#নিষিদ্ধ_নরমপত্র
#পর্ব_৩
#লেখনিতে:জুঁই_আক্তার
আনান রুমে ঢুকেই নিঝুমের দিকে তাকিয়ে এক ধ্যানে হারিয়ে যায়।তার চোখে পড়ে,নিঝুম হালকা গোলাপি রঙের একটা থ্রি-পিস পরেছে। চুলগুলো লম্বা, কোমর ছুঁই ছুঁই, ছড়ানো অবস্থায় পড়ে আছে পিঠ জুড়ে।ওড়নাটা সারা শরীরে জড়িয়ে রেখেছে নিঝুম।আনান স্থির হয়ে যায়।
সে কিছু বলার আগেই নিঝুম দু’পা পিছিয়ে যায়, বুকের কাছে ওড়নাটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে।নিঝুম কিছু বলতে গেলে অনুভব করে তার ঠোঁট কাপছে,কাঁপা কণ্ঠে, থেমে থেমে তারপর ও নিঝুম বলে,
আপনি...?
আনান কিছু বলার মতো শব্দ খুঁজে পায় না।তার চোখ তখনো নিঝুমের দিকে।এই মুহূর্তটায় যেন সময়ও থেমে গেছে।রুম জুড়ে শুধু নিঃশব্দ, নিঃশ্বাস আর একটা অজানা স্পন্দন।নিঝুম আবার বলে ,
" কিছু বলবেন ?"
আনানের ধ্যান ভাঙ্গে এতক্ষণে , আনান কিছু বলতে যাবে তখনই তার একটু অন্য রকম লাগে । পুরো বাড়ি ঠান্ডা কিন্তু এই রুমে এত গরম ! চোখ যায় রুমের দিকে , আনান কিছুটা অবাক হয় ...আনান রুম থেকে বের হতে হতে বলে ,
" তোকে যেন সারাদিন রুমে না দেখি, নিঝুম !"
নিঝুম কিছু বুঝার আগেই আনান রুম থেকে চলে যায় । নিঝুম দেওয়ালের সাথে একবারে মিশে যায় । তার সমস্ত শরীর এখনো কাঁপছে, সে বুঝতে পারছে না একটু আগে কি হয়েছে !
' এই লোকটা কেনো বার বার সামনে আসে! '
আনান রুমে গিয়েই নিজের জ্যাকেট খুলে ফেলে , তার অসহ্যরকম রাগ হচ্ছে নিজের উপর ! এরকম হুট করে রুমে যাওয়াটা ঠিক হয় নি । তখনই তার মাথায় আসে পুরো বাড়িতে এসি লাগানো ,কিন্তু নিঝুমের রুমের এসি নেই কেনো ? যেখানে পুরো বাড়িতে এসি লাগানো ওর রুমে নেই কেনো ? ওই খাটে নিঝুম ঘুমায় কিভাবে ? রুমটা এতো ছোট কেনো ? ওর বই খাতা কোথায় ? এই বাড়িতে কি হচ্ছে ? তা যে করেই হোক জানতে হবে !
---
নিঝুম রুমে বিছানায় বসে কিছুক্ষণ আগের কথা ভাবছে ,এমন সময় আদ্র রুমে ঢুকেই নিঝুমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। একটু আগের কথা আর এখন এই ছোঁয়ায় নিঝুম আতকে উঠে! নিঝুম চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো ,
' ছাড়ুন ,আমাকে .... গায়ে হাত দিবেন না। '
কথাটি বলেই নিঝুম ডুকরে কান্না করে উঠে । আদ্র কিছু না বুঝতে পেরে বলে উঠে,
" নিঝুম আপু ,ওই আপু ! কান্না করো কেনো ?"
আদ্ররোর কথা শুনে নিঝুম আরো জোরে জোরে কান্না শুরু করে । আদ্র কাঁদো কাঁদো স্বরের বলে উঠে,
" আমি কি কিছু করেছি আপু ? "
নিঝুম আদ্রকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠে,
" খারাপ ছেলে এত দেরি কেনো করলি আসতে ? আমার কথা মনে পড়ে নি বুঝি? "
" আপু কেঁদো না ,আমি আর কখনও তোমাকে রেখে যাবো না , আপু প্লিজ ! "
নিঝুম নিজের চোখ মুছে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে ,
" মনে রাখবি ! এভাবে হুট সামনে আসবি না ! কখন বাসায় এলি?"
" ঠিক আছে, সকালে এসেছি ! আপু ..."
" হুম , বল?"
" আমি কি তোমাকে বেশি কষ্ট দিয়েছি ? "
" নাহ , কিযে বলিস! আমার আবার কিসের কষ্ট ?"
"কেনো তোমার কষ্ট হয় না ?"
" নাহ, আমার কষ্ট হয় না তাই ! "
আদ্র কিছু বলতে যাবে তার আগেই নিঝুম ,
" যা রুমে, যা আমি এখন নামায পড়বো ! "
আদ্র কিছু না বলে বেরিয়ে যায় ।আনান এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ দেখে,আদ্র রুমে ঢুকে সোজা তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।আনান কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই তার চোখ পড়ে আদ্রোর মুখে।ছেলেটা ছোট হলেও মুখটা অদ্ভুত একটা ভাবনায় ডুবে আছে। ভ্রু কুঁচকে আছে, চোখ দুটো যেন ভিজে ভিজে...আনান অবাক হয়ে, গম্ভীর গলায় বলে
---কিরে, তোর কি হয়েছে?
আদ্র কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
--আমি কি খারাপ ভাইয়া...?
আনান কিছুটা অবাক হয়ে একটু নরম স্বরে বলে,
---না রে... তুই কেনো খারাপ হতে যাবি! কী হয়েছে বল?
আদ্র নিচু চোখে ফিসফিস করে বলে,
---কিন্তু... নিঝুম আপু...!
নিঝুমের নাম শুনতেই আনান আদ্ররের মুখ থেকে কথাটা ছিনিয়ে নিয়ে বলে,
---কি হয়েছে নিঝুমের?
আদ্র একটু পিছিয়ে যায়, চোখ নামিয়ে বলে,
---না ভাইয়া, কিছু হয়নি... কিন্তু আমার মনে হয় আমি আপুকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি।আনান এবার আরও অবাক। তারপর বলে উঠে,
---তুই কষ্ট দিলি কিভাবে?
আদ্র ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলে,
---জানি না ভাইয়া, কিন্তু আজকে আপু বলল, "আমার তো কষ্ট হয় না...কিন্তু আপু তো কাঁদছিল ভাইয়া!
আনান কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে,
---নিঝুম এখন কাঁদছে?
---না ভাইয়া, এখন নামায পড়বে।
আনান ধীরে ধীরে আদ্রোর হাত ধরে নিজের পাশে বসায়।
সোজা হয়ে বসে সে বলে,
---আদ্র, আমি তোকে কিছু প্রশ্ন করব... তুই সত্যি সত্যি বলবি তো?
---হ্যাঁ ভাইয়া, তুমি প্রশ্ন করো। আমি মিথ্যে বলব না!
আনান হালকা হাসে, তারপর বলল,
---আমি জানি তুই মিথ্যে বলবি না। নিঝুমের ব্যাপারে যা জানিস সব বল। ছোট-বড়, দরকারি-অদরকারি, যেটাই হোক... সব বল আমায়।
আদ্র একটু ভেবে নিয়ে বলে,
---ভাইয়া, আমি কোথা থেকে শুরু করব? তুমি প্রশ্ন করো, আমি উত্তর দিই, না হলে বলতে পারব না।
আনান প্রশ্ন করে,
---নিঝুম সারাদিন রুমে কেনো থাকে?
আদ্র একটু ইতস্তত করে, তারপর গলা নিচু করে বলে,
---ভাইয়া, আমি বলব, কিন্তু তুমি আমার আম্মুকে বলো না! আম্মু মারবে!আনান মাথা নাড়ে।
---নিঝুম আপু সারাদিন রুমে থাকে না, মেজোমা আপুকে দিয়ে সব কাজ করায়! রান্নাও করে আপু!কিন্তু রান্না শেষে যখন খাবার বানায়, তখন মেজোমা বলে,এই রান্না রিয়ানা আপু করেছে! আমরা সবাই সব সময় এক সাথে খেতে বসি, কিন্তু নিঝুম আপু কখনো আমাদের সাথে খায় না!
আনান বিস্ময় নিয়ে তাকায়। কিন্তু আদ্র থামে না।
---আর জানো ভাইয়া, প্রতি ঈদে আমরা সবাই নতুন জামা কিনি, কিন্তু নিঝুম আপু কিনে না!রিয়ানা আপুর পুরনো জামা গুলোই পরে। আমরা ঈদে বাইরে যাই, ঘুরতে যাই, কিন্তু নিঝুম আপু কখনো যায় না...!"
আনান যেন মুহূর্তে নিঃশব্দ হয়ে যায়। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। আদ্রর কথাগুলো তীক্ষ্ণ শলের মতো বিঁধে যায় বুকের গভীরে।আদ্র নিচু স্বরে বলে,
---আর কি বলব ভাইয়া...?
আনান ধীরে ধীরে বলে,
---নিঝুম... বই কিনতে পারে...?
আদ্র চোখ বড় করে বলে,
---ভাইয়া, তুমি জানো না...?
---কি?
---নিঝুম আপু তো পড়াশুনা করে না!
এই কথা শুনেই আনান যেন ভিতর থেকে কেঁপে ওঠে।
“এই পরিবারের ভেতর আমি কাকে চিনি আর কাকে চিনিনি?”নিজেকেই বলে উঠে আনান!
আনান আবার বলে উঠল,
“ কেনো সে পড়াশুনা করে না “
“ আমি ঠিক জানি না তবে এটা নিয়ে বাড়িতে একটা ঝামেলা হয়েছিল ,এক বছর আগে ! মেজো বাবা নিঝুম আপুকে মেরে ছিল কোনো কারণে ! “আনান বোবা হয়ে যায়, নিঝুমের সেই চুপচাপ রুমে থাকা, সেই ম্লান হাসি, আর ভীত চোখগুলো যেন সব একে একে সামনে ভেসে ওঠে।
আনান এখন আর কিছু বলতে পারে না। শুধু নিঃশ্বাস ফেলে চুপ করে বসে থাকে।কথা শেষ করেই আদ্র ধীরে ধীরে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।আনান চুপচাপ বসে থাকে, চোখে থমথমে এক শূন্যতা। যেন চারপাশটা ঘিরে আছে অজানা কোনো অন্ধকারে।তার মাথার মধ্যে শব্দ গুলোর প্রতিধ্বনি বাজছে,
"নিঝুম আপু নতুন জামা পরে না…নিঝুম আপু রান্না করে, কিন্তু কৃতিত্ব দেয়া হয় রিয়ানা আপুকে…নিঝুম আপু কাঁদে… কিন্তু বলে কষ্ট হয় না…!"আনান ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে ফেলল।ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। এই বাড়িতে সে এতদিন ছিল, এত কিছু দেখেছে, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারেনি!নিজেকেই প্রশ্ন করল সে,
“আচ্ছা, নিঝুম কি সত্যি এই ১২টা বছর ধরে এমন কষ্টেই কাটিয়েছে?তাহলে আমি কী করলাম এই ১২ বছরে?
আমি কি এতটাই অন্ধ ছিলাম...?”তার বুকের ভেতর থেকে একরাশ রাগ, ঘৃণা আর অসহায়তা একসাথে বেরিয়ে আসে।এই বাড়ির মানুষগুলো এত পাষাণ কী করে হতে পারে?একটা মেয়ের জীবনকে তারা এভাবে গিলে ফেলছে আর কেউ কিছু বলছে না!অনেক হয়েছে... আর না!আজ আর সহ্য করতে পারছে না আনান।
সে দাঁড়িয়ে পড়ে,তার চোখ জ্বলছে। সে নিজেকেই বলে উঠে,
"আজ থেকে আমি, আনান ভুঁইয়া, নিজেকে ছুঁয়ে বলছি,আমি আমার প্রাণ দিয়ে হলেও নিঝুমকে আর কষ্ট পেতে দেব না।তার জন্য আমি আছি। আমি থাকব। আমি তাকে আগলে রাখব।"
আনান ফিসফিস করে বলে,
"নিঝুম, তোর খারাপ দিন শেষ।তোকে আর কাঁদতে হবে না।
কারণ তোর... আনান চলে এসেছে।"
—
রাত ৯টা বাজতে চলল।
আনান রুমে বসে ফোন স্ক্রল করছে, রিয়ানা রুমের ভেতরে ঢুকে আনান কে ডাক দেয় , আনান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে,
“ কারও রুমে ঢোকার আগে নক করে ঢোকতে হয়, এটা কেউ শেখায় নি !”রিয়ানা অবাক হয়ে বলে,
“তুমি কি আমাকে বললে!”
আনান গম্ভীর স্বরে বলে,
“তুই ছাড়া কেউ আছে এখানে ?”
“ বড় মা খেতে ঢেকেছে তাই তো বলতে এসেছি!”
“যা বলেছি, এখন থেকে মনে রাখবি,আমি আসছি যা তুই !”
“ঠিক আছে !”
রিয়ানা রেগে হরহরিয়ে বেরিয়ে যায় ।রিয়ানা বের হতেই আনান ও রুম থেকে বেরিয়ে পরে আজ আর কারও জন্য অপেক্ষা করে না । আনোয়ার ভুঁইয়া আর আতিফ টেবিলে বসে কথা বলছে । আনান আসতেই আনোয়ার আর আতিফ কথাপথন বন্ধ করে দেয়। হাসনা রিয়ানার চেহারা দেখে আহমেদ ভুইয়া কে বলে দেখলে ,“ আমার মেয়েটা সারাটা দিন কাজ করবে আর ওই নিঝুম ওকে দিয়ে কিচ্ছু করানো যায় না!তোমরাই ওকে মাথায় তুলছো ।”
হাসনা ভুঁইয়ার কথা শুনে আনান তীক্ষ্ণ নজরে চেয়ে বলে,
“আপনি ঠিক কথা বলেছেন। এই বাড়িতে এসেছি দুইদিন হতে চলল কিন্তু একদিন ও ওকে আমি ডাইনিং টেবিলে দেখিনি !”
হাসনা ভূঁইয়া আনানের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, “ দেখলে রিয়ানার বাবা, আনানও বুঝতে পেরেছে কিন্তু তোমরা বুঝতে পারছ না!”তখনই আনান হাসি দিয়ে বলে,
“ অনেক হয়েছে ওর ফাঁকিবাজি আমি চলে এসেছি ! রিতা … এই রিতা..!”
রিতাকে ডাকতে দেখে সাবিনা বলে উঠেন,
“কি হয়েছে ,আনান । ওকে কেনো ডাকছিস ?”
রিতা দৌড়ে এসে বলে ,
“ ঢাকচিলেন, ভাইয়া!”
“হে , যাও । নিঝুমের রুমে যাও ওকে বলো ,নিচে আসতে !”
“ আচ্ছা ।”
হাসনা অবাক হয়ে বলে,
“ কি করছো ,বাবা ? ওর আসতে হবে না! কি লাগবে বলো আমি করে দিচ্ছি ।”আনান হেসে বলে ,
“না ,আপনার দরকার নেই ! নিঝুম এখন থেকে আমাদের সাথে খাবে ।”
সাবিনা রাগী সুরে বলে উঠেন ,
“ও এত বছর আমাদের সাথে খায়নি ! তুই বললেই খাবে !”
আনান গম্ভীর স্বরে বলে,
“ আসতে তো দেও , পরে দেখা যাবে !”
সাবিনা বিরক্তি নিয়ে বলেন ,
“ওকে তো আমি আরো আগেই খাবার দিয়ে এসেছি !”
আনান হেসে বলে উঠলো ,
“তাহলে তো আরো ভালো! কালকে থেকে ও আমাদের সাথেই খাবে ।”
রিতা নিঝুমকে নিচে যেতে বললেই , নিঝুম একটু ঘাবড়ে যায় ! তার ভয় হতে থাকে ! নিঝুম মনে মনে ভাবে, এই সময় ওরা খেতে বসে ! এখন কেনো যেতে বলল !
নিঝুম চিন্তিত কন্ঠে বলে উঠলো ,
---রিতা,আমাকে কে ডেকেছে ?
---আনান ভাই !
নিঝুমের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে ।
---কিহ ,আনান ভাই… !কেনো ?
---জানি নাহ,আমি ! তোমারে নিচে যেতে কইসে ।
নিঝুম মাথায় হাত রেখে ভাবছে কি করবে !
তখন রিতা জোরে বলে উঠে ,
---আরে তোমারে কইসে যাইতে আর তুমি বইয়া রইসো ! যাও ভাইয়া ডাহে!
নিঝুম আর কিছু না বলে বেরিয়ে যায়, সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে মনে হচ্ছে,এখনই মনে হয় পড়ে যাবে! কিন্তু শেষে সে নিজেকে নিজেই সামলে নেয় । নিচে গিয়ে তার মাথাটা ঘুরে ওঠে,বাড়ির সবার সামনে সে এসে দাঁড়িয়েছে!
নিঝুম কি বলবে , বুঝতে পারছে নাহ্!
তখনই আনান বলে উঠে ,
– সারাদিন রুমে কি ?
নিঝুমকে কিছু না বলতে দিয়ে আনান আবার বলে ,
---অনেক হয়েছে ,আর নয়! এখন থেকে আমাদের সাথে রোজ খেতে বসবি ! যদি তোকে ডাইনিং টেবিলে না পাই তাহলে আর তোকে খাবার দেওয়া হবে না !”
নিঝুম কি হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করছে । তার হাত পা কাঁপছে, এখানে কি হচ্ছে সে জানে না!সাবিনা রেগে বলেন ,
“ তুই কে ওকে খাবার না দেওয়ার ! নিঝুম যা রুমে যা !”
আনান গম্ভীর মুখে বলে উঠে ,
“ সেটা পরে দেখা যাবে!তোকে কি বলেছি মনে থাকবে তো ?”
“ ঠিক আছে ।”
নিঝুম প্রথম সিঁড়িতে পা রাখতে যাবে ,তখন আনান বলে উঠে ,
“ দাঁড়া ! ”
“ পড়াশুনার কি খবর ? কাল থেকে পড়াশুনা প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠতে হবে ! এত সময় নেই হাতে !”
পড়াশোনার কথা উঠতেই নিঝুমের চোখ চকচক
করে উঠলো । এবার আনোয়ার ভূঁইয়া রেগে উঠলে উঠলেন ,আনান , কারও সম্পর্কে না জেনে সিদ্ধান্ত নিতে তোমাকে কে শিখিয়েছে ?
আনান হাসি দিয়ে বলে উঠে ,
---কেনো ,নিঝুমকে আমি চিনি না নাকি?নাকি তুমি চিনো না! যখন আমরা চিনি তখন বলতে সমস্যা কোথায়?
আনোয়ার ভুঁইয়া কে কিছু বলতে না দিয়ে,আনান বলে উঠে,
“ যা, রুমে যা! যা বলেছি মনে থাকবে তো ?”
নিঝুম মাথা নাড়ায় । আর এক মুহূর্তও নিঝুম ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।পা টেনে টেনে সে নিজের ঘরে ঢুকল, দ্রুত হাত বাড়িয়ে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল।
তারপর ধপ করে বিছানার ওপর পড়ে গেল,শুধু শরীর নয়, যেন সমস্ত ক্লান্ত মনটাও সেই বিছানায় ছুড়ে ফেলে দিল।
চোখদুটো ছাদে আটকে গেলেও মনটা স্থির থাকল না।
একটা অজানা উত্তেজনা, ভয়, আর উদ্বেগ তার বুকের ভেতরে দাপিয়ে বেড়াতে লাগল।নিঝুম মনে মনে নিজের সঙ্গে কথা বলতে লাগল,
"আচ্ছা... আনান ভাই কি পারবে আমাকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে? আমি কি পারব আবার পড়তে বসতে, আগের মতো নিজের স্বপ্নগুলোকে আঁকড়ে ধরতে? আমার জীবনের এই দুঃস্বপ্ন, এই দুর্যোগ,এর শেষ কোথায়? নাকি এটা চলতেই থাকবে…?"
হঠাৎই একটা স্মৃতি যেন বজ্রপাতের মতো নেমে এল তার মনে।সেদিনের কথা...সেই অভিশপ্ত দিনের কথা মনে পড়তেই নিঝুমের সারা শরীর কেঁপে উঠল।গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।জীবন তো চলছিল ভালোই…সব কিছু একপাশে রেখে নিজের মতো করে পথ চলছিল সে।
কিন্তু সেদিন…এক বছর আগের কথা...
এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়ার দিন।
নিঝুমের বুক ধুকপুক করছে।পেছন থেকে তার বান্ধবী নুসরাত এগিয়ে এসে বলল,
"নিঝুম... টেনশন হচ্ছে ভাই! কি করব আল্লাহ জানে... তুই তো ভালো স্টুডেন্ট, কিন্তু আমি?"নিঝুম বিরক্ত হয়ে ঘুরে দাঁড়ায়, তারপর বলে উঠে,
"কে বলেছে আমি ভালো স্টুডেন্ট? আমারও তো ভয় করছে, দেখিস না রেজাল্টে কি হয়!"ততক্ষণে রেজাল্ট চলে আসে।নুসরাত মোবাইলে বড় বড় করে দেখে... তারপর হঠাৎ করে চিৎকার করে ওঠে, "ওফফফ্! পাস করসি ভাই!!"সে নিঝুমের দিকে ঘুরে বলে,
"নিঝুম! তোরটা পাইছস?"নিঝুম নিঃশ্বাস আটকে বলে,
"আমি এখনও পাই নাই..."
নুসরাত থমকে যায়, তারপর বলে উঠে,
"কি বলিস! ফেল করলি নাকি?"
নিঝুমের গলায় কান্না এসে পড়ে, কণ্ঠ ভারী হয়ে যায়,
"তাহলে কি আমি ফেল করলাম? আমি তো ভালো পরীক্ষা দিয়েছিলাম... অনেক কষ্ট করে পড়েছি...!"তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াতে শুরু করে।
"আজ বাবা আসবে বলেছিল... আমি ভাবছিলাম তাকে দেখাবো, আমি পারি... কিন্তু এখন তো সব শেষ!"
"ঘরের সব কাজ সামলে, কতো কষ্ট করে পড়েছি আমি! কিন্তু তাও শেষ পর্যন্ত ফেল করলাম!"নিঝুমের কান্না ধীরে ধীরে জোরে জোরে হাহাকার হয়ে ওঠে।এইদিকে নুসরাত ছুটে যায় রেজাল্ট চেক করতে।নিঝুম একা একা বসে কাঁদতে থাকে।হঠাৎ সে দেখে, নুসরাত ফিরে এসেছে…
তবে মুখে কোনো কথা নেই। সে নিঃশব্দে মাটিতে বসে পড়ে।
নিঝুম অস্থির হয়ে উঠে দাঁড়ায়, তার পর বলে উঠে,
"তুইও পেলি না !"নুসরাত কোনো উত্তর দেয় না।
নিঝুম কাঁদো স্বরে আবার জিজ্ঞেস করে,
"এইবার টপ কে করলো?"নুসরাত চিৎকার দিয়ে বলে,
"নিঝুম ভুঁইয়া!"
নিঝুম কাঁদতে কাঁদতে বলল ,
”ওও ,নিঝুম ভুঁইয়া ।কথাটি বলেই নিঝুম থমকে যায়। কিছুক্ষণ বুঝতেই পারে না।"কি…হহহ… আমি?! তুই মিথ্যে বলছিস! মজা করিস না প্লিজ…"
নুসরাত রেগে বলে ওঠে,
"দেখে আয় নিজেই, তখন বুঝবি!"নিঝুম আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ছুটে যায় নিজের রেজাল্ট দেখতে।আর তারপর সে স্তব্ধ।সে সত্যিই টপ করেছে।শরীরটা যেন হঠাৎ হালকা হয়ে যায়!আজ নিঝুম অপেক্ষা করছে তার বাবার জন্য।আহমেদ ভুঁইয়া।দুপুর গড়িয়ে বিকেল ২টা বেজে যায়, কিন্তু বাবার দেখা নেই।সে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তার পাশে।নুসরাতও অপেক্ষা করে করে শেষে চলে যায়।নিঝুম রাস্তার ধারে একা দাঁড়িয়ে থাকে... তখনই একট গাড়ি এসে তার সামনে দাঁড়ায়।নিঝুম সরে যেতে যায়, ঠিক তখনই,
গাড়ি থেকে একজন অচেনা ছেলে নেমে আসে।সে সোজা নিঝুমের সামনে এসে দাঁড়ায়।নিঝুম ভয় পেয়ে পিছু হটতে চায়, কিন্তু এর আগেই...ছেলেটি নিঝুমের হাত ধরে ফেলে!
নিঝুম কিছু বুঝে ওঠার আগেই, ছেলেটি তাকে জোর করে গাড়ির ভিতর তুলে নেয়।নিঝুম চিৎকার করতে চায়,
কিন্তু ছেলেটি তার মুখ চেপে ধরে।তারপরে গাড়ির দরজা লক করে দেয়।নিঝুম দম বন্ধ করে চিৎকার করতে থাকে,
কিন্তু গাড়িটি সাউন্ডপ্রুফ,তার কান্না, তার আর্তনাদ কেউ শুনতে পায় না।ছেলেটি তার দুই হাত বেঁধে ফেলে।নিঝুম কাঁদতে থাকে।তার কোলের উপর থাকা সেই মার্কশিটটা তখনো ভাঁজ হয়ে ধরা…যেটা সে তার বাবা কে দেখাতে চেয়েছিল!সে পারে… সে জিতেছে… সে হেরে যায়নি…
আর এখন?তার চোখের সামনে সেই সফলতার কাগজটা,
আর সে নিজে একটা বন্দি!নিঝুম জোরে জোরে কাঁদতে দেখে ছেলেটি নিঝুমকে বলে ,
“ আমি তোমাকে কিছু করব না। কিন্তু চিৎকার করলে সেটা তোমার জন্য খারাপ হবে !”
নিঝুম ধীরে ধীরে বলে , “আমি বাড়ি যাবো ! ছেড়ে দিন আমাকে !”
ছেলেটি হাসি মুখে বলে, “ এখন তো ছাড়া যাবে না।”
এমন সময় নিঝুম দেখে আহাম্মেদ ভূঁইয়া চলে এসেছেন। নিঝুম জোরে জোরে ডাকে ,কিন্তু তিনি শুনতে পারেন না। নিঝুম এবার ছেলেটির কাছে অনুরোধ করতে শুরু করে ,
“ প্লিজ আমাকে যেতে দেন, আমার বাবা এসেছে, প্লিজ আমাকে যেতে দিন!”
নিঝুম বারবার মিনতি করতে থাকে । শেষে ছেলেটি রেগে ধমকে উঠল ,
“ আর একটা কথা বলবি ! আমি তোর এমন অবস্থা করব তুই ভাবতেও পারবি না ।”
ছেলেটি নিঝুমের সামনে এসে বলে উঠে,
“মেয়েদের প্রতি আমার আলাদা দুর্বলতা কাজ করে কিন্তু তোর মত রূপসী আমার সামনে,আমি চাইলেই যা ইচ্ছা করতে পারি ! আমি তাও তোকে কিছু করছি না !” ছেলেটি নিঝুমের অনেকটা কাছে এসে,
“ কিন্তু বেশি চিৎকার করলে মনে হয় না, আমি ঠিক থাকতে পারবো !” নিঝুম ভয়ে গাড়ির সাথে লেগে যায় ,
‘ প্লিজ , আমাকে ছোবেন না ! আমি আর চিৎকার করব না !’
ছেলেটি হেসে ফোনে মনোযোগ দিল । নিঝুম দেখে আহাম্মেদ ভূঁইয়া রেগে কলেজ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন । নিঝুম আর ডাকার চেষ্টা করে না । দেখতে দেখতে রাত হয়ে যায় , শেষে বারোটায় গাড়িতে একটা নতুন ছেলে ডোকে । নিঝুম ভয়ে গাড়ির সাথে মিশে যায়, ছেলেটি গাড়িতে ঢুকে বলে, “ সময় হয়ে গেছে, ছেড়ে দে!”
নিঝুমকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়! নিঝুম এই রাতে অনেক কষ্টে বাড়িতে গিয়ে দাঁড়ায়!বাড়িতে ঢুকতে দেখে সবাই জেগে আছে , নিঝুম বাড়িতে ঢুকে আহমেদ ভূঁইয়ার সামনে কাঁদতে কাঁদতে কিছু বলতে যাবে , এর আগেই আহমেদ ভূইয়া , সজোরে একটা থাপ্পর মারে ! নিঝুমের গালে ! নিঝুম সোজা গিয়ে ফ্লোরে পড়ে। নিঝুম কিছু বলতে যাবে এর আগেই আহমেদ ভুঁইয়া বলেন , “ আমি জানতাম , দিনশেষে তুই ও তোর মায়ের মত হবি ! তোর মা যেমন সব রেখে পালিয়েছে ,তুই ও সেই রাস্তাই অনুসরণ করছিস।”
নিঝুম আহমেদ ভুঁইয়াকে কাঁদতে কাঁদতে বলে,“ আমি ইচ্ছা করে কিছু করি নি ! আমাকে …”নিঝুমের কথা শেষ হওয়ার আগেই আনোয়ার ভুঁইয়া রেগে বলে ,
“হয়েছে আর কৈফিয়ত দিতে হবে না ! রাতে বারোটা বাজে মেয়েরা কি করে তা আমাদের জানা আছে !”
“ বড় বাবা বিশ্বাস করেন , আমাকে নিয়ে …”
নিঝুমের কথা শেষ হওয়ার আগেই আহমেদ জোরে একটা লাথি মারে নিঝুমের পেটে। নিঝুম জোরে চিৎকার করে ওঠে । আহমেদ চিৎকার করে বলে , “ওই মুখ দিয়ে আর কোনো কথা আমি শুনতে চাই না । হাসনা ঠিকই বলত তোকে পড়ানো আমার ঠিক হচ্ছে না । যতই আমার টাকা খাওয়াই দিন শেষে তো ওই মায়ের রক্তে বেড়ে উঠেছে তোর ভেতরে ! এত বছর খাইয়ে বড় করতে পেরেছি , আর সময় হলে বিদায় ও করতে পারব।”
নিঝুম পেটের ব্যাথায় কাতরাচ্ছে । সারাদিন কিছু খাওয়া হয় নি , একগ্লাস পানিও না । সেই অবস্থা নিঝুম দৌড়ে বাড়িতে এসেছে । কিন্তু লাথি গুলো পেটে পড়ায় , খিদে আর ব্যথায় যন্ত্রণা আরো বেড়েছে।
আনোয়ার ভুঁইয়া রেগে বলেন , “তোর মা এই পরিবারের নাম ডুবিয়েছে ,ভুলে গেছিস! কিভাবে মানুষের সামনে আমাদের মান ইজ্জত নিয়ে তুই আর তোর মা খেলা শুরু করেছিস ! আজ থেকে তোর পড়াশুনা শেষ! এই বাড়িতে তোর বাইরে যাওয়ার কথা শুনি শুধু,আমার থেকে খারাপ কেও হবে না! ভাববি না আমি আহাম্মেদ , আমি আনোয়ার। আহাম্মেদ তো শুধু লাথি দিয়েছে আমি তার থেকেও বেশি খারাপ !”আনোয়ার ভুঁইয়া সোজা রুমে চলে যান।নিঝুম পড়াশুনার কথা শুনে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে !
“বড় বাবা, প্লিজ। আমার পড়াশুনা বন্ধ করো না। দেখুন আমি কলেজে টপ করেছি! দেখুন বড় বাবা ! দেখুন ….”
আহমেদের কানে নিঝুমের মিনতিগুলো আগুনের মত লাগছে । সে রাগে নিঝুমের চুলের মুঠি ধরে টেনে,
কাগজ দে !ছিঁড়ে ফেলে তাকে! ছিন্নভিন্ন করে দেয় নিঝুমের স্বপ্নকে!
"না… না… দয়া করে!" বলে নিঝুম বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ে।
কিন্তু কোনো কানেই সে কান্না পৌঁছায় না।না সাবিনা, না হাসনা,কেউ পাশে আসে না।নিঝুম সেই রাতে পড়ে থাকে ঠাণ্ডা মেঝেতে,পেটের ব্যথা নিয়ে।এক ফোঁটা পানি না খেয়ে, সারাদিনের ক্লান্ত শরীরে সে শুধু শুয়ে থাকে,চোখের পাতা এক না করেই ডুকরে কেঁদেছে!
নিঝুম এসব ভাবতে ভাবতেই দেখে কেউ দরজায় কড়া নাড়ছে ! চোখ মুছে ধীরে ধীরে যেতে দেখে !
চলবে ...