প্রায় ২ ঘণ্টা যাবৎ বাস চলছে।
শুদ্ধ দু'হাত আড়াআড়িভাবে গুঁজে রেখেছে। হঠাৎ মাথায় একটু দুষ্ট বুদ্ধি আসতেই পকেট থেকে ফোন বের করল। এরপর সেই তার সেই আননোন নাম্বার থেকে ফারাহ'র নাম্বারে মেসেজ করে,
'সুন্দরী। সাদা জামায় তোমাকে মারাত্মক লাগছে গো!'
ফারাহ'র হাতেই ফোন ছিল। মেসেজটি দেখে ফারাহ্ ভীষণ অবাক হয়। সে সত্যিই সাদা জামা পরে আছে। এই লোকটা জানলো কি করে? ফারাহ্ এদিক-ওদিক তাকায়। শুদ্ধ মাথা নিচু রেখে মিটিমিটি হাসে।
নিজেকে সামলে ফারাহ'র দিকে চেয়ে বলে,
'কি হয়েছে?'
ফারাহ্ থতমত খেয়ে বলে,
'কিছু না স্যার।'
এরপর মাথা নিচু করে নেয় ফারাহ্। সে ভাবনায় ব্যস্ত। এই বাসে তো সব মেয়ে। তবে সেই ছেলে কি সীতাকুণ্ডে থাকে? বাসে ওঠার আগে হয়তো তাকে দেখে নিয়েছে। ভাবনার মাঝেই আবার-ও মেসেজ আসে,
'সুন্দরী, আমাদের বিয়ে ফাইনাল করতে আমিও যাচ্ছি তোমার পিছু পিছু।'
মেসেজটি পড়ে ফারাহ্ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। এই অসভ্যকে ফারাহ্ মরে গেলেও বিয়ে করবে না। রাগে রিপ্লে দেয়,
'তোকে আমি জীবনেও বিয়ে করব না বে'য়া'দ'ব।'
মেসেজটি পড়ে শুদ্ধ পাশ থেকে কেশে উঠল। ফারাহ্ শুদ্ধের দিকে তাকায়। মৃদুস্বরে বলে,
'স্যার পানি খাবেন?'
শুদ্ধ মনে মনে বিড়বিড় করে, 'তোমাকে খাবো।'
কিন্তু মুখে বলল,
'না। ঠিক আছি।'
এরপর ফারাহ'র নাম্বারে মেসেজ করে,
'তোমাকে খাবো পাখি। এজন্য তোমাকে আমার বিয়ে করতেই হবে।'
মেসেজটি সিন করে শুদ্ধ একটা প্রশান্তির শ্বাস নেয়। ডান হাত মুখে রেখে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে। ফারাহ্ মেসেজটি পড়ে আর-ও রেগে যায়। এই লোকটা যে একদম যা তা ফারাহ্ বুঝেছে। ব্লক করতে গিয়েও করল না। তার মনে হলো, এই ছেলেকে ব্লক করলে আরেক নাম্বার থেকে জ্বালাবে। অন্যভাবে একে শায়েস্তা করতে হবে।
হঠাৎ মনে পড়ল, কিছুকক্ষণ আগে শুদ্ধ তাকে বলেছিল, সে যেন শুদ্ধকে ফ্রেন্ড ভাবে। ফারাহ্ ভাবলো, এই ছেলের কথা শুদ্ধকে বললে, শুদ্ধ এই ছেলেকে তার পিছু থেকে ছাড়িয়ে দিতে পারবে। অতঃপর শুদ্ধকে ডাকে,
'স্যার?'
ফারাহ'র ডাকে শুদ্ধ সোজা হয়ে বসে। নিজেকে সামলে বলে,
'কিছু বলবে?'
ফারাহ্ দোনোমোনো করে বলে,
'একটি বখাটে ছেলে আমাকে কয়েকদিন হলো খুব বিরক্ত করে। আপনি যেদিন আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন, আমাকে ছেলে দেখতে এসেছিল। সেদিন এই বখাটে ছেলে আমার বিয়ে ভেঙে দিয়েছিল। আর তারপর থেকে আমার পিছে পড়ে আছে।'
শুদ্ধের পেট ফেটে হাসি পাচ্ছে। তার গল্প তাকেই শোনাচ্ছে। হাসি আসলেও সে বহুকষ্টে নিজেকে সামলালো। এরপর মৃদুস্বরে বলে,
'আমাকে কি করতে হবে?'
ফারাহ্ মিনমিন করে বলে,
'আপনি তো ছেলে মানুষ। তাকে কড়া কিছু শুনিয়ে দিলে সে আমার পিছু ছেড়ে দিতে পারে। তাই বলছিলাম আর কি।'
শুদ্ধ কেশে উঠল। এখন সে নিজেই নিজেকে ধমকাবে? এটাই বাকি ছিল। ফারাহ্ শুদ্ধকে আবার-ও কাশতে দেখে বলে,
'আচ্ছা, স্যার বলতে হবেনা। প্রবলেম নেই।'
শুদ্ধ দ্রুত বলে ওঠে, আরে না না। দাও তোমার ফোন। বলছি আমি।
ফারাহ্ খুশি হলো। ডায়াল কলে সেই নাম্বার তুলে দিয়ে, তার ফোন শুদ্ধের দিকে বাড়িয়ে দেয়। শুদ্ধ ফারাহ'র হাত থেকে ফোন নেয়। সবার আগে শুদ্ধ বাহাতে তার কোন সাইলেট করে। এরপর পকেট থেকে টিস্যু বের করে কপালের ঘাম মুছে নেয়। এখন নিজেকেই চারটে কথা শোনাতে হবে ভেবে শুদ্ধের অবস্থা করুণ।
ডান হাতে ফারাহ'র তুলে রাখা নাম্বারে ডায়াল করে। তার বা পায়ের উরুর উপর ফোনে আলো জ্বলে ওঠে। শুদ্ধ বা হাতে কোনোরকমে ফোনটি রিসিভ করেই তার ফোন উল্টো করে রাখলো। এরপর ফারাহ'র ফোন কানে ধরে ফারাহ'র দিকে তাকায়। ফারাহ্ আগ্রহী চোখে চেয়ে আছে শুদ্ধের দিকে। শুদ্ধ একটু হাসল। এরপর গলা ঝেড়ে গম্ভীর গলায় বলে,
হ্যালো?
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসলো না। আসবে কি করে? সেই সিমের মালিক তো শুদ্ধ নিজেই। কথাটা ভেবেই শুদ্ধ হতাশার শ্বাস ফেলল। এরপর বহুকষ্টে কিছুটা রাগী ভাব এনে এক নিঃশ্বাসে বলে,
এই তোর সাহস তো কম না, তুই আমাদের ভার্সিটির স্টুডেন্টকে ডিস্টার্ব করিস। তোকে কিন্তু উল্টো করে ঝুলিয়ে, পাছার ছাল তুলব বলে দিলাম। তারপর সেই ছাল দিয়ে জুতো বানিয়ে পরব। আর কতকাল গরুর চামড়ার জুতো পরবো? এবার মানুষের চামড়ার জুতো-ও পরব, সেই চামড়া হবে তোর পাছার। দাঁড়া।
শুদ্ধের কথাগুলো শুনতেই ফারাহ্ শব্দ করে হেসে দেয়। শুদ্ধের কথাগুলো এত ফানি। এদিকে কথাগুলো বলে শুদ্ধ নিজেই তক্কা খেয়ে যায়। সবসময় উল্টাপাল্টা বলে বলে তার আজ এই অবস্থা। ভালো কথা মুখ দিয়ে বের হয় না। শেষমেশ নিজেই নিজের পাছার ছাল তুলে জুতো বানাতে চাইলো? ছ্যাহ!
শুদ্ধ দ্রুত কান থেকে ফোন সরিয়ে কল কেটে দেয়। এরপর ফারাহ'র দিকে ফোন বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
আর ডিস্টার্ব করবে না। ফোন নাও।
ফারাহ্ শুদ্ধের হাত থেকে ফোন নেয়। শুদ্ধ তার ফোন নরমাল মুড করে পকেটে রাখে। এরপর আর এক সেকেন্ড-ও সময় নষ্ট না করে দু'হাত আড়াআড়িভাবে গুঁজে সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে নেয়। ফারাহ'র হাসি সবসময় ভালো লাগলেও এখন ভালো লাগছে না। ইনডিরেকলি তাকে নিয়েই তো হাসছে। কিভাবে মানবে? নাহ, আর মানা যাচ্ছে না। চোখ বুজে রেখেই গম্ভীর গলায় বলে,
হাসি বন্ধ কর। ঘুমাবো আমি।
শুদ্ধের কথায় ফারাহ্ চুপ হলো। আড়চোখে শুদ্ধের দিকে তাকাল একবার। ভাবলো, শুদ্ধের হয়ত অনেক ঘুম পেয়েছে, এজন্য চুপ করতে বলছে। কিন্তু ফারাহ'র প্রচুর হাসি পাচ্ছে। এই প্রথম শুনল, পাছার ছাল দিয়ে কেউ জুতো বানায়। ফারাহ্ মুখে হাত দিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগলো।
প্রায় ২০ মিনিট পেরিয়েছে। শুদ্ধ চোখ মেলে দেখল ফারাহ্ ঘুমিয়ে গিয়েছে। শুদ্ধ তাকিয়ে রইল ফারাহ'র মুখপানে। কি সুন্দর মেয়েটা! কবে যে বিয়েটা হবে! সেই আশায় শুদ্ধের দিন গুনতে হবে এখন।
ভাবনার মাঝে শুদ্ধের ফোন বেজে উঠলে শুদ্ধ পকেট থেকে বের করে দেখল ইরফান কল করেছে। শুদ্ধ কল রিসিভ করে ফোন কানে ধরে। মিটিমিটি হেসে বলে,
মিস করছিলি সোনা? আই মিস ইউ ইউ ঠু বাবু।
ইরফান চোখমুখ কুঁচকে নেয়। তবে কিছু বলেনা। শুদ্ধ ইরফানকে চুপ দেখে বলে,
কি বলবি, বলে ফেল। মাইরাকে নাকি থা'প্প'ড় মে'রেছিস। বাচ্চা মেয়েটাকে আর মারিস না, বুঝলি?
ইরফান গম্ভীর মুখে বসে আছে। ডান হাত গাড়ির স্টিয়ারিং-এ রাখা। বা হাতে কানে ফোন ধরে রেখেছে। পাশের সিটে মাইরা ঘুমিয়ে আছে। ইরফানের দৃষ্টি মাইরার ঘুমন্ত মুখপানে। শুদ্ধ ইরফানের থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে ইরফানকে ডাকলে ইরফান জিজ্ঞেস করে,
ও কি খেতে লাইক করে?
শুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলে,
কে?
ইরফান বিব্রতবোধ করে। শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
কিসের বাতাস লাগলো রে তোর? বুঝলাম না ব্যাপারটা!
ইরফান রেগে বলে,
সাটআপ।
ইরফানের ধমকে মাইরা ঘুমের মাঝে নড়েচড়ে ওঠে। ইরফান ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,
যা জিজ্ঞেস করেছি, চুপচাপ অ্যান্সার কর।
শুদ্ধ হাসলো। কিছু তো চলছে ইরফান-মাইরার মাঝে। আপাতত এসব ভাবনা রাখল। সীতাকুণ্ড থেকে ফিরে এসবের রহস্য উদঘাটন করবে সে। অতঃপর বলে,
বিরিয়ানি ওর সবচেয়ে পছন্দের খাবার।
ইরফান বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
আর ইউ সিওর?
শুদ্ধ মিটিমিটি হেসে বলে,
আহারে কত চিন্তা তোর! চালিয়ে যা সোনা! হাউ সুন্দর আমার ইরফান বাবুর কেয়াল!
ইরফান রেগে খট করে কল কেটে দেয়। ওপাশে শুদ্ধ হাসল।
ইরফান গাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। প্রায় ১৫ মিনিট পর ইরফান আবার-ও ফিরে আসে হাতে একটি বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে। ড্রাইভিং সিটে বসে পাশে তাকালে দেখল মাইরা ঘুমঘুম চোখে তার দিকে চেয়ে আছে। সদ্য ঘুম থেকে ওঠার ফলে মাইরার চোখমুখ হালকা ফুলে, সাথে লাল হয়ে আছে। ইরফান ভ্রু কুঁচকে বলে,
স্টুপিড গার্ল।
মাইরা ঢোক গিলল। ইরফান তার হাতের প্যাকেট মাইরার কোলের উপর রাখে। গম্ভীর গলায় বলে,
ফিনিশ ইট। ফার্স্ট।
মাইরা প্রশ্নাত্মক চোখে তাকায়। ইরফান আবার-ও গম্ভীর গলায় বলে,
টাইম ফাইভ মিনিটস। ফিনিশ কর। আদারওয়াইজ, থা'প্প'ড় দিয়ে সব দাঁত ফেলব তোমার।
মাইরা বোকাচোখে চেয়ে রইল। প্যাকেটটি খুলে দেখল ভেতরে বিরিয়ানি। সকাল থেকে কিছু খায়নি। সাথে পছন্দের খাবার পেয়ে যেন মাইরার ক্ষুধা আরও বেড়ে গেল। গাড়ির ড্যাশবোর্ডের উপর থেকে পানির বোতল নিয়ে জানালা দিয়ে হাত ধুয়ে নেয়। খাওয়া শুরু করল। আড়চোখে ইরফানের দিকে তাকালো কয়েকবার। ইরফান ফোনে মগ্ন।
মাইরার ভালোই লাগলো। ইরফানের একটা গুণ তো আছে!
কাঁধের উপর ভারী অনুভব করে ফারাহ'র ঘুম ছুটে যায়। ঘুমঘুম চোখে একটুখানি ঘুরে তাকালে ফারাহ্ বুঝতে পারে, শুদ্ধ ঘুমের ঘোরে তার কাঁধের উপর চলে এসেছে। ফারাহ্ ডান হাত তুলে চোখ ডলে। এরপর মাথাটা আরেকটু ঘোরালে শুদ্ধ'কে একটু-আধটু দেখতে পায়। শ্যামবর্ণের শুদ্ধকে দেখে ফারাহ'র বুক ধুকধুক করতে লাগলো। ফারাহ্ চোখ সরাতে পারলো না। কি সুন্দর করে ঘুমায় শুদ্ধ! কথাটা ভাবতেই ফারাহ'র ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে।
হঠাৎ-ই শুদ্ধ নড়েচড়ে ওঠে। ঘুমের ঘোরে বিড়বিড়িয়ে বলে,
মা মাথাটা একটু টিপে দাও। মাথা ব্যথা করছে।
কথাটা আস্তে বললেও ফারাহ্ শুনতে পায়। তার কি হলো কে জানে, ডান হাত বাড়িয়ে শুদ্ধ'র সিল্কি চুলের ভাঁজে হাত রাখে। শরীর শিরশির করে ওঠে।
শুদ্ধ আরাম পেয়ে আবার-ও গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার বদলে ঘুম ছুটে যায়। তার হঠাৎ মনে পড়ে, সে বাসে। এখানে মা নেই। তাহলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে কে? আর সে কোথায় মাথা রেখেছে? কথাটা মনে আসতেই শুদ্ধ দ্রুত চোখ মেলে তাকায়। বুঝল, সে মাথা রেখেছে ফারাহ'র কাঁধে। হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ফারাহ্। ব্যাপারটা শুদ্ধ'র ঠিক হজম হচ্ছে না। অন্তরটা ঠান্ডা হয়ে গেল প্রিয় নারীর হাতের এটুকু স্পর্শ পেয়ে। ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি ফুটল। ভাবলো ভার্সিটি পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত এভাবেই থাকবে। কথাটা ভেবে চোখ বুজে নেয়। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মাথায় মনে হলো, এইখানে অনেক স্টুডেন্ট আছে। তাদের এভাবে দেখে নিলে ব্যাপারটা ভালো না।
এরপর হঠাৎ-ই শুদ্ধ মাথা তুলে সোজা হয়ে বসে। ফারাহ্ থতমত খেয়ে যায়। সে তো ভেবেছিল, শুদ্ধ ঘুমিয়ে। এইজন্য হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। শুদ্ধ'কে জেগে যেতে দেখে ফারাহ্ চোখমুখ খিঁচে মাথা নিচু করে আছে।
শুদ্ধ মিটিমিটি হেসে গলা ঝেড়ে বলে,
তোমার হাতে জাদু আছে। আমার মাথা ব্যথা ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে।
ফারাহ্ অস্বস্তি, লজ্জায় গাঁট হয়ে বসে রইল। শুদ্ধ ফারাহ'র জড়তা বুঝতে পেরে আবার-ও হাসল। এরপর দু'হাত আড়াআড়িভাবে রেখে সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে নেয়। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি লেপ্টে। শান্তি লাগছে ভীষণ।
মাইরা বিরিয়ানি খাওয়ার পর, আবার-ও ঘুমিয়েছিল। এরপর জেগে গিয়ে আর কোনো কথা বলেনি। একটু পর পর আড়চোখে শুধু ইরফানকে দেখেছে। সে ভাবছে, ইরফান তাকে বিরিয়ানি খাওয়ালো, ইরফানকে একটা থ্যাংকস্ দেয়া উচিত।
ইরফান ভার্সিটির মাঠে গাড়ি সাইড করে। মাইরা ভাবলো, গাড়ি থেকে নামার আগে ইরফানকে একটা থ্যাংকস্ দিবে। অতঃপর ইরফানের দিকে চেয়ে মৃদুস্বরে বলে,
থ্যাংকিউ স্যার!
ইরফান গম্ভীর মুখাবয়বে মাইরার দিকে তাকায়। মাইরা ইরফানের দৃষ্টি দেখে ঢোক গিলল। রেগে গেছে না খুশি হয়েছে মাইরা কোনোটাই বুঝল না। হঠাৎ ইরফান গম্ভীর গলায় বলে,
হোয়াই?
মাইরা মিনমিন করে বলে,
ওই যে বিরিয়ানি.....
মাইরার কথার মাঝেই ইরফান শক্ত গলায় বলে,
নো নিড।
মাইরা কেঁপে ওঠে। খ্যাংকিউ দিলে কারো রিয়েকশন এরকম হয়, আজ প্রথম দেখল। মাইরা বিরক্ত হলো। তার-ই দোষ। এই জন্তুর মতো স্বভাবের লোককে ধন্যবাদ দিতে চাওয়া। অসহ্য একটা।
মাইরা আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত গাড়ির দরজা খুলতে নেয়, কিন্তু পারে না। ইরফান গম্ভীর চোখে মাইরার দিকে চেয়ে আছে। মাইরা কিছুকক্ষণ চেষ্টা করার পর ব্যর্থ হয়ে ইরফানের দিকে তাকালো।
ইরফানকে মাইরার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে মাইরা চোখ বড় বড় করে তাকায়। আসার পথে একবার ইরফানের হাতের শক্ত থাপ্পড় খেয়েছে। এখনো গালটা টনটন করছে।
ধন্যবাদ দেয়ার অপরাধে এখন আবার তাকে মারবে না-কি? কথাটা ভাবতেই মাইরা দ্রুত বলে ওঠে,
এদিকে আসছেন কেন? আরেকবার মারলে কিন্তু আমি ভিসি স্যারের কাছে আপনার নামে নালিশ করব বলে দিলাম।
ইরফান মাইরার উপর ঝুঁকে মাইরার দিকে শক্ত চোখে চেয়ে আছে। মাইরা ঢোক গিলল। ইরফান মাইরার দিকে চেয়ে-ই শক্তহাতে মাইরার সিল্টবেল্ট খুলে দেয়। এরপর গাড়ির দরজা খুলে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
আউট!
মাইরা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। দরজা খোলা দেখে দ্রুত গাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
ইরফান গাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে শব্দ করে ডোর লাগায়। মাইরা এগিয়ে যায় সামনে দিকে। ইরফান এগিয়ে এসে মাইরার পিছনে দাঁড়িয়ে দু'হাত পকেটে গুঁজে গম্ভীর গলায় ডাকে,
হেই স্টুপিড গার্ল!
ইরফান কথায় মাইরার পা থেমে যায়। পিছু ফিরে তাকালে ইরফানের সাথে চোখাচোখি হয়। মাইরা প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে আছে।
ইরফান দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
তোমার মতো স্টুপিড বাঁদরকে আমি কখনোই বউ মানবো না। আন্ডারস্ট্যান্ড? সো, এই বিয়ের কথা ভুলে যাও।
ইরফানের কথায় মাইরা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। ঢোক গিলল মেয়েটা। ভাবলো, এই লোকের থাপ্পড় খাওয়ার জন্য সে-ও এই লোকের বউ হয়ে বসে থাকতে পারবে না। অতঃপর কিছুটা রেগে উত্তর দেয়,
আপনার মতো ঘাড়ত্যাড়া, খবিস লোক, আর জন্তুর চেয়েও অধম লোক আমাকে বউ না মানলেই বরং আমি বেঁচে যাবো।
কথাটা বলে মাইরা জান হাতে নিয়ে দৌড় দেয়। ইরফান শক্ত চোখে মাইরার দিকে চেয়ে থাকে। দাঁত কিড়মিড় করে আওড়ায়,
স্টুপিড বাঁদর, থাপ্পড় দিয়ে সব দাঁত ফেলব তোমার।
শুদ্ধ ইরফান আর মাইরার জন্য অপেক্ষা করছিল ভার্সিটিতে। ইরফান মাইরাকে দেখতে পেয়ে এদিকে দিকে এগিয়ে আসছিল।
ইরফান-মাইরার লাস্ট কথা দু'টো শুদ্ধের কানে এসেছে। কথাগুলো শুনে শুদ্ধের মাথায় বাজ পড়ে। এদের মধ্যে বর-বউ নিয়ে কথা হচ্ছে কেন? কিসের বিয়ে? কিসের বউ না মানা? আবার মাইরা বলছে, বউ না মানলেই মাইরা বেঁচে যাবে। সবমিলিয়ে শুদ্ধের মাথা এলোমেলো লাগে।
শুদ্ধ দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে ইরফানের সামনে দাঁড়ায়। ইরফানের দিকে সরু চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করে,
কিসের বউ মানবি না? কোন বিয়ের কথা ভুলতে বললি মাইরাকে?
শুদ্ধের কথায় ইরফান থতমত খেয়ে তাকায়। খুব দ্রুত নিজেকে সামলে বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
নাথিং।
এরপর ইরফান তার গাড়িতে উঠে পড়ে। শুদ্ধ ইরফানের গাড়ির ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে উঠে বসে। তার মাথায় ইরফান, মাইরার কথাগুলো ঘুরছে। ভীষণ ভাবুক হয় সে।
নিশ্চয়ই কোনো ঘাবলা আছে। সেই ঝড়ের রাতে এরা দু'জন কোথায় ছিল, এসব ব্যাপারে ইরফান তাকে এখনো বলেনি। ইরফান এসব বলবে-ও না শুদ্ধ জানে। যা শোনার মাইরার থেকে সময় করে শুনতে হবে।
সেই রাতে দু'জন লাপাত্তা হলো। এরপর থেকেই ইরফানের বিহেভিয়ার কেমন যেন চেঞ্জ হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে মাইরার প্রতি ইরফানের অদ্ভুত একটা কেয়ার শুদ্ধের চোখে পড়ছে। সে ভেবেছিল, সামান্য কিছু। কিন্তু এদের মধ্যে তো একেবারে বিয়ে নিয়ে কথা হচ্ছে। নাহ, আগে মাইরার থেকে সব শুনতে হবে। তারপর সে দম নিবে।
মাইরা ইরফানকে কথাগুলো বলে নিজেই বেশ অবাক হয়। যতই হোক, ইরফান তার টিচার, আগে হলে এভাবে বলতে পারতো না হয়তো। কিন্তু সেদিন রাতে হঠাৎ বিয়ের পর মাইরার যেন সাহস বেড়েছে। মাঠের কোণায় মিলাকে দেখে মাইরা থামলো। মিলা বাস থেকে নেমে মাইরার জন্য অপেক্ষা করছিল। মাইরাকে দেখে এগিয়ে এসে কিছু বলতে নিলে মাইরার বাম গাল নজরে পড়লে মিলা অবাক হয়। ফর্সা গাল লাল হয়ে আছে, হালকা ফুলে উঠেছে। ইরফান ভ্রু কুঁচকে বলে,
এ্যাই মাইরা তোর গালে কি হয়েছে?
মিলার কথা শুনে মাইরার হাত অটোমেটিক বাম গালে চলে যায়। একটু ব্যথা পেল। অসহায় কণ্ঠে বলে,
ইরফান স্যার থাপ্পড় মে'রে'ছে।
মিলা চোখ বড় বড় করে বলে,
কিহহ!
একটু পর চোখ ছোট ছোট করে চেয়ে বলে,
আবার কি করেছিস তুই?
মাইরা মিনমিন করে বলে,
জন্তু বলেছিলাম, সেটা শুনে নিয়েছিল।
মিলা হতাশ! রেগে বলে,
আরও দু'টো দেয়নি কেন? সেই কবে থেকে একটার পর একটা অঘটন ঘটাচ্ছিস তাও আবার ওমন বদমেজাজি স্যারের সাথে! একটা থাপ্পড় মে'রে ছেড়ে দিয়েছে, শুকরিয়া কর।
মাইরা রেগে বলে,
তুই ওই ইরফাইন্না স্যারের হয়ে কথা বলছিস? শালি শত্রু! থাক আমি গেলাম।
কথাটা বলে ধুপধাপ পা ফেলে এগিয়ে গেল। ওই লোক তাকে যে কতগুলো মেরেছে এসব ভাবলেই তার মাথা গরম হয়ে যায়। আর সে তো কিছুই বলেনি।
মিলা মাইরার পিছু পিছু এগিয়ে যায়।
মিলার খারাপ লাগলো। গালটার কি অবস্থা হয়েছে। এই বাঁচালটা যদি তাও একটু শুধরাতো!
ধরনীতে দুপুর গড়িয়ে বিকেলের আমেজ নেমেছে। সূর্যের আলো পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। মাইরা ঘুমিয়েছিল। মাত্র ঘুম ভেঙে গিয়েছে। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে।
সীতাকুণ্ড থেকে ফিরে মাইরা দু'দিন ভার্সিটি যায়নি। শরীরের অবস্থা খুব একটা ভালো না। টিউশন-ও কয়েকদিন মিস হয়ে গিয়েছে।
আজ আর মিস দেয়া যাবে না। তড়িঘড়ি করে রেডি হয়ে নিল।
এখানে এসে একটি ফোন কিনেছে মাইরা। মূলত তার মা কলে পাচ্ছিল না, এরপর মিলার নাম্বারে ফোন দিয়ে জানতে পারে মাইরার ফোন হারিয়ে গিয়েছে। সাথে সাথে মিলার কাছে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে। মাইরা, মিলা একসাথে গিয়ে ফোন কিনেছে। দূর থেকে মায়ের ভালোবাসা পায়, কিন্তু কাছ থেকে মায়ের ভালোবাসা আর পাওয়া হয় না। যেটুকু পায়, এটা-ই বা কম কিসের? সৎ মায়ের এটুকু ভালোবাসা-ই তো কেউ পায় না।
মাইরার ফোন বেজে উঠে। শুদ্ধ কল করেছে। মাইরা নির্দ্বিধায় ফোন রিসিভ করে। শুদ্ধ মাইরাকে তার সাথে দেখা করতে বললে মাইরা জানায় ঘণ্টা দুই পরে তার সময় হবে। শুদ্ধ মাইরার বলা সময়ে দেখা করতে চায়, সাথে মাইরাকে এড্রেস বলে। মাইরা ঘাটলো না এটা নিয়ে। শুদ্ধ তার বড় ভাইয়ের মতো। যখন তখন তার সাথে দেখা করতে চাইতেই পারে। মাইরা তার পার্স, ফোন নিয়ে টিউশনের উদ্দেশ্য বেরিয়ে যায়।
ঘড়িতে সময় তখন রাত ৭:৩০।
শুদ্ধ মাইরাকে একটি রেস্টুরেন্টে আসতে বলেছিল। মাইরা টিউশন করিয়ে শুদ্ধের অ্যাড্রেস অনুযায়ী রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করলে শুদ্ধকে চোখে পড়ে। শুদ্ধ একটি টেবিল বুক করে বসেছে। মাইরা এগিয়ে গিয়ে শুদ্ধকে সালাম দেয়। শুদ্ধ সালাম এর উত্তর নিয়ে মৃদু হেসে বলে,
চলে এসেছ মাইরা, বসো বসো। ভেরি ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।
মাইরা চেয়ার টেনে বসে বলে,
কি কথা ভাইয়া?
ওয়েটার এসে শুদ্ধদের টেবিলে দুই প্লেট বিরিয়ানি রাখে। শুদ্ধ মাইরার দিকে এক প্লেট বিরিয়ানি এগিয়ে দিলে মাইরা হেসে বলে,
আপনার মতো একটা বড় ভাই থাকলে আমার বিরিয়ানি খাওয়ার টেনশন থাকে না। আপনাকে আমি নারুবেল বউ খুঁজে দিব-ই দিব।
শুদ্ধ ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে তাকায়। ইশ! তার নারুবেল হলে কি জঘন্যটাই না লাগবে? ছ্যাহ! মাইরা শুদ্ধ'র মুখের এক্সপ্রেশন দেখে হাসে।
শুদ্ধ নিজেকে সামলালো। আসল কথা বলুক আগে। অতঃপর মাইরার দিকে সরু চোখে চেয়ে বলে,
আর তোমার জন্য জন্তু বর খুঁজে দিলে কেমন হয় মাইরা?
শুদ্ধ'র কথা শুনে মাইরা ভ্রু কুঁচকে তাকায়। শুদ্ধ ভ্রু নাচিয়ে বলে,
এই যেমন ধর, ইরফান।
ইরফান নামটা শুনতেই মাইরা থতমত খেয়ে তাকায়। ইরফান অলরেডি তার স্বামী। আর সে ইরফানকে জন্তু বলে। শুদ্ধ এভাবে বলছে কেন?
শুদ্ধ মাইরার ভড়কে যাওয়া মুখ খেয়াল করে। ভালো-ই ঘাবলা আছে এই ইরফান আর মাইরার মাঝে। আজ সব রহস্য উদঘাটন করবে সে। শুদ্ধ গলা ঝেড়ে বলে,
দ্রুত খেয়ে নাও মাইরা। ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে তোমার সাথে।
মাইরা চিন্তিত হলো। তবে কথা বাড়ালো না। বিরিয়ানি তার খুব পছন্দ। শুদ্ধ যেদিন তাকে আর মিলাকে শপিং করে দিয়েছিল, সেদিন-ও তাকে বিরিয়ানি খাইয়েছিল।
প্রায় ২০ মিনিটের মাথায় মাইরা আর শুদ্ধ'র খাওয়া শেষ হয়। দু'জন হাত ধুয়ে এসে আবার-ও বসে। শুদ্ধ দু'হাত বুকে আড়াআড়িভাবে গুঁজে সিরিয়াসভাবে বলে,
মাইরা ঝড়ের রাতে তুমি আর ইরফান কোথায় ছিলে?
প্রশ্নটা শুনে মাইরা ঢোক গিলল। শুদ্ধ জহুরি চোখে মাইরার দিকে চেয়ে আছে। মাইরাকে চুপ দেখে শুদ্ধ পুনরায় প্রশ্ন করে,
জানি তুমি আর ইরফান এক আদিবাসীদের ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলে। তারপর কি ঘটেছিল সেটাই জানতে চাইছি।
মাইরা চিন্তিত হয়। কি বলবে এখন সে? তার আর ইরফানের বিয়ে, এই কথাটা যেন মাথা থেকে বের-ই হয় না। আবার কাউকে কিভাবে এটা বলবে, সেটাও ভেবে পায়না।
মাইরাকে এবারে-ও চুপ দেখে শুদ্ধ সিরিয়াস হয়ে প্রশ্ন করে,
মাইরা আমার নিজের বোন নেই, তুমি তো জানো তাই না? আর আমার মা কে কি সুন্দর তৃণা আম্মাজান বলে ডাকো। আমি তো মাঝে মাঝে ভুলেই যাই তুমি আমার মায়ের পেটের বোন নয়। এখন তুমি তোমার বড় ভাইকে মিথ্যা বলবে না-কি সত্য বলবে, ভাবো।
মাইরা অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় শুদ্ধের দিকে। শুদ্ধকে মিথ্যা বলতে পারবে না সে। অতঃপর নিজেকে সামলে মিনমিন করে বলে,
ভাইয়া, ওই আদিবাসীরা আমার আর ইরফান স্যারের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে।
মাইরার কথাটা শুনে শুদ্ধ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। মুখ থেকে বেরিয়ে আসে,
কিহহহ?
মাইরা ঢোক গিলল। শুদ্ধ'র এমন রিয়েকশন দেয়া স্বাভাবিক।
শুদ্ধ মাইরার কথা এখনো হজম করতে পারছে না। টেবিলের উপর থেকে গ্লাস নিয়ে দুই ঢোক পানি খেয়ে নেয়। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, মাইরার কথাটা। ইরফানের যা রাগ। শুদ্ধ জানে ইরফান মাইরাকে অলরেডি দু'টো থাপ্পড় মেরেছে। ইরফান-মাইরা। কিভাবে সম্ভব? এরা তো দুই মেরুর মানুষ। ইরফান বেশি কথা বলা পছন্দ করেনা। আবার এদিকে মাইরা কথা না বলে থাকতে পারেনা। তবে এরা একসাথে থাকবে কিভাবে? কিন্তু বিয়ে তো হয়ে গিয়েছে। তাছাড়া ইরফানের মাইরার প্রতি এক্সট্রা কেয়ার শুদ্ধ'র চোখে পড়েছে। হয়তো চাইলেই সম্ভব। শুদ্ধ নিজেকে সামলে মাইরার দিকে তাকায়। মাইরা অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে শুদ্ধ'র দিকে।
শুদ্ধ মৃদু হেসে বলে,
তাহলে তুমি আমার ভাবি হয়ে গেলে মাইরা? সুপার!
মাইরা চোখ বড় বড় করে বলে,
না ভাইয়া। আপনার ভাইয়ের বউ কেউ হবে না। একটু-ও দয়ামায়া নেই লোকটার। এতো পাছাণ! আচার-আচরণ, দেখাশুনায় সব জন্তুর মতো।
কথাগুলো বলে মাইরা থামে। এরপর মিনমিন করে বলে,
আপনি আমার বড় ভাই তাই এসব বললাম। উনাকে বলবেন না যেন।
মাইরার কথা শুনে শুদ্ধ হাসতে হাসতে ঢলে পড়ছে। এদের এক ঘরে থাকতে দিলে দেখা যাবে, মাইরা ইরফানের উল্টাপাল্টা বলতে বলতে মুখের ফেনা তুলবে। আর ইরফান মাইরাকে থাপড়াতে থাপড়াতে সব দাঁত খুলে ফেলবে। শুদ্ধ নিজেকে সামলে বলে,
তার মানে তুমি ইরফানের থেকে তালাক নিয়ে আরেকটা বিয়ে করবে তাই তো?
এ পর্যায়ে মাইরা চুপ হয়ে যায়। মাইরার নিরবতায় শুদ্ধ একটু হাসলো। অতঃপর সিরিয়াস হয়ে বলে,
বিয়ে কোনো ছেলেখেলা নয়, বুঝেছ মাইরা? এই যেমন ইচ্ছে হলে। বিয়ে করে নিলে, আবার ইচ্ছে হলো আলাদা হয়ে গেলে। কিছু ব্যাপার উপর থেকে ঠিক করা থাকে, তেমনি হয়তো তোমাদের বিয়ে উপর থেকে এভাবেই ঠিক করা ছিল। মাইরা শুদ্ধের কথা মন দিয়ে শুনলো। তার মায়ের মুখে সবসময় শুনেছে, জন্ম, বিয়ে, মৃত্যু এগুলো সব আল্লাহর হাতে। কিন্তু ইরফান তো তাকে এই বিয়ে ভুলে যেতে বলেছে। অতঃপর মাইরা শুদ্ধের দিকে চেয়ে বলে,
'ইরফান স্যার আমাকে এই বিয়ের কথা ভুলে যেতে বলেছে, ভাইয়া।'
শুদ্ধ হেসে বলে,
'ওর ব্যাপার আমার উপর ছেড়ে দাও। তুমি প্রাকটিক্যালি ইরফানের বউ হওয়ার প্রিপারেশন নাও, কেমন?'
মাইরা কিছু বলল না। তার কান্না পাচ্ছে। আজকে পর্যন্ত তো ঠিক-ই ছিল। কিন্তু এখন শুদ্ধের কথায় মেয়েটির মনে বেশ প্রভাব ফেলেছে। কয়েকদিন আগে সে ইরফানের বউয়ের জন্য দুঃখ করছিল, এখন সে নিজেই এই লোকটির বউ হয়ে বসে আছে। আল্লাহ, এটা কিসের শাস্তি দিল তাকে? ওই অসভ্য লোকটাকেই আল্লাহ তার কপালে কেন রাখলো? এটা ভাবলেই তার হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।
শুদ্ধ যাওয়ার আগে মাইরাকে বলে, 'আগামীকাল ভার্সিটি শেষে তার সাথে যেন দেখা করে। একজায়গায় নিয়ে যাবে।'
মাইরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। এরপর শুদ্ধের পিছু পিছু সে-ও বেরিয়ে যায় রেস্টুরেন্ট থেকে।