#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৪২
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা
_______________________
দুপুরের অলস প্রহর পেরিয়ে সময় গড়াচ্ছে বিকেলের দিকে। আকাশের রঙ আজ অদ্ভুতভাবে নিরপেক্ষ। না সেখানে উজ্জ্বল রৌদ্রের অহংকার, না আছে বৃষ্টিভেজা মেঘের বিষণ্নতা। যেন প্রকৃতি নিজেও এক অনির্ধারিত অপেক্ষায় স্থির হয়ে আছে। ফ্ল্যাটের ভেতরটাও আজ অস্বাভাবিক নীরব। কেবল দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার টিকটিক শব্দ নিস্তব্ধতার বুকে ক্ষীণ ঢেউ তুলছে।
নিজের ঘরের জানালার পাশে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে অপরূপা। তার কোলে মাথা রেখে আধোঘুমে শুয়ে আছে পিহু। ছোট্ট মেয়েটার এক হাত শক্ত করে জড়িয়ে আছে মায়ের শাড়ির আঁচল। অন্য হাতে আগলে রেখেছে নিজের প্রিয় পুতুলটাকে। শিশুরা বড় বিচিত্র। পৃথিবী উল্টে গেলেও, সমস্ত সম্পর্ক ভেঙে চুরমার হয়ে গেলেও, তাদের শেষ আশ্রয় হয়ে থাকে মা।
অপরূপার আঙুলগুলো বুলিয়ে যাচ্ছে পিহুর নরম চুলে অন্যমনস্কভাবে। নিজের অস্তিত্বের শেষ অবশিষ্ট উষ্ণতাটুকু যাচাই করছে। তার দৃষ্টি জানালার বাইরে। দূর আকাশে। কিন্তু সে আকাশ দেখছে না। সে দেখছে কিছু মুখ। একটা স্নেহময় মুখ। একটা আশ্বাসভরা মুখ। একজন মা। একজন ভাই। দুটি মানুষ, যারা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। যারা আজ আর নেই। স্মৃতিরা বড় নিষ্ঠুর। মানুষ যখন ভুলে যেতে চায়, তখনই তারা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ফিরে আসে। পিহু ঘুমজড়ানো কণ্ঠে নড়েচড়ে উঠল। নরম স্বরে ডাকল,
“মাম্মা?"
অপরূপা নিচে তাকাল। চোখের গভীর শূন্যতা মুহূর্তের জন্য নরম হয়ে এলো। শুধালো,
“হুম?”
পিহু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শিশুসুলভ দ্বিধায় জিজ্ঞেস করল,
“পিহু কি দুত্তু? তুমি কি পিহুর উপর রেগে আচো?"
হাসলো অপরূপা। মেয়ের ললাটে চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
"না, একদম না।"
এমন সময় ভেসে এলো দরজায় মৃদু করাঘাত। অপরূপা মুখ তুলে তাকাল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বলল,
“আসুন।”
দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল নিদ্রা। তার হাতে বড়সড় একটি শপিং ব্যাগ। মুখে বিরাজমান রহস্যময় হাসি। ভেতরে ঢুকেই সে কোনো ভূমিকা না করে ব্যাগটা এগিয়ে দিল অপরূপার দিকে।
“দেখুন তো, শাড়িটা কেমন?”
অপরূপা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। অবাক চোখে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুসময়। তারপর ধীরে ধীরে ব্যাগটা হাতে নিল। অনেকদিন পর নতুন কোনো কিছুর স্পর্শ পেল সে। সাবধানে ভেতর থেকে শাড়িটা বের করতেই তার দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। হালকা গোলাপি রঙের একটি জামদানি। রঙটা খুব উজ্জ্বল নয়। আবার ফ্যাকাসেও নয়। নরম, কোমল, স্নিগ্ধ একটা রঙ।
যেন গোধূলিবেলার আকাশে ভেসে থাকা কোনো লাজুক মেঘখণ্ড।
সূক্ষ্ম সুতোয় বোনা নকশাগুলো আলোয় ঝিলমিল করে উঠছিল। মুহূর্তের জন্য অপরূপার আঙুল থেমে গেল কাপড়ের উপর। তারপর চোখে পড়ল ছোট্ট একটি অলংকারের বাক্স। ধীরে ধীরে সেটি খুলল সে। ভেতরে রাখা একটি পরিশীলিত গলার হার। সঙ্গে মানানসই কানের দুল। নকশায় আড়ম্বর নেই। অদ্ভুত এক সৌন্দর্য রয়েছে। মার্জিত,পরিমিত, রুচিশীল নকশা। কয়েক মুহূর্ত বাকরুদ্ধ হয়ে বসে রইল অপরূপা। তারপর ধীরে মাথা তুলে তাকাল নিদ্রার দিকে।
“এ এগুলো কার?”
নিদ্রার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। হেসে বলে উঠল,
“অবশ্যই আপনার।”
অপরূপার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“আমার মানে?”
“মানে নিয়ে পরে গবেষণা করবেন।”
নিদ্রা এমন ভঙ্গিতে হাত নাড়ল যেন বিষয়টা পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক ঘটনা। দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবকের মতো বিছানার কাছে এগিয়ে এলো সে।
“এখন দ্রুত তৈরি হয়ে নিন।”
অপরূপা আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। কৌতহল নিয়ে শুধালো,
“তৈরি হব কেন?”
নিদ্রা নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আল্লাহ! পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করা মানুষ সম্ভবত আপনিই।”
বলতে বলতেই সে পিহুকে কোলে তুলে নিল। পিহুও বাধ্য মেয়ের মতো তার গলা জড়িয়ে ধরল। নিদ্রা আবার বলল,
“ড্রেসিং টেবিলের ওপর সব মেকআপ আইটেম সাজিয়ে রাখা আছে।”
একটু থেমে অপরূপার দিকে তাকাল। তারপর মুচকি হেসে যোগ করল,
“যদিও আপনি এমনিতেই সুন্দর। তবুও মাঝে মাঝে মানুষকে নিজের সৌন্দর্যের কথা মনে করিয়ে দিতে হয়।”
অপরূপা নির্বাক। মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কোথাও যেতে হবে? কেন? হঠাৎ? আর আভিয়ান কোথায়? কোনো অজানা আশঙ্কা কিংবা কৌতূহল বুকের মধ্যে জন্ম নিতে লাগল তার। সে দ্রুত বলল,
“নিদ্রা, আসলে কী হচ্ছে? কেন রেডি হবো?"
নিদ্রা এবার ইচ্ছে করেই দৃষ্টি সরিয়ে নিল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সে সব জানে। কিন্তু কিছু বলবে না। সে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“সেটা নাহয় আভিয়ান এসে বলবে।”
“কিন্তু...”
"কোনো কিন্তু নয়। আজ একদিন অন্তত বাধ্য মেয়ের মতো কথা শুনুন।”
পিহু সঙ্গে সঙ্গে হাত নাড়ল। মুখভর্তি হাসি। সে-ও বলে উঠল,
“মাম্মা, তুমি সাজু করো।"
“দেখলেন? এবার তো সরাসরি নির্দেশ জারি হয়ে গেছে।দ্রুত করুন।”
আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না নিদ্রা। সে চটজলদি পিহুকে নিয়ে বাইরে চলে গেল। দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। ঘর আবার নীরব হয়ে পড়ল। অপরূপা একা, তার হাতে গোলাপি জামদানি। বিছানার উপর রাখা অলংকারের বাক্স। আর বুকের ভেতর চলছে এক অজ্ঞাত কম্পন। সে দীর্ঘক্ষণ স্থির হয়েই বসে রইল। এ পর্যায়ে তার দৃষ্টি নামল শাড়িটার দিকে।
আঙুল ছুঁয়ে গেল কোমল কাপড়ের উপর। একটি দীর্ঘ নিশ্বাস বেরিয়ে এলো বুকের গভীর থেকে। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল সে। একবার আয়নার দিকে তাকাল। আবার শাড়িটার দিকে। মুহূর্তখানেক দ্বিধায় চলল মস্তিষ্ক, সাথে অসংখ্য অনুচ্চারিত প্রশ্ন, অজানা আশঙ্কা আর অদ্ভুত এক প্রত্যাশা। সবকিছুকে সঙ্গে নিয়েই শেষ পর্যন্ত সে নিঃশব্দে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।
অতঃপর ফ্রেশ হয়ে বের হলো অপরূপা। ভেজা চুলের ডগা থেকে এখনো বিন্দু বিন্দু জল ঝরছে। ধীর পদক্ষেপে বেরিয়ে এলো অপরূপা। তার হাতে তখনো ধরা সেই শপিং ব্যাগ। বিছানার কিনারায় এসে বসতেই অদ্ভুত এক অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরল তাকে। ধীরে ধীরে ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে শাড়িটা বের করল। অপরূপা আঙুল বুলিয়ে দিল কাপড়ের উপর। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই বুকের গভীরে কোথাও হঠাৎ একটা ব্যথা মোচড় দিয়ে উঠল।
শেষবার কবে এভাবে সাজগোজ করেছে সে? মনে করার চেষ্টা করল তবে পারল না। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে শাড়িটা পরে নিল। তারপর খুলল অলংকারের বাক্স। ভেতরে সাজানো গয়নাগুলো দেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। একজোড়া কানের দুল। পাতলা একখানা নেকলেস। কয়েকটি সরু বালা। কোথাও কোনো বাহুল্য নেই, অতিরিক্ত চাকচিক্য নেই।
একটির পর একটি গয়না পরে যখন অপরূপা আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল, তখন নিজের প্রতিবিম্ব দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সে। এ কি সত্যিই সে? মাত্র দশটি দিন। অথচ মনে হচ্ছে দশটি বছর পেরিয়ে গেছে। চোখের নিচে গভীর কালচে ছাপ। কেমন শুকিয়ে বেরিয়ে এসেছে চোয়াল। তবুও আজ তাকে অপার্থিব সুন্দর লাগছে। একটি বিষণ্ন সৌন্দর্য। যে সৌন্দর্যের মধ্যে উচ্ছ্বাস নেই। আছে গভীর শোকের আবরণে মোড়া এক নারীর ম্লান স্নিগ্ধতা।
এমন সময় আবারো টোকা পড়ল তার দরজায়। অপরূপা ঘুরে তাকাল। বাইরে থেকে ভেসে এলো নিদ্রার কণ্ঠস্বর,
“রেডি হয়েছেন?”
“হ্যাঁ।”
দরজা খুলে দ্রুত পায়ে ভেতরে ঢুকল নিদ্রা। মুহূর্তেই থমকে গেল সে। সত্যিকার অর্থেই থমকে গেছে পুরোপুরি।কয়েক সেকেন্ড তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠেছে। পরপর নাটকীয় ভঙ্গিতে দু'হাত কোমড়ে রেখে বলে উঠল,
“হায় আল্লাহ! মানুষ এত সুন্দরও হয়?”
অপরূপা সঙ্গে সঙ্গে অপ্রস্তুত হয়ে গেল। নিদ্রা মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অসহায় সুরে বলে উঠল,
“আজ সত্যিই আভির জন্য মায়া হচ্ছে।”
ভ্রু কুঁচকে নিল অপরূপা। কপালে দেখা মিলল সূক্ষ্ম ভাজের। শুধালো,
“কেন?”
“কারণ প্রতিদিন আপনাকে দেখে ছেলেটা কীভাবে স্বাভাবিক থাকে, সেটা আমার বোধগম্য হচ্ছে না।”
অপরূপার অস্বস্তি বাড়ল। তৎক্ষণাৎ চোখ নামিয়ে ফেলল সে। তার গালের পাশে ফুটে উঠেছে হালকা লাল আভা।নিদ্রা সেটা দেখে আরও মজা পেল। সে এগিয়ে এসে কানের পাশের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিল।
তারপর কয়েক পা পিছিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের কাজ পরখ করল।
“পারফেক্ট।”
অপরূপা এবার বিরক্তির ভান করে বলল,
“এখন বলবেন কী হচ্ছে?”
“না।”
“নিদ্রা, প্লিজ বলুন।”
নিদ্রা দু'হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল। জবাব দিল,
“ট্রাস্ট মি, আমাকেও বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।”
“বিশ্বাস করছি না।”
“না করলেও সত্যি এটাই, গার্ল।”
নিদ্রার চোখেমুখে তখনো রহস্যময় হাসি। অপরূপার কৌতুহল বাড়ছে। মনের ভেতর প্রশ্নের সংখ্যা বাড়ছে। মেয়েটা যে জানে তা দো স্পষ্ট, তবে তাকে কেন বলছে না? এমন সময় শোনা গেল কারো পায়ের শব্দ। মুহূর্তেই নিদ্রার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল অর্থপূর্ণ হাসি।
“মনে হচ্ছে অপেক্ষার অবসান হলো।”
অপরূপার বুকের ভেতর হঠাৎ করেই অকারণ এক ধাক্কা লাগল। হৃদস্পন্দন একটু দ্রুত হয়ে উঠল। সে নিজেও বুঝতে পারল না কেন। কয়েক মুহূর্ত পর আবার দরজায় টোকা পড়ল। এইবার কণ্ঠস্বর গভীর, স্থির, পরিচিত।
“নিদ্রা?”
কণ্ঠটা শোনামাত্র অপরূপার আঙুলগুলো অকারণে শক্ত হয়ে উঠল তার আঁচলে। নিদ্রা মুখ টিপে হাসল।
"আসুন স্যার, আসুন।”
দরজা খোলায় ছিল। কেবল পর্দা সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল আভিয়ান। সাদা পাঞ্জাবিতে তাকে আজ অস্বাভাবিক সুদর্শন লাগছে। চুলগুলো পরিপাটি। হাতে ঘড়ি। সবুজ চোখদুটো আজ উজ্জ্বল, প্রত্যয়ী, অদ্ভুতভাবে স্থির। ভেতরে ঢুকেই সে থেমে গেল। একেবারে থেমে গেল। তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো অপরূপার উপর। আর তারপর আর কোথাও সরল না। অপরূপার আভিয়ানকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বেশে দেখা হলেও পাঞ্জাবিতে দেখা হলো এই প্রথম। সে বেশ অবাক, বিস্মিত হয়েই তাকিয়ে আছে তার দিকে।
আভিয়ানের দৃষ্টিও স্থির তার অপ্সরার দিকে। শাড়িটা কেনার সময়ও ভাবেনি এতটা সুন্দর লাগবে। চোখ জোড়া মুগ্ধতায় জমে এলো। মন্থর হয়ে এলো সময়ের গতি। আনমনেই বিড়বিড় করে উঠল,
"অপ্সরা, আমার অপ্সরা।"
নিদ্রা দুজনের দিকেই তাকিয়ে আছে। হাসি চেপে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছে সে। আভিয়ান যেন মুহূর্তের জন্য ভুলেই গেল সে কেন এসেছে। শুধু তাকিয়ে রইল নীরবে অপলক ভাবে। অপরূপা সেই দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে চোখ নামিয়ে ফেলল। তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কাঁপছে। কোনো অজানা ঘটনার পূর্বাভাস অনুভব করছে সে। অবশেষে দীর্ঘ কয়েক মুহূর্ত পর আভিয়ান ধীরে ধীরে শ্বাস নিল। তারপর মৃদু কণ্ঠে বলল,
“রঙটা আপনার স্পর্শ পেয়ে অধিক স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে।"
সংকোচহীন ভাবেই কথাটা বলে বসল আভিয়ান। অজান্তেই অপরূপার আঙুলগুলো শাড়ির আঁচল শক্ত করে চেপে ধরল। মাথা আরও নিচু হয়ে এলো। নিদ্রা বুঝে গেল, তার আর এখানে থাকার প্রয়োজন নেই। পিহু তার ঘরেই কার্টুন দেখছে। তাই নিদ্রারও যাওয়া উচিত। সে দুষ্টু ভঙ্গিতে বলল,
“আমি থাকলে কাবাবে হাড্ডি হয়ে যাব।”
একবার আভিয়ানের দিকে তাকাল সে। তারপর অপরূপার দিকে। চোখ টিপে বলল,
“আপনারা কথা বলুন, আমি যাই।”
কথাটা বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল নিদ্রা। যাওয়ার আগে দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে গেল। ঘরে নেমে এলো গভীর নীরবতা। এক পাশে দাঁড়িয়ে আভিয়ান। অন্য পাশে অপরূপা। আর তাদের মাঝখানে জমে থাকা অসংখ্য অপ্রকাশিত অনুভূতি, অনুচ্চারিত প্রশ্ন, অর্ধসমাপ্ত সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস এবং এক অদ্ভুত নিয়তির অদৃশ্য উপস্থিতি। ঘরজুড়ে কাজ করছে চাপা নিস্তব্ধতা। জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়া বিকেলের সোনালি আলো মেঝের উপর দীর্ঘ রেখা এঁকে দিয়েছে। সেই আলোয় দাঁড়িয়ে আছে আভিয়ান, অস্বাভাবিকভাবে স্থির, অস্বাভাবিকভাবে শান্ত সে।
আর তার কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে অপরূপা। মেয়েটার বুকের ভেতরটা অকারণেই দ্রুত উঠানামা করছে। কোনো এক অনিবার্য ঘটনার পূর্বাভাস যেন বাতাসে মিশে আছে।
একটা অজানা অস্বস্তি শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ছে তার। অবশেষে সে নীরবতা ভাঙল। ধীর, সংযত কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“এবার বলবেন? আমাকে এভাবে সাজতে বলা হয়েছে কেন?”
আভিয়ান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। কয়েক মুহূর্ত অপলক তাকিয়ে রইল তার দিকে। সেই দৃষ্টিতে ছিল না কোনো অস্থিরতা, না কোনো দ্বিধা। বরং প্রশান্ত দৃঢ়তা, যা সাধারণত দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষে জন্ম নেয়। অবশেষে সে এক পা এগিয়ে এল। তারপর আরেক পা। দুজনের মাঝখানে থাকা দূরত্বটুকু অল্প অল্প করে কমে এলো।সে গভীর, স্থির কণ্ঠে বলল,
“কারণ আজ আমাদের বিয়ে।”
মুহূর্তেই থমকে গেল সময়। অপরূপার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল আভিয়ানের চোখে। চোখের মণি বিস্ফারিত। ঠোঁটও সামান্য ফাঁক হয়ে গেছে। মুখের সমস্ত রক্ত যেন এক নিমিষে সরে গেছে। কয়েক সেকেন্ড সে শব্দের অর্থই বুঝতে পারল না। মস্তিষ্ক শুনেছে ঠিকই, কিন্তু গ্রহণ করতে পারেনি। তারপর আচমকাই ভাঙা স্বরে বলে উঠল,
“কী? বিয়ে মানে? কীসের বিয়ে? আপনি কীসব আবোলতাবোল বলছেন?”
আভিয়ানের মুখাবয়বে সামান্যতম পরিবর্তনও এলো না।
এই প্রতিক্রিয়ার জন্য সে আগেই প্রস্তুত ছিল। সে ধীরে ধীরে পাশে রাখা সোফার দিকে এগিয়ে গেল। বসে পড়ল গা এলিয়ে। মাথা তুলে তাকাল তার স্নো হোয়াইটের মুখশ্রীর পানে।
“বসুন।”
“আমি বসব না।”
“ঠিক আছে।”
মৃদু মাথা নাড়ল আভিয়ান। অত্যন্ত শান্ত সে। বলল,
"দাঁড়িয়েই শুনুন।”
অপরূপা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার আঙুলগুলো অজান্তেই শাড়ির আঁচল মুঠো করে ধরেছে। আভিয়ান দীর্ঘ এক শ্বাস নিয়ে বলে উঠল,
"আপনি আমাকে পছন্দ করেন কি না, সেটা আজকের আলোচনার বিষয় নয়। আমাকে বিশ্বাস করেন কি না, সেটাও নয়। আমি আজ কেবল বাস্তবতার কথা বলব। যে বাস্তবতার দোহাই আপনি দিয়ে এসেছেন আমাকে, সেই বাস্তবতা।”
ঘরের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল। অপরূপা আজ মনোযোগী শ্রোতা। মস্তিষ্ক নানারকম ভাবনায় মত্ত থাকলেও সে নিশ্চুপ হয়ে শুনছে। আভিয়ান কিছুক্ষণ চুপ রইল। চোখ রাখল নমণীর চোখে। বলল,
“আপনার বাবা নেই। এতদিন আপনার মা ছিলেন।আপনার ভাই ছিলেন। আপনার মাথার উপর একটি নিরাপদ ছায়া ছিল। আজ তারা কেউ নেই।”
অস্থির হয়ে উঠল রমণী। স্মৃতি গুলো ভেসে বেরাতেই অপরূপা দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল। চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল অশ্রু। আভিয়ান তাকিয়ে রইল। শান্তভাবে বলল,
“আপনার মেয়ের ভবিষ্যত, সুরক্ষা, ভরসা যাই বলুন না কেন তার জন্য আগে আপনার মাথার উপর কারো ছায়া প্রয়োজন। সে আমি হই বা যে কেউ। জানেন তো আপনার মা ভাইয়ের মৃত্যুর পেছনে প্রত্যোক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কে আছে? পরবর্তী আপনার উপর বা লিটেল কিটেনের উপর যে কোনো বিপদ আসবে না এই ভরসা আছে? আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন আমি কী বলতে চাইছি।”
অপরূপা স্থবির। হ্যাঁ, সে বুঝছে। অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই বুঝছে। এই সমাজের নির্মম বাস্তবতা তার অজানা নয়।
একজন একাকী নারীকে ঘিরে কত প্রশ্ন, কত দৃষ্টি, কত অনিরাপত্তা জন্ম নেয় সে খুব ভালো করেই জানে। তবুও মনের ভেতরের একাংশ এখনও প্রতিবাদ করছে। চোখ সরিয়ে উচ্চারণ করল,
“আমি পারব। আমি একাই থাকতে পারব।”
আভিয়ান ধীরে মাথা নাড়ল। শীতল স্বরে আওড়াল,
“নিজের জন্য পারবেন। কিন্তু পিহুর জন্য? ওর ভবিষ্যতের জন্য? ওর নিরাপত্তার জন্য? আপনি কি নিশ্চিত সৈকত আর কখনো ফিরে আসবে না?”
শরীর দৃশ্যত কেঁপে উঠল অপরূপার। স্মৃতির এক শীতল ছায়া নেমে এলো মুহূর্তেই। আভিয়ান উঠে দাঁড়াল। মুখোমুখি হলো রমণীর। দূরত্ব রইল কিছু ইঞ্চি। নিগূঢ় চাহনিতে রমণীর গোটা অস্তিত্বকেই পড়ে ফেলতে সক্ষম সে। তাই তো আওড়াল ফের,
“আমি আছি, আজও আছি, আগামীকালও থাকব। তবে কিছুক্ষেত্রে থেকে যেতেও অধিকারের প্রয়োজন পড়ে, প্রয়োজন পড়ে একটি নামের। ধরে নিতে পারেন আমি আজ সুযোগের সৎ ব্যবহার করছি, তবুও বাস্তবতা এটাই যে আপনার প্রয়োজন না হলেও পিহুর প্রয়োজন আছে আমাকে। আর আমার প্রয়োজস আপনাকে।"
নীরবতা। অত্যন্ত দীর্ঘ, ভারী নীরবতা। অপরূপা চোখ তুলে তাকাল। শুনে গেল সবটা। কী অদ্ভুত তার দৃষ্টিজোড়া
আভিয়ানের দৃষ্টিও স্থির। এক চুল নড়াচড়া নেই। সে আবার বলল,
“আপনি এখন শোকের মধ্যে আছেন। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থাতেও হয়তো নেই। তবু আমি আপনাকে আবেগ দিয়ে প্রভাবিত করতে আসিনি।”
সামান্য ঝুঁকে এল আভিয়ান। চোখে চোখ রেখে বলে উঠল,
“আমি আপনাকে ভালোবাসি না, একদমই না।"
থামল আভিয়ান। হৃৎস্পন্দনের গতি বাড়ল কয়েক গুন। আওড়াল,
"আপনি আমার ভালোবাসার চাইতেও বেশি কিছু, আপনি আমার ঝরা শিউলির দিনে এক স্নিগ্ধতম শুরু। সূচনাটা অন্য কারো হলেও সমাপ্তিটা আমার চাই, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চাই আপনার এই দুটো হাত। চাই একটুখানি সুখ, একটু খানি আশ্রয় আর পুরোপুরি আপনাকে।"
কেঁপে উঠল রমণী। অনুভূতির দোলাচলে হারিয়ে ফেলল হৃদয়ের গতি। কম্পিত হলো গোটা কায়া। আভিয়ানের দৃষ্টি জোড়া মাদকতায় পরিপূর্ণ। শুকনো ঢোকে গলা ভিজিয়ে উচ্চারণ করল,
"আজ আমি প্রেমিক হিসেবে আপনার সামনে না দাঁড়ালেও আমি একজন ভয়ংকর প্রেমিক পুরুষ, অপ্সরা। আজ আমি দায়িত্বশীল একজন মানুষ হিসেবে কথা বলছি আপনার সাথে ঠিকই, তবে সব কিছুর উর্ধ্বে আমার কেবল আপনাকেই চাই।"
ঘরজুড়ে ঘনীভূত হলো নিস্তব্ধতার অতল আধার। অপরূপা ঘোরে পড়ে গিয়েছে নাকি কোনো এলোমেলো ঝরে মস্তিষ্ক হারিয়ে ফেলছে তার সকল বাক্য সে বুঝে উঠতে পারছে না। সে আওড়াল,
"ক কেন? কেন চান আমাকে?"
"আমার বাগানের একটি মাত্র ফুল আপনি, না চেয়ে থাকব কেমনে? বাঁচা যায়?"
"ক কিন্তু আমি তো চাই না আপনাকে।"
হাসলো আভিয়ান। অদ্ভুত ক্ষীণ সেই হাসির রেখা। আত্মবিশ্বাসী তার কণ্ঠস্বর,
"একদিন চাইবেন, না চাইলেও ক্ষতি নেই। আমি তবুও থেকে যাব শেষ অব্দি। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত, আপনার গল্পের সমাপ্তি পর্যন্ত।"
অপরূপা নির্বিকার। কী নিখুঁত ভাবেই না নিজের প্রতিটি বাক্য উপস্থাপন করে যাচ্ছে এই লোকটা। না আছে দ্বিধা, না আছে সংকোচ। অথচ সকল দ্বিধা সংকোচ যেন তাকেই গলা চেপে ধরছে। রুদ্ধ হয়ে আসা কণ্ঠনালী ভেদ করে বেরিয়ে এলো,
"এভাবে হয় না, আমি আর কাউকে আমার জীবনে জড়াদে চাই না। আর হয়তো পারবোও না।"
তেমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখাল না আভিয়ান। না সে অবাক হলো। বরং অত্যন্ত শান্ত স্বরেই উচ্চারণ করল,
“এই বিয়ের পরও যদি আপনি আমাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে না পারেন তবে আমিও আপনার উপর কোনো অধিকার খাটাব না।”
অপরূপা ধীরে তাকাল। তার চোখে বিস্ময়।
“মানে?”
“মানে, যতদিন পর্যন্ত আপনি নিজে থেকে আমাকে গ্রহণ না করবেন, ততদিন পর্যন্ত আমি আপনার নির্ধারিত সীমারেখার বাইরে যাব না। আমি অপেক্ষা করতে পারি, সেটুকু ধৈর্য্য আছে আমার।"
ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল আভিয়ানের। ক্ষীণ সুরে আওড়াল,
“অপেক্ষা করতে আমি অভ্যস্ত। আমার কেবল প্রয়োজন আপনার সম্মতি। আপনার স্বাধীন সিদ্ধান্ত। জোর করে অর্জিত কোনো সম্পর্ক আমার কাছে সম্পর্ক নয়।”
অপরূপার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। লোকটা আজ তাকে আবেগ দিয়ে নয় যুক্তি দিয়ে বোঝাচ্ছে।প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয় নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে বোঝাচ্ছে। ভালোবাসার কথা বলেও ভালোবাসার দাবি করছে না। আভিয়ান আবার বলল,
“আপনি চাইলে আজ না বলতে পারেন। আমি তবুও আপনার পাশে থাকব। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন। জীবনের সব সিদ্ধান্ত হৃদয় দিয়ে নেওয়া যায় না। কিছু সিদ্ধান্ত দায়িত্ববোধ দিয়ে নিতে হয়। পিহুর জন্য, আপনার ভবিষ্যতের জন্য। আপনার নিরাপত্তার জন্য।”
চোখ বুজে নিল অপরূপা। রাজ করল দীর্ঘ ভারী নীরবতা। বুকের ভেতর আঁকড়ে ধরল কিছু বিষাক্ত তিক্ত অনুভূতির ঢেউ। কী করবে না করবে এ নিয়ে নিজের মন ও মস্তিষ্কের চলল দ্বন্দ্ব। চলল হাজারটা কথোপকথন, আলোচনা। নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়া। অতঃপর দীর্ঘক্ষণ কাটল। কতক্ষণ কেটে গেল, কেউ জানে না। শুধু দেয়ালের ঘড়িটা নিজের ছন্দে সময় গুনে চলল।অবশেষে অপরূপা চোখ খুলল। দৃষ্টি ক্লান্ত, অবসন্ন। তবুও আশ্চর্যরকম স্থির। আভিয়ান শীতল চোখেই তাকিয়ে, অপেক্ষায় জবাবের। অপরূপা ঘুরে দাঁড়াল। বক্স থেকে উঠিয়ে নিল বালা জোড়া। পুরোনো নকশার।অপরূপা ভুল না হলে বালাদুটো পুরোনো। সে বালাদুটো এগিয়ে দিল আভিয়ানের নিকটে। শুধালো,
"বালা দুটো কার?"
