ফন্ট সাইজ:
থিম:
ঝরা শিউলির দিনে

২৪তম পর্ব

লেখক: তামান্না ইসলাম শিমলা

#ঝরা_শিউলির_দিনে

#পর্ব ২৪

#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

রিসোর্টের চারপাশে আলো আর অন্ধকারের এক অদ্ভুত মিশেল। দূরের ফোয়ারা থেকে ভেসে আসছে পানির শব্দ। হালকা বাতাসে উড়ছে সাদা পর্দাগুলো। ভেতরের সুরেলা মিউজিক বাইরে পর্যন্ত ভেসে আসছে ক্ষীণভাবে। আর ঠিক সেই সময় অন্ধকার দিকটা চিরে খটখট শব্দ তুলে এগিয়ে এলো কেউ। দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ তার।সবার আগে নজরে পড়ল হাই হিলের চিকচিকে মাথা। তারপর ধীরে ধীরে আলোয় ভেসে উঠল অবয়বটা।

রেড বডিকন ড্রেসে মোড়া এরিনা।

চুলগুলো খোলা। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। চোখে কালো স্মোকি শেড। অপরূপা কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে এরিনার দিকে। পিহুও গোল গোল চোখ করে দেখছে মেয়েটাকে। কেবল আভিয়ানের মুখভঙ্গিটাই পুরো বিপরীত। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে তার। কপালের রগ ফুলে উঠছে সামান্য। দৃষ্টিতে স্পষ্ট বিরক্তি। মুহূর্তেই যেন তার মস্তিষ্ক জ্বলে উঠেছে।

এরিনা ধীর পায়ে এসে ঠিক আভিয়ানের সামনে দাঁড়াল।

তারপর বাঁকা হাসি হেসে পাশ ফিরে তাকাল অপরূপার দিকে। চোখ বুলাল মাথা থেকে পা পর্যন্ত। পরমুহূর্তেই আবার আভিয়ানের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

"ড্যাডি, হু ইজ শি?'

অপরূপা থমকে গেল এরিনার মুখে আভিয়ানের এমন সম্বোধনে। ড্যাডি? চোখের পাতা কেঁপে উঠল তার।

এত বড় একটা মেয়ে সে আভিয়ানকে ড্যাডি বলছে কেন?

মস্তিষ্কে যেন মুহূর্তেই গিঁট লেগে গেল। সে ভাবছে তাহলে এরিনা কি সত্যিই আভিয়ানের মেয়ে? কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? না না, বয়সের হিসেব তো মিলছে না! তাহলে?

ভাবনাগুলো মাথার ভেতর এলোমেলো হয়ে ঘুরপাক খেতে লাগল অপরূপার। তবে ভাবাভাবির সময় নিল না পিহু। ছোট্ট মস্তিষ্ক না বুঝেই আভিয়ানকে সরাসরি বলে বসল,

“ইয়ান! এই আন্তিতা তোমার মেয়ে?”

একটু থেমে আবার নিষ্পাপ বিস্ময়ে যোগ করল,

“তোমার এত বড় এত্তা মেয়েও আছে?”

এক সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ পরিবেশ থমকে গেল। আভিয়ান চোয়ালের কঠোরতা বাড়ল। অপরূপা তৎক্ষনাৎ ধমকে উঠল মেয়েকে,

“পিহু!”

তাড়াতাড়ি ধমকাল সে। কিন্তু পিহু তো তখনো অবাক। সে কি আর এসব বোঝে?

“কী হয়েচে? উনই তো দ্যাদি বলল!”

পিহুুর কথা শুনে এরিনা এবার হেসে উঠল। পিহুর গাল টেনে দিয়ে বলে উঠল,

" হাউ কিউট এন্ড ইনোসেন্ট কিড। এ ই ড্যাডি সেই ড্যাডি না, বাচ্চা।"

পিহু বুঝল না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সে এরিনার মুখপানে। অপরূপাও কপছু বুঝেনি। সে এসবে অভ্যস্ত নয়। আভিয়ান ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে বেশি দেরি নেই। চোখ খুলে শক্ত স্বরে বলল,

"এরিনা, বিহেভ ইয়্যুসেল্ফ।"

এরিনা ভ্রু তুলল।

“এক্সকিউজ মি? আমি কী করলাম?”

“তুমি খুব ভালো করেই জানো।”

“ওহ প্লিজ!”

সে বিরক্তি নিয়ে চুল সরাল নিজের চোখের সামনে থেকে। আভিয়ানের কণ্ঠস্বর এবার আরও ঠাণ্ডা হয়ে এলো। সে চাচ্ছে না এত গুলো মানুষের সামনে এরিনার সাথে রুর আচরণ করছে। তবে মেয়েটা বিরক্তিকর। এরিনার নজরে পড়ল আভিয়ানের পাশে দাঁড়ানো রমণীর পানে। হুট করেই কপালে ভাজ পড়ল তার। এতক্ষণে তার নজর পড়েছে এরিনার যে এই মেয়েটা ও আভিয়ান ম্যাচিং ড্রেস পড়েছে। এরিনা কিছু বলতেই যাবে এমন সময় তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এলো অভ্র। ব্যস্ত স্বরে উচ্চারণ করল,

“স্যার, সব রেডি। ক্লাইন্টরা অপেক্ষা করছে। সাইনিং শুরু করতে হবে।”

অভ্রের নজর কোনো দিকে নেই। সে বলেই আবার ছুটেছে। আভিয়ানও আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। পিহুকে নিয়েই সে পা বাড়াল। অপরূপা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। আভিয়ান ইতোমধ্যে ভেতরের দিকে হাঁটা শুরু করেছে। পিহু তার কাঁধে ভর দিয়ে হাত নাড়ছে।

“মাম্মা তাতা।"

অপরূপা কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল স্থির।

পাশেই এরিনা। হাতে তার ওয়াইনের গ্লাস। সে গ্লাস তুলে এক চুমুক দিল। অপরূপাকে আরেক দফা পা থেকে মাথা অব্দি দেখে নিয়ে গা-ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,

"আপনি কে বলুন তো? আর ওই বাচ্চা? হু ইজ শি?"

অপরূপা এরিনান দিকে তাকাল। সে স্পষ্টতই জবাব দিল,

"আমি এই কোম্পানির এমপ্লয়ি।"

"তাহলেই ভালো।"

ভ্রু কুঁচকে নিল অপরূপা। শুধালো,

“মানে?”

এরিনা কাঁধ ঝাঁকাল। জবাব দিল,

"নাথিং। হেয়াটেভার।"

কথা শেষ না করেই সে ঘুরে দাঁড়াল। হাই হিলের খটখট শব্দ তুলে হেঁটে চলে গেল আলো-অন্ধকারের ভেতর। আর অপরূপা দাঁড়িয়ে রইল স্থির হয়ে। মাথার ভেতর হিসাবগুলো মেলানোর চেষ্টা করছে সে। কিন্তু যতই মিলাতে চাচ্ছে সবকিছু যেন আরও বেশি জট পাকিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল অপরূপা। এসব নিয়ে আর ভেবে লাভ নেই। ইতোমধ্যে পার্টির আমেজ বেড়েছে। কেউ ওয়াইনের গ্লাস হাতে হেসে কথা বলছে। কেউ ব্যবসায়িক আলোচনার মাঝেও স্ট্যাটাস ধরে রাখতে জোর করে অ্যালকোহোল নিচ্ছে। হালকা জ্যাজ মিউজিকের সুর ভেসে বেড়াচ্ছে চারপাশে। কোলাহল থেকে খানিকটা দূর বারান্দার শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে অপরূপা।

এখানে ভিড় তুলনামূলক কম। সামনেই অন্ধকার জলরাশি। রিসোর্টের লেকের পানিতে আলো প্রতিফলিত হয়ে ঝিকমিক করছে। হাতে ধরা সফট ড্রিংকসের গ্লাসটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে। চারপাশে প্রায় সবাই কমবেশি ড্রিংকস করছে। যেন এটাই সামাজিকতার অলিখিত নিয়ম। অপরূপার এসব ভালো লাগছে না।

সে মূলত ইধিকার জন্য অপেক্ষা করছে। এই পুরো অফিসে ইধিকা ছাড়া আর কারো সাথে তার স্বস্তিকর সম্পর্ক নেই। এমন সময় পেছন থেকে ভেসে এলো এক পুরুষ কণ্ঠ।

“মিস অপরূপা?”

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখতে পেল সে রাহাতকে অফিসের মার্কেটিং টিমের একজন। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। চুলে জেল দেওয়া। মুখে কৃত্রিম হাসি। হাতে ওয়াইনের গ্লাস। অপরূপা ভদ্রতার খাতিরে ক্ষীণ হাসল। জবাব দিল,

“জ্বি?”

রাহাত এগিয়ে এলো। প্রশ্ন ছুড়ল,

“একা দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”

“এমনি।”

“পার্টি এনজয় করছেন না মনে হচ্ছে।”

“আমি ঠিক আছি।”

অপরূপা সংক্ষিপ্ত জবাব দিল। কিন্তু রাহাত থামল না।

“আচ্ছা একটা কথা বলি?”

অপরূপা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই রাহাত হেসে গ্লাসে চুমুক দিল। ঠোঁট কামড়ে বলল,

“আজ আপনাকে কিন্তু মারাত্মক সুন্দর লাগছে।”

অপরূপার ভ্রু কুঁচকে গেল। রাহাতের কথা বলার ধরণ তার পছন্দ হয়নি। সে চোখ সরিয়ে সৌজন্যতার খাতিরে ছোট্ট করে বলল,

“থ্যাংক ইউ।”

কথাটা বললেও তার কণ্ঠে কোনো আগ্রহ নেই। সে স্পষ্টই কথোপকথনটা শেষ করতে চাইছে। কিন্তু রাহাত যেন ইচ্ছা করেই আরও কাছে এসে দাঁড়াল।

“সত্যি বলতে অফিসে আপনাকে এতটা লক্ষ্য করিনি আগে।”

অপরূপা এবার অস্বস্তি অনুভব করল। ধীরে ধীরে এক পা সরে দাঁড়াল সে।

“এক্সকিউজ মি, আমি...."

অপরূপার কথাটা শেষ করার আগেই ছলকে উঠল রাহাতের গ্লাস। লাল রঙের ওয়াইন গিয়ে পড়ল সরাসরি অপরূপার শাড়িতে।

“ওহ শিট!”

অতিরঞ্জিত ভঙ্গিতে বলে উঠল রাহাত।

“আই'ম সো স্যরি।"

চমকে উঠল অপরূপা! নেভি ব্লু শাড়ির উপর লালচে দাগ ছড়িয়ে গেছে। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাহাত দ্রুত এগিয়ে এলো।

“ওয়েট, আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি।”

বলেই বিনা অনুমতিতে হাত রাখল অপরূপার পেটের কাছে। শাড়ির আঁচলের নিচে। অপরূপার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। মুহূর্তের জন্য যেন মস্তিষ্ক অবশ হয়ে গেল।

রি রি করর উঠল শরীর। সব কিছু এতটা দ্রুত হলো যে সে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপরই বুঝতে পারল লোকটা ইচ্ছা করেই ছুঁয়েছে তাকে। অপরূপার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। গা ঘিনঘিন করতে লাগল তার। মনে হলো শরীরের উপর নোংরা কিছু লেগে আছে। চোখ জ্বালা করে উঠল তৎক্ষনাৎ। রাহাত আবারও বলল,

“আরে রিল্যাক্স, আমি তো শুধু...”

আবারো হাত বাঁড়াতে নিল রাহাত। দু পা পিছিয়ে গেল অপরূপা। হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিল,

“ডোন্ট!”

কাঁপা গলায় বলে উঠল অপরূপা। এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নিল আরো কিছুটা দূরত্বে। তার হাত কাঁপছে। শ্বাস কাঁপছে। চারপাশে লোকজন আছে। কেউ খেয়ালও করছে না ঠিকমতো। অথচ তার মনে হচ্ছে সে যেন হঠাৎ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। রাহাত এবারও মিথ্যা স্বাভাবিক ভঙ্গি ধরে রাখার চেষ্টা করল।

“আরে, এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে?”

অপরূপা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। চোখের কোণে পানি জমে উঠেছে ইতোমধ্যে। শাড়ির আঁচল শক্ত করে চেপে ধরে প্রায় দৌড়েই সেখান থেকে চলে এলো সে। একজন মেয়েই জানে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ ঠিক কী পরিমাণ মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। অপরূপার বুক ধড়ফড় করছে। শরীর কাঁপছে। মনে হচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব কোথাও লুকিয়ে পড়তে পারলে ভালো হতো। এই মুহূর্তে সে শুধু একটা জিনিসই অনুভব করছে, আর তা হলো ভীষণ পরিমাণ অপমান আর অসহ্য ঘৃণা।

________

রিসোর্টের আলোকোজ্জ্বল প্রাঙ্গণ কোলাহলে মুখর। দূরে হালকা মিউজিক বাজছে, কেউ হাসছে, কেউ গ্লাসে গ্লাস ঠুকছে। অথচ সেই ভিড়ের মাঝেই আভিয়ানের ভেতরে জমে উঠছে অদৃশ্য এক দহন। ডিল সাইন করা শেষ, এখন পার্টি এনজয় করছে সবাই। কোলের মধ্যে পিহুকে নিয়ে ফুড কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আভিয়ান। এক হাতে ছোট্ট প্লেট, অন্য হাতে কাঁটাচামচ। পিহু ভুরু কুঁচকে একটা চিকেন বলের দিকে তাকিয়ে আছে। আভিয়ান সেটা প্লেটে তুলতেই ন ছিটকাল ছোট্ট পিহু।

“ইয়ান, এতা ঝাল।”

আভিয়ান প্লেট থেকে সামান্য অংশ ভেঙে নিজে মুখে দিল বোঝার জন্য। অতঃপর নির্লিপ্ত স্বরে বলল,

“না, খেতে পারবে।”

পিহু সাথে সাথে গাল ফুলিয়ে ফেলল। বুকে হাত বেঁধে ঠোঁট উল্টে বলল,

"এতা ঝাল। আমি কাব না।"

"এটা ঝাল, তুমি না খেয়ে কী করে বুঝলে?"

"এমনি এমনি। পিহু সব বুজে। পিহু পাস্তা কাবে।"

আভিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রেখে দিল চিকেন বল। পরপর পিহুর কথা মতো সে প্লেটে তুলে নিল পাস্তা। চামচে তুলে ধরল পিহুর মুখের সামনে।

“মুখ খোলো।”

পিহু বাধ্য মেয়ের মতো মুখ খুলতেই খাইয়ে দিল আভিয়ান। অদ্ভুত ধৈর্য নিয়ে সে পিহুকে এটা ওটা খাওয়াচ্ছে।

“আর কোনটা?”

“ওই গোল গোল ওইটা।”

আভিয়ান চোখ তুলে তাকাল। প্রশ্ন করল,

“মিটবল?”

“হ্যাঁ ওতাই।”

আভিয়ান ওয়েটারকে ইশারা করতেই নতুন প্লেট এনে দিল। পিহু ততক্ষণে তার কোটের বোতাম নিয়ে খেলছে।

“ইয়ান?”

“হুম?”

“তুমি কাবে না?"

আভিয়ান হাসলো। খাবার তুলে মুখে দিল পিহুর। জবাব দিল,

"তুমি আগে খাও। আমি পরে খাব।"

পিহু মাথা দুলাল। আভিয়ান আবারো ব্যস্ত হলো তাকে খাওয়াতে। অফিসের বেশিরভাগ মানুষই অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে আভিয়ানের এই রূপ। এমন সময় আভিয়ানের কর্ণে ভেসে এলো এক পরিচিত নারী কণ্ঠ।

“পিহু।”

কম্পিত কণ্ঠস্বর। আভিয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। অপরূপা দাঁড়িয়ে আছে কয়েক কদম দূরে। মুহূর্তেই তার দৃষ্টি আটকে গেল মেয়েটার মুখে। ফ্যাকাশে। অস্বাভাবিক রকম ফ্যাকাশে। নীল মসলিন শাড়িটার আঁচল এলোমেলো হয়ে আছে। কপালের পাশে কয়েকটা চুল লেপ্টে গেছে। এত কিছুর মাঝে আভিয়ানের সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল তার কাঁপা আঙুলগুলো। আভিয়ানের ভ্রু কুঁচকে এল। জিজ্ঞেস করে বসল,

“কী হয়েছে?”

অপরূপা সরাসরি তাকাল না। তাকে অস্বাভাবিক লাগল আভিয়ানের কাছে। অপরূপা না তাকিয়েই আরেক কদম এগিয়ে এলো। বলল,

“পিহুকে নিয়ে বাসায় যাব।”

“এখন?”

“হ্যাঁ।”

সংক্ষিপ্ত, শুষ্ক কণ্ঠস্বর তার। আভিয়ান এবার সম্পূর্ণ মনোযোগ দিল। সবুজাভ দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল অপরূপার মুখে। মেয়েটাকে দেখে ঠিক লাগছে না তার কাছে। জিজ্ঞেস করল,

“আপনার কি শরীর খারাপ করছে?”

“না।”

“তাহলে?”

“আমি এ এখনই বাসায় যেতে চাই।”

কথাগুলো স্পষ্ট বলার চেষ্টা করলেও গলার স্বর ভেঙে আসছে অপরূপার। মনে হচ্ছে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে কষ্ট হচ্ছে তার। আভিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। অতঃপর নিচু স্বরে বলল,

“আমি পৌঁছে দিচ্ছি, চলুন।”

“দরকার নেই। আমি যেতে পারব।"

“এত রাতে আপনাদের একা ছাড়ব ভাবলেন কী করে?”

আভিয়ানের কণ্ঠটা ঠাণ্ডা, দৃঢ়। অপরূপা আর কিছু বলল না। শুধু চোখ নামিয়ে নিল। বলতে গেলে কোনো কিছুতেই সে মনোযোগ রাখতে পারছে না। তার অস্থির লাগছে। শরীর ঘামছে অস্বস্তিতে। এমন সময় তাদের দিকে অভ্র এগিয়ে এলো হাসিমুখে। ডাকল আভিয়ানকে,

“স্যার!”

অভ্রর হাতে ফাইল। তার নজর গেল অপরূপার দিকে। চিরচেনা হাসি উপহার দিয়ে বলল,

“আজ তো কথা বলার সময়ই পেলাম না আপনার সাথে। আপনি...”

থেমে গেল অভ্র। কারণ অপরূপার মুখটা অদ্ভুত রকম নিস্তেজ। সে নিজেও চিন্তিত চিত্তে শুধালো,

“আপনি ঠিক আছেন?”

অপরূপা জোর করে সামান্য হাসল। ছোট্ট করে জবা দব দিল,

“হুম।”

আভিয়ানের বিরক্তি বাড়ল। চোয়াল শক্ত হয়ে এল।

“অভ্র।”

“জি স্যার?”

“এদিকটা সামলে নিও।"

বলেই হাঁটা ধরল আভিয়ান। অভ্র কপাল কুঁচকাল। পেছন থেকে ডাকল,

“আপনি কোথায় যাচ্ছেন, স্যার? আপনি কি আর ফিরবেন না?”

“ফিরব। তুমি নিজের কাজ করো।”

কথাটা শেষ করেই আভিয়ান পিহুকে আরো ভালোভাবে কোলে তুলে নিল। অপরূপার দিকে তাকিয়ে বলল,

“চলুন।”

আভিয়ান থামল না। অপরূপা লম্বা শ্বাস টেনে নিজেও পা বাড়াল তার পিছু পিছু। রিসোর্টের সামনের পার্কিং এরিয়ায় এসে থামল তারা। কালো গাড়িটার দরজা খুলে দিল আভিয়ান।

“বসুন।”

অপরূপা কিছু বলতে গিয়েও বলল না আর। বলার মত শক্তিটাও যেন তার মাঝে অবশিষ্ট নেই। চুপচাপ উঠে বসল সে। আভিয়ান এবার পিহুর দিকে তাকাল।

“লিটেল কিটেন, দুটো মিনিট মাম্মার কাছে বসো।”

পিহু বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে গাড়িতে উঠে গেল। তবে যাওয়ার আগে আভিয়ানের টাই টেনে বলল,

“কোতায় যাচ্চো?”

"আসছি দু মিনিট।”

সংক্ষিপ্ত জবাব তার। দরজা বন্ধ করে সে আবার হাঁটা ধরল রিসোর্টের ভেতরে। ফুড কাউন্টারের সামনে এসে থামল আভিয়ান। ওয়েটারের কাছ থেকে একটা বক্স নিয়ে বেছে বেছে কিছু খাবার বক্সে রাখছে সে। ঠিক তখনই খটখট শব্দ তুলে আভিয়ানের পাশে এসে দাঁড়াল এরিনা। এতটা সময় সে আভিয়ানকেই খুঁজছিল। সে ভ্রু তুলে তাকাল আভিয়ানের ব্যস্ত হাতের পানে।

“তুমি খাবার প্যাক করছ কেন?”

এরিনার উপস্থিতি আগেই টের পেয়েছে আভিয়ান। তাই আর কোনো জবাব দিল না সে। এরিনা আবার বলল,

“কী হলো, বলো?”

এবারো নিরুত্তর আভিয়ান। এরিনা বিরক্ত হলো।

আভিয়ানের কাঁধে হাত রেখে কর্কশ স্বরে উচ্চারণ করল,

“আভি, আই’ম টকিং টু ইউ।”

আভিয়ান এবারও তাকাল না। ঝাড়া দিয়ে হাত সরিয়ে দিয়ে শুধু বলল,

“স্টেপ ব্যাক।”

এরিনা হেসে ফেলল বিদ্রুপের সাথে। সে জড়িয়ে ধরল আভিয়ানের বাহু। মুহূর্তেই মস্তিষ্ক দাবানলের ন্যায় দাউ দাউ করে উঠল আভিয়ানের। এক ঝটকায় এরিনাকে ছাড়িয়ে নিয়ে উচ্চস্বরে ধমকে উঠল আভিয়ান,

“এরিনা।”

“হোয়াট?”

“তোমার সমস্যাটা কোথায় এরিনা? গায়ের উপর এসে পড়ছো কেন?"

গর্জে উঠল আভিয়ান। মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে গেল। এরিনার চোখ বিস্ফারিত। আভিয়ান এক পা এগিয়ে এলো।

“এই জায়গাটা তোমার ড্রামা করার জন্য না। আর আমার ধৈর্যেরও সীমা আছে। তুমি লিমিট ক্রস করছো, আমাকে বাধ্য করো না এমন কিছু করতে যা তোমার জন্য অপমানজনক হয়।"

আশেপাশের সকলেই থেমে গেছে। সকলের দৃষ্টি তাদের দিকেই নিবদ্ধ। অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল এরিনা। ঠোঁট কেঁপে উঠল অপমানে।

“তুমি আমাকে এভাবে..."

“নিজের সীমায় থাকো এরিনা, এটাই তোমার জন্য ভালো হবে। এমনিতেও তোমার মত ব্যক্তিত্বহীন মেয়েকে আমার সহ্য হয় না।”

আভিয়ানের রুর কণ্ঠে কথাগুলো এতটাই ধারালো ছিল যে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন পর্যন্ত অস্বস্তিতে পড়ে গেল। কিন্তু আভিয়ান? সে বিন্দুমাত্র পরোয়া করল না সেসবে। খাবারের প্যাকেটগুলো হাতে নিয়ে সোজা সবার দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,

"এনজয় দ্যা পার্টি।"

অতঃপর একবারও পেছনে না তাকিয়ে সে হাঁটা ধরল গাড়ির দিকে। আর পেছনে জ্বলজ্বলে আলোয় অপমানে, ক্রোধে দাঁড়িয়ে রইল এরিনা। চোখ জোড়ায় জমা হয়েছে জল। অপমানে শরীর কাঁপছে তার। বাম হাত উঠিয়ে নিজের ঘাড়ই চেপে ধরল সে। পরপর বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল,

"তোমার এই দম্ভ যদি আমি না ভেঙেছি তবে আমার নামও এরিনা চৌধুরী নয়।"

______

শান্ত শীতল আবহাওয়া। হাইওয়ে ধরে গাড়ি ছুটছে আভিয়ানের। একহাতে স্টিয়ারিং ধরা অন্য হাতটা আঁকড়ে ধরে রেখেছে পিহুকে। আভিয়ানের চোখ দুটো সামনে স্থির, কিন্তু মন সম্পূর্ণ স্থির নয়। মাঝে মাঝে সূক্ষ্মভাবে তাকাচ্ছে পাশে বসা অপরূপার দিকে। আর তার কোলের ওপর দিব্যি গা এলিয়ে বসে আছে পিহু। ছোট্ট দুই হাত স্টিয়ারিংয়ের মাঝ বরাবর রাখা। উৎসুক হয়ে আভিয়ানের হাতের তালে তালে নিজেও হাত ঘোরাচ্ছে সে। পিহুর মুখশ্রীতে গভীর মনোযোগ যেন সত্যিই সে-ই গাড়ি চালাচ্ছে। ঠোঁট কুঁচকে আছে সামান্য, ভ্রু টানটান। নিজের দায়িত্বটা বেশ গুরুত্ব দিয়েই নিয়েছে সে। পরপর পিহু হেসে আভিয়ানের দিকে মুখ তুলে চাইল। উপহার দিল স্নিগ্ধ হাসি। বলে উঠল,

"মাম্মার পরে তোমাকে পিহু সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, ইয়ান।"

হাসল আভিয়ান নিজেও। মনোযোগ ভঙ্গ করে একপলক তাকাল সে পিহুর হাস্যজ্বল মুখপানে। জবাব দিল ছোট্ট করে,

"আমিও।"

আভিয়ান ফের দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকাল অপরূপার দিকে।অপরূপা জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে।

চোখ বন্ধ। এক হাত দিয়ে আরেক হাতের বাহু শক্ত করে চেপে রেখেছে। শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিক ধীর। মাথার ভেতর বারবার ফিরে আসছে কিছু মুহূর্ত। অস্বস্তিকর। অপমানজনক। বিষাক্ত। একটা অপরিচিত হাত। অনাহূত স্পর্শ। কাছে ঝুঁকে আসা গন্ধ। বিকৃত দৃষ্টি। মুহূর্তেই তার পুরো শরীর শক্ত হয়ে উঠল অপরূপার। মনে হচ্ছে গায়ের ভেতর কাঁটা বিঁধে আছে। যতবার স্মৃতিটা ফিরে আসছে, ততবার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। গা ঘিনঘিন করছে। শ্বাস আটকে যাচ্ছে। সে চোখ আরও শক্ত করে বন্ধ করল। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

কিন্তু আভিয়ানের চোখ এড়াল না কিছুই। সে কয়েকবার আড়চোখে তাকাল। কিছু একটা ঠিক নেই। খচখচ করছে তার মাঝেও। অপরূপার এই নীরবতা স্বাভাবিক না। আভিয়ানের চোয়াল ধীরে শক্ত হয়ে উঠল। গাড়ির গতি কমিয়ে আনল সে। তারপর নিচু, ভারী স্বরে ডাকল,

“আর ইয়্যু ওকে?”

কোনো উত্তর এলো না অপরূপার কাছ থরকে। অপরূপা শুনতেই পায়নি। আভিয়ান এবার আরও স্পষ্ট স্বরে ডাকল,

“অপরূপা।”

ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে। কিন্তু তাকাল না। জানালার বাইরের অন্ধকারেই দৃষ্টি রেখে বলল,

“জি, শুনছি।"

"ঠিক আছেন আপনি?"

"হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি।”

স্বরটা অদ্ভুত দুর্বল। যেন শব্দগুলো বলতেও কষ্ট হচ্ছে মেয়েটার। আভিয়ানের ভ্রু কুঁচকে গেল।

“আপনাকে দেখে ঠিক মনে হচ্ছে না।”

“আমি ঠিক আছি।”

“তাহলে কাঁপছেন কেন?”

প্রশ্নটা সোজাসাপ্টা। তবে আভিয়ানের ভেতরে লুকিয়ে আছে স্পষ্ট উদ্বেগ। অপরূপা নিরুত্তর। কারণ সে নিজেও জানে না সে কী বলবে। বলবে যে তার এখনো ওই লোকটার ছোঁয়া গায়ে লেগে আছে মনে হচ্ছে?

বলবে যে নিজের শরীরটাই নিজের কাছে অপরিচিত লাগছে? বলবে যে ভয় না পেলেও ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছে সে? অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে? রাগ হলো নিজের উপর। কেন সে প্রতিবাদ করতে পারল না? কেন শক্ত হাতে দুটো চড় বসাতে পারল না সে? কেন? এত দুর্বল কেন এই নারী জাতি?

অপরূপা আবারো চোখ বন্ধ করে গা এলিয়ে দিল সিটে। তার কিচ্ছুটি ভালো লাগছে না। সুন্দর একটা দিন এভাবে কেন নষ্ট হলো? আভিয়ানও আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। তবে বারবার সে আঁড়চোখে তাকাচ্ছে অপরূপার দিকে। এমন সময় হঠাৎ করেই অপরূপার শরীর কেঁপে উঠল ঝাঁকুনি দিয়ে। এক ঝটকায় সামনে ঝুঁকে পড়ল সে।

“গ গাড়ি থামান!”

আভিয়ানের বুক ধক করে উঠল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অপরূপা আবারো উচ্চারণ করল,

"গাড়ি থামান এখনই!"

আভিয়ান আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। ব্রেক কষে গাড়ি রাস্তার পাশে থামাল। তৎক্ষনাৎ অপরূপা দরজা খুলেই ছুটে নেমে গেল গাড়ি থেকে। ভেজা ফুটপাথের পাশে গিয়ে ঝুঁকে পড়তেই প্রবল বমি শুরু হলো তার। ব্যকুল হলো তার হৃদয়। অপরূপার কাঁপতে থাকা অবয়বটা চোখে পড়তেই আভিয়ানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। যেন অদৃশ্য কোনো আতঙ্ক মুহূর্তেই তার সমস্ত স্থিরতা ভেঙে চুরমার করে দিল। মুখের রং নিমিষেই বদলে গেল তার। গলা শুকিয়ে এলো। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠল। আনমনেই উচ্চারণ করল,

“শিট!”

আভিয়ান দ্রুত পিহুকে সিটে বসিয়ে পানির বোতল হাতে বেরিয়ে এলো গাড়ি থেকে। অপরূপা তখনো কাঁপছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের ওপর পড়েছে তার। আভিয়ান আর নিজেকে আটকাল না। সরাসরি জড়িয়ে ধরল অপরূপার কাঁধ। অস্থির স্বরে ডাকল,

“অপরূপা!”

আভিয়ানের মাঝে প্রকাশ পাচ্ছে স্পষ্ট অস্থিরতা। অস্থির ব্যাকুল তার কণ্ঠস্বর। অপরূপাকে জড়িয়ে নিল নিজের আরো কাছে। অপরূপার হাত ঠেকল আভিয়ানের বুকে। দুর্বল শরীরটা সামলে নিতে অজান্তেই সে খামচে ধরল আভিয়ানের শার্টের অংশ। আভিয়ানের উৎকণ্ঠা বাড়ল।

"হেই, লুক এট মি."

মাথা তুলতে পারল না অপরূপা। আভিয়ান আরও ঝুঁকে এলো তার কাছে।

“আপনি ঠিক আছেন? হেই কথা বলুন, কথা বলুন অপরূপা। তাকান আমার দিকে।”

উত্তর নেই অপরূপার। মাথা ঘুরছে তার। চোখের সাসনে সব কিছু অস্পষ্ট হয়ে আসছে। অপরূপার দুর্বল শরীরটা ঢলে পড়ল আভিয়ানের বুকে। কপাল গিয়ে ঠেকল আভিয়ানের বিস্তৃত বুকে। আভিয়ান কী করবে না করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। এক হাতে অপরূপার কাঁধ জড়িয়ে অপর হাতে পানির বোতলের ঢাকনা খুলে বোতলটা এগিয়ে দিল অপরূপার দিকে।

“অপরূপা, হেই বেশি খারাপ লাগছে? এদিকে ফিরুন, পানিটা খান।”

নিজেকে সামলে নিতে খানিকটা সময় লাগল অপরূপার। অতঃপর কাঁপা হাতে পানির বোতলটা নিজের হাতে নিল।

আভিয়ান আলতো হাতে নিজের হাত ঠেকাল তার হাতের উপর। গলা ভেজাল রমণী। কিছুটা স্বস্তি পেল সে। আভিয়ানের শার্টটাও ছেড়ে দিল। মাথা ঝাঁকিয়ে কিছুটা মুখটা ধুয়ে নিল। আভিয়ান সময় নষ্ট না করে ধীরে তাকে ধরে গাড়ির কাছে নিয়ে এলো। দরজা খুলে সাবধানে বসিয়ে দিল অপরূপাকে। নিজেও ঝুঁকে এলো সামনে।

তারপর হঠাৎ থেমে গেল। ভ্রু কুঁচকে খুব নিচু স্বরে বলল,

“আপনি কি ড্রিংকস করেছিলেন?”

অপরূপা বিস্ময়ে তাকাল। টিপটিপ করে তাকিয়ে দু'দিকে মাথা ঝাকাল মৃদু। জবাব দিল,

“না।”

“তাহলে আপনার শরীর থেকে...."

আভিয়ান বাকিটা বলল না। তবে অপরূপা বুঝতে তেমন সময় লাগল না। লম্বা শ্বাস টেনে শরীরটা আবারো এলিয়ে দিলে সিটে। জবাব দিল,

“আমি কিছু খাইনি। এক্সিডেন্টলি একজনের ওয়াইন পড়ে গিয়েছিল আমার শরীরে।"

অপরূপার বাক্য শেষ হতে না হতেই পাশ থেকে চাপা কান্নার শব্দ এলো। আভিয়ান ও অপরূপা দুজনেই তাকাল সেদিকে। পিহু। ছোট্ট মুখটা কুঁচকে আছে। চোখ ভর্তি পানি। ঠোঁট কাঁপছে, ভয়ে পেয়েছে বাচ্চাটা।সে জীবনে কখনো তার মাম্মাকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখেনি। আভিয়ান চট করে দরজা লাগিয়ে দিল। দ্রুত ড্রাইভিং সিটে উঠে পিহুকে কোলে টেনে নিল। পিহুর মাথাটা বুকে ঠেকিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিল আভিয়ান।

“হেই হেই… কিছু হয়নি।”

পিহুর দৃষ্টি পুরোপুরি অপরূপার দিকে। বহু কষ্টে কান্না আটকে রেখেছে ছোট্ট প্রাণটা। এতক্ষণ নিজেকে সামলে রাখা পিহু এবার কেঁদেই ফেলল।

“মাম্মা…”

পিহুর কান্না শুনে বুকটা ধুক করে উঠল অপরূপার।নিজের সব অস্বস্তি, অপমান, দুর্বলতা একপাশে সরিয়ে সে সামনে ঝুঁকে মেয়েকে বুকে টেনে নিল।

“এই তো আমি আছি মা, আমার সোনা। কিছু হয়নি তো আমার।"

পিহু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল অপরূপাকে। ফুপিয়ে কাঁদছে মেয়েটা। অপরূপা চুমু খেল পিহুর কপালে, গালে।

“কাঁদবে না সোনা, কিছু হয়নি তো। এই যে দেখো, কিচ্ছু হয়নি।”

পিহুর হাতের বাঁধন শক্ত হলো। মায়ের বুকের ভেতর মুখ গুঁজে দিল। এই ছোট্ট পৃথিবীতে এই মানুষটাই তার নিরাপদ আশ্রয়। অপরূপা চোখ বন্ধ করে মেয়ের মাথায় চুমু খেল। নিজেকে জোর করে শক্ত করল। সময় নিয়েই পিহুর কান্না থামল। হেঁচকি তুলতে তুলতে সে আবার আভিয়ানের দিকেও তাকাল। আভিয়ান এতটা সময় তাদের দিকেই তাকিয়ে ছিল। এ পর্যায়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। অপরূপার দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“এখন কেমন লাগছে?”

“ভালো।”

“শিউর?”

অপরূপা মৃদু মাথা নাড়ল। সংক্ষিপ্ত জবাব দিল,

“হ্যাঁ।”

আভিয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল অপরূপার মুখপানে। বিশ্বাস হলো না পুরোপুরি। তবু আর চাপ দিল না।পেছনের সিট থেকে খাবারের প্যাকেটটা এনে এগিয়ে দিল অপরূপার দিকে।

“এটা খান।”

কপালের মসৃণ ত্বকে ভাজ পড়ল অপরূপার। শুধালো,

"কী এটা?"

"খাবার।"

স্পষ্ট সোজাসাপ্টা জবাব আভিয়ানের। অপরূপা মাথা নাড়ল। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ইচ্ছে করছে না।”

“খালি পেটে ছিলেন?”

অপরূপা নিরুত্তর। উত্তর না পেয়েই আভিয়ানের কণ্ঠ রুক্ষ হয়ে উঠল।

“আপাতত আপনি আমার গাড়িতে। আপনার দায়িত্ব আমার কাঁধে। আপনি অসুস্থ হয়ে পড়লেও দায়টা আমার।”

তার সবুজ চোখদুটো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল আরে। আদেশের স্বরে আওড়াল,

"সো, ইট।"

পিহুও মাথা তুলে তাকাল। অপরূপার গালে ছোট্ট হাতটা বুলিয়ে দিয়ে বলল,

"মাম্মা কাও।"

মেয়ের কথা ফেলতে পারল না অপরূপা। চুপচাপ প্যাকেট খুলল সে। ভেতরে স্যান্ডউইচ। হালকা সালাদ। যাক, খাওয়ায় যায়। অতঃপর খেতে শুরু করল সে।গাড়ির ভেতর কাজ করছে শান্ত নীরবতা। আভিয়ান পিহুকে নিজের কোলে নিল। যদিও বা অপরূপা দিতে চাচ্ছিল না। পিহু মাথা ঠেকাল আভিয়ানের বুকে। আভিয়ান নিজের স্যুট আর টাইটা খুলে ফেলেছে। শার্টের হাতা কনুই অব্দি গোটানো। ইতোমধ্যে পিহু আধঘুমে জড়িয়ে গিয়রছে। আভিয়ানের বুকে হেলান দিয়ে আছে সে। ছোট্ট হাতটা আভিয়ানের শার্ট মুঠো করে ধরে রেখেছে।

আভিয়ান গাড়ি স্টার্ট দিল। এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে আছে, আরেক হাত খুব সতর্কভাবে রাখা পিহুর পিঠে।

যেন সে ঘুমের মধ্যে পড়ে না যায়। মাঝপথে হঠাৎ অপরূপার খেয়াল হলো আভিয়ান কি খেয়েছে? সে তো কিছুই খায়নি। সে ভাবল এই খাবারটাও হয়তো তার নিজের জন্য ছিল। অপরূপার হাত থেমে গেল। একটা অদ্ভুত অপরাধবোধ কাজ করল তার মনে। আর খেতে ইচ্ছে করল না তার। প্যাকেটটা বন্ধ করে রাখল হেডবোর্ডের সামনে। আভিয়ান একপলক তাকাল সেদিকে। পরপর দৃষ্টি ফিরিয়ে আওয়াজ তুলল,।

“পুরোটাই শেষ করুন।”

“পারছি না।”

আভিয়ান জোর করল না। পানির বোতলটা এগিয়ে দিল,

"গ্লাভ বক্সে দেখুন এমিস্ট্যাট আছে, খেয়ে নিন। আর বেশি খারাপ লাগলে বলুন, হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি।"

অপরূপা চমকাল। দু'দিকে মাথা দুলিয়ে বলল,

"এখন ঠিক আছি আমি।"

আভিয়ানের দৃষ্টি স্থির সামনে। এক বারের জন্যেও ঘুরে তাকাল না। বরং দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করল,

"ওষুধটা খেয়ে নিন।"

অপরূপা আভিয়ানের হাত থেকে পানির বোতলটা হাতে নিল। গ্লাভ বক্স থেকে ওষুধ বের করে খেয়ে নিল। অতঃপর আবারো নীরবতা নেমে এলো তাদের মাঝে। দীর্ঘ রাস্তা পেরিয়ে গাড়ি এসে থামল গন্তব্যে। ঠিক অপরূপার বিল্ডিংয়ের সামনে। অপরূপা ধীরে নেমে এলো গাড়ি থেকে। পিহু গভীর ঘুমে মগ্স। আভিয়ানের বুকের সাথে মাথা গুঁজে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে সে। অপরূপা খুব সাবধানে মেয়েকে নিজের কোলে তুলে নিল। আভিয়ানের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ হেসে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল।

"ধন্যবাদ।"

কোনেরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাল না আভিয়ান। অপরূপা যেতে নেবে ঠিক তখনই অপরূপার কিছু মনে পড়ল।

“এক মিনিট।”

সে দ্রুত পার্স খুলে আভিয়ানের ফেলে যাওয়া ফোনটা বের করল। সেদিন ভুলে তার কাছেই রয়ে গিয়েছিল।

সে ফোনটা এগিয়ে দিল। আভিয়ান সামান্য অবাক হলো!

তবে মুখে কিছু প্রকাশ পেল না। নিঃশব্দে ফোনটা হাতে নিল। অপরূপা আর দাঁড়াল না। ঘুমন্ত মেয়েকে বুকে নিয়ে ধীরে গেট পেরিয়ে বিল্ডিংয়ের ভেতরে ঢুকে গেল সর।আভিয়ান স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল সে দিকে। অন্ধকার করিডোরে অপরূপার নীল শাড়ির আঁচলটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। অতঃপর ফোনটা অন করল আভিয়ান।স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই ওয়ালপেপার ভেসে এলো অপরূপার চোখ জোড়া।

স্থির। গভীর। অদ্ভুত মায়াময় মোহনীয় চোখ জোড়া।আভিয়ান অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল সেই দৃষ্টিপানে। লম্বা শ্বাস টেনে ফোনটা রেখে আভিয়ান পাশে রাখা অপরূপার আধখাওয়া খাবারের বক্সটা নিজ হাতে তুলে নিল। অপরূপা যেটুকু খেয়ে রেখে দিয়েছিল সেটুকুই। একটুও দ্বিধা করল না সে। রমণীর আধখাওয়া খাবারের বাকি অংশ চুপচাপ খেতে শুরু করল সে নিজে। হুট করেই নজরে পড়ল কাঠের ছোট্ট চামচে লেগে আছে লাল রঙ। বুঝতে বাকি রইল না এটা কী, এটা অপরূপার ঠোঁটের লিপস্টিকের অংশ। কে জানে কী হলো আভিয়ানের! কিছু একটা ভেবে চামচ টা রেখে দিল হেড বক্সে। স্টিয়ারিং এ হাত রেখে জানালার কাঁচ ভেদ করে তাকাল ঠিক উপরে। দেখা মিলল রমণীর এক ঝলক। ব্যস্ত পায়ে এসে তোয়ালে নিয়ে আবারো ব্যস্ত পায়ে মিলিয়ে গেল। সেদিকে চেয়েই হেসে উঠল আভিয়ান। কী স্নিগ্ধ এক হাসি। পরপর আনমনেই গেয়ে উঠল,

"এই মন পড়েছে আমার বড় দোটানায়,

প্রেম বয়ে আনলো হঠাৎ দমকা হাওয়ায়।

এই আশিকি এই আশিকি, করলো কি জাদু হায়?

এই আশিকি এই আশিকি, করলো কি জাদু হায়?"

__________

#চলবে

মন্তব্য করে যাবেন। দ্রুত রিয়াক্ট তুলে দিন।

#অভ্রদহ গল্পটা পড়ছেন তো? দ্রুত পড়ে ফেলুন, আর বলিয়েন কেমন লেগেছে। ঠিক আছে?😙

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন