ততক্ষণে ইরফান ডান হাতে মাইরার ওড়না ছুড়ে ফেলে দিয়ে, সে হাত জামার ফাঁকে গলিয়ে দিয়ে অবাধ্য বিচরণ চালায়। মাইরা কেঁপে ওঠে। দু'হাতে ইরফানের ডান হাতঠোঁট চেপে ধরে হাতের বিচরণ থামাতে চাইলে ব্যর্থ হয়। মেয়েটার নিঃশ্বাস অতি ভারি। ঢোক গিলে আওড়ায়, 'কি করছেন? হাত সরান।'
ইরফান মাইরার কথা কথা কানে নিল না। সে তার কাজে ব্যস্ত। মাইরা হাসফাস করে। কিন্তু নড়ল না। ইরফান মাইরার ঘাড়ে ছোট ছোট চুমু আঁকে, দু'হাত অবাধ্য। চোখ বুজে রেখে ফিসফিস কণ্ঠে আওড়ায়,
'ইউ আর আ ভেরি লিটল গার্ল।'
পরদিন সকাল সকাল মাইরা ঘুমে থাকতেই ইরফান লাবিবকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে। উদ্দেশ্য লাবিবের বাবার কাছে লাবিবকে ফেরত দিবে, সাথে তার শর্তগুলো আদায় করে নিবে। গতকাল লাবিবকে এনে দেয়ার পর থেকে মাইরাকে কাছে না পাওয়ার যে প্যারা সে খেয়েছে, লাবিবকে এখানে আর এক মুহূর্ত রাখবেনা।
ইরফান লাবিবের বাবাকে গতকাল রাতেই জানিয়ে দিয়েছিল সে এই শহরে লাবিবকে তার কাছে ফেরত দিবে। একটি নির্দিষ্ট জায়গার নামও টেক্সট করে দিয়েছে।
একটি ফাঁকা জায়গায় ইরফান দাঁড়িয়ে আছে। পাশে শুদ্ধ, তার কোলে লাবিব। শুদ্ধ ইরফানকে জহুরি চোখে দেখছে। সকাল সকাল তার বাড়ি গিয়ে তাকে ঘুম থেকে টেনে তুলে এনেছে এই ব্যাটা ইরফান। কিন্তু যখন শুনল লাবিবকে ইরফান গতকাল গ্রাম থেকে এনেছে, আর এখন আবার ফেরত দিচ্ছে এসেছে। দু'টো ভাবলে শুদ্ধ'র মাথা এলোমেলো লাগে। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। ইরফান এসব কাজ কেন করছে এটাই বুঝতে পারছে না। সে লাবিবের দিকে চেয়ে বলে,
'এই বাচ্চা, সত্যি করে বল, তোমাকে কে এনেছে?'
লাবিব আদোআদো স্বরে বলে,
'সুত্তি সুত্তি, আমাকি খুচিব ডুলাবাই এনিচে।'
লাবিবের কথা শুনে শুদ্ধ শব্দ করে হেসে দেয়। ডান হাতে লাবিবের গান টেনে বলে, 'কি নাম দিয়েছিস রে! খুচিব ডুলাবাই। ওয়াহ্, কেয়া বাত হে!'
লাবিব হেসে বলে, 'ওয়া ওয়া কিয়া বাত হি!'
শুদ্ধ হাসে। ইরফান লাবিবের দিকে বিরক্ত চোখে চেয়ে বলে,
'ডিজগাস্টিং শালা।'
শুদ্ধহয়ে ইরফানের দিকে তাকায়। হাসতে হাসতে বলে, 'ওরে বাবা, শালা দুলাভাইকে ডাকে খুচিব ডুলাবাই, আর দুলাভাই শালাকে ডাকে ডিজগাস্টিং শালা। মানে পুরাই জমে একেবারে ঘন গবর।'
কথাটা বলে শুদ্ধ ইরফানের
থুতনিতে হাত দিয়ে হেসে বলে,
'কি রে লাবিবের খুচিব ডুলাবাই, দিনকাল কেমন যায়?'
ইরফান রেগে শুদ্ধর হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দেয়। বিরক্তি কণ্ঠে বলে, 'সাটআপ।'
তখনই লাবিবের বাবা হতদন্ত পায়ে এসে দাঁড়ায়। শুদ্ধ'র কোলে সুস্থ লাবিবকে দেখে কলিজায় পানি আসে। দ্রুত কোলে নিতে চাইলে ইরফান লাবিবের সামনে বা হাত রেখে আটকে দেয়। ভদ্রলোক লাবিবকে দেখে আশেপাশের কাউকে খেয়াল করেনি। এখন বাঁধা পেয়ে সামনে তাকায়। ইরফানকে দেখে ভদ্রলোকের চোখমুখে বিস্ময় ভর করে। এটা তো মাইরার স্বামী। এরপর সে শুদ্ধ'কে খেয়াল করে। মনে পড়ল বিয়ের দিন শুদ্ধ নওজেকে মাইরার ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাকে শাসিয়েছিল। আবারো দৃষ্টি ঘুরিয়ে ইরফানেরচোখের দিকে তাকিয়ে অবাক কণ্ঠে বলে, 'তুমি?'
ইরফান গম্ভীর গলায় বলে,
'ইয়েস, ইট'স মি। মাইরা'স হাসবেন্ড, ইরফান নেওয়াজ।'
ভদ্রলোক রেগে বলে,
'তুমি আমার ছেলেকে.....
মাঝ থেকে ইরফান বলে,
'রাইট। আমি আপনার ছেলেকে কিডন্যাপ করেছিলাম। আপনি শর্ত মানলে ছেলেকে পাবেন, আদারওয়াইজ নো।'
শুদ্ধ একবার ইরফানের দিকে তাকায় তো একবার লাবিবের বাবারমাইরা দিকেকিছুক্ষণ তাকায়। কি হচ্ছে এখানে? লাবিবকে ইরফান কিডন্যাপচুপ করে এনেছে মানে কি? লাবিব তার বাবাকে দেখে বাবার কাছে যেতে চায়, শুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলে,
'এ্যাই ইরফানের ডিজগাস্টিং শা'লা থাম। বুঝতে দে এখানে কি হচ্ছে।'
লাবিব মুখ ফোলায়।
ইরফান দু'হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে বলে, 'লাবিবকে আবারো কখন, কিভাবে কিডন্যাপ করে মে'রে দিব, 'আপনি কিছু জানতে পারবেন না। বাট আপনি আমার শর্ত মেনে নিলে লাবিব সেইভ থাকবে।'
লাবিবের বাবা মধ্যবিত্ত ঘরের একজন। খুব স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন চলে না তার। এর উপর ইরফানকে দেখে তার ভালোই ক্ষমতাবান লোক বলে মনে হচ্ছে। সেদিন মাইরাকে তাদের গ্রাম থেকে তুলে আনতে গিয়ে ইরফান হেলিকপ্টার নিয়ে গিয়েছিল। গতকাল তার ছেলেকে তুলে এনেছে। সবমিলিয়ে ভদ্রলোক ইরফানকে বেশ ভ'য় পেল। ইরফান গম্ভীর গলায় বলে,
'আমার ওয়াইফকে রিয়েল বাবার মতো ট্রিটমেন্ট করতে হবে। আন্ডারস্ট্যান্ড?'
শুদ্ধ বোধয় এবার বুঝল ইরফানের আসল কাহিনী। ওরে শালা, মাইরার দুঃখ দূর করার জন্য কি নাটক সাজিয়েছে এই ব্যাটা, ভাবা যায়! শুদ্ধ-ও ইরফানের সাথে তাল মিলিয়ে বলে,
'হ্যাঁ 'হ্যাঁ, আপনি আমার ভাইকে এতক্ষণে নিশ্চয়ই চিনেছেন? ও কিন্তু সুবিধার মানুষ নয়। আপনার বাচ্চার জীবন সেকেন্ডের মাঝে ফিনিশ করে দিবে।
এরপর শুদ্ধ লাবিবের গালে হাত বুলিয়ে অসহায় মুখ করে বলে,
আহারে! ফুলের মতো বাচ্চাটার জীবন অকালে ঝরে যাবে!'
কথাটা বলে শুদ্ধ মিটিমিটি হাসল। লাবিবের বাবা ইরফানের দিকে চেয়ে ভীত কণ্ঠে বলে,
'আমি তোমার শর্ত মানবো। মাইরার সাথে খুব ভালো ব্যাবহার করব। মাইরা আমার বাড়ি আসলে ওকে আর যেতে বলব না। ওর মা, লাবিব এদের সাথেও মিশতে দিব। আমার ছেলেটাকে তোমরা ছেড়ে দাও।'
কথাটা বলতে বলতে লাবিবের বাবা দু'হাত জোর করে। শুদ্ধ'র খারাপ-ই লাগলো। লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে বাচ্চা ছেলেটার জন্য গতকাল থেকে ভীষণ ছটফট করেছে। আহারে! এমন কিউট এক বাচ্চা, তাও আবার নিজের, যদি জানা যায় তার মৃ'ত্যু সংকটে তখন সেই বাবার কেমন অনুভূতি হবে? ব্যাপারটি শুদ্ধ পুরোপুরি ফিল করতে না পারলেও বেশ বুঝল। এক রাতেই লোকটার উপর টর্নেডো বয়ে গেছে। এই ইরফানটার মাথায় বেশ বুদ্ধি!
ইরফান লাবিবকে শুদ্ধ'র কোল থেকে তার কোলে নেয়। এরপর লাবিবের বাবাকে ইশারায় বলে,
'নিচে দেখুন।'
ভদ্রলোক লাবিবকে নেয়ার জন্য ছটফট করছিল। ইরফানের কথায় নিচে দৃষ্টি রাখলে দেখল তাদের মাঝ বরাবর একটু চাকু খাড়া করে গেড়ে রাখা। ভদ্রলোকের ভ্রু কুঁচকে যায়। উপরে তাকায়।
তখনই ইরফান লাবিবের বাবার কোলে দিতে নেয় লাবিবকে। ভদ্রলোক ছেলেকে একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ে নিবে এমন, কিন্তু মাঝ বরাবর এসে ইরফান হাত আলগা করে দেয়। লাবিব নিচের দিকে পড়ে যেতে নেয়। লাবিবের বাবা চেঁচিয়ে ওঠে 'লাবিব' বলে। তিনি ভেবে নিয়েছে আজ লাবিবের জীবন শেষ। নিচু হয় লাবিবকে ধরার জন্য। তার আগেই ইরফান নিচু হয়ে লাবিবকে ধরে নেয় বা হাতে। তাকায় আতঙ্কিত মুখে থাকা লাবিবের বাবার পানে। বাঁকা হেসে বলে,
'ভেরি গুড। সবসময় এভাবেই ভ'য় পাবেন। আমার ওয়াইফের সাথে নেক্সট টাইম খারাপ বিহেভ করলে, সিচুয়েশন এর চেয়েও ভ'য়া'ব'হ হবে। মাইন্ড ইট।'
কথাটা বলে ইরফান লাবিবকে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। লাবিব কেঁদে দিয়েছিল। ইরফান ধরে নিয়েছে বলে তার কান্না থেমেছে। কাঁদোকাঁদো স্বরে বলে, 'পুচা খুচিব ডুলাবাই।'
ততক্ষণে লাবিবের বাবা সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার ইরফান লাবিবকে ভালোভাবে লাবিবের বাবার কোলে দিয়ে দেয়। ভদ্রলোক ছেলেকে পেয়ে ছেলেকে সাপ্টে ধরে নিজের সাথে। চোখের কোণে পানি জমেছে তার। তার বাচ্চা এটা, তার র'ক্ত। লাবিবও বাবাকে পেয়ে বাবা বাবা বলে। হাসে। একদিন পর বাবাকে পেয়ে খুব খুশি সে।
লাবিবের বাবা গ্রামেই ছিল। এখন পর্যন্ত লাবিবের মাকে জানায়নি সে লাবিবের ব্যাপারটি। লাবিবের মা নরম মনের। এই দুধের বাচ্চার পরিস্থিতি এতো কঠিন জানলে তার কি হত কে জানে! সে অপেক্ষায় ছিল লাবিবকে কাছে পাওয়ার। গতকাল মাঝরাতে লাবিবকে ফিরে পাবার মেসেজ পেয়ে সারারাত ছটফট করেছিল লাবিবের বাবা। সকাল হতেই রওয়ানা হয়েছিল শহরের পথে। এখন ছেলেকে পেয়ে হৃদয় ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। ভদ্রলোক মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, মাইরার সাথে এই জীবনে আর কখনো উঁচু গলায় কথা বলবেনা।
শুদ্ধ ইরফানের দিকে চেয়ে ঢোক গিলল। গরম লাগছে তার। ভাবা যায়, কি ভয়া'নক কান্ড বাঁধিয়েছে এই ইরফান। যদি একটু হেরফের হয়ে লাবিব সত্যি সত্যি ওই খাড়া চাকুর উপর পড়ে যেত, কি হত? ভাবতেই গলা শুকিয়ে আসছে তার।
ইরফান মাঠে আগে থেকে গেড়ে রাখা চাকুটি তুলে শুদ্ধ'র দিকে ছুড়ে দিলে শুদ্ধ কেচ ধরে নেয়। ইরফান তার পথে এগোয়, পিছু পিছু শুদ্ধ। ইরফানকে জিজ্ঞেস করে,
'যেকোনো ভালোবাসাই মন থেকে হয় ইরফান। লাবিবের বাবা নিজের ছেলের জন্য ভ'য় থেকে মাইরার সাথে বাবার ভালোবাসার এক্টিং করবে। কি লাভ এতে?'
ইরফানের দু'হাত প্যান্টের পকেটে। সে হাঁটতে হাঁটতে সূক্ষ্ম হেসে বলে,
'সো হয়াট? একসময় মাইরা লাবিবের বাবাকে নিজের বাবার জায়গায় বসিয়েছিল। ভুল প্রমাণিত হয়ে ক'ষ্ট পেয়েছে। লোকটির জন্য ওর সৎ মা অ্যান্ড সৎ ভাইয়ের সঙ্গে ডিকেন্স তৈরী হয়েছে। ওর কেউ নেই ভেবে ও দুঃখ পেয়েছে। বাট এখন ওর নিজেকে আর অসহায় মনে হবে না। সবার ভালোবাসা পেয়ে মাইরার মনে হবে ওর-ও একটা ফ্যামিলি আছে। সৎ বাবার মিথ্যে ভালোবাসা পেয়েও ও হাসবে। দ্যাটস এনাফ। হোয়াটএভার, বাবার রিয়েল লাভ দেয়ার জন্য তো আমার বাবা আছেই।'
ইরফানের কথা শুনে শুদ্ধ বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। বুঝল মাইরার ব্যাপারে ইরফান সব জেনেছে। তবে ইরফানের কথাগুলো বেশ ভালো লাগলো। সত্যিই মাইরার জন্য তার খারাপ লাগতো। কিন্তু এখন অন্তত ওর এই মা আর ভাইকে যখন খুশি কাছে পেয়ে মেয়েটির দুঃখ কমবে। হাসল শুদ্ধ।
বলে,
'তুই তো মারাত্মক জিনিয়াস ভাই।'
ইরফান পাত্তা দিল না শুদ্ধ'র কথা বিড়বিড় করে, 'মাই বার্ডফ্লাওয়ার।'
ঘাড়ের কাছে অনবরত উষ্ণ শ্বাস আঁচড়ে পড়ায় সামিয়া ঘুমের মাঝে নড়েচড়ে ওঠে। সময়ের সাথে সাথে এর তীব্রতা বাড়তে থাকে, এক পর্যায়ে সামিয়ার ঘুম পুরোপুরি ভেঙে যায়। ঘুমঘুম চোখ ধীরে ধীরে মেলে। বোঝার চেষ্টা করে সে কোথায়। ঘুমঘুম চোখদু'টো ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে গেলে বুঝতে পারে, তার সাথে কেউ একজন চেপে শুয়ে আছে। মনে পড়ে, গতকাল নাছিমের সাথে তার বিয়ে হয়েছে। মেয়েটার দৃষ্টির আকার বড় হয়। হতদন্ত হয়ে উঠতে গেলে নাছিমের মাথার সাথে সামিয়ার মাথা জোরেসোরে এক ঠোকা লাগে। নাছিমের ঘুম ছুটে যায়। চোখেমুখে বিরক্তির ভাঁজ ফুটে ওঠে। চোখ মেলে তাকালে পাশে সামিয়াকে নজরে আসে।
সামিয়া দ্রুত হাতে তার এলোমেলো শাড়ি ঠিক করছিল। নিজেকে ভালোভাবে ঢেকে সামনে তাকালে নাছিমের সাথে চোখাচোখি হয়। নাছিম লালিত চোখ দ্বারা গম্ভীর চোখে সামিয়ার দিকে চেয়ে আছে। সামিয়া ঢোক গিলল। এই লোকটা তার পাশে শুয়েছে কেন? কথাটা ভাবনায় আসতেই মিনমিন করে প্রশ্ন করে ফেলে,
'আপনি এখানে ঘুমিয়েছেন কেন?'
নাছিম সটান হয়ে শোয়া। দু'হাত আড়াআড়িভাবে বুকে গুঁজে রাখা। গলা ঝেড়ে উত্তর করে,
'তাহলে কোথায় ঘুমাবো?'
