ফন্ট সাইজ:
থিম:
ঝরা শিউলির দিনে

৭ম পর্ব

লেখক: তামান্না ইসলাম শিমলা

#ঝরা_শিউলির_দিনে

#পর্ব ৭

#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

রাতের কুমিল্লা মানেই অন্যরকম এক সৌন্দর্যের শহর। শহরের প্রতিটি আনাচে কানাচে সেজেছে আলোতে। রাতের সৌন্দর্য উপভোগ্য হলেও রাস্তা ফাঁকা। আর সেই ফাঁকা রাস্তা ধরে হাই স্পিডে ছুটে চলছে দুটো বাইক। একজন আরেকজনকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে কালো রঙের বাইকটিকে টেক্কা দিয়ে কিছুতেই এগোতে পারছে না পেছনে থাকা হলুদ রঙের বাইকটি। এক পর্যায়ে কালো বাইকে থাকা ব্যক্তিটি বাঁকা হেসে পেছনে তাকাল। হেলমেটের কাঁচের ওপারে থেকে পেছনের বাইকে থাকা ব্যক্তিটিকে দেখে নিল। অতঃপর স্পিড বাড়াল আরো কয়েকগুণ।

বাইকের হ্যান্ডেল থেকে হাত ছেড়ে দিয়ে হাত মেলে দিল। ঝুঁকে গেল পেছনের দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তরভ পেছনে থাকা বাইকের গতি কমে এলো। পরপর কালো বাইকটিরও। অতঃপর পাশাপাশি আসতেই দুজনে আবারো একই সাথে গতি বাড়াল। ফুড জোন ক্যাফেটেরিয়াটা খোলামেলা জায়গায় অবস্থিত। খোলা আকাশের নিচে দারুণ একটা পরিবেশ। আজ সেখানে আয়োজন করা হয়েছে ফুরাদের এক বছরের ছেলের জন্মদিনের আয়োজন করা হয়েছে। আশে পাশে আছে লোকজন ও বন্ধুবান্ধবরা। অল্প বয়সে বিয়ে করে অল্প বয়সেই বাপ হয় গিয়েছে সে। এদিকে তার বয়সী হয়েও একটা প্রেম করতে পারল না জাওভান।

আফসোস নিয়ে সে বারবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। পরমুহূর্তেই কারো কথা মাথায় আসতেই প্রচন্ড বিরক্ত বোধ করছে। শুভ্র মুখটা কুঁচকে নিচ্ছে। ফোনটা দেখছে বারবার। সাথে মেজাজ গরম হচ্ছে। ঠিক এমন সময় দূর থেকে দুটো বাইকের শব্দ ভেসে এলো। ছিন্ন করল নীরবতা। হেডলাইটের আলোতে মুহূর্তেই কেটে গেল অন্ধকার। পরপর আলোর বেগে দুটো বাইক এসে থামল ঠিক তার সামনে। একটি বাইকে এক নারী অবয়ব, অপরটিতে একজন ছেলে। কাওয়াসাকি নিনজা জেড-এক্স-টেন-আর বাইকটির দেখা মিলতেই জাওভানের অপেক্ষার অবসান ঘটল। বাইকে বসা ব্যক্তিটি ধীরে ধীরে হেলমেটের গ্লাসটা উপরে তুলল। তৎক্ষনাৎ দৃশ্যমান হলো তার সবুজ রাঙা চোখজোড়া। অন্ধকারেও তীক্ষ্ণভাবে জ্বলছে তার আঁখি পল্লব। জাওভান হন্তদন্ত পায়ে এগিয়ে এলো বাইকের সামনে। বিরক্তিকর স্বরে আওড়াল,

“কী রে ভাই? এত লেইট কেন করলি? আধা ঘন্টা ধরে বসে আছি আমি! ফুরাদ ওর ছেলেকে কেকও কাটতে দেয়নি তোদের জন্য।”

বাইকে বসে থাকা ব্যক্তিটি আর কেউ নয়, বরং আভিয়ান। আর জাওভান তারই বেস্ট ফ্রেন্ড। আভিয়ান এক পলক জাওভানের দিকে তাকিয়ে ধীরে হেলমেট খুলল। মুহূর্তেই কপালে এসে পড়ল এলোমেলো চুলগুলো। হাত উঠিয়ে চুল গুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিল সে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে আঁড়চোখে দেখল আশপাশটা। আভিয়ানের কাঠকাঠ মুখশ্রীতে গম্ভীর ভাব। এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা যাচ্ছে না তার মুখাবয়বের প্রতিক্রিয়া।

আভিয়ান হেলমেটটা খুলেই ছুঁড়ে মারল জাওভানের দিকে। নেমে দাঁড়াল বাইক থেকে। একগুচ্ছ আলোকরশ্মি এসে পড়ল তার মুখের উপর। আভিয়ানের চেহারার গঠন পুরোপুরি ভিন্ন। বাঙালীদের মতো নয়। তার চেহারায় ইউরোপীয়ান গ্রিক গডদের মতো অভিজাত মাধুর্যতা আছে। তার গড়ন এতটাই নিখুঁত যে মনে হয় কোনো শিল্পীর করা নিখুঁত কোনো কারুকাজ। তীক্ষ্ণ চোয়াল, উচ্চ নাক, হালকা বক্র ভ্রু। সবকিছু সুচারু, চোখ সরানো কঠিন। আভিয়ানের শরীরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হচ্ছে তার চোখ। তার সবুজ রঙের চোখ। আর সেই চোখ দুটো বর্তমানে গভীর ভাবে প্রকাশ করছে তার গম্ভীর মনোভাব। জাওভান এগিয়ে এলো আভিয়ানের দিকে।

“এত লেইট কেন করলি?”

আভিয়ান কোনো জবাব দিল না। হাতের গ্লাভস খুলে শপিং ব্যাগটা হাতে নিল। এগিয়ে গেল অনুষ্ঠানের ভেতর। লোক সমাগম একদমই পছন্দ না তার। তবুও কিছু করার নেই। আভিয়ানকে দেখেই ফুয়াদ সবাইকে ছেড়ে ছুটে এলো তার কাছে। জড়িয়ে ধরল তাকে।

“এত দেরি কেন করলি? কয়টা বাজে আসতে বলেছিলাম?”

আভিয়ান প্রতিক্রিয়া দেখাল না। বরং ব্যাগটা এগিয়ে দিল,

“দ্যাটস ফর ইয়্যুর সান।”

“দেন গিভ ইট টু হিম।”

“ইট্‌স ভেরি ক্রাউডেড দেয়ার।”

এ কথা শুনে ফুয়াদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ব্যাগটা নিজেই হাতে নিল।

“উইশও জানাবি না?”

আভিয়ান পকেট থেকে ফোনটা বের করল। সময় দেখল। আটটার কাছাকাছি। দৃষ্টি স্থির রেখে জবাব দিল,

“আমি উইশ করলে কি তোর ছেলে দু বছর বেশি বাঁচবে?”

ফুয়াদ চোখ মুখ কুঁচকে নিল। বাহুতে আঘাত করে বলল, “তুই আর শুধরালি না।”

আভিয়ান আগের ন্যায় জবাব দিল,

“আমার তরফ থেকে উইশটা তুই-ই করে দিস।”

হাসলো ফুয়াদ। বলল,

“আচ্ছা বস। যা বলবি তাই। এখন গিয়ে বস যা, একদম যাবি না।”

“আই ডোন্ট হ্যাভ টাইম।”

আভিয়ানের তৎক্ষনাৎ জবাবে অসন্তুষ্ট হলো ফুয়াদ। চোখ রাঙিয়ে বলল,

“চুপচাপ বস। আই ডোন্ট হ্যাভ টাইম।”

কথাটা ভেঙিয়েই বলল সে। পরমুহূর্তে একটি খালি টেবিল দেখিয়ে বলল,

“ওখানে গিয়ে বস। আমি স্টাফদের পাঠাচ্ছি।”

আভিয়ান কিছু বলতে নেবে তার আগেই ফুয়াদ করুন স্বরে বলে উঠল,

“প্লিজ ভাই, ত্যাড়ামি করিস না। তোর ত্যাড়ামি সামলানোর ক্ষমতা আমার নাই, এমনিতেই বউ-এর ত্যাড়ামি সামলাতে সামলাতে অবস্থা টাইট। বস, কেক আনছি। ওটা অন্তত খেয়ে যা।”

আভিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গমগমে স্বরে জবাব দিল,

“অনলি ফাইভ মিনিটস।”

“এনাফ ফর মি।”

বলেই দৌড় লাগাল ফুয়াদ। আভিয়ান ফোন হাতে নিয়ে এসে বসল খালি টেবিলে। এদিকে মানুষজনের ভির কম। সব স্টেজের কাছেই জড়ো হয়েছে। ততক্ষণে দ্বিতীয় বাইকে থাকা নিদ্রাও নেমে এসেছে। অর্থাৎ আভিয়ানের সাথে আসা অপর বাইকে থাকা ব্যক্তি। হেলমেট খুলতেই তার চুলগুলো ঢেউ খেলিয়ে নেমে এলো কাঁধে। শ্যামলা বর্ণের রমণীর মুখশ্রীতে বিদ্যমান এক অপরূপ আকর্ষণ। চিকনচাকন শরীরের রমণীর চোখ জোড়া শান্ত। হেলমেটটা আঙুলে ঝুলিয়ে এগিয়ে গেল আভিয়ানের কাছে। জাওভান পিছু ডাকল,

“নিদ্রা?”

নিদ্রা যেতে যেতে শব্দ করল,

“শুনছি।”

জাওভানও পা চালিয়ে এগিয়ে এলো। দু'জনেই বসল আভিয়ানের পাশে। জাওভান এক পলক দেখে নিল ফোনের মনোযোগী আভিয়ানকে। পরমুহূর্তে নিদ্রার দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“তোরা এক সাথে কী করে? রাস্তায় দেখা?”

নিদ্রা পায়ের উপর পা তুলে বসল। জ্যাকেটটা খুলে ভেতরে থাকা শার্টটা ঠিক করতে করতে বলল,

“বাসায় দেখা।”

জাওভান চোখ মুখ কুঁচকে নিল।

“বাসায় মানে? কার বাসায়?”

“আভির।”

“হোয়াট!”

জাওভান চট করে তাকাল আভিয়ানের দিকে। তার কোনো হেলদোল নেই। সে ফোন স্ক্রল করতে ব্যস্ত। নিদ্রা এক পলক আভিয়ানের দিকে তাকিয়ে তারপর জাওভানের দিকে তাকাল।

“আভি আসা তো দূর, ও বাড়িতে ঘুমাচ্ছিল। আমি যাওয়ায় গিফ্টটাও আমার হাতে ধরিয়ে দিচ্ছিল বদমাইশটা। আমি জোড় করে তুলে নিয়ে এসেছি।”

মুহূর্তেই মুখটা বিকৃত করল জাওভান। আভিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ইয়্যু আর সো ডিজগাস্টিং, আভি।”

আভিয়ানের তরফ থেকেও তৎক্ষনাৎ জবাব এলো,

“দেন হুয়াই আর ইয়্যু টকিং টু মি?”

“বিকজ আই'ম ডিজগাস্টিং টুউউউ।”

জাওভানের জবাবে ফিক করে হেসে উঠল নিদ্রা। আঁড়চোখে তার দিকে তাকাল আভিয়ান। নির্লিপ্ত তার মুখভঙ্গি। এমন সময় ফুয়াদ কেক নিয়ে এলো সবার জন্য। বসল তাদের সাথেই। ফুয়াদকে দেখেই নিদ্রা খোঁচা মেরে বলল,

“বিয়ের পর তো তোর খোঁজ খবরই নেই। এখন আসছে দাওয়াত করে খাওয়াতে।”

ফুয়াদ হাসলো। আসলেই তার খোঁজ থাকে না। সংসারটা তো মুখের কথা না। কত শত দায়িত্বের ভিরে সময়ই হয়ে ওঠে না বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেওয়ার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“তোরা বিয়ে শাদি কর, তখন বুঝবি কেন যে খোঁজ নেওয়ার ফুরসত মেলে না।”

জাওভান হাত রাখল ফুয়াদের পিঠে। বলল,

“আমাদের চারজনের সার্কেলটা কত সুন্দর ছিল বল? মাঝ থেকে তুই একদমই নাই হয়ে গেলি।”

ফুয়াদ আবারো দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“সময় সবকিছুই পরিবর্তন করে ফেলে। যাইহোক, তোরা তো আগের মতোই আছিস। রাইড হয় নাকি?”

নিদ্রা জবাব দিল,

“এভরি উইক।”

“দ্যাটস গুড। আমার শরীরে তো জং ধরে গিয়েছে। ভাবছি আবারো যোগ দিতে হবে।”

এ পর্যায়ে ভেসে এলো আভিয়ানের কণ্ঠস্বর,

“মানুষের ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। তোর ইচ্ছে থাকলে মাসের দুটো রাত আমাদের দেওয়াটা কোনো বড় ব্যপার ছিল না। যাইহোক, যার যার বিষয়।”

আভিয়ানের চোখ মুখ গম্ভীর। দৃষ্টি ফোনের দিকেই। ফুয়াদের মনটা খারাপ লাগছে। আসলেই সে চেষ্টা করেনি। আড়াইটা বছর ধরে দু একটা কল ছাড়া সামনা-সামনি যোগাযোগ করেনি। সংসারে একটু বেশিই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তাতে কী? বন্ধুদের তো একটা দিন দেওয়াই যেত। ফুয়াদ হাত বাড়াল,

“প্রমিস ভাই, উইকে না হোক, মান্থে একবার রাইডে যাবই। এইযে পাক্কা প্রমিস। আয় আজ আড়াই বছর পর আবারো হাত মেলাই?”

আভিয়ান চোখ তুলে তাকাল। জাওভান হাত রাখল ফুয়াদের হাতের উপর। তার উপর রাখল নিদ্রা। সকলের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল আভিয়ানের উপর। আভিয়ানের দৃষ্টি সবার হাতের দিকে। অতঃপর চোখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেল তিন জোড়া অসহায় চাহনি। পরপর প্রতিক্রিয়াহীন নিজেও হাত বাড়াল। খুশিতে চেঁচিয়ে উঠল নিদ্রা। সবাই মিলে হাত উঠিয়ে উচ্চারণ করল,

“ফোর মাইনাস জিরো।”

হ্যাঁ, এটাই তাদের ফ্রেন্ডসগ্রুপের নাম ছিল। এমন সময় ডাক পড়ল ফুয়াদের। তার স্ত্রী তাকে ডাকছে। বেচারা বোকা বোকা হেসে বলল,

“একটু আসিরে।”

বলেই দৌড় লাগাল সে। হেসে উঠল জাওভান ও নিদ্রা। ফুয়াদ, আভিয়ান, জাওভান, নিদ্রা চারজনই ছোট থেকে বেস্ট ফ্রেন্ড। ওরা চারজন স্কুল থেকে একই সাথে পড়াশোনা করেছে। তারপর একই সাথে একই ভার্সিটিতে, যদিও বা নিদ্রাকে আলাদা থাকতে হয়েছে। পড়াশোনা শেষ করে সবাই এখন যার যার কাজে ব্যস্ত হলেও তারা তিনজনই যখন তখন হাজির হয়। কেবল বিয়ের পর থেকে ফুয়াদ ব্যতিত। বাকি তিনজনই ছন্নছাড়া, বাঁধা ধরা নিয়মে চলতে পারে না। যদিও আভিয়ান একটু বেশিই ছন্নছাড়া। জাওভান তবুও দায়িত্ব নিয়ে কর্তব্য পালন করছে বাবার বিজনেসে। জাওভান আর আভিয়ানের বাবা বিজনেস পার্টনার ছিল, সেখান থেকেই আভিয়ান আর তার বন্ধুুত্ব। অবশ্য দুজন দুই মেরুর। বলতে গেলে জাওভান চঞ্চল প্রকৃতির ছিল, একপ্রকার বিরক্ত করেই ক্ষান্ত হত। আর সময়ের সাথে সাথে জাওভানের এই আচরণ গুলোই আভিয়ান সহ্য করে নিয়েছে, বন্ধত্ব তৈরি হয়েছিল। যা এখন আরো গাঢ়। ফুয়াদ ছিল চেয়ারম্যানের ছেলে।

আর রইল নিদ্রা, সে একজন গাইনি ডাক্তার। এখনো বিয়ে করেনি সে। নিদ্রার বাবা একজন ডাক্তার, মা জন্মের সময় মারা গেছেন। আর তার ওদের সাথে পরিচয়টা পারিবারিক ভাবেই। আভিয়ানের বাবা সায়ান এহসানের বন্ধ ছিলেন নিদ্রার বাবা নিকোলাস।

আভিয়ান আবারো মনোযোগ দিয়েছে ফোনে। এই অনুষ্ঠানের কোনো কিছুতেই তার কোনো টান কাজ করছে না। এমন সময় হুট করেই মনে পড়ল বিকেলে দেখা হওয়া ওই বাচ্চাটির কথা। কী যেন নাম? হ্যাঁ, পিহু। নোপ, লিটেল কিটেন! পিহুর বলা কথা গুলো মনে পড়তেই আনমনে হেসে উঠল আভিয়ান। তাকে এভাবে হঠাৎ হাসতে দেখে অবাক হলো জাওভান ও নিদ্রা। এই ছেলে তো হাসির কথা শুনেও হাসে না, আজ কী হলো এর? এভাবে হাসছে কেন? কৌতুহল দমাতে পারল না জাওভান। প্রশ্ন করে বসল,

“কী রে? হাসছিস কেন একা একা?”

ক্ষীণ হাসির প্রলেপ অধর ছাড়ল না আভিয়ানের। ওভাবেই জবাব দিল,

“একজনের কথা ভেবে।”

দু'জনেই বিস্ময় নিয়ে তাকাল আভিয়ানের দিকে। চোখ জোড়া বড়ো বড়ো হয়ে গিয়েছে দুজনেরই। সুর টেনে বলল,

“একজনের কথা ভেবে?”

মুহূর্তেই চোয়াল শক্ত হলো আভিয়ানের। জাওভানের কোল থেকে হেলমেটটা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। মাথায় পরতে পরতে এগোলো বাইকের কাছে। যেতে যেতে বলল,

“ইডিয়েট।”

আভিয়ান ততক্ষণে বাইকে উঠে বসেছে। বাইক স্টার্ট দিচ্ছে। নিদ্রা ডাকল,

“এই কোথায় যাচ্ছিস?”

আভিয়ান বাইক ঘোরাল ধুলো উড়িয়ে। লুকিং মিররটা ঠিক করে গ্লাভস পরে নিল। ছোট্ট করে জবাব দিল,

“রাইডে।”

মুহূর্তেই উঠে দাঁড়াল জাওভান। সাথে নিদ্রাও। দৌড় লাগাল নিজেদের বাইকের দিকে।

“আমরাও যাব।”

জাওভানের কথাটা আভিয়ানের কানে এলো। বাইক ছুটল তার। যেতে যেতে পেছনে ফেলে রাখা জাওভান ও নিদ্রাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“টেক ইট গ্রাউন্ডে চলে আয়।”

বলেই গতি বাড়াল সে। জাওভান আর নিদ্রাও পরপর বাইক স্টার্ট দিল। গতি বাড়িয়ে ধরার চেষ্টা করল আভিয়ানকে। অথচ তারাও জানে, আভিয়ানকে আর দৃষ্টিসীমানায় দেখা যাবে না। উল্টো দেখার ইচ্ছে জাগলে জমের দোয়ারে গিয়ে পড়তে হবে। কারণ এই ছেলে পিছুটান ফেলে রেখে ছুটে বেরায় নিজ গতিতে। সামনে পেছনে তাকানোর সময়টাও নেয় না। আজও যে ব্যতিক্রম হবে না। তাই করল। আভিয়ান হাইস্পিডে উঠে এলো হাইওয়েতে। একহাতে ফোনটা বের করে স্পটিফাই অন করল। ইয়ারপট লাগিয়ে ফুল ভলিউমে গান ছাড়ল। নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল আভিয়ান, বাইকের স্পিড মাত্রা ছাড়াল। সাথে খোলা রাম্তায় গলা ছেড়ে গাইল নিজেও,

“Blessings, the fire, inside you, I see you

You cannot hide from me, baby, I'll be you

We got hooked, that was just a preview

We had a taste, and now I can't leave you

Yo no sé mucho, pero te siento

Allá en el fondo, en mis adentros

Algo me dice que yo estoy en lo correcto

Que mi estrógeno requiere de tu testo”

—---

রাত অনেকটা গড়িয়েছে। নতুন শহরের রাত যেন একটু বেশিই নীরব। না আছে পরিচিত কোলাহল, না আছে চেনা জানা শব্দ। কিছুটা হলেও অন্যরকম লাগছে অপরূপার। কখনো তো এমন একা থাকা হয়নি। তাও একটা নতুন শহরে। একটু তো ভয় জাগা স্বাভাবিক। অপরূপা পিহুকে খাইয়ে নিজ হাতে হাত মুখ ধুয়ে দিয়েছে। জামা পাল্টে ফ্রেশ করিয়ে দিয়েছে, মেয়েটার খুব গরম। বড্ড ঘামে। তাই বডি পাউডার লাগিয়ে দিয়েছে পুরো শরীরে। পিহুও আজ বেশ ক্লান্ত, তবুও চোখে ঘুমের চেয়ে উত্তেজনাই তার বেশি। অপরূপা পিহুকে বিছানায় বসিয়ে নেমে দাঁড়াল। বলল,

“তুমি এখানে বসো, আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি, ঠিক আছে?”

অপরূপা মৃদু স্বরে বলল। পিহু মাথা নাড়ল ঝটপট। জবাব দিল,

“আচ্চা, দুত্ত আসবে।”

অপরূপা হাসল মেয়ের আধো আধো বাক্যে। বলল,

“হু, দ্রুতই আসব।”

বলেই পা চালিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল সে। পিহু বিছানায় বসে পাজেল সল্ভ করছিল। হুট করে তার মনে পড়ল ইয়ানের কথা। ইয়ানের দেওয়া সেই খেলনা বাইকটার কথা। সেটা তো তার মাম্মাকে দেখানোই হয়নি। কোথায় রেখেছ সে? মনে করার চেষ্টা করল পিহু, পরমুহূর্তেই মনে পড়ল। খেলনাটা সে টেবিলের উপর রেখেছে। পিহু নামল বিছানা থেকে। টেবিলে খুঁজে খেলনাটা হাতে নিল।

এমন সময় তার চোখ গেল বারান্দা দিয়ে ওই মাঠটার দিকে। বাজি ফোটানো হচ্ছে। আকাশে উঠে ছড়াচ্ছে রঙ বেরঙের আলো। কৌতুহল জন্মাল পিহুর ছোট্ট মস্তিষ্কে। গাড়িটা হাতে নিয়েই সে এগিয়ে গেল বারান্দায়। রেলিং এর গ্রিল ধরে বাইরে তাকাল। মাঠের চারপাশে অনেক গুলো লাইট জ্বলছে। তাই পুরোটাই স্পষ্ট। পিহু চোখ ছোট ছোট করে তাকাল নজরে পড়ল এত বড় মাঠের মাঝ বরাবর কেবল তিনটি বাইক ও তিনজন ব্যক্তিকে। যাদের মাঝে একজন বাইকে হেলান দিয়ে ফোন দেখছে। আর দু'জন এই বাজি গুলো ফোটাচ্ছে।

এত দূর থেকে সবই অস্পষ্ট ঠেকল পিহুর কাছে। তবে ঝারবাতির ন্যায় বাজি গুলো যখন আকাশ রাঙালো তখনই তার চোখ মুখ উজ্জ্বল হলো। ইচ্ছে করল তারও যেতে। কিন্তু তার মাম্মা তও তাকে কখনোই এই রাতে নেবে না। রাত তো প্রায় এগারোটার বেশি। মানুষজন মাঠে নেই। বরং মাঠের পাশ ঘেঁষে চলা রাস্তা দিয়ে দু একজন মানুষ নিজের গন্তব্যে ছুটছে। ইতোমধ্যে হাত মুখ ধুয়ে মুখটা মুছতে মুছতে বেরিয়ে এসেছে অপরূপা। রুমে ঢুকতেই থমকে গেল সে। পিহু ঘরে নেই দেখে মুহূর্তেই বুকটা ধুক করে উঠল। ডাকল,

“পিহু?”

চারদিকে তাকাল অপরূপা। কোনো সাড়া নেই। বাইরে থেকে আতসবাজির শব্দ কানে আসতেই আন্দাজ করে নিল কিছু একটা। দ্রুত বারান্দার দিকে এগোল।

গিয়ে দেখল পিহু বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

হাতের মাঝে একটা ছোট্ট খেলনা গাড়ি। সেটাই নিয়ে খেলছে আর আকাশ দেখছে। একটুও ভয় পাচ্ছে না এই শব্দে। অপরূপার বুকের ভেতর চলা ধুকপুকুনি কমল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল পিহুর কাছে।

“এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”

পিহু ঘুরে তাকাল।

“মাম্মা! মাম্মা দেকো ওরা আকাশে বাতি জ্বালা করছে।”

আঙুলের ইশারায় দেখাল পিহু। আরেকটা এগিয়ে এলো অপরূপা। বলল,

“তোমাকে না আমি বসতে বলেছিলাম?”

পিহু তার হাতে থাকা গাড়িটা দেখাল। জবাব দিল,

“এতা নিতে এসেছিলাম তো।”

অপরূপা অবাক হলো। একটু ঝুঁকে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

“এটা কোথায় পেয়েছো?”

পিহু গর্বিত মুখে বলল,

“ইয়ান দিয়েছে!”

অপরূপা ভ্রু তুলল,

“ইয়ান?”

পিহু মাথা নাড়ল জোরে জোরে,

“হুঁ! ইয়ান!”

“এই ইয়ান কে?”

পিহু হাসল,

“ইয়ান পিহুর ফ্রেন্ড। ওইযে তোমাকে বললাম না?”

অপরূপা মৃদু চোখ মুখ কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো,

“ফ্রেন্ডস তো বুঝলাম, কিন্তু কে সে?”

পিহু একটু থেমে গেল। মুখটা কেমন ছোট হয়ে গেল। জবাব দিল,

“জানি না তো।”

অপরূপা খেলনাটা হাতে নিল। বড্ড অবাক হলো। এটা বেশ ভারি। আলোর দিকে নিতেই চমকে উঠল। দেখে তো বেশ দামিও মনে হচ্ছে। এই দামি জিনিসটা কে তার মেয়েকে দিল? কেনই বা দিল? কে এই ইয়ান? নানা রকম প্রশ্নের জট বাঁধল অপরূপার মস্তিষ্কে। মায়ের মনে যে কত শত চিন্তা ঘোরে তার হিসেব নেই। ততক্ষণে পিহু খেলনাটা আবার নিজের কাছে নিয়ে নিয়েছে। গাড়িটা আবার চালানোও যায়। পিহু চাকা ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,

“ইয়ানের সাতে আবার দেকা হলে তোমাকেও দেকা করিয়ে দেবনি!”

অপরূপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেয়েটা কত সহজেই মানুষকে আপন করে নেয়। আর এই পৃথিবীটা যে কতটা জটিল, সেটা তো সে জানেই না। সে আলতো করে পিহুর মাথায় হাত রাখল,

“চলো, এখন ঘুমাবে। অনেক রাত হয়েছে।”

পিহু চোখ বড় বড় করে বলল,

“একনই ঘুমু করব?”

“হ্যাঁ, রাত হয়ে গেছে।”

“আরেত্তু থাকি?”

“উহু।”

“আরেত্তু পিলিজ?”

এই পাকা মেয়েটা যদি এভাবে বায়না করে তবে কি মানা করা যায়? অপরূপা দু'দিকে মাথা দুলিয়ে বলল,

“মাম্মার ঘুম পাচ্ছে, আমি গেলাম।”

পিহু একটু ভেবে মাথা নাড়ল। বলল,

“আচ্চা। তুমি ঘুমু করো।”

পিহুর এমন জবাব আশা করেনি অপরূপা। মুহূর্তেই কপালে ভাজ পড়ল। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“এই পাকা বুড়ি, একা একা থাকবে তুমি? সাহস তো কম না!”

পিহু যেন খুশি হলো। খুব গর্ববোধ হলো তার। হেসেই বলল,

“হুঁম তো, পিহু তো ব্রেভ গাল।”

“ওরে আমার ব্রেভ গার্ল, আসুন এবার ঘুমাবেন। না-হয় এবার পিট্টি দেব পিট্টি।”

পিহু তৎক্ষনাৎ জবাব দিল,

“মাম্মা গুড গাল, মাম্মা পিত্তি দেয় না।”

“খোদা! এই মেয়ে এত্ত কথা শিখেছে কই থেকে!”

নিজের কপালে নিজেই চাপড় দিল অপরূপা। তা দেখে পিহু স্বাভাবিক ভাবেই জবাব দিল,

“নানুমনির থেকে শিকেছি। নানুমনি অনেক কথা বলে। এত্তগুলা কথা বলে।”

“তুমিও নানুমনি ভার্সন টু হচ্ছো।”

“না না, ফতোকপি হচ্ছি।”

“ইস!”

“হিহি।”

হেসে ফেলল অপরূপা। পিহুও হাসছে। কোলে তুলে নিয়ে বলল,

“ওরে দুষ্টু মেয়ে, এবার ঘুমাবেন। একদম দুষ্টুমনি করবেন না।”

পিহু গলা জড়িয়ে ধরল অপরূপার। কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে বলল,

“আচ্চা।”

এমন সময় উচ্চশব্দে একটি বাজি ফাটল। কানে তালা লেগে যাওয়ার মত শব্দ হলো। অপরূপা সহ পিহুও চমকে উঠেছে। দুজেই একসাথে তাকাল মাঠের দিকে। বাজি ফাটানো ব্যক্তি দু'জন দ্রুত বাইকে উঠে বসছে। তাদের দিকে ইট ছুড়ছে অপরজন। পরপর লাল ও হলুদ রঙের বাইকটা ছুটে গেল। রয়ে গেল কালে রঙের বাইকটা। লোকটা নিজেও বাইকে চাপল। হেলমেট পরে থাকায় দেখতে পেল না অপরূপা। এমনিতেও এত দূর থেকে চশমা লাগিয়েও দেখা যেত না। পরপর হাই স্পিডে কালো রঙের বাইকটা মাঠ থেকে প্রস্থান করতেই বিরক্তিতে মুখটা বিকৃত হলো অপরূপার। বিড়বিড় করে আওড়াল,

"সিরিয়াসলি! হোয়াট ইজ রং উইথ দেম?"

_______

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন