শেষ শেষ ফাইনালি নিকোলাস অলদ্রিন তোমাদের থেকে বিদায় নিল 💖
সাইকো রোমান্টিক থ্রিলার জনরা।
#হিয়া_জ্বলে_পিয়ার_দরদে
#নুসরাত_জাহান_ইভা
#অন্তিম_পর্ব
ছোটবেলা থেকেই নিকোলাসের চারপাশটা ছিল বড্ড একাকী, বড়ই নিস্প্রাণ। ধনাঢ্য আর অভিজাত পরিবারের সন্তান সে। বাবা হামিদ কায়সার দেশের একজন প্রথম সারির প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, আর মা পুষ্প কায়সার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা প্রফেসর।
বাইরে থেকে ঝকঝকে তকতকে এক সুখী পরিবারের অবয়ব থাকলেও, ভেতরের দেয়ালগুলো প্রতিনিয়ত ভাঙছিল। এমন কোনো দিন পার হতো না, যেদিন হামিদ কায়সার আর পুষ্প কায়সারের মধ্যে তীব্র চিৎকার আর ঝগড়া হতো না। যখনই সেই রণক্ষেত্র তৈরি হতো, কিশোর নিকোলাস ভয়ে এককোণে গুটিসুটি মেরে চুপসে যেত। অবুঝ গলায় কতদিন বাবা-মাকে অনুরোধ করেছে এসব বন্ধ করতে, কিন্তু তার সেই আকুতি কারও কানেই পৌঁছাত না।
সমাজ যাকে সফল ব্যবসায়ী হিসেবে চিনত, সেই হামিদ কায়সার আসলে ছিলেন এক চরম চরিত্রহীন মানুষ। শহরের আনাচে-কানাচে, নিষিদ্ধ আবাসিক এলাকায় ছিল তার অবাধ যাতায়াত। পুষ্প কায়সার একজন আত্মমর্যাদাশীল নারী হয়েও সমাজের ভয়ে এসব কথা মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারতেন না, আবার ভেতরে ভেতরে এই তীব্র অপমান সহ্যও করতে পারতেন না। আর তার এই ক্ষোভই রূপ নিত রোজকার সেই ভয়াবহ ঝগড়ায়।
সেদিনও তার ব্যতিক্রম ছিল না। ঘরে ফিরেই নিকোলাস টের পেল, আজ আবারও তার বাবা-মা তীব্র বিতণ্ডায় মেতে উঠেছেন। কিন্তু কিছু সময় পর আচমকাই পুষ্প কায়সারের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে গেল। কোনো এক অজানা আশঙ্কায় নিকোলাসের বুকটা কেঁপে উঠল। সে অত্যন্ত সতর্কতায়, পা টিপে টিপে বাবার ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। আলতো করে ভেতরে উঁকি দিতেই যে দৃশ্য নিকোলাসের চোখে পড়ল, তার জন্য পৃথিবীর কোনো সন্তানেরই প্রস্তুত থাকার কথা নয়।
ফ্লোরে নিথর হয়ে পড়ে আছে নিকোলাসের মা, চারপাশের মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। আর ঠিক তার পাশেই, বিছানায় তার বাবা এক পতিতা নারীকে নিয়ে মত্ত, যেন কাম আর সুখের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছেন তিনি! মায়ের রক্তাক্ত দেহ আর বাবার এই চরম পাশবিকতা দেখে কিশোর নিকোলাসের ভেতরের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মস্তিষ্কে তখন আর কোনো যুক্তি কাজ করছিল না, শিরায় শিরায় বইছিল প্রতিশোধের আগুন।
এক ছুটে টেবিলের ড্রয়ার থেকে বাবার লাইসেন্স করা রিভলবারটা বের করে আনল নিকোলাস। হাত কাঁপল না একটুও।
নিকোলাস প্রথম গুলিটা করল বিছানায় থাকা সেই মেয়েটিকে। তারপর পশুর মতো চেয়ে থাকা নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে পর পর চারটে গুলি ছুড়ল। চারপাশের কোলাহল নিমেষেই স্তব্ধ হয়ে গেল।
সব শেষ হওয়ার পর নিকোলাস ধীর পায়ে হেঁটে এসে মায়ের নিথর দেহের পাশে বসল। একদৃষ্টে মায়ের রক্তাক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কতক্ষণ, তার চোখে তখন কোনো জল ছিল না, ছিল এক জমাট বাঁধা পাথর। ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ করলেন হামিদ কায়সারের বিশ্বস্ত ম্যানেজার। ভেতরের এই বীভৎস দৃশ্য দেখে তিনি পুরোপুরি ঘাবড়ে গেলেন, ভয়ে কাঁপতে লাগলেন। কিন্তু নিকোলাসের শান্ত, শীতল চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি নিজেকে সামলে নিলেন এবং নিকোলাসকে শক্ত হতে বললেন।
কিছুক্ষণ পর ম্যানেজারের সাহায্যে নিকোলাস তার বাবা-মায়ের লাশ গাড়িতে তুলল। পুরো ঘটনাটাকে এমন নিখুঁতভাবে সাজানো হলো, যাতে বাইরে থেকে মনে হয় এটি একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা। কিন্তু নিকোলাসের ভেতরের সেই আদিম হিংস্রতা তখনও শান্ত হয়নি। বিছানায় পড়ে থাকা সেই পতিতা মেয়েটির লাশ দেখে তার চোখ দুটো তখনো যেন আগুন ঝরাচ্ছিল।
নিকোলাস রান্নাঘর থেকে একটা ধারালো ছুরি এনে মেয়েটার শরীরটাকে নির্মমভাবে টুকরো টুকরো করে কাটল। তারপর সেই মাংসের টুকরোগুলো নিয়ে গিয়ে রাস্তার ক্ষুধার্ত কুকুরদের খাওয়াল। সেদিন শহরের রাস্তার কুকুরগুলোও এক অদ্ভুত তৃপ্তি নিয়ে সেই মাংস খেয়েছিল।
আর এরপরেই নিজের আসল নাম আর অভিশপ্ত অতীতকে চিরতরে পেছনে ফেলে নিকোলাস চলে আসে অস্ট্রেলিয়ায়। কিন্তু সেই ভয়াল দৃশ্য তার অবচেতন মনে একটা স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে দিয়ে যায়। তার মাথায় চিরদিনের জন্য গেঁথে যায় একটি চরম সত্য
- পতিতারা কখনোই ভালো হয় না, এরা সমাজের এক একটা নোংরা কীট, এই সুন্দর পৃথিবীতে এদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।
আর এভাবেই, নিজের ভেতরের আয়ান কায়সার নামটাকে গলা টিপে হত্যা করে, এক অন্ধকার অতীত থেকে জন্ম নেয় নিকোলাস অলদ্রিন।
মিরা কথাগুলো শেষ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঘরের ভেতরের বাতাস তখন ভারী হয়ে উঠেছে।
মেহেক পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মিরার দিকে। তার কান দুটো যেন ভোঁ ভোঁ করছে। সে কি সত্যি শুনল এসব? অতীতের কাজে মানুষটা বাধ্য হয়েছে এমন করতে!!
- কী ভয়ানক এক গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেলাম আমরা, মেহেক! রায়হান তোমাকে চেয়েও পেল না, আমি রায়হানকে চেয়েও ভাগ্যকে পাশে পেলাম না। তুমি চাইলে নিকোলাসকে, সে-ও রইল ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর নিকোলাস? সে তো তোমাকে পেয়েও ধরে রাখতে পারল না, হারিয়ে ফেলল! আমাদের ভালোবাসার গল্পটা এতখানি নিষ্ঠুর না হলেও তো পারত!
মিরা থেমে এবার তার ব্যাগে হাত দিল। একটা ভাঁজ করা সাদা কাগজ বের করে সেটা আলতো করে বাড়িয়ে ধরল স্তব্ধ হয়ে থাকা মেহেকের সামনে।
- নাও এটা, নিকোলাস তোমাকে দিতে বলেছে। আজ পুরো ২৭ টা দিন হয়ে গেল নিকোলাস আমাদের মাঝে নেই। আই থিংক, এই কয়টা দিনে তুমি নিজেকে মেন্টালি যথেষ্ট স্ট্রং করে তুলতে পেরেছ এই চিঠিটা পড়ার জন্য!
মেহেক কাঁপতে থাকা হাত দুটো বাড়িয়ে দিল কাগজটার দিকে, যেন ওই কাগজের টুকরোটাতে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস।
……………………………………
মেহেক যখন কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে চিঠিটা মেলল, দুপুরের কড়া রোদ ততক্ষণে বিকেলের নরম আলোয় রূপ নিয়েছে। বেতের সোফাটায় বসে মেহেক কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে রইল।
- বুকটা এভাবে ধকধক করছে কেন?
মেহেক বুকে হাত রাখল কিছুক্ষণ।
খামটা ছিঁড়তেই নিকোলাসের চেনা সেই হাতের লেখা ভেসে উঠল চোখের সামনে। প্রতিটি অক্ষর যেন এক একটা জীবন্ত ক্ষত।
আমার আত্নার চেয়েও প্রিয় মিসেস অলদ্রিন,
ভালো আছো তুমি?! ফাইনালি চিঠিটা পড়ছো তাহলে! যাক, আমার জীবনটা অন্তত শেষলগ্নে এসে সার্থক হলো। আচ্ছা একটা কথা বলবে মিস্ট্রেস? আমার ভালোবাসায় কি খুব কমতি ছিল? যদি থেকে থাকে, প্লিজ কোনো অভিযোগ করো না। নাহয় আল্লাহ আমাকে ওপাড়ে আরও শাস্তি দেবেন। এমনিতেই এ জীবনে অনেক পাপ করে ফেলেছি, পাপের বোঝাটা বড্ড ভারী হয়ে গেছে আমার।
আচ্ছা মিস্ট্রেস! আমার বয়স কি খুব বেশি হয়ে গিয়েছিল? এত তাড়াতাড়ি কেন মরে গেলাম বলো তো? একটা ছোট্ট বাচ্চা, তোমাকে নিয়ে একটা ছিমছাম সুন্দর সংসার হলে বড্ড মন্দ হতো না, তাই না?
মিস্ট্রেস, তুমি জানো না, যেদিন আমি মিরার মুখে শুনলাম আমার রক্ত তোমার গর্ভে সেদিন আমি এত খুশি হয়েছিলাম যে মনে হচ্ছিল এই বুঝি খুশিতে আমার আত্মাটা শরীর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে! ইশ! কত ভালো হতো যদি তুমি নিজে আমায় এসে এই খুশির খবরটা দিতে? আমাদের সন্তানের কথা নিজের মুখে বলতে? কিন্তু তুমি এত পাষাণ হলে কী করে মিস্ট্রেস? শেষবারের মতো আমাকে একটা নজর দেখতেও এলে না!
যাইহোক, আমার মন বলছে আমাদের ছেলেই হবে। যদি ছেলে হয়, তাকে তুমি একদম নিজের মতো করে বড় করবে। তার পাপা একটা খুনী এইটা অন্তত তাকে জানতে দিও না। তোমার পবিত্র আদর্শে তাকে বড় করে তুলো। আর হ্যাঁ, ছেলে হলে তার নাম রেখো আজান কায়সার। এই অভিশপ্ত আয়ান কায়সারের ছেলে হবে আজান কায়সার। এই একটা অনুরোধ আমার, রেখো প্লিজ! আমার সন্তান কিন্তু পবিত্র ওকে তুমি নিজের জীবনের অভিশাপ মনে করো না জান। আমার ভালবাসার প্রতীক হিসেবেই সারাজীবন বয়ে নিও এই সন্তানকে।
মিস্ট্রেস! অপরাধী হয়ে গেলাম তোমার কাছে। আমি তোমাকে একটা সাজানো গোছানো সংসার দিতে পারলাম না। ভালো বাসতে পারলাম না ঠিকমতো। উল্টো আমার ছায়ায় এসে তুমি শুধু কষ্টই পেয়েছো এতদিন। সুখের বদলে আমার জন্য প্রতিদিন সহ্য করেছো হাজারো যন্ত্রণা, প্রতি রাতে লুকিয়ে কেঁদেছো। কিন্তু এখন তো আর আমি নেই, কোনো অশান্তি নেই। সুখে আছো তো তুমি এখন???
মিস্ট্রেস এই যে আমি এখন লিখছি, আমার চোখ দুটো বারবার ঝাপসা হয়ে আসছে। নোনা জলে কাগজের বুকটা ভিজে যাচ্ছে, আমি ঠিকমতো দেখতেও পারছি না কি লিখছি। হাতটা কাঁপছে বড্ড। তাও আজ আমায় লিখতেই হবে, এই পাথর হয়ে যাওয়া মনের সব কথা আজ না উগরে দিলে আমি শান্তিতে মরতেও পারবো না।
জানো মিস্ট্রেস, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে এখন। বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কেন জানি হঠাৎ করে বাঁচতে ইচ্ছে করছে খুব! বড্ড লোভ হচ্ছে এই পৃথিবীর আলোটার প্রতি। অথচ আমি এখন এমন এক নির্মম পথের যাত্রী, যেখান থেকে শতবার মাথা কুটলেও আর ফিরে আসা যাবে না। কিন্তু আজ আমার বাচতে ইচ্ছে করছে অনেক। ইশ খোদা কি পারতো না আমার জীবনটা আর পাচটা সাধারণ ছেলের মত দিতে?? আজ আমার এত করে বাঁচতে কেন ইচ্ছে করছে বলো তো? আমি তো জীবনে কোনো আফসোস নিয়ে মরছি না! তাও কেন মনটা এত ব্যাকুল হচ্ছে বাঁচার জন্য?
আমি যাকে চেয়েছি তাকেই বিয়ে করেছি, সংসার করেছি, আজ আমি বাবা হতে যাচ্ছি। আমার জীবনের সব স্বপ্নই তো পূরণ হলো! তাও কেন এই মুহূর্তে এসে মরতে ইচ্ছে করছে না? বলতে পারো মিস্ট্রেস? কেন বুকটা এভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে?
তুমি হয়তো ভাবছো একটা মানুষকে অল্প কদিনের দেখায় একটা ছেলে কীভাবে এত গভীর করে ভালোবাসতে পারে? না মিস্ট্রেস, এটা অল্প কদিনের গল্প নয়। আমি তোমাকে ভালো বেসেছি দীর্ঘ ৬টা বছর ধরে! আজ থেকে ছয় বছর আগে নিলয়ের মোবাইলে প্রথম তোমার একটা ছবি দেখেছিলাম। ব্যস, সেই প্রথম দেখাতেই তুমি আমার মনের গহীন কোণে স্থায়ী ঘর বানিয়ে নিয়েছিলে। যখন নিলয় ভিডিও কলে বাড়িতে কথা বলতো, আর তুমি অসতর্কভাবে ক্যামেরার সামনে চলে আসতে আমি দূর থেকে তৃষ্ণার্ত চোখে শুধু তোমাকে দেখতাম আর মুচকি হাসতাম। নিজের অজান্তেই আমার হাতটা চলে যেত বুকের বাঁ পাশে, যেখানে তোমার নামটা খোদাই করা ছিল।
আজ যখন সব শেষ, তখন মনে হচ্ছে যদি আর একটু সময় পেতাম! যদি তোমার হাতটা ধরে আর কয়েকটা দিন বাঁচা যেত! কিন্তু নিয়তি বড় নিষ্ঠুর মিস্ট্রেস।
তুমি জানো মিস্ট্রেস, একটা অন্ধকার অতীত পিছু তাড়া করেছিল বলে খুব যত্নে একটা জিনিস নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছিলাম এতদিন। ছোট্ট একটা রিভলবার। কত রাতে এটাকে হাতে নিয়ে ভাবতাম, যদি কখনো জীবনটা বড্ড বেশি অসহ্য হয়ে ওঠে, তবে নিজেকে নিজেই শেষ করে দেব। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি কখনো ভাবতেই পারিনি এত তাড়াতাড়ি, এত হুট করে নিজের মাথায় এটার ট্রিগার চেপে ধরতে হবে! শালার জীবন পেলাম একটা, অথচ সেই জীবনটাকে একটু ছুঁয়ে দেখার, একটু ভালোভাবে উপভোগ করার সুযোগটাই পেলাম না। বুকভরে দুটো শান্তিতে নিঃশ্বাস নেওয়ার আগেই সব ফুরিয়ে গেল।
জানো মিস্ট্রেস, আজ যে পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি, আমি চাইলেই কিন্তু এই খেলায় খুব সহজে জিতে যেতে পারতাম। এই নিকোলাস অলদ্রিন কোনোদিন হারতে শেখেনি। কিন্তু যখন ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিপক্ষটা স্বয়ং তুমি সেখানে নিজের সবটুকু উজাড় করে হেরে যাওয়াটাকেই আমি শ্রেয় মনে করেছি। তোমার কাছে হারার মাঝেই যে আমার পরম আনন্দ, আমার পরম মুক্তি!
আমি তোমাকে ভালোবাসি মিস্ট্রেস। এত ভালোবাসি যে তা কোনো শব্দ দিয়ে, কোনো ভাষা দিয়ে তোমাকে বোঝানো যাবে না। আমার ভালোবাসার গভীরতা যে কতটা অথৈ ছিল, তা পরিমাপ করার ক্ষমতা এই পৃথিবীর কোনো নিক্তির নেই। তুমিও কোনোদিন তা মেপে শেষ করতে পারবে না।
গত কয়েকটা দিন ধরে আমার রাতগুলো কেমন কেটেছে জানো? যখন চারপাশটা নিঝুম হয়ে আসত, রাত গভীর হতো, আমি একা একা নিজের মাথায় ওই ঠান্ডা রিভলবারটা ঠেকিয়ে রাখতাম। আঙুলটা ট্রিগারের ওপর কাঁপত। কতবার যে মরে যেতে চেয়েছি, কতবার যে এই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি চেয়েছি, কিন্তু শেষমেশ পারিনি। অদ্ভুত না? এই নিকোলাস অলদ্রিন তো কোনোদিন মৃত্যুকে ভয় পায়নি! যমদূত সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও যার চোখের পলক পড়ত না, সেই মানুষটা আজ মৃত্যুর ঠিক দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে কেন এত ভয় পাচ্ছে বলো তো? কেন আজ তার হাত দুটো এভাবে কাঁপছে?
বোধহয় ভেতরে ভেতরে আমি তোমার কাছ থেকে দূরে যাওয়ার ভয় পাচ্ছি। আমাদের অনাগত সন্তানটাকে না দেখতে পাওয়ার ভয়ে আমার আত্মাটা কুঁকড়ে যাচ্ছে আজ।
মিস্ট্রেস, তুমি এত বাঁকা কেন বলো তো? আমার বুকের বাম পাঁজর দিয়ে তৈরি হয়েছ বলেই কি তোমার মনে এত বক্রতা? এত ঘাড়ত্যাড়া, এত জেদি কেন তুমি?
তুমি চেয়েছিলে আমি যেন আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করি, আর শেষ পর্যন্ত তুমি তোমার সেই জেদটাই বজায় রাখলে! বুক ভেঙে যায় ভেবে,, একটা মানুষ এতটা নিখুঁত কীভাবে হতে পারে? একটা মানুষ নিজের মুখে বলা কথা এতটা নির্মমভাবে সত্য করে কীভাবে দেখায়? যা বললে, ঠিক তা-ই করে ছাড়লে!
যে তীব্র জিদ আর ত্যারামি নিয়ে তুমি আমাকে দূরে ঠেলে দিলে মিস্ট্রেস। ঠিক ততখানি জিদ আর অধিকার নিয়ে তুমি আমাকে ভালোও তো বাসতে পারতে! কেন বাসলে না?
এখন আমার শুধু একটাই তাড়না চিঠিটা কোনোমতে শেষ করে মিরার হাতে দিতে পারলেই আমি বাঁচি। ও এটা তোমার কাছে পৌঁছে দেবে, এই ভরসাটুকু বুকে নিয়ে মরতেও শান্তি। এটা তোমার হাতে চলে গেলে আমার মনে আর কোনো আক্ষেপ থাকবে না, কোনো অভিযোগ থাকবে না।
যখন আমার নিথর দেহটা তোমার সামনে এসে দাঁড়াবে, তখন অন্তত কোনো অভিযোগ করো না! কেন এভাবে একা ফেলে গেলাম এই প্রশ্নটাও তুলতে এসো না। মনে রেখো, শাস্তিটা তুমিই দিতে চেয়েছিলে, আমার সন্তানকে আমার বুক থেকে কেড়ে নিয়ে, আড়ালে রেখে। কিন্তু একজন বাবা হয়ে এই জীবন্ত নরকের শাস্তি আমি আজীবন বয়ে বেড়াতে পারতাম না। তুমিই বলো কীভাবে পারতাম? আমার নিজের রক্ত, আমার সন্তান আমাকে ছাড়া বড় হবে আর আমি এই অন্ধকার সেলের ভিতর ছটফট করব? এই নির্মমতা আমি আর বরদাস্ত করতে পারলাম না মিস্ট্রেস।
মিস্ট্রেস, মিরার কাছে আমি একটা চাবি দিয়েছিলাম, ও কি সেটা তোমার হাতে দিয়েছে? যদি দিয়ে থাকে, তবে আমার পাশের বন্ধ রুমের তালাটা আজ একটু খুলে দেখো। খুব অপটু হাতে তোমার জন্য কিছু সারপ্রাইজ রেখে গিয়েছিলাম সেখানে। জানি না তোমার ভালো লাগবে কি না।
মিস্ট্রেস ও আমার মিস্ট্রেস! জীবনের এই শেষপ্রান্তে এসে, মৃত্যুর একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমার কী ইচ্ছে করছে জানো? বড্ড ইচ্ছে করছে তোমাকে শেষবারের মতো একটাবার খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরি! যদি জড়িয়ে ধরতে নাও পারি, অন্তত একটু ছুঁয়ে দেখি তোমার হাতটা। এই চাওয়াটা কি খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে মিস্ট্রেস? একজন মৃত্যু পথযাত্রী মানুষের এই শেষ ইচ্ছেটুকু কি খুব বড় অন্যায়?
কিন্তু কপাল আমার এমনই মন্দ যে, জীবনের এই অন্তিম ক্ষণে এসেও আমি তোমাকে একটু ছুঁতে পারছি না, তোমাকে একটু বুক উজাড় করে ভালোবাসতে পারছি না! এই চরম ব্যর্থতা, এই বুকফাটা হাহাকার আমি কোথায় লুকাবো বলো? আমার খুব ইচ্ছে ছিল মিস্ট্রেস, তোমার কোলে মাথা রেখে, তোমার হাতের স্পর্শ পেতে পেতে আমি আমার জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটুকু ছাড়বো। কিন্তু নিয়তি আজ আমাকে কোথায় এনে দাঁড় করালো! চারপাশটা কেমন শূন্য, বড্ড অন্ধকার। আমার ভয় লাগছে খুব।
হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি নিজেকে শেষ করে দেব। তবে বিশ্বাস রাখো যখন নিজের মাথায় নিজেই ট্রিগারটা চাপবো, তখনো আমি শুধু তোমার কথাই ভাববো মিস্ট্রেস। আমার এই পাপী চোখ দুটো যখন চিরতরে বুজে আসবে, তার শেষ মুহূর্তেও হয়তো সেখানে শুধু তোমার ওই মায়াবী মুখটাই ভেসে থাকবে।
মিস্ট্রেস, তোমার কি আমার কথা একবারও মনে পড়ে না? একটা বারের জন্যও কি এই অপরাধীটার জন্য তোমার বুকটা কেঁপে ওঠে না?
আচ্ছা আমি মারা যাওয়ার পর, যখন আমার এই নিথর, ঠান্ডা দেহটা তোমার সামনে পড়ে থাকবে, তখন কি তুমি আমায় জড়িয়ে ধরবে? একটুখানি কান্না করবে তো আমার জন্য? তোমার ওই পবিত্র চোখ থেকে দুটো ফোঁটা অশ্রুকণা কি আমার এই অভিশপ্ত শরীরের ওপর ফেলবে? প্লিজ কেদোঁ মিস্ট্রেস! একটুখানি কেদোঁ আমার জন্য। এই বিশাল পৃথিবীতে যে তুমি আর আমাদের অনাগত সন্তান ছাড়া আমার আপন বলতে আর কেউ নেই! আমি যে বড্ড একা মিস্ট্রেস, বড্ড একা।
মিস্ট্রেস আমার বড্ড কান্না পাচ্ছে আজ। খুব কান্না পাচ্ছে। চিঠি লেখার এই শেষ পর্যায়ে এসে আমার চোখ দিয়ে এত অশ্রুকণা কেন ঝরছে বলো তো? কেন আজ আমার এই অবাধ্য কান্নারা কোনো বাঁধ মানতে চাইছে না? বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে যাচ্ছে। ইশ! এই মুহূর্তে, ঠিক এই চরম মুহূর্তে তোমাকে বড্ড প্রয়োজন ছিল আমার। সব ভুলে যদি শুধু একটাবার তোমার ওই বুকে মাথাটা রাখতে পারতাম, তবে হয়তো জীবনের সব ক্ষত ভুলে একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারতাম মিস্ট্রেস!
আমার স্ত্রী, আমার মিস্ট্রেস, আমার জীবনের একমাত্র বিনাশকারী তুমি ভালো থেকো, অনেক অনেক ভালো থেকো।
কোনো এক বৃষ্টির রাতে আমার মিস্ট্রেস বলেছিল সে নাকি আমার বিনাশকারী হবে। সেদিন প্রবল বর্ষণের শব্দে তার কথাটা এক চিলতে হাসিতে উড়িয়ে দিয়েছিলাম, অতটা গায়ে মাখিনি। কিন্তু আজ চারপাশের এই নিস্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন হাড়হিম করা সত্যিটা টের পাই। আজ বুঝতে পারছি, তার সেই প্রতিটি শব্দ কতটা নিখুঁত আর নির্মমভাবে সত্যি ছিল।
আমি আজ চলে যাচ্ছি, এই পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছি তাতে কী হয়েছে? আমার শরীরের রক্ত তো তোমার শরীরে মিশে আছে। আমারই এক অংশ তোমার গর্ভে একটু একটু করে বড় হয়ে উঠছে। তাকে নিয়েই তুমি সুখে থেকো, নিজের একটা সুন্দর পৃথিবী গুছিয়ে নিও। সে হবে আমার চ্যাম্প। আমার জন্য মাথা নুইয়েছো মিস্ট্রেস কিন্তু আমার চ্যাম্পই হবে একদিন তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তোমার সবচেয়ে বড় অহংকার । তার হাত ধরেই তুমি মাথা উঁচু করে বাঁচবে, মিস্ট্রেস।
বেশিদিনের সংসার ছিল না আমাদের। ৮ মাসের সংসারে আমি তোমাকে অনেক যন্ত্রণা দিয়েছি। তুমি মাফ না করলে তোমার আল্লাহও আমাকে মাফ করবে না আজ।
শুনো না যাওয়ার আগে একটা শেষ কথা রেখো মিস্ট্রেস। তোমার এই মন, তোমার এই পবিত্র দেহ তুমি আর কখনো অন্য কোনো পুরুষকে ছূঁতে দেবে না! তোমার দেহের এমন কোনো অংশ নেই, যা আমার এই দুই ঠোঁট পরম ভালোবাসায় আর তীব্র আকুলতায় স্পর্শ করেনি। তাই আমার রেখে যাওয়া জিনিসে অন্য কেউ যাতে কখনো হাত বাড়ানোর সাহস না দেখায় মিস্ট্রেস। তোমার জীবনে আমিই যেন শেষ পুরুষ হয়ে থাকি মিস্ট্রেস। এই অধিকারটুকু আমার ওপাড়ে যাওয়ার পরও কেড়ে নিও না প্লিজ!
মেহেক ও আমার মেহেক! তুমি শুধু আমার স্ত্রী নও, তুমি আমার ভালোবাসা, আমার বেঁচে থাকার তীব্র মোহ, আমার আত্মার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভালো থেকো তুমি। আজ থেকে এই পাপের ছায়া কিংবা এই অভিশপ্ত পাপী আর কোনোদিন তোমার পিছু নেবে না, কোনোদিন তোমার চেনা আলোয় অন্ধকার ছড়াবে না। এবার অন্তত বুক ভরে শ্বাস নাও, শান্তিতে বাঁচো তুমি। অন্তত আমায় ভুলে যেও না। এই অধমকে একটু মনের মনিকোঠায় জায়গা দিও মিস্ট্রেস আমি সেখানেই একটু জায়গা নিয়ে চুপটি মেরে বসে থাকেব শুধু। তোমায় একটু জ্বালাবও না কথা দিচ্ছি।
লোকে বলে চোখের আড়াল হলে নাকি মনেরও আড়াল হয়ে যায়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এই সস্তা সান্ত্বনা চলবে না মিস্ট্রেস। আমাকে তোমার মনে রাখতেই হবে, আজীবন। কখনো প্রশান্তির ঘুমে, কখনো বা চমকে ওঠা দুঃস্বপ্নে আমি তোমার স্মৃতিতে হানা দেবই। আমাকে ভুলে যাওয়ার কোনো পথ আমি তোমার জন্য খোলা রাখিনি। আমি তোমাকে বাধ্য করব আমায় মনে রাখতে।
আমার আত্নার অংশ মিসেস কায়সার পরজন্মেও যদি প্রাণ পাই, তবে সৃষ্টিকর্তার কাছে তোমাকেই চেয়ে নেব। তোমাকেই ভালোবাসার জন্য আমি আবার জন্ম নেব। কারণ আখিরাতে তোমার আর আমার দেখা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পাপ আর পুণ্য কখনো একসাথে থাকার নিয়ম নেই যে।
মিস্ট্রেস কাগজ ফুরিয়ে এসেছে আমার। সাথে সব আলো নিভে আসছে মিস্ট্রেস, আমার সময়ও ফুরিয়ে এসেছে। ভোরও হয়ে গেছে। ভাবছি শেষবারের মত আবারও নামাজে দাড়াব। আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে নিব সবকিছুর জন্য।
শুনো না মিস্ট্রেস। মন ত চাইছে আবার ফিরে তাকাই তোমার দিকে। ভুলে যাই সবকিছু। আর আবার নতুন করে শুরু করি। কিন্তু,,,, কিন্তু এবার যখনই তুমি আমার চোখের দিকে তাকাবে তোমার কষ্ট হবে। এইজন্যই বলেছিলাম জীবনের রাস্তায় কারো হাত ধরে অনেকটা পথ এগিয়ে যাওয়ার পর সেখান থেকে একা একা ফিরে আসাটা খুব কঠিন। তবু চলতে হয়। কাছে আসার জন্য কখনো কখনো দূরে যেতে হয় মিস্ট্রেস।
যাওয়ার আগে তোমাকে আমার হৃদয়ের শেষ গানটা উৎসর্গ করে গেলাম আজ
যার বিশালতার মাঝে
আমি একটুকু পাই নি ঠাই
তাকে কৃতজ্ঞতা জানাই
সে যে দিয়েছে আমায়
মহাশূন্যে আশ্রয়
মহাশূন্যের সেই অতল অন্ধকারেই আমি হারিয়ে যাচ্ছি মিস্ট্রেস। ভালো থেকো আমার ভালোবাসা। বিদায়।
ইতি,
তোমার নামের পাশে নিজের নামটা লিখে যাওয়া এক পাপী
নিকোলাস অলদ্রিন
মেহেক এবার কাঁপতে কাঁপতে চিঠির কাগজটা নিজের বুকের গভীরে শক্ত করে চেপে ধরল, যেন এটার ভেতরে এখনো নিকোলাসের হৃদস্পন্দন বাকি আছে। কাঁদতে কাঁদতে মেহেকের দম বন্ধ হয়ে আসছিল, হেঁচকি উঠে গেল বুকে। যে মানুষটাকে সে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য ভেবেছিল, সেই মানুষটা যে তাকে এতটা অতলান্ত গভীরতায় ভালোবাসত, তা মেহেক কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি।
চোখের পানি মুছতে মুছতে মেহেক আকাশের দিকে তাকাল। গোধূলির শেষ রক্তিম আলো তখন মিলিয়ে যাচ্ছে মহাশূন্যের বুকে। মেহেক তার ভেতরের সমস্ত আকুলতা উগরে দিয়ে বুক ফেটে জোরে চিৎকার করে উঠল
- আমি ভালোবাসি আপনাকে, নিক! বড্ড ভালোবাসি! আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন আমার কথা? একটিবার ফিরে এসে দেখুন না আপনার মিস্ট্রেসকে কতটা সুখে আছে সে!!
- ভেবেছিলাম এই শহরের বুকে আমাদের গল্পটা অন্যরকম হবে। কতজন মিলে এসেছিলাম আমরা এই শহরে। আমি, আপনি, নিলয় ভাইয়া, রায়হান। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, আজ এই বিশাল শহরে আমি একদম একা। আপনি তো মহাশূন্যের বিশালতায় নিজেকে হারিয়ে নিলেন, কিন্তু আমার যে কোথাও হারাবারও পথ নেই।
- নিকোলাস অলদ্রিন রূপী এক অধরা মানুষ না হয়ে, আপনি যদি শুধুই আমার আয়ান কায়সার হয়ে থেকে যেতেন, তবে কী এমন ক্ষতি হতো, নিক?
তবুও আপনাকে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ আমাকে ভালোবাসার এক স্বর্গীয় অনুভূতি দেওয়ার জন্য, একটা সাজানো সংসার দেওয়ার জন্য। একজন নারী হিসেবে মাতৃত্বের যে পরম আনন্দ, তা তো আমি আপনার মাধ্যমেই পেয়েছি। সব মিলিয়ে আমার জীবনে আপনার অবদানের জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আপনার দেওয়া প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি ভালোবাসা আমি আজীবন হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখব।
কিছুক্ষণ পর, নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে মেহেক উঠে দাঁড়াল। তার অবশ হয়ে আসা হাতের মুঠোয় তখনো শক্ত করে ধরা ছিল মিরার দেওয়া সেই চাবিটা। বাংলাদেশ থেকে বিগত ২৭ দিনে অসংখ্য কল এসেছে।মেহেকের বাবা মা তাকে দেশে আসতে বলছে। কিন্তু মেহেক যাবে না বলে দিয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতেই ধীর, ক্লান্ত পায়ে ছাদ থেকে নেমে মেহেক নিকোলাসের সেই চিরচেনা বন্ধ ঘরটার সামনে গেল। চাবিটা যখন তালার ভেতরে ঘুরল, সেই ধাতব শব্দটা মেহেকের বুকে তীরের মতো বিঁধল।
ধীরে ধীরে দরজার পাল্লাটা খুলতেই মেহেক এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বিস্ময়ে তার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল।
এ কি দেখছে মেহেক! পুরো ঘরের চারদিকের বিশাল দেয়াল জুড়ে শুধু একটি মুখ ------ মেহেক!
কোনো এক অদৃশ্য জাদুকর যেন ক্যানভাসের বুকে তার সমস্ত আবেগ ঢেলে দিয়েছে। কোথাও মেহেক আপনমনে হাসছে, কোথাও জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, কোথাও আবার তার চুলে জড়িয়ে আছে জুই ফুলের মালা। নিকোলাস অলদ্রিন তার এই রুক্ষ, অপটু হাতে জলরং আর তুলি দিয়ে মেহেকের প্রতিটি রূপ, প্রতিটি অভিব্যক্তিকে নিখুঁতভাবে জীবন্ত করে তুলেছে।
মেহেক ধীরপায়ে দেয়ালের সামনে এসে দাড়াল। এক একটা ছবির সামনে গিয়ে পরম মমতায়, খুব আলতো করে হাত বোলাতে লাগল। প্রতিটি আঁচড়ে মেহেক অনুভব করতে পারছিল নিকোলাসের সেই নিভৃত রাতের দীর্ঘশ্বাস, তার ভালোবাসার তীব্র ছোঁয়া।
হাত বুলাতে বুলাতে হঠাৎই ঘরের ঠিক মাঝখানের সবচেয়ে বড় ছবিটার সামনে এসে মেহেক থমকে গেল। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মেহেক।
ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে মেহেক দাঁড়িয়ে আছে, তার কোলে ফুটফুটে একটা সদ্যজাত বাচ্চা। মেহেকের ঠোঁটে এক স্বর্গীয় মায়ের হাসি। আর ঠিক তাদের পেছনে, আবছা অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে একটি দীর্ঘ, চওড়া ছায়া। এক জোড়া অদৃশ্য হাত দিয়ে সেই ছায়াটি যেন মেহেক আর তার সন্তানকে পুরো পৃথিবী থেকে আগলে রেখেছে।
মেহেকের বুঝতে বাকি রইল না, এই নির্বাক ছবিটা দিয়ে নিকোলাস আসলে কী বোঝাতে চেয়েছিল।
মৃত্যুর শীতল থাবা নিকোলাসকে স্পর্শ করার আগেই নিকোলাস বুঝতে পেরেছিল, এই আলো-আঁধারির খেলায় সে আর বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না। নিকোলাস হয়তো সশরীরে এই পৃথিবীতে থাকবে না, কিন্তু মৃত্যুর ওপারে দাঁড়িয়েও সে তার মিস্ট্রেস আর তাদের ভালোবাসার শেষ চিহ্নকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ছেড়ে দেবে না।
এই ছায়াই নিকোলাস। এই ছায়াই তার অস্তিত্ব।
মেহেক সেই ছবিটার ওপর নিজের কপালটা ঠেকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল।
- তুমি ভুল ছিলে নিক, তুমি মহাশূন্যে আশ্রয় পাওনি। তুমি আশ্রয় পেয়েছ আমার এই বুকের ভেতর, আমাদের সন্তানের স্পন্দনে। তুমি যেখানেই থাকো না কেন, আমি জানি তুমি আমাদের ছায়া হয়েই থাকবে, চিরকাল।
ঘরের কোণে তখন নিকোলাসের রেখে যাওয়া সেই সুরটা যেন অলক্ষ্যেই বেজে উঠছিল
সে যে দিয়েছে আমায় মহাশূন্যে আশ্রয়.......
____________ সমাপ্ত __________