ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের অমল কাব্য (সিজন-৩)

১৫তম পর্ব

লেখক: DRM Shohag

ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে ইনায়া তার দু'জন ফ্রেন্ডের সাথে হাঁটছিল। ইনায়া মনমরা হয়ে আছে। তারা তিনজন মিলে ট্রুথ আর ডেয়ার খেলছিল। লাস্ট ডেয়ার ইনায়ার উপর এসে পড়েছে। তার দু'জন ফ্রেন্ড তাকে ডেয়ার দিয়েছে, রাস্তায় এক ছেলেকে গিয়ে বলতে হবে, 'আমি আপনাকে ভালোবাসি। আপনাকে ছাড়া বাঁচবো না।' এরকম টাইপ একটি কথা। এটাই ডেয়ার। ইনায়ার ঘাম ছুটে যাচ্ছে। কাকে না জানি গিয়ে বলতে হয়, সে তাকে ভালোবাসে। অসহায় কণ্ঠে বলে, 'প্লিজ একটা আবুল টাইপ ছেলেকে ম্যানেজ কর। নয়তো আমি শেষ।'

ইনায়ার ফ্রেন্ড দু'জন হেসে রাস্তার ওপাশে উল্টো হয়ে দাঁড়ানো এক ছেলেকে দেখিয়ে দেয়। বলে, 'ওই যে ওই ছেলে। ওকে গিয়ে বলবি, তুই তাকে ভীষণ ভালোবাসিস। তাকে ছাড়া বাঁচবি না। সে যেন খুব দ্রুত তোকে বিয়ে করে।'

ইনায়া তাকালো ছেলেটির দিকে। সাহেবদের মতো এক ছেলে দাঁড়ানো। পরনে কোর্ট-প্যান্ট। নিশ্চয়ই ভদ্রঘরের কোনো ভালো ছেলে হবে। তার কথা শুনে তাকে না আবার থাপ্পড় মেরে দেয়! ইনায়া অসহায় কণ্ঠে বলে, 'আজকের দিনটা ছেড়ে দে আমায়। আর জীবনে ডেয়ার নিব না। প্রমিজ।'

ইনায়ার ফ্রেন্ডরা শুনলো না। ইনায়াকে ঠেলে পাঠিয়ে দিল। ইনায়া ধীর ধীরে ছেলেটির পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়। ভয়য়ের চোটে ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে গিয়েছে। ঢোক গিলল দু'বার। এরপর ফ্রেন্ডদের শেখানো কথা গড়গড় করে বলে, 'আমি আপনাকে ভালোবাসি। আপনাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। প্লিজ আমাকে বিয়ে করুন।'

পরিচিত কণ্ঠ পেয়ে ফাইজ পিছু ফিরে তাকায়। ইনায়াকে দেখে কপালে ভাঁজ পড়ে তার। ইনায়ার মুখ থেকে এরকম কথা সে মোটেও আশা করেনি। থমথমে মুখে তাকায় ইনায়ার দিকে।

এদিকে ইনায়া কথাটা বলে দৌড় দিতে চাইছিল কিন্তু ফাইজকে দেখে বিস্ময়ে কোটর থেকে চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়। ভয় পেয়ে রীতিমতো কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়ে গিয়েছে মেয়েটার। এটা তো তার ভাইয়ার ফ্রেন্ড। হায় আল্লাহ, একদম সাড়ে সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। এখন কি হবে? তার ইরফান ভাইয়া যদি জানে সে তার বন্ধুকে উল্টাপাল্টা কথা বলেছে, তাকে আস্ত রাখবে না। ইনায়া ভীত কণ্ঠে তাড়াহুড়ো করে বলে, 'স্যরি ভাইয়া, আমি আসলে বুঝতে পারিনি এটা আপনি। স্যরি স্যরি!'

কোনোমতে এটুকু বলে ইনায়া উল্টোদিকে দৌড় দেয় জান হাতে নিয়ে। ফাইজের মুখ আরও থমথমে হয়ে যায়। ইনায়া তাকে এসব বলার মতো মেয়ে নয়, সে খুব ভালো করেই জানে। কিন্তু এসব কেন বলল, সেটাই ভাবছিল। তার মাঝে এই মেয়ে তাকে ভাইয়া ডেকে মুডটার পুরো রফাদফা করে দিল। সামনে থাকলে ঠাস করে একটা কানের গোড়ায় লাগিয়ে ভাইয়া ডাকের সাজা বোঝাতো। কিছু একটা ভেবে মিটিমিটি হেসে বিড়বিড় করে, 'বিয়ে তো তোমাকেই করব লিটল কুইন। সাথে আমি তোমার ভাইয়া না ছাইয়া সেটাও বোঝাবো।'

বাড়ি এসে ইনায়া ছটফট করছে। ফাইজ কি ইরফানকে তার কথা বলে দিয়েছে? যেহেতু বন্ধু, না বলে তো থাকবে না। আর বলে দিলে ইনায়ার কি হবে ভাবতেই মেয়েটার গায়ে জ্বর এসে যাচ্ছে। শুধু মনে হচ্ছে এক্ষুনি ইরফান তার ঘরে আসলো বলে। ইনায়া কিছু একটা ভেবে দ্রুত তার ফোন নিয়ে শুদ্ধ'র নাম্বারে কল করল। ফোন রিসিভ হওয়ার সাথে সাথে ইনায়া বিচলিত কণ্ঠে বলে, 'শুদ্ধ ভাই, তোমার সাথে অনেক ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।'

শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে বলে, 'ওরেব্বাস! আমার সাথে তোর ইম্পর্ট্যান্ট কথা? তা মিটিং রুমের অ্যারেঞ্জ করতে হবে?'

ইনায়া শুদ্ধের কথা পাত্তা না দিয়ে বলে, 'শোনো। আমার দ্বারা একটা ভয়ংকর কেলেঙ্কারি হয়ে গেছে। ওই যে তোমার আর ইরফান ভাইয়ের একটা ফ্রেন্ড আছে না? নাম ফাইজ। ওনার সাথে ঝামেলা।'

ইনায়ার মুখে ফাইজের কথা শুনে শুদ্ধ অবাক হয়ে বলে, 'ফাইজ তোকে কিছু বলেছে না-কি?'

ইনায়া মিনমিন করে বলে, 'না। আমি তোমাদের বন্ধুকে বলেছি।'

শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে বলে, 'তুই ফাইজকে বলেছিস? কোন মহান কথা বলেছিস রে ছেমড়ি?'

ইনায়া চেঁচিয়ে বলে, 'একদম উল্টাপাল্টা নামে ডাকবে না তো শুদ্ধ ভাই। আমার কথা মন দিয়ে শোনো।'

শুদ্ধ হতাশ হয়। এই মেয়েদের স্বভাবই কি চিল্লানো না-কি? ফারাহ্ তো এখনো তার বাড়ি আসেনি। কি জানি কি হয়! সে বলে, 'হ্যাঁ হ্যাঁ বল। আমার ভোলাভালা বন্ধুটাকে কি বলে এসেছিস। ভুলভাল বললে পিঠের ছাল তুলে, সেই ছাল দিয়ে আমার বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য আমার পায়ের জুতা বানাবো।'

ইনায়া মন খারাপ করে বলে, 'তুমি এভাবে বলছ? আমি ইরফান ভাইয়ার ভয়ে তোমার কাছে কল দিলাম। থাক বলবোই না।'

শুদ্ধ সাথে সাথে বলে, 'আরে আরে, বল। কিছু করব না রে বইন। ফটাফট বলে ফেল।'

ইনায়া এবার অসহায় কণ্ঠে বলে, 'আমার ফ্রেন্ডরা আমাকে ডেয়ার দিয়েছিল, রাস্তার যেকোনো এক ছেলেকে গিয়ে ভালোবাসি বলতে হবে। আমি তোমাদের বন্ধুকে চিনতে না পেরে তাকে ভালোবাসি বলে দিয়েছি।'

শুদ্ধ শব্দ করে বলে ওঠে, 'মিটে গেছে।'

ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলে, 'কি মিটে গেছে? কি বলছ এসব?'

এরপর একটু থেমে বিচলিত কণ্ঠে বলে, 'তোমার বন্ধু ইরফান ভাইয়াকে সব বলে দিলে আমার কি হবে? শুদ্ধ ভাই, তুমি প্লিজ কিছু একটা কর। ইরফান ভাইয়া জানলে আমাকে আস্ত রাখবে না।'

শুদ্ধ মিটিমিটি হেসে বলে, 'হাউ জোশ কাহিনী!'

ইনায়া কিছু বলতে নেয়, তার আগে শুদ্ধ বহুকষ্টে তার হাসি চেপে গম্ভীর গলায় বলে, 'এতক্ষণে হয়ত ফাইজ ইরফানকে বলে দিয়েছে। তুই ইরফানের হাতে মার খাওয়ার পর আমাকে কল দিস। তার মধ্যে আমি তোর জন্য হসপিটালের এক নামিদামি কেবিন ঠিক করে রাখছি। তুই নিশ্চিন্তে মার খা বোন। ও হ্যাঁ, ইরফানের ভাইব কিন্তু ফাইজের মাঝেও আছে। ফাইজও হয়তো তোর বাদির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে হয়ত। আহারে! তোর কত কষ্ট! এসব নিয়ে ভাবিস না। তুই আমার দুই বন্ধুর মার চুপচাপ খেয়ে নে। একদম চিন্তা করবি না, তোর মার খাওয়া শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আমি শুনতে আসব, আমার বন্ধুদের কিউট কিউট মার তোর কতটা কিউট লাগলো, কতটা মিষ্টি লাগলো, কতটা টক বা ঝাল লাগলো।'

ইনায়া চেঁচিয়ে ওঠে, 'শুদ্ধ ভাইইইইইইই??????'

ততক্ষণে শুদ্ধ কল কেটে দিয়েছে। ইনায়ার ইচ্ছে করছে শুদ্ধের মাথার চুল সব টেনে ছিঁড়তে। এমনিতেই টেনশনে মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছিল। এখন শুদ্ধের সাথে কথা বলে টেনশনের পরিমাণ কয়েকশোগুণ হাই হয়ে গেছে। সে যে কোন দুঃখে শুদ্ধকে কল দিতে গেল!

এদিকে শুদ্ধ কল কেটে দিয়ে তখন থেকে হাসছে। নিজেকে সামলে ফাইজের নাম্বারে মেসেজ করে, 'ওহে ফাইজা খালামণি, তুমি বেশি উড়ো না। আমার বোন ডেয়ার পূরণ করতে গিয়ে তোকে ভালোবাসি বলেছে। আর তোকে ভালোবাসি বলায় এখন ও মারাত্মক অনুশোচনায় ভুগছে। মানে ও তোকে শুধু এবং শুধুমাত্র আপন ভাইয়ের নজরে দেখে। লাইক আমি আর ইরফান। এজন্য ও তোকে খাতা কলমে নিজের ভাই হিসেবে দলিল করে নিতে চায়। মাত্র ফোন করে জানালো আমায়। বোনের আবদার বলে কথা! ফেলতে পারিনা। তুই ডেটটা আমাকে জানা সোনা, তুই ঠিক কবে আমার বোন ইনায়ার ভাই হতে চাস? চিন্তা নেই, আমি অবশ্যই তোর ইচ্ছের গুরুত্ব দিয়ে ডেট ফিক্সড করব সোনামণি। আমি আবার খুব দয়াল বন্ধু বলে কথা!'

ইয়া বড় মেসেজটি সেন্ড করে শুদ্ধ মিটিমিটি হাসে। ফাইজের নাম্বারে থেকে রিপ্লে আসে, 'আমাকে আপন ভাই ভাবাচ্ছি তোর বোনকে, দাঁড়া। আর তোর ব্যবস্থা তো আমি করছি। ফারাহকে হারিকেন দিয়েও খুঁজে পাবি না। বে'য়া'দ'ব বান্দর।'

মেসেজটি দেখে শুদ্ধের মুখ ভোতা হয়ে যায়। এই বে'য়া'দ'ব আবার তার বউকে নিশে টানে কেন? উফ! এর বোনকে ভালোবেসে জীবনটা তেজপাতা হয়ে যাচ্ছে! সে একটু শান্তিমতো এই ফাইজ খাইজকে জ্বালাতেও পারে না। সে হতাশ! পুরাই হতাশ!

ফাইজকে কিছু রিপ্লে দেয়ার জন্য টাইপ করতে নিলে ফারাহ'র নাম্বার থেকে মেসেজ আসে। শুদ্ধের ভ্রু কুঁচকে যায়। সে যে নাম্বার থেকে ফারাহ্ কে অপরিচিত হয়ে জ্বালাতো, সেই নাম্বারে ফারাহ্ মেসেজ দিয়েছে, 'আমার হাসবেন্ডকে আমার আর ভালো লাগে না। তুমি আমাকে কবে তোমার কাছে নিয়ে যাবে বল তো? আমি তোমার জন্য আর কত অপেক্ষা করব জান?'

মেসেজটি পড়ে শুদ্ধ কেশে ওঠে। এই মেয়ে এসব কি বলে? ফারাহ'র স্বামী তো সে। তাছাড়া ফারাহ্ জানে, এই নাম্বারের মালিক অন্যকেউ। তার মানে মেয়েটা স্বামীকে অর্থাৎ তাকে ভুলে গিয়ে পরপুরুষকে নিয়ে ভাবছে? কি পরিমাণ বে'য়া'দ'ব ভাবা যায়? শুদ্ধ মারাত্মক রেগেছে। ফারাহ'র হিসেবে, ফারাহ্ তাকে ভুলে গিয়ে অন্য ছেলেকে নিয়ে ভাবছে। কারণ ফারাহ্ জানেনা এটা শুদ্ধ। না চিনে, না জেনে অন্য আরেকজনকে জান ডাকছে। শুদ্ধ আর নিতে পারছে না। ইচ্ছে করছে, ফারাহ্'কে থাপড়ে সোজা করতে। দাঁত কিড়মিড় করে বিড়বিড় করে, 'পরপুরুষকে জান ডাকা বের করব ফারাহ্ পাখি। আমাকে চেনো না তুমি। বে'য়া'দ'ব মেয়ে!'

ইরফান মাইরাকে সকালের পর পর তার মায়ের বাড়ি রেখে গিয়েছে। মাইরার সৎ মা আজ মাইরার জন্য অনেককিছু রেঁধেছিল তার সৎ বাবার নির্দেশে। মাইরা মায়ের আচরণে অবাক না হলেও অবাক হয়েছে তার সৎ বাবার আচরণে। হঠাৎ সে এত ভালো কিভাবে হয়ে গেল, এটাই মাইরা বুঝতে পারছে না। আরেকটি অবাক করা বিষয় হলো, লাবিবের বাবা তাকে ১০ লাখ টাকার একটি চেক ধরিয়ে দিয়েছে। এই চেক লাবিবের বাবার নয়। এটা ইরফানের ফ্রেন্ড নাছিমের। ভদ্রলোক মাইরাকে বলেছে, মাইরা সাথে নাছিমের বিয়ের জন্য নাছিমের থেকে সে দশ লাখ টাকার চেক নিয়েছিল। এটা যেন মাইরা নাছিমকে ফিরিয়ে দেয়। মাইরা শুধু অবাক হয়ে শুনছিল লাবিবের বাবার কথা। ভদ্রলোককে যত দেখছিল তত অবাক হচ্ছিল। সূর্যের আলো পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। মাইরা তার মাকে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে।

চেকটি পেয়ে মাইরা শুদ্ধকে কল করে একবার তার সাথে দেখা করতে বললে শুদ্ধ জানায় আগামীকাল করবে। মাইরা চেয়েছিল চেকটি শুদ্ধের হাতে দিয়ে দিতে। সে যেন এটা নাছিমকে দিয়ে দেয়। কিন্তু শুদ্ধ ব্যস্ত থাকায় সে শুদ্ধের থেকে নাছিমের নাম্বার নেয়। শুদ্ধ জিজ্ঞেস করলে মাইরা বলে, সে পরে সব বলবে। এরপর সে নাছিমকে কল করে। ভীষণ বিব্রতবোধ করছিল সে। কিন্তু এই চেকটি নিজের কাছে রাখতে ভীষণ ছোট লাগছিল মাইরার। টাকা তো কম নয়, একদম দশ লাখ! অনেক বেশি। তাই মাইরা তার সব বিব্রতবোধ ঠেলে নাছিমকে কল দিয়ে বলে তার সাথে দেখা করতে। জায়গার নাম মাইরা বলে দিয়েছে।

মাইরা তার বাড়ি থেকে কিছুদুর দাঁড়িয়ে নাছিমের জন্য অপেক্ষা করছে। হাতে নাছিমের দেয়া দশ লাখ টাকার চেক। যে এর মালিক, তার হাতে টাকা দিয়ে দিতে পারলে যেন বেঁচে যায় মাইরা।

প্রায় মিনিট দশেক পর রাস্তার অপর পাশে নাছিমকে দেখতে পেয়ে মাইরা নড়েচড়ে দাঁড়ায়। নাছিম ধীরপায়ে এগিয়ে এসে মাইরার সামনে দাঁড়ায়। দৃষ্টি মাইরাতে। নাছিমের সাথে মাইরার একবার চোখাচোখি হতেই মাইরা দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। নাছিমের দৃষ্টি তার কাছে ভীষণ অস্বস্তিকর লাগে।

নাছিমের মুখখানা ভীষণ মলিন। সে জানেনা মাইরা তাকে কেন দেখা করতে বলল। তবে ভীষণ অবাক হয়েছে সে। তার নাম্বারই বা কার থেকে নিয়েছে! নাছিম এসব বুঝল না। মাইরা তাকে কল করে শুধু বলেছে, তার সাথে এক্ষুনি দেখা করতে। সাথে জায়গার নাম বলেছে। এরপর কল কেটে দিয়েছে। মেয়েটার কণ্ঠ বেশ রূঢ় ছিল। কথাটা ভেবে নাছিমের মলিন মুখ আরও মলিন হয়। মাইরাকে সে আড়াল থেকে যতটা চঞ্চল দেখেছে, নিজের সামনে ততটাই বড় মেয়েদের মতো আচরণ করতে দেখেছে।

কথাগুলো নাছিম মাইরার দিকে চেয়ে ভাবছিল। হঠাৎ-ই মাইরা মাথা উঁচু করে নাছিমের দিকে তাকায়। ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, 'আমার সাথে আপনার বিয়ে উপলক্ষ্যে এই চেক আমার বাবা আপনার থেকে নিয়েছিল। এটা রাখুন।'

নাছিমের কপালে ভাঁজ পড়ে। তাকায় মাইরার বাড়িয়ে দেয়া হাতের দিকে। দৃষ্টি ঘুরিয়ে আবারো মাইরার দিকে তাকায়। মাইরার গম্ভীর মুখপানে চেয়ে থাকে। বুকের বা পাশটায় ভীষণ যন্ত্রণা করছে। অনেককিছু বলতে ইচ্ছে করছে। তার বার্বিডলকে নিয়ে কতশত অনুভূতি জমা আছে তার মাঝে, এ কথা মাইরা বুঝল না।

নাছিমকে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাইরা বিব্রতবোধ করে। গলা ঝেড়ে বলে, 'আপনি কি ভুলে গেছেন আমি আপনার বন্ধুর বউ?'

নাছিমের দৃষ্টিতে অসহায়ত্ব। সে যাকে এত করে চাইল, সে তার বন্ধুর বউ হয়ে গিয়েছে! সে কি করে ভুলবে এত বড় শক? তার জীবনের কম বড় শক এটা? সে মাইরার দিকে চেয়েই ঢোক গিলে বলে, 'ভুলিনি বার্বিডল।'

নাছিমের নেয়া উদ্ভট নামে মাইরার বিব্রতবোধ বাড়ে। সে নিজেকে সামলে বলে, 'তাহলে বন্ধুর বউয়ের দিকে এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? আমি আপনার সাথে একটা প্রয়োজনে দেখা করতে এসেছি। নিজেকে দেখাতে আসিনি।'

নাছিম সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নেয়। চোখ বুজে নেয় দ্রুত। মাইরার কথার ধার অনেক। নাছিমের বড্ড অসহায় লাগে। ঘনঘন শ্বাস ফেলে ছেলেটা। কি করে বোঝাবে এই মেয়েটাকে, তার কতটা জুড়ে তার বার্বিডল? নাছিম নিজেকে সামলে নিতে চায়। মাইরা তার বন্ধুর বউ। তাকে সংযত রাখতে হবে। কিন্তু সে যে পারেনা। খুব দুঃখ হয়, তার বার্বিডলকে না পাওয়ার আফসোস তার মেটে না। নাছিম নিজেকে স্বাভাবিক করে চোখ মেলে তাকায়। খুব ইচ্ছে করল চোখ তুলে মাইরার মুখখানা দেখতে। কিন্তু সে চোখ তুলল না। ব্যথিত দৃষ্টিজোড়া নিচে নামিয়ে রেখেই মৃদুস্বরে বলে, 'তুমি আমার বন্ধুর বউ। সেই হিসেবে এই চেকটা তোমার কাছে রেখে দাও। ধরে নাও আমি তোমাকে...'

মাঝপথে মাইরা রূঢ় কণ্ঠে বলে, 'আমাকে কি আপনার ভিখারি মনে হচ্ছে?'

কথাটা শুনতেই নাছিম চোখ তুলে মাইরার দিকে তাকায়। অসহায় কণ্ঠে বলে, 'বার্বিডল এভাবে বলছ কেন?'

মাইরা এবার চেঁচিয়ে বলে, 'আপনি বারবার আমাকে এসব উল্টাপাল্টা নামে কেন ডাকছেন? অদ্ভুত তো! আমি আপনার বন্ধুর বউ, এটা আপনাকে আর কতবার মনে করিয়ে দিতে হবে?'

নাছিম ঢোক গিলল। বুকের ব্যথা ক্রমাগত বাড়ছে। মেয়েটা তার সাথে কখনো নরম কণ্ঠে কথা বলেনি। নাছিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনুতপ্ত স্বরে বলে, 'স্যরি!'

এরপর মাইরার শক্ত চোখজোড়ায় দৃষ্টি রেখে বলে, 'তুমি কি সবসময় এতো রূঢ়ভাবে কথা বলো?'

মাইরার কাটকাট জবাব, 'হ্যাঁ।'

নাছিম কি বলবে বুঝল না। সে শুধু মাইরাকে দেখে যায়। মেয়েটিকে দেখতে কত ছোট লাগে, অথচ এর তেজ ভীষণ। নাছিম মৃদুস্বরে বলে, 'টাকাটা আমি তোমাকে গিফট করলাম। রেখে দাও।'

মাইরা বিরক্তি কণ্ঠে বলে, 'এসব টাকা আমার লাগবে না। চেক নিন।'

কথাটা বলে মাইরা নাছিমের দিকে চেক ধরে রাখা হাতটি আরেকটু এগিয়ে দেয়। নাছিম মাইরার দিকে চেয়েই বলে, 'গিফট ফিরিয়ে দিতে নেই।'

মাইরার শক্ত কণ্ঠে বলে, 'আমি যার তার গিফট নিই না। নিন এটা।'

মাইরার 'যার তার' বলা কথাটা নাছিমের খারাপ লাগলেও সে নিজেকে সামলায়। বলে, 'রিকুয়েস্ট করছি, রেখে দাও।'

মাইরা চরম বিরক্ত হয়ে চেকটি নাছিমের হাতে জোর করে গুঁজে দেয়ার জন্য বা হাতে নাছিমের হাত ধরে মাইরা। এরপর ডান হাতের চেকটি নাছিমের হাতে ধরিয়ে দিতে যায়, তখনই পাশ থেকে ইরফানের শক্ত গম্ভীর স্বর ভেসে আসে, 'কি হচ্ছে এখানে?'

ইরফানের কণ্ঠ কানে আসতেই মাইরা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। দ্রুত নাছিমের হাত ছেড়ে বাদিকে ফিরে তাকায়। ইরফানের রক্তলাল চোখে চোখাচোখি হয়। মাইরা ঢোক গিলল। সে ভেবেছিল ইরফান আসার আগেই সে নাছিমকে চেকটি দিয়ে বাসায় চলে যাবে। নাছিমকে চেকটি সে ইরফানের মাধ্যমেও দিতে পারতো, কিন্তু ইরফান যা মানুষ, ঝামেলা ছাড়া কিছুই হবে না ভেবে মাইরা ইরফানকে বলার সাহস পায়নি।

নাছিম ইরফানকে দেখে বারবার ঢোক গিলছে। সে নিজের জন্য ভয় পাচ্ছে না, ভয় পাচ্ছে মাইরাকে নিয়ে। ইরফান মাইরাকে ভুল বুঝে মাইরার সাথে উল্টাপাল্টা বিহেভ করবে না তো? নাছিম ঢোক গিলে বলে, 'ইরফান, ওকে কিছু বলিস না।'

এটুকু বলতেই ইরফান ঝড়ের বেগে তেড়ে যায় নাছিমের দিকে। কোনো কথা ছাড়া সমানে নাছিমের মুখ বরাবর ঘুষি মারতে থাকে। হুংকার ছেড়ে বলে, 'ওকে কি বলব নাকি না বলব, এটা তোর থেকে শুনব আমি? তোর সাহস কি করে হয় আমার ওয়াইফকে নিয়ে কথা বলার?'

ইরফানের মার এখনো থামেনি। নিজের বন্ধুকে এভাবে মারতে দেখে মাইরা ভয় পেয়ে যায়। ইরফানকে টেনে সরাতে চায় আর বলে, 'কি করছেন? উনাকে ছাড়ুন। উনার কোনো দোষ নেই।'

মাইরার কথা শুনে ইরফানের রাগ তড়তড় করে বেড়ে গেল। আগের চেয়েও গায়ের জোরে নাছিমের মুখ বরাবর দুটো ঘুষি দিয়ে নাছিমকে ধাক্কা দেয়। নাছিম পড়তে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয়। নাকমুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে ছেলেটার। সেদিকে নাছিমের হুশ নেই। সে ভীত চোখে তাকায় মাইরার দিকে।

ভাবনার মাঝেই ইরফান মাইরার গাল শক্ত হাতে চেপে ভস্ম করা দৃষ্টিতে চেয়ে বলে, 'ওর জন্য এতো ভাবিস? ভাবাচ্ছি তোকে, যাস্ট ওয়েট।'

কথাটা বলে ইরফান মাইরার গাল ছেড়ে মাইরার হাত ধরে টানতে টানতে তার গাড়ির দিকে নিয়ে যায়। মাইরা হাতে ভীষণ ব্যথা পায়। অসহায় কণ্ঠে বলে, 'আহ! লাগছে আমার। হাত ছাড়ুন, আমি একাই যাচ্ছি।'

ইরফান মাইরার কথা শুনলো না। পায়ের গতি আরও বাড়ালো। মাইরা ইরফানের পায়ের সাথে তাল মেলাতে পারেনা।

নাছিম রক্তমাখা নাকমুখ ডান হাতে মুছে ইরফান আর মাইরাদের দিকে তাকায়। ইরফানকে পিছু ডাকতে গিয়েও থেমে যায় সে। ইরফান আর মাইরার মাঝে তার যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু ইরফান রেগে গেলে নিজের মাঝে থাকে না। মাইরাকে কিছু করবে না তো? ভীষণ অসহায় লাগলো নিজেকে।

ইরফান এত জোরে মাইরার হাত ধরেছে, মেয়েটার মনে হচ্ছে তার হাত ছিঁড়ে যাবে। হাত মোচড়ামুচড়ি করতে চাইলে পারেনা, হাত শক্ত করে ধরে রাখায়। ইরফান গাড়ির দরজা খুলে মাইরাকে ধাক্কা দিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দেয়। মাইরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়। এতক্ষণ হাত ইরফান ধরে রাখায় মনে হচ্ছিল হাত ছিঁড়ে যাচ্ছে, আর এখন ধাক্কা খেয়ে মনে হলো ডান হাত বোধয় ভেঙে গেল। ব্যথায় মেয়েটা মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে। চোখের কোণে পানি জমে।

ইরফান শব্দ করে গাড়ির দরজা লাগিয়ে ড্রাইভিং সিটে এসে বসে গাড়ি স্টার্ট দেয়।

মাইরা আড়চোখে ইরফানের দিকে তাকায়। মনে হচ্ছে তার পাশে সত্যি সত্যি এক জন্তু বসে আছে। খুব বুঝেছে তাকে ইরফানদের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে। বলতে ইচ্ছে করল, সে মায়ের বাড়ি থাকবে, কিন্তু বলার সাহস পায় না। বিড়বিড় করে, 'অসভ্য লোক একটা।'

নাছিম মলিন মুখে দাঁড়িয়ে রইল। দৃষ্টি ইরফানের চলন্ত গাড়ির পানে। যে গাড়িতে তার না হওয়া বার্বিডল আছে। গাড়িটি অদৃশ্য হলে নাছিম দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। রাস্তায় পড়ে থাকা টাকার চেকটির দিকে একবার তাকায়। সামান্য নিচু হয়ে চেকটি হাতে তুলে নেয়। ভেতর থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

সামিয়া এখানে টিউশন পড়াতে এসেছিল। হাঁটতে হাঁটতে পিছন থেকে নাছিমকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসে। সিইওর হওয়ার জন্য এটা নাছিম কি-না! সামনে এসে নাছিমকে দেখে অবাক কণ্ঠে বলে, 'আপনি কি মারামারি করেছেন?'

পরিচিত কণ্ঠে নাছিম মাথা তুলে তাকায়। সামিয়ার সাথে চোখাচোখি হয়। নাছিম বিব্রতবোধ করে। পকেট থেকে রুমাল বের করে দ্রুত হাতে ভালোভাবে মুখ মুছে নেয়। যদিও মুখে সেভাবে রক্ত লেগে নেই, তবে ঠোঁটের কোণা কেটেছে। ভালোভাবে খেয়াল করলে যা বোঝা যাচ্ছে। সামিয়াকে এখনো নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে নাছিম বিরক্তি কণ্ঠে বলে, 'কি প্রবলেম?'

সামিয়া ভ্রু কুঁচকে বলে, 'আপনাকে আমি ভদ্র ভেবেছিলাম।'

নাছিম চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। মনে হচ্ছে আজ সকালে সামিয়াকে তার বলা 'তোমাকে আমি ভালো ভেবেছিলাম' কথাটি তাকেই ফেরত দিল সামিয়া। নাছিম কটমট চোখে চেয়ে বলে, 'তুমি কি আমাকে অভদ্র বলতে চাইছ?”

সামিয়া মিনমিন করে বলে, 'তাই তো মনে হচ্ছে।'

নাছিম রেগে বলে, 'কি বললে?'

সামিয়া থতমত খেয়ে বলে, 'না মানে, দুঃখিত!'

নাছিম তার গাড়ির দিকে যেতে যেতে বলে, 'তোমার দুঃখিত তুমি ধুয়ে খাও।'

সামিয়া ঢোক গিলল। বুঝেছে ভুলভাল বলে ফেলেছে। কিন্তু নাছিম মারামারি করল কার সাথে এটাই বুঝল না।

একমিনিটের মাথায় নাছিম আবারো ফিরে এসে দাঁড়ায় সামিয়ার সামনে। জিজ্ঞেস করে, 'তুমি এখানে করছ?'

সামিয়া উত্তর দেয়, 'টিউশন পড়াতে এসেছিলাম।'

'কেন?'

নাছিমের প্রশ্নে সামিয়া অদ্ভুতভাবে তাকায়। সে তো অনেক আগে থেকেই টিউশন পড়ায়। এখন এটার জন্য তাকে কৈফিয়ত দিতে হবে? ব্যাপারটি সামিয়ার কাছে ভালো লাগলো না। সে বলে, 'আপনাকে কেন বলব?'

নাছিম চট করে বলে ফেলে, 'কারণ আমি তোমার হাসবেন্ড।'

সামিয়া অবাক চোখে তাকায়। এদিকে নাছিম কথাটা বলে নিজেও বিব্রতবোধ করছে। নিজেকে সামলে বলে, 'বার্বিডলকে অনেক ভালোবাসি। তবে তোমার দায়িত্ব এড়িয়ে যাবো না। তোমাকে টিউশন করাতে হবে না। তোমার যখন যা লাগবে আমাকে বলবে।'

সামিয়া কিছু বলতে নিলে মাঝখান থেকে নাছিম বলে, 'এর প্রেক্ষিতে আর কিছু বলো না। আমি জানি আমি তোমাকে বিয়ে করে অন্যায় করেছি। দায়িত্ব এড়িয়ে আর অন্যায় করতে চাই না। প্লিজ আমাকে নিষেধ করো না।'

নাছিমের কথা শুনে সামিয়া ভীষণ অবাক হয়ে নাছিমকে দেখল। সে আর কিছুই বলল না। নাছিম সামিয়াকে জিজ্ঞাসা করে সে বাড়ি যাবে কিনা। সামিয়া বলে, 'হ্যাঁ, সে এখন বাড়ি যাবে।'

নাছিম সামিয়াকে তার সাথে আসতে বললে, সামিয়া নাছিমের পিছে পিছে যায়। এরপর নাছিম গাড়ির দরজা খুলে দিলে, সামিয়া চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসে।

ইরফান বাড়ির সামনে গাড়ি থামিয়ে কোনো কথা ছাড়া মাইরাকে কোলে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে আসে। ডান পায়ে শব্দ করে দরজা আটকে দিয়ে বড় বড় পায়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়। এরপর মাইরাকে কোল থেকে নামিয়ে পিছন থেকে মাইরার দু'হাত চেপে ট্যাপের নিচে রাখে। ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে সাবান দ্বারা মাইরার হাত শক্ত হাতে ঘষতে থাকে। মাইরা এতক্ষণ বহুকষ্টে চুপ করে থেকে ইরফানকে বোঝার চেষ্টা করছিল। ইরফান যে মারাত্মক রেগে আছে, এটা সে খুব ভালোই বুঝেছে। সে কিছু বলার সাহসই পাচ্ছে না। দেখলেই কেমন ভয় ভয় লাগে। কিন্তু এখন চুপ থাকতে পারছে না। মনে হচ্ছে ইরফান তার হাত ছিঁড়ে ফেলবে, এভাবে সমানে ঘষছে। এক পর্যায়ে মাইরা ব্যথাতুর গলায় বলে, 'কি করছেন? আমার হাত ছাড়ুন। ব্যথা পাচ্ছি আমি।'

মাইরার কথা ইরফানের কানে গেল কি না! সে তার মতো কাজে ব্যস্ত। হাতের গতি বৃদ্ধি পায়। মাইরার নরম হাতের চামড়া জ্বলে ওঠে। ব্যথা পেয়ে মেয়েটার চোখ দু'টো ভিজে ওঠে। মোচড়ামুচড়ি করতে করতে অসহায় কণ্ঠে বলে, 'দয়া করে আমার হাত ছাড়ুন, হাত জ্বলছে।'

থামার নামগন্ধ নেই ইরফানের। এবার মাইরার দু'চোখে জমা পানি গালে গড়িয়ে পড়ে। ডানদিকে সামান্য ঘাড় বাঁকিয়ে রেগে বলে, 'অসভ্য লোক, আমায় ছাড়ুন।'

ইরফানের দু'চোখে তখনও আগুন জ্বলছে। মাইরার কথায় রাগে মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়। এতক্ষণ ধৈর্য ধরে যেটুকু রাগ কন্ট্রোল করেছিল, মুহূর্তেই সব ধৈর্য ভ্যানিশ হয়ে যায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে, মাইরা নাছিমের হাত ধরেছিল সেই দৃশ্য। চোখের পলকে মাইরাকে ঝটকা মেরে তার দিকে ফিরিয়ে মাইরার ডান গালে কষিয়ে একটা থাপ্পড় মারে ইরফান। যার জন্য মাইরা মোটেও প্রস্তুত ছিল না। মেয়েটা থাপ্পড় খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় ওয়াশরুমের সাদা টাইলসের মেঝের উপর। পড়ে যাওয়ার সময় ট্যাপের সাথে মাথা জোরেসোরে বাড়ি খায়। তীব্র ব্যথায় মাইরা চেঁচিয়ে ওঠে। মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। ডান হাতে মাথার পিছনদিকে চেপে ধরে। মনে হচ্ছে মাথায় বোধ নেই। চারপাশ ঘুরছে।

ইরফান হাঁটুগেড়ে বসে বা হাতে মাইরার মাথার চুল মুঠো করে ধরে, ডান হাতে মাইরার গাল শক্ত হাতে চেপে ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে, 'তোর সাহস কি করে হয়, আরেকজনের হাত ধরার? কোথায় পেয়েছিস এত সাহস? বল স্টুপিড?'

মাইরার চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ে। তার কথা না শুনেই ইরফানের এরকম ব্যবহার মাইরার সহ্য হলো না। সে রাগে জিদ্দে কাঁদতে কাঁদতে বলে, '১০০ বার ধরব আরেকজনের হাত।'

কথাটা বলতে দেরি হলেও মাইরার বাম গালে ইরফানের শক্ত থাপ্পড় পড়তে দেরি হয়নি। মাইরা আবারো মেঝেতে পড়ে যায়। এবার সে শব্দ করে কেঁদে দেয়। কান্নামাখা গলায় বিড়বিড় করে, 'অসভ্য লোক, আমাকে মেরে ফেলবেন আপনি?'

ইরফান মাইরার হাত ধরে টেনে বসায়। ডান হাতে মাইরার গাল চেপে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, 'কি বললি স্টুপিড গার্ল?'

অকারণে ইরফানের এত মার মাইরার সহ্য হয় না। তার কথা না শুনেই মারছে তাকে। সে কেন এত মার খাবে? মেয়েটা চেঁচিয়ে বলে, 'থাকবো না আমি আপনার সাথে। খবিশ লোক একটা। মেরে মেরে শেষ করে দিচ্ছে আমাকে।'

ইরফান আবারও মাইরাকে থাপ্পড় মারার জন্য হাত উঠালে মাইরা ভয় পেয়ে দু'হাতে তার দু'গাল ঢেকে নেয়। কাঁদতে কাঁদতে অসহায় কণ্ঠে বলে, 'আর মারবেন না। আমি অনেক ব্যথা পেয়েছি। আমার মাথা...'

মাইরার কথা জড়িয়ে আসে। শরীর ভীষণ দুর্বল। লালিত চোখ দু'টো নিভু নিভু হয়ে এসেছে। কাঁদতে কাঁদতে ফর্সা মুখ লাল হয়ে গিয়েছে। মনে হচ্ছে সে ঢুলছে। যে কোনো সময় পড়ে যাবে।

ইরফানের হাত থেমে যায় মাইরার পাশের কপাল বেয়ে তাজা রক্ত পড়তে দেখে। চোখেমুখে ভর করে বিস্ময়। মুহূর্তেই সব রাগ পালিয়ে গেল। ঢোক গিলল ইরফান।

এদিকে মাইরা এতক্ষণ কাঁদতে কাঁদতে জোর খাটিয়ে কিছুটা তেজ দেখালেও এখন শরীর নেতিয়ে এসেছে। মাথাটা প্রচন্ড ব্যথা করছে। দুর্বল শরীরটা ঢুলতে ঢুলতে কয়েক সেকেন্ডের মাথায় মাইরা পিছনদিকে শরীর ছেড়ে দিলে ইরফান দ্রুত এগিয়ে এসে বা হাতে মাইরাকে আগলে নেয়। চোখেমুখে ভীতি। মাইরার কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া রক্ত ইরফান তার ডান হাতে একটু লাগায়। এরপর সেই হাতটি মুখের সামনে এনে সামনে থেকে দেখে গলা শুকিয়ে আসে তার। মাইরার গাল চাপড়ে ভীত কণ্ঠে ডাকে, 'বার্ডফ্লাওয়ার, আর ইউ ওকে?'

