#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৪৩
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা
_______________________
রাত তখন আটটার প্রহর অতিক্রম করার দ্বারপ্রান্তে। বাইরে মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। বারান্দার কাঁচঘেরা জানালাগুলোর সামনে ঝুলে থাকা হালকা রঙের পর্দা বাতাসের স্পর্শে ধীর লয়ে দুলে উঠছে বারবার। বিশাল প্রাসাদোপম বাড়িটার ভেতরেও আজ অদ্ভুত এক প্রশান্ত নীরবতা। এরিনার কক্ষের প্রশস্ত বিছানার একপাশে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে অপরূপা। তার পরনে এখনো সেই হালকা গোলাপি জামদানিটি। দিনের আলো মুছে গেলেও শাড়িটার মৃদু আভিজাত্য কমেনি একটুও। মাথার খোঁপা কিছুটা আলগা হয়ে এসেছে, কানের পাশ দিয়ে কয়েকগুচ্ছ চুল নেমে এসেছে গাল ছুঁয়ে।
তার পাশেই মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে আছে পিহু। ছোট্ট মেয়েটার সমস্ত মনোযোগ এখন তার দুই পুতুলকে ঘিরে। কখনো তাদের চুল আঁচড়ে দিচ্ছে, কখনো আবার গম্ভীর মুখে তাদের নিয়ে সংসার সাজাচ্ছে। অপরূপার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে সামনের দেয়ালে। তবে সে দেয়াল দেখছে না।
সে ভাবছে। ভাবছে আজকের দিনটার কথা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনার কথা। আজ সারাদিনে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে তাকে এই বাড়ির মানুষগুলো। সে ভেবেছিল অসংখ্য প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। ভেবেছিল কৌতূহলী দৃষ্টি তাকে বিদ্ধ করবে। ভেবেছিল তার অতীত, তার সন্তান, তার হঠাৎ বিয়ে সবকিছু নিয়ে অন্তত কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হবে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কিছুই হয়নি। কিছুই না।
আভিয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে প্রথমবার দেখার পর সামান্য বিস্ময় কাটিয়ে উঠতেই সবাই এমনভাবে গ্রহণ করেছে, যেন সে বহুদিনের পরিচিত। যেন সে এই পরিবারেরই একজন। ইরফান এহসান নিজের হাতে তার মাথায় হাত রেখে দোয়া করেছেন। গভীর স্নেহমাখা কণ্ঠে আশীর্বাদ করেছেন। সাইদ, এরিনা দুজনেই বেশ হাসি খুশি। শুধুমাত্র নাবিলা এহসান খানিকটা গম্ভীর ছিলেন।
তবুও তিনি কোনো প্রশ্ন করেননি। না কোনো জিজ্ঞাসা, না কোনো অভিযোগ আর না কোনো অস্বীকৃতিও। এই সহজ গ্রহণযোগ্যতাই বরং অপরূপার কাছে সবচেয়ে বেশি অস্বাভাবিক লাগছে।
মেয়েটা ধীরে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক তখনই দরজাটা মৃদু শব্দে খুলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করল এরিনা। তার হাতে রুপালি ট্রে। ট্রের উপর পরিপাটি করে সাজানো কয়েকটি খাবারের প্লেট। মুখভর্তি সেই প্রাণবন্ত হাসি। ঘরে ঢুকেই উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“এই যে! এখনো খাওয়ানো হয়নি?”
অপরূপা চমকে মুখ তুলল।এরিনা ট্রেটা টেবিলের উপর রেখে পিহুর দিকে তাকাল। পিহুর গাল টেনে দিয়ে উচ্চারণ করল,
“আমাদের রাজকুমারীর তো নিশ্চয়ই খুব ক্ষুধা পেয়েছে?”
পিহু সঙ্গে সঙ্গে নিজের পুতুল দুটো উঁচিয়ে ধরল। গম্ভীর মুখে বলল,
“এরা আগে কাবে।”
এরিনা নাটকীয় ভঙ্গিতে চোখ বড় করল। তারপর পিহুর মতো করেই বলল,
“ও আচ্ছা! তাহলে আমি কি ততক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করব?”
পিহু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। জবাব দিল,
“হুম।”
এরিনা হেসে উঠল। পরপর সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। অপরূপার ঠোঁটের কোণেও ক্ষীণ এক হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। এরিনা তাকাল আভিয়ানের দিকে। হাসিটা একটু নরম হয়ে এলো তার। কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
“আচ্ছা, একটা কথা বলব?”
“জি?”
“না মানে সেদিনের জন্য সরি।”
অপরূপা ভ্রু কুঁচকাল। সে বিঝে উঠতে পারল না ঠিক কোন কারণে সরিটা বলল এরিনা। কৌতুহল নিয়ে শুধালো,
“কোন দিনের কথা বলছেন?”
এরিনা বিব্রতভাবে মাথার পেছনে হাত বুলিয়ে বলল,
“পার্টির দিনের কথা বলছিলাম, আসলে আমি খুবই অস্থির প্রকৃতির মানুষ। মাথায় যা আসে, মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়।”
অপরূপা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। সৌজন্যের সহিত জবাব দিল,
“ওটা কোনো বিষয় না।"
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
এরিনা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। অপরূপা খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল এরিনার দিকে। মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা চালাল বোধহয়। কিছুক্ষণ নীরব থেকে অপরূপা জিজ্ঞেস করল,
“আপনি মানে মিস্টার আভিয়ানের কী হন?”
অপরূপার কথাটা শুনে এরিনা এমনভাবে হেসে উঠল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মজার প্রশ্ন শুনেছে। কিছুটা রসিকতার স্বরেই বলে উঠল সে,
“এখনো মিস্টার আভিয়ান?”
অপরূপা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। এরিনা মাথা দুলিয়ে বলল,
“শুধু আভিয়ান বললেই তো হয়।”
অপরূপা চোখ নামিয়ে নিল। তা দেখে এরিনা আনমনেই হাসলো ক্ষীণ। কিছু না ভেবেই বলে বসল,
“অথবা অন্য কোনো নামও দিতে পারেন। যদিও আমার ধারণা, ওর সবচেয়ে পছন্দের নাম হবে 'অপ্সরার আভিয়ান’।”
মুহূর্তের মধ্যে অপরূপার গাল রাঙা হয়ে উঠল। এরিনা আরও জোরে হেসে ফেলল রমণীর লজ্জামাখা মুখখানা দেখে। চোখ মুখ তার অত্যন্ত উজ্জ্বল। দেখে মনে হচ্ছে এই বিয়েতে সবচেয়ে বেশি খুশি বোধহয় সে নিজেই। আদেও কি তাই? এরিনা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“আচ্ছা আচ্ছা, আর বলছি না। আর আমাকে আপনি করে বলারও দরকার নেই। তুমি বললেই হবে।”
“আচ্ছা।"
অপরূপার তৎক্ষনাৎ স্পষ্ট জবাব। এরিনার অধর থেকে হাসির রেখা সরছেই না। আজ বুঝি তার হাসার দিন? হবে হয়তো।
“এই তো ভালো। যাইহোক, যে প্রশ্ন করেছিলেন। আমি আভির কাজিন। ও আমার মামাতো....”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই কণ্ঠস্বর থেমে গেল এরিনার।
মুহূর্তের মধ্যে মুখের হাসিটা যেন ম্লান হয়ে এলো। চোখের গভীরে দেখা দিল অদ্ভুত এক ঝলক। বহু পুরোনো কোনো স্মৃতি আচমকা হৃদয়ের ভেতর এসে আঘাত করেছে তাকে। সে দৃষ্টি নামিয়ে নিল তৎক্ষনাৎ। খুব ধীরে শ্বাস ফেলল। অতঃপর জোর করে ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
“ভাই। মামাতো ভাই। ছোটবেলা থেকে আভি বলে ডাকি তো, তাই অভ্যাস হয়ে গেছে।”
এরিনা দ্রুত প্রসঙ্গ বদলে ফেলল। প্রশ্ন করল,
“আপনার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?”
অপরূপা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল নীরবে।মেয়েটার হাসিটা স্বাভাবিক নয়। চোখদুটোও অদ্ভুতভাবে ভিজে আছে। তবুও অপরূপা কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু নরম স্বরে বলল,
“না। কোনো সমস্যা হচ্ছে না।”
এরিনা মাথা নেড়ে হাসল। চুপ হয়ে গেল দুজনেই। অপরূপা দেখেই চলেছে এরিনাকে। কয়েকমুহূর্ত কাটল নীরবতায়। অতঃপর হঠাৎ করেই এরিনা চোখ রাখল অপরূপার চোখে। আনমনে বলে উঠল,
“আপনি খুব ভাগ্যবতী একজন নারী।”
হঠাৎ মেয়েটার মুখ থেকে এমন বাক্য শুনে অপরূপা স্পষ্টতই বিস্মিত। অবাক নয়নে তাকাল সে।
“মানে?”
এরিনা মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। শ্বাস নিতেও ভুলে গেল মেয়েটা। খানিক অপ্রস্তুতও হয়েছে বোধহয়। সে অপ্রস্তুত হাসলো। আওড়াল,
“কিছু না।”
“না, বলো।”
এরিনা মাথা নাড়ল। চোখের কোণে জমে ওঠা জল আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে বলল,
“আসলে... আরে ছাড়ুন না। আগে আপনারা খেয়ে নিন।”
“এরিনা...”
“আমি একটু আসছি।”
কথাগুলো বলেই প্রায় পালিয়ে যাওয়ার মতো দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে। একবারও পেছনে তাকাল না। দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। ঘর আবার নিস্তব্ধ হয়ে উঠল। অপরূপা দীর্ঘক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, এরিনার হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর বেদনা। একটা অপ্রকাশিত গল্প। একটা নীরব ক্ষত। কিন্তু আজ সেই গল্প শোনার সময় নয়। আজ কেউই প্রস্তুত নয় সেই গল্পের মুখোমুখি হওয়ার জন্য। সে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনল। পিহু তখনো নিজের পুতুলের রাজ্যে ব্যস্ত। অপরূপা নরম গলায় ডাকল,
“পিহু আসো, খাবে।”
পিহু মুখ তুলে তাকাল। পিহু খাওয়ার কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে ফেলল।
“ইয়ানও এত্তো এত্তো কেতে বলে।”
অপরূপা হাসল মেয়ের জবাবে। পিহুকে বিছানায় বসিয়ে ধৈর্য নিয়ে চামচে করে খাবার তুলে খাওয়াতে লাগল।
পিহুও আশ্চর্যজনকভাবে বাধ্য। মাঝেমধ্যে বড় বড় হাই তুলছে। চোখদুটো বারবার বুজে আসছে। খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই মাথাটা এসে ঠেকল অপরূপার কাঁধে।
“মাম্মা ”
অপরূপা হাত ধুতে ধুতে জবাব দিল,
“হুম?”
“আমার ঘুমু পাচ্চে।”
হাত ধুয়র অপরূপা আলতো করে পিহুর এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে দিল।
“চলো।”
সে পিহুকে এরিনার বিছানায় শুইয়ে দিল। পাতলা চাদরটা বুক পর্যন্ত টেনে দিল। আপনমনে এক হাতে মেয়ের চুলে বিলি কাটতে লাগল। পিহুর চোখদুটো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এলো। নিশ্বাসগুলো হয়ে উঠল দীর্ঘ, শান্ত, নিয়মিত। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে ঘুমের কোমল অতলে তলিয়ে গেল শিশুটি। অপরূপা নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। এই বিশাল পৃথিবীতে এখন তার নিজের বলতে হয়তো সত্যিই একমাত্র এই ছোট্ট মানুষটিই। অপরূপা ঝুঁকে এসে পিহুর কপালে অত্যন্ত মমতায় একটি চুম্বন এঁকে দিল।
ঘুমের মধ্যেও ছোট্ট মেয়েটার মুখে অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট। ভ্রুদুটো মাঝেমধ্যে কুঁচকে উঠছে। নিঃশ্বাসগুলোও স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা ভারী। অপরূপা আলতো করে হাত রাখতেই বুঝতে পারল শরীরটা গরম। জ্বর জ্বর ভাব। মেয়ের কপালে হাত বুলিয়ে দিল সে। আঙুলের স্পর্শে পিহু সামান্য নড়ে উঠল, তারপর আবার নিশ্চিন্তে ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজার বাইরে মৃদু শব্দ হলো। অপরূপা চমকে মুখ তুলল।
দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো দরজার দিকে। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছেন ইরফান এহসান। সাদা পাঞ্জাবির উপর গাঢ় রঙের শাল জড়ানো। বয়সের ভার তাঁর চুলে ও মুখে স্পষ্ট হলেও ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তায় এতটুকু ভাটা পড়েনি।
অপরূপার বুকের ভেতরটা আচমকা ধক করে উঠল।
সে প্রায় তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল। মাথার আঁচলটা আরও একটু টেনে নিয়ে বিনীত কণ্ঠে বলল,
'আসসালামু আলাইকুম, দাদু।"
ইরফান এহসান শান্ত মুখে জবাব দিলেন,
"ওয়ালাইকুমুস সালাম।"
ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন তিনি। অপরূপা ভাবছে ইরফান এহসান হয়তো কিছু না কিছু প্রশ্ন করবে। কিছু জবাবদিহি করতে হবে তাকে। হয়তো বলা হবে এত বড় সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো, কেন কাউকে আগে জানানো হলো না। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তেমন কিছুই হলো না। ইরফান এহসান বিছানার কিনারায় বসে পড়লেন। তারপর অপরূপার দিকে তাকালেন। ইশারায় বললেন,
"বসো।"
অপরূপা দ্বিধাগ্রস্ত ভঙ্গিতে বসে পড়ল। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। ইরফান এহসান কোটের পকেট থেকে একটি ছোট্ট মখমলের বাক্স বের করে তার দিকে এগিয়ে দিলেন।
"আপাতত তোমার দাদুর তরফ থেকে এটুকুই রাখো। সবকিছু তো খুব হঠাৎ করেই হয়ে গেল।"
অপরূপা চমকে উঠল! বিস্ময় নিয়ে বাক্সটার দিকে তাকাল সে। আমতা আমতা কনে উচ্চারণ করল,
"জি?"
ইরফান এহসান চোখের ইশারায় দেখালেন বক্সটা। বললেন নিতে। অপরূপা খানিক দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগলেও বাক্সটা হাতে নিল। ইরফান এহসান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। হুট করেই বলে উঠলেন,
"আমার নাতিটা খুব অগোছালো মানুষ, বুঝলে বোন। ওকে কোনো কিছু দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না। ছোটবেলা থেকেই এমন। মা বাবাহীন ছেলেটাকে আমিও ঠিক মত সময় দিতে পারিনি। তাইতো এতটা বেটরোয়া,ছন্নছাড়া এই ছে লেটা। নিজের ইচ্ছেমতো চলে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেয়।"
অপরূপা শুনল। কী অমায়িকতা, মার্জিত কথা বলার ধরণ। ইরফান এহসানের অধরে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি। তিনি অপরূপার দিকে সরাসরি তাকালেন। বলে উঠলেন,
"কিন্তু আমার এই অশান্ত, ছন্নছাড়া পিছুটানহীন নাতিটার তোমার জন্য গত কয়েকদিনে যেভাবে অস্থির হতে দেখেছি, তেমনটা কখনো দেখিনি আর কারো জন্য অস্থির হতে।"
অপরূপা চুপ করে শুনছে। ইরফান এহসান ভুল কিছু বলেননি। লোকটা যে তার জন্য এই গত দশটা দিন ঠিক কতটা অস্তিরতায় পেরিয়েছে তা সে এখন কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারছে। সব কি মোহ? খানিকের আকর্ষণে কেউ উতলা হয়? হয় হয়তো। সৈকতও তো হতো। কতই না যত্নে রেখেছিল তাকে। অথচ সবটাই ছিল অ়ভিনয়। দিন শেষে কী হলো? তার গোটা পরিবার, জীবনটা এক লহমায় ধ্বংস করে দিল। অজান্তেই বুকের ভেতর তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব হলো রমণীর। শ্বাস আঁটকে এলো গলার কাছে। ইরফান এহসানের দৃষ্টি ঘুরে ফিরে আবারো অপরূপার উপরেই স্থির হলো।
"তোমার অতীত সম্পর্কে আমি জানি। তোমার জীবনে কী কী ঘটেছে, তাও জানি। আর আজ যে আভিয়ান তোমাকে বিয়ে করে আনবে, সে ধারণাটাও আমার ছিল। অন্তত এ কয়েকদিনে ওর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে এটাই আন্দাজ করেছিলাম আমি।"
এ পর্যায়ে অপরূপা বিস্মিত চোখে তাকাল। ইরফান এহসান মৃদু হেসে বললেন,
"আমার আভিয়ান তার এতটুকু জীবনে ঠিক কদিন মন খুলে হেসেছে আমার জানা নেই। ওর কাছে কোনো পিছুটান নেই। নিজেকে হাজারবার চেষ্টা করেও বাঁধতে পারেনি কিছুতে। সেখানে তোমাতে বেঁধেছে ও নিজ ইচ্ছায়। যার অর্থ ওর অন্ধকার জীবনে তুমি দ্যুতি বেশেই এসেছ।"
অপরূপা শুনে গেল। মস্তিষ্কে ধারণ করল প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ। পরপর ইরফান এহসান তাকালেন ঘুমন্ত পিহুর দিকে। সেদিকে চেয়েই আওড়ালেন,
"মানুষ যখন সত্যি কাউকে নিজের বলে মেনে নেয়, তখন তাকে হারানোর ভয়ও জন্মায়। আভিয়ানের চোখে সেই ভয় আমি দেখেছি। একটা কথা কি জানো?"
চোখ তুলে চাইল রমণী। বুকের ভেতরটা ভার হয়ে আসছে তার। অজানা কারণেই মন মস্তিষ্ক জট পাকাচ্ছে। ফাঁকা ঢোক গিলে শুষে নিল সমস্ত বিড়ম্বনা। শুধালো,
"কী?"
“প্রত্যেক অনমনীয় সত্তার অন্তরালে থাকে এক দহনবিদ্ধ হৃদয়ের দীর্ঘ ইতিহাস। তাদের বাহ্যিক অবয়ব প্রস্তরসম কঠিন হলেও অন্তঃস্থলে বহমান থাকে অগণিত অপ্রকাশিত ক্ষতের দহনযন্ত্রণা।”
থেমে গেল অপরূপার শ্বাস প্রশ্বাস। হীম হয়ে এলো তার শরীরটা। আভিয়ানকে তো তেমনই একটা মানুষ ভাবে। যে কঠিন, খুব জটিল একটা মানুষ। যদি-ও বা বাহ্যিকতা দেখে ভেতরটা বিচার করা উচিত নেই। হুট করেই অপরূপার মনে পড়ল তার বাবার বলা একটি কথা।
“কঠোরতা চরিত্রের বৈশিষ্ট্য নয়, বরং ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ের আত্মরক্ষামূলক আবরণ।”
হ্যাঁ, এটাই। তবে আভিয়ানের বিষয়ে সে কিচ্ছুটি জানে না। জানার মতো আগ্রহ কাজ করেনি, বা পরিস্থিতিও ছিল না। ইরফান এহসান অপরূপাকে এতটা ভাবতে দেখে হাসলেন। কণ্ঠস্বর দৃঢ় হলো তার।
"আমার আভিয়ানও তেমনই। বাইরে থেকে ওকে যতটা শক্ত মনে হয়, ভেতরে ততটা নয়। ছেলেটা নিজের সকল যন্ত্রণা নিজ মনেই পুষে রাখে। তবে আমি শুধু চাই আমার আভিয়ানকে এবান স্বাভাবিক হতে দেখতে। ওর একটা স্বাভাবিক জীবন, একটা সংসার, ওর সকল অপ্রকাশিত দুঃখ গুলোর নিঃশেষ। ওকে সুখী দেখতে চাই আমি। জীবনে অনেক কিছু পেয়ে থাকলেও, শান্তি খুব বেশি পায়নি।"
অপরূপার চোখ অনিচ্ছাতেই নরম হয়ে এল। সে ঠিক কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। আর না তার কিছু বলার অপেক্ষা করল ইরফান এহসান। বরং ঘুমন্ত পিহুর পানে চেয়ে দাম্ভিক স্বরে উচ্চারণ করলেন,
"পিহুকে নিয়ে কোনোদিন কোনো চিন্তা করতে হবে না তোমার। এই বাড়িতে সে অতিথি নয়। সে আমাদেরই সন্তান। তুমি কেবল আমার নাতিকে সামলাও। ছেলেটাকে পিছুটানে বাঁধো। একটু সুখ এনে দাও। এই বৃদ্ধের আকুল মিনতি এটাই।"
চমকে উঠল অপরূপা। চটজলদি দুদিকে মাথা দুলাল সে। উচ্চারণ করল,
"এসব কী বলছেন দাদু? এভাবে বলবেন না। বিয়ে যেহেতু হয়েছে, আজ থেকে এই সংসারটা তো আমারই। আর আমি আমার দায়িত্ব কর্তব্য সর্বোচ্চটা দিয়ে পালন করব।"
সন্তুষ্ট হলেন ইরফান এহসান। মুখশ্রী চকচক করে উঠল। সহসাই ভেজা চোখ হতে চশমা নামিয়ে মুছে নিলেন অশ্রুসিক্ত নয়ন।
"পিহুর দায়িত্ব তার বড় বাবার, আমার ছোট মাকে আমি দেখব। তুমি কেবল আমার বেপরোয়া নাতিটাকে দেখো। আমি জানি তুমি পারবে।"
অপরূপার গলা ভারী হয়ে এলো। কতদিন পর কেউ এমন নিশ্চিন্ত ভরসার কথা বলল তাকে? সে নিচু স্বরে বলল,
"আপনি আমাকে এত ভরসা করছেন কেন?"
ইরফান এহসান মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
"কারণ আভিয়ান করেছে।"
থমকে গেল রমণী। ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইল ইরফান এহসানের পানে। তিনি দ্বিতীয় দফায় হাসলেন। জবাব দিলেন,
"আমার নাতি মানুষ চিনতে ভুল করে না। আর যেখানে সে তোমাকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছে, সেখানে তোমার ভেতর নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে যা আভিয়ানকে বিয়ের মত বন্ধনে আটকাতে পেরেছে।"
অপরূপা মাথা নিচু করে ফেলল। তার চোখের কোণে চিকচিক করছে জল। ইরফান এহসান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। চোখ মুছে বুক ভরে শ্বাস নিলেন তিনি।
"বিশ্রাম করো।"
বলেই হাঁটা ধরলেন তিন। বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। অপরূপা অনেকক্ষণ স্থির বসে রইল। লম্বা শ্বাস টেনে মাথা ঝাঁকাল পরপর। মাথাটা ধরেছে বড্ড। হুট করেই পাশে রাখা বক্সটার কথা খেয়ালে এলো তার। ভেতরে কী আছে তা নিয়ে কোতুহল জাগল। খুলল সে মখমলের বাক্সটা। ভেতরে রাখা একটি সূক্ষ্ম কারুকাজ করা সোনার চুলের কাঁটা।
মুহূর্তেই আলোর স্পর্শে ঝিলমিল করে উঠল সেটি। অপরূপার অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটি হাসি ফুটে উঠল। কিছু না ভেবেই কাঁটাটি হাতে তুলে নিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে । নিঃশব্দে নিজের খোঁপায় গুঁজে দিল। আয়নায় প্রতিফলিত মুখটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত এক অনুভূতি জমতে লাগল বুকের গভীরে। মানুষ কি সত্যিই সব হারানোর পরেও নতুন করে আশ্রয় খুঁজে পেতে পারে? ভাঙা জীবন কি আবারও কোনো ছাদের নিচে নিরাপত্তা খুঁজে পায়?
উত্তরটা তার জানা নেই। তবে বহুদিন পর প্রথমবারের মতো তার মনে হলো, হয়তো জীবন এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। হয়তো সমস্ত অন্ধকারের পরও কোথাও না কোথাও একটুখানি আলো অপেক্ষা করছে তার জন্য। আর সেই আলোটা হয়তো অন্ধকার নামক আভি.... ভাবতে গিয়েও ভাবতে পারল না অপরূপা। অজান্তেই একরাশ অনুভূতি ঘিরে ধরল তাকে। আনমনে বিড়বিড় করে উঠল,
"জীবন একটি নাট্যমঞ্চ। কখনো বিষাদে ডুবিয়ে মৃত্যু পথে ধাবিত করে, কখনো বা সেই পথেই শুরু হয় স্বর্গীয় যাত্রা।"
_____
রাত প্রায় বারোটা ছুঁইছুঁই। এহসান মঞ্জিলের বিশাল ছাদজুড়ে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত স্থিতি। দূরবর্তী নগরীর অসংখ্য আলোকবিন্দু কুয়াশার পাতলা আবরণে ঝাপসা হয়ে জ্বলছে, অন্ধকারের বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নক্ষত্রমালার ন্যায়। রাতের বাতাসে মিশে আছে হালকা শীতলতা। সেই বাতাস কখনো নিঃশব্দে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে রেলিং, কখনো আবার এলোমেলো করে দিচ্ছে মানুষের ভাবনার ভাঁজগুলো। ছাদের এক কোণে কাঠ ও লোহার কারুকার্যময় বসার জায়গাটিতে বসে আছে আভিয়ান। দুই কনুই হাঁটুর উপর স্থির। আঙুলের ফাঁকে জ্বলতে থাকা সিগারেটের আগুনটুকু অন্ধকারে বারবার জ্বলে উঠছে, আবার নিভে যাচ্ছে। একটার পর একটা সিগারেট শেষ করছে সে। ধোঁয়ার সর্পিল রেখাগুলো ধীরে ধীরে উপরে উঠছে, পরপর বিলীন হয়ে যাচ্ছে রাতের গভীরতায়।
তার ঠিক সামনেই বসে আছে ফুয়াদ, জাওভান এবং নিদ্রা। তিনজনই বেশ কিছুক্ষণ ধরে আভিয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টিতে কৌতূহল, বিস্ময়।অবশেষে ফুয়াদই দীর্ঘ নীরবতার অবসান ঘটাল। মুখ বাঁকিয়ে বলল,
"কী ব্যাপার? বিয়ে করেছিস তুই, নাকি আমরা?"
জাওভান সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠল। নীরবতা যখন ভেঙেছেঢ সে আর চুপ থাকে কী করে? আভিয়ানের পিঠে চড় বসিয়ে আওড়াল,
" আমি তো ভাবছিলাম আজকে তোকে আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না। কিন্তু দেখছি মহাশয় ছাদে বসে জীবনদর্শন নিয়ে গবেষণা করছেন।"
আভিয়ান বিরক্ত চোখে তাকাল তার দিকে। জাওভান ওসব গুরুত্বই দিল না। সে আগের কথায় জপল,
" আজ না তোর বিয়ে হয়েছে, আভি।"
"তো?"
জবাবটা দিল ফুয়াদ,
"তো মানে কী? তুই রাত বারোটায় ছাদে বসে সিগারেট খাচ্ছিস। এটা কিছু হলো?"
জাওভান সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
"এ যেন ইতিহাসের বিরলতম ঘটনা।"
হেসে উঠল নিদ্রা আর ফুয়াদ। আভিয়ান বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকাল তাদের দিকে। এরা কি তাকে একটু একাও থাকতে দেবে না? বিরক্তি তার প্রকাশ পেল কণ্ঠেও,
"তোদের কাজকর্ম নেই?"
ফুয়াদ নির্লজ্জের মতো উত্তর দিল,
"না, আজকে বিশেষ দায়িত্বে আছি।"
কপালে ভাজ পড়ল আভিয়ানের। গম্ভীর স্বরে শুধালো,
"কী দায়িত্ব?"
"নববিবাহিত বরকে পর্যবেক্ষণ করা।"
জাওভান গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল,
"অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মানবতা বলতে একটা বিষয় আছে না বল?"
আভিয়ান চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিড়বিড় করে আওড়াল,
"আল্লাহ, আমাকে ধৈর্য দাও।"
আভিয়ানকে বিড়বিড় করতে দেখে ফুয়াদ সামনে ঝুঁকল।
চোখ ছোট করে জিজ্ঞেস করল,
"একটা কথা বল তো? এতদিন যে স্নো হোয়াইট, অপ্সরা, আমার পৃথিবী, আমার মহাবিশ্ব বলে বেড়াতি, সেই মানুষটা এখন তোর রুমে বসে আছে। সেখানে তুই বাসর ঘরে না গিয়ে এখানে বসে সিগারেট খাচ্ছিস কেন?"
নিদ্রা কাশি দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। এতটা সময় সে নিশ্চুপ ছিল। যদি-ও বা এখনো সে কেবল নীরব দর্শক। জাওভানও নিজের জায়গা থেকে আরো এগিয়ে এল। চিন্তিত ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল,
"আসল প্রশ্ন হচ্ছে, তোর কি ভয় লাগছে?"
আভিয়ান কপাল কুঁচকাল।
"কীসের ভয়?"
জাওভান নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। চোখের ভঙ্গিমাটাও অশালীন।
"এহুম এহুম, ভয় পাচ্ছিস? ডাক্তার দেখাতে হবে নাকি?"
ফুয়াদ তৎক্ষনাৎ হেসে উঠল হো হো করে। নিদ্রা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। যতই হোক সে একজন মেয়ে। সে চটজলদি উঠে দাঁড়াল। আমতা আমতা করে বলল,
"আমার ঘুম পাচ্ছে, আমি গেলাম।"
আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না সে। হনহন করে প্রস্থান করল।এতে আরো সুযোগ পেয়ে বসল জাওভান ও ফুয়াদ। এ পর্যায়ে আভিয়ান তাকাল ওদের দিকে। নিজের কপালের রগ চেপে ধরল সে। গমগমে স্বরে উচ্চারণ করল,
"আল্লাহর ওয়াস্তে, তোরা এখনই নাম।"
"নামব কেন?"
জাওভান আরও আরাম করে বসে বলল,
"এতদিন বিয়ের জন্য যে মানুষটা পৃথিবী মাথায় তুলে রেখেছিল, সে এখন ছাদে বসে আছে কেন সেটার উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমরা কোথাও যাচ্ছি না।"
আভিয়ান কোনো জবাব দিল না। সে তাকিয়ে রইল অদূর অন্ধকারে। ফুয়াদ এবার একটু থেমে বলল,
"সিরিয়াসলি বল, সব ঠিক আছে তো?"
আভিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার মাথা ধরেছে বড্ড। অতঃপর খুব ধীরস্বরে বলল,
"সব ঠিক আছে।"
"তাহলে?"
জাওভান প্রশ্ন করল। আভিয়ান গাঢ় শ্বাস ফেলল। গুমোট বাঁধা স্বরে উচ্চারণ করল,
"মানুষটা অনেক কিছু হারিয়ে এসেছে। আমি চাই না ওর উপর আর কোনো চাপ পড়ুক।"
"চাপ যাতে না পড়ে সেই খেয়াল রাখতে হবে। আফটার অল, শি'জ ইয়্যুর ওয়াইফ।"
কোন কথার প্রেক্ষিতে কী বলতে হয় সেই জ্ঞান হারিয়েছে জাওভান। তাইতো ফটাফট কথা খানা বেরিয়ে এলো তার কণ্ঠনালী থেকে। জাউভানের কথায় বিরক্ত আভিয়ান। সোজা কথা কেন বোঝে না এরা? সে গম্ভীর ভাবেভ তাকাল জাওভানের দিকে। বিরক্ত স্বরেই আওড়াল,
"কীসের মধ্যে কী, হ্যাঁ? তোরা কি আজকে আমাকে বিরক্ত করার শপথ নিয়ে এসেছিস?"
"অবশ্যই।"
চটজলদি জবাব ফুয়াদের। জাওভান নিজের শার্টের কলার ঝাকিয়ে গর্বিত স্বরে বলল,
"বন্ধুত্বের দায়বদ্ধতা বলে একটা বিষয় আছে। সেটা তো পালন করতে হবে নাকি?"
আভিয়ান অসহায় চোখে চাইল দুজনের দিকে। তার এখন একটু একা থাকা প্রয়োজন। আর এই দুটো মিলে তাকে আরো জ্বালা দিচ্ছে। সে পারছে না দুটোকে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে। এত বিরক্তিকর কেন এরা? আভিয়ান যখন এসব ভাবনায় মগ্ন ফুয়াদ হঠাৎ তখন রহস্যময় ভঙ্গি করল। আভিয়ানের বাহুতে চাপড় মেরে বলে উঠল,
"আচ্ছা, জরুরি প্রশ্ন।"
"আবার কী?"
"প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনেছিস তো?"
আভিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল ফুয়াদের দিকে। না বুঝেই শুধালো,
"কোন জিনিসপত্র?"
ফুয়াদ আর জাওভান একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। জাওভান নাটকীয়ভাবে বলল,
"মেডিক্যাল সেফটির আলোচনা হচ্ছে ব্রো, তুই এত ইনোসেন্ট কেন বলতো?"
মেজাজ হারাল আভিয়ান। রক্ত চড়ে গেল মাথায়। দাঁতে দাঁত চেপে পা উঁচিয়ে লাথি বসাল জাওভান আর ফুয়াদের পায়ে। ধমকে উঠল,
"এই তোরা যা তো এখান থেকে।"
ফুয়াদ হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভান করল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই আবার বলল,
"দেখ ভাই, আমরা তো শুধু হেল্পই করতে এসেছিলাম।"
মাঝ থেকে কথা কাটল জাওভান,
"তোর কথা চিন্তা করে সব রেখেও এসেছি ঘরে। সব সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছি, শুধু সময় মতো ব্যবহার করতে ভুলিস না। একটি দূর্ঘটনা, সারাজীবনের কান্না।"
না! আর পারা গেল না। আভিয়ানের অবশিষ্ট ধৈর্য্যটাও ভেঙে গেলে। বিশ্রী এক গালি ছুড়ল জাওভানের উদ্দেশ্যে।পরপর উঠে এসে কিল বসাল নাক বরাবর।
"আর একটা বাজে কথা বললে আমার হাতেই খুন হবি তুই। যা তো বাল, যা এখান থেকে।"
জাওভান মিথ্যা আর্তনাদ করে ফুয়াদকে ইশারা করে বলে উঠল,
"দেখলি ভাই, দেখলি? বউ পেতে না পেতে কত বদলে গেল? কোলে দুই চারটা ল্যাদা গ্যাদা আসলে তো আমাদের চিনবেই না। এই কারণেই, হ্যাঁ এই কারণেই বলি সবসময় সতর্কতা অবলম্বন করে চল। তা তো শুনবি না। একটা কথা মাথায় রাখবি, গরীবের কথা বাসী হলেও ফলে। এই গরীবের অভিশকপ পড়ুক তোর উপর, তোর ডজন খানেক বাচ্চা হোক। সব গুলো সারাদিন হাগুমুতু করে তোকে ভিজিয়ে দেক। হাগুর গন্ধে তোর নাক বুজে যাক।"
নাটকীয় ভঙ্গিতে বিলাপ বকতে শুরু করেছে জাওভান। ওদিকে ফুয়াদ হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে নিচে বসে। আভিয়ানের সম্পূর্ণ মুখশ্রী রক্তিম। কোমরে হাত বেঁধে রাগে ফুসছে সে। এ পর্যায়ে আভিয়ানের মুখটা দেখে জাওভানও নিয়ন্ত্রণ হারাল নিজের। হেসে গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হলো তার। এমন সময় ফুয়াদের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়েই সে লাফিয়ে উঠল।
"ইয়া আল্লাহ!"
আঁতকে উঠল বেচারা জাওভান। বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"কী হলো?"
"আমার বউ।"
ফুয়াদের এহেন জবাবে জাওভা হতভম্ব। জাওভান লাথি বসাল ফুয়াদের পায়ে। বলে উঠল,
"শালা! আত্মা বের করে দিয়ে এখন বলিস বউ। শালা খবিশ।"
ফুয়াদ তেমন গুরুত্ব দিল না। সে দৌড় লাগাল দরজার দিকে। যেতে যেতে বলল,
"তোরা থাক। আমি যাচ্ছি।"
জাওভান আভিয়ানের দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হাসল।
"এক বান্দা বউকে রেখে সিগারেটের সঙ্গে রোমান্স করছে। আরেক বান্দা হার্ট অ্যাটাক দিয়ে বউয়ের সাথে প্রেমালাপ করতে যাচ্ছে। হাউ কিউট, হাউ সুইট।"
আভিয়ান বাক্য অপচয় করল না। এসে দাঁড়াল রেলিং এ ভর দিয়ে। জাওভানও এগিয়ে এসে রেলিংয়ে হেলান দিল।
তারপর ধীরস্বরে বলল,
"তুই যাচ্ছিস না কেন?
আভিয়ান জবাব দিল না।
"অপরূপা... উম, সরি। ভাবি। ভাবিকে বাসর ঘরে বসিয়ে রেখে তুই এখানে বসে আছিস কেন? যা ভাই যা, যা না রে।"
জাওভান এক সেকেন্ডও ছাড় দিচ্ছে না আভিয়ানকে ত্যক্ত করতে। জাওভান আবার মাথা নেড়ে বলল,
"এমনিতে তো বিয়ের জন্য লাফাচ্ছিলি। আর এখন মরার মতো বসে আছিস।"
আভিয়ান কেবল একবার তাকাল, দৃষ্টিতে দৃষ্টি পড়তেই থেমে গেল সে। দুহাত তুলে আত্মসমর্পণ করল।
"ঠিক আছে, ঠিক আছে। আনরোমান্টিক ব্যাটা ছাওয়াল। তোর বাচ্চার সংখ্যা সেঞ্চুরি পার করুক। আমি যাই।"
এটুকু বলেই ঘুরে দাঁড়াল জাওভান। সিঁড়ির দিকে হাঁটা ধরল। কয়েক সেকেন্ড বাদে আবারো এগিয়ে এসে ঠোঁট কামড়ে বলল,
"গতি কমিয়ে, স্যার। এটা আপনার বউ, বাইক না।"
মুহূর্তেই রক্ত মাথায় চড়ে গেল আভিয়ানের। অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকাল পেছনে। গর্জে উঠল,
"বেয়াদবের বাচ্চা।"
জাওভান ততক্ষণে ভো দৌড়। দাঁতে দাঁত চাপল আভিয়ান। বিড়বিড় করল,
"অসহ্য! অশ্লীল কোথাকার!"
শব্দ করে শ্বাস ফেলল আভিয়ান। চারপাশে শুধু রাতের বিস্তীর্ণ অন্ধকার, দূরের শহরের মৃদু আলোকরেখা, আর আকাশভরা তারার মলিন জ্যোৎস্না। আভিয়ান আরো কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইল। তারপর শেষ সিগারেটটাও মাটিতে ফেলে জুতোর নিচে পিষে দিল। মাথাটা পেছনে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতর আজ অদ্ভুত এক অনুভূতির সমাবেশ। এক অচেনা কোমলতার ভার। আজ থেকে অপরূপা তার স্ত্রী, একটি মাত্র শব্দ। ভাবতেই বুকের গভীরে অদ্ভুত এক আলোড়ন জেগে উঠল। নিজের চুলে হাত চালিয়ে আকাশের দিকে তাকাল সে।
নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল,
"আমি কেন যাচ্ছি না আপনার কাছে জানেন?"
থামল আভিয়ান। শুঁকনো ঢোক গিলল পরপর। চোখের সামনে ভেসে উঠল রমণীর মুখখানা। নিজের জবাব নিজেই দিল,
“গোটা পৃথিবীকে পদানত করার শক্তি থাকলেও আপনার সামনে আমি নিতান্তই এক পরাজিত যোদ্ধা। আপনার ওই কাজলরাঙা চাহনিই যথেষ্ট আমার সমস্ত দৃঢ়তা, সংযম ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার জন্য।”
_______
#চলবে
মন্তব্য করে যাবেন। 🤍