ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ নরমপত্র

২য় পর্ব

লেখক: জুঁই আক্তার

#নিষিদ্ধ_নরমপত্র 

#পর্ব_২
#লেখনিতে:জুঁই_আক্তার 
নিঝুমের গলা শুকিয়ে আসে।
তার গায়ে ভয়ের হালকা কাপছে, কিন্তু তারচেয়েও বেশি ধাক্কা দেয় আনানের কথার ভঙ্গি।আনানের চোখে একটুও নরমতা নেই।সে শুধু তাকিয়ে থাকে,চোখের সামনে একটা পরিচিত মুখের পরিবর্তন দেখে,যাকে সে ছোট বাচ্চার মতো ছেড়ে গিয়েছিল,আজ যেন সে অচেনা কোনো মেয়ে, ভেজা কণ্ঠে নিঝুম ফিসফিস করে বলে,
“আমি... রান্না গরম করছিলাম। হঠাৎ বাইরে একটু হাওয়া খেতে এসেছিলাম…”
আনান কোনো উত্তর দেয় না।শুধু একবার তাকিয়ে বলে,
 “বাড়ির বাইরে এইভাবে রাত জেগে ঘোরা,এটা তোদের এখন নিয়ম হয়ে গেছে বুঝি?”নিঝুম কি বলবে বুঝলো না,নিঝুম চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে দরজার কাছে।আনান একবার তাকায়, কিছু না বলে মাথা ঘুরিয়ে সোজা রুমের ভেতরে চলে যায়।নিঝুম তখন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাবে...ঠিক সেই সময় চোখ পড়ে,আনান আবার ফিরে এসেছে!এবার সে গিয়ে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে পড়েছে।
মোবাইল বের করে হাতে নিয়ে ঠাণ্ডা ভঙ্গিতে স্ক্রল করছে।
নিঝুমের বুকটা কেমন ধক ধক করে ওঠে।তার মাথায় তখন অদ্ভুত সব চিন্তা ছুটে আসে।
"লোকটা পুরো চেঞ্জ হয়ে গেছে!ছোটবেলায় এমন তো ছিল না… এখন তো হাইটটাই আকাশ ছোঁয়া! এত লম্বা কিভাবে হলো?"চোখটা চলে যায় আনানের চুলের দিকে।সেটা এত সুন্দর আর পরিপাটি করে কাটা,এক ঝলকে তার মনে হয়,
"আমি তো মেয়ে হয়েও এমন সুন্দর চুল রাখতে পারি না!"
সব কিছু মিলিয়ে তার ভেতরে অস্থিরতা জমে ওঠলো।ঠিক তখনই, হালকা এক গন্ধে তার নাক ঝাঁজিয়ে ওঠে।
পোড়া গন্ধ! 
“আমার... রান্না!”
একটানে রান্নাঘরের দিকে দৌড় দেয় সে।গিয়ে দেখে, গ্যাসে বসানো তরকারিটা একদম পুড়ে কালো হয়ে গেছে।হাত ফেলে চুলার সুইচ অফ করে দেয়, কপালের ঘাম মুছে নিতে নিতে হঠাৎ পেছনে তাকায়,সামনেই দাঁড়িয়ে আনান।পকেটে হাত ঢুকানো, মুখে হালকা ঠাণ্ডা ভঙ্গি নিয়ে সোজাসুজি বলে ওঠে,
“আরো বাইরে হাওয়া খেতে যা, হাওয়া খেয়ে পেট তো নিশ্চয় ভরেছে?”
নিঝুম মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে।লজ্জা লাগছে,প্রথম দিনই এভাবে নিজের মান সম্মান হারাতে চাইনি!সে কিছু বলতে যাবে,আনান তখনি বলে,
 “তুই টেবিলে বস। আমি বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসি।”
নিঝুম আঁতকে উঠে, তারপর তড়িঘড়ি করে বলে ওঠে,
“না! না আনান ভাই, লাগবে না! ফ্রিজে রান্না রাখা আছে! আমি ঐগুলা গরম করে নিচ্ছি! বাইরে থেকে কিছু আনবেন না, প্লিজ!”
আনান কাঁধ উঁচু করে দিয়ে বলে,
“ঠিক আছে, যা। গরম করে ফেল।”কথাটা বলে সে আবার গিয়ে সোফায় বসে মোবাইলে চোখ রাখে।
নিঝুম কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকে, নিজের গালটা চিমটি কাটে।
মনে মনে বলে,"আমি কোনো কিছুই ঠিকমতো করতে পারি না!বড়মা তো স্পষ্ট করে বলেছিল ছেলের সামনে যেন না যাই… আর আমি কিনা আজ নিজেই তার সামনে এভাবে রাতে ধরা খেলাম! হায় কপাল!"তার খিদেটা যেন একদম উধাও হয়ে গেছে।মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে করিডোর পেরিয়ে সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়ায়।প্রথম সিঁড়িতে পা রাখতেই হঠাৎ,আনানের কণ্ঠে কাটা শব্দ ছুড়ে আসে পেছন থেকে, “কিরে? রান্না শেষ?”নিঝুম দাঁড়িয়ে পড়ে,
আস্তে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে,
 “না…”
আনান তখন ঠাণ্ডা কণ্ঠে আবার বলে,
 “তাহলে কোথায় যাচ্ছিস?”নিঝুম চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ ।কি বলবে বুঝলো না!তার ভেতরের লজ্জা আর অনিচ্ছার মিশেল একটা গলার কাঁটার মতো আটকে থাকে।
কিছু না বলে, সে ধীরে পা তুলে আবার নিচে চলে আসে...
নিঝুম রান্না গরম করে আনলো।হাতে ধরা ট্রের ভারের চেয়ে মনে চাপটা ছিল অনেক বেশি মনে হলো।চুপচাপ সে টেবিলে বসে।ভুলবশত ডানদিকে বসে পড়েছে,এমন একটা জায়গায়, যেখান থেকে ড্রয়িং রুমে বসে থাকা কাউকে সরাসরি দেখা যায়।আর সেখানে... বসে আছে আনান ভাই।
তার মনে হয়, সে ঠিকমতো নিঃশ্বাসও নিতে পারছে না।
চোখ নামিয়ে খাবারের দিকে তাকায়,প্লেটে ভাত তোলে... কিন্তু তা যেন মুখে নিতে পারছে না।শরীরের প্রতিটা স্নায়ু আনানের উপস্থিতি টের পাচ্ছে,আর চোখ...
চোখটা যেন আপনার ইচ্ছামতো আনানের দিকে বারবার চলে যাচ্ছে।তাকায়... আবার মাথা নিচু করে ফেলে।
আনান একবার তাকায়, চোখাচোখি হয়।
নিঝুম সঙ্গে সঙ্গেই চমকে উঠে মাথা নিচু করে ফেলে।
তার বুকের ভেতরটা দপদপ করে ওঠে, সে নিজের ভেতরেই নিজেকে ধমকায়, "এই নিঝুম! কেনো বারবার তাকাচ্ছিস! তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?"নিজেকে সামলাতে, সে এবার জোরে জোরে খাবার খেতে শুরু করে।কিন্তু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে হঠাৎ গিলে বসে!গলার ভেতরটা পুড়ে যায়,সে হঠাৎ কাশতে শুরু করে।কান্না আর কাশির মাঝখানে হাঁসফাঁস করতে করতে উঠে দাঁড়াতে যাবে,ঠিক তখনই দেখে... তার সামনে পানির গ্লাস।সে হালকা চমকে তাকায়,
আনান ভাই দাঁড়িয়ে আছেন, তার এক হাত বাড়ানো, হাতে পানির গ্লাস।নিঝুম থতমত খেয়ে যায়।এতটা কাছে! এতটা সামনে!তার হৃদপিণ্ড যেন বুকে আর থাকে না, কান পর্যন্ত উঠছে।নিঝুম আনানের দিকে তাকিয়ে কাশছে,আনান রাগী সুরে,
"পানিটা খাবি নাকি কাশবি ?"
সে হাত কাঁপতে কাঁপতে গ্লাসটা নেয়,এক চুমুকে পানিটা শেষ করে।পানি খাওয়ার পরও চোখ নামাতে পারছে না।আনানের চোখে একধরনের স্বাভাবিক গম্ভীরতা।নিঝুম চোখ বন্ধ করে জোরে একটা নিশ্বাস নেয়,যেন নিজেকে একটুখানি শান্ত করে রুমে ফিরতে পারে।আনান হঠাৎ করেই বলে ওঠে,
  “তোর খাওয়া শেষ?”নিঝুম চমকে উঠে তাকায়,মাথা নিচু করে শান্ত কণ্ঠে উত্তর দেয়,
“হ্যাঁ, আমার খাওয়া শেষ।”আনান তখন নিঃসংকোচে বলে ওঠে, “তাহলে আমাকে খাইয়ে দে।”নিঝুম যেন ঠিক বিশ্বাসই করতে পারে না, সে কী শুনলো।তার মুখে বিস্ময় ফুটে ওঠে,
 “কি...? আমি..."
"হ্যাঁ..."
"আপনি রাতে ডিনার করেন নি ?"
আনান ঠাণ্ডা গলায়, যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে বলে,
 “ না , আমি রাতে ডিনার করিনি।”
 “না? কেনো?” নিঝুম জিজ্ঞেস করে। 
“খিদে ছিল না। এখন পেয়েছে। তাই বললাম,তুই খাইয়ে দে।”এই মুহূর্তে নিঝুমের বুকটা জোরে জোরে কাঁপছে।
তার হাত-পা যেন হঠাৎ করেই শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।
মনে হচ্ছে, এই কথা গুলো তার জীবনের সবচেয়ে অপ্রস্তুত মুহূর্ত গুলোর একটি।সে কাঁপা গলায় বলে,“আমি কিভাবে খাওয়াবো?”আনান তখন চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে, ফোনটা হাতে ঘোরাচ্ছে,চোখও তুলছে না, শান্ত কণ্ঠে বলে,
 “হাত দিয়ে খাওয়াবি আর কিভাবে?কে অন্য ভাবে খাওয়ানো যায় নাকি !নিঝুম হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে।
এই লোকটা... এই আনান ভাই...কোনো সমস্যা নেই তার মুখে। যখন ছোট ছিল তখন সব কথা শুনতো আর এখন আমাকে এর কথায় নাচাচ্ছে !কোনো সংকোচ, কোনো ভাবনার রেখা নেই। একবার তো জিজ্ঞাসা করতে পারত কিন্তু না উনি তো শুধু অর্ডার করবে ! এসব মনে মনে বলছে নিঝুম ।আনান বিরক্তি নিয়ে ,"আজ রাতে ওই খাবার আমি খেতে পারব তো ? "নিঝুম প্লেটে ভাত তোলে, ধীরে ধীরে বলে,“নিজের হাতে খেতে পারবেন না?”
আনান ঠাণ্ডা গলায়, চোখ না তুলে বলল,
“না, হাতে ব্যথা। খাইয়ে দে।”
নিঝুম কিছু বলার আগেই মনে মনে চিৎকার করে ওঠে,
 “এ কেমন ঝামেলায় পড়লাম আমি!
আমি বুঝলাম না, ঝড়টা আমার দিকেই কেন আসে সবসময়?”
“কি দিয়ে খাবেন?” নিঝুম জিজ্ঞেস করে।আনান গা-ছাড়া ভঙ্গিতে বলে,“তোর যেটা ইচ্ছা, ওইটা দিয়ে দে। "নিঝুম চুপ করে যায়।তার এবার রাগ উঠছে ,নিঝুম কিভাবে জানবে, ওনি কি দিয়ে খাবেন ?" আপনি কি দিয়ে খাবেন, টা আমি কিভাবে জানবো ?"" বেশি কথা বলিস না নিঝুম, খাইয়ে দে।”নিঝুম কোনো কথা না বলে, তরকারি নিয়ে,সে ধীরে ধীরে লোকমাটা আনানের মুখের দিকে তোলে।লোকমাটা দিতে দিতে, তার ভেতর কাঁপতে থাকে।সে মনে মনে বলে,
 “আল্লাহ্, দয়া করে… দয়া করে… উনি যেন আমার দিকে না তাকান…”কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই...আনান হঠাৎ করে নিঝুমের হাতটা ধরে ফেলে।নিঝুম চমকে ওঠে!তার শরীরটা যেন জমে যায়।এই স্পর্শ…এই অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রস্তুত স্পর্শে সে নিজের শ্বাসটুকু হারিয়ে ফেলে।আনান তখন রাগী স্বরে বলে ওঠে, “তোর হাতে এত দাগ কিসের, নিঝুম?”
নিঝুম ভয়ে মুখ নিচু করে বলে,“আমি জানি না…”
আনান তার দিকে একটু ঝুঁকে আসে, চোখ সরু করে আবার বলে,
 “তোর হাতে দাগ, আর তুই জানিস না?
একটা হলে বুঝতাম, কিন্তু এইভাবে এতগুলো?
কি করিস তুই বাসায়?”
নিঝুম আরও কুঁকড়ে যায়।নিঝুম কি বলবে বুঝতে পারে না । নিঝুম মনে মনে ভেবে হাসে,এই দাগ এই বাড়ির দেওয়া আর এই বাড়ির ছেলে কিনা জানতে চাচ্ছে। সে কি আর করতে পারবে ! পারবে শুধু যন্ত্রনা বাড়াতে !
যার কথা কেউ শোনে না, যাকে কেউ বোঝে না।
সে আস্তে বলে,
“আমি জানি না… আপনি খাবেন?”আনান হঠাৎ একটুও মুড না বদলে বলে,
“দে।আমি নিজের হাতে খেতে পারবো।”এই কথাটা যেন নিঝুমের হৃদয়ে জল ছিটিয়ে দেয়।সে প্রাণ ফিরে পায়!আনান হাত ছেড়ে দেয়।নিঝুম আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না।
চোখ নিচু করে, দমবন্ধ করে সোজা ঘরের দিকে দৌড় দেয়।
তার পেছনে একঝলক হাওয়া বয়ে যায়।সে জানে না, রান্নাঘরে কী আছে, কিংবা টেবিলের সামনে কে আছে,
সে শুধু জানে… এখন সে যদি আরও এক মুহূর্ত থাকে,
সে ভেঙে পড়বে… চোখে জল নেমে আসবে।আর তা সে কাউকে দেখাতে চায় না।
আনান নিঝুমের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে! নিঝুম যে লোকমা গুলো মেখেছে , আনান চুপ করে সেগুলো খায়।
রান্না ঘরে গিয়ে তার হাসি পায় , মেয়েটা কাজ করেনি কাজ বাড়িয়েছে । আনান সব গুলো ঠিক ভাবে গুছিয়ে রুমে চলে যায় । রুমের ডোকেই সে করিডোরে দিকে যায় , তার অদ্ভুত লাগে এই নিঝুমকে কে সে ১২ বছর আগে দেখেছিল , তখন তো নিঝুম আনান কে দেখে ভয় পেত না।
কিন্তু এখন সে বদলে গেছে তাও আনান কিছু ভাবতে ভাবতে সে বিছানায় শুয়ে পড়ে ,সাথে ফোনে বাজতে থাকে ....
  
 " যা চাওয়ার চেয়ে নে
              যা পাওয়ার নিয়ে নে
    যা হওয়ার হয়ে নে
আজকে,,,,,,,,,,,,,,
এদিন বেসামাল তোর স্বস্থি নাজেহাল দেখে কষ্ট হলো কাল ঝরটাকে,,,,,,,,,,,
ও তাইতো প্রেমের নাম লিখেছি 
আর তাতে তোর নাম লিখেছি 
মাঝ রাতে বদনাম হলো মন, যেইনা 
চোখের 
ইচ্ছে হলো
তোর পাড়াতেই থাকতে গেল
ডাক নামে তোর ডাকতে গেলো মন,
কি করি এমন অসুখের জমেছে মরন এ বুকে,,,,,,,।
___
রুমে ঢুকেই নিঝুম দরজা বন্ধ করে দেয়।চাপা একটা শব্দে দরজাটা “টক” করে বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার শরীর কাঁপতে থাকে।সে বিছানার পাশে বসে পড়ে। বুকটা কেমন জোরে জোরে উঠানামা করছে,জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে সে।তার সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে গেছে, হাত কাঁপছে।আজ যা ঘটলো সে সব নিঝুম কল্পনাও করেনি।সে নিজের বুকটা চেপে ধরে, মনে মনে শুধু একটাই কথা ঘুরছে বারবার,
“আমি কেন গেলাম ওখানে! কেনো গেলাম!”চোখ বন্ধ করে বিছানায় মাথা রাখে,কিন্তু ভেতরে এসবই ঘুরছে!তারপর নিজেকেই নিঝুম বলে ওঠে,“বড়মা আমাকে সাবধান করেছিল,বলেছিল আনান ভাইয়ের সামনে যেন না যাই।
কিন্তু আমি... আমি তো ঠিকমতো কথা শুনলাম না।
একরাত না খেলে কী হতো?আমি তো এমনিতেই কত রাত না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি,আজ হঠাৎ করে এতটা প্রয়োজন কী ছিল আমার!”নিঝুম চোখ বন্ধ করে বিছানার কোলবালিশটা জড়িয়ে ধরে।তার গলা ভারি হয়ে আসে।
চোখে জল জমে, কিন্তু সে চায় না কাঁদতে।বিড় বিড় করে উঠলো নিঝুম,
 “সব দোষ আমার।সবটা... শুধু আমার দোষ।”নিজের শরীরটা ছোট করে গুটিয়ে ফেলে সে।হাঁটু গুলো বুকে টেনে চেপে ধরে যেন নিজেকে নিজেই গুটিয়ে রাখতে চায়।তীব্র রাগে তার ভেতরে কান্না উথলে উঠেছে,কিন্তু সে জোর করে সেটাকে চেপে রাখে।আর তার সেই রাগ-ভেজা চোখ দুটো কখন যে ধীরে ধীরে জলে ভরে ঘুমিয়ে পড়ে,সে নিজেও টের পায় না।
---
সকাল ৮টা।
সাবিনা আর হাসনা দুজনেই কাজে ব্যস্ত। এত বছর পর আনান বাড়িতে ফিরেছে,একটা আলাদা উত্তেজনা ঘিরে রেখেছে পুরো পরিবেশটাকে।রিয়ানা আজ খুব খুশি। আনান তার জন্য এনেছে আইপ্যাড, মেকআপ লাইট সহ একটা বড় মিরর, আর ঝুড়ি ভরে চকলেট!রিয়ানা সোজা হেঁটে যায় নিঝুমের ঘরের দিকে।নিঝুম বিছানায় শুয়ে ছিল, দরজা খুলে রিয়ানাকে দেখে উঠে বসে পড়ে।
 "তুই এখানে?"
 "কেনো? আসতে পারবো না নাকি?"
 "না না, এমন কিছু বলিনি! শুধু তোকে সচরাচর এখানে দেখি না, তাই..."
"হ্যাঃ, হয়েছে ডং করিস না! বাজে লাগে দেখতে!"
একটু থেমে রিয়ানা বলে,
 "কাল আনান ভাই এসেছে । সবাইকে অনেক কিছু দিয়েছে। আমি তো ভাবলাম তোর জন্যও কিছু আনবে। কিন্তু না... তোকে কিছুই দেয়নি। তোর কথা মনে ছিল না হয়তো ওনার!"নিঝুম শান্ত গলায় জবাব দেয়,
"আমি তো বলিনি আনতে। এটা তো ওনার ইচ্ছা,আনবেন কি আনবেন না। বারো বছর পর দেখা, আমার কথা মনে আছে কিনা সেটাই তো বড় কথা..."এই কথা বলতেই নিঝুমের মনে পড়ে যায় গত রাতের সেই দৃশ্য...রিয়ানার কথাগুলো তার কানে বাজে ঠিকই, কিন্তু সে যেন হোশে নেই।
রিয়ানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে।রুম থেকে বেরিয়েই তার দেখা হয় আদ্রর সাথে।"কিরে বাদর! তুই চলে এসেছিস!"
 "হ্যাঁ রে, চলে এসেছি বাদরের নানী!"আদ্র মুচকি হেসে পালিয়ে যেতে থাকে।রিয়ানাও তার পেছনে দৌড়াতে থাকে।
আদ্র, আতিফ ভুঁইয়ার একমাত্র ছেলে। আজ তার মা 
সাহিমা ফিরেছেন বাবার বাড়ি থেকে। আদ্র এক দৌঁড়ে ঢুকে পড়ে আনান ভাইয়ার রুমে।আনান তখন ফোনে মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা দেখছিল।আদ্র চিৎকার করে বলে,
"ভাইয়া! বাঁচাও! এই শাকচুন্নি আমাকে খেয়ে ফেলবে!"
আনান কিছু বোঝার আগেই আদ্র গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর।হকচকিয়ে উঠে বসে আনান, "আরে পাগল! দেখে শুনে দৌড়া! পড়ে ব্যাথা পাস না আবার!"
আদ্র আঁকুপাতি গলায় চেঁচিয়ে উঠলো,
"ভাইয়া, বাঁচাও!"
রিয়ানা রুমের ভেতরে এসে চোখ গরম করে বলে,
 "ভাইয়ের গায়ে পড়ে আছিস? তোর একদিন কি, আর আমার এক দিন !"
" ভাইয়া আমাকে ঠিক বাঁচাবে। ভাইয়া বাঁচাও ! "আনান হাসছে রিয়ানার আর আদ্রোর কাহিনীতে ,এ যেন সাপ আর বেজী ! এমন সময় নিচে থেকে আওয়াজ আসে , সাবিনা ডাকছে ," বেলা হয়ে গেলো তো তোরা খেতে আয়! "
"যা , তকে আজ ছেড়ে দিলাম! আনান ভাই নিচে খেতে আসো। "
রিয়ানা আদ্রর দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
"এই তোকে কি কার্ড দিয়ে আনতে হবে ? আয়।
আনান আর আদ্র একসাথে নিচে যায় , সহিমা আনান কে দেখে বলে , শেষে রাজ্যের রাজপুত্র এলো।" ছোট মা, কেমন আছেন ?"
" এইতো ভালো ,তুমি বাবা ?"
"এইতো দেখেছেনই !"
"হে , দেখছি তো খেতে বস ।"
আজও সবাই খেতে বসেছে কিন্তু নিঝুম নেই ! আনান না খেয়ে বসে আছে , আনান কে দেখে হাসনা বলে ,
" দেখলে রিয়ানার বাবা ,নিঝুম এখনও পড়ে পড়ে ঘুমায়! বাড়িতে যে বড় ভাই এসেছে ,তার কোনো খবরই নেই !
আর এইদিকে রিয়ানাকে দেখো কত সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে এসেছে! "আহমেদ কিছু না বলে চুপ করে খাচ্ছে। আনান ও কিছু না বলে চুপ করে খেয়ে সবার আগে চলে যায়। সবার খাওয়া শেষ হতেই আনান নিচে ড্রয়িং রুমের গিয়ে বসে।
___
2 দিন ধরে নিঝুমের কোনো কাজ না থাকায় সে বেশ আরামেই আছে । সে ঘড়িতে চেয়ে দেখে এখনো অনেক সময় বাকি রাত হওয়ার কিন্তু আজ যাই হোকনা কেন ! সে রুম থেকে বের হবে না ! কি করবে বুঝতে না পেরে ,সে নিজের চুল গুলো খোলে ! চুলের দিকে তাকাতেই তার আনান ভাইয়ের কথা মনে পড়ে । নিঝুম মনে মনে ভাবে ,
আনান ভাইয়ের চুল গুলো অনেক সুন্দর এর মানে আনান ভাই অনেক আগে থেকেই চুলের যত্ন করেন কিন্তু আমি তো ভালো করে চুলের যত্ন নিতে পারি না । নিঝুম নিজের চুল গুলো দিকে তাকায় অযত্নে চুলগুলো রুক্ষ হয়ে গেছে! 
বিকেল ৪টা বাজতে চলেছে, কিন্তু নিঝুম এখনো রুমেই? এই মেয়েটা কি পাগল হয়ে গেছে!আনানের চোখে রাগের আগুন, বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা এক মুহূর্তে বিস্ফোরণের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে।আর সহ্য করতে পারছে না সে! রাগ নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে হঠাৎ করেই এক দমে নিঝুমের রুমের দিকে এগিয়ে যায়।রাগের তীব্রতায় দরজায় নক করার কথাও ভুলে যায় আনান!নিঝুমের রুমের দরজা খোলাই ছিল,তাই ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেলো!
রুমে ঢুকেই থমকে যায়।নিঝুম চুল গুলো আঁচড়াতে ওড়না নামিয়ে রেখেছিল। আনানকে দেখে সে মুহূর্তে থমকে যায়,হকচকিয়ে উঠে দাঁড়ায়,চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে, যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।
তারপর তাড়াতাড়ি নিচে রাখা ওড়নাটা কাঁপা হাতে তুলে নেয় সে।আনানেরও চোখ নিচু হয়ে আসে,সে বুঝতে পারে, রাগের মাথায় সে সীমা ছাড়িয়ে ফেলেছে।
সেই মুহূর্তে নিঝুম কাপা কাপা ঠোঁটে বলল,
আপনি...?!
চলবে ....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন