#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৮
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা
_______________________
অন্যান্য দিনের তুলনায় আজকের সকালটা অন্যরকম। আজ অফিসে প্রথমদিন অপরূপার। জানালা পর্দা ভেদ করে ঢুকে পড়া নরম আলোটা চোখে লাগছে না খুব একটা, বরং ছুঁয়ে যাচ্ছে কোমলতা। সেই আলো এসে পড়েছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অপরূপার ওপর। তার সামনে খোলা আলমারি। ভেতরে যত্ন করে গুছিয়ে রাখা শাড়িগুলো। আজ তার পরনে চুড়িদার। তাও অনেক গুলো বছর বাদে পরেছে। কাপড়টা শরীরে লেগে থাকতে না থাকতে অদ্ভুত এক অস্বস্তি জেগে ওঠল অপরূপার মনে। যেন নিজেকে নিজেরই মধ্যে ঠিকভাবে খুঁজে পাচ্ছে না।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নিজের দিকে তাকিয়ে রইল সে। চোখে তার বিস্ময়। এটা কি সত্যিই সে? চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ, ঠোঁটে কোনো রঙ নেই, তবুও পরিপাটি ভাবটা আছে। তার কাছে নিজেকে কেমন অদ্ভুত ঠেকছে। ভাবল বদলাবে কি-না? পরমুহূর্তেই ভাবল যেখানে যা চলে! কিন্তু যুক্তি সবসময় মনকে শান্ত করতে পারে না। একটু অস্থির হয়ে অপরূপা আবার আলমারির দিকে ফিরে গেল। হাত গিয়ে থামে একটা সবুজ শাড়ির ওপর। আর কিছু না ভেবেই শাড়িটা নিয়ে গায়ে জড়াল। সে এটাতেই সাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।
আয়নার সামনে দাঁড়াতেই এবার আর কোনো দ্বিধা নেই তার মনে। এই সে। এটাই সে। চেনা, স্বস্তির, নিজের মতো করে গড়া একজন নারী। অপরূপার ঠোঁটে ফুটে ওঠেল হাসির রেখা। এখনো ঘুমিয়ে আছে পিহু। ছোট্ট শরীরটা কম্বলের মধ্যে গুটিয়ে আছে। তার নিশ্বাসের ওঠানামার গতি নজরে পড়ল অপরূপার।
অপরূপা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে মেয়ের দিকে। এই ছোট্ট মানুষটাই তার সবকিছু। সে ধীরে কাছে গিয়ে বসে পড়ল পিহুর মাথার কাছে। মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিল।
মেয়েটাকে প্রথম দিনই নিয়ে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? যদিও অনুমতি তো আছেই, তবুও কেমন একটা লাগছে তার। পিহু একটু নড়ে চড়ে ওঠতেই অপরূপার ধ্যান ভাঙে। মুখ কুঁচকে ফেলে নড়া চড়া করছে মেয়েটা। সময় নেই খুব একটা। পিহুকে খাইয়ে রেডিও করতে হবে। এখন নক ওঠালে সমস্যা। অপরূপা কিছুটা ঝুঁকল মেয়ের দিকে। ডাকল,
“পিহু, সোনা মা।”
পিহু চোখ আধখোলা করে তাকায় মায়ের দিকে। পিহু গুমরে ওঠে, মাথা নেড়ে আবার কম্বলের ভেতর ঢুকে যায়। অপরূপা মৃদু কণ্ঠে আবার ডাকে,
“আজ কিন্তু মাম্মার অফিস আছে। তুমি যাবে না সাথে? ওঠো সোনা, দ্রুত করতে হবে।”
অফিস আছে কথাটা কর্ণকুহর হতেই পিহু ধীরে ধীরে কম্বলের থেকে মুখটা বের করে তাকাল। চোখে তার কৌতূহল। ঘুমু ঘুমু কণ্ঠে শুধালো,
“অপিস?”
অপরূপা মাথা নাড়ে। জবাব দেয়,
“হুঁ। ভুলে গিয়েছ?”
পিহুর চোখ জোড়া উজ্জ্বল হলো। উঠে বসল বিছানায়,
“পিহুর মনে আছে।”
“তাহলে ওঠো। ফ্রেশ হবে চলো।”
মায়ের কথায় দুদিকে মাথা দুলায় পিহু। অপরূপা আর সময় নষ্ট করল না। সে দ্রুত পিহুকে নিয়ে তৈরি করাল। সাদা রঙের একটা ফ্রক পরিয়ে চুল গুলো দুটো ঝুঁটি তরে দিল। একপলক সময়টা দেখে নিল ঘড়িতে। পিহুর হাতে তখন তার ইয়ানের দেওয়া বাইকটা। অপরূপা ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছাতে গোছাতে পিহুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ওটা রেখে যাও, হারিয়ে ফেলবে না-হয়।”
পিহু শুনল না। উল্টো বলল,
“না, আমি এতা নিয়ে যাব।”
“কথা শুনো পিহু।”
দু'দিকে মাথা দুলিয়ে না করল পিহু। অডরূপার সাইডব্যাগের চেইনবেল্টের সাথে লাগিয়ে দিল নিজেই। হেসে বলল,
“একন এতা আর হারাবে না।”
অপরূপা মেয়ের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর কথা বাড়াল না। বের হতে হবে তাদের। পিহুর হাত ধরে হাঁটা ধরল। বলল,
“হয়েছে, চলো এবার।”
পিহুও আর কথা বাড়াল না। অতঃপর দু'জনেই বের হলো অফিসের উদ্দেশ্যে। বাসা থেকে অফিসের দূরত্বটা খুব বেশি না। অতঃপর তারা পৌঁছাল গন্তব্যে। পরপর পিহুকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল অপরূপা।
ফোনের রিংটোন কানে আসতেই অপরূপা একটু থামল। ফোনটা বের করে কল রিসিভ করল। ওপাশে আমেনা বেগম।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পিহু কৌতূহলী চোখে চারপাশ দেখছে। তার কাছে সবকিছুই নতুন, সবকিছুই আকর্ষণীয়। অপরূপাও কথা শেষ করে চলে এলো সিক্সথ ফ্লোরে। আশে পাশে মানুষ নেই তেমন। এই ফ্লোরে কর্মরত সকলেরই নিজস্ব কেবিন আছে। তারা তাদের কাছে ব্যস্ত। রিসিপশন পার হতেই নজরে পড়ল ম্যানেজার অভ্রকে। সেও অপরূপাকে দেখে এগিয়ে এলো তার কাছে। অপরূপার উপস্থিতি আগের মতোই স্থির, স্বাভাবিক। অভ্র অপরূপার দিকে তাকিয়ে সৌজন্যতার সহিত উচ্চারণ করল,
“গুড মর্নিং।”
অপরূপা মাথা নোয়ায়। জবাবে বলে,
“গুড মর্নিং।”
পিহু তার আঁচল আঁকড়ে ধরে আছে। অভ্র লোকটা বেশ পরিপাটি গোছগাছ। ফরমাল পোশাকে লোকটা বলতে গেলে সুদর্শনও বটে। অভ্রের নজর পড়ল পিহুর উপর। সে হেসে নিচু হয়ে পিহুর দিকে তাকায়।
“তুমি পিহু, তাই না?”
পিহু একটু ইতস্তত করে মাথা নাড়ে। অভ্রের চোখজোড়া উজ্জ্বল হলো। জিজ্ঞেস করল,
“তুমিও তবে কাজে বসে পরো।”
পিহু তৎক্ষনাৎ জবাব দিল,
“আমিই তো করব কাজ, পিহু সব কাজ করতে পারে।”
“আচ্ছা?”
“হুম।”
উপর-নিচ মাথা দুলাল পিহু। অপরূপা এদিক ওদিক তাকিয়ে শ্বাস টানল। অভ্রকে প্রশ্ন ছুড়ল,
“স্যার, আমার কী করতে হবে এখন?”
অভ্র সোজা হয়ে দাঁড়াল। অপরূপার দিকে তাকিয়ে বলল, “স্যার এখনো আসেননি। আজ একটু দেরি হবে মনে হচ্ছে। সে যা-ইহোক, আমাকে স্যার বলার প্রয়োজন নেই। অভ্র বলেই ডাকতে পারেন।”
অপরূপা মাথা নাড়ে। সৌজন্যমূলক হেসে বলে,
“আচ্ছা। তবে এখন কী করব?”
“আপাতত রিসিপশনে গিয়ে বসুন। বা আপনার সমস্যা না থাকলে আমার কেবি….”
পুরো বাক্য শেষ করতে পারল না অভ্র। হঠাৎ করেই অফিসের শান্ত পরিবেশ ভেঙে দৌড়ে আসে একটা মেয়ে। পরনে তার জিন্স ও কুর্তি। গলায় ওড়না ঝুলানো। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, চুল গুলোও ছাড়া। মেয়েটার দিকে নজর পড়ল অপরূপার। দেখতে বেশ মিষ্টি। চোখে মুখে প্রাণচাঞ্চল্য, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে দৌড়াতে দৌড়াতে। সে এসে থামে অভ্রের সামনে।
“স্যার! আমি কি লেইট হয়ে গেছি? স্যরি স্যার, আসলে খুব জ্যাম ছিল।”
তার কণ্ঠে অস্থিরতা। প্রতিদিনই দেরি করে আসাটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছে তার। বকাও তো খেতে হয়। অভ্র দীর্ঘশ্বাস পেলল তার দিকে তাকিয়ে। বলল,
“না, আজ তুমি লেইট করোনি।”
মেয়েটার মুখে যেন সাথে সাথে স্বস্তি নেমে এলো।
“উফ! আমি তো ভেবেছিলাম আজও ঝাড়ি খেতে হবে! যাক বাঁচা গেল।”
মেয়েটার নাম ইধিকা ফওজিয়া। এই সেক্টরের সবচেয়ে ছোট সদস্য। ইধিকার নজর পড়ল অপরূপা আর পিহুর দিকে। কৌতূহল ঝলমল করে ওঠল তার চোখ জোড়া। অভ্রের অসমাপ্ত বাক্য আর সমাপ্ত হলো না। উল্টো এবার ইধিকাকে বলল,
“ইধিকা, উনি অপরূপা৷ কোম্পানির নতুন সদস্য, অর্থাৎ তোমাদের কলিগ। আপাতত তোমার কেবিনে বসাও। স্যার আসলে ডেকে নেব।”
ইধিকার চোখ মুখ উজ্জ্বল হলো। নতুন মানুষ মানেই নতুন গল্প, আর এটা তার জন্য আনন্দের বিষয়। সে দু'দিকে মাথা দুলাল,
“ওকে স্যার!”
অতঃপর অপরূপা ও পিহুকে নিয়ে এলো নিজের কেবিনে। ইধিকার কেবিনে ঢুকতেই পরিবেশটা বদলে গেল।
“আপু, আপনি বসুন।”
অপরূপা কথাটা বলেই ইধিকা গিয়ে বসল নিজের ডেস্কের সামনে। অপরূপাও বসল পিহুকে কোলে নিয়ে। পিহুও চারপাশে তাকিয়ে দেখছে সবটা। ইধিকা অপরূপার দিকে ঘুরে বলল,
“আমি ইধিকা!”
অপরূপা মৃদু হেসে বলে,
“আমি অপরূপা।”
ইধিকা পিহুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আর এই ছোট্ট মানুষটা?”
পিহু একটু গম্ভীর হয়ে বলে,
“আমি ছোট না, আমি পিহু।”
ইধিকা হেসে ওঠে।
“ওকে! পিহু ম্যাডাম!”
পিহুর মুখে খুশির ছাপ স্পষ্ট। ইধিকাও হাসে। ইধিকা চেয়ার টেনে এগিয়ে বসে, তার মনযোগ পুরোটা পিহুর দিকে। অপরূপার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ওর বয়স কত আপু?”
অপরূপা হাসি মুখে জবাব দিল,
“চারবছর পড়বে সামনে।”
“বাহ, কী মিষ্টি হয়েছে। একদম আপনার মত।”
অপরূপা মৃদু হাসে। তার অস্বস্তি হচ্ছে। কাজে ব্যস্ত থাকলে হয়তো এমন লাগত না। কৌতুহলী ইধিকক অপরূপাকে আবারো প্রশ্ন করল,
“ওর বাবা কী করে?”
মুহূর্তেই চমকে ওঠে অপরূপা। বুকটা কেমন ব্যথিত হলো তার। কথা আঁটকে এলো। নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই পিহু মন খারাপ করে বলল,
“আমার পাপা স্টার হয়ে গিয়েছে।”
ইধিকা অস্বস্তিতে পড়ল নিজেও। ইস কেন জিজ্ঞেস করতে গেল? সে অপরাধী মুখ করে বলে উঠল,
“স্যরি আপু, আসলে বুঝতে পারিনি। এক্সট্রিমলি স্যরি, প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড।”
অপরূপক নিশ্চুপ। সে কেন এমন অস্বস্তি বোধ করবে? সব তো অনেক আগেই ফেলে এসেছে। তা নিয়ে অস্থিরই বা কেন হবে? পরমুহূর্তেই নিজ অধরে হাসি ফোটাল সে। ইধিকাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ইটস ওকে, আই ডিড্ন্ট মাইন্ড।”
অপরূপার জবাবে ইধিকার হাসি খুশি ভাবটা ফিরে এলো। চশমাটা ঠিকঠাক করে শুধালো,
“কিছু মনে না করলে জানতে পারি আপনার হাসবেন্ডের কী হয়েছিল? আর কবে…”
পুরো প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই অপরূপা অতি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জবাব দিল,
“হি’স অ্যলাইভ, বাট দেয়ার’স নাথিং লেফট বিটুইন আস। উই’আর ডিভোর্সড।”
চমকাল রমণী। চকিত নয়নে চেয়ে রইল অপরূপার দিকে। পরপর তাকাল পিহুর দিকে। বাচ্চা একটা মেয়েকে নিয়ে ডিভোর্স! ইস! চঞ্চল রমণীর আরো কৌতুহল বাড়ল জানার। তবে জিজ্ঞেস করাটা নিশ্চয় দৃষ্টিকটু হবে। কারণ তারা তো পূর্ব পরিচিতও নয়। ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস না করাটায় বোধহয় ভালো।
ইধিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পিহুর দিকে তাকিয়ে হাসল। গাল টেনে দিয়ে ব্যাগ থেকে কিটক্যাট বের করে এগিয়ে দিল পিহুর দিকে। পিহু খুশি হলো। এমন সময় ডাক এলো অপরূপার। অভ্র জানাল স্যার এসেছে। অপরূপা পিহুকে নিয়ে যাবে কি-না যাবে না এটাই ভাবছে। যদি বিরক্ত বোধ করে? এ কথা ভেবেই পিহুকে ইধিকার কাছে রেখে ইধিকাকে বলল,
“একটু রাখো হ্যাঁ? ও তোমায় বিরক্ত করবে না।”
ইধিকা হাসি মুখে জবাব দিল,
“আরে আপু, আপনি যান। আমি আছি তো। পিহু তার আন্টির কাছে থাকবে। কী, থাকবে না?”
পিহু হেসে উপর নিচ মাথা দুলিয়ে ছোট্ট করে জবাব দিল,
“হুম।”
অপরূপাও স্বস্তি পেল। দ্রুত বেরিয়ে এলো অভ্রের সাথে। অভ্র অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে এলো। অপরূপাকে বলল,
“আপনি যান, এবার।”
বুকটা ধুকপুক করছে অপরূপার। গাঢ় শ্বাস টেনে সে দরজা খুলে অনুমতি চাইল,
“মে আই কামিন, স্যার?”
তৎক্ষনাৎ একটি নিচু অথচ ভারি স্বর ভেসে এলো তার কর্ণে,
“ইয়েস।”
অপরূপা প্রবেশ করল ভেতরে। গিয়ে দাঁড়াল বড় কাঁচের টেবিলের ডেস্কের সামনে। নজর পড়ল সামনে বসে থাকা লোকটার দিকে। ফাইলটা মুখের সামনে ধরে বসে আছে সে। পরপর তার নজর পড়ল টেবিলে রাখা নেমপ্লেটের উপর। তাতে গোটাগোটা অক্ষরে লেখা একটি অক্ষর। শুধুমাত্র ইংরেজিতে, “ভি”। ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল অপরূপার। এমন সময় ভেসে এলো সামনে থাকা ব্যক্তিটির গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর,
“মিসেস অপরূপা হাওলাদার, রাইট?”
অপরূপা চোখ তুলে তাকাল। লোকটা এখনো ফাইলটা মুখের সামনে ধরে রেখেছে। অপরূপা নিজেও গম্ভীর স্বরে উচ্চারণ করল,
“মিস, নট মিসেস। আই’ম মিস অপরূপা হাওলাদার।”
এ পর্যায়ে মুখের সামনে থেকে ফাইলটা সরাল ব্যক্তিটি। দৃশ্যমান হলো তার কুঞ্চিত ভ্রু জোড়া। পরপর তীক্ষ্ণ ফ্যাকাশে সবুজরাঙা চোখ জোড়া। অপরূপাও একপলক দেখে নিল তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সবুজ আভা। হুট করেই আভিয়ানের মুখে ছড়াল খানিক বিস্ময়। টানটান হলো কপালের চামড়া।
হঠাৎ কীসের এই বিস্ময়। কয়েক সেকেন্ড কেটে কয়েকটক মিনিট কাটল, অথচ আভিয়ানের দৃষ্টির নড়চড় হলো না অপরূপার মুখশ্রী হতে। না কাটল তার বিস্ময়। হৃৎস্পন্দন বুঝি খানিকটা ভারি হলো। ঠিক বোঝা গেল না। সে অবাক নয়নে দেখে নিল অপরূপার পা থেকে মাথা অব্দি। অপরূপা নিজেও কিছুটা বিস্মিত হলো আভিয়ানের চোখ দেখে, যদিও তা অপ্রকাশ্য। ততক্ষণে চোখ নামিয়ে নিয়েছে আভিয়ান। মুখশ্রীর কাঠামো আগের থেকেও বেশি কঠোর হয়েছে তার। পরপর অপরূপার কর্ণে এসে আঘাত হানল,
“ওয়েল, মিস অপরূপা হাওলাদার। আই’ম আভিয়ান এহসান, দ্য কারেন্ট ওনার অ্যান্ড সিইও অফ এহসান গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ।”
অপরূপা ছোট্ট করে উচ্চারণ করল,
“ইয়েস, স্যার।”
আভিয়ান দৃষ্টি সরালো। চোখ নামিয়ে রাখল ফাইলটার দিকে। হঠাৎ অস্থিরতা বাড়ল তার। হাতে তার অপরূপার রিপোর্ট ফাইল। সেটাতে অদ্ভুত ভাবে নজর বুলিয়ে বলল,
“বসুন।”
অপরূপা বসল। আভিয়ানের পূর্ণ মনোযোগ ফাইলে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবটাই দেখছে সে। গত সাতদিন ধরে সে আসেনি অফিসে। বরং অভ্রের ঘাড়েই সবকিছু ছেড়ে দিয়ে সে এদিক এদিক ছুটে ছন্নছাড়া হয়ে। অভ্র ছেলেটা বয়সে আভিয়ানের থেকে দু বছরের বড়, তবে আভিয়ান তাকে নাম ধরেই ডাকে। ছেলেটা বেশ ভালো, মেধাবী সাথে দায়িত্বশীল। তাই তো এতটা ভরসা করতে পারে আভিয়ান। আভিয়ান দীর্ঘসময় দেখল ফাইলটা। অতঃপর সোজা হয়ে বসল। চোখ রাখল অপরূপার চোখে। এতক্ষণে তাকে স্বাভাবিক মনে হলো।
“আপনার কাজের বেশ প্রশংসা পেয়েছি, সাথে শুনেছি প্রেজেন্টেশন ভালো দিতে পারেন।”
অপরূপা অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে জবাব দিল,
“জি।”
আভিয়ানের জবাবটাও এলো পরপর,
“নেক্সট উইকে ইতালির একটি কোম্পানির সাথে আমাদের ডিল হতে যাচ্ছে। প্রজেক্ট রেডি। আপনি সাতটা দিন সময় পাচ্ছেন, প্রজেক্টের যাবতীয় সকল ডিটেইল আপনাকে আজকের ভেতর দেওয়া হবে, সময় নিয়ে প্রেজেন্টেশন তৈরি করুন।”
অপরূপা আশ্চর্য হলো! সাতদিনের ভেতরে প্রেজেন্টেশন তৈরি করবে কী করে? অপরূপার ফ্যালফ্যালে চিন্তিত চোখ জোড়া দেখে প্রশ্নের অনুমান করে নিল আভিয়ান। তুখোড় মস্তিষ্ক মুহূর্তেই ধরে ফেলল প্রতিক্রিয়ার মানে। পরপর বলল,
“ডোন্ট ওয়্যারি, মিস অপরূপা। আই’ল হেল্প ইউ।”
কিছুটা স্বস্তি পেল অপরূপা। আত্মবিশ্বাস হারালে তো চলবে না। বুকের ধুকপুকুনি বেড়েছে। তা কমানোর চেষ্টা চালিয়ে বলল,
“মাত্র সাতদিনে….”
পুরো বাক্য শেষ হওয়ার আগেই আভিয়ান দাম্ভিক স্বরে আওড়াল,
“ইয়্যু ক্যান। দ্যাটস ইয়্যুর কেবিন।”
আভিয়ানের চোখের ইশারা অনুসরণ করে অপরূপা তাকাল পেছনে। এই বিশাল রুমটার মুখোমুখি কেবিনটা। ভেতরে-বাইরে দুটো দরজা। মাঝে কাঁচের দেওয়াল। যেখানে ম্যানেজারের কেবিনটাও দূরে। যদিও ভেতর থেকে বাইরের সবকিছুই নজরে পড়ে। তবে অপরূপা একদম মুখোমুখি। এদিকে অপরূপার ভাবাত্মক মুখোভঙ্গি দেখে রুক্ষ স্বরে ডেকে উঠল আভিয়ান,
“মিস অপরূপা।”
অপরূপা চমকাল! ভাবনা কাটিয়ে জবাব দিল,
“ইয়েস স্যার।”
পরপর তীর্যক চাহনির সাথে সাথে ভেসে এলো আভিয়ানের গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর,
“ডোন্ট কল মি স্যার, কল মি আভিয়ান। অনলি আভিয়ান।”
কপালে ভাজের রেখা দৃশ্যমান হলো অপরূপার। অবাকতা বৃদ্ধি পেল আরো কিছুটা। আভিয়ান চোখ সরিয়ে নিল। মুখে হাত দিয়ে হেলান দিল চেয়ারে, দৃষ্টি স্থির করল ল্যাপটপের স্ক্রিনে। অপরূপা কিছু বলার আগে আবারো ভেসে এলো আভিয়ানের কণ্ঠ,
“ইফ ইট মেইক্স ইউ কমফোর্টেবল, ইউ মে অ্যাড মিস্টার বিফোর মাই নেম।”
অপরূপা ছোট্ট শ্বাস ফেলল। চোখ নামিয়ে ছোট্ট করে জবাব দিল,
“ইয়েস স্যা…”
থামল অপরূপা। ভুলটা শুধরে নিয়ে বলল৷
“স্যরি, মিস্টার আভিয়ান।”
আভিয়ান চোখ তুলে তাকাল না। সে নিজের কাজে ব্যস্ত। কেবল দৃষ্টি স্থির রেখে উচ্চারণ করল,
“ইউ ক্যান গো নাউ।”
“থ্যাংক ইউ।”
অতঃপর বেরিয়ে গেল অপরূপা। দরজা পার হতেই চোখ তুলে তাকাল আভিয়ান। দেখল অদ্ভুত দৃষ্টিতে। সবুজ চোখের নিগূঢ় চাহনির এক অস্থির চিত্র। অতঃপর আভিয়ান চোখ জোড়া বন্ধ করে নিল। হেলান দিয়ে বসে চেপে ধরল নিজের চুল। বিড়বিড় করে উঠল,
"মাই ড্যাম লাক! ফাকিং হেল।"
________
#চলবে
মন্তব্য করবেন।🤍🫶