আভিয়ান অপেক্ষায় ছিল জবাবের। তবে জবাবের বদলে অপরূপার এহেন প্রশ্নে সে বেশ অবাকই হলো। তবুও স্বচ্ছল ভঙ্গিতে জবাব দিল,
"ছিল দীদার, সেখান থেকে মায়ের। তারপর হওয়ার কথা আমার স্ত্রীর।"
অপরূপার দৃষ্টি বালা জোড়ার দিকে। আভিয়ানের চোখে চোখ রাখার সাহস সে হারিয়েছে। শরীরটা ভার হয়ে আসছে, কাঁপছে মৃদু। কিচ্ছুটি না বলে নিজের হাতে পরে নিল বালাদুটো। অনুচ্চারিত জবাব পেয়ে গেল আভিয়ান। এই একটি উত্তরের জন্যই সে এতক্ষণ নিঃশ্বাস আটকে রেখেছিল সে। অপরূপা নিজের কাজে মনোযোগ রেখেই বলল,
“চলুন।”
কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ হলো না। আভিয়ানের চোখ দুটো বুজে হয়ে এলো প্রশান্তিতে। বুকের উপর চাপা পড়ে থাকা কোনো বিশাল ভার অবশেষে নেমে গেছে। অবশেষে, অবশেষে তার স্নো হোয়াইট তার হবে চলেছে। আর মাত্র কয়েকটা ঘন্টা, তারপর এই অপরূপা হাওলাদার নামক নারীটি তার। সম্পূর্ণ তার। সে হাসল। খুব ক্ষীণ, খুব শান্ত সেই হাসি। সেই হাসিতে বিজয়ের গর্ব ছিল না, ছিল না উল্লাস, ছিল শুধু গভীর এক স্বস্তি।
একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার সমাপ্তির প্রশান্তি। সে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। অপরূপার সামনে এসে থামল।
তারপর অত্যন্ত নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আমি কি আপনার হাতটা ধরতে পারি?”
থমকে গেল অপরূপা। চমকে গিয়েই তাকাল আভিয়ানের চোখের দিকে। কোনো উত্তর দিল না রমণী, কেবল তাকিয়ে রইল দীর্ঘক্ষণ। আভিয়ানের চোখের গভীরে নিশ্চয়তা খুঁজছে সে। খুঁজে চলেছে কোনো আশ্রয়, কোনো প্রতিশ্রুতি। আভিয়ান তাড়া দিল না। আর কোনো কথাও বলল না। শুধু ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিল। কয়েক মুহূর্ত পর অপরূপার কাঁপা আঙুলগুলো এসে স্পর্শ করল তার হাত। উষ্ণ, ক্লান্ত, অবসন্ন সেই স্পর্শে আস্থা, আশ্বাস। আভিয়ান আলতো করে সেই হাত মুঠোবন্দী করল সযত্নে। সে যেন কোনো ভঙ্গুর অমূল্য বস্তু আগলে রাখছে। পরপর মৃদু হেসে আওড়াল,
“আপনাকে তিন কবুলে আমার করে নেওয়ার পর আমার প্রথম ইচ্ছেটা হবে আপনার হাতের পৃষ্ঠে ঠোঁট ছোঁয়ানো।"
কেঁপে উঠল অপরূপার নারী কায়া। বাক্য হারা রমণী কেবল দেখেই গেল এক উন্মাদ পুরুষকে। আভিয়ান চোখ ফিরিয়ে নিল। অতঃপর এগিয়ে গেল দরজার দিকে। অপরূপাও নিঃশব্দে পা বাড়াল একসাথে, পাশাপাশি। পা বাড়াল কোনো প্রতিশ্রুতির উচ্চারণ ছাড়াই। আজকের এই পথচলা নিছক প্রেমের পথচলা নয়। এটি দায়িত্বের, বিশ্বাসের। পারস্পরিক আশ্রয়ের। আর সময় যদি অনুমতি দেয়, তবে হয়তো এই পথ চলাটাই হবে একদিন গভীর, পরিণত ভালোবাসারও।
_______
কাজী অফিসের ছোট্ট কক্ষটিতে জমাট বেঁধে আছে আবহমান গাম্ভীর্য। বাইরে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে কোমল হয়ে আসছে। জানালার কাঁচ ভেদ করে প্রবেশ করছে সোনালি আভা। সেই আলো এসে পড়েছে মাঝখানে রাখা পুরোনো কাঠের টেবিলের উপর। টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, কাবিননামার খসড়া, কয়েকটি সিলমোহর আর কলম।
আজ এই সাধারণ মুহূর্তটাই কয়েকটি জীবনের গতিপথ বদলে দিতে চলেছে। টেবিলের ওপারে বসে আছেন কাজী সাহেব। তিনি আর কেউ নন, ফুয়াদের বাবা হাজী ফরিদ আহমেদ। বহু বছরের অভিজ্ঞতায় অগণিত বিয়ের সাক্ষী হয়েছেন তিনি। কত মানুষের নতুন জীবনের সূচনা দেখেছেন নিজের চোখে। তবুও আজ তাঁর দৃষ্টিতে এক ধরনের সূক্ষ্ম বিস্ময় খেলা করছে। ঘটনাপ্রবাহ এত দ্রুত বদলেছে যে তিনিও পুরো বিষয়টা এখনো সম্পূর্ণভাবে আত্মস্থ করতে পারেননি। টেবিলের একপাশে পাশাপাশি বসে আছে আভিয়ান ও অপরূপা।
অপরূপার মাথা নিচু। হালকা গোলাপি জামদানির আঁচল আঙুলে জড়িয়ে রেখেছে সে। আঙুলের ডগাগুলো বারবার কেঁপে উঠছে। মুখশ্রী শান্ত। সেই শান্তির আড়ালে কতটা অস্থিরতা, কতটা শোক, কতটা অনিশ্চয়তা লুকিয়ে আছে তা বোঝা যাচ্ছে তার নিঃশ্বাসের অনিয়মিত ওঠানামা দেখলেই। মনে হচ্ছে সে যেন এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না সে এখানে বসে আছে। একটি বিয়ের আসরে,নিজের বিয়ের আসরে।
অন্যদিকে আভিয়ান আশ্চর্যজনকভাবে স্থির। চোয়াল তার দৃঢ়। দৃষ্টি প্রশান্ত। তার চোখে আজ দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষে পাওয়া এক অদ্ভুত নিশ্চিন্ততা। বহুদিন ধরে বুকের গভীরে লালন করা কোনো সংকল্প অবশেষে বাস্তবতার মাটি ছুঁতে চলেছে। নিদ্রার কোলে বসে আছে পিহু।
ছোট্ট মেয়েটা দু'হাতে নিজের পুতুল আঁকড়ে ধরে চারদিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে। ঘরের কারও মুখেই হাসি নেই। কেউ খুব জোরে কথা বলছে না।
সবাই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার অপেক্ষায়। কিন্তু তার শিশুমন এসব জটিলতা বোঝে না। সে শুধু এটুকুই বুঝছে আজ সবাই একসাথে আছে। আর সেটাই তার কাছে যথেষ্ট। নিদ্রা কিছুক্ষণ আভিয়ানের দিকে তাকিয়ে থেকে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। তারপর বিরক্ত কণ্ঠে বলল,
“দাদুকে অন্তত জানাতে পারতিস।”
আভিয়ান অনায়াস ভঙ্গিতে চেয়ারের পিঠে হেলান দিল।
একটুও বিচলিত হলো না সে। জবাব দিল,
"দাদু জানে।”
“জানে মানে?”
“আমি বিয়ে করছি, এটা জানে।”
নিদ্রার চোখ গোল হয়ে গেল। বিস্ময় নিয়ে শুধালো,
“কাকে বিয়ে করছিস, সেটাও জানে?”
আভিয়ান ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে বলল,
“বউ নিয়ে বাড়িতে উঠলেই জেনে যাবে।”
নিদ্রা অসন্তুষ্ট। পরে যদি এসব নিয়ে ঝামেলা হয় তখন? এর চেয়ে সবটা জানিয়ে নিলেই তো ভালো হত। নিদ্রা ডাকল আভিয়ানকে,
“আভিয়ান!”
“কী?”
“দাদুকে অন্তত নিয়ে আসতে পারতি। তোর বিয়ে, তোর আপন বলে তো শুধু দাদুই আছে।"
দীর্ঘশ্বাস ফেলল আভিয়ান। আগের ন্যায় স্থির রইল। জবাব দিল,
"আসতে বলেছিলাম। সে আসেনি, আমার কী দোষ?"
"কেন আসেনি? রাগ করেছে?"
"উঁহু, অপেক্ষা করছে। প্রস্তুতি নিচ্ছে বাড়ির বউকে বরণ করে ঘরে তোলার।"
নিদ্রা হতভম্ব। সব তো স্বাভাবিকিই। তবে অপরূপাকে দেখার পরও কি সব স্বাভাবিক থাকবে? এ নিয়ে বেশ দ্বিধায় আছে রমণী।
"বউ আমার, সংসার করব আমি। কারো মানা না মানাই বিন্দুমাত্র আগ্রহ বা গুরুত্ব আমার কাছে নেই।"
আভিয়ান কাঁধ ঝাঁকাল। পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক কথাই বলেছে। তার নির্লিপ্ত ভাব দেখে নিদ্রা বিরক্ত হলেও শেষ পর্যন্ত আর কিছু বলল না। এতক্ষণ নীরব থাকা অপরূপা ধীরে ধীরে মুখ তুলল। চোখদুটোতে স্পষ্ট দ্বিধা। সঙ্গে অদৃশ্য এক সংশয়। তার কণ্ঠস্বরও আগের তুলনায় অনেক নিচু হয়ে এলো,
“আপনি এখনো চাইলে ভেবে দেখতে পারেন।”
আভিয়ান দৃষ্টি ফেরাল তার দিকে। স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই প্রশ্ন করল,
"ভাবছি, সারাদিনই ভাবি। আমার ভাবনা জুড়ে কেবল আপনি।"
অপরূপা চোখ নামিয়ে নিল। তারপর অত্যন্ত ধীর স্বরে বলল,
“পরে আফসোস করবেন না যেন। আপনার পরিবারকে না জানিয়ে এত বড় সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। পরে ঝামেলাটা কার হবে?”
কথাগুলো শেষ হতে না হতেই আভিয়ান অধরে দেখা মিলল মৃদু হাসির রেখা। সেই পরিচিত শান্ত হাসি। যে হাসিতে কেবল শুধু প্রশান্তি। সে উচ্চারণ করল,
“আফসোস?”
সে সামান্য ঝুঁকে এলো। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল অপরূপার মুখে।
“আফসোস তখন হতো, যখন আপনাকে আমি না পেতাম।”
অপরূপার বুকের ভেতরটা অকারণেই কেঁপে উঠল। সে কিছু বলল না। শুধু দৃষ্টি নামিয়ে নিল পুরোপুরি। আভিয়ান আবার বলল,
"আর বাকি রইল ঝামেলা? সেটা না হয় আমার উপর ছেড়ে দিন, আমার অপ্সরা।”
নিদ্রা মুখ টিপে হাসল। তার মনে হলো এই মানুষটাকে কখনো কখনো সত্যিই অসহনীয় লাগে। কিন্তু ঠিক সেই কারণেই হয়তো ভরসাও করা যায়। এমন সময় ধড়াম করে খুলে গেল দরজা। পরের মুহূর্তেই হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল জাওভান আর ফুয়াদ। দুজনের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে যেন এদেরই আজ বিয়ে।
ফরমাল পোশাক। পরিপাটি চুল। শরীর থেকে ভেসে আসছে সুগন্ধির হালকা সুবাস। দুজনেই এমনভাবে তৈরি হয়ে এসেছে যেন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে যাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে নিদ্রা কপালে হাত ঠেকাল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“বিয়েটা আভিয়ানের, না তোদের?”
জাওভান অত্যন্ত গম্ভীর মুখে তার দিকে তাকাল। মুহূর্তখানেক নীরব থেকে বলল,
“তুই চাইলে আমারটাও হয়ে যেত।”
এক নিমিষে পুরো ঘর নিস্তব্ধ। ফুয়াদ চোখ বন্ধ করল।
ফরিদ সাহেব কাশলেন। অপরূপা নিজেও হতভম্ব।
আভিয়ান আগের ন্যায় অনুভূতি শূন্য বেসে বসা। আর নিদ্রা? সে জাওভানের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন এখনই খুন করবে। পরক্ষণেই ফুয়াদের শক্ত কিল গিয়ে পড়ল জাওভানের পিঠে।
“চুপ কর।”
“আহ!”
“আজকে অন্তত মুখ সামলে কথা বল।”
“আমি তো কিছুই বলিনি!”
“আর একটা বলবি?”
“না ভাই।”
নিদ্রা বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। জাওভান কাশতে কাশতে পাশে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের সম্মান বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করছে সে। ঘরের পরিবেশটাও খানিকটা হালকা হয়ে এলো। ঠিক তখনই পিহু চারদিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল,
“আমরা একানে কেন?”
তার শিশুসুলভ উচ্চারণ শুনে নিদ্রা হেসে ফেলল। জবাব দিল,
“এখানে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে।”
পিহু বিস্মিত চোখে তাকাল।
“কী কাজ?”
“তোমার মাম্মা আর পাপার বিয়ে।”
পিহুর ভ্রু কুঁচকে গেল। সে কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বলল,
“আমাল তো পাপা নেই।”
নিদ্রা একবার আভিয়ানের দিকে তাকাল। তারপর পিহুর ছোট্ট নাকটা আলতো টিপে দিয়ে বলল,
“আছে তো।”
“কই?”
“ওই যে তোমার ইয়ান।”
পিহুর চোখ গোল হয়ে গেল। চোখে তার স্পষ্ট বিস্ময়। তক খেয়াল করল না আভিয়ান বা অপরূপা। তারা চুপটি করে বসে আছে। পিহু ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে সে আভিয়ানের দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল,
“ইয়ান?”
“হ্যাঁ।”
“ইয়ান আমার পাপা? কিন্তু ইয়ান তো আমার ফ্রেন্ড।”
নিদ্রা চুমু খেল পিহুর গালে। জবাব দিল,
"আজ থেকে পাপাও।”
পিহু কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে রইল। তার ছোট্ট মাথার ভেতর বিশাল এক গণিত চলছে। সবকিছু মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে সে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিশুমন তার নিজস্ব সিদ্ধান্তে পৌঁছাল। বিষয়টা পরে ভাবা যাবে। এখন পুতুল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে আবার নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের পুতুল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। ফরিদ সাহেবের কাজ কর্ম শেষের পথে। এ পর্যায়ে তিনি গলা পরিষ্কার করে উচ্চারণ করলেন,
" আর সময় নষ্ট করে কী লাভ? বিয়ের কাজ শুরু করা যাক?"
আভিয়ান সরাসরি তাকাল ফরিদ সাহেবের দিকে। মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। অপরূপার হাতদুটো নিবিড়ভাবে কোলের উপর রাখা। আঙুলগুলো বারবার একে অপরকে আঁকড়ে ধরছে, আবার ছেড়ে দিচ্ছে। তার অস্থিরতার ক্ষুদ্রতম প্রকাশ সেই কম্পমান আঙুলের ডগাগুলোতেই জমা হয়েছে। বাহ্যিকভাবে সে শান্ত, সংযত, স্থির। অথচ বুকের ভেতরে হৃদস্পন্দন যেন অনিয়মিত ছন্দে ধাক্কা মেরে চলেছে পাঁজরের দেয়ালে।
মনে হচ্ছে প্রতিটি নিঃশ্বাস তাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এই মুহূর্তের পর আর কিছুই আগের মতো থাকবে না।অন্যদিকে আভিয়ান আশ্চর্যজনকভাবে স্থির। তার মুখাবয়বে কোনো উদ্বেগ নেই। কোনো তাড়াহুড়ো নেই।কোনো দ্বিধাও নেই। তাদের পাশেই সাক্ষী হিসেবে বসেছে ফুয়াদ ও জাওভান।
দুজনেই আজ অস্বাভাবিকভাবে নীরব। মাঝে মাঝে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে বটে, কিন্তু কারও মুখে স্বাভাবিক খুনসুটি নেই। ঘরের ভেতর নেমে এসেছে গাম্ভীর্য। সবকিছু প্রস্তুত দেখে ফরিদ সাহেব ধীরে গলা পরিষ্কার করলেন। তারপর “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” পাঠ করে সুশৃঙ্খল, মৃদু অথচ আনুষ্ঠানিক কণ্ঠে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ। মহান আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমতে আমরা আজ এখানে উপস্থিত হয়েছি ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক একটি বৈধ ও পবিত্র বিবাহ সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে।”
কথাগুলো উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কক্ষের পরিবেশ যেন আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি সামনে রাখা কাবিননামা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র একবার মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর মুখ তুলে অপরূপার দিকে তাকালেন।
“আপনার নাম অপরূপা হাওলাদার?”
“জি।”
“আপনার পিতার নাম মরহুম আহাদ হাওলাদার?”
প্রশ্নটা শুনতেই মুহূর্তের জন্য অপরূপা জমে গেল। শুরু হলো ধুকপুকানি। মাথা নত করে নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দিল,
“জি।”
ফরিদ সাহেব মাথা নেড়ে নথিতে চোখ বুলালেন। এরপর দৃষ্টি স্থির করলেন আভিয়ানের উপর।
“আপনার নাম আভিয়ান এহসান?”
“জি।”
“আপনার পিতার নাম মরহুম আব্রাহাম এহসান।"
আভিয়ান মাথা দুলাল মৃদু। জবাব দিল
"জি।"
সবকিছু যাচাই-বাছাই শেষ করে ফরিদ সাহেব কিছুক্ষণ দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,
“আপনারা উভয়েই প্রাপ্তবয়স্ক এবং স্বেচ্ছায় এই বিবাহে অংশগ্রহণ করছেন তো?”
প্রথমে উত্তর দিল আভিয়ান। কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই তার। অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবেই বলল,
“জি।”
এরপর সকলের দৃষ্টি গিয়ে থামল অপরূপার উপর।মুহূর্তেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অপরূপা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। চোখের সামনে ভেসে উঠল বহু পরিচিত মুখ।
আহাদ হাওলাদার। আমেনা বেগম। আর তার ভাই পলাশ। একটির পর একটি মুখ। একটির পর একটি স্মৃতি। সে শক্ত একটা ঢোক গিলল। গিলে নিল সকল সঃকোচ। অত্যন্ত ধীরে মাথা তুলল সে। অতঃপর জবাব দিল,
“জি।”
ফরিদ সাহেব সন্তুষ্টির ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ। দেনমোহর কত বাঁধব?"
"মৃত্যু।"
চমকে উঠল উপস্থিত সকলে। দৃষ্টি গিয়ে পড়ল আভিয়ানের উপর। অথচ আভিয়ান অত্যন্ত শান্ত। অপরূপা প্রায় হতভম্ব। এ ছেলে পাগল নাকি? আভিয়ানের দৃষ্টির নড়চড় হলো না। সে ফরিদ সাহেবের দিকে তাকিয়েই বলল,
"যদি সম্ভব হতো তবে আমি আমার গোটা অস্তিত্ব তাকে লিখে দিতাম। কিন্তু মুক্তি না। মৃত্যু ব্যতিত এ সম্পর্ক থেকে কোনো মুক্তি নেই।"
ফরিদ সাহেব আড়ালে হাসলেন বটে তবে কণ্ঠস্বর রইল মোলায়েম,
"দেনমোহর তো কেবল বিচ্ছেদের জন্য নয়, এটা স্ত্রীর হক। স্ত্রীর হক মিটিয়ে তবেই নিজের অধিকার পাবে।"
আভিয়ান আগের মতোই রইল। তাকাল অপরূপার দিকে। অপরূপা আগো থেকেই তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকিয়ে ছিল। তাই মুহূর্তেই দুজনের চোখে চোখ পড়ল। আভিয়ান স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
"আপনি বলুন।"
থতমত খেয়ে গেল রমণী। কী বলবে সে?
"আমি? আমি কী বলব?"
"দেনমোহর কত চান?"
চোখ নামিয়ে নিল অপরূপা। কেমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। নিদ্রা বেজায় বিরক্ত আভিয়ানের উপর। এ ছেলের মাথায় যে সমস্যা তার জানা আছে। তাঢ পরিস্থিতি সামলাতে নিজেই বলল,
"আঙ্কেল দশ পনেরো লিখে দিন।"
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ফরিদ সাহেব। ক্ষীণ হেসে লিখলেন দশ লাখ। নির্ধারিত মোহরানার পরিমাণ ঘোষণা করলেন এবং উভয় পক্ষের সম্মতি নিশ্চিত করলেন। সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি মূল পর্বে প্রবেশ করলেন। মুহূর্তটা আর কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়।
এটি দুটি জীবনের ভাগ্যরেখা একসূত্রে বাঁধার মুহূর্ত। ফরিদ সাহেব প্রথমে অপরূপার দিকে তাকালেন।।
“মরহুম আহাদ হাওলাদারের একমাত্র কন্যা অপরূপা হাওলাদার, আপনি কি স্বেচ্ছায় এবং সম্পূর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কে মরহুম আব্রাহাম এহসানের একমাত্র পূত্র আভিয়ান এহসানকে নির্ধারিত মোহরানার বিনিময়ে আপনার স্বামী হিসেবে কবুল করছেন?"
অপরূপার হৃদপিণ্ড যেন হঠাৎ করেই বুকে ধাক্কা দিল।তার হাত কেঁপে উঠল মুহূর্তেই। ঠোঁট শুকিয়ে এলো। একটি মাত্র শব্দ, একটি মাত্র শব্দ উচ্চারণ করার সাথে সাথে পাল্টে যাবে তার জীবন। তার পরিচয়, তার পরিস্থিতি, তার ঠিকানা। চোখের পাতাও কাঁপছে তির তির করে। সে তাকাল নিজের মেয়ের পানে। পিহু হাসি মুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। অবুঝ মেয়েটার প্রাণোচ্ছল হাসির কাছে সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব উড়িয়ে দিল একজন মা। নিজেকে লিখে দিল আভিয়ান এহসানের নামে। একটি পবিত্র বাক্য উচ্চরিত হলো তার কণ্ঠসারী ভেদ কর,
“জি আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।”
“আপনি কি আভিয়ান এহসানকে আপনার স্বামী হিসেবে কবুল করছেন?”
“জি, কবুল।"
"আরেকবার বলুন, আপনি কবুল করছেন?"
"জি, কবুল।"
পরপর তিনবার উচ্চরিত হলো এই পবিত্র বাক্যখানা। প্রাণ জুড়াল পাশে বসে থাকা মানবের। তার বুকের ভেতর যে সুখের তান্ডব চলছে তা অপ্রকাশ্য। ফরিদ সাহেব মুখ ফেরালেন আভিয়ানের দিকে।
“মরহুম আব্রাহাম এহসানের একমাত্র পূত্র আভিয়ান এহসান, আপনি কি আহাদ হাওলাদারের একমাত্র কন্যা অপরূপা হাওলাদারকে নির্ধারিত মোহরানার বিনিময়ে আপনার স্ত্রী হিসেবে কবুল করছেন?”
এক মুহূর্তও সময় নিল না আভিয়ান। তার দৃষ্টি তখনও অপরূপার উপর স্থির। অপেক্ষার প্রহর শেষ করে দৃঢ় স্বরে উচ্চারণ করল,
"কবুল, কেবল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নয়, পরজনম পর্যন্ত কবুল। আমার স্ত্রী হিসেবে লক্ষ-কোটি বার তাকে কবুল।"
চোখ বুজে থাকা অপরূপার মাঝে ঠিক কীরূপ ঝড় চলছে তা বোঝানো দায়। অনুভূতি গুলো কেমন এলোমেলো কর দিচ্ছে তাকে। জাওভান অদৃশ্য হাসি চেপে মাথা নিচু করল। ফুয়াদের মুখেও তৃপ্তির মৃদু রেখা ফুটে উঠল। নিদ্রা দীর্ঘদিনের অজানা এক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার মতো করে শ্বাস ছাড়ল। পিহু এখনো কিছুই বুঝতে পারছে না। সে কেবল অবাক হয়ে সবাইকে দেখছে। ফুয়াদ সাহেব কাবিননামা এগিয়ে দিলেন।
“এখন স্বাক্ষর করতে হবে।”
চোখ খুলল অপরূপা। প্রথমে কলম হাতে নিল সে নিজেই। কলম ধরতেই আঙুল কেঁপে উঠল রমণীর। নিজের নামটি লিখতে গিয়ে হঠাৎ উপলব্ধি হলো এই স্বাক্ষরটি কেবল একটি কাগজে লেখা নাম নয়। এটি তার জীবনের একটি সম্পূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা। স্বাক্ষর শেষ করে ধীরে কলম নামিয়ে রাখল সে। পরপর আভিয়ান কলম হাতে নিল। দৃঢ়, নিশ্চিন্ত, অবিচল হাতে নিজের নাম লিখে দিল। নিজেকেই লিখে দিল তার স্নো হোয়াইটের নামে। একবারও থামল না , একবারও ভাবল না। সে যে বহুদিন আগে থেকেই এই সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তুত ছিল। সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করল ফুয়াদ ও জাওভান। সবশেষে কাজী সাহেব নিজের স্বাক্ষর ও সিলমোহর সম্পন্ন করলেন। নথিগুলো গুছিয়ে রেখে সন্তুষ্ট কণ্ঠে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ। ইসলামী শরিয়ত এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আপনাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে।”
কথাটা উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কক্ষের পরিবেশে এক অদৃশ্য পরিবর্তন এলো। নিদ্রা সবার আগে বলে উঠল,
“মাশাআল্লাহ!”
জাওভান হাসিমুখে বলল,
“অবশেষে হাতি কাদায় পড়ল।"
সঙ্গে সঙ্গে ফুয়াদের কনুই এসে পড়ল তার পাঁজরে।
“চুপ কর, কীসব বলিস?”
“আহ! সত্য কথাও বলা যাবে না?”
"চুপ।"
কেউ আর উত্তর দিল না। ফরিদ সাহেব হাত তুলে দোয়া করলেন। সবাই হাত তুলল। অপরূপা, আভিয়ানও।
তাদের দাম্পত্য জীবনে শান্তি, বরকত, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, কল্যাণ এবং স্থায়ী সৌভাগ্য কামনা করলেন তিনি। দোয়া শেষে সবাই মুখে হাত বুলিয়ে নিল। কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলল না। প্রত্যেকে নতুন বাস্তবতাটিকে অন্তরে ধারণ করার জন্য একটু সময় নিচ্ছে। নীরবতার সেই ক্ষণস্থায়ী আবরণ ভেঙে ধীরে ধীরে আভিয়ান হাত বাড়াল। অপরূপার হাত তখনও কোলের উপর রাখা। সে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাল। আভিয়ানের দৃষ্টি আগে থেকেই তার দিকে। অধর জুড়ে প্রাপ্তিময় হাসি। বিজয়ের উল্লাস ছড়িয়ে আছে মুখশ্রী জুড়ে। পরমুহূর্তেই আভিয়ান অপরূপার হাত আলতো করে নিজের হাতে তুলে নিল। সেই স্পর্শে অপরূপার শরীর কেঁপে উঠল। আভিয়ান অত্যন্ত সতর্কভাবে, অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে তার হাতের পিঠে ঠোঁট স্পর্শ করল। ঘরে উপস্থিত সবাই কয়েক সেকেন্ড নীরব হয়ে রইল। অপরূপার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। আভিয়ান ধীরে মুখ তুলল। চোখে চোখ রাখল সে। তার চোখদুটো আজ অদ্ভুত প্রশান্ত, অদ্ভুত দীপ্ত। গভীর, সংযত কণ্ঠে বলল,
“অবশেষে আমার জীবনে আসার জন্য ধন্যবাদ, আমার অপ্সরা। আমাকে কবুল করার জন্য ধন্যবাদ, আমার হওয়ার জন্য ধন্যবাদ। সবশেষে মিস অপরূপা থেকে মিসেস আভিয়ান হয়ে ওঠার জন্য ধন্যবাদ, আমার স্নো হোয়াইট। এই পথচলা দীর্ঘ হোক, সকল যাতনা ভুলে আপনি পুরোপুরি আমার হোন। কেবল আমার, এই আভিয়ান এহসানের।"
বিস্মিত রমণী বাক্যহারা। অদ্ভুত ভাবে চেয়ে রইল সে আভিয়ানের দিকেই। আভিয়ান স্থান, কাল সব ভুলে বসেছে। সকলের দৃষ্টি স্থির তাদের উপরেই ছিল। এ পর্যায়ে নিদ্রা ইশারা করল সকলকে বেরিয়ে যেতে। যদিও বা ফরিদ সাহেব পরিস্থিতি বুঝে আগেই প্রস্থান করেছেন। এ পর্যায়ে নিদ্রার ইশারায় ফুয়াদ ও জাওভানও পিছু পিছু বেরিয়ে গেল। রেখে গেল দুটো মানুষকে। সদ্য বিবাহিত নব দম্পতিকে। একটু আকটু হোক অনুভূতির লেনদেন।আভিয়ানের নিজের জগতে। যে জগতটা শুধু তার এবং তার স্নো হোয়াইটের।
"আপনি আমার ঝরা শিউলির দিনে হঠাৎ আসা প্রেম। আপনি আমার অর্ধাঙ্গিনী, আমার প্রাণ, আমার গোটা জগত আপনি। আপনি কেবল এই আভিয়ান এহসানের ব্যক্তিগত অপ্সরা।"
অপরূপা চোখ সরিয়ে নিতে চেয়েও ব্যর্থ হলো। প্রাণপাখিটা বুঝি এবার বেরিয়েই আসবে। এই লোকটা তাকে বাঁচতে দেবে না, নির্ঘাত হৃৎপিণ্ডের গতি হারা হয়ে মৃত্যু হবে তার। আভিয়ান আরেকটু কাছে ঝুকে এলো। আবারো ঠোঁট ছোঁয়াল অপরূপার হাতের উপরিপৃষ্টে। ওভাবেই উচ্চারণ করল,
“আপনার গল্পের প্রতিটি অসমাপ্ত বাক্যের পাশে আমার অস্তিত্ব জুড়ে দেওয়ার দায়িত্ব আজ থেকে আমার।”
_________
#চলবে
নিন বিয়ে খান। আমি যাচ্ছি ছুটিতে।🤍