সামিয়া চুপ করে রইল। নাছিম থমথমে কণ্ঠে বলে, 'বেড ছাড়া ঘুম হয়না আমার।'
সামিয়া চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। বলে, 'এর জন্য আপনি আমার পাশে ঘুমাবেন? আমার ডিভোর্সের পর আমি আরেকটা বিয়ে করলে সে যদি শোনে, আমি আপনার পাশে শুয়েছি, সে-ও আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে।'
নাছিম ভ্রু কুঁচকে বলে,
'তোমার আগে বিয়ে হয়েছে শুনলে, তোমার কিছু না হলেও সবাই ভাববে তোমার সবকিছু শেষ। তাছাড়া সে যদি বেশি বুঝদার হয়, তোমাকে বিলিভ করে, তাহলে তাকে বলে দিবে আমি যথেষ্ট স্পেস দিয়ে ঘুমাতাম, কিন্তু তুমি সুযোগ বুঝে তোমার বর্ডার ক্রোস করে আমার দিকে চলে আসতে।'
সামিয়া চোখ বড় বড় করে তাকায়। খেয়াল করল, সত্যিই সে নাছিমের দিকে চলে এসেছে। কিন্তু সে কি করবে? সে ঘুমিয়ে থাকলে তো তার হুশ থাকেনা। বলে,
'দেখুন, আপনি আমার পাশে আর ঘুমাবেন না। আমি ঘুমিয়ে গেলে হুশে থাকিনা।'
নাছিম বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
'তাহলে ঘুমিয়ো না।'
'মানে?'
'ডিস্টার্ব কর না। এমনিতেই তোমার জন্য গতকাল সারারাত ঘুমাতে পারিনি।'
সামিয়া বিরক্ত হয়। নিজে ছ্যাঁকা খেয়ে ঘুমাতে না পেরে কিভাবে তার দোষ দিচ্ছে! সে বলে,
'আপনি ঘুমাতে পারেননি, কারণ আপনি ছ্যাকা খেয়েছেন, এখানে আমার কি দোষ?'
নাছিম কটমট চোখে চেয়ে বলে,
'তোমাকে ভালো মেয়ে ভেবেছিলাম।'
সামিয়া মিনমিন করে বলে,
'আমি তো ভালোই।'
নাছিম শোয়া থেকে উঠে বসে। গতপরশু সামিয়ার বুঝিয়ে বলা কথাগুলো মনে পড়ল। সেই অনুপাতে মন বলল মেয়েটা বন্ধু হিসেবে খারাপ না। কিন্তু আজ মুখের উপর সত্যি বলে দেয়ায় নাছিমের সহ্য হলো না। সে বেড থেকে নেমে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলে,
'তুমি যথেষ্ট অভদ্র মেয়ে। ভালো হয়ে যাও। পয়সা লাগলে আমাকে বলবে। তুমি আমাকে পরশুরাতে হেল্প করেছিলে। তার প্রতিদান হিসেবে আমি এটুকু করতেই পারি।'
সামিয়া বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে দেখল নাছিমের প্রস্থান। কি বলে গেল? সে অভদ্র? ভালো হওয়ার জন্য না-কি আবার তাকে পয়সাও দিবে। লোকটা কি খারাপ! সামিয়ার রা'গ হলো।
নাছিম শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখল সামিয়া এখনো বিছানার উপর বসে আছে। শরীরে গতকালকের সেই শাড়ি।
নাছিম নিজেও গতকাল ফ্রেশ না হয়েই ঘুমিয়ে গিয়েছিল। সে এগিয়ে এসে বলে,
'ফ্রেশ হয়ে নাও।'
সামিয়ার ধ্যান ভাঙে। সে বোধয় নাছিমের কথা শুনলো মা। মাথা তুলে নাছিমের দিকে চেয়ে বলে,
'আমি আপনার সাথে থাকতে চাইনা।'
নাছিমের গায়ে একটি গ্যাবার্ডিন প্যান্ট সাথে একটি টি-শার্ট। সে তার মাথার ভেজা চুল দু'হাতে ঝাড়তে ঝাড়তে বলে,
'সেইম ঠু ইউ।'
সামিয়া ঢোক গিলল। গতকাল বিয়ের পর নাছিমকে দেখার আগ পর্যন্ত তার স্বামীর প্রতি যে চিন্তাধারা ছিল, সেটা এখন নেই। এমনিতেই মেয়েটা ছেলেদের প্রতি ভীষণ অস্বস্তি ফিল করে। এর উপর নাছিম তাকে বলেছে তাদের ডিভোর্সের কথা, ফলে নাছিম তার স্বামী ভাবলেও অস্বস্তির পরিমান বিন্দুমাত্র কমেনি। যেখানে নাছিমকে স্বামী ভাবার আগেই বলা হয়েছে ডিভোর্সের কথা, সেখানে মেয়েটার অস্বস্তি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। যার ফলে নাছিমের সাথে একঘরে থাকার ব্যাপারটি সে মেনে নিতে পারছেনা। সামিয়া মিনমিন করে বলে,
আমি আপনার সাথে এভাবে একঘরে থাকতে চাই না।'
নাছিম দু'হাত প্যান্টের পকেটে দু'হাত রেখে দাঁড়ায়। ঘুম কম সাথে এখন লম্বা শাওয়ার নেয়ার ফলে চোখ দু'টো বেশ লাল হয়ে আছে। সে সামিয়ার দিকে চেয়ে বলে,
আজ থেকে মায়ের সাথে থাকবে। আমি ম্যানেজ করে দিব, ডোন্ট ওয়ারি!'
সামিয়া আবারো বলে,
আমি কি আগের মতো আমার রুমমেটদের সঙ্গে গিয়ে থাকতে পারবো না?'
নাছিম কাটকাট জবাব দেয়,
নো। আমার ওয়াইফ হয়ে অন্য ফ্ল্যাটে গিয়ে থাকা যাবেনা।'
আপনি তো আমাকে মানেন না আর মানবেনও না। তাহলে আমি কেন আপনাদের বাড়ি থাকবো?'
সামিয়ার কথাটায় কেমন যেন অসহায়ত্ব ফুটে উঠল। নাছিম কি বলবে বুঝল না। এদিকে সামিয়া কথাটা বলে নিজেও অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সাথে নিজের বোকা কথায় নিজের উপর খানিক বিরক্ত হলো। এরপর মিনমিন করে বলে,
বুঝেছি, যতদিন আমরা স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে আছি, ততদিন আপনাদের বাড়িতেই থাকতে হবে। কিন্তু আমাকে একটা আলাদা ঘর দিবেন, প্লিজ!'
নাছিম সামিয়ার দিকে চেয়ে আছে। অনুশোচনা কাজ করছে তার। এইজন্যই সে বিয়ে করতে চাইছিল না। সে তো ভাবতে পারেন। তার বার্বিডলের জায়গায় অন্যকাউকে। কিন্তু মাঝখান থেকে এই মেয়েটির জীবন ন'ষ্ট হয়ে গেল না? এই কথাটা তার মা, বন্ধুরা কেউ ভাবলো না। ছেলেটা ঢোক গিলল। বড় করে একটা শ্বাস টেনে বলে,
'দিব।
এরপর এগিয়ে এসে সামিয়ার দিকে ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
'ক্যান উই বি ফ্রেন্ডস্?'
হঠাৎ নাছিমের এহেন কাজে সামিয়া অবাক হয়। তাকায় নাছিমের দিকে। নাছিম মৃদু হেসে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সামিয়া কি বলবে বুঝল না। মানুষটাকে অতটাও খারাপ লাগলো না তার।
নাছিম অনুতপ্ত স্বরে বলে,
'আমি জানি, তোমার এরকম লাইফ প্রাপ্য ছিল না। দোষটা আমারই। মায়ের জন্য আমার বিয়েতে মত দেয়া ঠিক হয়নি। কারণ আমি আর পাঁচজনের মতো কারো হাসবেন্ড হতে পারবনা। এর কারণও তুমি জানো। বাট আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমাদের ডিভোর্সের পর আমি নিজ দায়িত্বে তোমার জন্য অনেক ভালো পাত্র আনব। যে তোমার সমস্ত সিচুয়েশন সফলি বুঝবে, তাছাড়া এজ আ ফ্রেন্ড, আমি তো আছি।'
সামিয়া নাছিমের কথাগুলো শুনলো। অবাক হলো। এর আগে নাছিমকে যেমনই দেখুক, একটুও চিনতে পারেনি। আজ মনে হলো, সে বেশ ভালোই চিনল নাছিমকে। নাছিমের বলা সব কথা ভালো না লাগলেও একেবারে খারাপও লাগলোনা, নাছিমের জায়গা থেকে ভেবে। সামিয়া তাকালো নাছিমেট বাড়িয়ে রাখা হাতের দিকে। সে হয়ত বন্ধু হওয়ার অফারটা ছুড়ে ফেলতে চাইছেনা। তাই হাত বাড়িয়ে হাতে হাত মেলাতে চায়। কিন্তু অস্বস্তির কারণে চাইলেও এগোতে পারছেনা। নাছিম বুঝল না কি-না, সামিয়াকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে সে
তার হাত সরিয়ে আনে। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,
'সবকিছুর জন্য অ্যা'ম স্যরি! তোমার কোনো প্রবলেম হলে আমাকে অবশ্যই জানাবে।'
এটুকু বলে নাছিম ঘর থেকে বেশি যায়। সামিয়া মলিন মুখে চেয়ে রইল। নাছিমকে তার ভীষণ ভালো মানুষ মনে হলো। কিন্তু এই মানুষটার সাথে থাকার ভাগ্য তার নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামিয়া বেড থেকে নেমে ওয়াশরুমে চলে যায়। অনেক বেলা হয়েছে। ফজর নামাজ পড়ে ঘুমিয়েছিল, তাই উঠতে লেট হয়ে গেল। কি-জানি নাছিমের মা তাকে কি বলে! যদিও ভদ্রমহিলাকে ভীষণ ভালো মানুষ বলে মনে হয়।
মাইরা ঘরে এপাশ-ওপাশ করে অনবরত পায়চারি করছে। গতরাতে অনেক লেট করে ঘুমানোয় দেরিতে তার ঘুম ভেঙেছে। গতকাল রাতে ইরফান তাকে শান্তি করে একটুও ঘুমোতে দেয়নি। জ্বা'লিয়েছে সারারাত। অ'সভ্য লোক। এসব নিয়ে ওতোটা ভাবছেও না সে। দুঃখের ব্যাপার হলো, ঘুম থেকে উঠে সে লাবিবকে পাচ্ছিল না। এরপর ভ'য়ে ভ'য়ে রুমা নেওয়াজকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে, সে জানায় ইরফান লাবিবকে নিয়ে গিয়েছে। মাইরা এটাও জানে, ইরফান লাবিবকে তাদের বাড়ি দিয়ে এসেছে। কারণ কিছুক্ষণ আগে তার মা কল করেছিল। ভীষণ খুশি মনে বলছিল, তাকে ওই বাড়ি যেতে। মাইরা কিছুটা অবাক হয়েছিল, সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে, যখন লাবিবের বাবা নিজে ফোন নিয়ে তাকে ওই বাসায় যেতে বলেছে। আরও অবাক করার ব্যাপার, ভদ্রলোক মাইরার সাথে খুব সুন্দর করে কথা বলেছে। মাইরার এখনো মনে হচ্ছে সে একটা ভুলভাল স্বপ্ন দেখেছে। আর সে লাবিবের বাবার থেকেই জেনেছে, ইরফান লাবিবকে তার কাছে দিয়ে এসেছে।
এতো এতো চিন্তা নিয়ে ঘুরঘুর করছিল মেয়েটি, তখনই শ'ক্ত বুকে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেতে নিলে ইরফান মাইরাকে টেনে ধরে।
মাইরা ইরফানকে দেখে রে'গে বলতে নেয়, তার ভাইকে না বলে কেন নিয়ে গিয়েছে। কিন্তু সে থেমে যায়। মনে পড়ল তার মা আর লাবিবের বাবা তাকে ওই বাড়ি যেতে বলেছে। যারা তাকে একবেলা ওই বাড়ি থাকতে দিত না, তারাই আজ এতো সুন্দরভাবে ওই বাড়ি যেতে বলছে। মা আর ভাইয়ের সাথে একসাথে বসে একটুখানি হেসে কথা বলাটাই তার কত স্বপ্ন। র'ক্তের কেউ নেই তার। আছে হয়ত, কিন্তু তার খোঁজ নেয় না। নিজের মা নেই, বাবাও নেই। কে খোঁজ নিবে? কিন্তু
তার এই সৎ মা তাকে খুব ভালোবাসে। অথচ ভাগ্য তাদের একসাথে একটু হেসে কথার সুযোগও দেয়নি। কিন্তু আজ সেই সুযোগগুলো কিভাবে যেন পাবে বলে মনে হচ্ছে। তাই
মাইরা অন্যসব ভাবনা চেপে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলতে নেয়, সে তার মায়ের বাড়ি যেতে চায়, কিন্তু থেমে যায়, হঠাৎ ইরফান কাছে আসায়।
ইরফান মাইরাকে তার দিকে টেনে নিয়ে গলায় মুখ ডুবিয়েছে। গলায় উষ্ণ শ্বাস আছড়ে পড়ায়, মাইরা কেঁপে ওঠে। ইরফান ফিসফিস কণ্ঠে আওড়ায়,
'স্টুপিড গার্ল, ওড়না খুলে রেখে আমাকে সিডিউস করতে চাইছিলে? নট ব্যাড। বাট ইউ নো? আমি তোমার ফেস দেখে, ভয়েস শুনেও সিডিউস হয়ে যাই। আই কান্ট কন্ট্রোল মাইসেল্ফ। ইট'স আ বিগ প্রবলেম। ফাস্ট সুস্থ হয়ে যাও। ওকেই?'
লজ্জায় মাইরা হাসফাস করে ওঠে। ইশ! ওড়না নিতে ভুলেই গিয়েছিল। তার মাঝেই ইরফান চলে এসেছে। নড়েচড়ে দাঁড়াতে চাইলে ইরফান আরও শক্ত করে ধরে মাইরাকে।
তখনই শুদ্ধ ইরফানকে ডাকতে ডাকতে এদিকে আসে। শুদ্ধের গলা পেয়ে মাইরার মোচড়ামুচড়ি বাড়ে। হাসফাস কণ্ঠে বলে, 'ছাড়ুন আমাকে, শুদ্ধ ভাইয়া আসছে।'
ইরফানের ধ্যান নেই। দু'হাতে শক্ত করে মাইরাকে নিজের সাথে চেপে ধরে রেখেছে। গলা জুড়ে ছোট ছোট চুমু আঁকতে ব্যস্ত সে। মাইরা দাঁত কিড়মিড় করে বলে, 'অসভ্য লোক, আমায় ছাড়ুন বলছি।'
শুদ্ধের গলা একদম দরজার কাছ থেকে পেয়ে ইরফানের হুশ ফেরে। সে দ্রুত মাইরাকে ছাড়ে। এরপর সাথে সাথে মাইরাকে তার কোর্টের ভেতরে ঢুকিয়ে নেয়। দু'হাতে মাইরাকে চেপে ধরে তার বুকে। যদিও মাইরা পুরোপুরি কভার হয়নি, তবে অনেকটাই হয়েছে। চোখমুখ খিঁচে দাঁড়িয়ে রইল মেয়েটা। দু'হাতে সাপ্টে ধরে ইরফানকে। কোন দুঃখে যে ওড়না নেয়নি তখন! এজন্য এখন এমন বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে।
শুদ্ধ দরজা থেকে ভেতরে আসতে নিলে ইরফান রাখানিত স্বরে বলে, 'স্টপ শুদ্ধ।'
শুদ্ধের পা থেমে যায়। চোখে পড়ে ইরফান তার দিকে রেগে তাকিয়ে আছে। শুদ্ধ কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় ইরফান একটি মেয়েকে ধরে রেখেছে দেখে। যদিও মাইরার শুধু পা দেখা যাচ্ছে, তবে শুদ্ধ মাইরাকে চিনে ফেলল। কোনো একটা ঝামেলার জন্যই মাইরা শান্ত হয়ে আছে, শুদ্ধ বুঝল। সে মিটিমিটি হেসে গলা ঝেড়ে বলে, 'উহুম উহুম, সকাল-দুপুরে এ কি খুল্লাম খুল্লাম রোমান্স চলছে বাবু সোনারা?'
ইরফানের কোর্টের ভেতর মাইরার মুখ কাঁদোকাঁদো হয়ে যায়। লজ্জায় ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। ইরফান বিরক্তি কণ্ঠে বলে, 'এখান থেকে যা।'
শুদ্ধ হেসে বলে, 'আরে যাবো যাবো। কিন্তু তার আগে আমার ভাবিসাহেবার মূল্যবান মুখ কি একবার আমি দেখিতে পারি? ওগো ভাবিসাহেবা, একবার আমাকে আপনার মুখদর্শন করিয়ে ধন্য করিবেন কি?'
শুদ্ধের নাটকীয় ভঙ্গিতে বলা কথায় মাইরার লজ্জা বাড়ে। শুদ্ধ আবারো কিছু বলতে নিলে ইরফান শুদ্ধের দিকে একটি গ্লাস ছুড়ে মেরে চেঁচিয়ে বলে, 'যাবি তুই?'
শুদ্ধ ততক্ষণে দৌড় দিয়েছে। কাঁচের গ্লাসটি ভেঙে দরজার কাছে টুকরো টুকরো হয়ে আছে।
শুদ্ধ চলে গিয়েছে বুঝতেই মাইরা ইরফানকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। এরপর দৌড়ে গিয়ে বিছানার অপরপাশে রাখা ওড়না গায়ের জড়িয়ে নেয়। ইরফান বিরক্ত চোখে তাকায়। মাইরা ইরফানের দিকে একটু এগিয়ে এসে বলে, 'আজকে আমি মায়ের বাড়ি যেতে চাই।'
ইরফান কিছু বলার আগেই মাইরা আবারো বলে, 'আপনি নিষেধ করলেও যাবো। আমার মা আমাকে যেতে বলেছে। লাবিবের বাবাও বলেছে।'
কথাটা বলতে বলতে মাইরা দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। মাইরার দৌড়ানোয় ইরফান বিরক্ত হলেও মাইরার কথা শুনে ইরফানের ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসি ফোটে। বিড়বিড় করে, 'ওহ, আই সি!'
কিছুক্ষণ পর,
ইরফানের ঘরের ডিভানের উপর শুদ্ধ হেলান দিয়ে বসে কানে ফোন নিয়ে কথা বলায় ব্যস্ত, 'কি বলবি বল? বউ দিয়ে আসলাম। দিনে একবার হলেও একটু বউয়ের চিন্তা কর বাপ।'
নাছিম বিরক্তি কণ্ঠে বলে, 'পারব না। তোরা বিয়ে দিয়েছিস, তোরা চিন্তা কর। ইরফানকে একটু দিবি? ও কি আমার উপর এখনো রেগে আছে?'
শুদ্ধ হতাশ কণ্ঠে বলে, 'মনে হচ্ছে গার্লফ্রেন্ডের খোঁজ নিতে গিয়ে বউকে পাত্তা দিচ্ছে না।'
কথাটা বলে বেডের উপর বসা ইরফানের দিকে তার ফোন ছুড়ে দিয়ে বলে, 'এই ইরফান নে, তোর গার্লফ্রেন্ড ফোন করেছে। দেখ কি বলে!'
তখনই ঘরে মাইরা প্রবেশ করে। হাতে একটি ট্রে, যাতে দু'কাপ কফির মগ। শুদ্ধের কথা শুনে মাইরা ইরফানের দিকে তাকায়। ইরফানের গার্লফ্রেন্ড ফোন দিয়েছে মানে? সে একবার ইরফানের দিকে তাকায় তো একবার শুদ্ধের দিকে। শুদ্ধ মাইরাকে দেখে হাসল। উঠে দাঁড়িয়ে মাইরার হাতের ট্রে থেকে একটি কফির মগ নিয়ে হেসে বলে, 'আরে মাইরা যে! ইরফানের গার্লফ্রেন্ডের সাথে কনভারসেশন শুনবে না? এসো, এসো বসো।'
শুদ্ধের কথায় ইরফান তাকায় মাইরার দিকে। মাইরার বিস্ময় দৃষ্টি তার-ই দিকে। ইরফান জানে কলে নাছিম আছে। এজন্য সে ফোন নিতে চাইছিল না। কিন্তু মাইরাকে দেখে সে সিদ্ধান্ত পাল্টালো। হাত বাড়িয়ে ফোন তুলে নিয়ে কানে ধরে। সূক্ষ্ম হেসে গম্ভীর স্বরে বলে, 'মাই জান। হাউ আর ইউ?'
ওপাশে নাছিম ইরফানের কন্ঠে এমন ধারার কথা শুনে থতমত খেয়ে যায়। ইরফান রেগে তার সাথে কথাই বলছিল না। আর এখন একেবারে জান ডেকে বসল? ইরফানের মাথার প্রবলেম হলো না-কি তার কানের প্রবলেম হলো? নাছিম কোমরে হাত দিয়ে ভাবুক হয়ে ঘরের এপাশ-ওপাশ হাঁটতে লাগলো। উত্তরে কি বলা যায় সেটাই ভাবছে।
শুদ্ধ কফির মগে দ্বিতীয় চুমুক দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু ইরফানের কথা শুনে সে কেশে ওঠে। সে ভাবতেই পারেনি ইরফান এমন মজা করতে পারে! আড়চোখে মাইরার দিকে তাকায়। পেট ফেটে হাসি পাচ্ছে তার। কিন্তু বহুকষ্টে নিজেকে সামলালো।
মাইরা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় ইরফানের দিকে। দু'হাতে শক্ত করে ট্রে চেপে ধরে। এই অসভ্য লোকটা তার মতো এত সুন্দরী বউ ঘরে রেখে কোন রাক্ষসীকে জান ডাকছে? ইচ্ছে করছে ইরফানের গলা চেপে জান ডাকা বের করা। অসভ্য লোক একটা।
ভাবনা রেখে মাইরা শুদ্ধের দিকে তাকালে শুদ্ধ ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, 'বছর পাঁচেক হবে ওদের রিলেশনের। বেশ ডিপ রিলেশনশিপ বুঝলে?'
শুদ্ধের কথা শুনে মাইরার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। মানে কি? ইরফানের রিলেশন মানে? ইরফানকে দেখে তো একটুও বোঝা যায় না, তার গার্লফ্রেন্ড আছে। তাছাড়া তাদের বিয়ের পর শুদ্ধ তো নিজেই তাকে তাদের বিয়ে নিয়ে ভাবতে বলেছিল। বলেছিল বিয়ে একবারই হয়, আরও কত কি! আর এখন শুদ্ধ-ই উল্টো কথা বলছে। মাইরা ঢোক গিলে বলতে নেয়, 'কিন্তু ভাইয়া আপনি যে.....'
কথার মাঝেই শুদ্ধ বলে ওঠে, 'আমার একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজ পরে গিয়েছে মাইরা। আজ আসি কেমন?'
কথাটা বলে শুদ্ধ হাতের কফি মগ টি-টেবিলের উপর রেখে তাড়াহুড়ো করে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। মাইরা আর কিছু বলার সুযোগ-ই পেল না। সে তাকায় ইরফানের দিকে, যে এখন ফোন রেখে অনবরত ল্যাপটপে আঙুল চালাতে ব্যস্ত। মাইরা কটমট চোখে তাকালো। গার্লফ্রেন্ডকে জান ডেকে এখন কাজ দেখানো হচ্ছে। মাইরা হাতের ট্রে টি-টেবিলের উপর শব্দ করে রেখে ধুপধাপ পা ফেলে ইরফানের পাশে এসে দাঁড়ায়। দু'হাত কোমরে রেখে রাগে ফোঁসফোঁস করতে করতে বলে, 'আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে, তাহলে আমাকে বিয়ে করলেন কেন?'
ইরফান তাকালো না। যেন শুনতেই পায়নি। তার গভীর মনোযোগ ল্যাপটপে নিবদ্ধ। মাইরা এবার ইরফানের দিকে একটু ঝুঁকে আগের চেয়েও জোরে চেঁচিয়ে বলে, 'আপনার গার্লফ্রেন্ড থাকতে আমাকে এভাবে বিয়ে করলেন কেন হ্যাঁ? বলছেন না কে......'
বাকিটুকু বলার আগেই ইরফান তার কোলের উপর থেকে ল্যাপটপ ঠাস করে বেডের উপর রেখে মাইরাকে টেনে তার কোলে বসায়। এক সেকেন্ড-ও সময় ব্যয় না করে ঠোঁটের ভাঁজে নিয়ে নেয় মাইরার ঠোঁটজোড়া। হঠাৎ ইরফানের এহেন কাজে মাইরা হতভম্ব হয়ে যায়। পড়ে যাওয়ার ভয়ে দু'হাতে ইরফানের গলার দিকটায় খামচে ধরেছিল। যা এখন আরও দৃঢ় করল। সরে আসতে চাইল ইরফানের থেকে। কিন্তু ইরফান বা হাতে শক্ত করে মাইরার কোমর চেপে রেখেছে। ডান হাত মেয়েটার চুলের ভাঁজে। প্রায় তিন মিনিটের মাথায় ইরফান মাইরাকে ছেড়ে দেয়। মাইরা-ও ইরফানের গলায় বসানো নখ আলগা করে দেয়। চোখ বুজে ঘনঘন শ্বাস ফেলে মেয়েটা। ইরফান তাকায় মাইরার দিকে। চুলের ভাঁজ থেকে হাত সরিয়ে এনে বুড়ো আঙুল মাইরার লালিত ভেজা ঠোঁটজোড়ায় চালাতে চালাতে বলে, 'এই ডিলিসিয়াস চকলেট খেতে।'
মাইরার শরীর শিরশির করে ওঠে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালে ইরফানের সাথে চোখাচোখি হয়। মাইরা ঢোক গিলে বলে, 'সত্যি আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে?'
ইরফান মাইরার চোখে চোখ রেখে বলে, 'হুম।'
মাইরা কটমট চোখে চেয়ে বলে, 'অসভ্য লোক। ক্যারেক্টারলেস আপনি। থাকবো না আপনার....'
ইরফানকে আবারো তার দিকে এগোতে দেখে মাইরা দ্রুত দু'হাতে তার ঠোঁটজোড়া চেপে ধরে মিনমিনিয়ে বলে, 'থাকবো থাকবো। কিন্তু আপনার গার্লফ্রেন্ড...।'
ইরফান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে, 'সো হোয়াট? ইউ আর পার্মানেন্ট, গার্লফ্রেন্ড ইজ টেমপোরারি।'
মাইরা চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। ইরফান যে তার সাথে মজা করছে, এটা সে এখন বুঝতে পারছে। তাছাড়া শুদ্ধ ভাইয়ার মতো মানুষ তো এসব নিয়ে একদম সিরিয়াসের মতো করে মজা করবে, এটাই স্বাভাবিক। সে-ও কি বোকা! এরা দু'ভাই তাকে বোকা বানিয়েছে, আর সে-ও বোকা হয়েছে। মাইরা ইরফানের দিকে চেয়ে হাসে। মাইরাকে হাসতে দেখে ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকায়। মাইরা ইরফানের মুখের সামনে মুখ এগিয়ে নিয়ে হঠাৎ-ই বলে ওঠে, 'একদম ঠিক বলেছেন। যেমন আপনি আমার পার্মানেন্ট, আর আমার বানানো বয়ফ্রেন্ডগুলো হবে টেমপোরারি।'
কথাটা বলে মাইরা উঠে দাঁড়িয়ে দৌড় দিতে নিলে ইরফান বা হাতে মাইরার ডান হাত টেনে ঠাস করে তার কোলে এনে বসায়। মাইরার পিঠ ঠেকে ইরফানের বুকে। মাইরা কিছু বোঝায় আগেই ইরফান মাইরার হাত মুচড়ে ধরে। মাইরা চেঁচিয়ে ওঠে। ঘাড় বাঁকা করে ইরফানের দিকে তাকিয়ে কাঁদোকাঁদো কণ্ঠে বলে, 'আহ্ লাগছে। ছাড়ুন আমাকে।'
ইরফান মাইরার দিকে চেয়ে রেগে বলে, 'কি বানাবে বলছিলে?'
মাইরা মাথা নাড়িয়ে অসহায় কণ্ঠে বলে, 'কিছু বানাবো না সত্যি। মজা করেছি। এবার ছাড়ুন।'
ইরফান মাইরার হাত ছেড়ে গম্ভীর গলায় বলে, 'ফাস্ট রেডি হয়ে নাও।'
মাইরা দ্রুত ইরফানের দিকে চেয়ে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে, 'মায়ের বাড়ি রেখে আসবেন?'
ইরফান ছোট করে বলে, 'হুম। তোমাকে রেখে আসব। অ্যান্ড বিকাল ৫ টায় তোমাকে নিতে যাবো। আন্ডারস্ট্যান্ড?'
মাইরা খুশি হলো ইরফান তাকে নিজে থেকে তাদের বাড়ি নিয়ে যাবে এজন্য। তবে মন খারাপ হলো, একরাতও থাকতে পারবেনা ভেবে। কিন্তু এখন কিছু বলল না। আগে ইরফান তাকে রেখে আসুক, তারপর সে কোনো একভাবে ম্যানেজ করে থেকে যাবে। এখন কিছু বললে হয়ত যেতেই দিবেনা।
ইরফান ভাবুক মাইরার দিকে চেয়ে আদেশের সুরে বলে, 'তোমার ভাইকে অল্প করে কিস করবে।'
এরপর ল্যাপটপে মনোযোগ দিয়ে বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়, 'ডিজগাস্টিং শালা!'
মাইরা চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। মানে কিসব যুক্তিহীন কথা বলে ইরফান। মাঝে মাঝে মনে হয়, ইরফান একটা আতেল। সে ইরফানের কথা পাত্তা না দিয়ে রেডি হতে চলে গেল।