ফন্ট সাইজ:
থিম:
মনের রঙে তুমি

৪র্থ পর্ব

লেখক: সুমনা সাথী

#মনের_রঙে_তুমি

#লেখনীতে : সুমনা সাথী

[০৪]

দিনটা একদমই ভালো কাটলো না নুহার। ভার্সিটির ক্লাসগুলো আজ যেন যান্ত্রিক লেগেছে শুষ্ক, একঘেয়ে, প্রাণহীন। আরোযা আর লুনা আজ যেন হাওয়া হয়ে গেছে। কারও একটা মেসেজ পর্যন্ত আসেনি, না তো তারা ভার্সিটি এসেছে। বান্ধবীদের ছাড়া নুহার অকারণেই মনে হচ্ছিল, যেন চারপাশটা বিরক্তিকর একটা শূন্যতায় ভরে আছে। ক্লাস শেষ করে গেট পেরিয়ে মলিন মুখে বেরিয়ে আসলো। হঠাৎই চোখে পড়ল সামনের রোদে বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে। পরনে কালো টি-শার্ট, গাঢ় ধূসর জিনস, চোখে সানগ্লাস। আহির ইবনান মীর।মুহূর্তেই মনটা কেমন খিটখিটে হয়ে উঠল নুহার। আবার শুরু হলো! এই লোকটা ঠিক যেন জানে কখন তার মুড সবচেয়ে খারাপ থাকে, আর তখনই এসে হাজির হয়!আহির সানগ্লাসটা নামিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বলল,

' তাড়াতাড়ি উঠো।'

নুহা কিছু না বলে মুখ শক্ত করে বাইকে উঠে বসল। এখন কিছু বললে তর্ক বাড়বে, আর সেই ধৈর্য আজ তার নেই। মাথায় হালকা ব্যথা, পেটে খিদে, আর এই লোকটা যেন সব কিছুর ওপর টুপ করে বসা একটা বোঝা। বাইক থামল শপিং মলের সামনে। নুহা অবাক হয়ে তাকাল।

'এখানে কেনো এলাম?'

আহির সোজা হেঁটে যেতে যেতে বলল,

' মার্কেট করতে এসেছি। চুপচাপ এসো।'

নুহার এবার সত্যিই মেজাজ গেল বিগড়ে। কিন্তু মুখে কিছু বলল না সে। পেছনে পেছনে হাঁটতে লাগল।একটা দোকানে ঢুকতেই ঝাঁ-চকচকে আলোয় চোখ ঝলসে উঠল। শাড়ির দোকান। চারদিকে রঙিন সিল্ক আর বেনারসির বাহার নানা রকমের শাড়ি। নুহা বুঝে উঠতে পারলো না তাকে এখানে কেনো আনা হয়েছে। আহির অদ্ভুত মনোযোগে শাড়ি দেখে চলেছে। কখনও দোকানদারকে কিছু বলছে, আবার কিছু একটা দেখে মাথা নেড়ে দিচ্ছে। একটা শাড়ি পছন্দ করলো। শাড়িটা নিঃসন্দেহে সুন্দর। কিন্তু শাড়ি কেনো?কার জন্য? আহির দাম মিটিয়ে ব্যাগটা নুহার হাতে দিয়ে বলল,

' এইটা নাও।আর আমার সাথে এসো। '

নুহা এবার রীতিমতো ক্ষেপে উঠল,

' আমাকে দিচ্ছেন? আপনার কি হাত নেই? আর এইভাবে হুট করে মার্কেটে নিয়ে আসার মানেটা কী?'

আহির নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে একজন মহিলাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

' উনার সঙ্গে যাও। শাড়িটা পরে এসো। সাথে উনি তোমাকে রেডি করে দিবে পার্লারের লোক উনি। আমাদের একটা জায়গায় যেতে হবে।'

নুহা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।

' আমি শাড়ি পরতে পারি না। আর কেনো পরব সেটা তো বললেন না!এমনিতে ও তো যাওয়া যায়,এসব কেনো?'

'ধরে নাও, এটা শর্তেরই একটা অংশ।'

নুহা মুহূর্তকাল দাঁড়িয়ে থাকলো। দৃষ্টিতে ক্ষোভ। এই লোকটা আসলে কী চায়?একটা চালাক আর সুবিধাবাদী লোক। আহির আবারও কোথাও চলে গেল। কিছুক্ষণ পর হাতে আরও একটা ব্যাগ নিয়ে আসলো। তারপর সেটা মহিলাটার হাতে ধরিয়ে দিলো। বলল,

' এই ব্যাগে এক্সেসরিজ আছে। নুহা যাও উনার সাথে বেশি দেরি করো না। '

কিছুক্ষণ পর…

নুহা বেরিয়ে এলো। শাড়ির আঁচল হাত দিয়ে বারবার ঠিক করছে, যেন এখনই খুলে পড়ে যাবে এটাই জীবনের প্রথম শাড়ি! তাও আবার জোর জবরদস্তি করে পরানো হয়েছে এই লোকটার চাপে পড়ে। তার ওপর হাই হিল জুতা, যার প্রতিটা ধাপে মনে হচ্ছে নুহা যুদ্ধ করছে নিজের ভারসাম্যের সাথে। মেজাজ চূড়ান্ত খারাপ হয়ে আছে। না জানি আর কী কী করাবে তাকে দিয়ে। মনেই ভেসে উঠছে অসংখ্য অসন্তোষের কথা। নুহা সামনে তাকিয়ে দেখে, আহির কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। এখনও খেয়াল করেনি নুহাকে। নুহা শাড়ি সামলাতে সামলাতে ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। মনে ভেসে উঠল কিছু অপ্রকাশযোগ্য, অসম্মানজনক শব্দ, যেগুলো সে চেপে রাখল নিজেকে কষ্ট করে সংযত করে। ঠিক তখনই…

আহিরের চোখ হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। নুহার দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থবির হয়ে গেল যেন। গাঢ় কালো রঙের শাড়ি, গলায় হালকা নেকলেস, হাতে কাঁচের চুড়ি, কানে ছোট দুল। চুলগুলো খোলা, সাজগোজ একেবারেই মিনিমাল, তবুও যেন এক অদ্ভুত কোমল সৌন্দর্য জড়িয়ে আছে নুহাকে । মুখে কোনো মেকআপ নেই, শুধু হালকা একটু লিপস্টিক। আহির চোখ সরাতে চাইলো। এইসময় হঠাৎ নুহার ডাকে চমকে উঠল,

' এই যে বেকার ডাক্তার! শুনতে পাচ্ছেন?'

আহির চমকে তাকাল। নুহা একগাল বিরক্তি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আহির একটু স্বাভাবিক হয়ে বলল,

' একটু আগে কী বলে সম্মোধন করলে আমাকে? সাহস কি করে হলো তোমার?'

নুহা ভ্রু কুঁচকে বলল,

' বলেছি, বেশ করেছি। প্রয়োজন হলে আরও বলবো। শুনেছি ডাক্তাররা খুব ব্যস্ত থাকে। কিন্তু আপনাকে তো কোনো কাজ করতে দেখছি না! আর আমাকে শাড়ি পরিয়ে, সাজিয়ে এভাবে মার্কেটে ঘোরানোর মানেটা কী? আপনি কিছু বলবেন, নাকি আমি এখানেই বসে যাবো?'

আহির ঠোঁটের কোনে আসা হাসিটুকু আড়াল করে বলল,

' তুমি আমাকে কয়দিন দেখেছো? যে এমন গম্ভীর সিদ্ধান্তে চলে এলে। আমি বেকার ডাক্তার?'

' দুইদিনই যথেষ্ট ছিলো বুঝতে। একদিন দেখেছি আপনি কফি শপে বেকার সময় কাটাচ্ছেন। আজকে আবার এসব বাচ্চামি করছেন। এসব সময় নষ্টের কি কোনো মানে হয়? আনার খিদে পেয়েছে, কোথায় জিজ্ঞেস করবেন নুহা তুমি কিছু খাবে? তা না করে আপনি কিনা আমাকে শাড়ি পরিয়ে শো-ড্রামা করছেন!'

আহির ঠোঁটে প্রশস্ত হাসি নিয়ে বলল,

' যেখানে যাচ্ছি, ওখানে গিয়ে খেয়ে নিও। এখন চলো।'

নুহা দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। আহির ইতিমধ্যে বাহিরের দিকে এগোচ্ছে। একটা কৌতূহল। একরাশ বিরক্তি নিয়ে নুহা ধীরে ধীরে পা বাড়াল তার পেছন পেছন। কিছুক্ষণ পর বাইকটা থামল একটা তিনতলা সাদা বাড়ির সামনে। চারপাশে হালকা সাজসজ্জা, উঠোনে মানুষের যাতায়াত দেখে সহজেই বোঝা যায় বাড়িটিতে আজ কোনো অনুষ্ঠান। নুহা এক পা নামানোর আগেই মেজাজটা একটু খারাপ হয়ে গেল এই শাড়ি পরে হাঁটা'টা জাস্ট অসহ্য লাগছে তার। আহির বাইক থেকে নেমে গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই হঠাৎ এক ঝকঝকে সাজসজ্জায় সজ্জিত মেয়ে দৌড়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল! আহির চোখ কপালে তুলে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো, বিস্ময়ে প্রায় তড়িঘড়ি করে চিটকে গেল সে। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা রোশান হো হো করে হেসে উঠলো। ঠিক এই দৃশ্যটার জন্যই সে অপেক্ষা করছিল। আহির গম্ভীর গলায় বলল,

' এটা কে, রোশান? '

রোশান মাথা চুলকে বলল,

' ভাই, এইই তো... তোর প্রেমিকা, মানে ভাড়া করা হবু বউ!'

আহির সন্দিগ্ধ চোখে মেয়েটার দিকে তাকালো। মেকআপে ঢাকা মুখ, গা ঘেঁষা আধুনিক পোশাক, চড়া পারফিউমের গন্ধ সব মিলিয়ে এই মেয়েকে সামনে দাঁড় করালে ‘বউ’ তো দূরের কথা, নিজের আত্মসম্মানও থাকবে না। রাগ চেপে বলল,

' তুই আর কাউকে পেলি না? এই মেয়েকে বউ সাজালে আমার?!'

রোশান অসহায় কণ্ঠে বলল,

' দেখ, এত সহজ না ভাই! অনেক খুঁজে এই একটাকে রাজি করাতে পেরেছি। চিন্তা কর, অভিনয় ছাড়া কিছুই তো না! আবার কেউ চিনেও ফেলবে না।চল তো! '

আহির মুখ ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো। নুহা তখন ধীরে ধীরে শাড়ি সামলাতে সামলাতে হাঁটছে। মুখে পরিষ্কার বিরক্তি। প্রতিটি পা ফেলতেই বোঝা যাচ্ছে, শাড়ির সঙ্গে যুদ্ধ করে সে ক্লান্ত। চোখেমুখে ধৈর্যের শেষ সীমা। আহির একটু হেসে রোশানের দিকে তাকিয়ে বলল,

' তোর ভাড়া করা 'বউ' থাকুক তোর কাছেই। আমি আমার হবু বউ নিয়ে এসেছি। ওই যে, আসছে ।'

রোশান সেদিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে গেল। আজ আহিরের বন্ধু রনিকের এনগেজমেন্ট। সাজসজ্জা আর উৎসবের রঙে ভরে আছে পুরো বাড়ি। নুহাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর সে অবাক করার মতো দ্রুত সবার সাথে মিশে গেছে। হাসছে, কথা বলছে। আহির এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখছিল সবটা এই মেয়েটা ঠিক কেমন! কখনো রেগে আগুন আবার কখন এমন সাবলীল, প্রাণবন্ত। রোশান হঠাৎ করে পাশ থেকে বলল,

' এই আহির, একবার সত্যি করে বল এই ছোটখাটো, কিউট দেখতে মেয়েটাকে তুই কোথায় পেলি? দেখ, স্ট্যাম্পে লিখে দিলেও আমি বিশ্বাস করব না যে ও তোর গার্লফ্রেন্ড।'

আহির বিরক্ত চোখে রোশন এর দিকে তাকালো,

' কেন? তুই কি ভাবিস আমি প্রেম করতে পারি না নাকি?'

রোশান হঠাৎ চেয়ারে লাফ দিয়ে উঠল,

' পাইছি!তুই নিশ্চয়ই চকলেটের লোভ দেখিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে এসেছিস! তাইনা?'

' তোর মাথার এক্সরে দরকার। কাল চেম্বারে আয় একবার চেক-আপ করি তোর।'

এই মুহূর্তে আহিরের চোখ গেল নুহার দিকে। সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে রাগী চোখে তাকিয়ে আছে। আহির এগিয়ে জিজ্ঞেস করল,

' এইভাবে তাকিয়ে আছো কেন? মনে হচ্ছে চোখ দিয়েই গুলি করবে আমাকে!'

' আমি এখানে আর এক মুহূর্তও থাকবো না। চলুন এক্ষুনি!'

' এই তো, একটু আগে তো সব ঠিক ছিল। আবার কী হলো? আচ্ছা চলো।'

ঠিক তখনই রনিকের বোন, রিয়া, আহিরের পাশে এসে দাঁড়াল। কিছুটা ইচ্ছাকৃতভাবে গা ঘেঁসে। আহির অস্বস্তি নিয়ে একপাশে সরতেই রিয়া মিষ্টি গলায় বলল,

' আহির ভাই, তাহলে সত্যিই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, তাই তো?'

আহির মৃদু হেসে উত্তর দিল,

' হ্যাঁ, ঠিক তাই। তোমার নুহার সঙ্গে আলাপ হয়েছে নিশ্চয়ই? বিয়েতে কিন্তু অবশ্যই আসবে। এখন একটু যাওয়ার অনুমতি দাও রনিককে বলে আসি।'

আহির চলে যেতেই নুহা লক্ষ করল, রিয়ার মুখটা যেন এক মুহূর্তেই শুকিয়ে গেল। কাঁদো কাঁদো চোখ। এত সাজসজ্জার মাঝে একরাশ হতাশা জমলো তার মুখে । দেখতে বেশ সুন্দর মেয়েটা। ফর্সা গায়ের রঙে লাল ড্রেস, পরিপাটি সাজে চোখে পড়ার মতো। কিন্তু আচরণটা ছিল ঠিক উল্টো অপ্রাসঙ্গিকভাবে গায়ে পড়া। নুহার মনের মধ্যে হঠাৎ একটা খচখচানি তৈরি হলো। আহিরের দিকেই রাগটা গিয়ে জমলো এমন একটা মেয়েকে সে অবলীলায় উপেক্ষা করলো! এইসব ভাবনার মধ্যেই আহির ফিরে এলো। নুহা পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই ঘটে গেল বিপত্তি। রিয়া, অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে কিংবা উদ্দেশ্যমূলকভাবে, তার হাই হিল দিয়ে নুহার শাড়িতে পা চেপে ধরল। শাড়ির একটা অংশ খুলে এল। নুহা খুব বেশি না হলেও যথেষ্ট অস্বস্তিকর।

নুহা হকচকিয়ে কোনওভাবে নিজেকে সামলে দাঁড়াল। কিছু বলার আগেই রিয়া দ্রুত হেঁটে সরে গেল, যেন কিছু হয়নি। চারপাশে মানুষের ভিড়। নুহার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আসলো। হাতে ধরে রাখা শাড়ির ভাঁজ তার ভিতরের অস্থিরতা প্রকাশ করছে। আহির দূর থেকে সবটাই লক্ষ করেছিল। নুহার থমথমে মুখ দেখে দ্রুত এগিয়ে এল। ইশারায় জানতে চাইল, কী হয়েছে? নুহা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

' ডাক্তার, একটা চোপাট হয়ে গেছে!'

আহির কপাল কুঁচকে বলল,

' কি পাট?'

' সাধে কি আর আপনাকে বেকার ডাক্তার বলি? বলছি চোপাট! মানে শাড়ির একদম শোচনীয় দশা! আপনার প্রাক্তন আমার শাড়ির যেই অবস্থা করেছে তার ক্ষতিপূরণ আপনাকেই দিতে হবে! আমি এখন কীভাবে যাব ?'

আহির কয়েক সেকেন্ড কিছু বলল না। চোখ আটকে রইল নুহার ঝামেলাপূর্ণ শাড়ির ভাঁজে। তারপর হঠাৎ কি একটা ভেবে আর একটু এগিয়ে আসলো। কিছু না বলেই নুহাকে দু'হাতে কোলে তুলে নিল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন