শীতল হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। যেন এই হাত মেহেক আর কখনো ছাড়তে চায় না। আজ দীর্ঘ সময় নিয়ে মেহেক তাকিয়ে থাকলো তার স্বামী নামক আসামির দিকে।
মেহেক ভাবতে থাকে নিকোলাস হয়ত এত আয়োজন এত মানুষ দেখে আজ মনে মনে বিড়বিড় করছে
- অতঃপর আমার সময় ফুরোলো। আমি নেতিয়ে পড়া চারাগছের ন্যায় মাটি ছুঁলাম। মানুষ জনের আনাগোনা দেখলাম, আকাশ দেখলাম। তারা কেউ আমাকে দেখলো না। আকাশ পানে উড়ে চলা সাদা গাঙচিলও আমায় দেখে টিটকারি মারলো। একসময় খুব ওড়ার সাধ জেগেছিল কিনা। আকাশ ছুঁতে চাওয়া উড়ন্ত, বাড়ন্ত আমিটা হঠাৎ করে কেমন মাটি ছুঁয়ে ফেললাম। দিগ্বিদিক ছুটে চলা আমার উথাল পাথাল মন কেমন শান্ত হয়ে গেল। ঝর্ণাধারার অশ্রুপাত দেখতে দেখতে শ্যাওলা হয়ে কেমন ভেসে গেলাম তেপান্তরে। ওহ! সেথায়ও আমার ঠাঁই মেলেনি। তবে ঠাঁই মিলেছিলো সাদা গাঙচিলের। রৌদ্রজ্বল দিনে পানির অভাবে শুকিয়ে পড়া শ্যাওলা শুষে নিয়েছিল সেই মাটি। আমি আবারও মাটি ছুঁলাম। মাটিতেই আমার নিঃশেষ।
একটা সময় পর শুভ চোখের পানি মুছে এগিয়ে এলো। নিকোলাসের শেষ যাত্রার সময় হয়ে এসেছে। শুভসহ আরও কয়েকজন মিলে খাটিয়াটা কাঁধে তুলে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো।
খাটিয়াটা একটু ওপরে উঠতেই মেহেক শক্ত করে নিকোলাসের হাতটা ধরে রাখল। মেহেমকও খাটিয়ার সাথে সাথে দু-পা এগিয়ে গেল। তার ভেতরের নীরব চিৎকার যেন বলছিল
- যেতে দেব না, নিক! তোমাকে আমি এভাবে যেতে দিতে পারি না!
কিন্তু চাইলেও আজ এই নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে আটকানো মেহেকের পক্ষে সম্ভব ছিল না। পৃথিবীর কোনো শক্তিই আজ নিকোলাসকে আর ধরে রাখতে পারবে না।
মিরা আর এলিনা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে এসে মেহেককে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারা আলতো করে মেহেকের হাতের বাঁধনটা নিকোলাসের হাত থেকে আলগা করে দিল। আঙুলের ফাঁক গলে নিকোলাসের শেষ স্পর্শটুকু যখন চিরতরে হারিয়ে গেল, মেহেক যেন তার বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটুকুও হারিয়ে ফেলল। শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে এক তীব্র বুকভাঙা যন্ত্রণায় মেহেক আবারও জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল মেঝের ওপর। আর সেই ফাঁকে, কাঁধের ওপর ভর করে নিকোলাস অলদ্রিন তার শেষ ঠিকানার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল, পেছনে রেখে গেল এক অন্তহীন বিরহের গল্প।
অদুর থেকে যেন দুটো লাইন ভেসে আসছে
প্রেম যে বোবো প্রেম যে কালা
তাই প্রেমে এতই জ্বালা
এই জ্বালায় পরাণ কান্দেরে
হিয়া জ্বলে পিয়ার দরদে
সন্ধ্যা নামতেই চারপাশের পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে হয়ে উঠল। তবে এই থমথমে ভাবের মাঝেও আজ কোনো আতঙ্ক নেই, আছে এক অদ্ভুত স্বস্তি। প্রতিটি বাড়ির খোলা জানালা গলিয়ে, ড্রয়িংরুমের কোণ থেকে ভেসে আসছে টেলিভিশনের চেনা টিউনিংয়ের শব্দ। সবকটি নিউজ চ্যানেলে তখন ব্রেকিং নিউজ স্ক্রল করছে।
নিউজ প্রেজেন্টার গম্ভীর কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে সন্ধ্যার প্রধান সংবাদ পড়ছেন
- আজকের সন্ধ্যার বিশেষ সংবাদ। দেশজুড়ে দীর্ঘদিনের যে আতঙ্কের রাজত্ব চলছিল, আজ ভোরে তার চিরতরে অবসান ঘটেছে। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, আজ ভোরে সেন্ট্রাল জেলের বিশেষ সেল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে সেই কুখ্যাত সাইকো কিলার নিকোলাস অলদ্রিনের মরদেহ। নিজের মাথায় নিজেই শ্যুট করে সে আত্মহত্যা করেছে।
আদালত থেকে ইতিমধ্যেই তার ফাঁসির চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে আর কিছুদিনের মধ্যেই সাজা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তার আগেই আইনের হাত থেকে বাঁচতে সে নিজেকে শেষ করে দিল। তবে এই মৃত্যুর পর দেশের সাধারণ মানুষের মনে অবশেষে স্বস্তি ফিরে এসেছে। যে বিভৎস খুনি রাতের পর রাত মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল, যার নৃশংসতার গল্প শুনলে শিউরে উঠতো সাধারণ মানুষ, সে আর কখনো কারও ওপর আঘাত হানতে পারবে না। সাইকো কিলার নিকোলাস অলদ্রিনের অধ্যায় আজ এখানেই সমাপ্ত।
টিভি স্ক্রিনে নিউজ প্রেজেন্টারের এই কথাগুলো শেষ হতেই প্রতিটি পরিবারে যেন একটা আনন্দের হাওয়া বয়ে গেল। চায়ের দোকানে, অলিতে-গলিতে জটলা পাকিয়ে থাকা মানুষগুলো আজ দীর্ঘ ১৭ দিন পর এক বুক শ্বাস নিয়ে শান্তিতে কথা বলছে।
নিকোলাস অলদ্রিন চলে গেছে। একসময়ের প্রতাপশালী, অহংকারী আর ভয়ংকর সেই মানুষটা আজ পুরো দুনিয়ার চোখে কেবলই এক ঘৃণিত অপরাধী হিসেবে বিদায় নিল। মেহেকের চেনা 'নিক' আজ কোটি মানুষের মনে এক পৈশাচিক স্বস্তি জুগিয়ে ধুলোয় মিশে গেল, আর পেছনে রেখে গেল একাকী এক নারীর বুকভাঙ্গা হাহাকার ও কিছু অমীমাংসিত অনুতাপ।
চলবে,,
( কান্নাকাটি আজ না কাল করো কেমন!"🙂🥲)