ফন্ট সাইজ:
থিম:
ঝরা শিউলির দিনে

১০ম পর্ব

লেখক: তামান্না ইসলাম শিমলা

#ঝরা_শিউলির_দিনে

#পর্ব ১০

#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

চকচকে রৌদ্রজ্বল একটি দিনের সূচনা হয়েছে অনেক আগেই। মাঝে কেটেছে চারটি দিন। কর্মব্যস্ত চারটি দিন কেটেছে অপরূপার। তবে সে চিন্তিত পিহুকে নিয়ে। একটু বেশিই চিন্তিত। এই চারটা দিনে আভিয়ানের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। শুধু বাড়েনি, মাত্রা ছেড়েছে। অফিসের পুরোটা সময় পিহু আভিয়ানের কাছে থাকে। লাঞ্চ ব্রেকের টাইমেও কত বায়না তার, প্রচুর অবাধ্য হয়ে উঠেছে তার মেয়েটা। ইয়ান ইয়ান করে মাথা নষ্ট করে ফেলেছে অপরূপার। আর আভিয়ান? সে-ও বা কেন এত মিশছে মেয়েটার সাথে? ছোট্ট মনে স্নেহ পেলে তো আহ্লাদ বাড়বেই।

আভিয়ান নিজেও কাজকর্ম ফেলে পিহুকে নিয়ে থাকে। বাইরের মানুষের সাথে নিজের মেয়েটার এত মেলামেশা একদমই পছন্দ হচ্ছে না অপরূপার। মেয়েটাকে ভালোমতো বোঝালেও বোঝে না। এইতো গতকাল তাকে না বলেই পিহুকে নিয়ে শপিং মলে গিয়েছিল আভিয়ান। বিশাল বড় আকারের একটি টেডি সাথে ম্যাচিং ছোট্ট টেডিও কিনে দিয়েছে পিহুকে। তা পেয়ে পিহুর আনন্দ দ্বিগুণ। অথচ অপরূপার কাছে বিরক্ত লাগছে কেবল। সে তো কম দিচ্ছে না তার মেয়েকে, তবে কেন বাইরের মানুষের থেকে নেবে। মেয়েটাকে দুটো ধমকও দিয়েছিল বাসায় আসার পর। ধমক খেয়ে সে কি কান্না। বাচ্চা মানুষ তো, সেই কান্না কি আর থামানো যায়?

অভিমান করে না খেয়েই ঘুমালো। আজ শুক্রবার। অফিস নেই অপরূপার। এখন সময় ভর দুপুর। সকালে উঠেই মেয়ের মান ভাঙিয়েছে, তাকে কষ্ট দিয়ে কি রাতে অপরূপারও ঘুম হয়েছে না-কি? একদমই না। মেয়ে ছাড়া এ পৃথিবী তার কাছে ধু ধু মরুভূমির মত শূন্য। পিহুও তো তার মাম্মাকে বড্ড ভালোবাসে। অভিমান গলতে কতক্ষণ? অপরূপা রান্না শেষ করে ঘরে এলো। গরম পড়েছে খুব। ঘেমে নেয়ে অবস্থা বেগতিক। গোসল দিতে হবে। পিহু আভিয়ানের দেওয়া টেডিটার সাথে খেলছে, কথা বলছে। অপরূপা কিছু না বলে গোসল দিতে চলে গেল।

লম্বা একটা গোসল শেষে বের হয়ে দেখল পিহু ঘরে নেই। কোথায় যেতে পারে সেটা অপরূপার জানা। সে পা বাড়িয়ে ব্যালকনিতে এলো। বড় টেডিটা চেয়ারে বসিয়ে রেখে ছোট একটা টেডি বাহুতে ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাম হাতটা রেলিং এ। দৃষ্টি ওই মাঠটার দিকে। এই ভর দুপুরবেলা মাঠে একটা কাকপক্ষীরও দেখা নেই। রাস্তায় যা দুই একজন মানুষ দেখা যায়। অপরূপা খেয়াল করল তার মেয়ের মন খারাপ। অপরূপা নিজের লম্বা চুল গুলো মুছতে মুছতে এগিয়ে এলো পিহুর কাছে।

এতটা সময় আগুনের তাপ লাগায় ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে। গাল দুটো একটু বেশিই। অপরূপা দেখতে বেশ সুন্দর, যেমন ফর্সা তেমনই চেহারার গঠন। সরু কালো চিকন ভ্রু জোড়ায় বর্তমানে তার ভাজ। ঘন পাপড়ি যুক্ত আঁখিপল্লবে চিন্তার ছাপ। জ্বিভ দ্বারা গোলাপি ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে সে বসল পিহুর সামনে। শীতল কণ্ঠে ডাকল, "সোনা।"

পিহু চমকে উঠল খানিক! টেডিটা আরেকটু শক্ত করে ধরে ঘুরে দাঁড়াল অপরূপার সামনে। অপরূপা হাত রাখল মেয়ের ফোলা ফোলা গালে। নরম গলায় শুধালো,

“কী হয়েছে, সোনা?”

পিহু জবাব দিল না। সে চোখ নামিয়ে নিল। অপরূপা খানিক অস্থির হলো। ডাকল,

“পিহু?”

পিহু মলিন মুখে তাকাল এবার। আস্তে করে বলল,

“কিছু না।"

“তাহলে এমন চুপ করে আছো কেন?”

পিহু ঠোঁট কামড়ে ধরল। গলার স্বর নেমে এলো। আরো আস্তে করে বলল,

"এমনি।"

পিহুকে কাছে টেনে আনল অপরূপা। চুমু খেল গালে।

"মাম্মাকে বলবে না?"

পিহু গলা জড়িয়ে ধরল অপরূপা। অতঃপর বলে উঠল,

“পিহু ইয়ানকে মিস করছে।”

আবারো সেই বিরক্তির ঢেউ উঠল অপরূপার মনে। চোখ জোড়া বন্ধ করে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

“মিস করতে হবে না।”

“কেন?”

“সে তোমার আপন কেউ না যে সবসময় তোমার সাথেই থাকবে, পিহু।”

পিহু মুখ তুলে তাকাল। চোখে জল চিকচিক করছে তার। ঠোঁট উল্টে বলল,

"ইয়ান তো আমার ফ্রেন্ড, আমার ইয়ান তো আমার সাতেই থাকে।"

অপরূপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কী করে বোঝাবে এই মেয়েকে সে? এদিকে মেয়ের এমন চোখ মুখ দেখে যে তারও বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। সে উঠে দাঁড়াল। পিহুকে উদ্দেশ্য করে বলল,

"চলো খাবে। বিকেলে গ্রাউন্ডে যাব, কেমন?"

পিহু জবাব না দিয়ে আবারো আগের মতো হয়ে দাঁড়াল। অপরূপা আবারো ডাকল থাকে,

"পিহু?"

পরপর আধোস্বরে ভেসে এলো তার কণ্ঠস্বর,

"আমি কাব না।"

"কেন খাবে না? এত বায়না কীসের তোমার? আমি এবার সত্যি তোমাকে নানুমনির কাছে দিয়ে আসবো, পিহু।"

পিহু ফিরে তাকাল। খানিক সময় তাকিয়ে থেকে ঠোঁট ভেঙে শব্দ করে কেঁদে উঠল সে। অপরূপা ব্যতিব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এলো। কোলে তুলে নিল পিহুকে। অস্থির হলো তার হৃদয়।

"সরি মাম্মা, সরি। এত্তগুলো সরি। কাঁদে না, সোনা।"

পিহু কিচ্ছুটি না বলে শব্দ করে কেঁদে চলেছে। অপরূপা কী করবে না করতে বুঝতে পারছে না। সে পিহুকে নিয়ে ঘরে এলো। পিহুকে বসিয়ে দিল বিছানায়। অতঃপর কান্না থামিয়ে শান্ত করল তাকে। চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলল,

"কাঁদে না, সোনা। পিহু না গুড গার্ল? গুডগার্লরা কি কান্না করে?"

পিহু নাক টানছে। ঠোঁট উল্টে বলল,

"তুমি শুদু আমাকে বকা বকা করো। তুমি এত্তু এত্তুও বালোবাচো না আমাকে।"

পিহুর ছোট্ট মুখটা অপরূপার হাতের বাঁধনে। চোখ মুখ মুছে দিয়ে বলল,

"আর বকব না। মাম্মা তোমাকে অনেক ভালোবাসে, তুমি কেন কথা শোনো না?"

"শুনি তো। পিহু সব কতা শোনে। তুমি শুদু শুদু বকা বকা করো।"

"আচ্ছা, আর বকব না বলছি তো। এখন কান্না থামিয়ে খেতে চলো। মাম্মা এখনো খায়নি, তার খিদে পেয়েছে তো।"

পিহু শান্ত হলো। এগিয়ে এসে বসল অপরূপার গা ঘেঁষে। মিটিমিটি চোখে তাকিয়ে আহ্লাদী স্বরে আওড়াল,

"মাম্মা এত্তা কতা বলি?"

কপালের মসৃণ ত্বকে ভাজ সৃষ্টি হলো অপরূপার। কুঞ্চিত হলো ভ্রু জোড়া। শুধালো,

"কী?"

"বকা বকা করবে না তো?"

"করব না।"

“মাম্মা, পিহু ইয়ানের সাতে কতা বলতে চায়।”

অপরূপা থমকাল। অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল তৎক্ষনাৎ। আশ্চর্য হয়ে উচ্চশব্দে উচ্চারণ করল,

"কী!"

পিহু আবারো মন খারাপ করল, গাল ফোলাল। নিজের সকল ভাবনা গুলোকে দূরে ঠেলে দিয়ে মস্তিষ্ক ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করল অপরূপা। গমগমে স্বরে উচ্চারণ করল,

"খেতে চলো। কালকে অফিসে গেলে কথা বলো।"

তৎক্ষনাৎ ভেসে এলো পিহুর গলা,

"আমি একনই বলতে চাই।"

অসহায় চাহনি অপরূপার। কী যন্ত্রণায় পড়েছে সে। নরম কণ্ঠে প্রশ্ন করল,

“এখন?”

উপর নিচ মাথা দুলাল পিহু। জবাব দিল,

“হুঁ।”

অপরূপা মহা ফেসাদে পড়ে গেছে। এবার সত্যি ইচ্ছে করছে পিহুকে রেখে আসতে। মেয়েটা এতটা জেদি কী করে হয়ে গেল? অপরূপাকে নিশ্চুপ দেখে পিহু তার বাহু ঝাকালো। ডাকল,

"মাম্মা।"

অপরূপা দৃষ্টি নামাল। তাকাল পিহুর মুখপানে। পরপর পিহু বলে উঠল,

"আমি কতা বলব, দাও না কতা বলিয়ে।"

"কীভাবে কথা বলবে? তাকে কোথায় পাব আমি? এত জেদ করো না, সোনা। কালকে অফিসে গিয়ে তো কথা হবেই।"

পিহু বুকে হাত বেঁধে চোখ জোড়া ছোট ছোট করে দিল। বলল,

"কল করো। কলে কতা বলব।"

আশ্চর্যের চরম পর্যায়ে পৌঁছাল অপরূপা। এই মেয়ের মাথায় এসব ঢোকে কী করে? খোদা! পিহু ফের বাহু ঝাঁকালো। উপায়ন্তর না পেয়ে অপরূপা নিজেকে সংযত রেখে বলল,

“এভাবে হুট করে ফোন করা যায় না, পিহু।”

পিহু গাল ফুলাল। জেদ দেখিয়ে বলল,

“আমি কথা বলবোই।”

অপরূপা চুপ করে গেল। ভেতরে ভেতরে দ্বন্দ্ব চলছে তার। গতকাল বকেছে, একটু আগেও বকেছে। এখন আবার বকবে? মেয়েটা কষ্ট পেলে তো তারও কষ্ট হয়। কী রেখে কী করবে সে? মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে এলো হুট করেই। পরপর বেরিয়ে এলো একটি দীর্ঘশ্বাস। অতঃপর মেয়ের কথা রাখতে সে ফোনটা বের করল। কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল অপলক। কাকে দোষারোপ করবে সে? মিস্টার আভিয়ানকে? নাকড নিজের মেয়েকে? সেটাও বুঝে উঠতে পারছে না সে। অতঃপর সব ভাবনা দূরে ঠেল আভিয়ানের নাম্বারে কল দিল অপরূপা। দুবার রিং হতেই কল রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে ভেসে এলো ঘুম জড়ানো ভারী কণ্ঠ,

“হ্যালো?”

অপরূপার গলার স্বর যেন আটকে গেল। নিজেকে সামলে নিতে সময় লাগল খানিকক্ষণ। পরপর বলল,

“আ আমি অপরূপা বলছি।"

"আই নো।"

ওপাশ থেকে মুহূর্তেই ভেসে এলো আভিয়ানের ঘুম জড়ানো শান্ত স্বর। অপরূপা বিস্মিত! সে জানে মানে? কী করে জানে? অপরূপা যখন স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছর ঠিক তখনই পিহু নিচ থেকে লাফিয়ে উঠে ডাকল তাকে। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল,

“মাম্মা! ফোন দাও! পিহু কতা বলবে!”

অপরূপা এক পলক তাকাল স্ক্রিনের দিকে। অতঃপর ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলল,

"আই'ম সরি, মিস্টার আভিয়ান। আসলে পিহু আপনার সাথে কথা বলার জন্য বায়না ধরেছে। তাই বাধ্য হয়েই কলটা করা।"

ওপাশ থেকে কোনো শব্দ আর শোনা গেল না। নীরবতায় স্থির হলো পরিবেশ। অপরূপা নিজেও আর কিছু না বলে ফোনটা এগিয়ে দিল পিহুর দিকে। পিহু ফোন কানে নিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় ডেকে উঠল আভিয়ানকে,

“ইয়ান!”

আভিয়ানের কণ্ঠস্বরটা নরম হলো। জবাব দিল,

“ইয়েস, লিটেল কিটেন।"

পিহু খুশিতে আত্মহারা। এতক্ষণে মনটা তার শান্ত হলো। সে একগাল হেসে বলল,

“তুমি কোতায়, ইয়ান?”

“বাসায়।”

আভিয়ানের ঘুম জড়ানো কণ্ঠস্বরটা কর্ণকুহর হতেই পিহু কিছু একটা আন্দাজ করে নিল। জিজ্ঞেস করল,

“তুমি কি ঘুমাচ্চিলে?”

আভিয়ানের সংক্ষিপ্ত জবাব,

“হুঁ।”

“একন তো দুপুর। তুমি একনো ঘুমাচ্চো?"

"হুঁ।"

"কেন? তুমি কি অতুস্ত?"

ওপাশ থেকে আভিয়ান বোধহয় হাসলো খানিকে। কণ্ঠস্বরটা স্পষ্ট হলো,

"না, লিটেন কিটেন।"

পিহু চিন্তিত চিত্তে শুধালো,

"তাহলে?"

"রাত জেগেছি তাই দিনে ঘুমাচ্ছি। সেসব ছাড়ো, তুমি বলো কী বলবে?"

পিহু থামল। মন খারাপ করে গালে হাত ঠেকাল। জবাবের বদলে ডাকল আভিয়ানকে,

“ইয়ান?”

আভিয়ানও জবাব নিল,

“হুম?”

“পিহু তোমাকে অনেক মিস করছিল।”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কাটল নীরবতায়। অতঃপর ভেসে এলো এক ধীর স্থির কোমল কণ্ঠস্বর,

"ইয়ান মিসড ইউ টু, লিটেল কিটেন।"

পিহু নিজের ডান হাত উঠিয়ে আঙুল দিয়ে নিজের গাল ছুঁলো দুবার। বলল,

"পিহু তোমাকে একনো মিস করছে, ইয়ান।"

"আচ্ছা?"

"হুম।"

"কতটা?"

পিহু আপনা-আপনি নিজের হাত উঠালো। বলল,

"এত্তগুলা।"

মুহূর্তেই আভিয়ানের হাসির শব্দ কানে এলো পিহুর। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অপরূপারও কান এড়ালো না সেই হাসির শব্দ। এতক্ষণ যাবত সবটাই শুনছিল সে। পিহুও গাল ফুলিয়েছে। সে তো হাসার মত কিছু বলেনি। তবে কেন তার ইয়ান হাসছে? অভিমানী স্বরে প্রশ্ন ছুড়ল,

"তুমি হাসছো কেন, ইয়ান?"

আভিয়ানের হাসির শব্দ করে আসে। তার তরফ থেকে ভেসে এলো নরম কোমল কণ্ঠস্বর,

"লিটেল কিটেনের কথা শুনে তার ইয়ান খুব হ্যাপি হয়েছে, তাই সে হাসছে।"

এবার পিহুও হাসলো। বলল,

"ইয়ান, তুমি কাল দেকা করবে তো আমার সাতে? জানো মাম্মা বলেচে মাম্মা আমাকে নানুমনির কাচে পাটিয়ে দেবে। তকন তো পিহু তোমাকে অনেক মিস করবে, ইয়ান।"

মেয়ের এমন কথা শুনে অপরূপা হতভম্ব। ঠোঁট জোড়া ফাঁক হয়ে এলো তার। কিছু বলার আগেই কর্ণকুহর হলো আভিয়ানের গম্ভীর ভারি কণ্ঠস্বর,

"তোমার মাম্মাকে বলে দিও দুষ্টুুবুদ্ধি মাথা থেকে ঝেড়ে প্রেজেন্টেশনে মন দিতে। ইয়ান কেবল লিটেল কিটেনের জন্য, অপরূপার জন্য কিন্তু নয়। তার কাছে আমি আভিয়ান এহসান, যে কাজে গাফলতি পছন্দ করে না।"

মুহূর্তেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল অবুঝ পিহু। অথচ অপরূপা বাক্য হারাল। লজ্জা, অস্বস্তি একই সাথে গ্রাস করল তাকে। মেয়েটা তাকে লজ্জায় ফেলল এভাবে! ইস! কী যে করবে সে এই মেয়েকে নিয়ে। পরপর আভিয়ানের কথা শুনে বিস্ময় আকাশ ছুঁলো অপরূপার।

"লবঙ্গ আর মধু দিয়ে চা খেয়ে নেবেন। গলা পুরোপুরি বসে যাওয়ার আগেই গলা ঠিক করুন, অপরূপা।"

মুহূর্তেই অপরূপার হাত চলে গেল নিজের গলায়। গতরাতে বাড়ি আসার পর থেকেই গলাটা খুসখুস করছিল বড্ড। সকালে উঠে বুঝতে পেরেছিল গলাটা খানিক বসেও গিয়েছে। তবে এই বিষয়টা আভিয়ান খেয়াল করল কী করে? অপরূপা স্থির চিত্তে তাকিয়ে আছে পিহুর হাতের মুঠোয় থাকা ফোনের দিকে। ততক্ষণে পিহুর থেকে বিদায় নিয়ে কল কেটে দিয়েছে আভিয়ান। হয়তো আবারো গভীর ঘুমে তলিয়েছে। গোটা রাত বাইক রাইড করেছে, দিনে তো ঘুমাবেই। ওদিকে পিহুও বিছানা ছেড়েছে। ফোনটা রেখে হাসি মুখেই অপরূপার আঁচল টেনে ধরল সে। ডেকে বলল,

"মাম্মা, পিহু হাঙরি।"

মস্তিষ্কে ছুটে চলা ভাবনার রেল থামিয়ে চোখ নামাল অপরূপা। কী আশ্চর্য! কী অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে তার। স্বস্তি নাকি অস্বস্তি? নাকি দুটোই? জানা নেই তার। বরং দ্রুত ব্যস্ত হতে চাইল তার মস্তিষ্ক। পরপর পিহুকে নিয়ে চলল খাবার খেতে।

______

"বাইয়া, ও বাইয়া। আমাল কুব কস্ত হচ্চে। ও মাম্মা, ও বাইয়া।"

একটি শিশুর অবিরাম আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে আভিয়ানের সমগ্র স্নায়ুতন্ত্র। করোটির ভেতর তীব্র পীড়াদায়ক স্পন্দন। মাথার প্রতিটি শিরা যেন টনটন করে উঠছে। ক্ষুদ্র সেই কণ্ঠের আর্তনাদ ঘরের চার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে বারবার ফিরে এসে আঘাত হানছে তার কর্ণকুহরে, আর সেই প্রতিঘাতে ক্রমশ ভেঙে পড়ছে তার স্থিরতা। এসি চলছে ফুল পাওয়ারে, মাথার উপর ঘূর্ণায়মান পাখা নিরবচ্ছিন্ন বাতাস বইয়ে দিচ্ছে পুরো ঘরে। তবুও ঘামে ভিজে যাচ্ছে আভিয়ানের শরীর। অস্থিরতায়, আতঙ্কে, না-জানা এক বিভীষিকায়। কপালের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে, যেন সামান্য চাপেই ছিঁড়ে যাবে যখন-তখন। নিজের অজান্তেই দু’হাতে শক্ত করে খামচে ধরল নিজের চুল। এই যন্ত্রণা থেকে নিজেকেই টেনে বের করে আনতে চাচ্ছে সে।

ঠিক তখনই দৃশ্যমান হলো একজোড়া কালো, কুচকুচে চোখ। চোখে চোখ পড়তেই সময় থমকে গেল আভিয়ানের শ্বাস প্রশ্বাস। সেই দৃষ্টিতে আর আগের মতো ছটফটানি নেই, নেই প্রাণভয়ে ছটফট করা আকুলতা। বরং সেখানে জমে আছে এক রুদ্ধশ্বাস নীরবতা, অব্যক্ত এক মিনতি। আভিয়ান হাত বাড়াতে চাইল, কিন্তু পারল না। অদৃশ্য কোনো শক্তি যেন তাকে বেঁধে রেখেছে স্থবিরতায়। সে কেবল তাকিয়ে আছে অপলক অসহায়, নিস্তব্ধ, ভেঙে পড়া এক মানুষের ন্যায় । বাচ্চা মেয়েটির শরীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছে। আহাজারি থেমে গেছে। ক্ষতবিক্ষত দেহ আর নড়ছে না তার। তবুও চোখ দুটি স্থির হয়ে আছে আভিয়ানের দৃষ্টিতে। মুহূর্ত কয়েক পর সেই চোখেও নেমে এলো ক্লান্তির পর্দা। পলক ভারী হয়ে এলো বাচ্চাটির। পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার আগমুহূর্তে অতি ক্ষীণ, ভাঙা স্বরে উচ্চারিত হলো একটি মাত্র শব্দ,

“বাইয়া…”

দুঃস্বপ্নের সেই শ্বাসরুদ্ধ মুহূর্ত আর সহ্য করতে পারল না আভিয়ান। হঠাৎই যেন চেতনা ফিরে এলো। চিৎকার করে উঠল,

“না!”

বিছানার উপর হঠাৎ উঠে বসল আভিয়ান বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা যেন ছুটে পালাতে চাইছে। শ্বাসপ্রশ্বাস অনিয়মিত, শরীর কাঁপছে অদৃশ্য আতঙ্কে। গলা শুকিয়ে কাঠ। চোখ শক্ত করে বন্ধ করে দু’হাতে নিজের চুল আঁকড়ে ধরল সে। অস্থির হয়ে চোখ জোড়া বন্ধ করে নিল। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে চোয়ালে। বেয়ে পড়ছে উন্মুক্ত পুরুষালি গড়নের পেঠানো বুকের উপর। ঠিক তখনই অনুভব করল, নাকের কাছে উষ্ণ, ভারি কিছু গড়িয়ে পড়ছে ঠোঁটে। বাম হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে তড়িঘড়ি মুছে নিল সেই লাল তরল। মস্তিষ্ক দপদপ করছে। ব্যথায় টিকতে না পেরে চিৎকার করে ডাকল ইরফান এহসানকে।

"দাদু, দাদু!"

সময়টা তখন সন্ধ্যা। তবে আভিয়ানের বদ্ধ ঘরে সময়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। বাইরের আলো, বাতাস, দিন-রাত সবকিছু থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক অন্ধকারে আবদ্ধ সে। ঘরের দেয়াল, পর্দা, আসবাব সবই কালোর একঘেয়ে স্তব্ধতায় মোড়া। কেবল এক কোণে জ্বলছে ক্ষীণ নীল ড্রিম লাইট, যার আলো এই গভীর অন্ধকার ভেদ করার মতো শক্তিশালী নয়। বরং তা আরও বেশি গুমোট করে তুলেছে পরিবেশটাকে।

নাক দিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। মাথা ঘুরছে তীব্রভাবে। চারপাশ দুলে উঠছে বারবার। দ্বিতীয়বার কাউকে ডাকার মতো শক্তিও অবশিষ্ট নেই তার শরীরে। কোনোমতে নিজেকে সামলে বিছানা থেকে নেমে এলো আভিয়ান।

পা দুটো তার ভারী, অনিশ্চিত। তবুও টলতে টলতে পৌঁছে গেল গেমিং রুমে। এই মুহূর্তে লাইট জ্বালানোর মতো ধৈর্য বা স্থিরতা কিছুই অবশিষ্ট নেই। অন্ধকারেই হাতড়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। আঙুলগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে খুঁজতে লাগল প্রয়োজনীয় কিছু। অবশেষে তা হাতের নাগালে আসতেই তার কাঁপুনি আরও বেড়ে গেল। দ্রুত ছোট্ট বোতলটা খুলে ফেলল সে। কোনো কিছু না ভেবেই ট্যাবলেট বের করল। সময় নষ্ট না করে মুখে ঢেলে দিল দা। পাশে থাকা পানির বোতল থেকে এক নিঃশ্বাসে গলা ভিজিয়ে গিলে ফেলল সবটা। অতঃপর এক অদ্ভুত বিরক্তি, ক্লান্তি আর ক্ষোভের মিশেলে অ্যালপ্রাজোলামের কৌটাটা ছুঁড়ে মারল মেঝেতে।

বসে পড়ল নিচে। চেপে ধরল নিজের চুল৷ দীর্ঘক্ষণ স্থির রইল সেভাবেই। অস্থিরতা কমতেই কমে এলো নোস ব্লিডিং। ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছাড়ল। চোখ মেলতে ইচ্ছে করল না। ততক্ষণে হৃৎপিণ্ডেন গতি স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে এসেছে। অথচ মস্তিষ্ক জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে তার। সেই জ্বলন কমছে না। না পেরে নিচে বসেই ডেস্কে থাকা গেমিং সেট-আপ এক নিমিষেই ছুঁড়ে ফেলল নিচে । ভেঙেচুরে চুড়মাড় হলো কাঁচের সাউন্ড সিস্টেম। তবুও শান্ত হলো না মন মস্তিষ্ক। উঠে দাঁড়াল আভিয়ানের৷ নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে দেয়ালে আঘাত করল বার কয়েক। মুহূর্তেই হাতের চামলা থেঁতলে গেল। ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গড়াল রক্ত। চিৎকার করে উঠল নিজের উপরেই,

"আই’ম সো ড্যাম টায়ার্ড অফ দিস ফাকিং লাইফ। জাস্ট ফাঁকড আপ।"

অতঃপর আভিয়ান হুড়মুড় করে বেরিয়ে এলো গেমিং রুম থেকে। ঢুকল ওয়াশরুমে। লম্বা একটা শাওয়ার নেওয়া প্রয়োজন তার। মাথাটা ঠান্ডা করতে হবে। অতঃপর ঘন্টা খানিক বাদে বের হলো সে। হাতটা জ্বলছে খুব। কালো রঙের একটি ট্রাউজার আর কালো রঙের একটি টি শার্ট পরে নিল আভিয়ান। টি-শার্টটা একদম লেগে আছে তার পেশিবহুল শরীরে।

ভেজা চুল গুলো পড়ে আছে কপালে। মুছবার মত ইচ্ছেটুকুও নেই। ফোনটা হাতে নিয়ে কল করল জাওভানকে। এগিয়ে গেল বড় কাঁচের উইন্ডো গ্লাসের দিকে। কালো পর্দা সরিয়ে তাকাল বাইরে৷ রাত নেমে এসেছে। ততক্ষণে কল রিসিভ করেছে জাওভান। সে কিছু বলার আগেই আভিয়ান গমগমে স্বরে আদেশ করল,

"ক্যান্টনমেন্টের সামনে আয়।"

ওপাশ থেকে জাওভানের জবাবটাও এলো দ্রুত,

"ওখানে কেন? আমি তো...."

পুরো বাক্য শেষ হওয়ার সুযোগটাও দিল না আভিয়ান। ভারিক্কি স্বরে আওড়াল,

"নাইন শার্প। ডোন্ট কিপ মি ওয়েটিং।”

জাওভান দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ জিজ্ঞেস করল,

"রাইডে যাবি?"

"হুঁ।"

"নিদ্রাকে বলব?"

"বল।”

“ফুয়াদকে?”

“ঠিক আছে।”

জাওভানের জবাবের অপেক্ষা না করে কল কেটে দিল আভিয়ান। পর্দাটা পুনরায় টেনে দিয়ে এগিয়ে এলো কাঁচের টি টেবিলের কাছে। হেলমেটটা তুলে নিয়ে পরতে পরতে বের হলো ঘর থেকে। সিঁড়ি বেয়ে নামতে গেলেই দেখা মিলল ইরফান এহসানের। বাড়িতে ঢুকছেন তিনি। হাতে তার লাঠি। যদিও বা এটা তার কাজে লাগে না। বয়স প্রায় আশির কাছাকাছি হলেও এখনো পর্যন্ত তিনি যথেষ্ট ইয়াং। রোগব্যধি যা আছে তা-ও খুব একটা তাকে কাবু করতে পারেনা। এখনো এদিক ওদিক একাই চলাচল করেন। যদিও বা সাথে সবসময় থাকে তার স্যাক্রেটারি পলাশ ভূইয়া।

আভিয়ানকে হেলমেট পরে নিচে আসতে দেখে থেমে গেলেন ইরফান এহসান। কপালে ভাজ পড়ল তার। কুঁচকে গেল মুখটা। আভিয়ান স্বাভাবিক। কোনো হেলদোল নেই। সে নেমে এলো নিচে। ইরফান এহসানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডগ্লাফস পরতে লাগল। তা দেখে চোখ মুখের কঠোরতা গাঢ় হলো ইরফান এহসানের। শুধালেন,

"সারাদিন ঘুমিয়ে এখন আবার বের হচ্ছো?"

"হুঁ।"

আভিয়ানের স্পষ্ট সোজাসাপ্টা জবাব। অসন্তুষ্ট হলেন ইরফান এহসান। সেই অসন্তোষ প্রকাশ পেল তার কণ্ঠে,

"কোথায় যাচ্ছো আবার? ফিরবে কখন?"

আভিয়ান নিজের কাজেই মনোযোগ রেখে বলল,

"চট্টগ্রাম যাচ্ছি।"

"কী!"

আশ্চর্যে মুখাবয়বের আদল পাল্টে গেল তার। সময় নিয়ে বললেন,

"কী? কিসের চট্টগ্রাম? এখন গেলে ফিরবে কখন?"

এই পর্যায়ে চোখ তুলে তাকাল আভিয়ান। জবাব দিল,

"আই ডোন্ট নো।"

"যাচ্ছো না তুমি।"

"আই'ল গো।"

"নো।"

"সে হোয়াটএভার ইউ ওয়ান্ট, আই’ম নট লিসেনিং।"

ইরফান এহসানের কঠোরতা বৃদ্ধি পেল। এই ছেলে এত কেন অবাধ্য? রুক্ষ স্বরে আওড়ালেন,

"এত বেপরোয়া না হয়ে এবার জীবনের মানেটা বুঝতে শেখো, আভি। আমি সারাজীবন থাকব না তোমার সাথে, আমি চলে গেলে সারাজীবন তোমার খামখেয়ালী সহ্য করার মতো আর কাউকে পাবে না।"

আভিয়ানের দৃষ্টি কঠোর হলো। এ পৃথিবীতে ইরফান এহসান ছাড়া আর কেউ নেই আভিয়ানের। তার সকল দূর্বলতা এখন একজনই, ইরফান এহসান। আর এই দূর্বলতাই বারবার কাজে লাগান তিনি। ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে বেরান কথায় কথায়। খিঁচে যাওয়া মেজাজ সামলে নিয়ে আভিয়ান অত্যন্ত শান্ত স্বরে উচ্চারণ করল,

"কে জানে? পেয়ে যেতেও পারি।"

নাতির এহেন কথায় চোয়াল ঝুলে পড়ল ইরফান এহসানের। না, এই ছেলেকে সে শুধরাতে পারবে না। সম্ভবই না। ছেলেটার বয়স তো কম হয়নি, আটাইশ বছরের একজন পুরুষকে সে তো আর হাতে কলমে ধরিয়ে বোঝাতে পারবে না। আভিয়ানের তো বুঝেও না বোঝার মত করে ছুটে বেরায়। মন মন মস্তিষ্ক বন্দি করতে পারে না কোনো রুদ্ধদ্বার। ইরফান এহসান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এ পর্যায়ে গলার স্বর নরম হলো তার। বললেন,

"এই-যে সারাদিন হুটহাট যেখানে খুশি সেখানে ছুটে বেরাও, আমার খোঁজ খবর কি নাও? একদিন দেখবে এই এত বড় বাড়িতে আমি মরে পড়ে আছি। শেষ কালে হয়তো একটু পানিও পাব না। তোমাকে দেখতেও পাব না।"

"দাদু!"

"ধমকাচ্ছো কেন? ভুল কি বললাম? নিজে তো থাকোই না, আমি যে বললাম বিয়ে করো। তাও করছো না। আমারও তো ইচ্ছে করে বেঁচে থাকতে তোমার একটা সুন্দর সুখী সংসার দেখে যেতে। সে এসে তোমার জীবনটা গুছিয়ে নেবে। তোমার সন্তান আসবে, তোমার বাড়ি জুড়ে তারা খেলবে। ভেবে দেখো তো, কত সুন্দর একটা জীবন।"

আভিয়ান নিশ্চুপ। চোখের মনিটা গাঢ় আকার ধারণ করছে তার। ইরফান এহসান নাতির জবাব না পেয়ে আবারো বলে উঠলেন,

"বললাম কাউকে পছন্দ না হলে নিদ্রাকে নিয়ে ভেবে দেখো। তোমরা দুজনেই তো একই প্রকৃতির। ছোট থেকে বড় হয়েছ। তা-ও না। কী চাও বলোতো তুমি?"

আভিয়ান নির্লিপ্ত। সময় নিল সে। অতঃপর জবাব দিল,

"শান্তি।"

"শান্তিটা আসবে কোথায় থেকে?"

"জানা নেই।"

বিরক্ত হলেন ইরফান এহসান। বিরক্ত স্বরেই বলে উঠলেন,

"আজ থেকে তোমার সাথে আর কোনো কথা নেই আমার। দিন দিন বয়স বাড়ছে তোমার, এর পরে মেয়ে পাবে তুমি? আমিও তো মরার দিকে এগোচ্ছি। কবে যেন মরে টরে যাই। শেষ ইচ্ছেটা ছিল নাতি বউ দেখে যাব। সেই ইচ্ছে কি আর পূরণ হবে? হবে না তো, কেন হবে? তোমার তো যায় আসে না আমার ইচ্ছে নিয়ে। আমি মরে গেলে তারপর দেখবে আমি তোমার জন্য কী ছিলাম।"

আভিয়ানের রাগ হলো। ধমকে উঠল উচ্চস্বরে,

"দাদু! কোন কথার সাথে কোন কথা মেলাচ্ছ তুমি? আর মরার কথা বলছো কেন? সমস্যা কী?"

"আমি আর কিছুই বলব না। যেদিন নাতবউ ঘরে আনতে রাজি হবে সেদিনই কথা বলতে আসবে।"

কথাটা বলে আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করলেন না ইরফান এহসান। গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন। চোয়াল শক্ত হলো আভিয়ানের। দাঁতে দাঁত চেপে আঁড়চোখে তাকিয়ে দেখল ইরফান এহসানের যাওয়ার পানে। উচ্চারণ করল,

"হি নেভার স্টপস, ডাজ হি?”

ইরফান এহসান দৃষ্টি সীমানা পার হতেই সোজা হয়ে দাঁড়াল আভিয়ান। দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেলমেটের গ্লাস নামিয়ে বিড়বিড় করে আওড়াল,

"ওহ গড, হোয়াই ইজ হি লাইক দিস? আই ক্যান্ট ডিল উইথ হিম এনিমোর।"

পরপর চোখ মুখ অন্ধকার করে হাঁটা ধরল সে। গম্ভীরতা বাড়ল। গ্যারেজে এসে সোনালী রঙের আলো ছড়ানো বাতি জ্বালাল। কালো পর্দায় ঢাকা অবস্থায় বিদ্যমান ছয়টি বাইক। সবগুলোই ব্র্যান্ডের। সাথে তার প্রিয়। তবে সবচেয়ে প্রিয় যেই বাইক, সেটি হলো BMW S 1000 RR বাইকটি। খটখট শব্দ তুলে বাইকটির কাছে এগিয়ে গেল আভিয়ান। অতঃপর পর্দা সরিয়ে উন্মুক্ত করল তার অতিপ্রিয় বাইকটি। বাইকের সামনের দুইটা এলইডি হেডলাইট। সেটা জ্বালিয়ে দিল আভিয়ান।

মুহূর্তেই চোখে এসে পড়ল আলোর ঝলকানি। যেন কোনো শিকারির চোখ, অন্ধকারকে চিরে সামনে তাকিয়ে আছে। কালো বডির উপর আলো পড়তেই চকচক করে ওঠল ধারালো লাইন। যার উপর গোল্ড প্লেটে খচিত আছে একটি অক্ষর। ইংরেজিতে কেবল একটি মাত্র অক্ষর, 'ভি'। আভিয়ান আর সময় নষ্ট করল না। চড়ে বসল বাইকে। অতঃপর শব্দ তুলে বের হলো সে। ছুটে গেল দীর্ঘ একটা পথ পারি দিতে। কেবলই নিজেকে ব্যস্ত রাখতে, নিজের অস্থিরতা ভুলতে।

_________

#চলবে

সকলেই রেসপন্স করবেন। আবারো রিচ ডাউন হচ্ছে। সকলেই মন্তব্য করবেন।🤍

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন