ভার্সিটির গেইটের বাইরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত ইরফান।
আশেপাশে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে,
'হ্যাঁ, পাশে দশ তলা বিল্ডিং।'
মাইরা মিলার হাত ধরে ভার্সিটির গেইটের ভেতরে প্রবেশ করতে নেয়, তার আগেই ইরফানের কথাটা কানে আসতেই একটু দুষ্টুমি করতে আওয়াজ করে বলে ওঠে,
'কু'ত্তা তোর ডার্লিং।'
মাইরার কথাটি শুনতে পেয়ে ইরফান কানে ফোন ধরে রাখা অবস্থায় পিছু ফিরে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায়। মাইরা পিছু ফিরলে ইরফানকে দেখে চোখ বড় বড় করে তাকায়। আয়হায়, এটা তো তার ভার্সিটির প্রফেসর ইরফান নেওয়াজ। বেচারি ভ'য়ে মিলার হাত ছেড়ে সামনের দিকে দৌড় দেয়, ভার্সিটির গেইটের সামনে হঠাৎ মুখ থুবড়ে পড়ে।
মিলা হতভম্ব হয়ে যায়। দ্রুতপায়ে মাইরার মাথার কাছে বসে বলে,
'এ্যাই মাইরা, পড়লি কেমনে?'
মাইরার চোখমুখ কোঁচকালো। ইশ! বাচ্চাকালে এভাবে পড়েছিল। এতো বড় হয়ে আবার পড়লো। মিলার কথা শুনে রে'গে তাকায় মিলার দিকে। এর সামনেই পড়লো আর এ বলছে পড়লি কেমনে?
কিছু বলতে গিয়েও বলল না ইরফান তাদের থেকে একটু দূরে, এজন্য। ধুলোমাখা মাঠ থেকে মাইরা উঠতে গিয়ে বোরখার সাথে পা বেঁধে গিয়ে আবারও ঠাস করে পড়ে যায়।
ইরফান রে'গে কল কেটে দিয়েছে। এগিয়ে এসে মাইরার পাশে দাঁড়িয়েছে। চোখমুখ শক্ত করে মাইরার দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে,
'স্টুপিড গার্ল।'
মাইরা ইরফানের বলা স্টুপিড গার্ল শুনে নিয়েছে। মনে মনে মুখ ভেঙায়। আশেপাশে অনেকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে আছে, বেচারি যেমন ল'জ্জা পেয়েছে, তেমনি রা'গ লাগছে। ডানপাশে কালো জুতো পায়ে দু'টো পা দেখে বুঝল ইরফান এখানেই দাঁড়িয়ে আছে। মাইরার কাঁদতে ইচ্ছে করছে। এই স্যার তাকে আজ কি কাঁচা-ই খেয়ে নিবে।
মাইরা ঢোক গিলে কোনোরকমে মাঠ থেকে উঠে কোনোদিকে না তাকিয়ে দৌড় লাগায়। ইরফান তাকে ধরতে পারলে আস্ত রাখবে কি-না সন্দেহ! বেচারি ভ'য়ে শেষ।
এদিকে মিলা হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছে। বেচারি মাইরাকে টেনে তুলবে বলে নিচু হয়ে বসেছিল। এদিকে এই মাইরা একা একাই পালিয়েছে। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে ইরফানের দিকে তাকালো মিলা।
ইরফান চোখমুখ শক্ত করে মাইরার গমনের দিকে চেয়ে আছে। মেয়েটি কই যে দৌড়ে গিয়ে লুকিয়েছে। দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
'স্টুপিড গার্ল, ডিজগাস্টিং!'
কথাটা বলে বড় বড় পা ফেলে অফিস-রুমের দিকে যায়।
মিলা ঢোক গিলল। এ্যাই মাইরাকে তার-ই থা'প'ড়া'তে ইচ্ছে করছে। সামনের দিকে যেতে যেতে বলে,
'মাইরার বাচ্চা!'
মাইরা ইরফানের আড়ালে এসে দাঁড়িয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ হাঁপায়। কালো বোরখা পুরো সাদা হয়ে গিয়েছে। অনেকে মিটমিট করে হাসছে। মাইরা সেকেন্ড ইয়ারের একটি ছেলেকে হাসতে দেখে বলে, 'ভাইয়া, একদম হাসবেন না। আপনি না সিনিয়র? জানেন না, জুনিয়রদের স্নেহ করতে হয়?'
ছেলেটি থতমত খেয়ে তাকায়। মুখ স্বাভাবিক করে নেয়। মিলা মাইরার বাহুতে ধাক্কা দিয়ে রে'গে বলে,
'এ্যাই বে'য়া'দ'ব, আমাকে রেখে চলে আসলি কেন?'
মাইরা দাঁতে কেলিয়ে বলে,
'নিজে বাঁচলে তারপর বাপের নাম নিব।'
মিলা দু'হাত কোমরে দিয়ে মাইরার দিকে রে'গে তাকায়। মাইরা এক হাতে মিলাকে জড়িয়ে বলে, 'তোকে কিছু বলবে না। যা বলার সব তো আমাকেই বলবে ময়না। অকাম তো আমি করেছি।'
বলতে বলতে মাইরা তার পেটে হাত বুলায়।
মিলা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, 'কিরে ব্য'থা পেয়েছিস?'
মাইরা রে'গে বলে,
'না, আরাম পেয়েছি।'
মিলা ইনোসেন্ট মুখ করে বলে,
'আমি কি করলাম? আমাকে রা'গ দেখাস ক্যান?'
মাইরা কাঁদোকাঁদো মুখ করে বলে,
'তুই বললি না কেন ওটা আমাদের স্যার? আমাকে এখন কি করবে কে জানে? কিছু না করেই কত শাস্তি পাওয়া লাগে। আর আজ ভুলভাল বলে ফেলেছি। আমি শেষ দোস্ত!'
মিলা মুখ বাঁকিয়ে বলে,
'ভালোই হইছে। মুখটা বন্ধ রাখতে পারিস না, এবার মজা বোঝ।'
'মুখ তো কথা বলার জন্য-ই। বন্ধ রাখবো কেন? আজব!'
'তাহলে এখন ইরফান স্যারের কাছে গিয়ে বল, মুখ তো কথা বলার জন্যই, এইজন্যই আমি আমার মুখ দিয়ে কু'ত্তাকে আপনার ডার্লিং বানিয়ে দিয়েছি।'
মাইরা ডান হাত পেটে রেখে বলে,
'এমন করিস না। থাক, বাড়ি যাই। প্রথম ক্লাস টাই ইরফাইন্না স্যারের।
আমাকে আস্ত রাখবে না ভাই।'
মিলা মাইরার হাত ধরে বলে,
'আমিও যাচ্ছি। একা একা কে ক্লাস করবে?'
মাইরা হাসলো। একদম মনের মতো একখান বান্ধবী তার এইটা। ডানহাতে বোরখা ঝেড়ে মিলা আর মাইরা এগিয়ে যায়। তখন-ই শুদ্ধ তাদের দু'জনের সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
'তোমরা দু'জন সেই বিচ্ছু না?'
মাইরা সাথে সাথে বলে,
'না ভাইয়া! আমরা মানুষ।'
মাইরার কথা বলার ধরনে শুদ্ধ হেসে ফেলল। সে স্টুডেন্টদের সামনে এটলিস্ট গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু বেচারা তার স্বভাব থেকে বেরোতে পারে না। তবুও চেষ্টা করে।
তবে মাইরার ব্যাপারটা আলাদা। এদিকে মাইরা শুদ্ধকে ভাইয়া বলার কারণ আছে। মাইরা আর শুদ্ধ একই গ্রামের। মাইরা যখন গ্রামে থাকতো, তখন শুদ্ধকে বেশ ভালো করেই চিনতো। তখন থেকেই শুদ্ধকে ভাইয়া ডেকে অভ্যাস।
শুদ্ধ হাসি আটকে মাইরার উদ্দেশ্যে বলে, 'ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কোথায় যাচ্ছিলে?'
মিলা আমতা আমতা করলে মাইরা মিলাকে একটা গুঁতো দেয়। এরপর শুদ্ধর উদ্দেশ্যে বলে,
'ক্লাসে-ই যাচ্ছিলাম।'
শুদ্ধ গম্ভীর গলায় বলে, 'যাও।'
মাইরা আর মিলা অসহায় মুখ করে ক্লাসের দিকে এগোলো। মাইরা একটু পর পর পিছু ফিরলে শুদ্ধকে দেখে ক্লাসের দিকে এগোয়। শুদ্ধকে ভাইয়া মেনে মজা করলেও ভার্সিটিতে দেখা হওয়ার পর মাইরা স্যার হিসেবে যথেষ্ট সম্মান করে।
কিছুক্ষণ পর শুদ্ধকে আর দেখতে না পেয়ে মাইরা মিলার হাত ধরে দৌড় দিতে দিতে বলে,
'চল, পালাই।'
মিলা মাইরার পিছু দৌড়ায়। এই মাইরার সাথে থাকতে থাকতে সে একদিন পা'গ'ল-ই হয়ে যাবে।
ইরফান নেওয়াজ। ভার্সিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর।
বয়স ২৯। উচ্চতায় ৬ ফুট। গায়ের রঙ ফর্সা। খাড়া নাক, দীর্ঘ কপাল। দু'গাল ভর্তি চাপ দাঁড়ি। মাথার চুলগুলো স্বাভাবিক এর চেয়ে বেশ বড়। চোখের মণি দুটো বাদামি, অচেনা কারো নজরে পড়লে মনে হবে, লেন্স লাগানো।
শুদ্ধ ইয়াশার। যে ইরফানের ফুফাতো ভাই। এই ভার্সিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। হাইট ৬ ফুট। শ্যামবর্ণের পুরুষ শুদ্ধ। দু'গালে চাপ দাঁড়ি।
ইরফানের ক্লাস ছিল, কিন্তু সে ক্লাস ক্যান্সেল করে দিয়েছে। অফিসরুমে এসে একটানা পায়চারি করছে। রা'গে এসির মাঝেও ঘামছে।
চোয়াল শক্ত তার। হাঁটুর বয়সী এক মেয়ে, সাথে এই ভার্সিটির স্টুডেন্ট, তাকে সরাসরি কু'কু'র বলে দিয়েছে, ব্যাপারটা একদম-ই হজম হচ্ছে না তার। ইচ্ছে তো করছে ওই স্টুপিড মেয়েটাকে আগে থা'প'ড়ি'য়ে মুখের ভাষা শেখাতে।
পরনের কোট খুলে চেয়ারের সাথে রাখলো। কোটের নিচে কালো শার্ট, ইরফান চোয়াল শক্ত করে দু'হাতের শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটালো।
দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে চোখ বুজল। ফলস্বরূপ হাতের রগগুলো ফুলে দৃশ্যমান হয়।
রা'গ টুকু গিলতে না পেরে হঠাৎ-ই মুষ্টিবদ্ধ ডান হাতে টেবিলের উপর পাঞ্চ মা'রে, তখন-ই শুদ্ধ দরজা ঠেলে ভেতরে দৃষ্টি দিলে ইরফানের অবস্থা দেখে চেঁচিয়ে বলে,
'আরে আরে, কি করছিস?'
ইরফান শক্ত চোয়ালে শুদ্ধর দিকে তাকায়। শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
'সব খুলে ফেলেছিস কেন? বেশি গরম লাগলে আরেকটা এসির ব্যবস্থা করছি।'
ইরফান রাগান্বিত স্বরে বলে,
'ও কোন সাহসে আমাকে কু'কু'র বলল?'
শুদ্ধ চোখ বড় বড় করে তাকায়। বিস্ময় কন্ঠে আওড়ায়,
'কু'কু'র?'
নিজেকে সামলে অবাক হওয়ার ভান করে বলে,
'এতো বড় মিস্টেক কে করল? বাঘ, সিংহ আরও কত হিংস্র প্রাণী ছিল, সব রেখে কু'কু'রের মতো এক অবলা প্রাণীর সাথে তোকে তুলনা করল? ইশ! কু'কু'র গুলো শুনতে পেলে খুব ক'ষ্ট পাবে!'
ইরফান শুদ্ধর কথা শুনে রে'গে আরও বোম হয়ে যায়। টেবিলের উপর থেকে ফাইল নিয়ে শুদ্ধর দিকে ছুঁড়ে মা'রে সাথে রে'গে শব্দ করে ডাকে,
'শুদ্ধ??'
শুদ্ধ হাসতে হাসতে দ্রুত বসে পড়ে। কিছুকক্ষণ আগে ভার্সিটির ভিসি ইরফানের রুমের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। ইরফানের ছুঁড়ে ফেলা ফাইল ভদ্রলোকের পায়ের কাছে গিয়ে পড়েছে। অবাক হয়ে বলে, 'ইরফান, কি হয়েছে?'
ভিসি'র গলা পেয়ে শুদ্ধ সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ইরফান গম্ভীর গলায় বলে, 'নাথিং আঙ্কেল।'
ইরফানদের ভার্সিটির ভিসি শাহাবুদ্দীন আহমেদ। তার ইরফানের বাবার সাথে ব্যবসায় সূত্রে খুব ভালো সম্পর্ক। বলা যায়, তারেক নেওয়াজের খুব কাছের বন্ধু সে। সেই হিসেবে ইরফান আর শুদ্ধকে বেশ ভালো করে চেনে, সাথে সম্পর্কটা-ও বেশ ভালো।
শুদ্ধ হেসে বলে,
দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে চোখ বুজল। ফলস্বরূপ হাতের রগগুলো ফুলে দৃশ্যমান হয়।
রা'গ টুকু গিলতে না পেরে হঠাৎ-ই মুষ্টিবদ্ধ ডান হাতে টেবিলের উপর পাঞ্চ মা'রে, তখন-ই শুদ্ধ দরজা ঠেলে ভেতরে দৃষ্টি দিলে ইরফানের অবস্থা দেখে চেঁচিয়ে বলে,
'আরে আরে, কি করছিস?'
ইরফান শক্ত চোয়ালে শুদ্ধর দিকে তাকায়। শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
'সব খুলে ফেলেছিস কেন? বেশি গরম লাগলে আরেকটা এসির ব্যবস্থা করছি।'
ইরফান রাগান্বিত স্বরে বলে,
'ও কোন সাহসে আমাকে কু'কু'র বলল?'
শুদ্ধ চোখ বড় বড় করে তাকায়। বিস্ময় কন্ঠে আওড়ায়,
'কু'কু'র?'
নিজেকে সামলে অবাক হওয়ার ভান করে বলে,
'এতো বড় মিস্টেক কে করল? বাঘ, সিংহ আরও কত হিংস্র প্রাণী ছিল, সব রেখে কু'কু'রের মতো এক অবলা প্রাণীর সাথে তোকে তুলনা করল? ইশ! কু'কু'র গুলো শুনতে পেলে খুব ক'ষ্ট পাবে!'
ইরফান শুদ্ধর কথা শুনে রে'গে আরও বোম হয়ে যায়। টেবিলের উপর থেকে ফাইল নিয়ে শুদ্ধর দিকে ছুঁড়ে মা'রে সাথে রে'গে শব্দ করে ডাকে,
'শুদ্ধ??'
দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে চোখ বুজল। ফলস্বরূপ হাতের রগগুলো ফুলে দৃশ্যমান হয়।
রা'গ টুকু গিলতে না পেরে হঠাৎ-ই মুষ্টিবদ্ধ ডান হাতে টেবিলের উপর পাঞ্চ মা'রে, তখন-ই শুদ্ধ দরজা ঠেলে ভেতরে দৃষ্টি দিলে ইরফানের অবস্থা দেখে চেঁচিয়ে বলে,
'আরে আরে, কি করছিস?'
ইরফান শক্ত চোয়ালে শুদ্ধর দিকে তাকায়। শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
'সব খুলে ফেলেছিস কেন? বেশি গরম লাগলে আরেকটা এসির ব্যবস্থা করছি।'
ইরফান রাগান্বিত স্বরে বলে,
'ও কোন সাহসে আমাকে কু'কু'র বলল?'
শুদ্ধ চোখ বড় বড় করে তাকায়। বিস্ময় কন্ঠে আওড়ায়,
'কু'কু'র?'
নিজেকে সামলে অবাক হওয়ার ভান করে বলে,
'এতো বড় মিস্টেক কে করল? বাঘ, সিংহ আরও কত হিংস্র প্রাণী ছিল, সব রেখে কু'কু'রের মতো এক অবলা প্রাণীর সাথে তোকে তুলনা করল? ইশ! কু'কু'র গুলো শুনতে পেলে খুব ক'ষ্ট পাবে!'
ইরফান শুদ্ধর কথা শুনে রে'গে আরও বোম হয়ে যায়। টেবিলের উপর থেকে ফাইল নিয়ে শুদ্ধর দিকে ছুঁড়ে মা'রে সাথে রে'গে শব্দ করে ডাকে,
'শুদ্ধ??'
শুদ্ধ হাসতে হাসতে দ্রুত বসে পড়ে। কিছুকক্ষণ আগে ভার্সিটির ভিসি ইরফানের রুমের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। ইরফানের ছুঁড়ে ফেলা ফাইল ভদ্রলোকের পায়ের কাছে গিয়ে পড়েছে। অবাক হয়ে বলে, 'ইরফান, কি হয়েছে?'
ভিসি'র গলা পেয়ে শুদ্ধ সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ইরফান গম্ভীর গলায় বলে, 'নাথিং আঙ্কেল।'
ইরফানদের ভার্সিটির ভিসি শাহাবুদ্দীন আহমেদ। তার ইরফানের বাবার সাথে ব্যবসায় সূত্রে খুব ভালো সম্পর্ক। বলা যায়, তারেক নেওয়াজের খুব কাছের বন্ধু সে। সেই হিসেবে ইরফান আর শুদ্ধকে বেশ ভালো করে চেনে, সাথে সম্পর্কটা-ও বেশ ভালো।
শুদ্ধ হেসে বলে,
'আঙ্কেল, আপনার বন্ধুর ছেলেকে বাঘ, সিংহের সাথে তুলনা করলে
মানায় কি-না বলুন তো!'
শুদ্ধর কথা শুনে ইরফান রে'গে তাকায় শুদ্ধর দিকে। শাহাবুদ্দীন আহমেদ মুখ লুকিয়ে একটু হাসলো। খুব দ্রুত নিজেকে সামলে শুদ্ধর উদ্দেশ্য বলে,
'শুদ্ধ, ইরফানকে আর রাগিয়ো না।'
শুদ্ধ হাসলো। শাহাবুদ্দীন আহমেদ এগিয়ে এসে ইরফানের সামনের চেয়ারে বসে। ইরফানের উদ্দেশ্যে বলে,
'ইরফান, বসো।'
শুদ্ধ রুম থেকে বেরোতে নিলে ভদ্রলোক বলেন,
'শুদ্ধ, তুমিও এসো।'
শুদ্ধ হাতঘড়িতে একবার সময় দেখে পিছু ফিরে বলে,
'আঙ্কেল, আমার ক্লাস আছে।'
'ওহ আচ্ছা। তাহলে তোমার সাথে এটা নিয়ে পরে আলোচনা করব।'
শুদ্ধ মাথা নেড়ে বলে,
'আচ্ছা আঙ্কেল।'
এরপর রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
ইরফান নিজেকে শান্ত করে চেয়ারে বসে মৃদুস্বরে বলে,
'আঙ্কেল, বলুন।'
শাহাবুদ্দীন আহমেদ গলা ঝেড়ে বলে,
'ইরফান, আমাদের ভার্সিটির ফাস্ট ইয়ার স্টুডেন্টদের নিয়ে একটা সফরে যেতে চাইছি। তুমি থাকতে পারবে?'
ইরফান ভাবনায় ব্যস্ত। শাহাবুদ্দীন আহমেদ আবারও বলেন,
'তুমি আর শুদ্ধ আমার ছেলের মতো। তোমরা সাথে থাকলে চিন্তামুক্ত থাকতে পারবো।'
ইরফান তার আঙ্কেলের দিকে তাকিয়ে বলে,
'ওকে আঙ্কেল। তবে নেক্সট এক উইক পারবো না। এরপর আপনাকে
ডেট জানাবো।'
শাহাবুদ্দীন আহমেদ সম্মতি জানিয়ে বলে,
'আচ্ছা ঠিকাছে। শুদ্ধর সাথে ডিসকাস করে জায়গাটা-ও তোমরা ঠিক করে আমাকে জানিয়ো।'
ইরফান সম্মতি জানালে শাহাবুদ্দীন আহমেদ রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
মাইরা ইসলাম। বয়স ১৮। গায়ের রঙ ফর্সা। উচ্চায় ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি। মুখটা গোলগাল। গাল দু'টো হালকা ফোলা। চোখ দু'টো বেশ বড়।
মাইরার ছোটবেলা গ্রামে কেটেছে। ছোটবেলায় বাবা মা মারা যায়। আছে সৎ মা, সৎ বাবা। আর এক ছোট্ট সৎ ভাই, যার নাম লাবিব। বয়স ৪ বছর।
মাইরার ছোটবেলা গ্রামে কাটলেও শহরে এসেছে, সে যখন ক্লাস নাইনে পড়ে। মূলত তার সৎ বাবা, সৎ মা দু'জনেই গ্রাম থেকে শহরে চলে আসে।
কিন্তু মাইরাকে তার মা খুব সুন্দর করে বলেছিল, মাইরা আর তাদের সাথে থাকতে পারবে না। এরপর মাইরার জন্য একটা হোস্টেল খুঁজে দেয়। তার মা মাইরাকে প্রতি মাসে খরচের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেয়-লাবিবের বাবার থেকে লুকিয়ে। মাইরাকে কয়েকমাস পর পর দেখতে আসে। মাইরা জানে তার সৎ মা তাকে ভালোবাসে, তবে নিজের সংসার তো টিকাতে হবে! সে পরের মেয়ে। তার জন্য এ পর্যন্ত তিনি অনেক করেছেন।
মাইরাকে তার সৎ মা লুকিয়ে টাকা দিত, কিন্তু মাইরা ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার থেকে টুকটাক টিউশন করায়। এরপর থেকে আর টাকা নিতে চাইতো না, কিন্তু তার মা অনেক ইমোশনাল কথা বলে মাঝেমাঝে মাইরাকে কিছু টাকা দিতে পারে। তবে মাইরা ৯০% সময় নেয় না। যেখানে তার থাকার জায়গা হয়নি, সেখান থেকে টাকা নেয়ার চেয়ে না খেয়ে ম'রে যাওয়া ভালো।
গত প্রায় সাড়ে চার বছর হলো মাইরা হোস্টেলে থাকে। তার বান্ধবী হয়েছে, তবে পরিবার নেই। কথাগুলো ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাইরা।
ভার্সিটি থেকে ফিরে মাইরা মিলার সাথে তার সৎ মা আর সৎ ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য এসেছে। মূলত ভার্সিটিতে ক্লাস না করে চলে আসায়, ভাবলো সময় আছে, দেখা করে যাক। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে প্রায় ৩০ মিনিট হলো বেল বাজায়, অথচ কেউ দরজা খুলছে না বা কোনো সাড়া নেই।
মেইন গেইট থেকে একজন ভদ্রলোক বেরোলে মাইরা জিজ্ঞেস করে লাবিবের কথা। ভদ্রলোক জানায়, গতকাল তারা কোথাও বেড়াতে গিয়েছে। কথাটা শুনে মাইরার তীব্র খারাপ লাগলো। প্রায় ৩ মাস পর দেখা করতে এসেছিল, তার মা-ও আর যায় না। ভাইটাকেও দেখা হয়না
কতমাস। কিন্তু তারা তাকে ভুলে, থাও ঘুরতে চলে গিয়েছে।
মাইরা মন খারাপ করে রাস্তার পাশে বেশ অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মেঘলা আকাশপানে চেয়ে লম্বা শ্বাস টানলো। মিলা মাইরার কাঁধে হাত রাখলে মাইরা দ্রুত মিলার দিকে তাকায়। মিলার মলিন মুখ দেখে মাইরা ঝাপসা চোখেই শব্দ করে হেসে ফেলল। মিলা হাসলো না। এই মাইরার উপর মাঝে মাঝে রা'গ হয়। দুঃখ পেয়ে মানুষ অন্তত মন খারাপ করে থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক! অথচ মাইরা হয়েছে উল্টো। মাইরার জন্য তার-ই মন খারাপ হয়ে যায়। আর মাইরা স্বাভাবিক। উল্টে মাইরা-ই তার মন ভালো করতে লেগে পড়ে। ভাবনার মাঝেই মাইরা বা হাতে ঝাপসা চোখজোড়া ডলে মিলাকে ধাক্কা দিয়ে বলে,
'তোর স্বামীর কপালে বহুত দুঃখ আছে বুঝলি! মানে এতো ইমোশন ক্যান তোর ভাই?'
মিলা বিরক্ত হয়ে বলে,
'চুপ থাক। তোর সমস্যা কি? নিজের মন খারাপের দু'টো কথা মন খুলে আমাকে বললে কি হয় মাইরা?'
মাইরা চুপ হয়ে গেল। এরপর একটু হেসে বলে,
'যার কেউ নেই, তার দুঃখ-ও নেই মিলা। আমার কে আছে বল তো? না তো নিজের মা আছে, না নিজের বাবা! না আছে নিজের একটা ভাই-বোন! থাকার মতো এই সৎ মা, সৎ ভাই। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে এই দু'জনের কাছে অভিযোগের ঝুড়ি নিয়ে বসি। 'কেন আমাকে তাদের সাথে রাখলো না?' কিন্তু আমার অভিযোগ যে বেমানান মিলা। পর হয়ে-ও তারা আমাকে যতটা ভালোবাসে, ওটুকুই তো কত অসহায় মানুষ পায় না। আমাদের মতো এতিম মেয়েদের ইচ্ছেগুলো খুব বেমানান। এই যেমন, আমার ইচ্ছে- আমি, আমার মা আর ভাই একসাথে থাকব। কিন্তু তারা তো পর, আমার সেই ইচ্ছে কখনো পূরণ হবার নয়। একশহরে থেকেও আমার জায়গা তাদের বাড়িতে হয়নি, হয়েছে হোস্টেলে।'
একটু থেমে হেসে বলে, 'এসব বাদ দে। চল, এই শহর ঘুরি। ভালো লাগবে।'
মিলা মাইরাকে জড়িয়ে ধরে। মাইরা মিলার পিঠে হাত বুলিয়ে বলে,
'ওলে, আমার ময়না টা আবার ইমুচুনাল হয়ে গেল রে!'
মিলা পাত্তা দিল না মাইরার কথায়। ভাঙা গলায় বলে,
'তোকে আমি একটা রাজপুত্র এনে দিব। যে তোর সব দুঃখ ভুলিয়ে দিবে।'
মাইরা হেসে বলে,
'আর আমি তোর জন্য এক টাকলু মামা আনবো।'
মিলা মাইরাকে জড়িয়ে রেখেই মাইরার পিঠে একটা থাপ্পড় মেরে বলে,
'বে'দ্দ'প ছেমড়ি।'
মাইরা হাসে।
শুদ্ধ ভার্সিটির অফিসরুম থেকে বেরিয়ে দেখল ইরফান ভার্সিটির মাঠের এক কোণায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে। শুদ্ধ এগিয়ে গিয়ে বলে, 'যেহেতু কেউ এক অবলা প্রাণী কু'ত্তা বাবুর সাথে তোকে তুলনা করেছে। সেই হিসেবে তোর এক অবলা প্রাণী হয়ে এভাবে বায়ু দূষণ করা ঠিক হচ্ছে না সোনা।'
ইরফান ডান হাতের মুঠোয় জ্বলন্ত সিগারেট চেপে বা হাতে শুদ্ধর কলার
চেপে ধরে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
'ওই স্টুপিড গার্লকে আমি ছাড়বো না।'
শুদ্ধ চোখ বড় বড় করে বলে,
'ওয়াও! সে একটা মেয়ে? কি কিউট রে!'
ইরফান বিরক্ত হয়ে শুদ্ধর কলার ছেড়ে দেয়। ডান হাতের সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে গটগট পায়ে তার গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।
শুদ্ধ হাসছে। একে কোন মেয়ে সরাসরি কু'কু'র বলে দিয়েছে? সাহস আছে মেয়েটার।
ফোন বেজে উঠলে শুদ্ধ পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল নাছিমের ফোন। রিসিভ করে জানায়, 'আসছে।'
নাছিম বাইরের দেশে পড়াশোনা করছে। এইচএসসি দিয়ে পড়াশুনার জন্য বাইরের দেশে গিয়েছিল। গতকাল বাংলাদেশে এসেছে। আজ সকালে ইরফান আর শুদ্ধ'র সাথে দেখা করতে চেয়েছে।
ইরফান আর শুদ্ধ ভার্সিটিতে থাকায় আশেপাশের কোনো ক্যাফেতে নাছিমকে আসতে বলেছে।
শুদ্ধ ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে ইরফানের গাড়িতে উঠে বসে। একজায়গায় যাবে বলে আলাদা করে আর নিজের গাড়ি আর নিল না।
ভার্সিটি থেকে কিছুটা দূরে একটি ক্যাফেতে নাছিম বসে আছে। ইরফানের সাথে কথা বলে জায়গাটির লোকেশন চাইছিল। মজার ব্যাপার হলো, ইরফান যখন বলেছিল, দশ তলা বিল্ডিং। তখন এক মেয়ে বলে উঠেছিল, 'ক'তা তোর ডার্লিং।'
এটা যতবার ভাবছে, নাছিম হাসি আটকে রাখতে পারছে না। ইরফান তো রোগে কল কেটেই দিয়েছে। কিন্তু সে মেয়েটি কে, যে ইরফানের মতো মানুষের সাথে ফা'জ'লা'মি করেছে?
শুদ্ধ আর ইরফান ক্যাফেতে প্রবেশ করে। ইরফান চেয়ার টেনে বসে। শুদ্ধ বসতে বসতে নাছিমের উদ্দেশ্যে বলে, 'কি রে হাসছিস কেন?'
নাছিম ইরফানের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে দেয়। হাসতে হাসতে শুদ্ধকে সেই কাহিনী বললে শুদ্ধ-ও নাছিমের সাথে হাসতে থাকে। ইরফান এমনি-ই রে'গে আছে। এদের দু'জনের হাসি দেখে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে গমগমে স্বরে চেঁচিয়ে বলে, 'সাটআপ।'
শুদ্ধ ও নাছিম দু'জনেই ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। চুপ হয়ে যায়। ইরফানের কণ্ঠে আশেপাশে যারা কথা বলছিল, কিছু সময়ের জন্য তারা-ও চুপ হয়ে যায়। শুদ্ধ ও নাছিম দু'জনেই মুখ লুকিয়ে মিটমিটিয়ে হাসছে।
শুদ্ধ নিজেকে স্বাভাবিক করে আপাতত তাদের জন্য কফি অর্ডার দেয়। ইরফানের জন্য ব্ল্যাক কফি অর্ডার দিয়েছে। কিছুক্ষণের মাঝে ওয়েটার কফি টেবিলে দিয়ে যায়।
ইরফান নাছিমের সাথে কয়েকটি কথা বলে সে তার মতো ফোনে মগ্ন, সাথে একটু পর পর কফির কাপে চুমুক দেয়। শুদ্ধ, নাছিম তাদের মতো কথা বলায় ব্যস্ত।
মিলা মাইরাকে নিয়ে তাদের বাড়িতে যাচ্ছিল। সকালে কিছু না খাওয়ায় অনেক ক্ষুধা পেয়েছে। এজন্য বাড়ি যাওয়ার পথে ভার্সিটির আশেপাশে একটি ক্যাফেতে আসে। মাইরা আসতে চাইছিল না, মিলা জোর করেই টেনে এনেছে।
মাইরা মিলার সাথে গল্প করতে করতে ক্যাফের ভেতরে প্রবেশ করে। কয়েক পা এগিয়ে যেতেই হঠাৎ মনে হলো পায়ের নিচে পিচ্ছিল কিছু, সাথে কোনো এক পায়ের সাথে বেঁধে যায়। মাইরা পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচার জন্য মিলাকে ধরতে গিয়ে-ও পারলো না। তার আগেই বামদিকে হেলে গিয়ে ঠাস করে চিৎপটাং হয়ে একদম ইরফানের কোলের উপর পড়লো।
ইরফান ডান সাইডে বসেছিল। আর ইরফানের পাশ দিয়েই মাইরা যাচ্ছিল। ফলস্বরূপ মাইরা ইরফানের কোলে এসেই পড়েছে। ইরফানের হাতে কফির মগ ছিল, সে কফিতে চুমুক দিতে যাচ্ছিল, তখন-ই মাইরার সাথে ধাক্কা লেগে কফির মগ হাত থেকে ছিটকে পড়ে। গরম কফি একদম ইরফানের বুক বরাবর শার্টের উপরে এসে পড়ে।
উপস্থিত সকলে হতভম্ব হয়ে যায়। মাইরা চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে। শেষ! আজ তার মৃত্যু নিশ্চিত!
ইরফান চোয়াল শ'ক্ত করে মাইরার দিকে চেয়ে আছে। এমনিতেই এই মেয়ে তাকে ভার্সিটির সামনে উল্টাপাল্টা বলে মাথা গরম করে দিয়েছিল। এখন মাইরার তার কোলে এসে পড়ে যাওয়া, সাথে বুক বরাবর গরম কফির ছ্যাকা খাওয়া। ইরফান আর নিতে পারলো না। মাইরাকে জোরে টান দিয়ে দাঁড় করিয়ে একপ্রকার ধাক্কা দেয়। কেউ বুঝে ওঠার আগেই মাইরার ডান গালে ইরফান ক'ষিয়ে একটা থা'প্প'ড় মে'রে দেয়।
মাইরা উল্টে পড়তে নেয়, তখন সেখানে এসে দাঁড়ায় অন্তরা। মাইরাকে দু'হাতে জাপ্টে ধরে। সে ক্যাফের দরজায় দাঁড়িয়ে মাইরার পড়ে যাওয়ার ঘটনাটি দেখেছে।
এইবার সকলে আগের চেয়ে-ও বিস্ময় নিয়ে তাকায়, একবার ইরফানের দিকে তো একবার মাইরার দিকে। শুদ্ধ, নাছিম দু'জনেই বসা থেকে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। মিলা ভ'য়ে কাঁপছে। ইরফান চিৎকার করে বলে, 'স্টুপিড গার্ল! আ'ইল যাস্ট কি'ল ইউ!'
কথাটা বলে হনহন করে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে যায় ইরফান। সকলে থমথমে মুখে চেয়ে আছে। ক্যাফেতে বসে থাকা অনেকেই আড়চোখে তাকাচ্ছে।
অন্তরা ইরফানকে পিছু ডাকলো, ইরফান শুনলে তো!
মাইরা অন্তরাকে ছেড়ে দাঁড়িয়েছে। গালটা জ্বলছে মারাত্মক। নরম গালে ওমন দানবীয় হাতের চ'ড় খেয়ে গাল কি আর স্বাভাবিক থাকে! মাইরার মনে হচ্ছে তার মাথার মগজসহ নড়ে উঠেছে। সাথে গরম কফি গলার কাছে এসে পড়ে হিজাব ভেদ করে অনেকটা ভেতরে গিয়েছে। গলার নিচ দিকে-ও জ্বলছে।
মিলা মাইরাকে একহাতে আগলে নেয়। তার খারাপ লাগছে। মাইরা আসতেই চাইছিল না, সে জোর করে টেনে আনলো, তার জন্যই ইরফান স্যারের হাতে শ'ক্ত থা'প্প'ড় খেতে হলো তার বান্ধবীকে। ওদিকে অন্তরারও খারাপ লাগলো। একে তো ইরফানের সাথে দু'টো কথা বলতে পারলো না, তার আগেই ইরফান রাগ করে জায়গাটি প্রস্থান করল। আবার এই মেয়েটি ইরফানের রাগের স্বীকার হয়ে মার খেয়ে বসে থাকলো।
শুদ্ধ দ্রুত এগিয়ে এসে মাইরার উদ্দেশ্যে বলে,
শুদ্ধ দ্রুত এগিয়ে এসে মাইরার উদেশ্য বলে,
'মাইরা, তুমি ঠিক আছো? ইরফানের হয়ে আমি স্যরি! আসলে ইরফানের রাগটা একটু বেশি।'
মাইরা অবাক হলো না শুদ্ধের ব্যবহারে। শুদ্ধ তাকে আপন বোন ভাবে, তা মাইরা জানে। গালের অসহ্য ব্যথা এবং গলার জ্বলুনিতে না চাইতেও চোখের কোণে পানি জমেছে। মাইরা খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়। এরপর শুদ্ধের দিকে চেয়ে হেসে বলে, 'ঠিক আছি ভাইয়া।'
শুদ্ধের খারাপ লাগলো। মেয়েটার ফর্সা ডান গালে পুরো পাঁচ আঙুলের ছাপ স্পষ্ট। আশেপাশের মানুষসহ শুদ্ধদের দৃষ্টি মাইরাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। ব্যথার চেয়ে লজ্জাই বেশি পাচ্ছে সে। শুদ্ধকে বলে মিলাকে টেনে দ্রুত ক্যাফের বাইরে চলে যায় মাইরা।
অন্তরা ও নাছিম দু'জনেই অবাক হয়ে শুদ্ধকে বলে, 'মেয়েটি কে? চিনিস না-কি!'
শুদ্ধ হতাশ কণ্ঠে বলে,
'ওই যে গ্রামে আমার এক পাতানো বোনের গল্প করতাম তোদের সাথে। এটাই সে। মাইরা নাম ওর। আমাদের ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে।'
অন্তরা ও নাছিম বুঝল।
নাছিম এসেছে বলে তাদের ফ্রেন্ডসার্কেল এখানে দেখা করার কথা ছিল। কিছুক্ষণ পর ফাইজ ক্যাফেতে প্রবেশ করলে সকলের থমথমে মুখ দেখে অবাক হয়। সাথে ইরফানকে না দেখে আরেকটু অবাক হয়। ফাইজের আসতে একটু লেট হয়ে গেল। সে চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলে,
'কি হয়েছে রে? আর ইরফান কোথায়?'
শুদ্ধ কিছুক্ষণ আগের ঘটে যাওয়া কাহিনী বললে ফাইজ হতাশ হয়।
'হায়রে, এই ইরফানের রাগ আর কমলো না। ইরফনের রাগের শিকার হয়ে কোন অবলা মেয়ের গাল যে ফাটলো!'
নাছিম চুপচাপ বসে আছে। হঠাৎ রেগে বলে, 'মেয়েটিকে মেরে ইরফান কাজটি একদম ঠিক করেনি।'
শুদ্ধ নিজেও ইরফানের উপর রাগে আছে। তাই নাছিমের কথার বিপরীতে কিছু বলল না। মাইরাকে এভাবে মারার কোনো দরকার ছিল? বিরক্তি নিয়ে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার আগে বিল মিটিয়ে দিয়েছে।
এদিকে নাছিমের কথায় ফাইজ ও অন্তরা চোখ ছোট ছোট করে তাকায়।
অন্তরা ভ্রু কুঁচকে বলে, 'মারলো মেয়েটির গালে। জ্বলছে তোর কিছুমিছু! কাহিনী কি?'
নাছিম থতমত খেয়ে বলে,
'আমার কি হবে? কিছু না। এমন পুতুলের মতো মেয়েকে কেউ কিভাবে মারে? এই ইরফানটা আসলেই মানুষ হলো না।'
কেউ আর কিছু বলল না। ফাইজ কিছু খাবার অর্ডার করল। এসেছে যখন কিছু খেয়েই যাক।
মাইরা রাতের খাবার খেয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। গলায় ঝুলানো ওড়না চেয়ারের উপর রেখে তার গলা দেখছে। গরম কফি পড়ে গলার অনেকটা অংশ জুড়ে লাল হয়ে আছে। আর গালের কথা তো বাদই দিল। এ জীবনে এমন মার খেয়েছে বলে তো মনে পড়ে না। বিড়বিড় করল,
'ইরফাইন্না স্যারের ওটা হাত না-কি লোহা!'
আয়নার দিকে গাল আরেকটু এগিয়ে নিয়ে দেখল, ফর্সা, নরম গাল এখনো হালকা ফুলে আছে। বাড়ি এসে অনেকক্ষণ বরফ দিয়েছিল। এত রাগ লাগছে তার। সে কি ইচ্ছে করে পড়েছিল না-কি! এমন খারাপ লোক জীবনে সে দেখেনি।
উফ, গালটা এখনো হালকা জ্বলছে। ইচ্ছে করছে ইরফানের সব চুল ছিঁড়ে ফেলতে। স্যার বলে কি ছেড়ে দিবে না-কি! তাকে অকারণে এভাবে থাপ্পড় মারা? সে দেখে নিবে ওই ইরফাইন্না স্যারকে। তাকে চেনে না তো! জীবন একদম ত্যানাত্যানা করে ছেড়ে দিবে।
এসব ভাবতে ভাবতে ধুপধাপ পা ফেলে বিছানার উপর ঠাস করে শুয়ে পড়ল। ইরফানকে কোনো না কোনোভাবে শায়েস্তা না করে সে শান্তি পাচ্ছে না। দু'হাতে মাথার চুল টেনে বিড়বিড় করল, 'শালা ইরফাইন্না স্যার!'
ঘড়িতে সময় ১২ টার কাছাকাছি। ইরফান অফিস থেকে ফিরে শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে মাত্র। পরনে একটি কালো গ্যাবার্ডিন প্যান্ট। ফর্সা উদাম শরীরে বিন্দু বিন্দু পানির কণা। আয়নার সামনে দাঁড়ালে সর্বপ্রথম দৃষ্টি আটকায় গলার নিচ বরাবর থেকে লোমশ বিহীন ফর্সা বুক লাল হয়ে আছে। গরম কফির ফল এসব। শরীরের বেহাল অবস্থা চোখে পড়তেই মাইরার বলা কুকুর, সাথে তার কোলের উপর মাইরার পড়ে যাওয়া ঘটনা দু'টো ভাবনায় আসার সাথে সাথে ইরফানের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়। চোখজোড়া বুজে শব্দ করে শ্বাস নেয়।
মেয়েটিকে গুণে গুণে আর-ও দশ থেকে বারোটি থাপ্পড় দিতে পারলে হয়ত রাগ একটু হলেও কমত।
শক্ত কণ্ঠে আওড়ালো,
'স্টুপিড গার্ল!'