মাইরা জ্ঞান হারায়নি, তবে প্রচন্ড মাথা ব্যথায় কিছু বলতে পারছে না। ইরফানের ডাকটিও বোধয় শুনতে পায়নি। কিন্তু ইরফান যে তাকে আগলে নিয়েছে, এটুকু বুঝে মাইরা নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চায়। ইরফান সময় নষ্ট না করে দ্রুত মাইরাকে কোলে তুলে নেয়। মাইরা আরও মোচড়ামুচড়ি করে। বিড়বিড়িয়ে বলে, 'অসভ্য লোক একটা। আমায় ছাড়ুন বলছি।'

ইরফান মাইরার বিড়বিড়িয়ে বলা কথা পাত্তা দিল না। দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে মাইরাকে বেডে বসিয়ে দেয়। বা হাতে মেয়েটাকে নিজের সাথে চেপে ধরে ডান হাতে মাইরার মাথা চেক করে। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় ইরফানের চোখে পড়ে মাইরার মাথার এক জায়গায় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। ইরফানের চোখমুখ শুকিয়ে আসে। ডান হাতের বুড়ো আঙুলের সাহায্যে ক্ষত স্থানটিতে স্পর্শ করলে মাইরা মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে।

ইরফান হাত সরিয়ে নেয়। তাকায় মাইরার বিধ্বস্ত মুখের দিকে। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে সে মাইরাকে বালিশের সাথে হেলান দিয়ে বসিয়ে রেখে দ্রুত ফার্স্ট এইড বক্স আনে। এরপর মাইরার সামনে বসে ফাস্টএইড বক্স থেকে প্রয়োজনীয় ঔষধ, ব্যান্ডেজ বের করে মাইরার দিকে এগোয়, তখনই মাইরা তার লালিত চোখজোড়া ধীরে ধীরে মেলে তাকায়।

ইরফানকে তার দিকে আসতে দেখে মাইরা দুর্বল শরীরে ইরফানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চায়, কিন্তু ইরফানকে একটুও নড়াতে না পেরে মাইর। হাসফাস কণ্ঠে বলে, 'যান বলছি। একদম আমার কাছে আসবেন না আপনি। আমি থাকবো না আপনার সাথে।'

শেষ কথায় ইরফান রেগে তাকায় মাইরার দিকে। বা হাতে মাইরাকে আবারো তার সাথে সাপ্টে ধরে ধমকে বলে, 'আর একবার এসব বললে থাপ্পড় দিয়ে সব দাঁত ফেলব তোমার।'

মাইরা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। মাথায় অনেক বেশি আঘাত পাওয়ায় মাইরা থেকে থেকে মাথায় বোধ পায় না বলে মনে হয়।

ইরফান মাইরার মাথা তার বুকে চেপে ডান হাতে মাইরার মাথায় ঔষধ লাগিয়ে দেয়, এরপর ধীরে ধীরে ব্যান্ডেজ করতে থাকে। মাইরা মোচড়ামুচড়ি করলেও নড়তে পারেনা। ইরফান শক্ত করে ধরে রেখেছে। এক পর্যায়ে মাইরা ফুঁপিয়ে ওঠে। বিড়বিড় করে, 'অসভ্য লোক একটা। শুধু মারে আমাকে। আমার মাথাটা ছিড়ে গেল। মার খাওয়ার জন্য আমি জীবনেও আপনার সাথে থাকবো না।'

ইরফান মাইরার মাথায় ব্যান্ডেজ করতে করতে গম্ভীর গলায় বলে, 'সাটআপ। রাগিয়ো না আমাকে। অবাধ্য হলে আরও মার খাবে।'

মাইরা আবারো মোচড়ামুচড়ি করতে করতে বলে, 'আমি মার খাবো না। থাকবো না আপনার কাছে। ছাড়ুন বলছি।'

মাইরার মাথায় ব্যান্ডেজ করা শেষ। ইরফান মাইরার এক কথা বারবার শুনে রেগে যায়। ডান হাতে মাইরার গাল চেপে ধরলে মাইরা আবারো ব্যথাতুর আওয়াজ করে। সাথে সাথে ইরফানের হাত ঢিল হয়। ফর্সা দু'গালে দুটো থাপ্পড় খেয়ে গাল দুটোয় দশ আঙুলের ছাপ পড়ে গিয়েছে মেয়েটার। বা পাশের ঠোঁটের কোণা কেটে রক্ত জমাট বেঁধেছে। ইরফান ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। চোখ বুজে নিজেকে শান্ত করে দু'হাতে মাইরাকে তার সাথে জড়িয়ে নেয়। মাইরার বাম গালে ঠোঁট চেপে বিড়বিড়িয়ে বলে, 'স্টুপিড, আবার আমাকে রাগাচ্ছ কেন?'

মাইরা ইরফানের বুকে পড়ে থেকে ফোঁপায়। বিড়বিড় করে, 'আমার মাথা ব্যথা করছে। আমি থাকবো না আপনার কাছে।'

কথাটা বলতেই ইরফান মাইরাকে নিয়ে ঠাস করে বিছানার উপর শুয়ে পড়ে। মাইরার মাথা ইরফানের হাতের উপর থাকায় সে মাথায় ব্যথা পায়নি, তবে চেঁচিয়ে ওঠে। মোচড়ামুচড়ি করে। ইরফান শক্ত করে মাইরাকে তার সাথে চেপে রেখেছে। মাইরার দু'পা তার দু'পায়ের ভাঁজে চেপে ধরে। মাইরা রেগে ইরফানের গলায় গায়ের জোরে দাঁত বসায়। ইরফানের মাঝে তেমন কোনো হেলদোল দেখা গেল না। সে মাইরাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে নিজের সাথে। মাইরা হাসফাস করে। বেচারি নিঃশ্বাস নিতে পারছে না ঠিক করে। কিন্তু সে ইরফানের গলায় বসানো দাঁত ছাড়লো না। যেন পণ করেছে মাংস তুলে নিবে সে। অসভ্য লোকটা তাকে কতগুলো মেরেছে! ইরফান ফিসফিস কণ্ঠে বলে, 'বুঝেছি, তুমি লাভ বাইট দিচ্ছ। ইট'স ওকে। আই লাভ ইট।'

সাথে সাথে মাইরা ইরফানের গলায় বসানো দাঁত আলগা করে দেয়। নাক টেনে চেঁচিয়ে বলে, 'এটা হেইট বাইট। একটা লাভ বাইটের জন্য আপনি সারাদিন কাঁদলেও আপনার মতো একটা অসভ্য লোককে কেউ লাভবাইট দিতে আসবে না। জন্তু লোক একটা। 'মাইরার কথায় ইরফানের রাগ হয়। স্টুপিডটা সবসময় থা'প্প'ড় খাওয়ার কাজ করে। কিন্তু কিছু বলল না। ডান হাত মাইরার চুলের ভাঁজে দিয়ে আলতো করে হাত চালায়।

মাইরা ফোঁপায়। এই অসভ্য লোকটা তার মাথা একদম ফেটে দিয়েছে। আর এখন ঢং করছে। মাইরা ইরফানের থেকে দূরে সরতে চাইলেও একচুল সরতে পারলো না। মাথা সামান্য পিছন দিকে নিয়ে চেঁচিয়ে বলে, 'আপনি আমাকে ছাড়বেন?'

ইরফান বিরক্ত চোখে তাকায় মাইরার দিকে। বলে, 'নো।'

মাইরার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। অতিরিক্ত রা'গের কারণে এমন হচ্ছে, সাথে মাথা ব্য'থা তো আছেই। মাইরাকে কাঁদতে দেখে ইরফান নরম গলায় বলে, 'ডোন্ট ক্রাই।'

কথাটা বলে মাইরার ঠোঁটের কোণায় ক্ষ'ত স্থানে হাত লাগাতে নিলে মাইরা মুখ আরেকদিকে নেয়। ইরফানের রাগ হয়। সে যত নিজেকে শান্ত করতে চায়, তত তাকে রাগায় এই স্টুপিডটা। ইরফান শ'ক্ত ডান হাতে মাইরার মুখ ঘুরিয়ে তার ঠোঁটের ভাঁজে মাইরার ঠোঁটজোড়া নিয়ে নেয়। মাইরা নিজেকে ছুটিয়ে নিতে চাইলেও পারেনা। প্রথমে একটু-আধটু ছটফট করার পর শান্ত হয় মাইরা। ইরফান ডান হাতে আলতো করে মাইরার মাথা ম্যাসাজ করে দেয়। যার ফলে মাইরা আরাম পায়।

মিনিট দুই পরে ইরফান শ'ক্ত কণ্ঠে বলে, 'ইন ফিউচার, অন্যকাউকে টাচ করলে, তোমাকে যাস্ট খু'ন করে ফেলব স্টুপিড গার্ল।'

কথাটা বলে মাইরার ঠোঁটের কোণায় দাঁত বসায় ইরফান। মাইরা গুঙিয়ে ওঠে। ইরফান নরম হয়। তবে ছাড়লো না মাইরাকে। ডান হাত মাইরার মাথার চুলের ভাঁজে নিয়ে আলতো করে চুল টেনে দিতে থাকে। আরাম পেয়ে মাইরা শান্ত হয়। মেয়েটার চোখে ঘুম। ক'সেকেন্ডের মাথায় মাইরা ঘুমিয়ে যায়। মাইরার ভারী নিঃশ্বাস পড়ছে বুঝতে পেরে ইরফান মাইরার ঠোঁটজোড়া থেকে কিছুটা সরে আসে। ডান হাত বাড়িয়ে মাইরার লালিত ঠোঁটজোড়ায় আঙুল চালিয়ে বিড়বিড় করে, 'স্টুপিড।'

এরপর এগিয়ে এসে মাইরার ঠোঁটের কোণায় ক্ষ'ত স্থানটিতে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায়। ছোট করে বলে, 'স্যরি বার্ডফ্লাওয়ার! বাট ইউ ডিজার্ভ ইট।'

বেশ কিছুক্ষণ ঘুমন্ত মাইরার মুখপানে চেয়ে থাকে ইরফান। এরপর মাইরাকে টেনে মাইরার মাথা তার বুকে রাখে। বেড সাইট টেবিল থেকে ল্যাপটপ নিয়ে পেটের উপর ল্যাপটপ রেখে ল্যাপটপে ডান হাতের আঙুল চালায় অনবরত। অন্যদিকে বা হাতে ঘুমন্ত মাইরার চুল আলতো করে টেনে দিতে থাকে।

ইনায়া শুদ্ধ'র সাথে কথা বলার পর থেকে অতিরিক্ত টেনশন করতে করতে ঘুমিয়ে গিয়েছিল। এখনও ভয় লাগছে তার। কখন না জানি ইরফান, নয়তো ওই ফাইজ তার বিচার করতে চলে আসে। মাগরিবের নামাজ পড়ে ঘরময় পায়চারি করছিল, ভাবল বাইরে বেরিয়ে দেখবে ইরফান বাড়ি এসেছে কি-না! তাছাড়া ভার্সিটি থেকে এসে খাওয়াও হয়নি, বেশ ক্ষুধার্ত সে। এজন্য ঘর থেকে বেরিয়ে আসল। রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ থেকে একটি মিষ্টি নিয়ে মুখে দিল। এরপর আরেকটি মিষ্টি হাতে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে। তখনই কলিংবেল বেজে ওঠে। ইনায়া মিষ্টি খেতে খেতেই এগিয়ে এসে দরজা খুলে দেয়। ভেবেছিল তার বাবা বা অন্যকেউ হবে। তেমন কিছু ভাবেনি। খাওয়ায় মন থাকায় চিন্তামুক্ত ছিল। কিন্তু দরজা খুলে সামনে ফাইজকে দেখে ইনায়ার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। ডান হাতে ধরে রাখা মিষ্টির রস বেয়ে বেয়ে নিচ দিকে পড়ে, ইনায়ার সেদিকে হুশ নেই। সে ফাইজকে দেখেই ভেবে নিয়েছে, ফাইজ তার ভাইকে বিচার দিতে এসেছে আর তাকে শাস্তি দিতে। কথাটা ভানতেই ইনায়ার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।

ফাইজ গম্ভীর মুখে ইনায়ার দিকে চেয়ে আছে। ইনায়ার হাতে মিষ্টি, যার অবস্থা বেহাল, মুখ ফুলো, দেখে বোঝা যাচ্ছে মুখে কিছু আছে। হাতে যেহেতু মিষ্টি, তাই ফাইজ ধরেই নিল ইনায়ার মুখে মিষ্টিই আছে। কিন্তু মেয়েটা তাকে দেখে শক খেয়েছে। ইনায়ার অবস্থার চেয়ে মেয়েটির মনের অবস্থা বুঝতে পেরে তার বেশি হাসি পাচ্ছে। কিন্তু ফাইজ উপর থেকে নিজেকে যথাসম্ভব গম্ভীর রাখল। অতঃপর বলে, 'সাইড দেয়া যাবে কি আ...'

আমাকে বলার জন্য আ উচ্চারণ করতে মুখ হা করার সাথে সাথে ইনায়া কেশে ওঠে। মেয়েটির মুখে যে মিষ্টি ছিল, তা ছিটকে বেরিয়ে এসে একদম ফাইজের হা করা মুখের ভেতর গিয়ে পড়ে। ফাইজের মাথা নিচু ছিল, আর ইনায়ার মাথা উঁচু। যার ফলে ঘটনাটি খুব সহজেই ঘটে গিয়েছে। ফাইজ ইনায়া দু'জনেই হতভম্ব চোখে তাকায় একে অপরের দিকে।

পিছন থেকে শুদ্ধ এসে ফাইজের পাশে দাঁড়িয়ে ফাইজের দিকে তাকালে চোখ ছোট ছোট করে তাকায় ফাইজকে হা করে থাকতে দেখে। শব্দ করে বলে, 'বাহ্ বাহ্, দেখেই হা এতো বড় হয়ে যাচ্ছে? খাওয়ার সময় তাহলে কত বড় হা হবে?'

শুদ্ধর কথায় ফাইজের ধ্যান ভাঙে। দ্রুত হা বন্ধ করে নেয়। রে'গে তাকায় শুদ্ধ'র দিকে। শুদ্ধ পাত্তা দিল না। সে ইনায়ার দিকে তাকালে দেখল ইনায়া কটমট চোখে তার দিকে চেয়ে আছে। শুদ্ধ মিটিমিটি হাসল। ইনায়া ভাবছে সে ফাইজকে সাথে এনেছে, ইনায়ার বিচার করতে। সে ইনায়ার ভাবনাকে সত্যি করতে ডান হাত বাড়িয়ে ইনায়ার মাথায় হাত রেখে হেসে বলে, 'হাউ কিউট কটমটীওয়ালী বোন আমার! একটু পরেই তোর বিচারসভা বসবে। যাহ ভালো জামা পরে আয়।'

ইনায়া রে'গে তার বা হাতে শুদ্ধ'র হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিয়ে কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায় আড়চোখে ফাইজের দিকে তাকিয়ে। ফাইজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার উপর বুঝতে পেরে ইনায়া নিজেকে গুটিয়ে নিল। তার পরনে এক ফকিন্নিমার্কা জামা। ইনায়ার মনে আসে, ফাইজ নিশ্চয়ই ভাবছে, তার ভালো জামা নেই। ইনায়া আর এখানে দাঁড়ায় না। দ্রুত উল্টো ঘুরে বড় বড় পায়ে তার ঘরের দিকে যায়।

যেতে যেতে শুদ্ধ'র গুষ্টি উদ্ধার করে। মানুষের ভাইরা কত হেল্প করে, আর তার ভাইরা তাকে বাঁশ দেয়। ইশ! ইরফান ভাইয়া তখনকার সেই কান্ড জানতে পারলে কি হবে? শুদ্ধ যদি একটু ম্যানেজ করে নিত, তবে কি এমন হত? ইনায়ার ইচ্ছে করছে শুদ্ধ'র মাথার সব চুল তুলে ফেলে দিতে। এরপর শুদ্ধ'র টাক মাথার পিক সে ফারাহ'র কাছে পাঠিয়ে শুদ্ধ'র মানসম্মানের রফাদফা করবে।

ফাইজের মুখের ভেতর ইনায়ার মুখ থেকে ছিটকে আসা মিষ্টির ছোট্ট অংশ। যা ফাইজ মুখ নাড়িয়ে টুপ করে গিলে খায়। দৃষ্টি ইনায়ার দিকে রেখে সামান্য ঠোঁট বাঁকিয়ে বিড়বিড় করে, 'ইয়াম্মি!'

পাশ থেকে শুদ্ধ শুনতে পায়। সে ফাইজের দিকে চেয়ে বলে, 'ওটা কোনো লেগপিস নয় সোনা যে ইয়াম্মি হবে। ওটা আমার বোন, জলজ্যান্ত মানুষ।'

ফাইজ ইনায়ার দিকে চেয়েই বলে, 'তোর বোন তোর চোখে মানুষ হলেও আমার চোখে লেগপিস। তাতে তোর কি?'

কথাটা শুনে শুদ্ধ নাকমুখ কুঁচকে বলে, 'ছ্যা ছ্যা ছ্যাঁহ, তুই এতো খ্রাপ কিভাবে হতে পারলি ফাইজ?'

ফাইজ বিরক্ত চোখে শুদ্ধ'র দিকে তাকায়। কিছু বলতে নেয়, তার আগেই ইরফানের কণ্ঠ ভেসে আসে, 'ঠিক যেভাবে তুই নাম্বার ওয়ান বাঁদর হতে পেরেছিস।'

ইরফানের কণ্ঠ শুনে ফাইজ, শুদ্ধ দু'জনেই সামনে তাকায়। ইরফান রেডি হয়ে নিচে নেমে এসেছে, মনে হচ্ছে অফিস যাবে। ইরফানের পিছন থেকে তারেক নেওয়াজ এগিয়ে এসে ফাইজ আর শুদ্ধকে দেখে বলে, 'আরে তোমরা দরজায় দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভেতরে এসো।'

ফাইজ শুদ্ধ দু'জনেই ভেতরে আসে। ফাইজ তারেক নেওয়াজকে সালাম দেয়। ভদ্রলোক সালাম এর উত্তর দেয়।

শুদ্ধ তারেক নেওয়াজ এর দিকে এগিয়ে এসে বলে, 'মামা কি হয়েছে জানো?'

তারেক নেওয়াজ ভ্রু কুঁচকে বলে, 'কি হয়েছে?'

শুদ্ধ ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলে, 'তোমার ছেলে ইরফান তোমাকে গ্রেট বাঁদর বলেছে।'

শুদ্ধর কথা শুনে তারেক নেওয়াজ হতভম্ব হয়ে বলে, 'কিইইই?'

শুদ্ধ আগের চেয়েও ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলে, 'বাঁদরের সাথে গ্রেট কেন বলেছে জানো? কারণ অন্য বাঁদররা তো কাপড় পরেনা। তাই ওরা শুধু বাঁদর। কিন্তু তুমি কাপড় পরে তোমার সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঢেকে রাখো, তাই তুমি গ্রেট বাঁদর। বাণীতে তোমার ছেলে ইরফান নেওয়াজ।'

শুদ্ধ'র কথা শুনে তারেক নেওয়াজ আর ফাইজ কেশে ওঠে। ইরফান বিরক্ত চোখে চেয়ে আছে শুদ্ধ'র দিকে। ফাইজ হতাশার শ্বাস ফেলে। এই মুহূর্তে শুদ্ধ'র ওভার ইনোসেন্ট ফেস দেখে তার মনে হচ্ছে, এতো ইনোসেন্ট ছেলের হাতে ফিডার নেই কেন? ফাইজ এই ভাবনারও বিরোধিতা করল, তার বলতে ইচ্ছে করছে, শুদ্ধ'র মতো এতো সুশীল ছেলেকে কোন ডক্টর তৃণা আন্টির পেট থেকে টেনে বের করল? তাকে ধরে আচ্ছা মতো ধোলাই করা উচিৎ। এই বেয়াদব বাঁদরটা নিজের মামাকেও শান্তি দিচ্ছে না।

এদিকে তারেক নেওয়াজ শুদ্ধ'র কথা শুনে ইরফানের উদ্দেশ্যে বলে, 'তুমি আমাকে বাঁদর বলেছ কেন ইরফান?'

ইরফান বিরক্তি কণ্ঠে বলে, 'যাস্ট বাঁদর বলিনি। সাথে গাধাও বলেছি।'

তারেক নেওয়াজ হতভম্ব কণ্ঠে বলেন, 'ইরফান এসব কি বলছ তুমি?'

ফাইজ আবারও কেশে ওঠে। ছেলে, ভাগ্নের মাঝখানে তারেক নেওয়াজকে ভীষণ এক অবলা প্রাণী বলে মনে হলো তার। আহারে!

ইরফান তার বাবার উদ্দেশ্যে বলে, 'বাঁদরের বাঁদরামি যে বোঝেনা, সে অভিয়েসলি গাধা বাবা। তুমি নিজেকে একবার আয়নায় দেখলেই চিনতে পারবে।'

ইরফানের কথা শুনে ফাইজ আর শুদ্ধ মিটিমিটি হাসে। তারেক নেওয়াজ ভোতা মুখে তাকায়। ঠিকই তো। সে কেন শুদ্ধ'র মতো বাঁদরের কথা বিশ্বাস করছে? এবার সে শুদ্ধ'র দিকে তাকালে শুদ্ধ নিজের হাসি চেপে মন খারাপের ভান করে বলে, 'আমি তো তোমাকে চেক করছিলাম মামা, তুমি তোমার ছেলেকে কতটুকু বুঝতে পারো! কিন্তু তুমি তো তোমার ছেলেকে বুঝলে না মামা। আমার ভাই প্লাস বন্ধু ইরফানটা খুব ক'ষ্ট পেয়েছে মামা। খুব কষ্ট। ওর কষ্টে আমি কষ্ট পাচ্ছি। আহ!'

কথাটা বলতে বলতে শুদ্ধ তার বুকের বা পাশে হাত দেয়। যেন তার বুকে কতই না ব্য'থা হচ্ছে!

শুদ্ধ এতো আবেগ নিয়ে কথাগুলো বলল, তারেক নেওয়াজ সাথে সাথে ইরফানের দিকে তাকায়। সত্যি সত্যি ইরফান আবার কষ্ট পেল কি-না! ইরফান সে ধরনের ছেলে নয় এটা তারেক নেওয়াজ জানে। কিন্তু শুদ্ধ'র কথা বলার ধরনে তার মাইন্ড ঘুরে গিয়েছে।

ইরফান তার বাবার ফেস দেখে দাঁত কিড়মিড় করে বলে, 'তুমি কি আবার গাধামি করতে চাইছ বাবা?'

তারেক নেওয়াজ থতমত খেয়ে তাকায়। চোখ মিটমিট করে। যেন তার এক ভ্রম কাটলো। সত্যিই তো সে বারবার এমন গাধামি করছে কেন? এবার সে শুদ্ধ'র দিকে চেয়ে রে'গে বলে, 'শুদ্ধ?'

শুদ্ধ আর ফাইজ শব্দ করে হেসে উঠল। ফাইজ নিজেকে সামলে নিলেও শুদ্ধ হাসতেই থাকে। কোনোরকমে নিজেকে সামলে হাসতে হাসতে বলে, 'উফ মামা, একমাত্র তুমিই আমার হায়ার লেভেলের প্রিয়। হাউ কিউট বোকা মামা!'

তারেক নেওয়াজ কি বলবেন বুঝলেন না। তার বংশের দুই ছেলেই তার নাক কাটে। ইরফান উচিৎ কথা বলে আর শুদ্ধ বাঁদরামি করে। এই তার কপাল।

ইরফান বাইরে বেরিয়ে যেতে নিলে ফাইজ বলে, 'ইরফান একটু বোস, ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।'

ইরফান যেতে যেতে বলে, 'অফিসে ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে। এক্ষুনি যেতে হবে।'

'দশ মিনিট টাইম দে।'

তারেক নেওয়াজ ফাইজের সাথে বলে, 'ফাইজ আব্বুর কথা শুনেই যাও ইরফান। দশ মিনিট লেট হলে কিছু হবে না।'

ইরফান দরজায় দাঁড়িয়ে ফাইজের দিকে একবার তাকায়। এরপর তার বাবার দিকে চেয়ে বলে, 'গত তিনবছর থেকে ফাইজ ইনায়াকে লাইক করে বাবা। ও ইনায়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে এসেছে। ইনায়ার হাসবেন্ড হিসেবে আমার ওকে পছন্দ। বাকিটা তুমি কথা বলে নাও। আঙ্কেল আন্টিকে বাসায় আসতে বলে বিয়ের ডেট ফিক্সড করে আমাকে জানিয়ো। আপাতত আমার অনেক কাজের চাপ।'

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন