#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ২২
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা
_______________________
বাইরে লোকজনের কোলাহল থাকলেও ক্যাফের ভেতরের পরিবেশটা শান্ত। কাঁচের দেয়াল ঘেঁষে বসেছে আভিয়ান ও অপরীপা। বাইরে বিকেলের মিষ্টি আলো ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে শহরের ব্যস্ততায়। নরম হলুদ আলোয় আলোকিত চারপাশ। কাউন্টারে মৃদু জ্যাজ মিউজিক বাজছে। কফির গাঢ় সুবাস মিশে আছে চারপাশে। আভিয়ান বসে আছে চেয়ারে হেলান দিয়ে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে নেমে এসেছে। তার কোলে দিব্যি আরাম করে বসে আছে পিহু। অপরূপা ঠিক তার সামনেই। তার আঙুলগুলো এখনো কফির মগ ছুঁয়ে আছে, কিন্তু মনটা যেন অন্য কোথাও।
ওয়েটার অর্ডার নিতে আসতেই আভিয়ান বিন্দুমাত্র তাকে কিচ্ছুটব জিজ্ঞেস না করেই ওয়েটারকে বলেছিল,
“ওয়ান স্ট্রং ক্যাপুচিনো এ্যন্ড ওয়ান মিল্ক কফি।”
অপরূপা তখন অবাক হয়ে তাকিয়েছিল কেবল। কারণটা হলো মিল্ক কফিটাই তার পছন্দ। আভিয়ানের মুখে অবশ্য কোনো ভাবান্তর নেই। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বসে আছে সে। পিহুর সামনে পেস্ট্রি ও ডোনাট। হঠাৎ করেই পিহু মুখ ভরা পেস্ট্রি নিয়ে উচ্ছ্বাসে বলে উঠল,
“ইয়ান, জানো? আমাদের বাসায় অনেক বড়ো এত্তা বসক এসেছিল! সেকানে অনেক বই ছিল। কপিও ছিল।”
আভিয়ান কাপের উপর আঙুল ঠুকতে ঠুকতে চোখ তুলল।
দৃষ্টি মেলল অপরূপার দিকে। তবে প্রশ্নটা করল পিহুকেই।
“আচ্ছা? কে পাঠিয়েছে?”
পিহু গাল ফুলিয়ে মাথা নাড়ল। গোল গোল চোখ করে চেয়ে বলল,
“জানি না। মাম্মাও জানে না।”
আভিয়ান আবারো ধীর দৃষ্টিতে তাকাল অপরূপার দিকে। সরাসরি তাকেই প্রশ্ন করল,
"বাহ! কে পাঠাল?"
"জানি না। নাম ঠিকানা লেখা ছিল না কারো।"
অপরূপার তৎকালীন স্পষ্ট জবাব। আভিয়ানচোখ নামিয়ে তাকাল পিহুর দিকে। যে কি-না একটু একটু করে পেস্ট্রি চামচে তুলে খাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়েই আভিয়ান ধীর স্বরে বলে উঠল,
“হয়তো অভ্র পাঠিয়েছে।”
আভিয়ানের মিখে এমন কথা শুনে সাথে সাথে অপরূপার ভ্রু কুঁচকে গেল। বিকৃত হলো চেহারার গঠন। মসৃণ ত্বকে ভাজ ফেলে বলে উঠল,
“না। উনি কেন দেবেন? উনি পাঠাননি কিছুই।”
অপরূপার কণ্ঠস্বরে বিরক্তি স্পষ্ট। আভিয়ান কফির মগে চুমুক দিল। ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল তার। তবে সেই হাসিটা অপরূপার নজরে পড়ল না, পড়ার মতোও না। পিহু একা একা খেতে পারছে না। তা দেখে আভিয়ান নিজেই চামচটা নিজের হাতে তুলে নিল। পিহুর জন্য আনা ডোনাটটা ছোট ছোট টুকরো করে পিহুকে খাইয়ে দিতে লাগল ধৈর্য নিয়ে। খাওয়ার মাঝে মাঝে টিস্যু দিয়ে ঠোঁট মুছিয়ে দিল। তবে পিহু বড্ড তাড়াহুড়ো করছে দেখে আভিয়ান সতর্ক হলো। নরম স্বরে বলল,
“আস্তে খাও, লিটেল কিটেন। শ্বাস আটকে যাবে।”
পিহু খিলখিল করে হেসে উঠল। খেতে খেতে বলল,
“তুমি বুড্ডু, ইয়ান!”
ভ্রু কুঁচকে গেল আভিয়ানেন। এই বুড্ডুটা আবার কী? কৌতুহল দমাতে না পেরে নিজেও উচ্চারণ করল,
“বুড্ডু?”
“হুম!”
উপর নিচ মাথা দুলিয়ে জবাব দিল পিহু। আভিয়ান শুধালো,
"বুড্ডু কী?"
পিহুর হাসিটা আরো গাঢ় হলো। আরো শব্দ করে হেসে উঠল সে। ছোট্ট হাতের তর্জনী আঙুল তুলে কয়েকবার আভিয়ানের গলায় খোঁচাল। জবাব দিল,
"বড্ডু বুড্ডু, তুমি বুড্ডু।"
আভিয়ানের হতভম্ব অবুঝ মুখ ভঙ্গীটা দেখার মতো হলো। অপরূপা কফির মগে ঠোঁট ছোঁয়াতেই আভিয়ানের সেই কুঁচকে যাওয়া মুখটা নজরে পড়ল তার। মুহূর্তেই না চাইতেও হেসে ফেলল সে। এলিয়েন বলাটা ভুল হয়নি সেদিন। নিজের হাসিটা নিয়ন্ত্রণ করে সে নিজেই জবাব দিল,
"পিহু বোঝাতে চেয়েছে আপনি বোকা।"
পিহুর বলা শব্দের মানে ভাবায় এতটা সময় ব্যস্ত ছিল আভিয়ান। এ পর্যায়ে অপরূপার কণ্ঠস্বর শ্রবণে প্রবেশ করতেই চোখ তুলে তাকাল সে তার পানে। মুখটা যেন আরো বিকৃত হলো। অপরূপা মুখে হাত তুলে নিজের হাসিটা নিয়ন্ত্রণ করল। আভিয়ান পরমুহূর্তে বিষয়টা বুঝতে পেরে অপ্রস্তুত হয়ে পিহুর দিকে তাকাল। পিহু তখনো হেসে চলেছে। এ পর্যায়ে আভিয়ানও হাসল পিহুর দিকে তাকিয়ে। পিহুর ছোট্ট হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চুমু খেল হাতে। জবাব দিল,
"ইয়েস, ইয়ান বুড্ডু। জাস্ট ফর ইউ, মাই লিটেল কিটেন।"
পিহু চটজলদি মাথা দুলাল। অসম্মতি প্রকাশ করে বলল,
"না না না! ইয়ান বুড্ডু না , ইয়ান ভালো। পিহু মজা করচিল।"
"আচ্ছা?"
"হুম।"
"এবার খাবার শেষ করো, লিটেন কিটেন।"
পিহু ঘাড় কাত করে সায় জানাল। আভিয়ান আবারো মনোযোগ দিল পিহুকে খাওয়ানোর দিকে। ব্যস্ত হলো দু'জন। সেদিকে অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে অপরূপা। অদ্ভুত এক ঘোরে পড়ে গেল সে। দৃষ্টিটা স্থির হয়ে রইল দু'জনের পানে। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো, এই যত্ন, এই আদর, এই সবই তো পিহুর প্রাপ্য ছিল তার বাবার কাছ থেকে। একটা স্বাভাবিক সংসার থেকে। কিন্তু জীবন বড় বিচিত্র। যাকে পাওয়ার কথা ছিল সেই এমন একটা পথে এসে হাত ছেড়ে দিল যে সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল এক নিমিষেই। আবার কিছু মানুষ অজান্তেই জায়গা করে নিল বর্তমান জুড়ে।অপরূপা ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আফসোস করেই বা কী? লাভ আছে আদেও? সৈকতের খবর তার জানা নেই। দুটো বছর পেরিয়েছে তার খবর নেওয়া ছেড়েছে অপরূপা। বাঁচুক মরুক যা খুশি হোক, কোনো যাইআসে না তার। তবে সে বিশ্বাস করে প্রকৃতি হিসাব বাকি রাখে না। সৈকত যা করেছে তার ফল সে পাবেই। হয়তো একটু আগে বা একটু পরে। বা হয়তো শেষে গিয়ে। দ্বিতীয় দফায় দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো অপরূপার থেকে। আবারো তাকাল আভিয়ানের পানে। লোকটা পিহুর প্রতি অনেকটা বেশি যত্নশীল। অল্প কয়েকটা দিনে এতটা মিশে গিয়েছে, বিষয়টা অদ্ভুত। অপরূপা মগে ঠোঁট ছুঁইয়ে হঠাৎ করেই আভিয়ানকে জিজ্ঞেস করে বসল,
“আপনি পিহুর সাথে এতটা এটাচড হচ্ছেন কেন?”
প্রশ্নটা কর্ণকুহরে প্রবেশ করা মাত্রই আভিয়ানের হাত থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড সম্পূর্ণ নীরবতা। তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল সে। গভীর সবুজাভ চোখদুটো স্থির হলো অপরূপার মুখে।
“এতে কি আপনার কোনো সমস্যা হচ্ছে?”
প্রশ্নের বিপরীতে গম্ভীর সোজাসাপ্টা প্রশ্ন আভিয়ানের। অপরূপা থতমত খেয়ে গেল। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“না না, মানে আমি সেভাবে বলিনি। আপনি...."
তার অস্বস্তি বুঝতে পেরেই আভিয়ান দৃষ্টি সরিয়ে নিল। আবার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ফিরে পিহুকে খাওয়াতে খাওয়াতে জবাব দিল,
“কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষ হুট করেই কিছু নামহীন সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। আর সেই সম্পর্কগুলো তৈরি হয় মনের গভীর থেকে। কোনো কারণের ভিত্তিতে না।”
থেমে গেল রমণী। বাক্য হারিয়ে বসেছে সে। আভিয়ানের এরূপ জবাবের বিপরীতে ঠিক কী বলবে সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না। অদ্ভুতভাবে বুকের ভেতরটা কাঁপছে তার। সময়ের সাথে সাথে অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল অপরূপার। কফির মগে চুমুক দিয়ে তাকাল বাইরের দিকে। রাস্তার আলো ঝাপসা হয়ে আছে কাঁচের দেওয়ালে।এদিকে আভিয়ান তাকিয়েই আছে তারই দিকে একদৃষ্টিতে।
পরপর চোখাচোখি হতেই নিখুঁত ভঙ্গিতে দৃষ্টি সরিয়ে নিল সে।
গলা পরিষ্কার করে বলল,
“আগামীকাল ফেইড লিড রিসোর্টে ডিল সাইনের পার্টি এরেঞ্জ করা হয়েছে। জানেন নিশ্চয়?”
অপরূপা মাথা নাড়ল। জবাব দিল অত্যন্ত শীতল স্বরে,
“হুম। মিস্টার অভ্র বলেছে। তবে...”
“ডোন্ট ওয়ারি।”
মাঝপথেই থামিয়ে দিল আভিয়ান।
“আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেব। গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন।”
অপরূপা কিছু বলতে নিতেই আবার যোগ করল সে,
“শুধু আপনাকে না। গাড়িটা ইধিকাকেও পিক করবে।”
এবার আর কিছু বলল না অপরূপা। শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। পিহু এখনো আভিয়ানের কোলে বসে ডোনাটের শেষ অংশটুকু খাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। অপরূপা মগে শেষ চুমুক দিল। আর ঠিক তখনই আভিয়ানের দৃষ্টি হঠাৎ থেমে গেল ক্যাফের একদম শেষ মাথার দিকে।
মুহূর্তেই চোখ-মুখ কুঁচকে এলো তার। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল স্পষ্ট। অপরূপা কিছু বুঝে উঠার আগেই আভিয়ান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কোণার টেবিলটার দিকে। সেখানে বসে আছে জাওভান, ফুয়াদ আর নিদ্রা। তিনজনেই গালে হাত দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এদিকেই। চোখেমুখে এমন কৌতূহল যেন বহু প্রতীক্ষিত কোনো সিনেমার ক্লাইম্যাক্স দেখছে তারা। জাওভানের মুখ তো পুরো হাঁ হয়ে আছে।ফুয়াদের চোখ গোল। আর নিদ্রা ঠোঁট কামড়ে বসে আছে, স্পষ্টই কিছু মিলানোর চেষ্টা করছে মস্তিষ্কের ভেতর। আভিয়ান চোখ রাঙাতেই জাওভান দ্রুত দুই হাত তুলে ইশারা করে বলল,
“আমি আসি?”
আভিয়ানের চোখের দৃষ্টি কঠোর হলো। পকেট থেকে ফোন বের করল চটজলদি।কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জাওভানের ফোন ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল আভিয়ানের মেসেজ।
“ডোন্ট ইউ ডেয়ার।"
তার নিচে আরো দুই একটা সংক্ষিপ্ত গালি। যা পড়ার সাথে সাথে জাওভানো বিড়বিড় করো গালি ছুড়ল সরাসরি তাকিয়ে। জাওভান মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করল,
“এত রূড কেন মানুষটা! কড়লার বংশধর!"
ঠিক তখনই নিদ্রা ফোনটা কেড়ে নিল জাওভানের হাত থেকে।
মেসেজ পড়ে ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল আভিয়ানের দিকে। তারপর দ্রুত টাইপ করল,
“কী চলছে এসব? তলে তলে বিয়ে করে বাচ্চাও পয়দা করে ফেলেছিস নাকি? কিছু জিজ্ঞেস করলে বলছিসও না!”
মেসেজটা পড়ল আভিয়ান। খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখাল না সে। বরং স্বাভাবিক ভাবেই রিপ্লাই দিল,
“সময় হলে বলব।”
এর বেশি কিছু লিখল না আর। ফোনটা উল্টো করে টেবিলে রেখে দিল। সবকিছুই এত দ্রুত ঘটল যে অপরূপা কিছুই বুঝল না। সে শুধু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল কেবল। আভিয়ান কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে অপরূপাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“বাড়ি ফিরবেন না?”
অপরূপা ধীরে মাথা নাড়ল। ছোট্ট করে জবাব দিল,
“ফিরব।”
আভিয়ান উঠে দাঁড়াল। অপরূপাকে কিছু বুঝে উঠতে দেওয়ার আগেই কাউন্টারে দিয়ে বিল মিটিয়ে ফিরে এলো। এক হাতে অনায়াসে পিহুকে কোলে তুলে নিল। অন্য হাতে শপিং ব্যাগগুলো। তারপর স্বাভাবিক কণ্ঠেই বলল,
“চলুন। পৌঁছে দিচ্ছি।”
অপরূপা সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি করল।
“না না, লাগবে না। আমরা...."
“প্লিজ মাম্মা, আমি বাইকে যাব! ইয়ানের সাতে যাব!”
হুট করেই বায়না ধরল পিহু। অপরূপা কড়া চোখে তাকাল মেয়ের দিকে। পিহু গাল ফোলাতেই আভিয়ান আর কিছু না বলেই হাঁটা ধরল ক্যাফের বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
“দ্রুত আসুন।”
অপরূপা কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল স্থির জায়গায়। অতঃপর বাধ্য হয়েই পার্সটা হাতে তুলে উঠে দাঁড়াল । পরক্ষণেই হেলমেটের কথা মনে পড়তেই দ্রুত সেটা হাতে নিল।
এরপর প্রায় ছোটাছুটি করেই বের হলো আভিয়ানের পিছু পিছু। আর পুরো দৃশ্যটাই যেন সিনেমার দৃশ্যের মতো উপভোগ করছিল দূরে বসে থাকা তিনজন। জাওভান মুখ হাঁ করে তাকিয়ে বলল,
“আমি কি জীবিত অবস্থায় এসব দেখছি?”
ফুয়াদ এখনো হতবাক!
“মানে... মানে... আভি... ভাই ও তলে তলে বিয়েও করে ফেলছে?”
ফুয়াদের চোয়াল ঝুলে পড়েছে। নিদ্রাও এবার গম্ভীর মুখে বলল,
“আমি তো প্রথম থেকেই সন্দেহ করছিলাম।”
জাওভান ঠোঁট কামড়ে মাথা নাড়ল। উচ্চারণ করল,
“আরেহ না।”
ফুয়াদ সাথে সাথে তাকাল তার দিকে।
“মানে?”
জাওভান গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
“বাচ্চাটা আভির না।”
এইবার নিদ্রা আর ফুয়াদ দুজনেই এমনভাবে তাকাল যেন জাওভান পৃথিবীর সব রহস্য জেনে বসে আছে। ফুয়াদ চেয়ার ছেড়ে সামনের দিকে ঝুঁকে এলো।
“তুই সব জানিস?”
নিদ্রাও চোখ সরু করল। কিছুটা ধমকেই উঠল,
“বল।”
জাওভান সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত তুলে সারেন্ডারের ভঙ্গিতে পেছনের দিকে ঝুঁকে গেল। দু'দিকে মাথা নেড়ে চটজলদি গলা ছাড়ল,
“আগেই বলছি, আমি কিছু জানি না ভাই! আভি শুধু অপরূপার ডেটা দিয়ে বলেছিল পার্সোনাল কিছু টপিক বের করতে। আমি শুধু সেটুকুই করেছি। ট্রাস্ট মি! এদের মাঝের কাহিনী কিছুই জানি না!”
ফুয়াদ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জাওভানের দিকে।জাওভানের চুল টেনে ধরল সে,
“তুই মিথ্যা বলছিস।”
“ওয়াল্লাহ মিথ্যা না!”
নিদ্রা এবার চেয়ার হেলান দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কাঁচের বাইরে তাকিয়ে উচ্চারণ করল,
“আভিয়ানের জীবনে প্রেম আসবে এটাই তো কল্পনার বাইরে ছিল।”
ফুয়াদ ছেড়ে দিয়ে নিজেও বসে পড়ল চেয়ারে। মূলত আভিয়ানই রাইডে বের হবে বলে ডেকেছিল তাদের। বলেছিল মলের সামনে থেকে আজ বিপরীতে যাবে। তাই তো কথা মতো জাওভান আগে পৌঁছাল। আর সে যখন এলো তখনই আভিয়ান ক্যাফের দিকে ঢুকছিল। জাওভান কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিদ্রা ও ফুয়াদও হাজির হয়েছিল। তারপর পিছু নিয়ে ক্যাফের এক কোণে এসে বসা। জাওভান হুট করেই নিদ্রার প্রশ্নের জবাবে বলে উঠল,
“প্রেম না ভাই এটা মনে হয় সোজা মানসিক রোগে গিয়ে ঠেকছে।”
ফুয়াদ মাথা নেড়ে বলল,
“ওর চোখ দেখলি? যেভাবে তাকাচ্ছিল! বাবাহ, যেন চোখ দিয়েই গিলে খাবে। কেস দেখি জম্পেস। কিন্তু তাই বলে এক বাচ্চা মা...”
নিদ্রা কফির মগ হাতে তুলে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
"স্টপ ফুয়াদ। কারো বিষয়ে মন্তব্য করার আগে আমাদের সবটা জানা উচিত। ভেতরের কাহিনী তো অন্য কিছুও হতে পারে, তাই না?"
জাওভান সায় জানাল। ঠোঁটে ফুটল হাসি। নিজেও কফির মগে ঠোঁট ছোঁয়াল। জবাব দিল,
" একজ্যাক্টলি। আর অপরূপা মেয়েটা সিঙ্গেল মাদার। জীবনে অনেক সাফার করে এই পর্যন্ত এসেছে। যদি আভির মনে অন্য কিছু থেকেও থাকে তবে আমাদের উচিত সেই অনুভুতিকে সম্মান করা।"
"হ্যাঁ, দিন শেষে ও অন্তত নিজেকে গুছিয়ে নেক।"
শেষ কথাটা নিদ্রাই বলল। সবাই হাসল কিছুটা। পরপর আভিয়ানের সুন্দর একটা ভবিষ্যতের ভাবনায় মত্ত হলো তিনজনই। এবার শুধু আভির মুখ থেকে সবটা সোনার পালা, জানার পালা।
________
প্রকৃতি বড় বৈচিত্র্যময়। কখন কোন রূপে ধরা দেবে, তা কেউ আগে থেকে আন্দাজ করতে পারে না। এই যেমন সারাটা দিন ছিল ঝকঝকে রোদে মোড়া। আকাশে একফোঁটা মেঘও ছিল না। অথচ সন্ধ্যা গড়াতেই হুট করে বদলে গেল সব। বাইরে এখন ঝড়। দমকা হাওয়ায় জানালার কাঁচ কেঁপে উঠছে বারবার। আকাশ বিদীর্ণ করে চমকে উঠছে বজ্রপাত।মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে শহরের বুকে। মাঝপথে এমন আচমকা বৃষ্টি শুরু না হলে হয়তো এতটা ঝামেলা হতো না। তবে আভিয়ানের বাইকে করে আসায় অন্তত পুরোপুরি ভিজতে হয়নি তাদের। এই মুহূর্তে ড্রয়িংরুমে আধভেজা অবস্থায় বসে আছে আভিয়ান। কালো টি-শার্টটা শরীরের সাথে লেপ্টে আছে হালকা। চুলগুলো থেকে এখনো টুপটুপ করে পানি পড়ছে। সে সামনের দিকে খানিকটা ঝুঁকে বসে আছে। আর কাঁচের টি-টেবিলের উপর বসে পিহু দুই হাতে তোয়ালে ধরে মন দিয়ে তার চুল মুছিয়ে দিচ্ছে।
“নড়বা না!”
গম্ভীর মুখে ধমক দিল পিহু। আভিয়ান বিনা বাক্যে মাথা নিচু করল আরো। নরম স্বরে জবাব দিল,
“ওকে, লিটেল কিটেন।”
“এইদিকে ঘুরো।”
আভিয়ান বাধ্য ছেলের মতো মাথা ঘুরিয়ে দিল। পিহু এবার বেশ খুশি হলো। হাসি হাসি মুখ করে বলল
“গুড বয়।”
আভিয়ানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল ক্ষীণ হাসির রেখা। ঠিক তখনই বেডরুম থেকে বেরিয়ে এলো অপরূপা। পিহুকে ফ্রেশ করিয়ে নিজেও তাড়াহুড়ো করে গোসল সেরে নিয়েছে সে। নীল রঙের শাড়িটা ভেজা শরীরে অদ্ভুত কোমলতায় ফুটে উঠেছে। আঁচলটা দুই ভাজ করে কাঁধে তোলা। মাথায় গামছা পেঁচানো। সদ্য স্নানের জল এখনো গাল বেয়ে গলায় গড়িয়ে পড়ছে। ড্রয়িং রুমে পা পড়তেই সামনের দৃশ্যটা নজরে পড়ল তার। জমে গেল তার পা। মেয়েটা কী খুশি মনে আভিয়ানের চুল মুছর দিচ্ছে। আভিয়ান নড়াচড়া করলে আবার ধমকও দিচ্ছি। আভিয়ানও তাতে সায় জানিয়ে কথা শুনছে। অপরূপা নিজেকে সামলে নিল। চোখ সরিয়ে এগিয়ে এলো।
“পিহু, দুষ্টুমি করো না।”
অপরূপার কণ্ঠ কানে যেতেই মাথা তুলল আভিয়ান। আর পরমুহূর্তেই তার মস্তিষ্ক যেন জট পাকিয়ে গেল। দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল অপরূপার উপর। সদ্য স্নানে ভেজা মুখটা, ভেজা গাল, নীল শাড়ির ফাঁকে উন্মুক্ত ফর্সা গলা দৃষ্টি এড়ালো না তার। না চাইতেও বেহায়া দৃষ্টি জোড়া আটকাল অপরূপার ঠিক গলার বাঁদিকে ছোট্ট কালো তিলটার উপর। আভিয়ানের বুকের ভেতর ধক করে উঠল তৎক্ষণাৎ। শুকনো ঢোক গিলল সে।দৃষ্টি সরাতে চাইল তবে পারল না। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ থেমে গেল সে। ঠিক তখনই পিহু তোয়ালেটা হাতে নিয়ে দৌড়ে এলো অপরূপার কাছে।
“মাম্মা, আমার কিদে পেয়েছে।”
অপরূপা চোখ সরাল আভিয়ানের দিক থেকে। মেয়ের উদ্দেশ্যে বাক্য ছুড়ল,
“তোয়ালেটা চেয়ারের উপর রেখে আসো। আমি খাবার বাড়ছি।”
“ওক্কে!”
পিহু দৌড়ে চলে গেল। আর পিহু যেতেই আবারো চোখাচোখি হলো দুজনার। অপরূপার দৃষ্টি এবার সরাসরি এসে আটকাল আভিয়ানের উপর। আভিয়ান তৎক্ষণাৎ চোখ ফিরিয়ে নিল।
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। নিজের ভেতরের অযাচিত অনুভূতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না সে। কিছু নিষিদ্ধ চাওয়ার উঁকি দিচ্ছে মনে, যা একদমই ঠিক নয়। হৃৎস্পন্দনের গতি বাড়ল কয়েকগুন। বুকের ভেতর চাপা অস্থিরতা জমেছে। গলা শুকিয়ে আসছে। হুট করেই উঠে দাঁড়াল আভিয়ান। হাত দিয়ে গ্রীবাদেশ ছুঁয়ে বলল,
“আমি আসছি।”
অপরূপা ভ্রু কুঁচকে তাকাল আভিয়ানের অস্থির মুখাবয়বের দিকে। বাইরে শব্দ সরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝড় বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। সে শান্তে স্বরেই বলল,
“এখন? ঝড় তো আরো বেড়েছে। কমুক, তারপর না হয় যাবেন।”
আভিয়ানের শ্বাস প্রশ্বাস ভারি। সে এক হাত চালাল নিজের চুলে। নিচু স্বরে আনমনেই বিড়বিড় করে আওড়াল,
"এই ঝড় কমার নয়, বরং অবস্থান নেবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে।"
একটু থেমে চোখ বন্ধ করে নিল। আবারো বিড়বিড় করল,
"আর একবার আমার হৃদয়ে চলা ঝড় নিয়ন্ত্রণ হারালে আপনি তা মোকাবেলা করতে পারবেন না, আমার অপ্সরা।"
অপরূপার কপালে ভাজ পড়ল। আভিয়ানকে বিড়বিড় করতে দেখে শুধালো,
“কিছু বললেন?”
আভিয়ান মাথা নাড়ল দু'দিকে। যার অর্থ দাঁড়াল, কিছুই হয়নি। জবাব দিল ছোট্ট করে,
“নাথিং।”
অপরূপা গুরুত্ব দিল না আর। রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলল,
“আপনি বসুন। খেয়ে দেয়ে তারপর যাবেন।”
কথাটা শুনেই আভিয়ান চোখ বন্ধ করল শক্ত করে।
নিজের মনেই ফিসফিস করল,
“আপনি নিজের বিপদ নিজেই ডাকছেন, স্নো হোয়াইট। আমার তৃষ্ণা এখন আর সভ্যতার শিকলে বাঁধা নেই।"
বড় বড় করে শ্বাস নিচ্ছে বেচারা। অস্থির লাগছে বড্ড। এক হাত দিয়ে নিজের ভেজা চুল খামচে ধরল আভিয়ান। অতঃপর হাত নামিয়ে ঘাড় চেপে ধরে হিসহিসিয়ে নিজেকেই বলল,
"গেট এ্যা গ্রিপ আভিয়ান!"
লাভ হলো না। বরং এখানে আরেক মুহূর্ত দাঁড়ানো মানেই একটা ভয়ংকর কিছু ঘটে যাবে। নিজেকেই ধমকাল সে। কিন্তু মস্তিষ্কে বারবার ভেসে উঠছে অপরূপার ভেজা মুখটা, স্নিগ্ধ রূপ আর গলার সেই কালো কুচকুচে তিলটা। আভিয়ান দাঁড়াল না আর। দ্রুত হেলমেটটা হাতে তুলে নিল। তারপর কোনো কথা না বলেই ধুমধাম পায়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল সে। শব্দ পেয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো অপরূপা।চারপাশে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল।
“মিস্টার আভিয়ান?”
ডাকল সে। কেউ নেই। পরপর দেখল দরজা খোলা। বের হয়ে দেখল সে নেই। দ্রুত দরজা আঁটকে অপরূপা বারান্দার দিকে এগিয়ে এলো। বাইরে ঝড় আরো তীব্র হয়েছে। রাস্তার নিচে দাঁড়িয়ে আভিয়ান বাইকে উঠছে। এক লহমায় ভিজে অবস্থা বেগতিক। হেলমেট পরে আভিয়ান স্টার্ট দিল বাইক। ঠিক তখনই আকাশ চিরে আঁছড়ে পড়ল তীব্র বজ্রপাত। সাদা আলোয় কয়েক মিলিসেকেন্ডের জন্য আলোকিত হয়ে উঠল চারপাশ। আর সেই ক্ষণিক আলোতেই চোখাচোখি হলো দুজনের। দূরত্বের মাঝেও আভিয়ানের চোখদুটো অদ্ভুত তীব্র।
অস্থির। গভীর। পরমুহূর্তেই সে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। বাইকটা হাইস্পিডে ছুটে গেল বৃষ্টিভেজা রাস্তা ধরে। আর অপরূপা স্থির দাঁড়িয়ে রইল বারান্দায়। ভেজা বাতাস এসে আছড়ে পড়ছে তার মুখে। পেছন থেকে ডাক এলো পিহুর,
"মাম্মা, ইয়ান কোতায়? ইয়ান তো তার ফোনই রেকে গেচে।"
মেয়ের কথা শুনে হুঁশ ফিরল অপরূপার। চটজলদি ভেতরে এলো। পিহুর হাতে আভিয়ানের ফোন। সে হিসাব মেলাতে পারছে না হুট করে আভিয়ান চলে কেন গেল? ফোনটাও ফেলে রেখে গেছে। অপরূপা ফোনটা হাতে নিল। কিছু না বলেই ফোনটা নিয়ে রাখল নিজের ব্যাগে। পিহুকে বলল,
"কাল দিয়ে দেওয়া যাবে।"
পিহু মাথা দুলাল। পরপর অপরূপা পিহুকে নিয়ে গেল খাওয়াতে। অথচ সে যদি একটাবার ফোনটা চালু করতে তবে তার নজরে পড়ত একটি অভাবনীয় দৃশ্য। ওয়ালপেপারে থাকা একজোড়া চোখ, নারীর একজোড়া কালো কুচকুচে রঙের আঁখি পল্লব। যা তার চেনা, বড্ড চেনা। কারণ চোখ দুটো যে তারই।
_______
#চলবে
মন্তব্য করে যাবেন। দ্রুত ৫০০+ রিয়াক্ট তুলে দিন ঝটপট।🤍