ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের অমল কাব্য (সিজন-৩)

১৬তম পর্ব

লেখক: DRM Shohag

কথাগুলো বলে ইরফান বড়বড় পায়ে চলে যায় বাইরে।

ফাইজ, শুদ্ধ, তারেক নেওয়াজ, পিছনে দাঁড়ানো রুমা নেওয়াজ সকলে ইরফানের বলা কথাগুলো শুনে বিনা মেঘে বর্জ্যপাত হওয়ার মতো রিয়েকশন দিয়ে দিয়েছে। ফাইজ যেখানে শুদ্ধকেই দু'দিন আগে ডিরেক্ট বলল, আগে ইনডিরেক্লি জানলেও ডিরেক্ট সেভাবে বলেনি। ফাইজ ইরফানের বোনকে পছন্দ করে জানলে ইরফান কেমন রিয়েকশন দিবে, ফাইজ সেই ভ'য় পাচ্ছিল। অথচ ইরফান সব জেনে বসে আছে। ফাইজ পুরো হতভম্ব হয়ে গিয়েছে। বেচারা ভেবেছিল ইরফান ছোটোখাটো সারপ্রাইজড হবে, উল্টে সে নিজেই বড়সড় সারপ্রাইজড হয়ে বসে আছে।

শুদ্ধ এগিয়ে এসে ফাইজের ঘাড়ে হাত রেখে বলে, 'আমি সিওর ইরফানের সাথে জ্বিন আছে বুঝলি ফাইজ? চল আমি আর তুই মিলে ওর থেকে ওই জ্বিন ছিনিয়ে নিয়ে আমাদের পকেটে রাখি। তারপর দেখব এই ব্যাটা ইরফান আমাদের কিভাবে সারপ্রাইজ দেয়। এই শা'লা তো আমাদের সারপ্রাইজ দিতেই দিচ্ছে না। শুধু নিজেই সারপ্রাইজ দিয়ে যাচ্ছে। নাছিমের বিয়েতেও একই অবস্থা। তোর বিয়ে হওয়ার আগেই সারপ্রাইজ দিয়ে দিল। ওকে ঠিক কি পরিমাণ ধরিবাজ জ্বিন ধরেছে, বুঝতে পারছিস?'

শুদ্ধ আজগবি কথায় ফাইজ বিরক্ত চোখে তাকায় শুদ্ধ'র দিকে। রে'গে বলে, 'গাধার মতো কথা বলা বন্ধ করবি তুই?'

কথাটা বলতে বলতে ফাইজের তারেক নেওয়াজ এর সাথে চোখাচোখি হয়। তারেক নেওয়াজ অদ্ভুদ চোখে চেয়ে আছে ফাইজের দিকে। ফাইজ অস্বস্তিতে পড়ে যায়। শুদ্ধকে গাধা বলতে গিয়ে ইরফানের তারেক নেওয়াজকে গাধা বলার ব্যাপারটি ভেসে উঠল মনে হলো। এর চেয়েও বেশি অস্বস্তিকর ব্যাপার হলো, তারেক নেওয়াজ জেনে গিয়েছে সে ইনায়াকে ভালোবাসে। হুট করেই ফাইজের ভীষণ ল'জ্জা লাগলো। সে বিব্রতবোধটুকু কোনোরকমে সামলে তারেক নেওয়াজকে ছোট করে বলে, 'আঙ্কেল আমার একটা কাজ পড়ে গিয়েছে, আসছি।'

কথাটা বলে তাড়াহুড়ো করে বেরিলে গেল ফাইজ। যেন পালিয়ে গেল এখান থেকে। ফাইজকে পালাতে দেখে শুদ্ধ মিটিমিটি হেসে শব্দ করে বলে ওঠে, 'বুন্দু আমাল শলম পায় মামা শলম।'

ফাইজের কানে গিয়েছে শুদ্ধ'র কথা। দাঁত কিড়মিড় করে বিড়বিড় করে, 'বে'য়া'দ'ব বাঁদর।'

তারেক নেওয়াজ এতক্ষণ গম্ভীর থাকলেও কয়েক সেকেন্ডের মাথায় মৃদু হাসেন। ফাইজকে তার খুব পছন্দ। মেয়ের জামাই হিসেবে তো একশোতে একশো। অপছন্দ হওয়ার চান্স নেই।

শুদ্ধ তার মামাকে হাসতে দেখে মামার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, 'কি মামা, আমার বন্ধুকে পছন্দ হলো?'

তারেক নেওয়াজ মৃদু হেসে বলেন, 'একদম।'

শুদ্ধ খুশি হয়ে দু'হাতে তারেক নেওয়াজের ভুড়িতে আঙুল চালিয়ে হাসতে হাসতে বলে, 'আমার হাউ কিউট ভুড়িওয়ালা মামা! একেবারে লাখে একটা।'

তারেক নেওয়াজ রেগে বলে, 'কি বললে তুমি?'

কথাটা বলে শুদ্ধ'র কান টেনে ধরতে নিলে শুদ্ধ হাসতে হাসতে এক দৌড়ে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে।

ঘড়ির কাটা রাত ৯ টার ঘরে। নাছিম বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশপানে চেয়ে আছে। বিকালে সামিয়াকে নিয়ে বাসায় আসার পর নাছিম আর বেরোয়নি। কিচ্ছু ভালো লাগছে না তার। বারবার মনে পড়ছে বিকালে মাইরার সাথে ঘটা তখনকার দৃশ্য। ইরফান মাইরাকে নিয়ে গেল। রে'গে গিয়ে মাইরাকে মা'রেনি তো? ইরফান রেগে গেলে ওর মাথা ঠিক থাকেনা। সেসব চিন্তা সাথে তার বার্বিডলকে হারানোর শোক সবমিলিয়ে নাছিমের বড্ড অসহায় লাগে। সে পকেট থেকে ফোন বের করে শুদ্ধকে একটা কল করল। কল রিসিভ হলে সে বিচলিত কণ্ঠে বলে, 'বার্বিডল কেমন আছে শুদ্ধ?'

ওপাশে শুদ্ধ বিরক্ত হয়ে বলে, 'নিজের বউ ঘরে রেখে আরেকজনের বউয়ের খোঁজ করছিস? ছ্যাহ! তোর কি উন্নতি হবে না?'

নাছিম শুদ্ধ'র কথা গায়ে না মেখে বিকালের ঘটনা সব খুলে বলে। এরপর বলে, 'ইরফান বার্বিডলকে কিছু বলেনি তো শুদ্ধ?'

শুদ্ধ নাছিমের সব কথা শুনে একটু ভাবুক হয়। আবারও নাছিমের মুখে মাইরার নাম বার্বিডল নাম শুনে রে'গে বলে, 'বালের বার্বিডল। এই নাম বাদ দিবি তুই? তোর জন্য মেয়েটার কতগুলো মার খাওয়া লাগলো আল্লাহ মাবুদ ভালো জানে।'

নাছিম মলিন গলায় বলে, 'স্যরি, মাইরা হবে।'

শুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মাইরা এইজন্য তাকে দেখা করতে বলেছিল, কিন্তু যেতে পারেনি বলে সে নিজেই গিয়েছে নাছিমকে চেক দিতে। আর ওদিকে ইরফান দেখে নিশ্চয়ই ভালো রিয়েকশন দেয়নি। সাথে মাইরাকেও ছাড়েনি। কাকে দোষ দিবে সেটাই বুঝতে পারছে না। আরেকদিকে নাছিমের ভাঙা হৃদয়। শুদ্ধ বোঝানোর স্বরে বলে, 'একটা কথা বলি নাছিম, আমার মনে হয়, ইরফান তোর চেয়ে মাইরার প্রতি বেশি পজেসিভ। তাছাড়া তুই মাইরাকে নিয়ে ভাবলে ইরফানের রাগ বাড়বে বই কমবেনা। তুই এবার অন্তত মাইরাকে নিয়ে ভাবা ছেড়ে দে। সবচেয়ে বড় কথা, তুই বিবাহিত নাছিম। তোর একটা বউ আছে একটু বোঝ।'

নাছিম চুপ করে শুনলো শুদ্ধ'র কথাগুলো। বার্বিডলকে নিয়ে ভাবা ছেড়ে দেয়ার কথা মুখে যতটা সহজে বলা যায়, কাজটি কি আদোও ততটা সহজ? নাছিম আর কিছু বলল না। শুদ্ধ নাছিমকে আরও কিছুক্ষণ বুঝিয়ে সুজিয়ে কল রেখে দেয়। নাছিম ফোন পকেটে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। উল্টো ঘুরে ঘরে আসার জন্য দু'পা এগোলে সামনে সামিয়া দেখে নাছিমের পা থেমে যায়। দু'জনের চোখাচোখি হতেই সামিয়া দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়। নাছিমের মনে হলো সামিয়ার চোখজোড়া ঝাপসা। সে ঠিক বুঝতে পারলো না সামিয়ার চোখে জল কেন ছিল।

সামিয়া নাছিমের পাশ কাটিয়ে বেলকনিতে যেতে নিলে নাছিম দ্রুত সামিয়ার সামনে দাঁড়ায়। সামিয়া মাথা নিচু রেখেই বলে, 'কিছু বলবেন?'

নাছিম মৃদুস্বরে বলে, 'বলব। আগে আমার দিকে তাকাও।'

সামিয়া ঢোক গিলল। অনেক গরম লাগছিল, এজন্য সে মাত্র গোসল করেছে। বা হাতে তোয়ালে। মাথায় শাড়ির আঁচল টানা। ভেবেছিল বেলকনিতে এসে আঁচল ফেলে ভালোভাবে মাথা মুছবে। নাছিম আবারো বলে, 'কি হলো তাকাও।'

সামিয়ার অসহায় লাগলো। নাছিমের কথাগুলো সে সব শুনেছে। জানেনা কেন তার খারাপ লাগছে। সারাদিন মাথায় ঘুরতে থাকে নাছিম তার স্বামী। আর তারপর যখন মনে পড়ে নাছিমের মনে অন্যকেউ তখনই কোথা থেকে যেন হাজারটা মন খারাপ তার মনে ভেসে আসে। সামিয়া তার ঝাপসা চোখজোড়া মোছার জন্য ডান হাত উঠালে নাছিম সামিয়া হাত ধরে ফেলে। নাছিমের এহেন কাজে সামিয়া চোখ বড় বড় হয়ে যায়। ভাবনার মাঝেই নাছিম অপর হাতে সামিয়ার মাথা উঁচু করে ধরে। সামিয়া আরও অবাক হয়। সাথে তার চোখে জমে থাকা অশ্রু বেয়ে গালে গড়িয়ে পড়ে। নাছিম দেখল সামিয়ার অবস্থা। মৃদুস্বরে বলে, 'কি হয়েছে?'

সামিয়া অস্বস্তিতে পড়ে যায়। ধরে রাখা হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইলে নাছিম সামিয়া ধরে রাখা হাত ছেড়ে দেয়। অপর হাতও সরিয়ে নেয়। সামিয়া দ্রুত চোখের পানি মুছে নেয়। মাথা নেড়ে বলে, 'কিছু না।'

নাছিম কি বলবে বুঝল না। সামিয়ার জায়গা থেকে ভেবে কিছুটা আন্দাজ করতে পারলো বোধয়। ভীষণ অসহায় লাগে নিজেকে। তার বিয়েটা করা একদমই উচিৎ হয়নি। এখন এর সমাধান খোঁজার পরও নিজেকে অপারাধী লাগে। নাছিম এসব ভাবনা আপাতত চেপে রাখল।

সামিয়ার মাথা থেকে শাড়ির আঁচল পড়ে যাওয়ায় নাছিমের চোখে পড়ে সামিয়ার ভেজা চুল। সে সামিয়ার হাত থেকে তোয়ালেটি কেড়ে নিয়ে সামিয়ার পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়। এরপর তোয়ালে দ্বারা সামিয়ার কোমর সমান ভেজা চুলগুলো মুছতে শুরু করে। সামিয়া বুঝতে পেরে পিছন ঘুরতে নেয় আর বলে, 'কি করছেন?'

নাছিম বাঁধা দিয়ে আদেশের সুরে বলে, 'পিছনে ঘুরবে না। আমার ইচ্ছে করছে এই কাজ করতে। সোজা হয়ে দাঁড়াও।'

সামিয়া চুপ করে থাকলো। নাছিমের কান্ডে যেন অস্বস্তি হয়, তেমনি অদ্ভুদ অনুভূতি হয়। নাছিম চুল মুছতে মুছতে মৃদুস্বরে বলতে থাকে, 'আমি তোমাকে খুব ভালো বন্ধু মানি সামিয়া। তুমি আমার থেকে কোনো কারণে কষ্ট পেলে আমাকে জানাবে। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব সেটা শুধরে নেয়ার। হয়তো সবকিছুর সমাধান আমার কাছে নেই। তবে.....'

নাছিম থেমে গেল। এরপর বলে, 'তুমি আমাকে বন্ধু ভাবলে আমি খুশি হব।'

কথাটা বলে নাছিম হাতের তোয়ালে সামিয়ার কাঁধের উপর রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে, 'তোমার চুলগুলো সুন্দর।'

সামিয়া অদ্ভুদভাবে তাকালো নাছিমের দিকে। নাছিমের কাজকর্ম কথাবার্তা শুনে সামিয়ার ভালো লাগলো। গত দু'দিনেই নাছিমকে সে যতটুকু চিনেছে তাতে মনে হয়, নাছিম একদম সোজাসাপ্টা বলে দেওয়া মানুষ। অর্থাৎ নাছিমের মনে যা তাকে সে তাই বলে দেয় একদম নির্দ্বিধায়। সত্যি বলতে সামিয়া নাছিমকে যত দেখছে তত ভালো লাগছে। অন্তত একজন মানুষ হিসেবে নাছিম সত্যিই খুব ভালো মানুষ। সামিয়ার আফসোস হয়, সে যদি এমন মানুষের মনে একটু হলেও জায়গা পেত! কিন্তু ভাগ্য তার সহায় নয়। তাই এটাও কখনো সম্ভব নয়।

পরদিন, শুদ্ধ কিছুক্ষণ আগে ভার্সিটিতে এসে পৌঁছেছে। অফিসরুমের দিকে যেতে নিলে মাইরাকে দেখে থেমে যায় সে। গতকাল রাতে নাছিমের বলা কথা মনে পড়ল। ইরফান মাইরাকে কি কিছু বলেছিল নাকি! যদিও এটা ওদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার। কিন্তু ইরফানের যা রাগ, বাপরে! এদের মাঝের খবর না নিলে দেখা যাবে ইরফানের রাগের কারণে কোনো দিন যেন মাইরার হদিস পাওয়া যাবে না। এর মাঝে শুদ্ধ খেয়াল করে, মাইরা একা একা ভার্সিটি এসেছে। আশেপাশে দৃষ্টি ঘুরিয়ে ইরফানকে খুঁজলেও ওকে চোখে পড়ল না। শুদ্ধ এগিয়ে গিয়ে মাইরার সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,

'মাইরা, তুমি একা কেন? ইরফান কই?'

মাইরা শুদ্ধকে দেখে দাঁড়িয়ে যায়। মলিন মুখে উত্তর করে, 'আমি একাই এসেছি ভাইয়া। আপনার ভাই কোথায়, সেটা আপনি কল করে জেনে নিন। আমি এসব জানি না।'

মাইরার কথার ধরনে শুদ্ধের কপালে ভাঁজ পড়ে। নিশ্চয়ই ইরফান কিছু করেছে। অতঃপর সে গলা ঝেড়ে বলে,

'ইরফান কি তোমাকে মেরেছে, মাইরা?'

এবার মাইরা পুরোপুরি মুখ খুলল,

'উনি আমাকে মারার জন্যই বিয়ে করেছে ভাইয়া। শুধু মারেনি, মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে আমার। আপনার ভাই আসলেই একটা জন্তু, বুঝলেন?'

মাইরার কথা শুনে শুদ্ধ কেশে ওঠে। সে একটু টাচ দিতেই রেডিও বেজে উঠেছে। কিন্তু ইরফান সত্যিই মাইরার মাথা ফেটে দিয়েছে? অবাক হয়ে বলে,

'তুমি সত্যি বলছো, মাইরা?'

মাইরা দে বলে,

'না, মিথ্যা বলছি। শুধু আপনার ভাই সত্যবাদী।'

শুদ্ধ অসহায় কণ্ঠে বলে,

'তুমি আমার উপর রাগ করছ কেন, মাইরা?'

মাইরা সত্যিই ভীষণ রেগেছে। কণ্ঠে আরও রাগ ঢেলে বলে,

'আমি অবশ্যই আপনার উপর রাগবো, ভাইয়া। আপনি আপনার ভাইকে একটু শাসন করবেন না?'

মাইরার কথা শুনে শুদ্ধের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। ক'সেকেন্ডের মাথায় কাশি উঠে যায় বেচারার। সে করবে ইরফানকে শাসন? এটাই শোনার বাকি ছিল। শুদ্ধকে এভাবে কাশতে দেখে মাইরা চোখ ছোট ছোট করে বলে,

'কি হয়েছে, ভাইয়া?'

শুদ্ধ বহুকষ্টে নিজেকে সামলে অসহায় কণ্ঠে বলে,

'তাই বলে আমি ইরফানকে শাসন করব, মাইরা? এতো অবাস্তব কথা তুমি বলতে পারলে?'

মাইরা তেজ নিয়ে বলে,

'অবশ্যই পারি। আপনার ভাই শুধু আমাকে মারে। আগে থাপ্পড় দিত, আর এখন তো মাথাও ফেটে দেয়। আমি আপনার ভাইয়ের সাথে থাকবোই না।'

শুদ্ধ অবাক হয়ে বলে,

'কি বলছ, মাইরা? এই সামান্য কারণে তুমি ইরফানের সাথে থাকবে না?'

মাইরা মলিন হেসে বলে,

'আমি উনার হাতে মাত্র ক'দিনে অনেক মার খেয়েছি, ভাইয়া। এটা আপনার কাছে সামান্য লাগছে? আমি আপনার নিজের বোন হলে ঠিকই অসামান্য লাগতো, তাইনা, শুদ্ধ ভাইয়া?'

মাইরার অসহায়ত্বে ঘেরা কণ্ঠে শুদ্ধের মুখ থমথমে হয়ে যায়। তাকায় মাইরার মলিন মুখের দিকে। ঠিক কি বলবে বুঝতে পারছে না।

মাইরা আবারও বলে,

'আমি সত্যিই উনার সাথে থাকবো না। আপনার ভাইকে আমার স্বাভাবিক লাগে না। কেমন অদ্ভুত আচরণ করে।'

শুদ্ধ ভীষণ অবাক চোখে দেখে মাইরাকে। বলে,

'মাইরা, তুমি হয়তো ভাবছ, ইরফান আমার ভাই বলে আমি শুধু ইরফানের কথাই ভাবছি। কিন্তু ব্যাপারটি এমন নয়, মাইরা। ইরফান একটু রগচটা টাইপ। সবার সাথে সেভাবে মিশতে পারে না। ঠিক করে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেনা। ওর রাগটা একটু বেশি। কিন্তু ও তোমাকে নিয়ে ভীষণ সিরিয়াস। তুমি একটু ভাবলেই বুঝতে পারবে। আমি ইরফানের মারকে সাপোর্ট করছি না। বাট...'

এটুকু বলে শুদ্ধ থেমে গেল। কি বলবে বুঝতে পারছে না। শুদ্ধকে চুপ দেখে মাইরা বলে,

'মানলাম উনার রাগ বেশি। কিন্তু উনি আমার কথা শুনবে না? কোনো কথাই বলে না। শুধু ধুপধাপ মেরে দেয়। আপনার ভাইকে আমার মাঝে মাঝে পাগল মনে হয়। উনি ছোট্ট ছোট্ট ব্যাপার নিয়ে অনেক বেশি ঝামেলা করে। আমি উনার সাথে থাকতে চাই না, ভাইয়া।'

শেষ কথাটি বলতে গিয়ে মাইরার কণ্ঠ কাঁপলো। শুদ্ধ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় মাইরার দিকে। মাইরার থেকে এরকম কথা শুনতে তার একটুও ভালো লাগছে না। মেয়েটা ছোট। কিন্তু অবুঝ নয়। আবার ভাবল, সত্যিই তো, ইরফানের এতো মার খেয়েই বা কে থাকতে চাইবে ইরফানের কাছে? ইরফানকে বোঝালে কাজ হবে কি-না! সে মাইরাকে কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়, মাইরার পিছনে দাঁড়ানো ইরফানকে দেখে। যে মাইরার দিকে খেয়ে ফেলা চোখে চেয়ে আছে। ঢোক গিলল শুদ্ধ। ইরফানের দৃষ্টি দেখেই বুঝেছে, ইরফান মাইরার বলা সব কথা শুনে নিয়েছে।

সে কিছু বলার আগেই ইরফান মাইরাকে টান মেরে তার দিকে ফেরায়। মাইরা পড়ে যেতে নিলে ইরফানের শার্ট খামচে ধরে নিজেকে সামলে নেয়। মাথা তুলে ইরফানকে দেখে অবাক হয়। ইরফানের রাগান্বিত দৃষ্টি দেখে ঢোক গিলল মেয়েটা। ইরফান মাইরার হাত ধরে টানতে টানতে সামনে দিকে যায়। মাইরা ইরফানের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়াতে চায়। পারে না। পিছন থেকে শুদ্ধ বলে,

'ইরফান, ওকে কিছু বলিস না।'

ইরফান শুনলো না। মাইরাকে টানতে টানতে গাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। মাইরা ইরফানকে সরিয়ে দিতে চায়, কিন্তু ব্যর্থ হয়। ইরফান গাড়ির দরজা খুলে মাইরাকে ভেতরে ধাক্কা দেয়। এতো জোরে ধাক্কা খেয়ে গাড়ির অপরপাশের দরজায় গিয়ে ধাক্কা খায় মেয়েটা। ব্যথা পেয়ে চোখমুখ কুঁচকে নেয়। এই অসহ্য লোকটার সাথে সে আর থাকতে পারছে না। সবসময় শুধু গায়ের জোর দেখাবে। হাতে ব্যথা পেয়ে দু'হাতে দু'হাত বুলাচ্ছিল। তখনই ইরফান গাড়ির ভেতরে উঠে এসে মাইরাকে গাড়ির সাথে চেপে ধরে। মাইরা কাঁদোকাঁদো মুখ করে বলে, 'আমাকে ছেড়ে দিন।'

ইরফান ডান হাতে মাইরার গাল চেপে হিসহিসিয়ে বলে, 'স্টুপিড গার্ল, আমি পাগল?'

মাইরা ঢোক গিলল। বলতে ইচ্ছে করল, পাগল-ই তো! এই যে এখন তার সাথে কেমন অদ্ভুত বিহেভ করছে। স্বাভাবিক কিছু যেন করতেই পারেনা লোকটা। কিন্তু মনের সব কথা মনেই রইল। আড়ালে একটু-আধটু সাহস থাকলেও ইরফানকে সামনে থেকে দেখলে তার সব সাহস ফুস হয়ে যায়। এই যেমন এখন হয়েছে ইরফানের রাগান্বিত মুখ দেখে। মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে তার চেয়ে অসহায় মেয়ে এই দুনিয়ায় আর একটাও নেই।

মাইরাকে চুপ দেখে ইরফান আরেকটু শক্ত করে ধরে মাইরার চোয়াল।

রাগান্বিত স্বরে বলে,

'কি বলছিলি? তুই আমার সাথে থাকতে চাস না?'

মাইরা ঢোক গিলল। খুব বুঝল, তার সব কথা শুনে নিয়েছে ইরফান। ভয় পাচ্ছে সে। নয়তো সাহস করে বলেই দিত, 'আপনার মতো পাগলের সাথে শুধু আমি কেন, কেউই থাকতে চাইবে না।' কিন্তু সেই সাহস নেই।

এই কথা আবারো বললে কয়টা যে থাপ্পড় খেতে হবে আল্লাহ জানে।

আবারো মাইরাকে চুপ দেখে ইরফান আরও রেগে যায়। ধমকে বলে,

'কথা বল, স্টুপিড গার্ল?'

মাইরা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। ইরফানের দিকে ভীত চোখে চেয়ে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। চোখের পলকে ইরফান মাইরার ঠোঁটজোড়ার দখল নিয়ে নেয়। মাইরা কেঁপে ওঠে। ইরফান দু'হাতে মাইরার কোমর জড়িয়ে ধরে, সে সোজা হয়ে বসে মাইরাকে তার কোলে বসায়। মাইরা ইরফানের থেকে ছাড়া পেতে ছটফটায়। কারণটা অবশ্য ইরফানের হিংস্রতা! মাইরার কান্না পাচ্ছে। ইরফান একটুতেই তার সাথে এরকম আচরণ করে। এক পর্যায়ে মেয়েটার বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে জল গড়ায়। ফোঁপানির শব্দ হয়। তবুও ইরফানের মনে দয়া হয় না। সে তার সময় মতো মাইরাকে ছাড়লো। মাইরা চোখ বুজে রেখে ফোঁপায়। থেকে থেকে বাচ্চাদের মতো কেঁপে ওঠে। ইরফান গম্ভীর চোখে মাইরাকে পর্যবেক্ষণ করে। মাইরার ঠোঁটের কোণে রক্ত লেগে। ইরফান ডান হাত বাড়িয়ে সেটুকু মুছে দিল। মাইরা ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। ঝাপসা চোখে ইরফানকে দেখে মাইরা কাঁদতে কাঁদতে চেঁচিয়ে বলে,

'আপনি অসভ্য লোক। একটা রাক্ষস আপনি। আমি আপনার সাথে কিছুতেই থাকবো না।'

কথাটা বলতেই ইরফান ডান হাত উঠায় মাইরাকে থাপ্পড় মারতে। মাইরা ভয় পেয়ে মাথাটা সামান্য পিছিয়ে নিয়ে চোখ বুজে নেয়। ইরফানের হাত থেমে যায়। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বাড়িয়ে নেয়া হাত দ্বারা মাইরার মাথা তার বুকে চেপে ধরে।

মাইরা ফুঁপিয়ে কাঁদে। ইরফান তার হাতে মাইরার ঘাড় থেকে চুল সরিয়ে দিয়ে ঘাড়ে মুখ গুঁজে গাঢ় দু'টো চুমু খেয়ে মৃদুস্বরে বলে,

'আমাকে রাগিয়ো না। তোমাকে আমার সাথেই থাকতে হবে। ইট'স ফাইনাল।'

মাইরা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে,

'আপনি একটা পাগল।'

ইরফান চোখ বুজে মাইরার ঘাড়ে, গলায় ছোট ছোট চুমু আঁকতে ব্যস্ত। এভাবে ধীরে ধীরে মাইরার কানের কাছে এসে ঘোর লাগা কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলে,

'যাস্ট ফর ইউ, স্টুপিড গার্ল।'

মাইরার কানে সে কথা গেল কি-না! সে কাঁদতে ব্যস্ত। ইরফান সবসময় তার সাথে এভাবে জোর করে। তার কথা শোনে না। একটু-আধটু কিছু বললেই শুধু মারতে আসে। মাইরার ফোঁপানি থামতে না দেখে ইরফানের চোখেমুখে বিরক্তি ফুটে ওঠে। দু'হাতে মাইরাকে তার বুকে শক্ত করে চেপে মাইরার গালে ঠোঁট চেপে নরম কণ্ঠে বলে,

'ডোন্ট ক্রাই।'

ইরফানের গাড়ি ভার্সিটির বাইরে ফাঁকা জায়গায় দাঁড় করানো ছিল, এজন্য তাদের সেভাবে কেউ দেখল না।

বিকালে ইনায়া তার ঘরজুড়ে ছটফট করছে। আজ সকাল সকাল সে ভার্সিটি যাওয়ার জন্য বেরোচ্ছিল, তখনই ফারাহ্, ফারাহ'র মা-বাবা তাদের বাড়ি এসেছিল। তারা এসে ইনায়াকে ভার্সিটি যেতে দেয়নি। ইনায়া স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিল। ভেবেছিল, শুদ্ধ ভাইয়ার বউ আর তার ভাইয়ার বন্ধু হিসেবে তাদের বাড়ি আসতেই পারে। কিন্তু ইনায়ার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে যখন শুনতে পায়, ফারাহ'র ভাই অর্থাৎ ফাইজের সাথে তার বিয়ে। একে তো ইনায়া বাড়ি একা ছিল, মাইরা ভার্সিটিতে চলে যাওয়ায়। তার উপর এমন উদ্ভট কথায় ইনায়া পুরো হতভম্ব হয়ে যায়। ফারাহ্'রা চলে যাওয়ার পর তার বাবা তাকে জানায়, ফাইজের সাথে তার বিয়ে ঠিক। প্রিপারেশন নিতে। ইনায়া সেই থেকে ধান্দা লেগে আছে। বাবার ইচ্ছেতেই বিয়ে করার ইচ্ছে তার। কিন্তু তাই বলে ফাইজকে? লোকটাকে হাতেগোনা কয়েকবার দেখেছে সে। একদম তার ভাইয়ের মতো গোমড়ামুখো লাগে। না জানি, ইরফানের মতোই রেগে তাকে থাপ্পড় মেরে দেয় না-কি? কথাটা ভাবতেই ইনায়া ঢোক গিলল। হাতে ফোন। ডায়াল নাম্বারে ফ্রাইজের নাম্বার। সাথে সাথে কলটি রিসিভ হয়, যেন ফাইজ কলের অপেক্ষায় ছিল। ইনায়া ঢোক গিলল। মিনমিন করে সালাম দেয় ফাইজকে। ফাইজ ছোট করে সালামের উত্তর নেয়। এরপর নীরবতা প্রায় পাঁচ মিনিট। ভয়ে ইনায়ার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। এদিকে ফাইজ ইনায়ার অবস্থা বুঝতে পেরে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। বলে,

'নিঃশ্বাসের শব্দ শোনাতে কল করেছ?'

ফাইজের কথা শুনে ইনায়া অস্বস্তিতে পড়ে যায়। বা হাতে নাকমুখ চেপে ধরে। তখনই ওপাশ থেকে ফাইজ গম্ভীর গলায় বলে,

'নাকমুখ চেপে লাভ নেই। যা বলতে কল করেছ, ফাস্ট বল।'

ইনায়া অবাক হয়। ফাইজ কি করে জানল সে নাকমুখ চেপে ধরেছে? মনে প্রশ্ন অনুযায়ী সে বিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, 'আপনি কিভাবে জানলেন আমি নাকমুখ চেপে ধরেছি?'

ফাইজ শব্দহীন হেসে বলে,

'আমি আমার লিটল কুইনকে তোমার চেয়ে বেশি চিনি।'

ইনায়া মাথা চুলকে বলে, 'সেটা কে?'

ফাইজ আবারো হাসল। ইনায়া এসব কথা বাদ দিয়ে কাজের কথা বলে,

'আপনি কি আমাকে বিয়ে করতে চাইছেন, ভাইয়া?'

ইনায়ার মুখে ভাইয়া ডাক শুনে ফাইজের চোয়াল শক্ত হলো। কি জঘণ্য ডাক! ছ্যাহ! কিন্তু ফাইজ নিজেকে সামলে বলে, 'আমি চাইছি না। তুমি চাইছ। আমাকে ছাড়া না-কি তুমি বাঁচবে না। দুই দুই বন্ধুর বোনকে কি করে মেরে ফেলি বল?'

ফাইজের কথা শুনে ইনায়া কেশে ওঠে। অসহায় কণ্ঠে বলে,

'বিশ্বাস করুন, ভাইয়া, আমি আপনাকে একদম নিজের ভাইয়ের চোখে দেখি। ওটা একটা ডেয়ার ছিল। আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন, ভাইয়া।'

ইনায়ার ভাইয়া ডাক সহ্য করতে না পেরে ফাইজ এবার এক কড়া ধমক দেয়। ইনায়া ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। ফাইজ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে গম্ভীর গলায় বলে,

'ইডিয়ট, আমি তোমাকে বোন নয়, বউয়ের চোখে দেখি। বাসররাতে আমাকে ভাইয়ার চোখে দেখার সাধ মেটাবো তোমার।

এরপর একটু থেমে আবেগী স্বরে বলে,

'যার জন্য তিন বছর অপেক্ষা করেছি, তার জন্য তিন দিন ওয়েট করতে পারছিনা। আমার লিটল কুইন তুমি।'

কথাগুলো বলে ফাইজ ফোনের ওপাশ থেকে একটি শব্দ করে চুমু আঁকে। স্তব্ধ ইনায়া ফাইজের এহেন কান্ডে কেঁপে ওঠে। ফাইজ ফিসফিসিয়ে বলে,

'আপাতত ফ্লায়িং কিস রাখো, লিটল কুইন। তিন দিন পর এক ইঞ্চিও দূরত্ব রাখব না আমাদের মাঝে। তোমায় আদর...'

আর শোনার শক্তি হয়নি ইনায়ার। খট করে কল কেটে দিয়েছে সে। মাথাটা ভনভন করে ঘুরছে মেয়েটার। ফাইজ এতক্ষণ এসব কি বলল, সেসব কিছুই যেন ইনায়ার মাথায় ঢোকেনি। সময় নিয়ে ইনায়া নিজেকে সামলায়। ভাবতে শুরু করে, ফাইজের বলা কথাগুলো। ফাইজের কথায় মনে হলো,

ফাইজ তাকে গত তিন বছর আগে থেকে পছন্দ করে। সাথে তার নাম দিয়েছে 'লিটল কুইন'। কথাটা ভাবতেই ইনায়ার পুরো শরীর শিরশির করে ওঠে। যদিও সে ফাইজকে কখনোই অন্য নজরে দেখেনি, আর না তো কখনো ভেবেছে। কিন্তু আজ ফাইজের মুখে এসব শুনে ফাইজের মুখ চোখের পর্দায় ভেসে উঠলেই ইনায়া অদ্ভুত অনুভূতির জোয়ারে ভাসে।

ফাইজ বলল, আর তিন দিন ওয়েট করতে পারছে না এর মানে, আর মাত্র তিন দিন পর তার বিয়ে। আর পাত্র স্বয়ং ফাইজ। ফাইজের মুখটা ভেসে উঠতেই ইনায়ার পুরো শরীরজুড়ে অদ্ভুত এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। ফাইজ দেখতে সুন্দর। শুধু সুন্দর নয়, বলা যায় ভীষণ সুন্দর। অন্তত ইনায়ার চোখে ভীষণ সুন্দর। কিন্তু ইনায়ার এটা ভেবে অদ্ভুত লাগছে, মানুষটা তাকে অনেক আগে থেকে ভালোবাসে। অথচ সে বুঝতেই পারেনি। আজ হঠাৎ জানতে পেরে, বড়সড়ো এক শক পেয়েছে। তার কি হলো কে জানে, হঠাৎ শব্দ করে হেসে ফেলল। কি জানি, আগে থেকে তার মাঝে ভাইদের প্রতি ভালো লাগা ছিল কিনা! সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারল না। তবে ভীষণ ভালো লাগছে, ফাইজ থেকে ভালোবাসে জানতে পেরে। আর বিয়েটাও ফাইজের সাথেই হচ্ছে, এটা ভেবে।

গত এক ঘন্টা ইরফান মাইরাকে পুরো ভার্সিটি খুঁজেছে। কিন্তু মাইরাকে কোথাও পায়নি। ইরফানের অফিসে কাজ ছিল, কিন্তু মাইরার ক্লাস থাকার কারণে সে অফিস না গিয়ে ভার্সিটিতে অপেক্ষা করছিল মাইরার জন্য। মাইরাদের ক্লাস শেষ হওয়ার পর, ইরফান মাইরাকে খুঁজলে আর পায় না। বাড়িতে কল করেছিল, বাড়ি থেকে জানিয়েছে, মাইরা সেখানে যায়নি। ইরফানের টেনশন হচ্ছে। কোথায় গেল তার বার্ডফ্লাওয়ার? কোনো বিপদে পড়েছে নাকি, ইচ্ছাকৃত কোথাও চলে গিয়েছে? ইরফান বুঝতে পারছে না। সকালে মাইরা তার ক্লাস করেছে, তার উপর রাগ নিয়ে। ইরফান বুঝতে পারছিল। আজ আসার সময়ও একা একা ভার্সিটি এসেছে। এরপর শুদ্ধকে বলছিল, তার সাথে থাকবে না। এসব বহুকষ্টে হজম করে ইরফান হজম করে নিয়েছিল। কিন্তু এখন যদি মাইরা ইচ্ছে করে কোথাও গিয়ে থাকে, তবে ইরফানের হাত থেকে বোধয় কেউ বাঁচাতে পারবে না। মাইরার রাগের কথা মনে পড়লে ইরফানের মনে হয়, মাইরা ইচ্ছে করে তাকে না বলে কোথাও চলে গিয়েছে। কথাটা ভাবতেই ইরফান রাগে কাঁপতে লাগলো। চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছে। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে,

'স্টুপিড গার্ল, যাস্ট খুন করে ফেলব তোকে।'

মাঠের এক কোণায় ইরফানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শুদ্ধ এগিয়ে আসছিল। ইরফানের বলা কথাটা শুনতে পেয়ে শুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। আবার কি হলো এদের? সকালে ইরফান যেভাবে মাইরাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল, ভেবেছিল কি না কি করবে। কিন্তু সে মাইরার থেকে শুনেছিল, ইরফান নাকি তাকে কিছুই বলেনি। শুদ্ধ স্বস্তি পেয়েছিল। গতকাল রাতেই বেচারি মাইরা ইরফানের মার খেয়ে সকালে তাকে কিসব বলছিল। এরপর তো সব স্বাভাবিক লাগলো। মাইরার একটা ক্লাসও ছিল তার। কিন্তু এখন আবার কি হলো? ইরফানের পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,

'কি হয়েছে রে?'

ইরফানের শুদ্ধের কলার চেপে রেগে বলে, 'ও কোথায়?'

শুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলে,

'ভার্সিটির আশেপাশেই দেখ, আছে হয়তো কোথাও।'

ইরফান রাগান্বিত সরি বলে,

'ওই স্টুপিড গার্ল ভার্সিটির কোথাও নেই। তুই বল, ও কোথায়?'

শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। লে হালুয়া, সে কিভাবে জানবে মাইরা কোথায়? মাইরা ভার্সিটিতে নেই, তাহলে অন্য কোথাও আছে। কিন্তু ইরফান এমনভাবে জিজ্ঞেস করছে যেন ইরফান তাকে বডিগার্ড হিসেবে নিযুক্ত করে রেখেছিল। এখন খুঁজে না পেয়ে তার কাছে এসেছে। শুদ্ধ মিটিমিটি হেসে বলে,

'মাইরা তোকে পছন্দ করে না, বাবু। ও আর তোর সাথে থাকতে চায় না। ওকে তুই ভুলে যা। আমি তোকে চার হাত-পা ওয়ালী চারটে বউ এনে দিব নে।

ময়না কান্দে না,

পাদে পুস,

খায় ম্যাংগো জুস!'

শুদ্ধের আজগবি কথায় ইরফান রেগে দাঁত কিড়মিড় করে বলে,

'হোয়াট দ্যা হেল?'

শুদ্ধ হাসতে হাসতে রাগান্বিত ইরফানের দিকে চেয়ে বলে,

'এমন একটা ভাব করছিস যেন তুই পাদিস-ই না। কত বড় বড় সেলিব্রিটিরা পর্যন্ত পাদে আবার হাগে। সেখানে তুই তো....'

ইরফানের কড়া কণ্ঠ, 'সাটআপ।'

কথাটা বলে শুদ্ধের দিকে তেড়ে আসলে শুদ্ধ দ্রুত দু'হাতে ইরফানকে থামিয়ে দিয়ে টপিক পাল্টে বলে,

'ফাইজ ওর আর ইনায়ার বিয়ের ডেট আগামী তিন দিন পর দিয়েছে। শুনেছিস?'

ইরফান বিরক্তি কণ্ঠে বলে,

'হুম। ও কোথায় বল?'

শুদ্ধ হতাশ হয়ে বলে,

'আরে আমি জানিনা। মাইরার মায়ের বাড়ি যেতে পারে। ও তো ওখানেই যায়।

একটু থেমে বোঝানোর স্বরে বলে,

'গতকাল নাকি তুই মাইরাকে মেরেছিলি? মেয়েটা তোর চেয়ে অনেক ছোট। ওর কথা না শুনে এভাবে মেরে....'

শুদ্ধের কথার মাঝে ইরফান দাঁতে দাঁত পিষে বলে,

'ওই স্টুপিড গার্লকে আজ একদম মেরে ফেলব আমি।'

কথাটা বলে ইরফান শুদ্ধকে ধাক্কা দিয়ে হনহন করে বেরিয়ে যায় ভার্সিটির মাঠ থেকে। চোখে মুখে অসম্ভব রাগ, যেন আজ মাইরাকে হাতের কাছে পেলে সত্যি সত্যিই মেয়েটাকে মেরেই ফেলবে।

শুদ্ধ পিছু ডাকলো কিন্তু ইরফান শুনল না। শুদ্ধ হতাশার sigh ফেললো। ইরফানের রাগও কমবে না, মাইরার উল্টাপাল্টা কাজও থামবে না। না জানি আবারও ইরফানের হাতে মেয়েটা কতগুলো মার খায়! এরপর মায়েরা দিবা কেমন রিয়েকশন হয়! এদের মাঝে কোনো মিলই নেই, আল্লাহ যে কোন সুখে এদের এক করে দিল! আবার ইরফানকেই বা মাইরার প্রতি কেন এতো desperate করে দিল!

ভার্সিটির ক্লাস শেষে মাইরা তার মায়ের বাড়ি এসেছে। গতকাল ইরফান রাস্তা থেকেই তাকে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। এরপর তার শ্বশুরবাড়ি থেকে তারেক নেওয়াজ জানিয়েছিল, মাইরা ওই বাড়ি চলে গিয়েছে, এজন্য তার মা আর টেনশন করেনি। আজ ভার্সিটির ক্লাস শেষে সে সরাসরি তার মায়ের বাড়ি চলে এসেছে। গতকাল থাকতে চেয়েছিল, ইরফান তো দিলই না, উল্টে বাড়ি নিয়ে গিয়ে তাকে মারল। মাইরা ঠিক করেছে, আজ সে এখানে থাকবে। এখন তাকে লাবিবের বাবা, মা কেউই কিছু বলে না, এজন্য নির্দ্বিধায় চলে এসেছে এখানে। এমনিতেও সে ইরফানের উপর মারাত্মক রেগে আছে। ইরফানের ঠাস ঠাস মার একদম সহ্য হচ্ছে না তার।

মাইরা তার ঘরে লাবিবকে কোলে নিয়ে বসে হেসে হেসে কথা বলছে লাবিবের সাথে। থেকে থেকে দুষ্টুমি করছে। থেকে থেকে লাবিবের গালে টুপ করে চুমু খায়। লাবিবও তার আপুইকে চুমু খায় আবার হেসে হেসে আদোআদো স্বরে কথা বলে।

হঠাৎ পায়ের শব্দ পেয়ে মাইরা মাথা উঁচু করে তাকায়। সামনে ইরফানকে দেখে মাইরা অবাক হলো। ঢোক গিলল ইরফানের রাগান্বিত চোখমুখ দেখে। আবার এই বাড়ি এসে কি করতে চাইছে এই অসভ্য লোকটা। ইরফানের চোখদুটো রক্তলাল। দেখেই মাইরার গা ছমছম করে ওঠে। ইরফান রেগে কি রিয়েকশন দিবে, সেসব ভাবার আগে, ইরফানের রাগান্বিত মুখ দেখেই ভয়ে মাইরার কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়। এতো সাহসী হতে চায়, কিন্তু সামনে থেকে সব হাওয়া ফুস হয়ে যায়।

লাবিব ইরফানের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলে, 'খুচিব ডুলাবাই।'

হঠাৎ-ই ইরফান বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এসে মাইরার কোল থেকে লাবিবকে একপ্রকার ছিনিয়ে নিয়ে দরজার দিকে এগোয়। মাইরা চোখ বড় বড় করে তাকায়। দ্রুত বিছানা থেকে নেমে ইরফানের পিছু পিছু যায় আর বলে,

'আরে, আমার ভাইকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? ওকে আমার কাছে দিন।'

লাবিবকে দু'হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ইরফান। লাবিব তার বোনের দিকে চেয়ে বলে,

'হু হু, আমি আপুল বাই। আপুল বাইকে কুতায় নিয়ে যাচ্চ খুচিব ডুলাবাই?

এরপর লাবিব ইরফানের দিকে চেয়ে বলে, 'আমাকি আপুইয়েল কাচে দাউ। আমাকে ছালো খুচিব ডুলাবাই।'

ইরফান লাবিবের দিকে চেয়ে ধমক দেয়, 'সাটআপ। 'লাবিব ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। ইরফান লাবিবকে দরজার বাইরে ঠাস করে নামিয়ে রেখে লাবিবের দিকে চেয়ে বিরক্তি কণ্ঠে আওড়ায়,

'ডিজগাস্টিং শা'লা।'

কথাটা বলেই লাবিবের মুখের উপর ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দেয় ইরফান। অবুঝ লাবিব তার ছোট ছোট দু'হাতে দরজায় বারি দেয় আর ডাকে,

'খুচিব ডুলাবাই কুলো, দজ্জা কুলো। আমি আপুই যাবো।'

লাবিবের বাবা এদিকে এসেছিল। সে ইরফানকে দেখেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গেছে। দ্রুতপায়ে মাইরার ঘরের দিকে এগিয়ে এসেছে লাবিবকে নিতে। এগিয়ে এসে লাবিবকে কোলে নিয়ে ভদ্রলোক জায়গাটি প্রস্থান করলেন। স্ত্রীকে জানিয়েছেন মাইরা আর ইরফান দু'জনের জন্যই ভালো ভালো রান্না করতে।

লাবিব তার বাবাকে বলে,

'বাবা খুচিব ডুলাবাই দজ্জা কুলে না।'

ভদ্রলোক ছেলেকে বুকে চেপে স্বস্তি পায়। ইরফানকে প্রথমে দেখে ভেবেছিল, ইরফান হয়ত আবারও তার ছেলেকে কিছু করতে এসেছে। কিন্তু ছেলেকে সুস্থ দেখে বেচারা দম নেয় একটু। লাবিবের মুখে ইরফানকে দেয়া উদ্ভট নাম শুনে ছেলের মাথায় চুমু খেয়ে বলে,

'একদম ঠিক নাম দিয়েছিস ওর।'

লাবিব কি বুঝল কে জানে, বাবার চুমু আর কথায় সে শব্দ করে হাসল।

এদিকে ইরফান লাবিবের মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দেয়ায় মাইরা ইরফানকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে সে দরজা খুলতে চেয়েছিল, তবে ইরফান মাইরাকে সফল হতে দেয়নি। বা হাতে মাইরার কোমর শক্ত করে ধরে রেখে ডান হাতে মাইরার গাল চেপে ধরে শক্ত গলায় বলে,

'স্টুপিড গার্ল, তোর সাহস কি করে হয়, আমাকে না বলে এখানে একা একা আসার?'

মাইরা মোচড়ামুচড়ি করে। গালে ব্যথা পেয়ে মৃদু আর্তনাদ করে বলে,

'আহ্ ছাড়ুন। লাগছে আমার।'

ইরফান মাইরার গাল ছাড়ার পরিবর্তে আরও শক্ত করে ধরে। মাইরার মনে হচ্ছে তার গাল কেটে যাচ্ছে দাঁত লেগে। এমনিতেই সকালে তার ঠোঁটের বারোটা বাজিয়ে রেখেছে। মাইরা ভেজা গলায় বলে, 'ছাড়ুন বলছি।'

ইরফান বা হাতে মাইরার উন্মুক্ত পেটে খামচে ধরে দাঁত কিড়মিড় করে বলে,

'এতো সাহস কোথায় পেয়েছিস বল? কেন অবাধ্য হবি আমার? কথা বল স্টুপিড?'

পেটে, গালে ব্যথা পেয়ে মেয়েটার চোখের কোণে পানি জমে। চেঁচিয়ে বলে,

'আমার যেখানে খুশি সেখানে যাবো। আপনার অবাধ্য হব। তাতে আপনার কি? অসভ্য লোক, ছাড়ুন আমায়। আমি থাকবো......'

না বলার আগেই ইরফান মাইরার ডান গালে শক্তপোক্ত এক থাপ্পড় পড়ে। মাইরা ফুঁপিয়ে ওঠে। মার খেতে খেতেই তার জীবনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। মাইরা পড়ে যেতে নিলে ইরফান বা হাতে মাইরার কোমর শক্ত করে ধরে রেখে ডান হাতে মাইরার গাল চেপে হিসহিসিয়ে বলে,

'বারবার এক কথা কেন বলবি? বলেছি না তোকে আমার সাথেই থাকতে হবে?'

ইরফানের দু'চোখ অগ্নিকুণ্ডের মতো লাল হয়ে আছে। অতিরিক্ত রাগে ইরফান কাঁপছে। মাইরার বারবার বলা থাকবো না, থাকবো না শুনতে শুনতে ইরফান আর নিতে পারছে না।

মাইরার বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে টপটপ করে জল গড়ায়। ইরফানের সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে যে তার মার খাওয়া শুরু হয়েছে, যত দিন যাচ্ছে এর পরিমাণ দিনদিন শুধু বাড়ছে। ইরফানের চোখমুখ এখনো শক্ত। মাইরার মুখে 'মাইরা তার সাথে থাকবে না।' কথাটা এতোবার শুনেছে ইরফান যে তার মনে হচ্ছে, মাইরাকে আধমরা করে বিছানায় ফেলে রাখলেও তার রাগ মিটবে কিনা সন্দেহ। কিন্তু মাইরার চোখের পানি দেখে বহুকষ্টে নিজেকে দমিয়ে রেখেছে। তবে রাগান্বিত মুখাবয়বের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি।

মাইরা ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। লালিত চোখজোড়া রাগান্বিত ইরফানের পানে রেখে ভাঙা গলায় কণ্ঠে রাগী ভাব নিয়ে বলে,

'কেন জোর করছেন আমাকে? একটু এদিক-ওদিক হলেই মেরে দেন। মানুষ মনে করেন না আমাকে? আমি বলছি তো, আমি আপনার সাথে থাকবো না। আপনাকে আমার ভালো লাগে.....'

কথাটা শেষ করতে দেয় না ইরফান। মাইরার অশান্ত ঠোঁটজোড়া বন্ধ করে দেয়। মাইরার মনে হলো, তার শরীরে কেউ মরিচ লাগিয়ে দিয়েছে। তিড়িং বিড়িং করে উঠল। যখন খুশি তখন থাপ্পড় মারে আর যখন খুশি তখন কাছে টেনে নেয়। এসব ভেবে মাইরার ভীষণ রাগ হয়।

কিছু সময়ের মাঝে মাইরা শান্ত হয়। ইরফানের ছোঁয়া কোমল, ভীষণ আদুরে। মাইরা নুইয়ে পড়ে। ইরফান মাইরার গলার ওড়না ছুড়ে ফেলে দেয়। টেনে নেয় মাইরাকে। হাতের বিচরণ অবাধ্য থেকে অবাধ্য হয়। মাইরা হাসফাস করে। দু'হাতে ঠেলে ইরফানকে সরিয়ে দিতে চাইলে ইরফান বিরক্ত হয়। মাইরার ঠোঁটজোড়া ঢিলে করে, তবে একেবারে ছাড়লো না। ওভাবেই চোখ মেলে তাকায় মাইরার দিকে। জিভে আগায় নোনতা স্বাদ লাগলে সেটুকু শুষে নেয়। মাইরা কেঁপে ওঠে। সরে যেতে চাইলে ইরফান মাইরার মাথার পিছনে হাত রেখে চেপে রাখে। মাইরা চোখ মেলে তাকায়। দু'জনের চোখাচোখি হয়। ইরফান তাদের মুখের মাঝে সামান্য দূরত্ব রেখে মাইরার চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে, 'আমাকে পছন্দ করে নিতে বলেছিলাম। এখনও পছন্দ করনি কেন? হোয়াই?'

মাইরা থমথমে দৃষ্টিতে তাকায়। মনে হচ্ছে, সে রোবট। তাকে একজনকে পছন্দ করতে বলল আর সেও পছন্দ করে নিল। অসভ্য লোক, সবসময় নিজের মতো করে সবাইকে চালাতে চায়। মাইরার রাগ হয়। সে ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলে,

'আপনার মতো জন্তুকে শুধু আমি কেন, এই পৃথিবীর কোনো মানুষই পছন্দ করবে না, বুঝলেন? তাই আমিও আপনাকে পছন্দ করব না। না মানে না।'

মাইরার কথাটা ইরফানের কর্ণপাত হতেই তার চোখেমুখে অজস্র ক্রোধ জমা হয়। রাগে থাপ্পড় মারার জন্য হাত উঠালে মাইরা ভাঙা গলায় চেঁচিয়ে বলে,

'হ্যাঁ হ্যাঁ, আরও মারুন। কিন্তু এটাই শেষবার। আমি আর আপনার কাছে থাকছি না। কথায় কথায় থাপ্পড় খেয়ে আপনার কাছে পড়ে থাকতে পারবো না আমি। আমার কেউ নেই। কাউকে লাগবেও না। আমার জন্য আল্লাহ্-ই যথেষ্ট।'

কথাগুলো বলতে বলতে মাইরার দু'চোখ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। ইরফানের হাত অনেক আগেই থেমে গিয়েছে। নির্বাক দৃষ্টিজোড়া মাইরার কান্নারত মুখপানে। ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে নেয়। দু'বার ঢোক গিলল ইরফান। নিজেকে এতো অসহায় লাগে। সে না তো তার রাগ দমিয়ে নিতে পারে, আর না তো এই স্টুপিড মুখের লাগাম টানে। যা যা করলে সে রেগে যাবে, স্টুপিডটা সেসবই করে। অসহ্য অনুভূতি নিয়ে ইরফান তার ডান হাতে মাথার চুল টেনে ধরে। বা হাতে মাইরাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়। মাইরা কয়েক পা পিছিয়ে যায়। অবাক হয় ইরফানের কাজে।

ইরফান ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। আপাতত এই স্টুপিড গার্লের সামনেই থাকবেনা বলে সে সিদ্ধান্ত নিল। অতঃপর ইরফান রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে উল্টো ঘুরে বড় বড় পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। মাইরা শক্ত গলায় বলে,

'আমি আপনার সাথে থাকতে চাই না।'

ইরফানের পা থেমে যায়। আবারো একই কথা। ইরফান নিতে পারছে না আর এটা। রাগে দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়। চোখের পলকে আবারো দিক ফেরায় মাইরার দিকে। সামনে এগোয় কয়েক পা। ভস্ম করা দৃষ্টি মাইরার পানে। মাইরা ভয় পেল রাগান্বিত ইরফানকে তার দিকে এভাবে এগোতে দেখে। ভীতি ঢোক গিলল মেয়েটা। তবে পিছু সরলো না। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ইরফান আবারো মাইরাকে থাপ্পড় মারতেই বোধয় এগোচ্ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে মাইরার বলা কথার মাঝে 'মাইরাকে মারার' বিষয়টি মনে পড়তেই ইরফানের পা থেমে যায়। দৃষ্টি শীতল হয়। এবার আর ইরফান মাইরাকে আঘাত করতে এগোলো না। বরং ডানপাশে রাখা একটি বড়সড় আয়না বরাবর মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত দ্বারা সর্বশক্তি দিয়ে ঘুষি মেরে দেয়। শক্ত আঘাতে আয়নাটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে মেঝের চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়। কিছু কাঁচের অংশ ইরফানের হাতে বিঁধে যায়। মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে যায় হাতটি।

হঠাৎ ইরফানের এহেন কান্ডে মাইরা হতভম্ব হয়ে যায়। ইরফানের ক্ষত হাতটি দেখে মেয়েটার বুকে কাঁটার ন্যায় কিছু বিঁধে যায়। ছলছল দৃষ্টিতে তাকায় ইরফানের চোখের দিকে। ইরফানের শান্ত দৃষ্টি তারই দিকে। মাইরা দ্রুত এগিয়ে আসতে নেয় ইরফানের দিকে। এক পা এগোতেই ইরফান ভারিক্কি স্বরে বলে,

'স্টপ বার্ডফ্লাওয়ার।'

মাইরা কেঁপে ওঠে। থেমে যায় তার পদযুগল। অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় ইরফানের দিকে। ইরফান দু'পা পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়ায়। ডান হাত চুইয়ে চুইয়ে কয়েক ফোঁটা রক্তের কণা মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে। ইরফানের সেদিকে খেয়াল নেই। এ ব্যাপারে সে অনুভূতিহীন। অথচ তার দৃষ্টিতে মাইরার প্রতি অজস্র অনুভূতি মিশিয়ে। কাতর স্বরে বলে,

'আমি জানি না, এতো অল্প সময়ে কাউকে ভালোবাসা যায় কি-না! আমি জানি না, আমি তোমাকে ভালোবাসি কি-না! ইনফেক্ট আমি এটাও জানি না, ভালোবাসা আসলে কি! কিন্তু আমার তোমাকে চাই বার্ডফ্লাওয়ার। তুমি না চাইলেও, আমার তোমাকে চাই। মানে তোমাকেই চাই। অন্যকেউকে নয়। সে তোমার মতো হলেও নয়।

তোমার ইচ্ছা পূরণ করতে, সাময়িক দূরত্ব দিয়ে গেলাম তোমাকে। সাবধানে থেকো। নিজের যত্ন নিও। আমাকে মনে রেখ। আমি আবারও ফিরব। তুমি না চাইলেও ফিরব। কারণ তোমাকে ছাড়া আমার যাস্ট চলবে না। আমাকে পছন্দ করে নাও, ফাস্ট। আদারওয়াইজ এভাবেই থাকতে হবে আমার সাথে। ইট'স ফাইনাল।'

একটু বলে থামে ইরফান। মাইরার কান্নারত মুখাবয়বে দৃষ্টি ঘোরায়। ডান গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ স্পষ্ট ভেসে আছে। ইরফান এগিয়ে এসে মাইরার সামনে দাঁড়ায়। মাইরা কিছু বোঝার আগেই ইরফান সামান্য ঝুঁকে মাইরার গালে ঠোঁট চেপে ধরে ফিসফিস কণ্ঠে বলে,

'রিমেম্বার দ্যাট, ইউ আর মাই হার্ট বার্ডফ্লাওয়ার।'

কথাটা বলে ইরফান আর দাঁড়ালো না। দ্রুত উল্টোদিকে পা চালায়।

মাইরা নির্বাক দৃষ্টিতে ইরফানকে দেখে। এই ইরফানকে সে একটুও চেনে না। কত আবেগ নিয়ে কথা বলে মানুষটা। তবে রেগে গেলে ওমন করে কেন?

ইরফান ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে ঢোক গিলে ছোট্ট করে বলে, 'বাই।'

আরও দু'পা এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,

'লিসেন মাই মিসেস।'

ইরফানের সম্মোধনে মাইরার শরীর শিরশির করে ওঠে। হঠাৎ-ই সুরেলা কন্ঠে ভেসে আসে ইরফানের গাওয়া ক'লাইন গান,

'ভালোবাসা হয় যদি অপরাধ!

আমি বারবার নিব,

সে ভুলেরই সাধ।

ভালোবাসা কখনো,

পরাজয় মানে না।

যাকে মেনে ছিলাম,

জীবনের আয়না।

তাকে দূরে রাখা যায়!

ভুলে থাকা যায় না!'

ইরফানের এতো সুন্দর কণ্ঠে গান শুনে মাইরা একদম স্তব্ধ হয়ে যায়। ইরফানের গাওয়া গানের প্রতিটি লাইন, প্রতিটি শব্দ, ইরফানের গানের সুর মেয়েটার কানে বাজছে। দু'চোখ বেয়ে টপটপ করে নোনাজল গালে গড়িয়ে পড়ে।

গানটুকু গেয়ে ইরফান বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,

I miss you a lot, my Birdflower.

I'll be back soon.'

এরপর ইরফান একটু আগের গাওয়া গানটির শিস বাজায়। দরজা খুলে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। পিছু ফিরল না আর। শিস বাজাতে বাজাতে এগিয়ে যায় বাড়ি থেকে বেরোনের জন্য। সামনে যত এগোয়, তত শিসের শব্দ মৃদু হয়ে আসে। মাইরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু ভেতরটা অজানা কারণে ছটফট করছে। মেয়েটির দু'চোখ বেয়ে টুপটুপ করে পানি গড়ায়। ইরফান কোথায় যায় তাকে রেখে? কেন তাকে জোর করে নিয়ে যাচ্ছে না? ইরফানের এভাবে নির্লিপ্তভাবে চলে যাওয়া সে মানতে পারছে না। মাইরা দৌড়ে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরে নজর করলে দেখল বাড়ির মেইন গেইট খোলা। অর্থাৎ ইরফান বেরিয়ে গেছে। সেই গানের সুর এখনো মৃদু ভেসে আসছে। মাইরা এক পা বাড়াতে নিলে খেয়ালে আসে তার শরীরে ওড়না নেই। তখনই শিসের শব্দ মিলিয়ে গিয়ে গাড়ির শব্দ ভেসে আসে। মেইন গেইট খোলা থাকায় শব্দটি পাওয়া যাচ্ছে। ইরফান তাকে না নিয়েই চলে যাচ্ছে। কথাটি ভাবতেই মাইরা হাসফাস করে। লালিত চোখজোড়া আবারো ভিজে ওঠে। মনে হচ্ছে ইরফানের বাজানো শিস এখনো কানে বাজছে। কি নিখুঁত সুন্দর ইরফানের কণ্ঠে গাওয়া গান আর শিস। এর চেয়ে ইরফানের শিস শুনেছিল একবার, তবে আজ প্রথম গান শুনলো। ইরফানের শিস, গান দুটোই ভীষণ সুন্দর শোনালো মাইরার কাছে।

অতঃপর মাইরা ইরফানকে নতুন এক নামে বিড়বিড় করে ডাকে,

'শিসওয়ালা?'

শব্দটি বলে একবার শুকনো ঢোক গিলে নেয় মাইরা। আবারো আওড়ায়,

'আমাকে রেখে যাবেন না।'

এটুকু বলতে গিয়ে মাইরার দু'চোখ বেয়ে আরও ক'ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন