ফন্ট সাইজ:
থিম:
ঝরা শিউলির দিনে

৪১তম পর্ব

লেখক: তামান্না ইসলাম শিমলা

#ঝরা_শিউলির_দিনে

#পর্ব ৪১

#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

রাত প্রায় আটটা ছুঁইছুঁই। আকাশ থেকে শেষ রঙটুকুও বহুক্ষণ আগেই মুছে গেছে। দূরের অন্ধকারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে জ্বলছে অসংখ্য বৈদ্যুতিক বাতি। কোথাও কোনো ব্যস্ততা নেই, কোনো কোলাহল নেই। মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসছে যানবাহনের ক্ষীণ শব্দ, আবার তা মিলিয়েও যাচ্ছে রাতের গভীর স্তব্ধতার ভেতর। ফ্ল্যাটজুড়ে চাপা নীরবতা। যে নীরবতা শব্দের অভাবে নয়, বরং অনুচ্চারিত শোকের ভারে জন্ম নেয়।

একটু আগেই পিহুকে নিয়ে ফিরেছে আভিয়ান।

সারাদিন ছোট্ট মেয়েটাকে নিজের কাছেই রেখেছিল সে। কখনো অফিসে নিয়ে গেছে, কখনো নিজের কেবিনে বসিয়ে রেখেছে, কখনো নতুন খেলনা কিনে দিয়েছে। হয়তো ইচ্ছে করেই। কারণ সে জানে, এই মুহূর্তে অপরূপার ভাঙাচোরা মন আর নিঃশেষ হয়ে যাওয়া শক্তির কাছে একটি শিশুর স্বাভাবিক চঞ্চলতাও পাহাড়সম ভারী হয়ে উঠতে পারে। ফিরেই নিজের ঘরে ফ্রেশ হতে চলে গেছে আভিয়ান।

অন্যদিকে নিদ্রা ধৈর্য ধরে পিহুকে গোসল করিয়ে দিয়েছে।

গরম পানির ছোঁয়ায় মেয়েটার গাল দুটো আরও লালচে হয়ে উঠেছে। ভেজা চুলগুলো শুকিয়ে পরিপাটি করে আঁচড়ে দিয়েছে সে। গোলাপি রঙের ছোট্ট ফ্রক পরিয়ে দিয়েছে যত্ন করে। এখন পিহুকে দেখতে ছোট্ট কোনো পুতুলের মতো লাগছে। তার দুই হাতে শক্ত করে ধরা দুটি নতুন ডল। একটির সোনালি চুল কোমর পর্যন্ত নেমে এসেছে। অন্যটির কালো রেশমি চুল। দুটো খেলনাই আজ বিকেলে কিনে দিয়েছে আভিয়ান। সাধারণত নতুন খেলনা পেলে পিহু খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়। ঘরময় দৌড়াদৌড়ি করে। গল্প বানায়।

কিন্তু আজ সে অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। অদ্ভুতভাবে চুপচাপ। করিডোরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে বারবার একটি নির্দিষ্ট দরজার দিকে তাকাচ্ছে। তারপর আবার নিচের দিকে তাকাচ্ছে। ছোট্ট মুখে স্পষ্ট দ্বিধা। যাবে? নাকি যাবে না? মাম্মা কি কথা বলবে? নাকি আগের মতোই চুপ করে থাকবে? শিশুরা অনেক কিছু বুঝতে না পারলেও মানুষের দুঃখ চিনতে পারে। গত কয়েকদিনে সে বুঝে গেছে তার মাম্মার ভেতরে কিছু একটা বদলে গেছে।

খুব বড় কিছু। এমন কিছু, যার কারণে সে আগের মতো হাসে না। গল্প বলে না। কোলে তুলে নেয় না। রাতে ঘুম পাড়িয়ে দেয় না।

ভাবনাগুলো হয়তো এত স্পষ্ট ভাষায় তার মনে নেই, কিন্তু অনুভূতিগুলো আছে। আর সেই অনুভূতিগুলোই তাকে বারবার থামিয়ে দিচ্ছে। একবার দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে এলো পিহু। আবার দাঁড়াল। আবার তাকাল।

অবশেষে সমস্ত দ্বিধা একপাশে সরিয়ে সাহস জোগাড় করল। ছোট্ট আঙুলগুলো ধীরে ধীরে দরজার হাতলে গিয়ে স্পর্শ করল। দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে গেল।

তারপর নিঃশব্দে ভেতরে প্রবেশ করল সে। ঘর অন্ধকার।

মূল লাইট জ্বালানো হয়নি। জানালার পর্দা অর্ধেক সরানো। বেলকনির দিক থেকে আসা ম্লান আলো ঘরের ভেতর ধূসর ছায়া এঁকে রেখেছে।

টেবিলের উপর দুপুরের খাবার এখনো পড়ে আছে।

যেভাবে রাখা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই। ভাত শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। পানির গ্লাসটাও অর্ধেক ভর্তি। সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে বহু ঘণ্টা ধরে কেউ সেগুলোর দিকে ফিরেও তাকায়নি। পিহু কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার ছোট্ট চোখদুটো টেবিলের দিকে গেল। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরল বেলকনির দিকে। আর তখনই সে দেখল তার মাকে। বেলকনির কোণায় রাখা একটি চেয়ারে বসে আছে অপরূপা। অন্ধকারের সঙ্গে মিশে যাওয়া এক নিঃশব্দ অবয়ব। এমনভাবে বসে আছে যেন চারপাশের পৃথিবীর সঙ্গে তার আর কোনো সংযোগ নেই।

তার মুখের অর্ধেকটা ছায়ায় ঢাকা। বাতাসে উড়ছে এলোমেলো কিছু চুল। দৃষ্টি কোথাও দূরে। খুব দূরে।যেখানে হয়তো এই ঘর নেই। এই শহর নেই। এই রাত নেই। শুধু আছে স্মৃতি। হারিয়ে যাওয়া মানুষদের মুখ।অসমাপ্ত কিছু ডাক। আর অসহনীয় এক শূন্যতা। তার কাছে মনে হচ্ছে, সে বেলকনিতে বসে নেই। বরং নিজের ভেতরের কোনো গভীর, অন্ধকার গহ্বরে ডুবে আছে।

যেখানে পৌঁছানো যায় না, ডাকা যায় না, ফিরিয়ে আনা যায় না।

ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে ছোট্ট পিহু কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল নিজের মায়ের দিকে। তার ছোট্ট বুকের ভেতরটাও কেমন করে উঠল। সে পুরোটা বুঝতে পারে না। তবুও বুঝতে পারে তার মাম্মা খুব কষ্টে আছে।

খুব, খুব কষ্টে। পিহু অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপে ডাকল,

"মাম্মা।"

অত্যন্ত মৃদু সেই কণ্ঠস্বর। তার ক্ষুদ্র দুটি হাত পুতুলের জামার প্রান্ত আঁকড়ে ধরে আছে। চোখদুটো নিবদ্ধ বেলকনির দিকে। কোনো সাড়া এলো না। বেলকনির আধো-অন্ধকারে বসে থাকা অপরূপার অবয়বটিও নড়ল না সামান্যতম। মনে হচ্ছে সে এই ঘরে নেই। এই শহরে নেই। এই মুহূর্তেও নেই। শরীরটা কেবল এখানে বসে আছে, অথচ মন বহু দূরে, এমন এক শূন্যতার গহ্বরে হারিয়ে গেছে। পিহু আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল।

তারপর আরও কয়েক কদম অগ্রসর হলো। ছোট্ট পায়ের ক্ষীণ শব্দটাও ঘরের ভারী নীরবতার মধ্যে বিলীন হয়ে গেল। আবারো ডাকল সে তার মাম্মাকে,

“মাম্মা?"

তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই অপরূপার। কেবল নিস্তব্ধতা, অস্বস্তিকর দমবন্ধ করা নীরবতা। পিহুর ঠোঁট ধীরে ধীরে ফুলে উঠল। মুখে জমল শিশুসুলভ অভিমান।

এরপর একটু উচ্চস্বরে ডাকল সে,

“মাম্মাআআ...”

এবার বোধ-হয় ঘোর থেকে ফিরে এলো অপরূপা।

অত্যন্ত ধীরগতিতে ঘুরল তার ঘাড়। শূন্য, অবসন্ন, প্রাণহীন দৃষ্টি এসে স্থির হলো পিহুর মুখে। সেই দৃষ্টিতে কোনো বিস্ময় নেই, নেই কোনো প্রশ্নও। শুধু আছে অবর্ণনীয় ক্লান্তি। দীর্ঘদিন ধরে অবিরাম রক্তক্ষরণের পর নিঃশেষ হয়ে যাওয়া কোনো আত্মা। কিন্তু পিহু সেসব কিছুই বুঝল না। মুহূর্তেই তার সমগ্র মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নিষ্পাপ আনন্দে ঝলমল করে উঠল দুটি চোখ। সে দুহাত উঁচু করে পুতুল দুটো দেখাল।

“দেকো!”

কণ্ঠে উচ্ছ্বাসের রেশ। সেই উচ্ছ্বাস, যা কেবল শিশুদের পক্ষেই সম্ভব। অপরূপা নীরব। পিহু নিজের মতো করেই বলতে লাগল,

“মাম্মা দেকো, ইয়ান কিনে দিয়েচে।”

বলতে বলতেই একটি পুতুল অপরূপার দিকে বাড়িয়ে দিল।

“এতা তোমার।”

অপরটি নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল।

“এতা আমার।”

অতঃপর কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে অত্যন্ত গম্ভীর ভঙ্গিতে যোগ করল,

“আমরা দুজন একসাথে খেলব।”

অপরূপা তাকিয়ে রইল স্থির নিষ্পলক চাহনিতে। তার দৃষ্টি পুতুলের উপর নয়, বরং সময়ের বহু পেছনে কোথাও নিবদ্ধ। পিহু খেয়াল করল না। সে টেবিলে উঠে বসল।

পা দুটো ছন্দহীনভাবে দোলাতে দোলাতে বলতে লাগল,

“জানো মাম্মা, আজ আমি ইয়ানের সাতে আইসক্রিম কেয়েচি। আর ইয়ান আমাকে কোলে করে দোকানে নিয়ে গেচে। তারপর বলেছে লিতেন কিতেন নাকি কুব ব্রেভ।”

কথাটা বলে নিজেই হেসে ফেলল পিহু। নির্মল সেই হাসি।

একটি শিশুর হৃদয় থেকে উঠে আসা নির্মেঘ আনন্দের মতো। কিন্তু সেই হাসি অপরূপার কর্ণগোচর হলো কি না, তা বোঝার উপায় নেই। কারণ ঠিক তখনই তার চেতনার অন্তঃস্থলে জেগে উঠেছে অন্য এক মুখ। সৈকত।

একসময় যার উপস্থিতিতে নিরাপত্তা খুঁজে পেয়েছিল সে।

একসময় যার কথায় বিশ্বাস করেছিল। একসময় যার পাশে ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিল। তারপর স্মৃতির ক্যানভাসে আকস্মিকভাবে বিস্ফোরিত হলো আগুন। দাউদাউ জ্বলতে থাকা শিখা। অন্ধকার রাত, আর্তচিৎকার, ধোঁয়ার কুণ্ডলী, দগ্ধ শরীর।

পোড়া মাংসের বিভীষিকাময় গন্ধ। আমেনা বেগমের নিশ্চল দেহ। পলাশের নিথর মুখ। লুপার শোকাতুর আর্তনাদ। সবকিছু একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার চেতনার উপর। অপরূপার বুকের ভেতর তীব্র যন্ত্রণার ঢেউ আছড়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে, হৃদপিণ্ডটা কেউ নিষ্ঠুরভাবে মুঠো করে চেপে ধরেছে। তার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠল মুহূর্তেই। হাতের আঙুলগুলো অনিয়ন্ত্রিত কম্পনে কেঁপে উঠল। মাথার ভেতরে হাজারো কণ্ঠ যেন একসাথে আর্তনাদ করছে।

"সব আমার জন্য হয়েছে., ও-ই করেছে। ও-ই আমার সব ছিনিয়ে নিয়েছে।"

ঝাপসা হয়ে এলো অপরূপার দৃষ্টি। বর্তমান আর অতীতের সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যেতে লাগল।

পিহুর ছোট্ট মুখের স্থানে বারবার ভেসে উঠতে লাগল সৈকতের মুখচ্ছবি। একবার দুইবার করে অসংখ্যবার।

অপরূপা হঠাৎ দুহাতে নিজের মাথা চেপে ধরল। চোখ বন্ধ করে ফেলল শক্তভাবে। না, না। এটা পিহু, এটা তার মেয়ে। তার অস্তিত্বের সবচেয়ে কোমল অংশ। সৈকত নয়।

কিন্তু শোক, ক্রোধ, অনুতাপ এবং মানসিক বিপর্যয়ের সম্মিলিত অভিঘাত তার যুক্তিবোধকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, বাস্তবতা তার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। ঠিক তখনই পিহুর কণ্ঠ আবার ভেসে এলো,

“মাম্মা?”

ছোট্ট পিহুর সেই কণ্ঠে কোনো অভিমান ছিল না, ছিল না অভিযোগও। ছিল শুধু এক গভীর, আদিম ভয়। মাকে হারিয়ে ফেলার ভয়। অবহেলিত হয়ে যাওয়ার ভয়।একাকী হয়ে পড়ার ভয়। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অপরূপার অন্তরের বহুদিনের সঞ্চিত সমস্ত যন্ত্রণা, শোক, ক্ষোভ, অনুতাপ, অপরাধবোধ এবং অসহায়তা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল সে।

চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম লাল। নিদ্রাহীন রাতের ছাপ, দীর্ঘ কান্নার দাগ আর অবিরাম মানসিক যন্ত্রণার চিহ্ন সেখানে স্পষ্ট। ফোলা চোখের নিচে কালচে ছাপ।

মুখশ্রী বিবর্ণ। চুলগুলো এলোমেলো।

তাকে দেখে মনে হচ্ছে কয়েক দিনের মধ্যে সে যেন কয়েক বছরের ক্লান্তি নিজের শরীরে বহন করে ফেলেছে।

পিহু প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। সে শুধু মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই পরিচিত মুখ, তার পরিচিত মানুষ।

কিন্তু আজ তিনি আর আগের সেই মানুষটি নন।অপরূপার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। মাথার ভেতর যেন অসংখ্য আর্তনাদ একসঙ্গে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

সবকিছু একাকার হয়ে গিয়ে তার মস্তিষ্ককে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। হঠাৎই দুহাতে পিহুর কাঁধ চেপে ধরল অপরূপা।নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিল শিশুটিকে। পিহু বিস্ময়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল। ডেকে উঠল,

"মাম্মা, কী হয়েছে তোমার?”

অপরূপার কণ্ঠনালী কাঁপছ। চোখে মুখে বিধ্বস্ত এক মানুষের অসংলগ্ন ক্ষোভ। মাথার চুল খামচে ধরে সে চিৎকার করে উঠল,

“কেন এসেছো এখানে?”

পিহু হতভম্ব হয়ে গেল। ঠোঁট কাঁপতে লাগল তার।

“আমি... আমি তো...”

“কেন এসেছো?”

এইবার কণ্ঠস্বর আরও উঁচু হয়ে উঠল রমণীর। পিহুর ছোট্ট শরীরটা আতঙ্কে কেঁপে উঠল। সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এক পা পিছিয়ে গেল। অপরূপা দুহাতে নিজের মাথা চেপে ধরল। তার মনে হচ্ছে করোটির ভেতরটা ফেটে যাবে। তারপর আবার চোখ তুলে তাকাল মেয়েটার দিকে।

কিন্তু সেই দৃষ্টিতে মাতৃত্বের কোনো পরিচয় ছিল না। সে যেন পিহুকে দেখছিল না। দেখছিল অন্য কাউকে। আরেকটি মুখ। একটি অভিশপ্ত স্মৃতি। সৈকত। তার ঠোঁট কাঁপল। অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল,

“সব শেষ হয়ে গেছে! সব... সব শেষ!"

পিহুর চোখ টলমল করছে। অশ্রু জমল পাপড়ির কিনারায়।

“মাম্মা..."

"ডেকো না!”

বজ্রপাতের মতো ধমকে উঠল অপরূপা।

“একদম ডেকো না!”

পিহু আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কান্না গুলো ভেঙে বেরিয়ে এল। ক্ষুদ্র বুকটা কাঁপতে লাগল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।

“আমি কী করেচি, মাম্মা? আমাকে বকা বকা কেন করচো?"

প্রশ্নটা শুনে অপরূপা হেসে উঠল। একটি ভাঙাচোরা, রিক্ত, অস্বাভাবিক হাসি। যে হাসির ভেতরে আনন্দ তো দূরের কথা, জীবনের কোনো উষ্ণতাই অবশিষ্ট নেই।

“কী করেছো? তোমরা আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছো!"

পিহু কিছুই বুঝতে পারছে না। তার কাছে তো পৃথিবীটা খুব সহজ। মা মানে আশ্রয়। মা মানে নিরাপত্তা। আর সেই মানুষটাই আজ তার কাছে অপরিচিত হয়ে উঠছেন।

“মা..."

ডাকতে দিল না অপরূপা। উন্মাদের ন্যায় কাঁপা ঠোঁটে উচ্চারণ করল,

"তোর বাবার জন্য হয়েছে সব!”

অপরূপার কণ্ঠ ক্রমশ ভেঙে আসছে। তার হাত কাঁপছে।

আঙুলগুলো থরথর করছে। সে থেমে কেমন অদ্ভুত ভাবে আবারো বলল,

“আমার মা নেই, আমার ভাই নেই। সব শেষ আমার, সব শেষ।”

প্রতিটি শব্দ বুক চিরে বেরিয়ে আসছে তার। পিহু ভয়ে আরও সঙ্কুচিত হয়ে গেল। দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে অবিরাম।

“আ আমি তো কিচু করিনি, মাম্মা। আমার ভয় করচে।"

“চুপ!”

অপরূপা নিজের চুল মুঠো করে ধরল। নিজেকেই শাস্তি দিতে চাইছে সে। খেঁকিয়ে উঠল,

“চুপ করো!”

নিজের চোখ থেকেও অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে তার। সে নিজের কথার অর্থও বুঝতে পারছে না। যন্ত্রণা মানুষকে কখনো কখনো নিজের কাছেই অপরিচিত করে দেয়।

“আমি আর পারছি না, আমি আর পারছি না।"

পিহু কাঁদতে কাঁদতেই আবার এগিয়ে এলো। ভয়ের মাঝেও শিশুমন শেষ আশ্রয়টুকু খুঁজে নিতে চায়।

সে মায়ের হাত ধরতে চেষ্টা করল।

“মাম্মা, পিহু ভয় পাচ্চে।"”

এই ক্ষুদ্র, উষ্ণ স্পর্শটাই যেন অপরূপার ভেতরের শেষ সংযমটুকুও ভেঙে দিল। এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিল সে। তারপর অস্থির, অসংলগ্ন এক প্রতিক্রিয়ায় পিহুকে দূরে ঠেলে দিল। ধাক্কাটা খুব জোরে ছিল না। কিন্তু ছোট্ট শরীরের জন্য যথেষ্ট। পিহু ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। তার হাত থেকে ছিটকে গেল দুটো পুতুল।

একটা গিয়ে পড়ল টেবিলের নিচে। আরেকটা গড়িয়ে থেমে গেল দরজার পাশে। এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে দাঁড়াল। নিস্তব্ধতা আর স্তব্ধতা। অতঃপর স্ব শব্দে কেঁদে উঠল সে,

“মাম্মাআআ!”

শিশুটির কান্না ঘরের প্রতিটি দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। ভয়, কষ্ট, বিভ্রান্তি আর আকুলতার মিশ্রণে ভেঙে পড়া সেই আর্তনাদ শুনলে পাথরও হয়তো নরম হয়ে যেত। পিহুর ছোট্ট মুখটা অশ্রুতে ভিজে গেছে। চোখদুটো আতঙ্কে বিস্ফারিত। সে বুঝতেই পারছে না কী ঘটেছে।

কেন ঘটেছে। কেন তার মা তাকে দূরে সরিয়ে দিল।অপরূপা দাঁড়িয়ে আছে ঠিক আগের জায়গাতেই। শরীর কাঁপছে তার, শ্বাসপ্রশ্বাস অনিয়মিত। চোখদুটো শূন্য।

অদ্ভুত, নিস্তেজ, বিধ্বস্ত। নিজের ভেতরেই কোথাও ডুবে যাচ্ছে সে। কাঁপতে থাকা আঙুল তুলে দরজার দিকে ইশারা করল সে।

“বেরিয়ে যাও, পিহু। প্লিজ প্লিজ প্লিজ।"

পিহু মাথা নাড়ল। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে বলল,

"পিহু কুব রাগ করবে।"

"বেরিয়ে যেতে বলেছি আমি। চোখের সামনে থেকে যাও, যাও বলছি।"

এ পর্যায়ে আর্তচিৎকার করে উঠল অপরূপা। শিশুটির কান্নার গতি বাড়ল, বাড়ল শব্দ। এক পাশে মেঝেতে বসে থাকা আতঙ্কিত একটি শিশু। অন্য পাশে নিজের শোক, অপরাধবোধ আর অসহনীয় মানসিক ভাঙনের নিচে চাপা পড়ে যাওয়া এক মা। দুজনেই কাঁদছে। দুজনেই ভেঙে পড়ছে। পিহুর কান্নার শব্দ সমগ্র ফ্ল্যাটজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। মেঝের উপর বসে আছে পিহু। ছোট্ট বুকটা হেঁচকির সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠছে। দুচোখ বেয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজাটা খুলে গেল। দ্রুত পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল আভিয়ান। কিছুক্ষণ আগেই গোসল শেষ করেছে সে। ভেজা চুল থেকে এখনো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে।

কালো টি-শার্টের গলার অংশ সামান্য ভিজে। এক হাতে ধরা সাদা তোয়ালে। কিন্তু ঘরে ঢুকেই তার সমস্ত মনোযোগ গিয়ে স্থির হলো এক জায়গায়। পিহু।

মেঝেতে বসে থাকা, আতঙ্কে কাঁপতে থাকা শিশুটিকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে বদলে গেল। উদ্বেগ, শঙ্কা আর তীব্র সুরক্ষাবোধ একসঙ্গে ভেসে উঠল সেখানে।

“সোনা, লিটেল কিটেন!”

দৌড়ে গিয়ে শিশুটিকে তুলে নিল আভিয়ান। এক ঝটকায় বুকের সঙ্গে চেপে ধরল পিহুকে। তার কণ্ঠে স্পষ্ট উদ্বেগ।

“কী হয়েছে, লিটেল কিটেন? কী হয়েছে?”

পিহু কোনো উত্তর দিতে পারল না। কাঁদতে কাঁদতেই দুহাত দিয়ে আভিয়ানের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। পিহুর কাছে সে-ই এখন তার একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়।

“ইয়াআআন...”

শব্দটা শুনেই আভিয়ানের মুখের পেশীগুলো শক্ত হয়ে উঠল। চোয়াল দৃঢ় হলো। অথচ কণ্ঠস্বর রইল কোমল।বারবার শিশুটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল সে।

“শান্ত হও, আমি আছি। কী হয়েছে বলো আমাকে?

তার কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই ঘরের আরেক প্রান্ত থেকে ভেসে এলো অপরূপার কণ্ঠ। এতটা সময় পিহুর ধ্যানেই মগ্ন ছিল আভিয়ান। অপরূপার অস্তিত্ব টের পায়নি সে।

“চলে যান, ওকে নিয়ে যান এখান থেকে।"

দেয়ালের সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। দুহাতে নিজের মাথা চেপে ধরা। উন্মাদের মতো সে আওড়াতে লাগল,

“সবাই চলে যাও! আমার সামনে থেকে চলে যাও!”

“আমি কাউকে দেখতে চাই না!”

পিহু আবার কেঁপে উঠল। ছোট্ট আঙুলগুলো আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল আভিয়ানের জামা। তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। আভিয়ান ধীরে মাথা তুলল।

দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো অপরূপার উপর। কয়েক সেকেন্ড স্থির রইল। অতঃপর দৃঢ় স্বরে ডাকল,

“অপরূপা, আপনি কেন এমন করছেন? ভয় পাচ্ছে আমার লিটেল কিটেন।”

কোনো উত্তর নেই। মেয়েটি হয়তো ডাক শুনতেই পায়নি।সে নিজের ভেতরেই বন্দি। নিজের দুঃস্বপ্নের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে। অপরূপা দুহাতে চুল মুঠো করে ধরল। চোখ বন্ধ করে অসংলগ্নভাবে বিড়বিড় করতে লাগল।

“সব আমার জন্য হয়েছে, সব। আমি যদি না যেতাম,আমি যদি ওদের একা না রেখে যেতামআম্মু বাঁচত, ভাইয়া বাঁচত। সব আমার জন্য হয়েছে!"

কথাগুলো বলতে বলতেই কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে এলো রমণীর।হঠাৎ করেই নিজের গালে নিজেই আঘাত করল সে। তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল ঘর।

“আমি খারাপ মানুষ, খুব খারাপ। আমি খারাপ মেয়ে, একজন খারাপ বোন, খারাপ মা।

ততক্ষণে নিদ্রাও চলে এসেছে। পিহুর কান্নার শব্দ শুনেই এসেছে সে। ঘরে ঢুকে দৃশ্যটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার পদক্ষেপ থেমে গেল। চোখে স্পষ্ট বিস্ময় আর আতঙ্ক।

কয়েক মুহূর্ত সে কিছুই বলতে পারল না। সে দ্রুত এগিয়ে আসতে নিল। মেয়েটার মানসিক অবস্থা বড্ড খারাপ। তার উপর খাওয়া দাওয়া করছে না। ওষুধও খাচ্ছে না। নিদ্রা পা বাড়াতেই আভিয়ান তাকাল তার দিতে। সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,

“কিটেনকে নিয়ে বাইরে যাও, আমি দেখছি।”

নিদ্রা দ্বিধায় পড়ে গেল। চোখ ঘুরে গেল অপরূপার দিকে।

“কিন্তু আভি...”

“নিদ্রা।”

এবার কণ্ঠস্বর আরও নিচু হলো আভিয়ানের, হলো আরও কঠিন, আরও দৃঢ়।

“প্লিজ। বাইরে যা লিটেল কিটেনকে নিয়ে।"

নিদ্রা বুঝতে পারল এ মুহূর্তে তর্কের কোনো স্থান নেই।

ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে পিহুকে কোলে তুলে নিল সে।

কিন্তু পিহু যেতে চাইল না। ছোট্ট হাত বাড়িয়ে রইল আভিয়ানের দিকে। কান্নার মাঝেই অসহায় স্বরে ডাকল,

“ইয়ান।"

আভিয়ানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে ঝুঁকে শিশুটির কপালে দীর্ঘ একটি চুম্বন এঁকে দিল।

“আমি আসছি, সোনা। তুমি আন্টির সাথে যাও, আমি এখনই আসছি। গো অন।”

নিদ্রা আর সময় নষ্ট করল না। পিহুকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল তাদের পেছনে। মৃদু শব্দে ছিটকিনি লেগে গেল।

কয়েকটি দীর্ঘ মুহূর্ত আভিয়ান নিথর দাঁড়িয়ে রইল।তার দৃষ্টি নিবদ্ধ অপরূপার উপর। সেই দৃষ্টিতে ছিল না করুণা, ছিল না কেবল উদ্বেগও। ছিল এক গভীর অসহায়তা।প্রিয় কোনো মানুষকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যেতে দেখেও তাকে সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার করতে না পারার যে অসহনীয় যন্ত্রণা, ঠিক তেমন এক অনুভূতি ধীরে ধীরে তার বুকের ভেতর জমাট বাঁধছে।

সতর্ক পদক্ষেপে ধীরে এগিয়ে এলো আভিয়ান। পরপর তার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল সে। মাথা সামান্য উঁচু করে তাকাল অপরূপার দিকে। মেয়েটি তখনও বিড়বিড় করে চলেছে নিজ মনে। নিজের সঙ্গে নিজেই এক অবিরাম বিচারসভা বসিয়েছে সে। নিজেকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। নিজেকেই অপরাধী ঘোষণা করেছে।

“আমারই মরে যাওয়া উচিত ছিল। আমি কেন বেঁচে আছি? আম্মুকে আমি বাঁচাতে পারিনি, ভাইয়াকেও না আমি কাউকে বাঁচাতে পারিনি।”

প্রতিটি শব্দ যেন ধারালো কাঁচের টুকরোর মতো এসে বিঁধতে লাগল আভিয়ানের বুকে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। দৃষ্টি ম্লান হয়ে এলো। তবুও নিজেকে সংযত রাখল সে। অত্যন্ত মৃদু স্বরে ডাকল,

"অপ্সরা।"

কোনো সাড়া নেই। আভিয়ান আবার ডাকল।এইবার সেই নামটি, যেটি শুধুমাত্র সে-ই উচ্চারণ করে। যার মধ্যে আছে অগণিত স্নেহ, মমতা আর নিঃশব্দ অনুভূতি।

“স্নো হোয়াইট।”

তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। অপরূপা বাস্তবতার সমস্ত শব্দ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তার চারপাশে কেবল শোকের এক অদৃশ্য প্রাচীর। আর সেই প্রাচীরের ওপারে পৌঁছানো অসম্ভব। আভিয়ান ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। তারপর হুট করেই কোনো এক সিদ্ধান্তে উপনীত হলো সে। আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। আভিয়ান সোজা দুহাতে অপরূপাকে টেনে নিল নিজের বুকে শক্ত করে। অটলভাবে জড়িয়ে নিল। যেমন ঝড়ের মধ্যে উপড়ে যেতে থাকা একটি বৃক্ষ শেষ শক্তিটুকু দিয়ে ধরে রাখে তার মাটি, ঠিক তেমন ভাবেই। ছটফট করে উঠল অপরূপা। অস্থিরভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।

“ছাড়ুন, আমাকে ছাড়ুন। আমি খারাপ, আমি সব শেষ করে ফেলেছি।"

আত্মঘৃণা ছাড়া আর কিছুটি প্রকাশ পেল না তার কণ্ঠে।নিজেকে ধ্বংস করে দেওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। আভিয়ান তাকে আরও শক্ত করে আগলে রাখল। একটি হাত স্থির হয়ে রইল তার মাথার উপর। অন্য হাতটি সুরক্ষার বলয়ের মতো জড়িয়ে রইল তার পিঠে। তার কণ্ঠস্বর আশ্চর্যরকম কোমল হলো,

"অপ্সরা, স্নো হোয়াইট আমার, শান্ত হোন। নিজের সাথে সাথে আমাকেও কষ্ট দিচ্ছেন আপনি। আপনি জানেন না আমি সইতে পারি না আপনার চোখের জল? জানেন তো। তবুও কেন কেঁদে চলেছেন? আমার প্রতি কি একটুও মায়া হয় না আপনার?"

চুপ হয়ে গেল অপরূপা। তবে কান্না থামল না। আভিয়ান অপরূপার এলোমেলো চুল গুলো গুছিয়ে দিতে দিতে আওড়াল,

“প্লিজ শান্ত হোন, একবার গভীর শ্বাস নিন। আমি আছি তো, দেখুন তাকিয়ে।'

মাত্র দুটি শব্দ। 'আমি আছি।’ কিন্তু কখনো কখনো একটি মানুষের ভেঙে পড়া পৃথিবীকে সামলে রাখতে এতটুকুই যথেষ্ট হয়। শব্দদুটি কানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই অপরূপার সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে গেল। যে কান্নাকে সে দশ দিন ধরে বুকের গভীরে বন্দি করে রেখেছিল সেটি আর আটকে রাখা গেল না। হঠাৎ করেই ফুঁপিয়ে উঠল সে। সেই ফুঁপিয়ে ওঠা মুহূর্তেই রূপ নিল বুকভাঙা আর্তনাদে। দীর্ঘদিনের জমাটবাঁধা বেদনা যেন একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো। সে কাঁদতে লাগল হাউমাউ করে।অসংযতভাবে বুক ফেটে বেরিয়ে এলো জমাট বাঁধা যন্ত্রণা গুলো। মনে হচ্ছিল প্রতিটি অশ্রুবিন্দুর সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতরকার রক্তক্ষরণও বাইরে বেরিয়ে আসছে।আভিয়ানের কালো টি-শার্ট মুহূর্তেই ভিজে গেল। তবুও সে একচুলও সরল না। কোনো অস্বস্তি প্রকাশ করল না।কেবল ধীরে ধীরে তার চুলে হাত বুলিয়ে যেতে লাগল।যেন কোনো আহত শিশুকে শান্ত করছে সে। তার মাঝে এতটা ধৈর্য্য কবে এলো? সে তো ছন্নছাড়া বাঁধনহারা ঘুড়ি ছিল। সে কী করে সব সহ্য করে নিচ্ছে? শুঁকনো ঢোক গিলল আভিয়ান। যন্ত্রণা গুলো গিলে নিল। অপরূপার হাত দুটো আঁকড়ে ধরে রেখেছে ছেলেটার বুকের কাছের টি শার্টের অংশ। বুকে কপাল ঠেকিয়ে কাঁদছে বাঁধনহারা বারিধারার ন্যায়। রোধ হওয়া কণ্ঠনালী শুকনো ঢোকে মুক্ত করল আভিয়ান। রমণীর উদ্দেশ্য বাক্য আওড়াল,

“আপনি খারাপ নন, শুনতে পাচ্ছেন? আপনি খারাপ নন, আমার স্নো হোয়াইট স্বচ্ছ, নিষ্পাপ, সে আমার অপ্সরা। সে খারাপ হতেই পারে না।"

অপরূপা মাথা নাড়ল। কান্নাভেজা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,

“আমি খারাপ।"

“না।”

“আমি খারাপ, আমি অনেক খারাপ। আমি পিহুর উপর চিৎকার করেছি। ওকে... ওকে আমি আঘাত করেছি।”

আভিয়ান চোখ নামিয়ে তাকাল তার দিকে। তার কণ্ঠস্বরে প্রকাশ পেল অসীম ধৈর্য।

“কারণ আপনি ভেঙে পড়েছেন । কারণ আপনি মানুষ, কোনো পাথর নন।"

অপরূপার কান্না আবার জোরালো হয়ে উঠল।

“আমি আমার মাকে বাঁচাতে পারিনি।"

এইবার আভিয়ান কয়েক সেকেন্ড নীরব হয়ে রইল।

তার নিজের বুকেও যে ব্যথা হচ্ছে। সে ঠোঁট ছোঁয়াল অপরূপার চুলে। উচ্চারণ করল অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে,

“সব যুদ্ধ মানুষ জিততে পারে না, জানেন তো? কিছু যুদ্ধের ফলাফল আমাদের হাতে থাকে না। কিছু পরাজয় মানুষের অক্ষমতার কারণে নয় বরং নিয়তির নির্মমতার কারণে হয়।"

থামল আভিয়ান। তারপর আবারো যোগ করল,

"তাতে মানুষ অপরাধী হয়ে যায় না, বুঝেন তো আপনি?

তাতে মানুষ খারাপ হয়ে যায় না।

অপরূপা নির্লিপ্ত, নিরুত্তর। আভিয়ান তার কপালের উপর থুতনি ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল। ফিসফিস স্বরে বলল,

“আপনি এতটা দুর্বল নন। আমি যে অপরূপাকে চিনি, সে ঝড়ের মুখে দাঁড়াতে জানে, সে অন্যদের ভরসা হতে জানে। সে হার মানতে জানে না। আপনি এতদিন সবার জন্য শক্ত ছিলেন, আজ একটু নিজের জন্য শক্ত হোন। আজ নিজেকে ক্ষমা করুন। নিজের আত্মাকে শাস্তি দেওয়া বন্ধ করুন, স্নো হোয়াইট।"

তীব্রতর ভাবে কাজে দিল আভিয়ানের কথা গুলে। কান্নার গতি থেমে এলো রমণীর। অগোছালো শ্বাসপ্রশ্বাস ধীরে ধীরে ফিরতে লাগল স্বাভাবিক ছন্দে। দীর্ঘ সময় পর প্রথমবারের মতো তার শরীরের টানটান শক্তভাব কিছুটা শিথিল হলো। কিছুক্ষণ পরে সে সম্পূর্ণ ক্লান্ত হয়ে পড়ল। সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে নিল সে। মাথাটা এসে ঠেকল আভিয়ানের বুকে।আভিয়ান নীরবে বসেই রইল স্থির। দুহাতে আগলে রাখল তার পৃথিবীকে। মানুষের পৃথিবীর সমস্ত ঝড়, সমস্ত শোক, সমস্ত অন্ধকার থেকে তার নিজের পৃথিবীকে আড়াল করে রাখতে চায় সে। অন্তত এই একটি মুহূর্তের জন্য। দীর্ঘদিনের অনিদ্রা, অবিরাম কান্না, মানসিক আঘাত আর আত্মগ্লানির ভারে সে যেন সম্পূর্ণ অবসন্ন হয়ে পড়েছে অপরূপার শরীর। চোখের নিচে গাঢ় কালচে ছাপ। মুখশ্রী বিবর্ণ। আভিয়ানের অনিয়ন্ত্রিত মনের ইচ্ছে জাগল মেয়েটার পুরো মুখ চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিতে। তবে তার সেই অধিকার নেই। কণ্ঠনালী রোধ হয়ে এলো ছেলেটার। কবে সে বিনা বাঁধায় নিঃসংকোচে তার স্নো হোয়াইটকে কাছে টানতে পারবে যখন তখন? হুট করেই আভিয়ান হাসলো। ক্ষীণ স্বরে বিড়বিড় করে করে উঠল,

“আপনার গল্পে আমার অস্তিত্ব না থাকলেও, আমার গোটা অস্তিত্ব জুড়েই শুধু আপনি।"

অপরূপা শুনল। চোখ বুঁজে ভালো মতোই শুনল সে। তবে কোনোরূপ প্রতিক্রিয়ার দেখা মিলল না তার মাঝে। হয়তো ইচ্ছাকৃত ভাবেই নিরুত্তর রইল। আভিয়ান শ্বাস টানল। কিছু না বলেই নিচু হয়ে তাকে কোলে তুলে নিল সতর্কভাবে। যত্নের সঙ্গেই উঠালো তাকে, তার কাছে তার স্নো হোয়াইট তার কাছে অমূল্য কাঁচের প্রতিমা। যা সামান্য অসাবধানতাতেই ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে। আভিয়ান উঠে দাঁড়াল। অপরূপা দু'হাতে জড়িয়ে ধরল আভিয়ানের গলা।

অপরূপা কোনো প্রতিবাদ করল না। কেবল নিস্পন্দ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিতে না ছিল প্রশ্ন, না অভিযোগ, না কোনো প্রত্যাশা। শুধুই সীমাহীন ক্লান্তি। আভিয়ান তাকে নিয়ে বিছানার কাছে এসে বসল। অত্যন্ত সাবধানে শুইয়ে দিল নরম গদির উপর। পাশের টেবিল থেকে টিস্যুর প্যাকেট তুলে নিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে নিল। নীরবে মুছে দিতে লাগল তার মুখ। চোখের কোণে জমে থাকা শুকনো অশ্রুর রেখাগুলো।

গাল বেয়ে নেমে আসা লবণাক্ত দাগগুলো। কপালের ঘামে ভেজা অংশটুকু। মতার আঙুলের স্পর্শে অপরূপার চোখের পাতা কেঁপে উঠছে বারবার। কিন্তু সে কিছু বলল না। আভিয়ানও না। কথার প্রয়োজন ছিল না বলেই দু'জনে নিশ্চুপ। কিছু কিছু মুহূর্তে ভাষা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। মানুষ কেবল নীরব উপস্থিতির মধ্য দিয়েই অনুভূতি প্রকাশ করে।

মেয়েটার এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো পরম যত্নে কানের পেছনে সরিয়ে দিল আভিয়ান। কপালের উপর ঝুলে থাকা কয়েকটি অবাধ্য গোছাও আঙুলের স্পর্শে গুছিয়ে দিল। তারপর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।

নিশব্দে, গভীরভাবে। অতঃপর অত্যন্ত কোমল কণ্ঠে বলল,

“আমি খাবার আনছি। লক্ষ্মী মেয়ের মতো খেয়ে নিবেন।”

অপরূপা কোনো জবাব দিল না। আভিয়ানও অপেক্ষা করল না। কিছুক্ষণ পর খাবারের ট্রে হাতে ফিরে এলো।

অপরূপার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না।জীবনের প্রতি, ক্ষুধার প্রতি, এমনকি নিজের প্রতিও উদাসীন হয়ে উঠেছে। আভিয়ান ধৈর্য হারাল না।

চামচ ছেড়ে হাত চালাল। অল্প খাবার তুলে তার দিকে এগিয়ে দিল।

প্রথমে অপরূপা মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইল। কিন্তু আভিয়ানের দৃঢ় দৃষ্টি দেখে আর কিছু বলল না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য মেয়ের মতো খেয়ে নিল। আভিয়ান অদ্ভুত এক শান্তি অনুভব করল বুকের ভেতর। প্রশান্তিতে হামি ফুটল অধরে। খাওয়া শেষ হলে ওষুধ এগিয়ে দিল আভিয়ান। সেটাও নীরবে খেয়ে নিল অপরূপা। সবকিছু শেষ হতেই আভিয়ান উঠে দাঁড়াল।

ট্রেটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়েও গেল।

ঠিক তখনই খুব ক্ষীণ, প্রায় শ্রুতির সীমা ছুঁয়ে যাওয়া এক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।,

“শুনুন?"

আভিয়ানের পদক্ষেপ থেমে গেল। সে ধীরে পেছন ফিরে তাকাল। বিছানার উপর আধশোয়া অপরূপা। চোখ দুটি নিচু। এ পর্যায়ে রমণী চোখ তুলে সরাসরি তাকাল তার চোখে। অপরাধবোধে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে সে বলল,

“পিহুকে একটু দেবেন?”

“না।”

অপরূপা বিস্মিত হলো। আভিয়ান আবার তার কাছে এসে দাঁড়াল। বিছানার পাশে বসে কম্বলটা টেনে ঠিক করে দিল। সে যেন কোনো অবুঝ শিশুকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে। শান্ত, সংযত কণ্ঠে বলল,

"আপনি এখন ঘুমাবেন চুপটি করে। আর কোনো চিন্তা করবেন না। লিটেল কিটেনকে আমি দেখে নিচ্ছি।”

অপরূপা কিছু বলতে চাইল। কিন্তু আভিয়ান তাকে সেই সুযোগ দিল না। আভিয়ান হাত বাড়িয়ে বেডসাইড ল্যাম্পের আলোটা আরও ম্লান করে দিল। ঘরটা ডুবে গেল নরম আধো-অন্ধকারে। দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে শেষবারের মতো একবার ফিরে তাকাল সে। বিছানায় শুয়ে থাকা মেয়েটার দিকে। হাসি ফুটল অধরে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বিড়বিড়িয়ে উঠল,

“বাউন্ডুলে ঘুড়ি আমি। দিগন্তের পর দিগন্ত পেরিয়ে উড়ে বেড়ানোই ছিল আমার স্বভাব। কোনো আকাশকে নিজের বলিনি, কোনো ঠিকানায় থামিনি। অথচ নিয়তির কী অদ্ভুত পরিহাস! যে আমি বাঁধন এড়িয়ে চলেছি আজীবন, সেই আমিই আজ স্বেচ্ছায় বাঁধা পড়েছি। এই আমিই এখন মুক্তির চেয়ে বন্দিত্বকেই প্রশ্রয় দিচ্ছি অধিক।"

ঘরের দরজাটা আস্তে করে টেনে বন্ধ করে দিল আভিয়ান। কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল করিডোরে।

মাথাটা কেমন ভার হয়ে আছে। গত কয়েকদিনে ঘুম বলতে কিছু নেই তার। খাওয়াদাওয়া অনিয়মিত। তার উপর অপরূপার মানসিক অবস্থা। সব মিলিয়ে শরীরটাও তার বিদ্রোহ করতে শুরু করেছে।

গাঢ় শ্বাস টেনে সে ড্রয়িংরুমের দিকে এগোল। সেখানে এসে দেখল নিদ্রা সোফায় বসে আছে। কোলে পিহু।মেয়েটার চোখদুটো এখনো কান্নায় লাল। তবে আর কাঁদছে না। নিদ্রা মোবাইলে কার্টুন চালিয়ে দেখাচ্ছে।

মাঝে মাঝে মুখভঙ্গি করে হাসানোর চেষ্টা করছে।

পিহুও মুগ্ধ হয়ে দেখছে। যদিও তার ছোট্ট মুখে এখনো বিষণ্ণতার ছাপ স্পষ্ট। আভিয়ান কিছুক্ষণ দূর থেকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর এগিয়ে এসে নরম স্বরে বলল,

“আমার কাছে দে, ওকে।”

নিদ্রা মুখ তুলে তাকাল। একবার আভিয়ানের দিকে।

পরেরবার পিহুর দিকে। অতঃপর ভ্রু কুঁচকে বলল,

“থাকুক আমার কাছে।”

আভিয়ান হাত বাড়িয়ে দিল।

"দে।”

নিদ্রা বিরক্ত হলো।

“তুই গিয়ে কিছু খেয়ে আয়।”

"আমি নিয়ে যাচ্ছি।”

“কেন?”

“ওকেও খাওয়াতে হবে।”

কথাটা শুনেই নিদ্রা ঠোঁট বাঁকিয়ে ফেলল। অভিনয় করে গম্ভীর মুখে বলল,

“অলরেডি ডান, স্যার।”

তারপর গর্বিত ভঙ্গিতে যোগ করল,

“খাইয়ে দিয়েছি আমি।”

আভিয়ান স্থির। গভীর শ্বাস ফেলে চোখ নামিয়ে ফেলল।

নিচু হয়ে এলো কণ্ঠস্বর,

“থ্যাংক ইউ।”

নিদ্রার চোখ মুখ সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে গেল।

“এই!”

আভিয়ান তাকাল। নিদ্রা প্রায় ধমকের সুরে বলে উঠল,

“আমাকে থ্যাংক ইউ বলছিস কেন?”

কিছু বলতে চাইল আভিয়ান। তবে তার আগেই ধমক এসে পড়ল তার উপর,

“চুপ।”

আভিয়ান থেমে গেল। নিদ্রার মুখটা গম্ভীর। বেশ অভিমান নিয়েই বলে উঠল,

“তুই কি সত্যিই ভাবিস আমি আলাদা কেউ? এত বছর পরেও? বন্ধুত্বে ফরমালিটি কেন আসবে?"

আভিয়ান চুপ করে আছে। নিদ্রা এবার সত্যিই রেগে গেল।

“মাথা খারাপ নাকি তোর?”

"রিলাক্স। আমি..."

“কিছু বলবি না।”

আভিয়ান ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল। মাথা নিচু করে বলল,

“আচ্ছা সরি।”

নিদ্রা মুখ ঘুরিয়ে নিল। এখনো রাগ করে আছে সে।

তারপর কয়েক সেকেন্ড পর নিজেই বলে উঠল,

“খেয়ে নে গিয়ে। আর শোন।”

আভিয়ান ভ্রু তুলল। নিদ্রা আঙুল তুলে বলল,

“তোর বিয়েতে ট্রিট হিসেবে একটা বাইক চাই। আর অবশ্যই বাইকটা কিন্তু ভালো মডেলের হতে হবে।”

আভিয়ানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল ক্ষীণ হাসি। যদিও

খুব সামান্য। নিদ্রা সেটা দেখেই সন্তুষ্ট হলো। সে পিহুকে কোলে তুলে উঠে দাঁড়াল।

“চল লিটেল কিটেন।”

পিহু একবার আভিয়ানের দিকে তাকাল। ছোট্ট করে হাত নেড়রদে উচ্চারণ করল,

“গুড নাইট ইয়ান।”

আভিয়ান হাত বাড়িয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

“গুড নাইট।”

নিদ্রা মেয়েটাকে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। এই অল্প কয়েকদিনে পিহুও মিশে গেছে তাদের সাথে। আভিয়ান ধীরে ধীরে সোফায় এসে বসল। শরীরটা ছেড়ে দিল পেছনে। মাথা এলিয়ে দিল কুশনে। চোখ বন্ধ করল ক্লান্তিতে। কিন্তু বিশ্রাম এলো না তার। বরং আরও বেশি চিন্তা, আরও বেশি অস্থিরতা জেঁকে ধরল। সে যতই চেষ্টা করুক পুরোপুরি রক্ষা করতে পারছে না তাদের। অপরূপা পিহু দুজনকেই। একটা অদৃশ্য দেয়াল বারবার এসে দাঁড়াচ্ছে মাঝখানে। সে কাছেই আছে। তবু নেই।

সে ছুঁতে পারছে, তবু অধিকার নেই। সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছে,

তবু থেমে যেতে হচ্ছে। আর সেই থেমে যাওয়ার মূল্য?

আজ অপরূপা ভেঙে পড়ছে। পিহু ভয় পাচ্ছে। এই অবস্থায় আর কতদিন? আর কত? হঠাৎই চোখ খুলে ফেলল আভিয়ান। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে তার।

দৃষ্টি দৃঢ়। কিছু একটা সিদ্ধান্ত নিজের মাঝেই ঠিক করে ফেলেছে সে চূড়ান্তভাবে। আর এক মুহূর্তও দেরি করবে না সে, একদম না। সোজা হয়ে বসল আভিয়ান। পকেট থেকে ফোন বের করল চটজলদি। ডায়াল করল ফুয়াদের নম্বর। কল রিসিভ হতে না হতেই বলল,

“ফুয়াদ।”

ওপাশ থেকে কিছু একটা বলার আগেই সে কথাটা শেষ করে দিল।

“জিমেইল চেক কর, কাগজপত্র পাঠাচ্ছি। কালকের মধ্যেই আঙ্কেলকে সব ব্যবস্থা করতে বল। আমি আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করতে চাই না।”

ওপাশ থেকে কী বলা হলো, তা শোনা গেল না।

কারণ আভিয়ান ইতোমধ্যেই কল কেটে দিয়েছে।

ফোনটা পাশে রেখে আবার সোফায় হেলান দিল। চোখ বুজল। বিশাল বড় একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে। এবার শুধু কার্যকর হওয়ার পালা। যে অধিকারহীনতায় সে চাইতেও বাঁধের মুখোমুখি হচ্ছে সেই বাঁধটাই এবার ভাঙার পালা। তার অন্তর আত্মা যে ছুঁতে চাচ্ছে সুখ। যাতনা পেরিয়ে সে টেনে নিতে চাচ্ছে তার স্নো হোয়াইটকে। নিজের বক্ষ মাঝে জড়িয়ে নিয়ে যাতে বলতে পারে,

"আপনি এখন আমার, শুধু আমার। কেবল এই আভিয়ান এহসানের। আজ থেকে আপনার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন স্পন্দিত হবে কেবল আমার নামে।"

ব্যস এটুকুই। এটুকুই সে চায়। আর কোনো বাঁধ মানতে প্রস্তুত নয় সে। অবশেষে ক্লান্ত হৃদয় আর মস্তিষ্ক শান্ত করতে সোফাতেই গা এলিয়ে পড়ে রইল আভিয়ান। কাটল দীর্ঘক্ষণ। অতঃপর আওড়াল,

“নিয়তির সবচেয়ে অদ্ভুত দিক কী জানেন? সে বারবার একই দরজার সামনে এনে দাঁড় করায়। আপনি আমার কাছে ঠিক সেই দরজাটাই, যেটা এড়িয়ে যেতে চেয়েও কখনো পারিনি আমি।”

_________

#চলবে

বিশাল বড় পর্ব দিলাম। মন্তব্য করে যাবেন কেমন?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন