#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ২১
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা
_______________________
দিনটা আজ অন্যরকম। আকাশে রোদ উঠেছে ঠিকই, কিন্তু তার তেজ নেই। হালকা মেঘের আস্তরণে চারপাশে একটা অলস, ঝিম ধরা আবহে মেতে আছে। বিশাল এহসান বাড়িটাও আজ অস্বাভাবিক নিরব। নিচতলায় কেবল কাজের লোকদের ক্ষীণ আনাগোনা, দূরে রান্নাঘর থেকে আসা বাসনের শব্দ। ব্যস এটুকুই। দ্বিতীয় তলার করিডোর ধরে ধীর পায়ে হাঁটছে এরিনা। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। পরনে ঢিলেঢালা কালো টিশার্ট, সাথে ধূসর রঙের প্লাজো। চুলগুলো এলোমেলো ভাবে খোলা, তবে সেই এলোমেলোতাতেও হিসেবি সৌন্দর্য। নিচ থেকে কফি নিয়ে নিজের ঘরের দিকেই যাচ্ছে সে। তবে হুট করেই আভিয়ানের ঘরের সামনে এসে থামল সে। আভিয়ানের ঘরের দরজাটা আধখোলা। সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটের কোণে হাসিটা আরো গাঢ় হলো এরিনার।
একটুও না ভেবে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল সে। ঘরজুড়ে আধো অন্ধকার। ভারী পর্দাগুলো টানা, কেবল ফাঁক গলে সূর্যের ক্ষীণ আলো বিছানার একপাশে এসে পড়েছে। বিছানায় উপর হয়ে শুয়ে আছে আভিয়ান। কোমর পর্যন্ত চাদর টানা তার। উন্মুক্ত পিঠটা স্পষ্ট দৃশ্যমান। চওড়া কাঁধ, টানটান পেশী, ত্বকের উপর এলোমেলোভাবে পড়ে থাকা কালচে চুলের গোছা। গভীর ঘুমে আছে সে। এরিনার বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো সে।
নাইটস্ট্যান্ডের উপর কফির মগটা রেখে খুব আস্তে হাত রাখল আভিয়ানের পিঠে। পরমুহূর্তেই আভিয়ানের শরীর শক্ত হয়ে উঠল। ঘুম ভাঙতে সময় লাগল না তার। চোখ খুলেই প্রথমে বিরক্তি নিয়ে কপাল কুঁচকাল সে। তারপর পাশ ফিরে তাকাতেই চোখে পড়ল এরিনার মুখশ্রী। মুহূর্তেই মুখটা শক্ত হয়ে গেল আভিয়ানের। গম্ভীর রেশটা গাঢ় হলো।
“তুমি এখানে কী করছো?”
ঘুম জড়ানো কর্কশ কণ্ঠেও আভিয়ানের বিরক্তি স্পষ্ট। এরিনা বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং বিছানার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসল।
“গুড মর্নিং, রুডম্যান।”
আভিয়ান উঠে বসল ধীরে ধীরে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে চোখে এসে পড়েছে। বিরক্ত ভঙ্গিতে হাত চালিয়ে সেগুলো সরাল। অতঃপর ঘাড় বাঁকিয়ে ঘুমের রেশ ছাড়াল। স্পষ্ট করল দৃষ্টি। এরিনার চোখে চোখ রেখে উচ্চারণ করল,
“আমি প্রশ্ন করেছি।”
এরিনা কাঁধ ঝাঁকাল। মিথ্যা জবাব দিল,
“কফি দিতে এসেছি।”
“কাজের লোক আছে।”
“তারা তোমার রুমে ঢোকে না।”
আভিয়ানের চোয়াল শক্ত হলো। স্পষ্ট ভাবে এরিনাকে জানিয়ে দিল নিজের সিদ্ধান্ত,
“তুমি-ও ঢুকবে না।”
এরিনা পুরোপুরব স্বাভাবিক। তার অধর ঘেঁষে গেল বাঁকা হাসি। ভ্রু উঁচিয়ে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে আওড়াল,
“স্টিল রুড।”
আভিয়ান সোজা তাকাল এরিনার দিকে। তার দৃষ্টিটা এতটাই শীতল যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য এরিনার হাসিটাও ফিকে হয়ে গেল। পরপর টি-শার্ট গায়ে জড়াতে জড়াতে বলল,
“নেক্সট টাইম নক করে ঢুকবে, ম্যানার্সলেস।”
“আর যদি না করি?”
বিছানা থেকে নেমে এরিনার মুখোমুখি দাঁড়াল আভিয়ান। ট্রাউজারের পকেটে হাত গুঁজে ভারি স্বরে উচ্চারণ করল,
"গেট আউট।"
এরিনা হেসে উঠল শব্দ করে। নিজেও আরেক পা এগিয়ে এলো আভিয়ানের দিকে। দৃষ্টি জোড়ায় মাদকতা। পরপর বাঁকা হেসে হিসহিসিয়ে বলল,
"পাপাকে কেবল আসতে দাও, রুডম্যান। তারপর লাইফটাইম আমাকেই সহ্য করতে হবে।"
"এন্ড ইয় থিংক আভিয়ান তোমার পাপার কথার ধার ধারে?"
"বাধ্য হবে।"
"ফাঁক, ইউ নো? ইউ আর অ্যা স্টাবর্ন।"
এরিনার মাঝে কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়ার দেখা মিলল না। বরং ঠোঁট কামড়াল হালকা। তারপর কফির কাপটা আবার হাতে তুলে নিল। চোখ টিপে বলল,
“ওয়েল, আই স্টিল লাইক ইউ দিস ওয়ে।”
আভিয়ানের মুখ আরো শক্ত হলো। এই মেয়ের মাথায় নিশ্চয় সমস্যা আছে। ব্যক্তিত্ব বলতে কিচ্ছুটি নেই। এরিনা ডান হাতটা উঁচু করে হুট করেই ছুঁয়ে দিল আভিয়নের অ্যাডম অ্যাপেল। বিষয়টা এতটাই অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল যে আভিয়ন নিজেও বুঝে উঠতে পারেনি এমন কিছু হবে। পরমুহূর্তেই মস্তিষ্ক সচল হলো। হুরহুর করে বৃদ্ধি পেল রাগের মাত্রা। ইচ্ছে করল কষিয়ে একটা চড় বসিয়ে দিতে। তবে মেয়েদের অসম্মান করা তার স্বভাবে নেই। তাই নিজেকে কন্ট্রোল করতে নাইটস্ট্যান্ডের উপর রাখা কাঁচের জগটা স্ব শব্দে ছুঁড়ে মারল নিচে। মুহূর্তেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল প্রতিটি কাঁচের অংশ। এরিনা বোধহয় এতে আরো মজা পেল, আনন্দ পেল। ঠোঁট হাসিটা গাঢ় হলো। অথচ আভিয়ান আযুল তুৱর গর্জে উঠল,
"আই সেইড গেট আউট এরিনা। দ্বিতীয়বার এমন কাজ করলে সেটা তোমার জন্য ভালো হবে না।"
"তবে খারাপটাই করো। আই হ্যাভ নো প্রবলেম, রুডম্যান।"
"এরিনা!"
হো হো করর হেসে উঠল এরিনা। আর দাঁড়াল না সে। কফিতে চুমুক দিতে দিতেই ঘুরে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হতেই আভিয়ান বিরক্তিতে কপাল চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করল,
"ব্লাডি বিচ!"
___________
শুক্রবার মানেই অপরূপার কাছে আলাদা এক ব্যস্ততার দিন।সপ্তাহের এই একটা দিনেই পুরো ঘরটার সাথে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। সকাল থেকে একটানা কাজ করে যাচ্ছে সে। সকল কাজ গুছিয়ে মাত্রই রান্না শেষ করেছে অপরূপা। গরম ভাপ উঠছে চুলার উপর রাখা ডাল থেকে। কপাল জুড়ে ঘামের ছোট ছোট বিন্দু জমেছে। আঁচল দিয়ে সেগুলো মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকল সে। ঠিক তখনই ভেসে এলো পিহুর কণ্ঠস্বর,
“মাম্মাআআ!”
ছোট্ট পায়ের টুপটাপ শব্দ তুলে দৌড়ে ব্যালকনি থেকে ভেতরে এলো পিহু। চুলগুলো এলোমেলো, মুখ লালচে হয়ে আছে উত্তেজনায়। এসেই অপরূপার হাঁটু জড়িয়ে ধরল সে। কোনো দ্বিধা ছাড়াই আবদার করল,
“মাম্মা! পিহুর এত্তা প্লে হাউস লাগবে!”
