#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ২৩
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা
_______________________
মেঘাচ্ছন্ন এক সকাল। আকাশজুড়ে ধূসর মেঘের আনাগোনা। সূর্যের অস্তিত্ব যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে সেই ভোর থেকে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। দূরের বিল্ডিংগুলোও কুয়াশাটে হয়ে আছে।
ড্রয়িংরুমের জানালার পাশে বসে পিহুকে ব্রেডে জ্যাম মাখিয়ে খাওয়াচ্ছে অপরূপা। পিহু দোল খেতে খেতে খাচ্ছে আর বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে।
মনের ভেতর একটা চিন্তা কাজ করছে তার অপরূপার। আজ সন্ধ্যায় পার্টি ফেইড লিড রিসোর্ট। যদিও আজ অফিস যেতে হচ্ছে না, তবুও এই আবহাওয়ায় বের হওয়াটাই বড় ঝামেলা মনে হচ্ছে। বৃষ্টিটাও থামার নাম নিচ্ছে না। এসব ভাবনার মাঝেই ফোনটা বেজে উঠল তার। অপরূপা একবার স্ক্রিনে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল। কারণ অচেনা নাম্বার।
“পিহু, তুমি খেতে থাকো। আমি আসছি।”
“ওক্কে।”
অপরূপা উঠে ঘরে এসে কলটা রিসিভ করল। জবাব দিল,
“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে ভেসে এলো ভদ্র নমনীয় কণ্ঠ,
“ম্যাম, আমি স্টেডফাস্ট থেকে ডেলিভারি ম্যান বলছি।”
অপরূপা অবাক হলো! ভ্রু জোড়া কুঁচকে উঠল মুহূর্তেই।
“ডেলিভারি?”
“জি ম্যাম। আপনার একটা পার্সেল আছে।”
“কিন্তু আমি তো কিছু অর্ডার করিনি।”
“ম্যাম, নাম্বার আর এড্রেস তো এটাভ। আপনি একটু নিচে আসবেন?”
অপরূপা কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আচ্ছা, আসছি।”
ফোন রেখে বাইরে এলো সে। পিহু তখন নিজে নিজেই খাচ্ছে। তাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“পিহু, তুমি এখানেই বসে থাকবে। কোথাও যাবে না, ঠিক আছে?”
পিহু জ্যাম মাখা হাত তুলে মাথা নাড়ল। জবাব দিল,
“তিক আচে!”
অপরূপা দ্রুত নিচে নেমে পার্সেলটা রিসিভ করল। বিশাল একটা বক্স। কিছুটা ভারিও। কৌতূহল আরো বেড়ে গেল তার। কষ্ট করে বক্সটা উপরে নিয়ে আসতেই পিহু দৌড়ে এলো।
“মাম্মা! এতা কী?”
“জানি না।”
“হয়তো আরো বই আচে।”
জবাব দিল না অপরূপা। পিহু ইতোমধ্যে বক্সের চারপাশে ঘুরঘুর শুরু করে দিয়েছে। অপরূপা আর দেরি না করে বক্সটা খুলল। মুহূর্তেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
ভেতরে দুটো বড় শপিং ব্যাগ। প্রথম ব্যাগটা খুলতেই বেরিয়ে এলো একটা ছোট্ট নেভি ব্লু ফ্রক। নরম নেটের উপর সূক্ষ্ম সিলভার কাজ। বুকের কাছে ছোট ছোট স্টোন বসানো। হাতাগুলো ফুলে থাকা। ঠিক যেন রাজকন্যার পোশাক। ড্রেসটা দেখতে পেয়ে পিহু তো খুশিতে আত্মহারা।
“ওয়াওওও!”
ফ্রকটা বুকে জড়িয়ে ধরল সে। অপরূপার হতভম্ব মুখপানে চেয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“মাম্মা! এতা আমার?”
অপরূপা এখনো অবাক। জবাব দিল না সে। অথচ পিহুর চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। উৎসুক তার মুখভঙ্গি।
“মাম্মা, পিহু এতা পরবে। একনই পরবে।"
“এখন না, রাখো এটা।”
“প্লিজ!”
“বলছি তো পরে।”
পিহু ঠোঁট ফুলালেও পরক্ষণেই আবার ফ্রকটার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল সে। এদিকে অপরূপা দ্বিতীয় ব্যাগটা হাতে নিল। খুলতেই তার নিঃশ্বাস আটকে গেল। বের হলো একটি চকচকে মসলিন শাড়ি। এটাও নেভি ব্লু রঙের। অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারুকাজ করা পুরো শাড়িজুড়ে। আঁচলের প্রান্তে রুপালি জরি আর হাতে করা ছোট ছোট নকশা। কাপড়টা এত হালকা যেন মেঘ ছুঁয়ে তৈরি।অপরূপা কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। শাড়িটা সত্যিই অপূর্ব। অজান্তেই তার আঙুল ছুঁয়ে গেল নরম কাপড়ের উপর। ঠিক তখনই নজরে পড়ল বক্সের কোণে রাখা ছোট্ট একটা নোট। ভ্রু কুঁচকে সেটা হাতে তুলে নিল সে। কাগজের ভাজ খুলতেই দেখা মিলল কিছু লেখা,
“টুডে ইজ স্পেশাল টু মি। অ্যান্ড লিটল কিটেন অ্যারাইভড ইন মাই লাইফ অ্যাজ সামওয়ান স্পেশাল।সো দ্য গিফট ইজ ফর হার। অ্যান্ড অন মাই স্পেশাল ডে, আই ওয়ান্ট মাই লিটল কিটেন টু লুক স্পেশাল টু। বাট ইফ আই গিফট অনলি লিটল কিটেন, হার মাদার মাইট গেট অফেন্ডেড। সো কনসিডার দিস ওয়ান আ কনসোলেশন প্রাইজ।”
[অর্থ:- আজকের দিনটা আমার কাছে বিশেষ। আর লিটেল কিটেন আমার জীবনে বিশেষ একজন হয়ে এসেছে। তাই উপহারটা ওর জন্য। আর আমার বিশেষ দিনে আমি চাই আমার লিটেল কিটেনটাকেও বিশেষ লাগুক। কিন্তু যদি শুধু যদি তাকে দিই, তাহলে তার মা হয়তো কষ্ট পেতে পারে। তাই এটাকে একটা সান্ত্বনা পুরস্কার ভাবতে পারেন।]
নোটটা পড়া শেষ হতেই অপরূপার চোয়াল ঝুলে পড়ল।
আর বুঝতে বাকি রইল না তার যে, এগুলো কে পাঠিয়েছে। মুহূর্তেই মাথার ভেতর একসাথে বহু অনুভূতি এসে জট পাকিয়ে গেল। রাগ করবে? নাকি হাসবে? নাকি অবাক হবে? লোকটা আসলে কী চায়? ঠিক তখনই পিহু আবার দৌড়ে এলো।
“মাম্মা! এতা ইয়ান দিয়েচে তাই না?”
অপরূপা চমকে উঠল। তাকাল মেয়ের পানে। আশ্চর্য হয়ে শুধালো,
“কেন মনে হলো?”
পিহু গর্বিত মুখে বলল,
“ইয়ান কালকে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল আমার পিয় রঙ কোনতা, আমি তকন বলেচিলাম আমার পিয় রঙ ব্লু। আর দেকো আমার ড্রেসতাও ব্লু ব্লু।”
অপরূপা হতভম্ব। ঠোঁট জোড়ার মাঝ বরাবর ফাঁক হলো তার। অপরূপা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে আবার শাড়িটার দিকে তাকাল। নরম কাপড়টা হাতের ফাঁকে গড়িয়ে পড়ছে। শাড়িটা সত্যি অসম্ভব সুন্দর।
"মাম্মা?"
"হু?"
দৃষ্টি রেখেই জবাব দিল অপরূপা। পিহু উৎসুক ভঙ্গিতে প্রশ্ন ছুড়ল,
"আমরা আজ ব্লু ব্লু পরব?"
হাসল অপরূপা। জবাব দিল,
"পরব।"
______
সন্ধ্যার শেষ আলোটুকুও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে পশ্চিম আকাশে। চারদিক জুড়ে এক স্নিগ্ধ আবছায়া ভাব নেমেছে। নিজের ঘরের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলো আভিয়ান। আজ তাকে অন্য দিনের তুলনায় আরও বেশি পরিপাটি লাগছে। সাদা শার্টটা নিখুঁতভাবে গায়ে লেগে আছে। তার উপর নেভি ব্লু রঙের স্যুট। গাঢ় রঙের ওয়েস্ট কোট বুকের উপর আঁটসাঁট হয়ে বসে আছে, যেন তার ব্যক্তিত্বের কঠোরতাকেই আরও প্রকট করছে। গলার টাইটা নিখুঁতভাবে বাঁধা। টাইয়ের মাঝখানে বসানো প্ল্যাটিনামের ‘ভি’ সাইনের টাই ক্লিপটা আলোতে চিকচিক করে উঠছে। হাতের কব্জিতে সিলভার প্ল্যাটিনাম চেইন ওয়াচ। চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করা। চোয়াল শক্ত। মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীরতা। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা চোখে পড়ল তার।
ইরফান এহসান সোফায় বসে আছেন। পাশে নাবিলা এহসান। আর একপাশে পা তুলে বসে আছে এরিনা। হাতে ফোন, কিন্তু তার চোখ ছিল সিঁড়ির দিকেই।আভিয়ান কারো দিকে বিশেষ নজর দিল না। সোজা গিয়ে দাঁড়াল ইরফান এহসানের সামনে। কিছুটা নিচু হয়ে বলল,
“দোয়া করো।"
ইরফান এহসানের চোখ নরম হয়ে এলো খানিকটা। তিনি আভিয়ানের মাথায় হাত রাখলেন।
“হ্যাঁ হ্যাঁ। আজ যেন কোনো ঝামেলা না করিস।”
আভিয়ান ঠোঁট বাঁকাল সামান্য। ইরফান এহসান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আবার বললেন,
“ক্লাইন্টদের সাথে ভালোভাবে কথা বলবি। এটা বড় ডিল।”
“হুম।”
শুধু এক অক্ষরের উত্তর। ঠিক তখনই এরিনা উঠে দাঁড়াল। ব্যস্ত ভঙ্গিতে আওয়াজ তুলল,
“ওকে, নাও চলো।”
আভিয়ানের কপালে সঙ্গে সঙ্গে ভাঁজ পড়ল। ধীরে আঁড়চোখে তাকাল সে। এরিনা পরিপাটি হয়েই দাঁড়িয়ে। রেড বডিকন ড্রেস শরীরের সাথে লেপ্টে আছে তার। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। চোখে স্মোকি মেকআপ। চুলগুলো খোলা, ঢেউ খেলানো। আভিয়ানকে তাকিয়ে থাকতে দেখে এরিনা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
"হুয়াট?"
আভিয়ান কয়েক সেকেন্ড নিরব থেকে শুধালো,
“তুমি কোথায় যাচ্ছ?”
এরিনা অবাক হওয়ার ভান করল।
“সিরিয়াসলি? অফকোর্স তোমার সাথে যাচ্ছি।”
আভিয়ানের মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। কঠোর হলো মুখভঙ্গি। প্রশ্ন ছুড়ল,
“কেন?”
“কারণ আই ওয়ান্ট টু।”
এরিনা ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। আঁড়চোখে মা আর নানাভাইকে দেখে নিয়ে চোখ টিপল আভিয়ানকে। নপচু স্বরে বলল,
“আর হনেস্টলি, তোমার পাশে আমাকে দারুণ লাগবে।”
আভিয়ান এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল। চোখদুটো বরফশীতল। কণ্ঠস্বর রুক্ষ,
“আমি কি তোমাকে ইনভাইট করেছি?”
এরিনার হাসিটা সামান্য থমকাল।
“আভি, ডোন্ট বি ড্রামাটিক।”
“আমি ড্রামাটিক না। যা বলার স্পষ্ট ভাবে বলছি।”
"আভি!"
আভিয়ান এরিনাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দেখে নিয়ে শীতল কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“এটা আমার অফিস পার্টি। নট এ নাইট ক্লাব।”
পুরো ড্রয়িংরুম থমকে গেল। এরিনার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল মুহূর্তেই। চোখে অপমানের আগুন জ্বলে উঠল তার। খেঁকিয়ে উঠল,
“এক্সকিউজ মি?”
আভিয়ান নির্বিকার। নাবিলা এহসানও এবার রেগে উঠলেন। ধমকে উঠলেন,
“আভিয়ান!”
আভিয়ান তাকাল না পর্যন্ত। তিনি আরো বেশি গর্জে উঠে বলে উঠলেন,
“তুমি ওকে এভাবে অপমান করতে পারো না।”
“করছি না। কেবল সত্যিটা বলছি।"
“তুমি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ, আভিয়ান।”
আভিয়ান এবার ধীরে ধীরে ঘড়ির দিকে তাকাল। গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলে উঠল,
“আমার দেরি হচ্ছে।”
এরিনা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
"ইয়্যু থিংক টু হাইলি অফ ইয়্যুরসেল্ফ."
আভিয়ানের মাঝে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতেই জবাব দিল,
“না। আমি শুধু জানি আমার পাশে কে মানায় আর কে না। এ্যন্ড আই মিন ইট।”
কথাটা শেষ করেই সদর দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল আভিয়ান। এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে রইল। অপমান সহ্য করতে পারছে না এরিনা। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ইরফান এহসানের দিকে ঘুরল।
“নানুভাই, গাড়ির চাবি দাও।”
“এরিনা, শোনো...”
“না! আমি যাবই।”
“বনু, ওর এখন মেজাজ....”
ইরফান এহসানের কথা শেষ হতে দিল না এরিনা। হাত উঠিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ধরল। চিৎকার করে উঠল,
“আই ডোন্ট কেয়ার! তুমি দেবে নাকি না?”
ইরফান এহসান কপাল চেপে ধরলেন। শেষমেশ ক্লান্ত স্বরে ড্রাইভারকে ফোন করলেন।
“গাড়ি বের করো।”
এরিনা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। হাই হিলের খটখট শব্দ তুলে দ্রুত বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হতেই নাবিলা এহসান ক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠলেন,
“এই কারণেই আমি এই বাড়িতে আসতে চাই না, বাবা!”
ইরফান এহসান চুপ। নাবিলা এহসান আরো বেশি ক্রোধ ঝাড়লেন,
“ও ছোটবেলা থেকেই এমন। সবাইকে অপমান করবে, নিজের মতো চলবে। আর সবাই সেটা সহ্য করবে?”
“নাবিলা শোনো।”
নাবিলা এহসান বিরক্তিতে মাথা নাড়লেন।
“না বাবা, প্লিজ! তুমি সবসময় ওর পক্ষ নাও।”
ইরফান এহসান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“ছেলেটা খারাপ না।”
“খারাপ না?”
তিক্ত হেসে উঠলেন নাবিলা। থেমে আবার যোগ করলেন,
“মানুষকে অসম্মান করা যদি খারাপ না হয় তাহলে ঠিক আছে।”
কিছুক্ষণ নিরবতা। তারপর ধীরে স্বরে ইরফান এহসান বললেন,
“ওর বিষয়ে সব তো জানিস তুই। কোন ঝড়ের মাঝ দিয়ে ছেলেটা বেঁচে আছে সেটা কি তোর অজানা?”
নাবিলা এহসান বিরক্ত চোখে তাকালেন। পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লেন,
“আর সেই ঝড়ের জন্য সবাইকে পুড়তে হবে?”
জবাব দিলেন না ইরফান এহসান। নাবিলা এহসান ঠোঁট কামড়ে ঘুরে দাঁড়ালেন। তারপর ধীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। ড্রয়িংরুমে পড়ে রইল শুধু এক বৃদ্ধ মানুষের দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস।
_____
রাতের শহর সবসময়ই এক রহস্যময়ী নারী।দিনের কোলাহল থেমে গেলে, নিয়ন আলোয় মোড়া শহরটা যেন নিজের অন্য এক রূপ মেলে ধরে। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি আলোর মালা, উঁচু বিল্ডিংয়ের কাঁচে প্রতিফলিত ঝলমলে আভা, দূরে ছুটে চলা গাড়ির হেডলাইট। সব মিলিয়ে শহরটা যেন আজ কোনো সিনেমার দৃশ্য। গাড়ির জানালার পাশে বসে সেই দৃশ্যই দেখছিল অপরূপা। তার চোখে মুগ্ধতা। তবুও মনের ভেতর কোথাও যেন এক অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করছে। পাশেই পিহু উৎসুক চিত্তে জানালার কাঁচে মুখ ঠেকিয়ে বাইরের রাস্তা দেখছে।মাথার ভেতর একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে অপরূপার। তাকে তো বলা হয়েছিল ইধিকাও একসাথে যাবে। কিন্তু কিছুক্ষণ আগেই কল করে শুনল ইধিকা তো অনেক আগেই পৌঁছে গেছে! আভিয়ান ঠিক কী চায়? তার মতিগতি সত্যিই বোধগম্য নয়।
ভাবনার মাঝেই গাড়িটা ধীরে ধীরে এসে থামল বিশাল এক রিসোর্টের সামনে।ফেইড লিড রিসোর্ট। পুরো জায়গাটা আলোয় ঝলমল করছে। প্রবেশপথ জুড়ে সোনালি ফেয়ারি লাইট, পাশে সাজানো সাদা অর্কিড আর সুগন্ধি লিলি। দূরে মৃদু সুরে বাজছে পিয়ানোর ইনস্ট্রুমেন্টাল। ড্রাইভার দরজা খুলতেই ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল অপরূপা। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই চারপাশের আলো যেন কিছু সময়ের জন্য থমকে গেল। নেভি ব্লু মসলিন শাড়িটা তার শরীরে অপার্থিবভাবে জড়িয়ে আছে। শাড়ির আঁচলজুড়ে সূক্ষ্ম রুপালি কারুকাজ, যা আলো পড়তেই নক্ষত্রের মতো ঝিলমিল করছে। খোলা চুলগুলো একপাশে নামানো। কানে ছোট মুক্তোর দুল। মুখে ভারী কোনো সাজ নেই। তবুও তার সেই স্বাভাবিক সৌন্দর্যটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। শান্ত। স্নিগ্ধ। মায়াবী।
মনে হচ্ছিল রাতের সমস্ত নীল আকাশ যেন আজ এসে জড়িয়েছে তার শরীরে।
দূরে দাঁড়িয়ে মিস্টার জ্যাকের সাথে কথা বলছিল আভিয়ান। তার হাতে ওয়াইনের গ্লাস। মুখে গম্ভীরতা।
হঠাৎ মিস্টার জ্যাকের দৃষ্টি আটকে গেল সামনে। সে কিছুটা বিস্মিত হয়ে বলে উঠল,
"ওহ গড! ইজন'ট শি মিস অপরূপা?"
কথাটা কর্ণধারে প্রবেশ করা মাত্রভ আভিয়ানও দ্রুত পেছনে তাকাল। আর তাকিয়েই স্থির হয়ে গেল তার গোটা দুনিয়া। সমস্ত শব্দ যেন হঠাৎ দূরে সরে গেল তার কাছে। দৃষ্টি আটকে রইল কেবল সেই নীল শাড়িতে মোড়ানো রমণীর উপর। বুকের ভেতর ধক করে উঠল কিছু একটা। অজান্তেই ঠোঁট নড়ল তার। মুগ্ধতায় আনমনেই বিড়বিড় করে উঠল,
"অপ্সরা, আমার অপ্সরা!"
আর তার পরপরই ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠে পরিচিত সম্বোধন।
“ইয়ান!”
পিহুর খুশিভরা ডাক ভাঙল তার ধ্যান। ছোট্ট মেয়েটা দৌড়ে এসে দাঁড়াল সামনে। নিজের ফ্রকটা দু’হাতে ছড়িয়ে ঘুরে বলল,
“ইয়ান, পিহু তোমার দেওয়া ড্রেসতা পরেচে। কেমন লাগচে আমাকে?”
আভিয়ানের চোখ নরম হয়ে এলো মুহূর্তেই। সে নিচু হয়ে পিহুকে কোলে তুলে নিল। পরম স্নেহে দৃষ্টি বুলাল।
“ইয়্যু লুক লাইক এ্য প্রিন্সেস, মাই লিটেল কিটেন।”
পিহু খিলখিল করে হেসে উঠল। গলা জড়িয়ে ধরল আভিয়ানের। কিছু না বলেই আভিয়ানের গালর চুমু খেল। চোখ পিটপিট করে বলল,
"আর তোমাকে কিং এর মত লাগচে।"
হাসলো আভিয়ান। পিহু পরপর প্রশ্ন ছুড়ল,
“মাম্মাও ব্লু পরেচে। মাম্মাকে কেমন লাগচে?'
আভিয়ানের দৃষ্টি আবার চলে গেল অপরূপার দিকে। মাতাল করা কণ্ঠে জবাব দিল,
"একদম কুইনের মতো।"
ততক্ষণে শাড়ি সামলে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো অপরূপা।
আর ঠিক তখনই তাদের পাশ দিয়ে এগিয়ে এলেন ক্লাইন্টদের একজন। মিস্টার লিওনার্দো রিচি।আভিয়ানের কোলে পিহুকে দেখে তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
"ওহ? এ্যন্ড হু ইজ দিস লিটেল এঞ্জেল?"
আভিয়ান ভাবার সময় টুকুও নিল না। নির্দ্বিধায় জবাব দিল,
“মাই লিটেল কিটেন।”
লোকটা হেসে ফেলল। প্রশ্ন ছুড়ল কৌতুহল নিয়ে,
"দ্যেন, ইজ শি ইয়্যুর ডটার?"
কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামল আভিয়ান। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মুখে ফিরে এলো সেই অটল আত্মবিশ্বাস। পিহুর অবুঝ মুখটার দিকে তাকিয়ে হাসল ক্ষীণ। চোয়াল শক্ত করে, সম্পূর্ণ দৃঢ় স্বরে বলল,
“ইয়েস, শি ইজ।”
একটা মাত্র শব্দ। কিন্তু শব্দটার অভিঘাত গিয়ে সোজা আঘাত করল অপরূপার বুকে। তার পা থেমে গেল। চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল মুহূর্তেই। সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল আভিয়ানের দিকে। আভিয়ান? এভাবে? কেন? তালগোল পাকিয়ে গেল মস্তিষ্ক। এর মাঝেই মিস্টার জ্যাকের ফোন বেজে উঠল। তিনি ক্ষমা চেয়ে মিস্টার লিওনার্দোকে নিয়ে ড্রিংকস সেকশনের দিকে চলে গেলেন। চারপাশ আবার স্বাভাবিক হয়ে এলো। কিন্তু অপরূপার ভেতরটা এখনো স্থির নয়। সে হা করে তাকিয়ে আছে আভিয়ানের দিকে। ঠিক তখনই পিহু হাত নাড়ল অপরূপার দিকে তাকিয়ে। ডাকল,
“মাম্মা!”
আভিয়ানেরও ধ্যান ভাঙল। পেছনে তাকিয়ে অপরূপাকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য সে সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।তবে মুখে তার কোনো ছাপ ফুটল না। অপরূপা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ আ আপনি কী বললেন একটু আগে?”
আভিয়ান শান্ত। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে প্রশ্নের বিপরীতে প্রশ্ন ছুড়ল,
“কোনটা?”
“ওই যে....”
অপরূপা কিছুটা থেমে গেল। পরপর বার কয়েক শ্বাস টেনে শুধালো,
“পিহু আপনার মেয়ে?”
আভিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল। দরখল রমণীর অস্থির রূপ। ক্ষীণ আলোতে মোহনীয় লাগছে তাকে। আভিয়ানের হুট করেই হিংসে হলো। তার এই রূপ অন্য কেউও দেখবে? কেন দেখবে? অপরূপা তখনও জবাবের অপেক্ষায়। আভিয়ান তা বুঝতে পেরে নিজের মাথা থেকে এই মুহূর্তে অযাচিত ভাবনা বের কর দিল। ধীর স্বরে বলল,
“সমস্যা হয়েছে?”
“মিস্টার আভিয়ান....”
“আমি মিথ্যা বলিনি।”
কথাটা বলেই পিহুকে আরেকটু সামলে নিল নিজের কোলে। অপরূপা হতভম্ব। অদ্ভুত ভাবে মন মস্তিষ্ক জট পাকিয়ে ফেলছে। গলা শুকিয়ে আসছে তার।
"ম মানে? ক কী বলছেন এসব?"
"কী বলছি?"
"পিহুকে কেন নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দিলেন আপনি?"
আভিয়ান এবার সম্পূর্ণ দৃষ্টি ঘুরিয়ে অপরূপার দিকে তাকাল। গভীর সবুজাভ চোখদুটো অদ্ভুত শান্ত তার।অতঃপর ভেসে এলো মেঘের ন্যায় কণ্ঠস্বর,
“মানুষকে আপন মনে করার জন্য সবসময় রক্তের সম্পর্কের প্রয়োজন পড়ে না। কিছু সম্পর্ক তৈরি হয় অনুভূতি থেকে, আর বন্ধন তৈরি হয় আত্মার সংযোগে।”
"তাই বলে...."
অপরূপার হতভম্ব মুখশ্রী। বাক্য শেষ করতে পারল না সে। কারণ তৎক্ষনাৎ পেছন থেকে ভেসে এলো তৃতীয় ব্যক্তির কণ্ঠস্বর। দেখা মিলল দৃঢ় ভঙ্গিতে এগিয়ে আসা একটি নারী অবয়ব।
"হেই ড্যাডি, ইয়োর গার্ল ইজ হিয়ার।"
________
#চলবে
রেসপন্স করবেন, মন্তব্য করে জানাবেন কেমন হয়েছে।
দ্রুত ৫০০+ রিয়াক্ট তুলে দিন। 🤍