পর্ব : ৩
ঘড়িতে রাত এগারোটা বেজেছে। সবাই এসে জড়ো হলো ছাদের সেই কোণায়। চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছে সবাই সাদমানের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে।
এইদিকে সাদমান অন্যদিকে ফিরে আছে বাড়ির পেছনের পুকুর পাড়ের দিকে রহস্যজনকভাবে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। সে ভাবছে আর সিগারেটের ধোঁয়া আকাশে ওড়াচ্ছে।
— "এই লম্পট! তোর হাতের বালটা ফেলে কি পরবর্তী প্ল্যানটা বলবি?" বলল সুনেহরা।
সাদমান পেছন ফিরে তাকালো। তারপর সবার সামনে একটু এগিয়ে গিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, — "এই ডাকের জন্যই তো অপেক্ষা করছিলাম এতক্ষণ।"
রবিন বলে উঠলো, — "মানে? কিসের জন্য অপেক্ষা করছিলি তুই?"
সাদমান গিয়ে নিজের চেয়ারে বসলো। — "আরে এতক্ষণ আমি ওইদিকে এমনি তাকিয়ে ছিলাম আর মনে মনে ভাবছিলাম তোরা আমাকে ডাকবি তো আমি গিয়ে তোদের সাথে গিয়ে বসে প্ল্যান বলব।"
সুনেহরা বললো, — "তার মানে এতক্ষণ তুই খামোখা ওই দিকে তাকিয়ে ছিলি? কোনো প্ল্যান নিয়ে ভাবলিনা?"
সাদমান দুষ্টু একটা হাসি দিয়ে বলল, — "হুম, তাই কিছু ভাবিনি। তোদের ডাকার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।"
সুনেহরা তখন রাগী কণ্ঠে ইকবালকে উদ্দেশ্য করে বলল, — "এই ইকবাল! তোর বজ্জাত ভাইকে যদি এখন গলা টিপে মেরে ফেলি, তোরা কেউ আমাকে আটকাবি না তো?"
তখন কম কথা বলা তিতলি বলে উঠলো, — "এই সাদমান! সময় নষ্ট কেন করতেছিস? আমি অনেক এক্সাইটেড, তাড়াতাড়ি চল তোর দাদার ঘরে।"
তখন রবিন আর ইকবালও বলল, — "হ্যাঁ রে সাদমান, বল। আমরা কখন যাচ্ছি ওই ঘরে?"
সাদমান একটু নড়েচড়ে বসলো। তারপর বলল, — "কি বালের প্ল্যান? রাত বারোটা বাজে, বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়বে আর তখনই আমরা ওই ঘরে প্রবেশ করব, একদম সিম্পল।"
ইকবাল বলে উঠলো, — "তো আমরা এখন এখানে কেন আসছি? ১২ বাজলে তো আমরা সোজা ওই কক্ষেই চলে যেতে পারতাম। আর সেটা তুই চন্দ্রনাথ পাহাড়েও বলতে পারতি।"
সাদমান নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে একটু দূরে গিয়ে উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট জ্বালালো। — "এই লম্পট! তোর বাল মার্কা এটিটিউড দেখার আমাদের কারোর সময় নেই, তাড়াতাড়ি বল তখন বললি না কেন?" বলল সুনেহরা।
— "ঝগড়ার রানী মিস সুনেহরা! সবাইকে এখানে ডেকে আনার কারণ হচ্ছে..."
সুনেহরা চেঁচিয়ে বলল, — "কি, কি? তাড়াতাড়ি বল, কি কারণ?"
— "আরে বলতে তো দে।" — "হ্যাঁ দে, গেউ গেউ কর তাড়াতাড়ি।" — "এখানে নিয়ে আসার কোনো কারণ নেই। এমনি আড্ডা দিতে আসছি।"
এটা বলেই সাদমান একটা হাসি দিল। সবাই সাদমানের দিকে রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে রইলো। সুনেহরা রাগী চাহনিতে ইকবালকে বলল, — "এখন যদি আমি ওই শয়তানের চুলগুলো গিয়ে ছিড়ে ফেলি, তোরা কি আমাকে আটকাবি?"
— "একদম না! ১২ টা বাজতে আরও বিশ মিনিট বাকি। যা, বিশ মিনিট তোর সাদমানের সাথে যা ইচ্ছা করতে পারিস।" দাঁত কিড়মিড় করে কথাটা বলল ইকবাল।
সুনেহরা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। তারপর গায়ের ওড়না খুলে নিজের কোমর বাঁধলো। এরপর সোজা গিয়ে সাদমানের কলার চেপে ধরল। — "এই কুত্তা, তোর মাথা নাগালে পাচ্ছিনা, একটু নিচু হ, আমি তোর সব চুল টেনে টেনে ছিড়ে ফেলব।"
সাদমান একটু ভীতু হয়ে বলল, — "এই ইকবাল, রবিন, এই তিতলি! সুনেহরাকে আটকা।" — "এই কুত্তা, কেউ আসবে না তোকে বাঁচাতে, আজকে তুই শেষ।"
পিছন থেকে রবিন বলে উঠলো, — "সাদমান! নিজেকে আজকে নিজেই বাঁচা, আজকে আমরা বাঁচাতে পারব না।"
সাদমানের মাথা নাগালে না পেয়ে তার শার্টের কলার চেপে ধরে চেয়ারে বসালো। সাদমান মেয়েদের গায়ে হাত তোলে না তাই সে কিছু করতেও পারছে না। সুনেহরা সাদমানের চুলগুলো শক্ত করে টেনে ধরল। সাদমান "আহ! উফফ!" করে চিল্লাতে লাগলো।
এটা দেখে রবিন আর ইকবাল হাসছে। এসব দেখে তিতলি গিয়ে সুনেহরাকে সাদমান থেকে আলাদা করল। — "এই, তোরা কি ছোট বাচ্চা? কি করছিস এসব? বারোটা বাজতে আর বেশি সময় নেই, চল আমরা এগিয়ে যাই।"
সাদমান চোখ বড় বড় করে সুনেহরাকে ন্যাকা কণ্ঠে বলল, — "পেতনি, তোকে আমি দেখে নেব।" — "হ্যাঁ হ্যাঁ, ভালো করে দেখিস পরে, এখন চল।" এটা বলেই তিতলি সবাইকে উঠিয়ে নিয়ে এগোতে লাগলো।
মাহমুদ শেখের ঘরটা শেখ বাড়ির ৩য় তলায়। তিনি একা থাকতে পছন্দ করতেন তাই বাড়ির একেবারে উপরের তলায় থাকতেন তিনি। জীবনের বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে কাটালেও শেষ বয়সে বাড়িতে এসে টানা ৬ মাস ছিলেন। সারাক্ষণ নিজের ঘরে বন্দি থাকতেন তিনি। শোনা যায়, তার শেষ একটা অভিযানের পুরো রিসার্চ তিনি এই শেখ বাড়িতে তার ঘরেই করেছেন।
বাবা খাইরুল সাহেবের কাছ থেকে জেনেছে যে, এই দাদা মাহমুদ শেখের মৃত্যুর পর থেকে গত ২৫ বছর এই ঘর আর খোলা হয়নি। সাদমান মাঝে মাঝে খাইরুল সাহেবকে দাদার ঘরটা সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন করত। খাইরুল সাহেব দাদার নাম শুনলেই যেন তার মুখ ভয়ে চুপসে যেত।
আজ এত বছর পর সাদমান ও তার কাজিনরা ঘরটা খুলতে যাচ্ছে। তারা সবাই ভয়ে ভয়ে সেই ঘরের দিকে এগোতে লাগলো। তারপর সেই বিশাল দরজার সামনে তারা পৌঁছালো। সবাই যেন কোনো এক অজানা অদ্ভুত ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত।
সাদমান ভয় পাচ্ছে দেখে সুনেহরা কাঁপাকাপা গলায় বলে উঠলো, — "এই সাহসী পুরুষ সাদমান শেখ! আপনি এত ভয় পাচ্ছেন কেন?"
সাদমান সুনেহরার দিকে তাকিয়ে বলল, — "এই পেতনি, আমার থেকে তো তুই বেশি ভয় পাচ্ছিস মনে হয়।" — "কৈ না তো! আচ্ছা সাদমান, দরজার ওপারে যদি ভূত থাকে, আমরা কোন দিকে পালাবো?" — "এই রবিন! তোর ভীতু পেতনি বোনকে কথা বলতে বারণ কর। আমার দরজা খুলতে ডিস্টার্ব হচ্ছে।"
সুনেহরা অল্প রাগে নাক ছিটকালো।
সাদমান ধীরে ধীরে চাবিটা চাবির জায়গায় ঢুকিয়ে চাবি ঘোরাতে লাগলো। এক পর্যায়ে একটু আওয়াজ করে দরজাটা খুলে গেল। সুনেহরা সাদমানের পিছনে লুকিয়ে গেল। ঘরটা পুরো অন্ধকার, কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। হাতে থাকা টর্চলাইট দিয়ে সাদমান ঘরের লাইটের সুইচ খুঁজতে লাগলো। অবশেষে পুরোনো আমলের একটা সুইচ খুঁজে পেল সে।
সুইচটা অন করার সাথে সাথে পুরো ঘরটা ৯০ দশকের আবছা লালচে আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল। সবাই চারপাশে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ঘরটায় ঢুকতেই প্রথমেই চোখে পড়ল বিশাল কাঠের একটি বইয়ের তাক। মাকড়সার জালে ঘেরা পুরো কক্ষ। দেওয়ালের প্রায় পুরোটা জুড়ে থাকা তাকগুলোতে সারি সারি পুরোনো বই। কোনোটা মোটা, কোনোটা ছোট; বেশিরভাগ বইয়ের মলাটই ধুলোয় বিবর্ণ হয়ে গেছে। কিছু বইয়ের মলাটে ইংরেজি, আবার কিছুতে অচেনা ভাষায় লেখা।
তিতলি ধীরে ধীরে তাকের কাছে গিয়ে একটা বইয়ের ওপর আঙুল বুলিয়ে বলল, — "এগুলো মনে হয় বহু বছর ধরে কেউ ছোঁয়ওনি।"
তার পাশেই ছিল বিশাল একটি সেগুন কাঠের টেবিল। পুরো টেবিল মাকড়সার জাল আর ধুলোয় ঘেরা। এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে পুরোনো নোটবুক, কালি-কলম, ম্যাগনিফাইং গ্লাস, কম্পাস, কয়েকটি কলমদানি এবং হলদে হয়ে যাওয়া কাগজের স্তূপ। টেবিলের এক পাশে পড়ে আছে একটি পুরোনো ক্যামেরা।
ঘরের ডান পাশের দেয়ালে ঝুলছে পৃথিবীর একটি বিশাল মানচিত্র। তার নিচেই দক্ষিণ আমেরিকার আলাদা একটি মানচিত্র। বিভিন্ন জায়গায় লাল, নীল ও কালো কালি দিয়ে ছোট ছোট চিহ্ন দেওয়া। কয়েকটি জায়গা আবার গোল করে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইকবাল মানচিত্রটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। — "দেখ! এখানে তো অ্যামাজনের পুরো অঞ্চল চিহ্নিত করা।"
কেউ কোনো উত্তর দিল না। আরেকটি দেওয়ালে সারি করে ঝোলানো রয়েছে বেশ কিছু পুরোনো সাদা-কালো ছবি। কোনো ছবিতে পাহাড়, কোনো ছবিতে ঘন জঙ্গল, আবার কোনো ছবিতে কয়েকজন অভিযাত্রীকে দেখা যাচ্ছে। ছবিগুলোর নিচে ছোট ছোট কাগজে তারিখ ও জায়গার নাম লেখা।
ঘরের এক কোণে রাখা ছিল কয়েকটি পুরোনো চামড়ার ভ্রমণব্যাগ। তার পাশে কাঠের বাক্সে সাজানো রয়েছে দূরবীন, পুরোনো কম্পাস, দিকনির্ণয়ের যন্ত্র এবং বিভিন্ন অভিযানে ব্যবহৃত সরঞ্জাম। অন্য পাশে কাচের আলমারিতে রাখা কয়েকটি অদ্ভুত প্রত্নবস্তু। ছোট পাথরের মূর্তি, মাটির তৈরি পাত্র, পুরোনো মুদ্রা, ধাতব ফলক এবং বিভিন্ন আকৃতির পাথরের টুকরো। প্রতিটি জিনিসের পাশে ছোট কাগজে কিছু লেখা রয়েছে।
সুনেহরা কাচের আলমারির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, — "নানা আসলে মানুষ ছিলেন, নাকি একটা চলন্ত জাদুঘর?" রবিন মৃদু হেসে বলল, — "মনে হচ্ছে নানা শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক ছিলেন না, বেশ বড় ধরনের অভিযাত্রীও ছিলেন।"
ঘরের একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল একটি পুরোনো লেখার ডেস্ক। ডেস্কের ওপর একটি বন্ধ পুরোনো বই, কয়েকটি খাম এবং কালো চামড়ায় মোড়ানো কিছু কাগজ পড়ে আছে। ডেস্কের পাশে রাখা মাহমুদ শেখের পুরোনো কাঠের চেয়ারটি এখনো ঠিক আগের মতোই রয়েছে। শুধু ওপরে ধুলো আর মাকড়সার জালে ঘেরা।
সবশেষে সাদমানের চোখ আটকে গেল দেওয়ালে ঝোলানো একটি পুরোনো গোলাকার ঘড়িতে। ঘড়িটির কাঁটা থেমে আছে— ৮টা ৪ মিনিটে। সাদমান কিছুক্ষণ নীরবে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, — "অদ্ভুত..."
ঘরের নিস্তব্ধতার মধ্যে তার কণ্ঠটা যেন আরও ভারী হয়ে শোনা গেল। সবাই ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে চারপাশের পুরোনো কাগজ-নকশা একটু একটু করে দেখতে লাগলো। যেন সবার মনে হচ্ছে কোনো হরর মুভির সেটে ঢুকে পড়েছে। সাদমান চারপাশ দেখতে দেখতে দেওয়ালে ঝুলানো পুরোনো মাকড়সার জালে ঘেরা ম্যাপটার দিকে তাকিয়ে রইলো। সবাই কিছু বুঝতে না পেরে সাদমানের পিছনে এসে দাঁড়ালো।
নীরবতা ভেঙে রবিন বলে উঠলো, — "সাদমান! নানা যে অনেক বড় কোনো অভিযানে কাজ করেছিল শেষ বয়সে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু অভিযানটা সম্পর্কে এখনো কিছু বুঝতে পারছি না। তোর কী মনে হয়, সাদমান?"
সাদমান পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে জ্বালালো। — "এই কুত্তা, এই সময়ও তোর সিগারেট খেতে হবে? এমনি অনেক ভয়ে আছি, তাড়াতাড়ি কিছু বল, কী বুঝলি।"
সাদমান তাদের দিকে ফিরল আর বলল, — "রবিন, তুই যা বলেছিস এটা একদম ঠিক। একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিস তোরা? ওই ঘড়ির দিকে তাকা সবাই ৮ টা বেজে ৪৪ মিনিট। ওই ঠিক চাবির বাক্সের লক এর মত। দাদা কোনো বড় অভিযানের প্ল্যানে ছিলেন এবং সেই অভিযান থেকেই দাদা নিখোঁজ হয়েছেন। তোরা চারপাশ ভাল করে দেখ, আমাকেও আরও ভাল করে দেখতে দে।"
সবাই চার পাশে গিয়ে বিভিন্ন কাগজ ও বইগুলো ঘেঁটে ঘেঁটে দেখতে লাগলো। সুনেহরা ভয়ে অন্য কোনো দিকে যায়নি, সে সাদমানের পেছনে পেছনেই আছে। — "এই সাদমান! তোর হাতের সিগারেটটা ফেলে দে না প্লিজ, গন্ধটা সহ্য হচ্ছে না।" — "এই পেতনি, তোর আমার সাথে কী? অন্যদিকে গিয়ে খোঁজ, কিছু পাস কি না দেখ।" — "না, আমার ভয় লাগছে। আমি তোর সাথেই থাকি। আর তুই সিগারেটটা ফেলে দে।" — "সহ্য করে থাক, আমি সিগারেট ফেলতে পারব না।"
সুনেহরা রাগীভাবে নাক সিটকালো। সাদমান আগে আগে হেঁটে যাচ্ছে আর সুনেহরা সাদমানের শার্টকে পিছন দিক থেকে ধরে ধরে হাঁটছে এবং ভয়ে ভয়ে চার দিকে তাকাচ্ছে। সাদমান সোজা হেঁটে কক্ষের এক কোণায় গেল। সেখানে বসার ছোট্ট একটা টেবিল আর চেয়ার। পাশে একটা জানালা, যেখান থেকে বাড়ির পেছনের পুকুর, তারপর বাউন্ডারি করা দেওয়ালের ওই পাশে ফসলি জমিও দেখা যায়।
টেবিলটির ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অনেক কাগজপত্র। সাদমান হঠাৎ লক্ষ করল টেবিলের এক সাইডে একটা ধুলো জমা মোটা বই। সাদমান বইটা হাতে নিল। হাত দিয়ে বইয়ের ওপর থাকা ধুলো সরিয়ে বইয়ের নাম পড়ার চেষ্টা করল। পাশে থাকা সুনেহরা সাদমান থেকে কিছুটা খাটো হওয়ায় পা ওপর করে সেও দেখতে লাগলো।
কালো রঙের বইটার কভারে বড় বড় বাংলা অক্ষরে লেখা— দ্য হেরিফেলো। নিচে ছোট করে লেখা— সম্পূর্ণ বাংলায় অনুবাদ। তার মানে বইটা অন্য কোনো ভাষায় ছিল, সেটাকে অনুবাদ করা হয়েছে বাংলায়। বইটার কভার পেজ উল্টালো সাদমান। সাদমান দেখে অবাক হলো, বইটার সমস্ত অক্ষরগুলো দোয়াত-কলমে হাতে লেখা।
সাদমান সবাইকে ডাকলো, — "এই, সবাই এই দিকে আয়।"
সাদমানের ডাক শুনে সবাই এগিয়ে এলো তার দিকে। — "কী পেয়েছিস সাদমান?" বলল ইকবাল। — "আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো এই বইতে পেয়ে যাবো— দ্য হেরিফেলো।"
রবিন বলে উঠলো, — "কিসের বই এটা সাদমান? আর কী লেখা আছে এতে?" — "আমি বইটার শুরুর ভূমিকা পড়েছি। আমি কিছু পেয়েছি সেই ভূমিকায়, যাতে বুঝলাম পুরো বইটা পড়লে আমরা আমাদের সব উত্তর পেয়ে যাবো। তার পর আমি ওইখানে থাকা পুরো ক্যামেরা গুলো চেক করেছি ভিতরে কোন রিল নেই।
ইকবাল বলল, — "তাহলে আর কি, আমরা বইটা পড়া শুরু করি, কী বলিস?" — "এখানে পড়া যাবে না।" — "কেন?" — "কারণ এখানে সুনেহরা অনেক বেশি ভয় পাচ্ছে, বইটাতে হয়তো ভয়ানক কিছু থাকতে পারে। আর কক্ষটা অনেক পুরোনো হওয়ায় একটু ভুতুড়ে। তিতলি আর সুনেহরার চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখ, তাদের মুখ কালো হয়ে গেছে ভয়ে।" — "তো এখন সলিউশন কী?" বলল ইকবাল।
তখন সুনেহরা একটু এগিয়ে এসে কাঁপাকাপা কণ্ঠে বলল, — "কৈ! কৈ!! আমি একদম ভয় পাচ্ছি না তো।" সাদমান একটু হেসে বলল, "সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি আমরা।"
রবিন তখন উৎসুক হয়ে বলল, — "আচ্ছা সাদমান, তুই আমাদের আগে বইয়ের ভূমিকায় কী পড়লি, সেটা বল।" — "ভূমিকায় এখানে আমাজনের গহীন জঙ্গলের একটা রাজ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে। সম্পূর্ণ একটা আলাদা জাতি। আর বইয়ের পাশাপাশি আমি কিছু চিঠি পেয়েছি এখানে, সেগুলোও নিয়ে নিই। বইটা আমরা আমার ঘরে গিয়ে পড়ব। আর বই ও চিঠিগুলো পড়ে যদি কিছু না পাই, তাহলে কাল আমরা আবার আসবো। আজকের মতো চল সবাই।"
সাদমানের কথার সাথে সবাই একমত পোষণ করে ঘর থেকে বের হলো। সাদমান আবার সুন্দর করে আগের মতো ঘরটা লক করে দিল। তারপর সবাই হাঁটা শুরু করল সাদমানের ঘরের দিকে।
[চলবে...]