অপরূপা কিছুটা অন্যমনস্ক ছিল। কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারল না পিহুর কথা। পরপর মাথা ঝাঁকিয়ে তাকাল মেয়ের মুখপানে। শুধালো,
“কী লাগবে?”
পিহু দুহাত ছড়িয়ে বলল,
"এত্ত বড় প্লে হাউস।"
অপরূপার ঠোঁটে হাসি ফুটল। মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলল,
“ও আচ্ছা, প্লে হাউস?”
পিহু জোরে মাথা নাড়ল। জবাব দিল,
“হুমম! পিংক কালারের।"
অপরূপা মেয়ের নাকটা আলতো টেনে দিল। পিহুর খেলনা কেনার জন্য টাকা রেখেছিল সে, তবে সময়ের অভাবে কেনা হয়নি। এখন যেহেতু মেয়ে চাচ্ছেই তবে না করার প্রশ্নই আসে না। পিহু ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে অপরূপার দিকে।অপরূপা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মেয়ের দিকে। এই ছোট্ট মানুষটাই তার সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। অপরূপা নরম স্বরে বলল,
“ঠিক আছে। বিকেলে নিয়ে যাব তোমাকে।”
চোখ দুটো মুহূর্তেই জ্বলে উঠল পিহুর। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ল,
“সত্যি?!”
“হুম।”
পরমুহূর্তেই পিহু ঝাঁপিয়ে জড়িয়ে ধরল অপরূপাকে।
“পিহু মাম্মাকে অনেক ভালোবাসে!”
অপরূপা চোখ বন্ধ করে মেয়েকে বুকে টেনে নিল। মিহি স্বরে বলল,
"হ্যাঁ, এবার গোসল দিয়ে খেতে চলো।"
পিহু দুদিকে মাথা দুলাল। অতঃপর সময় নষ্ট করল না অপরূপা। পিহুকে নিয়ে চলে গল ওয়াশরুমে। অতঃপর খাওয়া দাওয়া শেষ করে মা মেয়ে বের হলো শপিং মলের উদ্দেশ্যে।
___
শপিং মলের তৃতীয় তলায় তখন মানুষের ভিড় উপচে পড়ছে।
শুক্রবার সন্ধ্যা মানেই যেন শহরের সব ক্লান্ত মানুষ একসাথে বেরিয়ে পড়ে আলো ঝলমলে এই কৃত্রিম পৃথিবীতে। চারপাশে ঝলসে ওঠা নিয়ন লাইট, দোকানিদের ডাকাডাকি, বাচ্চাদের চেঁচামেচি। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত জীবন্ত পরিবেশ। অপরূপা এক হাতে কয়েকটা শপিং ব্যাগ ধরে আছে, অন্য হাতে পিহুর ছোট্ট আঙুল। আজ মেয়েটার মন ভীষণ ভালো। নতুন একটা গোলাপি প্লে হাউস দেখে সে তো আনন্দে আত্মহারা। হাতে একটা ছোট্ট একটা লাবুবু। পার্পেল রঙের। অপরূপা সেই পুতুলটার দিকে তাকিয়ে বারকয়েক চোখ মুখ কুঁচকেছে। এমন অদ্ভুত ভয়ংকর দেখতে পুতুল নাকি তার মেয়ের পছন্দ। এখনকার যুগের বাচ্চাদের পছন্দও বলতে হবে! দীর্ঘশ্বাস ফেলল অপরূপা। বেরিয়ে এলো মল থেকে। সিঁড়িতে পা রাখা মাত্রই পেছন থেকে ভেসে এলো এক পরিচিত কণ্ঠস্বর।
“এক্সকিউজ মি, অপরূপা?”
থেমে গেলে অপরূপা। কপালের মসৃণ ত্বকে ভাজ পড়ল । ঘাড় ঘুরাতেই সে দেখতে পেল অভ্রকে। আজ ফরমাল পোশাকে নয়, বরং বেশ স্বাভাবিক লুকে। কালো টি-শার্ট, ছাই রঙা জ্যাকেট, ডেনিম জিন্স। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মধ্যবয়স্ক এক নারী। শাড়ি পরা, মুখে স্নিগ্ধতা। চেহারার গড়নে অভ্রর সাথে আশ্চর্য মিল। অপরূপার সচল মস্তিষ্ক আন্দাজ করে নিল মহিলাটি নিশ্চয় অভ্রর মা হবেন। তার ভাবনার মাঝেই অভ্র হাসিমুখে এগিয়ে এলো। ঠোঁটর সেই চিরচেনা অমায়িক হাসি। প্রশ্ন ছুড়ল,
“আপনি এখানে?”
অপরূপাও সৌজন্যমূলক হাসল। জবাব দিল,
“জি। কিছু কেনা কাটা করতে এসেছিলাম।”
অভ্র নিচে তাকিয়ে দেখল পিহুকে। ভ্রু উঁচিয়ে হেসে বলল,
“ওহ, লিটেল ম্যাডাম তো আজ খুব খুশি মনে হচ্ছে।”
পিহু মিটিমিটি করে হাসল। তার মায়ের হাতে থাকা একটি শপিং ব্যাগের দিকে ইশারা করে বলল,
“মাম্মা আমাকে অনেক খেলনা আর বগ প্লে হাউস কিনে দিয়েচে।"
“বাহ! তাই নাকি?"
অভ্র অবাক হওয়ার ভান করল। পিহুর গাল টেনে দিয়ে বলল,
“তাহলে তো পার্টি দেওয়া উচিত।”
পিহু ভাব নিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“দেবনি।"
অভ্র হাসল। মনোযোগ ফেরাল অপরূপার দিকে। অপরূপার নজর গেল অভ্রর মা আলো বেগমের দিকে। অভ্র বুঝতে পেরে বলল,
“ওহ, ইনি আমার মা।”
অপরূপা তৎক্ষণাৎ সালাম দিল। আলো বেগম স্নেহভরা চোখে তাকালেন অপরূপার দিকে। হেসে বললেন,
“তোমার কথা অনেক শুনেছি। অভ্র প্রায়ই বলে।”
অপরূপা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। কী বলবে ঠিক বুঝতে পারল না। কেবল অপ্রস্তুত হয়ে হাসলো জোরপূর্বক।
“তোমার মেয়েটা খুব মিষ্টি।”
পিহু তখন নিজের লাবুবু আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে। অভ্রর মা অত্যন্ত সহজ মানুষ। তার কথাবার্তায় কোনো অহংকার নেই। বরং একধরনের মাতৃত্বময় কোমলতা আছে। অপরূপাও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠল। তারা যখন কথা বলায় ব্যস্ত পিহুর চোখ চলে গেল তখন নিচের দিকে।
মলের কাঁচঘেরা অংশের ওপাশে, বাইক পার্কিং জোনের কাছে কালো একটি স্পোর্টস বাইকের উপর বসে আছে কেউ একজন। পুরো শরীর কালো পোশাকে আবৃত।
মাথায় হেলমেট।
কেবল চোখ দুটো দৃশ্যমান। আর সেই চোখ তীক্ষ্ণ, স্থির, গাঢ় সবুজাভ। সোজা তাকিয়ে আছে এদিকেই। পিহু কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইল সেদিকেই। পরমুহূর্তেই তার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চিৎকার করে উঠল,
“ইয়ান!”
সবাই চমকে উঠল! পিহু হাত ছাড়িয়ে দৌড় দিল সেদিকে।
“পিহু!”
অপরূপা আঁতকে উঠলেও মেয়েটা ততক্ষণে অনেক দূরে।
বাইকের উপর বসে থাকা মানুষটার দৃষ্টি তখনো স্থির অপরূপা আর অভ্রর দিকে। হেলমেটের কালো গ্লাসের আড়ালে মুখ দেখা না গেলেও তার চোখের কঠোরতা স্পষ্ট।যেন জমাট বাঁধা কোনো অস্বস্তি। পিহু ছুটে গিয়ে দাঁড়াল বাইকের সামনে। গাল ভরে হেসে ডাকল,
“ইয়ান!”
আভিয়ানের ধ্যান ভাঙল। নিচে তাকাল সে। এক মুহূর্তের জন্য কঠোর দৃষ্টিটা নরম হয়ে এলো তার। বিনা বাক্যে এক হাত বাড়িয়ে পিহুকে তুলে নিল কোলে। পিহু হেসে ফেলল খিলখিল করে। আভিয়ান কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল মেয়েটার হাসিমাখা মুখটার দিকে। তারপর বাইকের ফুয়েল ট্যাংকের উপর সাবধানে বসিয়ে দিল তাকে।
“এখানে বসো।”
পিহু উচ্ছ্বাস নিয়ে দুহাতে হ্যান্ডেল ছুঁয়ে বলল,
“উইইই!”
ততক্ষণে অপরূপা, অভ্র ও তার মা এগিয়ে এসেছে।
অপরূপার বুকের ভেতর কেমন যেন ধুকপুক করছে।
কেন জানি আভিয়ানের দৃষ্টি আজ আরো বেশি শীতল লাগছে। অভ্র স্বাভাবিক হাসি নিয়ে বলল,
“স্যার, আপনি এখানে?”
আভিয়ান হালকা মাথা নাড়ল। দৃষ্টি স্থির পিহুর দিকে। সাবধানী সতর্কতা নিয়ে হাত জোড়া তার দুপাশে। সেভাবেই জবাব দিল,
“হুম।”
“রাইডে বের হয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
আভিয়ানের সংক্ষিপ্ত জবাব। একদম ভাবলেশহীন। অপরূপা স্পষ্টই টের পেল লোকটা কথা বলতে চাইছে না। তার পরনে কালো রঙের ব্যাগি ট্রাউজার ও টি-শার্ট। পুরুষালী পেটানোর শরীরের সাথে লেপ্টে আছে তা। শরীরের গঠন বোঝা যাচ্ছে পুরোপুরি। হাতে গ্লাভস নেই আজ। অপরূপা এক পলক তা দেখে নিজের দিতে তাকাল। তার পরনেও আজ কালো শাড়ি। সিল্ভার পারের কালো মসলিন শাড়ি। পিহুর পরনেও কালো টিশার্ট ও স্কার্ট। এমন সময় হুট করেই অভ্রর ফোন বেজে উঠল। ফোন কানে দিতেই সে বলল,
“জি… আচ্ছা, আসছি।”
কল কেটে মায়ের দিকে তাকাল।
“মা, আমাদের সিরিয়াল চলে এসেছে।”
মূলত আলো বেগমকে ডাক্তার দেখাতেই এসেছেন তারা দুজন। শপিং মলের পাশেই ক্লিনিক। অভ্র অপরূপার দিকে ঘুরে বলল,
“আমরা তাহলে আসি।”
অপরূপা নিশ্চুপ। অভ্ল আভিয়ানের দিকে একপলক তাকিয়ে বিদায় জানাল। অতঃপর তারা মেডিকেলের দিকেই চলে গেল। চারপাশে আবার কোলাহল জমল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ হয়ে রইল জায়গাটা। অপরূপা দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ
পিহু তখনো বাইকের ফুয়েল ট্যাংকের উপর বসে দুহাতে হ্যান্ডেল আঁকড়ে আছে। চোখেমুখে এমন উচ্ছ্বাস যেন পৃথিবীর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর জায়গায় বসে আছে সে।
আভিয়ান একহাতে বাইকের হ্যান্ডেল ধরে রেখেছে। অন্যহাতে আলতো করে পিহুর কোমর আগলে রেখেছে। হেলমেটের কালো গ্লাসের আড়ালেও তার দৃষ্টি স্থির লুকিং মিররে প্রতিফলিত হওয়া অপরূপার উপর। অপরূপা কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনে। শপিং ব্যাগগুলো আঙুলে ঝুলছে। চারপাশের মানুষজনের আনাগোনা, শব্দ সবকিছুর মাঝেও কেমন যেন আলাদা হয়ে আছে মুহূর্তটা। আর আভিয়ান? সে স্থির। নীরবতা ভাঙল অপরূপা নিজেই,
“আপনি এখানে কী করছেন?”
কণ্ঠটা যথেষ্ট সংযত। তবে প্রশ্নের ভেতর চাপা বিস্ময়টা স্পষ্ট।
আভিয়ান কোনো তাড়াহুড়ো করল না। বরং ধীর ভঙ্গিতে হেলমেটের গ্লাসটা আরো একটু উপরে তুলল। ভেসে উঠল সেই তীক্ষ্ণ সবুজাভ চোখজোড়া। গাঢ় ভ্রু। ঘাড় বাঁকিয়ে সরাসরি দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে জবাব দিল,
“রাইডে বের হয়েছিলাম।”
গম্ভীর, শীতল সেই কণ্ঠস্বর। তারপর কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে পাল্টা শুধাল,
“আপনি?”
অপরূপা এক পলক পিহুর দিকে তাকাল। অতঃপর বলতে নিল,
“আমি পিহুকে নিয়ে....”
আভিয়ান কথার মাঝেই নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“অভ্রর সাথে দেখা করতে এসেছেন, রাইট?”
কথাটা বলার ধরনটা অদ্ভুত। শান্ত, স্বাভাবিক। কথাটা কর্ণকুহরে প্রবেশ করা মাত্রই অপরূপা চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। উচ্চারণ করল,
“হোয়াট?”
“আমি কি ভুল বললাম?”
আভিয়ান বাইকের উপর হেলান দিল সামান্য।
“আপনাদের তো বেশ ভালো কথোপকথন চলছিল।”
অপরূপা এবার স্পষ্ট বিরক্ত হলো। বিরক্তি প্রকাশ পেল তার চোখে মুখে সহ তার কণ্ঠতেও।
“মিস্টার অভ্রর সাথে দেখা করতে আসব কেন আমি? তার সাথে এখানেই দেখা হয়েছে। আমি....”
“ইয়ান!”
হুট করেই পিহু উত্তেজিত গলায় ডেকে উঠল আভিয়ানকে। অপরূপা বাক্য সম্পূর্ণ করতর পারল না। দুজনের দৃষ্টি ঘুরে গেল তার দিকে। পিহু গর্বিত মুখে ঘোষণা দিল,
“আমরা প্লে হাউস কিনতে এসেচি!”
আভিয়ান এবার সরাসরি তাকাল অপরূপার দিকে। কয়েক সেকেন্ড। নীরব। স্থির। তারপর হুট করেই বাইক থেকে নেমে এলো সে। পিহুকে কোলে তুলে নিল এক ঝটকায়। পা চালাল সাসনের দিকে। অপরূপা কিছু না বুঝে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আগের ন্যায়। আভিয়ানের এক হাত পিহুর ভর সামলাচ্ছে। অন্যহাতে হেলমেট খুলতে খুলতে অপরূপাকে উদ্দেশ্য করে আওড়াল,
“হোল্ড দিস।"
অপরূপা এখনো ওভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। তা বুঝতে পেরে থামল আভিয়ান। ঘাড় বাঁকিয়ে গমগমে ভারি স্বরে পূনরায় আওড়াল,
"আই সেইড, হোল্ড দিস।"
অপরূপা এগিয়ে এলো। কিছু না বুঝেই অপরূপা হেলমেটটা হাতে নিল সে। আভিয়ান ইতোমধ্যে হাঁটা ধরেছে বিপরীত দিকে। অপরূপা হতভম্ব হয়ে পিছু নিল। শুধালো,
“কোথায় যাচ্ছেন?”
আভিয়ান নির্বিকার ভঙ্গিতে পা চালিয়ে জবাব দিল,
“কফি ডেটে।"
অপরূপা থমকে দাঁড়াল। মুহূর্তেই ভ্রু কুঁচকে গেল তার। বুকের ভেতর অকারণে ধুকপুকানি শুরু হলো। চারপাশের শব্দগুলোও যেন কেমন অস্পষ্ট লাগতে লাগল। সে দাঁড়িয়ে পড়তেই আভিয়ান আড়ালে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। তবে সেটা বোঝার উপায় নেই। কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে পেছনে তাকাল সে। গম্ভীর দেখাল তার মুখশ্রী। কণ্ঠটাও,
“অর ইফ কফি সাউন্ডস টু অর্ডিনারি, লেটস কল ইট ডেস্টিনি।"
অপরূপা দ্রুত এগিয়ে এলো এবার। আভিয়ানের বলা দ্বিতীয় কথাটি তার মস্তিষ্কে প্রবেশ করেনি। সে শোনেনি । কারণ সে তখনও প্রথম কথাটা নিয়েই ভাবছে।
“মিস্টার আভিয়ান, আপনি....”
কথা শেষ করার আগেই হুট করেই আভিয়ান বলে উঠল,
“ক্যান আই টাচ ইউ?”
থতমত খেয়ে গেল অপরূপা। চোখ বড় বড় হয়ে গেল মুহূর্তেই। হা করে তাকিয়ে রইল সে। লোকটা কি সত্যিই এসব বলছে? কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে আভিয়ানের দৃষ্টি তার দিকে নেই। বরং আশেপাশে। চারপাশে মানুষের ভিড় ঘন হচ্ছে। ঠিক তখনই এক মধ্যবয়স্ক লোক এদিকেই এগিয়ে আসছিল। তার দৃষ্টি, হাঁটার ভঙ্গি সবকিছুতেই ছিল অস্বস্তিকর উদ্দেশ্যের ছাপ। অপরূপার বিস্ময়কর দৃষ্টি আভিয়ানের দিকে নিবদ্ধ হলেও আভিয়ানের দৃষ্টি কার পেছনে। এগিয়ে আসা মধ্যবয়স্ক লোকটার দিকে। অপরূপা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আভিয়ান তার কবজি ধরে টেনে নিল নিজের দিকে। এক ঝটকায় জায়গা বদলে গেল তাদের। এখন আভিয়ান দাঁড়িয়ে অপরূপার আগের জায়গায়। আর অপরূপা তার পাশে, নিরাপদ দূরত্বে। আর অপরূপার দিকে আসা লোকটা ঠিক অপরূপার গা ঘেঁষে যাওয়ার আগ মুহূর্তেই সামনে আভিয়ানকে দেখে থমকে গেল।
সবুজ চোখ জোড়া তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে আভিয়ানের। চোয়াল শক্ত, কঠোর দৃষ্টি জোড়া নিয়ে এক পলক তাকাতেই লোকটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে অন্যদিকে হাঁটা ধরল। অপরূপা নির্বাক। সবকিছু এতটা দ্রুত হলো যে সে কিছু বুঝেই উঠতে পারলে না। এত দ্রুত সবটা ঘটল যে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সময়ই পেল না। আভিয়ানের দৃষ্টি স্থির সেই মধ্য বয়স্ক লোকটার দিকে। এসব লো মেন্টালিটির মানুষদের জন্য কোনো নারীই নিরাপদ নয় রাস্তাঘাটে। ঘাড় বাঁকিয়ে আনমনে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল,
"বিচ!"
অপরূপা এখনো ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আভিয়ানের দিকে। আভিয়ান দৃষ্টি ফেরাল। কিছুই হয়নি এমন ভাবেই বলল,
“আপনি যাবেন নাকি আমি আর লিটেল কিটেনই যাব?”
কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার শুধাল,
“উইচ ওয়ান?”
অপরূপা আর কথা বাড়াল না। আভিয়ান কিছি না বলে সোজা অপরূপার হাত থেকে শপিং ব্যাগ গুলো নিজের হাতে তুলে নিল। এক হাতের বাহুতে অবদ্ধ পিহু আর অপর হাতে শপিং ব্যাগ। অতঃপর হাত তুলে অপরূপাকে ইশারা করল সামনের দিকে। ছোট্ট করে বলল,
“আফটার ইউ।"
অপরূপা ধীর পায়ে হাঁটা ধরল সামনে। আর ঠিক তার পেছনেই, তাল মিলিয়ে, অদৃশ্য দেয়ালের মতো এগিয়ে চলল আভিয়ান। মলের কাঁচঘেরা করিডোরের আলো এসে পড়ছে তাদের উপর। পিহু আভিয়ানের কোলে বসে কিছু একটা বলছে, খিলখিল করে হাসছে। আভিয়ানের দৃষ্টি স্থির অপরূপার পদচারণার দিকে। পায়ে পায়ে তাল মিলিয়ে পিছু পিছু এগোচ্ছে সে। যেতে যেতে অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে বিড়বিড় করে উঠল,
“আমার স্মৃতির দস্তাবেজে অমোচনীয় হয়ে থাকুক আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ।”
______
#চলবে
মন্তব্য করে যাবেন। 🤍