ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের অমল কাব্য (সিজন-২)

১১তম পর্ব

লেখক: DRM Shohag

সামিয়া মাঠের এক কোণায় চুপচাপ বসে আছে। তার চাচা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। এজন্য কয়েকদিনের জন্য গ্রামে গিয়েছিল সে। তার বাবা-মা না থাকলে-ও চাচা চাচী আদর করে তাকে।

ফারাহ আর নুসরাত সামিয়াকে সীতাকুণ্ডে যাওয়ার জন্য অনেক জোর করেছিল, কিন্তু তার বাবার মতো চাচাকে অসুস্থ রেখে কিভাবে যাবে? টাকার সমস্যা নয়, বরং তার চাচা শুনলে তাকে টাকা দিয়ে দিত, কিন্তু সামিয়ার মন সায় দেয়নি।

গতকাল গ্রাম থেকে এসেছে সামিয়া। আজ ভার্সিটি আসলো।

ফারাহ, নুসরাত ভার্সিটির গেইটে ঢুকে মাঠের এক কোণায় সামিয়াকে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে আসে। তারা দু'জন সামিয়ার পাশে বসলে সামিয়া মৃদু হাসে দু'জনকে দেখে। জিজ্ঞেস করে,

'কেমন ঘুরলি?'

ফারাহ হেসে বলে,

'ভালো। তুই গেলে আরও অনেক মজা হত। তোকে অনেক মিস করেছি।'

সামিয়া ফারাহর কাঁধে মাথা রেখে মৃদুস্বরে বলে,

'চাচা অসুস্থ না হলে যেতাম।'

নুসরাত, সামিয়া আর ফারাহর সামনে বসে হাত দিয়ে বাতাস করার ভঙ্গি করে বলে,

'তোর আর যাওয়া। গেলে-ও তো সেই রোবটের মতো ঘুরতি।'

সামিয়া ভোতামুখে তাকায়। ফারাহ হাসলো। সামিয়া ভীষণ শান্তশিষ্ট একটা মেয়ে। কথা-ও কম বলে। এটা নিয়ে নুসরাত সামিয়াকে জ্বালায়। ফারাহ মেকি রাগে বলে,

'এ্যাই নুসরাত, আমার বান্ধবীর পিয়োগবি না তো।'

নুসরাত ফারাহর দিকে চেয়ে হেসে বলে,

'ভাবলাম তোর বান্ধবীকে একটা ফিডার কিনে দিব। কি হয়েছে শোন। একদিন সামিয়া ওর বাড়ির ওখানে ছেলেপেলেরা ফুটবল খেলছিল। হঠাৎ ওর পায়ে এসে খুব জোরে লাগে বলটা। জোরে এসে লেগেছে। ব্যথা কম পায়নি। দু'টো ছেলে এসে ওর সামনে দাঁড়ালে ও নিজেই ওদের হাতে বল তুলে দেয়। আমি হলে তো ওদের এক এক করে মাথা ফাটাতাম। আর এই শালী হাবা ভেজা বেড়াল ভদ্র মেয়ের মতো ওদের বল ফেরত দিল।'

এটুকু বলে নুসরাত সামিয়ার দিকে চেয়ে বলে,

'এই হাবা, চল, তোকে আজ ফিডার কিনে দিয়ে তবেই আমি দম নিব। চল চল।'

বলতে বলতে সামিয়াকে ঠেলতে লাগলো। সামিয়া চেঁচিয়ে বলে,

'চুপ করবি তুই?'

নুসরাত সামিয়ার মুখের সামনে এগিয়ে আসে। চোখ বড় বড় করে বলে,

'তুই কি সামিয়া? দেখতে তো সামিয়ার মতোই লাগছে। হঠাৎ ভেজা বেড়াল থেকে শুকনো বেড়াল হয়ে গেলি কিভাবে?'

সামিয়া চোখমুখ কুঁচকে চেয়ে আছে। ফারাহ নুসরাতের কান্ড দেখে হাসছে। নুসরাত হঠাৎ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,

'নাহ! এ আমি বিশ্বাস করিনা। এ হতে পারে না। আমাদের সামিয়া কোথায় হারিয়ে গেল! কেউ বল?'

নুসরাতের কান্ড দেখে ফারাহ হাসতে হাসতে সামিয়ার উপর ঢলে পড়ছে। এবার সামিয়া নিজেও হেসে ফেলল। নুসরাত হেসে বলে,

'রিনা খানের মতো এক্টিং করতে পেরেছি কি?'

সামিয়া হাসতে হাসতে বলে,

'কাছাকাছি।'

মাইরা আজ ভার্সিটিতে জামা পথে এসেছে। বোরখা ধুয়ে দিতে হবে, আলসিতে এই কাজ করা হয়নি। মাইরা মাঝে মাঝে বোরখা পরে, আবার কখনো জামা পরে। তবে মাথায় হিজাব বাঁধতে কখনো ভুলে যায় না।

আজ তার পরনে জর্জেটের একটি সবুজ জামা, সাথে সবুজ পায়জামা, বাম কাঁধে সবুজ ওড়না ভাঁজ করা। ম্যাচিং করে মাথায় একটি হিজাব বাঁধা।

আজ মিলা ভার্সিটিতে আসেনি। মাইরার সারাদিন ভীষণ বোরিং কেটেছে। সব ক্লাস শেষ করে মাইরা ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে আসে।

ভার্সিটি শেষে শুদ্ধ মাইরাকে দেখে তার সাথে আসতে বলে। মাইরা জিজ্ঞেস করে,

'কোথায় নিয়ে যাবেন শুদ্ধ ভাইয়া?'

শুদ্ধ হেসে বলে,

'তোমার শ্বশুরবাড়ি।'

শুদ্ধের কথায় মাইরা-ও হাসে। ভাবল শুদ্ধ মজা করে বলেছে। অতঃপর বলে,

'আপনি যা কিপ্টে। আপনার শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাবেন না। বুঝেছি। আমাকে নিজে থেকেই ফারাহ আপুর বাড়ি যেতে হবে।'

মাইরার কথায় শুদ্ধ থতমত খেয়ে তাকায়। এই মাইরা টা সব বুঝে গিয়েছে। ইশ! শুদ্ধ মিনমিন করে বলে,

'তুমি আমার একমাত্র বোন। এই কথা লিক কর না, কেমন?'

মাইরা অবাক হয়ে বলে,

'হায় আল্লাহ! আপনি তার মানে সত্যিই......'

শুদ্ধ ইনোসেন্ট মুখ করে বলে,

'বাসার ঘর তোমার হাতেই সাজিয়ে নিব। তবুও চুপ থাকো বোন আমার। কাউকেই যেন বল না, বুঝেছ তো? তোমাকে আমি একটা চকলেটের ২৪০ ভাগের এক ভাগ দিব, প্রমিস।'

মাইরা শুদ্ধের কথায় হাসতে হাসতে বলে,

'এতো খেতে পারবো না ভাইয়া। আরেকটু কম দিয়েন।'

শুদ্ধ মিটিমিটি হেসে বলে,

'আরে মাইরা, তোমার ভাই মারাত্মক দয়ালু। এতো কম দিলে আমার দিল খষ্ট পাবে।'

মাইরা আবার-ও হাসতে হাসতে বলে,

'একটা চকলেটের ২৪০ ভাগের এক ভাগ দিয়ে নিজেকে দয়ালু ভাবা আমার গ্রেট শুদ্ধ ভাইয়া।'

মাইরার কথায় শুদ্ধ হাসল। এরপর আবার-ও শুদ্ধ মাইরাকে বলে, মাইরা যেন কাউকেই না বলে। ফারাহকেও না বলে।

মাইরা মাথা নেড়ে বোঝায়, সে বুঝেছে, কাউকে বলবে না সে। শুদ্ধ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। আশেপাশে তাকালো। আজ সকালে ভার্সিটি এসে দূর থেকে ফারাহকে একবার দেখেছিল। এরপর আর একবার-ও দেখেনি।

শুদ্ধ ইরফানদের বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামায়। শুদ্ধ, মাইরা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়। মাইরা বাড়িটির দিকে তাকায়। তিনতলা বিশিষ্ট সাদা রঙের বিশাল আলিশান বাড়ি। মাইরা অবাক হয়ে বলে,

'এটা কার বাড়ি ভাইয়া?'

শুদ্ধ মৃদু হেসে বলে,

'দেখা যাক কার বাড়ি হয়। ভেতরে চলো।'

কথাটা বলে শুদ্ধ এগিয়ে যায়। পিছু পিছু মাইরা-ও যায়। শুদ্ধ বাড়ির কলিংবেল চাপলে রুমা নেওয়াজ দরজা খুলে দেয়। শুদ্ধের পাশে অপরিচিত এক মেয়েকে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলে,

'এটা কে শুদ্ধ?'

শুদ্ধ রুমা নেওয়াজকে পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভেতরে যেতে যেতে বলে,

'ভেতরে এসো মামি। তারপর বলখি মাইরা ভেতরে এসো।'

মাইরা রুমা নেওয়াজের উদ্দেশ্যে হেসে বলে,

'আসসালামু-আলাইকুম আন্টি।'

রুমা নেওয়াজ ছোট করে সালামের উত্তর দেয়। গম্ভীর গলায় বলে,

'ভেতরে এসো।'

মাইরা অবাক হলো। ভাবলো, এই মহিলা হাসেনা কেন? এসব রেখে মাইরা ভেতরে গিয়ে দাঁড়ায়। খেয়াল করল রুমা নেওয়াজ মুখ গম্ভীর করে চেয়ে আছে তার দিকে। মাইরার অস্বস্তি লাগছে। অপরিচিত কাউকে দেখে ভদ্রতাসূচক-ও তো একটু হাসা যায় না-কি! শুদ্ধ ভাইয়া এনাকে মামি বলল। মাইরা ওতো হিসাব করল না। শুদ্ধ ভাইয়া এনেছে। সে একটু পরেই শুদ্ধ ভাইয়াকে বললে, তার হোস্টেলে রেখে আসতে।

শুদ্ধ সোফায় বসে গা এলিয়ে বসে। কিছুক্ষণ দম নিয়ে বলে,

'আমার এক বোন। ওর নাম মাইরা ইসলাম। আমার বোনটাকে একটু আপ্যায়ণ কর মামি।'

রুমা নেওয়াজ মাইরার উদ্দেশ্যে বলে,

'বসো।'

মাইরা একটু হাসলো। কিন্তু রুমা নেওয়াজ হাসলো না। মাইরা অদ্ভুদভাবে রুমা নেওয়াজকে দেখছে। তার জীবনে এমন ছেলে মানুষ দেখেছে, কিন্তু এমন মহিলা মানুষ এই প্রথম দেখল। ভালো কথা-ও মনে হয়, রাগে বলছে।

তারেক নেওয়াজ ঘর থেকে বেরিয়ে মাইরাকে দেখল। শুদ্ধের কথা সে শুনেছে। এগিয়ে এসে মাইরার সামনে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলে,

'ভীষণ মিষ্টি দেখতে তুমি।'

মাইরা একটু হাসল। ভাবল, যাক এই বাড়ির কেউ তো অন্তত হাসে। অতঃপর মাইরা তারেক নেওয়াজের উদ্দেশ্যে বলে,

'আপনি-ও অনেক সুন্দর আঙ্কেল।'

অপরিচিত মানুষের সাথে মাইরার এভাবে কথা বলায় তারেক নেওয়াজ অবাক হয়। সাথে একটু হাসে। তারেক নেওয়াজ শুদ্ধের উদ্দেশ্যে বলে,

'সত্যি করে বলো শুদ্ধ, ও তোমার বোন? না-কি অন্যকিছু?'

শুদ্ধ মাথায় হাত দিয়ে বলে,

'আসতাগফিরুল্লাহ মামা, ও আমার মায়ের পেট থেকে বের হতে হতে কার পেট থেকে যেন বের হয়েছে। মাইরা আমার মায়ের পেট থেকে বের হতে পারেনি বলে, নিয়ম করে চোখের পানি ফেলে, আর নাকের পানি খেয়ে নেয়।'

শুদ্ধের কথা শুনে তারেক নেওয়াজ শব্দ করে হেসে দেয়। মাইরা তেজী কণ্ঠে বলে ওঠে,

'ভাইয়া, আপনার স্বভাব একদম আমার উপর চাপাবেন না।'

এরপর তারেক নেওয়াজের দিকে তাকিয়ে বলে,

'আঙ্কেল, শুদ্ধ ভাইয়া মাত্র নাকের পানি খেয়ে বলছিল, এতো মজা!'

মাইরার কথা শুনে শুদ্ধ ভোতামুখে তাকায়। সে সবার পিছনে লেগে পারলেও মাইরার সাথে পারেনা। এদিকে মাইরার কথা শুনে তারেক নেওয়াজ হাসতে হাসতে বলে,

'তুমি তো দেখি আমাদের শুদ্ধের সাথে টক্কর নিয়ে নিচ্ছ। বেশ ভালো। তোমার নাম কি আম্মু?'

মাইরা মৃদু হেসে বলে,

'আমার নাম মাইরা ইসলাম। আপনার নাম কি আঙ্কেল?'

মাইরার প্রশ্ন শুনে তারেক নেওয়াজ একটু কেশে ওঠে। তিনি মাইরার থেকে পাল্টা প্রশ্ন আশা করেনি। সচরাচর এরকম দেখেনি যে, সে নাম জিজ্ঞেস করেছে বলে, মেয়ের বয়সী মেয়েটি-ও উল্টে তাকে তার নাম জিজ্ঞেস করছে। তবে মাইরাকে তার বেশ ভালো লাগলো। মৃদু হেসে বলে,

'আমার নাম তারেক নেওয়াজ।'

শুদ্ধ হাসলো। মাইরাকে তো সে চেনে। এবার আস্তে আস্তে এই বাড়ির সবাই চিনে যাবে।

ভেতর থেকে ইনায়া বেরিয়ে মাহরাকে দেখে বলে,

'আরে তুমি সেই মেয়েটা না? যে ঝড়ের রাতে হারিয়ে গিয়েছিলে?'

মাইরা ইনায়াকে দেখে অবাক হলো। চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেন দেখেছে মনে হচ্ছে। হঠাৎ মনে পড়ল, সীতাকুণ্ডে সেই ঝড়ের রাতের পরদিন, তাকে কয়েকজন মেয়ে দেখতে এসেছিল। তার মধ্যে এই মেয়েটা ছিল। আর এই মেয়ে তো ইরফান স্যারের বোন। কথাটা মনে পড়তেই মাইরা চোখ বড় বড় করে তাকায়।

কিছুকক্ষণ আগে শুদ্ধ ওই মহিলাকে মামি বলল, এই আঙ্কেলকে মামা। সে তো জানে, ইরফান শুদ্ধের কাজিন। তার মানে এটা ইরফানের বাড়ি।

একে একে হিসাব মিলতেই মাইরা শুকনো ঢোক গিলল। বেচারি ভয়ে শেষ। দ্রুত শুদ্ধের পাশে গিয়ে কাঁদোকাঁদো মুখ করে বলে,

'ভাইয়া, এটা কি ইরফান স্যারের বাড়ি?'

শুদ্ধ হেসে বলে,

'বাহ মাইরা বাহ! তুমি তো খুব ব্রিলিয়ান্ট। অবশ্য হবে না-ই বা কেন! বোনটা কার দেখতে হবে তো!'

মাইরা অসহায় কণ্ঠে বলে,

'আপনি আমাকে ইরফান স্যারের বাড়ি এনেছেন কেন ভাইয়া? আল্লাহ, এখন আমার কি হবে? প্লিজ এখান থেকে নিয়ে চলুন ভাইয়া!'

এটুকু বলতেই বাম পাশ থেকে ইরফানের শক্ত কণ্ঠ ভেসে আসে,

'এই স্টুপিড গার্ল এখানে কি করছে?'

মাইরা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। এতোক্ষণ যে ভয় পাচ্ছিল, সেটাই হলো। মাইরার মুখ কাঁদোকাঁদো হয়ে যায়।

ইরফানের কথায় তারেক নেওয়াজ, রুমা নেওয়াজ অবাক হয়। তবে ইনায়া অবাক হলো না। সে সীতাকুণ্ডে গিয়ে একবার দেখেছিল, তার ভাই মাইরা মেয়েটাকে ওতো পছন্দ করেনা। তারেক নেওয়াজ অবাক হয়ে বলে,

'ইরফান, তুমি মেয়েটাকে চিনো?'

শুদ্ধ পা নাড়াতে নাড়াতে হেসে বে

'শুধু চেনে না মামা। তোমার ছেলে আমার বোনকে একেবারে হাড়ে হাড়ে চেনে।'

শুদ্ধের কথায় ইরফানের বাবা, মা অবাক হলো। ইরফান রেগে তাকায় শুদ্ধের দিকে। শুদ্ধ পাত্তা দিল না। মাইরা বারবার ঢোক গিলছে। ভয় পাচ্ছে এই ভেবে, শুদ্ধ ভাইয়া না আবার সব বলে দেয়। তখন ইরফান স্যার জানবে, সেই শুদ্ধকে সব বলেছে। আর তারপর যদি তাকে সমানে থাপড়াতে থাকে! কথাটা ভেবেই মাইরার গলা শুকিয়ে আসলো। সে আর থাপ্পড় খেতে চায় না। থাপ্পড়ের যা জোর! গাল কেটে যায় একদম।

কথাগুলো ভেবে মাইরা বামদিকে ফিরে তাকালে ইরফানের সাথে চোখাচোখি হয়। ইরফান শক্ত গলায় বলে,

'স্টুপিড গার্ল, এখানে কেন এসেছ?'

মাইরা ঢোক গিলে মিনমিন করে বলে,

'আমি আসিনি। আপনার ভাই......'

মাইরার কথার মাঝেই ইরফান রেগে বলে,

'আউট!'

মাইরা কেঁপে ওঠে। অপমানে মুখটা থমথমে হয়ে যায়। তারেক নেওয়াজ এগিয়ে এসে বলেন,

'ইরফান, মেয়েটাকে এভাবে বলছ কেন? ও আমাদের মেহমান।'

ইরফান তার বাবার কথা কানে নিল না। বিরক্ত চোখে চেয়ে আছে মাইরার দিকে। শুদ্ধ অবস্থা বেগতিক দেখে দ্রুত দাঁড়িয়ে যায়। এগিয়ে এসে ইরফানকে এক সাইড দিকে টেনে নিয়ে যায়। ইরফান বিরক্ত হয়। শুদ্ধকে কিছু বলার আগেই শুদ্ধ ফিসফিসিয়ে বলে,

'আমি সব জেনে গিয়েছি সোনা। মাইরাকে তুই যে নামে-ই ডাক। বউটা কিন্তু তোর-ই। ভুল বললাম না-কি?'

ইরফান অবাক হয়। এই কথাটা তো কারো জানার কথা নয়। বুঝল ওই স্টুপিডটা সব বলেছে। আরও রেগে যায়। মাইরার দিকে শক্ত চোখে তাকায়।

মাইরা ইরফানের দিকেই চেয়ে ছিল। ইরফানের রাগী দৃষ্টি দেখে মাইরা ঢোক গিলল। দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়।

ইরফান দৃষ্টি সরিয়ে শুদ্ধের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি কণ্ঠে বলে,

'যেভাবে জেনেছিস, সেভাবেই ভুলে যা।'

শুদ্ধ মিটিমিটি হেসে বলে,

'সে তো সময় বলবে। আপাতত এই কথা লিক করাতে না চাইলে শান্ত থাক সোনা। জানিস তো, আমি পেটে কথা জমা রাখলে বদহজম হয়ে যায়। তবুও তোর জন্য একটুখানি দয়ালু হতে চাইছি আরকি।'

ইরফান বিরক্তি কণ্ঠে আওড়ায়,

'ডিজগাস্টিং!'

এরপর হনহন করে দোতলায় উঠতে থাকে।

শুদ্ধ সবাইকে প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে থাকতে দেখে মেকি হাসলো।

এগিয়ে এসে সবার উদ্দেশ্যে বলে,

'বুঝিয়ে বলছি। প্রথমত মাইরা আমাদের গ্রামের মেয়ে, সেই সুবাদে ও আমার আর আমার মায়ের খুব কাছের মানুষ। এরপর মাইরা আমাদের ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট। তোমাদের ছেলেকে তো চেনো। তার স্টুডেন্ট অর্থাৎ আমার বোন মাইরাকে তোমাদের ছেলের পছন্দ নয়, এজন্য-ই এরকম করল। বুঝলে?'

শুদ্ধের কথা শুনে রুমা নেওয়াজ, তারেক নেওয়াজ এবার বুঝল। ইনায়া এগিয়ে এসে মাইরার পাশে দাঁড়িয়ে বলে,

'হ্যাঁ বাবা। আর সেদিন ঝড়ে তো....'

পাশ থেকে শুদ্ধ রেগে বিড়বিড়িয়ে বলে,

'এই বেয়াদব, চুপ কর।'

ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলে,

'কেন, কি হয়েছে?'

শুদ্ধ বিরক্ত হয়। মামা মামি না থাকলে মাথায় এক চাটি মারতো এর। ইরফান মাইরাকে মানছে না, এদিকে মামা মামি ইরফান-মাইরার ব্যাপার এখন-ই জানলে একটা দ্বন্দ্ব বাঁধবে। যেটা শুদ্ধ চাইছে না। সে আগে ইরফানকে মানাবে, এরপর সব সুন্দরভাবে প্রকাশ করবে। ইনায়াকে ধমকে চুপ করিয়ে তার মামির উদ্দেশ্যে বলে,

'মামি, মাইরাকে একটু আপ্যায়ণ কর। আমার মেহমান বলে পাত্তা দিচ্ছ না! ইশ, কি কষ্ট আমার!'

শুদ্ধের কথায় তারেক নেওয়াজ হাসলো। রুমা নেওয়াজ তীক্ষ্ণ চোখে মাইরার দিকে চেয়ে আছে। মাইরার দৃষ্টি রুমা নেওয়াজের দৃষ্টিতে পড়লে মাইরা দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়। মনে মনে বিড়বিড় করে,

'এইবার বুঝেছি, ইরফান স্যার ওমন জন্তুর মতো মায়ের জন্যই হয়েছে। মা, ছেলে একদম এক। দু'জনেই কেমন খেয়ে ফেলা চোখে তাকায়।'

রুমা নেওয়াজ আর কিছু বললেন না। চুপচাপ রান্নাঘরের দিকে গেলেন।

ইরফান দোতলায় উঠে গম্ভীর চোখে মাইরার দিকে চেয়ে আছে। মাইরা এদিক-ওদিক তাকায়, হঠাৎ উপরে চোখ গেলে ইরফানের সাথে চোখাচোখি হতে-ই মাইরা দ্রুত চোখ নামিয়ে নেয়। ঢোক গিলল মেয়েটা। সে যে কোথায় ফেঁসেছে একমাত্র সেই জানে।

ইরফান মাইরার মাথা থেকে পা পর্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ঘোরায়। মাইরার জামা, পায়জামা, হিজাব সব সবুজ। ইরফান গম্ভীর স্বরে বিড়বিড় করে,

'স্টুপিড গ্রীণ বার্ডফ্লাওয়ার!'

কথাটা বলে ইরফান উল্টো ঘুরে তার ঘরের দিকে যায়। মাইরাকে নিয়ে এরকম মন্তব্য করায় ইরফান নিজের উপর চরম বিরক্ত হলো বোধয়, যা তার মুখাবয়বে দৃশ্যমান।

মাইরা একটু-আধটু নাস্তা মুখে দেয়। এরপর শুদ্ধের সামনে গিয়ে বলে,

'ভাইয়া, আমাকে এক্ষুনি হোস্টেলে দিয়ে আসুন।'

শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে বলে,

'কেন মাইরা? শুশুর বাড়ি পছন্দ হয়??

শুদ্ধ কথাটা আস্তে বলায় ইনায়া শুনতে পায়নি। এখনো আপাতত ইনায়া ছাড়া আর কেউ নেই। মাইরা কিছু বলার আগেই শুদ্ধ সোফা থেকে উঠে পড়ে। এই বাড়িতে তার জন্য বরাদ্দকৃত রুমে যেতে যেতে ইনায়ার উদ্দেশ্যে বলে,

'ইনায়া, তোকে দায়িত্ব দিলাম। তুই আমার বোনকে এই বাড়ি ঘুরে দেখা। আমার ঘুম পাচ্ছে খুব।

আর মাইরা বাড়িটা ঘুরে দেখ। আমি কিন্তু পরবর্তীতে তোমার থেকে রিভিউ নিব।'

কথাটা বলে শুদ্ধ তার ঘরে গিয়ে ঘরের দরজা আটকে দেয়। এদিকে মাইরা অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। ইনায়া এগিয়ে এসে বলে,

'এসো মাইরা।'

মাইরা হাজার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইনায়ার সাথে গেল।

ইনায়া মাইরাকে নিয়ে তাদের ছাদে এসেছে। মাইরা ইনায়ার সাথে কথা বলতে বলতে ইনায়াদের ছাদটি ঘুরে ঘুরে দেখল। মাইরার ভীষণ ভালো লাগলো। ছাদের একপাশের কিছু জায়গা জুড়ে অনেক ধরনের ফুলগাছ আছে। তবে মাইরার কাছে একটি গাছ ভীষণ অদ্ভুদ ঠেকল। আগে কখনো দেখেনি। মাইরা ইনায়ার হাত ধরে গাছগুলোর দিকে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায়। ইনায়ার হাত ছেড়ে গাছটির পাশে বসে মাইরা বলে,

'আপু, এটা কি গাছ? আগে কখনো দেখিনি।'

কথাটি বলতে বলতে মাইরা একটি গাছে হাত বুলায়। যেন প্রতিটি ডালের সাথে অনেকগুলো করে সবুজ পাখি বসে আছে। মাইরার ভীষণ ভালো লাগলো। মাইরা মাথা উঁচু করে ইনায়ার দিকে চেয়ে আবার-ও বলে,

'এই গাছের নাম কি আপু? আমার তো মনে হচ্ছে এই গাছের নাম পাখিগাছ।'

ইনায়া মাইরার পাশে বসে মৃদু হেসে বলে,

'তোমার নামের সাথে অনেকটাই মিলে গিয়েছে মাইরা। এই গাছের নাম বার্ডফ্লাওয়ার।'

ইনায়ার কথা শুনে মাইরা অবাক হয়ে বলে,

'ওয়াও! আমি আন্দাজে নাম বললাম আর মিলে গেল। সেই তো! আপু, এই ফুল কি জঙ্গলে পাওয়া যায়?'

মাইরার কথা শুনে ইনায়া হাসতে হাসতে বলে,

'কি বল মাইরা! এটা বাংলাদেশের জঙ্গলে পাওয়া যায় না। এটা দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় একটি ফুল। তবে বিভিন্ন দেশে এই ফুল চাষ করা হয়।

বাংলাদেশেও অনেকে চাষ করে হয়তো।'

মাইরা ইনায়ার কথায় অবাক হয়ে বলে,

'তুমি তো অনেককিছু জানো আপু।'

ইনায়া মৃদু হাসলো। প্রায় কয়েকমাস আগে ইরফান এই ফুলের বীজ এনে রোপণ করেছিল। এরপর ইনায়া একদিন ছাদে এসে দেখে এমন পাখির মতো গাছ। এরপর ইরফানকে জিজ্ঞেস করলে ইরফান ছোট করে বলেছিল,

'এই ফুলের নাম বার্ডফ্লাওয়ার।'

বাকিটুকু ইনায়া গুগলে সার্চ দিয়ে জেনেছে।

মাইরা ইনায়ার দিকে চেয়ে ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলে,

'আপু, আমাকে এখান থেকে একটা গাছ দিবা? মানে এখানে তো অনেকগুলো গাছ আছে। শুধু একটা দিলেই হবে।'

মাইরার কথা শুনে ইনায়া থমথমে মুখে তাকায়। বাকি ফুলগাছ সে লাগালেও এই গাছ তার ভাই লাগিয়েছে। ইরফান তো তাকেই ঠিকমতো এই গাছগুলোর আশেপাশে ঘেঁষতে দেয়না। ইরফান এমনই। তার জিনিসে অন্য কেউ হাত দিবে। এসব ইরফানের পছন্দ নয়। সেখানে মাইরাকে এখান থেকে একটি গাছ দিয়ে দিলে ইরফান কি করবে কে জানে! কিন্তু মাইরাকে না করবে কিভাবে! কেমন যেন দেখায়। ভাবলো, শুদ্ধ ভাইকে ম্যানেজ করে নিতে বলবে। শুদ্ধ ভাই সবকিছু খুব সহজেই সামলে নেয়।

মাইরা ইনায়াকে চুপ দেখে মৃদু হেসে বলে,

'সমস্যা নেই আপু। আমি এমনিই বললাম।'

ইনায়া মৃদু হেসে বলে,

'কোনো সমস্যা নেই মাইরা। তুমি এখান থেকে একটি গাছ নিয়ে নাও।

আমি একটি ব্যাগ আনছি। একটু বসো এখানে।'

কথাটা বলে ইনায়া ছাদ থেকে নিচে নেমে যায়। মাইরা ইনায়ার কথায় ভীষণ খুশি হয়। অনেকগুলো বার্ডফ্লাওয়ার গাছগুলোর পাশে দেখল, কিছু চারা। মাইরা আরও খুশি হলো। এই চারা নিয়ে গিয়ে বেলকনিতে লাগালেই গাছ হয়ে যাবে। আর তারপর এই ফুল ফুটবে। মাইরার ইচ্ছে করল সবগুলো চারা নিয়ে নিতে। কিন্তু মাইরা তার ইচ্ছেকে চাপা দিল। একটা চারা নিতে পারছে এটাই অনেক। মাইরা নিচু হয়ে একটি চারা হাতে তুলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তখনই পিছন থেকে ইরফানের গম্ভীর স্বর ভেসে আসে,

'এখানে কি করছ?'

মাইরা সাথে সাথে উল্টো ঘুরে দাঁড়ালে ইরফানকে দেখে ঢোক গিলল। হাতের চারাটি দেখিয়ে বলল,

'এইতো, এই চারা নিলাম।'

ইরফান মাইরার হাতে বার্ডফ্লাওয়ার গাছের চারা দেখে অবাক হয়ে বলে,

'হোয়াট?' মাইরা ঢোক গিলল। ভাবলো, এটা তো ইরফানের বাড়ি। এই গাছগুলোতেও ইরফানের ভাগ আছে। ইরফান যা মানুষ, তাকে যদি এই গাছ নিতে না দেয়? কথাটা ভেবে মাইরার মন খারাপ হয়। মাইরাকে চুপ দেখে ইরফান ধমকে বলে,

'স্টুপিড গার্ল, আমার জিনিসে হাত লাগিয়েছ কোন সাহসে?'

মাইরা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। মেয়েটার মুখ কাঁদোকাঁদো হয়ে যায়। এতোক্ষণ যা ভাবছিল, সেটাই হতে যাচ্ছে। মাইরা নিজেকে সামলে মিনমিন করে বলে,

'স্যার, একটা মাত্র চারা নিয়েছি। প্লিজ, স্যার, একটা চারা নিই?'

ইরফান সাথে সাথে উত্তর করে,

'নো। রাখো এটা। ফাস্ট।'

মাইরার এবার সত্যিই কাঁদতে ইচ্ছে করল। গাছটি তার খুব পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু সব ভেস্তে গেল। কি আর করার! স্যারের মুখের উপর তো কথা বলা যায় না। হাতের চারাটি নিচু হয়ে যথাস্থানে রেখে মাইরা মনে মনে ইরফানের গুষ্টি উদ্ধার করতে লাগলো।

পিছন থেকে ইনায়া ইরফানের রিয়েকশন দেখে হতাশ হলো। সে ভেবেছিল, ইরফানের আড়ালে মাইরাকে একটা চারা দিতে। এরপর শুদ্ধ ভাইয়াকে ম্যানেজ করে নিত। কিন্তু ইরফান ভাই তার আগেই এসে হাজির। ইনায়া এগিয়ে এসে বলে,

'ভাইয়া, মাইরাকে একটা চারা দেওয়া.......'

এটুকু বলে ইরফানের দৃষ্টি দেখে থেমে যায়। ইরফান শক্ত গলায় বলে,

'এই স্টুপিড গার্লকে এখান থেকে নিয়ে যা। আদারওয়াইজ, থা'প্প'ড় দিয়ে সব দাঁত ফেলব তোদের।'

ইনায়া ঢোক গিলল। বুঝল ইরফান রেগে গিয়েছে। মাথা নেড়ে ছোট করে বলে,

'যাচ্ছি ভাইয়া।'

এরপর মাইরার হাত ধরে ছাদ থেকে নামতে শুরু করে।

মাইরা মনে মনে ইরফানকে ভেঙচি কাটলো। তার দেখা সবচেয়ে বাজে লোক এটা। কতগুলো গাছ এখানে। সে মাত্র একটি চারা চেয়েছিল, তবুও দিল না লোকটা। কি পরিমাণ খারাপ, অ'ভদ্র লোক হলে এমন করে মাইরা তো ভাবতেই পারেনা।

ধরনীতে সন্ধ্যা নামবে নামবে ভাব। শুদ্ধ শুয়ে থাকতে থাকতে সত্যিই ঘুমিয়ে গিয়েছিল। ইরফানদের বাড়ি থেকে মাইরাকে নিয়ে শুদ্ধ মাত্র বের হয়েছে। শুদ্ধ মৃদুস্বরে বলে,

'শ্বশুরবাড়ি পছন্দ হলো মাইরা?'

মাইরা বলে,

'আপনার ভাই একটা খ'বি'শ নম্বর ওয়ান ভাইয়া। উনার বউ উনার কাছে একদিন-ও থাকবে না। এতো খারাপ মানুষ আমি আমার জীবনে দেখিনি। উনার......'

শুদ্ধ কেশে উঠে বলে,

'থামো মাইরা, থামো। যত যাই বলো, বর-টা তো তোমার-ই।'

এ পর্যায়ে মাইরা একটু চুপ হয়। এরপর আবার-ও বলে,

'আমি উনাকে বর মানিনা ভাইয়া।'

শুদ্ধ গম্ভীর গলায় বলে,

'তার মানে তুমি আবার-ও অন্যকাউকে বিয়ে করবে মাইরা?'

মাইরা কিছু বলে না। মাথা নিচু করে হাঁটতে থাকে। শুদ্ধ আড়চোখে মাইরাকে পরখ করে মনে মনে হাসলো। অতঃপর বলে,

'বিয়ে কিন্তু একবারই হয় মাইরা। আর তুমি যদি আবার-ও বিয়ে......'

মাইরা সাথে সাথে বলে,

'আর বিয়ে করব না ভাইয়া। আমরা বাঙালি মেয়েরা এরকম নই।'

এটুকু বলে থামে। গাড়ির পাশে এসে দাঁড়িয়ে শুদ্ধের দিকে চেয়ে অসহায় কণ্ঠে বলে,

'কিন্তু আপনার ভাই আমাকে শুধু খা'প'ড়া'য়।'

শুদ্ধ কি বলবে বুঝল না। ইরফানের রাগ বেশি। তার উপর মাইরার মতো চঞ্চল মেয়ে ওর পছন্দ নয়। এদের আল্লাহ এক করল কেন, শুদ্ধ নিজেই বুঝে পায় না। তবে মাইরার প্রতি ইরফানের কিছু তো একটা আছে।

তখনই পকেটে ফোন বেজে উঠলে শুদ্ধ পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল ইরফানের ফোন। শুদ্ধ ফোন রিসিভ করলে ওপাশ থেকে ইরফান গম্ভীর গলায় বলে,

'ছাদে আয়।'

শুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলে,

'কেন?'

ইরফান বিরক্তি কন্ঠে বলে,

'আমি বলেছি তাই।'

বলেই কল কেটে দেয়। শুদ্ধ ছাদের দিকে নজর করলে দেখল ইরফান ছাদের কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। শুদ্ধ কথা না বাড়িয়ে গাড়ির দরজা খুলে দিলে মাইরা গাড়িতে উঠে বসে। শুদ্ধ মৃদুস্বরে বলে,

'মাইরা, তুমি একটু বসো। আমি দু'মিনিটে আসছি।'

মাইরা মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়।

পাঁচ মিনিটের মাথায় শুদ্ধ ছাদে এসে ইরফানের পাশে দাঁড়িয়ে নিচে তাকায়। মিটিমিটি হেসে বলে,

'ওয়াও, এখান থেকে তো মাইরাকে একদম পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। মেয়েটা কি যে সুন্দর! আমার আর ওকে বোন ভাবতে ইচ্ছেই করেনা।

এতো সুন্দর মেয়ে বোন নয়, শুধু এবং শুধু বউ......'

ইরফান ঝড়ের গতিতে শুদ্ধের দিকে ফিরে তাকায়। ডান হাতে শুদ্ধের কলার চেপে রাগান্বিত স্বরে বলে,

'তোকে আমি ছাড়বো না।'

শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে তাকায় ইরফানের দিকে। এটা কি হলো? সে সুইচ দিল, লাইটটা-ও কি সুন্দর সাথে সাথে জ্বলে উঠল। বাহ! ভালো তো! শুদ্ধ ডান হাত তুলে ইরফানের বুকের পাশে রেখে মিটিমিটি হেসে বলে,

'এখানে খুব জ্বলছে তাইনা সোনা? জ্বলনটা নিশ্চয়ই তোর বউ মাইরার জন্য?'

ইরফান বিব্রতবোধ করে। শুদ্ধের কলার ছেড়ে বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে। বা হাতে ধরে রাখা একটি ব্যাগ শুদ্ধের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,

'এটা ওই স্টুপিড গার্লকে দিবি।'

শুদ্ধ চুপচাপ ইরফানের হাত থেকে ব্যাগটি নিল। ব্যাগ চেক করে দেখল ভেতরে পুরো ৬টি বার্ডফ্লাওয়ারের চারা। শুদ্ধ এই গাছ ইরফানের মাধ্যমেই চিনেছে। আর সে খুব ভালো করেই জানে, ইরফান নিজের জিনিস কাউকে দেয়া তো দূর, হাতটাও দিতে দেয় না। আর সেখানে মাইরাকে পুরো ছয়টি চারা দিয়ে দিচ্ছে? এটা কিভাবে সম্ভব? ইরফানের দিকে দু'পা এগিয়ে এসে বিস্ময় কণ্ঠে বলে,

'সত্যি করে বল, আমার ভাই আসল ইরফান কোথায়?'

ইরফান চোখমুখ কুঁচকে তাকায় শুদ্ধের দিকে। শুদ্ধ আবার-ও চোখ ছোট ছোট করে বলে,

'আমি সিওর তোর উপর খারাপ জ্বিন ভর করেছে। দাঁড়া, আমি এক্ষুনি ছাড়িয়ে দিচ্ছি।'

এরপর শুদ্ধ খুবই ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলে,

'বাবা জ্বিন, আমার ভাইকে ছেড়ে দে। তোকে আমি গবর ঠেসে ঠেসে খাওয়াবো। ছু মন্তর ছু, কালি কু'ত্তার গু।'

কথাগুলো বলে শুদ্ধ ডান হাতে দু'বার ফু দিয়ে, হাতটি ইরফানের দিকে পানি ছিটানোর মতো করে। ইরফান শুদ্ধের দিকে রেগে তাকিয়ে আছে। শুদ্ধ আবার-ও কিছু বলতে চায় তার আগেই ইরফান দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

'সাটআপ।'

এরপর ইরফান শুদ্ধকে পাশ কাটিয়ে দ্রুতপায়ে ছাদ থেকে নেমে যায়। শুদ্ধ মিটিমিটি হাসল। এই ইরফান তো গেছে। তাও আবার মাইরার মতো মেয়ের উপর। এদের সংসার জীবন যে কেমন হবে, এটা ভাবলেই শুদ্ধের যেমন চিন্তা হয়, তেমনি হাসি পায়।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন