পর্ব : ০৭
প্রফেসর ফয়েজ কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আবার বলতে শুরু করলেন।
— আমরা মোট ছয়জন মিলে একটি দল গঠন করেছিলাম। দলে ছিলাম আমি, মাহমুদ, মার্ক, মাহমুদের ব্রিটিশ বন্ধু চার্লস এবং দুই তরুণী—এলিয়ানা ও থিয়োডর। এলিয়ানা ও থিয়োডর দুজনই আমেরিকান।
প্রফেসর একটু থামলেন।
তারপর বললেন,
— মার্কের কথা আগেই বলেছিলাম। সে ছিল একজন স্প্যানিশ নাগরিক। প্রায় চল্লিশটি ভাষা পড়তে ও লিখতে জানত। বলা যায়, সে ছিল অসাধারণ জ্ঞানী একজন অনুবাদক। প্রাচীন ভাষা নিয়েও তার দারুণ দক্ষতা ছিল।
সাদমান মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
প্রফেসর এবার বললেন,
— আর মাহমুদের ব্রিটিশ বন্ধু চার্লস... সে ছিল অন্য ধরনের মানুষ।
রবিন বলল,
— কেমন ধরনের?
প্রফেসর মুচকি হাসলেন।
— চোর।
ঘরের সবাই একসঙ্গে তাকাল।
প্রফেসর আবার বললেন,
— তবে ছোটখাটো চোর নয়। তার হাত ছিল একেবারে পাকা। হ্যাকিংয়েও সে ছিল ভয়ংকর দক্ষ।
ইকবাল আগ্রহ নিয়ে বলল,
— কী ধরনের হ্যাকিং করত সে?
প্রফেসর বললেন,
— একবারের ঘটনা বলি। আয়ারল্যান্ডের গ্যালওয়ে শহরের একটি ছোট ব্যাংকে গিয়েছিল চার্লস। নিজের জমানো কিছু পাউন্ড তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকের কর্মকর্তা তাকে বললেন, ব্যাংক কাউন্টার থেকে টাকা তোলা যাবে না, তাকে এটিএম থেকে টাকা তুলতে হবে।
চার্লস বাইরে এসে দেখে আশপাশে কোনো এটিএম নেই। এমনকি ওই ব্যাংকের শাখাতেও কোনো এটিএম ছিল না।
সে আবার ব্যাংকের ভেতরে গিয়ে কর্মকর্তার সঙ্গে অনেকক্ষণ তর্ক করল।
কিন্তু কর্মকর্তার একটাই কথা—
‘এটিএম থেকেই টাকা তুলতে হবে।’
শেষ পর্যন্ত চার্লস রাগ করে বাড়ি ফিরে যায়।
পরের দিন সে কী করেছিল জানো?
প্রফেসর মুচকি হাসলেন।
— সে ওই ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেমে ঢুকে ব্যাংকের নিরাপত্তাব্যবস্থা অচল করে দেয়। তারপর সে পুরো ব্যাংকের সমস্ত পাউন্ড খালি করে দেয়। । অবশ্য পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে অনেক বড় ঝামেলাও হয়েছিল।
ইকবাল অবাক হয়ে বলল,
— লোকটা তাহলে ভয়ংকর!
— ভয়ংকর তো বটেই। তবে আমাদের সেই গবেষণায় তার মতো একজন মানুষের প্রয়োজন ছিল।
প্রফেসর এবার এলিয়ানা ও থিয়োডরের দিকে এলেন।
— আর এলিয়ানা ও থিয়োডর ছিল মাহমুদের সহকারী। বলা যায়, তারা দুজনই মাহমুদের ছাত্রীর মতো ছিল। বয়স কম হলেও গবেষণার কাজে দুজনেরই যথেষ্ট দক্ষতা ছিল।
তিনি একটু থেমে বললেন,
— আমরা প্রায় তিন বছর একসঙ্গে গবেষণা করেছিলাম।
এই তিন বছরে হেরিফেলো সম্পর্কে আমরা এমন অনেক তথ্য জানতে পেরেছিলাম, যা যে কোনো অবিশ্বাসীকেও কিছুক্ষণের জন্য হলেও থমকে দিতে পারে।
হেরিফেলো কোনো সাধারণ জাতি নয়।
তাদের নিজস্ব রাজ্য আছে।
নিজস্ব আইন আছে।
নিজস্ব সামাজিক ব্যবস্থা আছে।
এমনকি তাদের নিজস্ব ভাষা এবং মুদ্রাও রয়েছে।
ঘরের সবাই আবার নীরব হয়ে গেল।
ঠিক তখন সুনেহরা আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করল,
— আচ্ছা দাদু! হেরিফেলো নামটা কোথা থেকে এসেছে? এটা কি আপনাদের দেওয়া নাম, নাকি তাদের কাছ থেকেই পাওয়া?
প্রফেসর ধীরে ধীরে চশমাটা খুললেন। পকেট থেকে একটি রুমাল বের করে চশমার কাচ মুছতে মুছতে বললেন,
— তোমার নাম কী, মেয়ে?
সুনেহরা একটু লজ্জা পেয়ে সাদমানের পেছনে মুখ লুকিয়ে বলল,
— আমি সুনেহরা।
প্রফেসর আবার চশমাটা চোখে পরে মুচকি হাসলেন।
— বাহ! খুব মিষ্টি নাম তোমার মতোই। আচ্ছা শোনো সুনেহরা, তোমার প্রশ্নটা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তোমরা আসার পর থেকে সবাই শুধু হেরিফেলো সম্পর্কে জানতে চেয়েছ। কিন্তু হেরিফেলো নামটি কোথা থেকে এসেছে, সেটা কেউ জানতে চাওনি।
সাদমান মৃদু হেসে বলল,
— দাদু, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী মহীয়সী নারী হচ্ছে সুনেহরা।
কথাটা শেষ হতেই ঘরের সবাই হেসে উঠল।
লজ্জায় সুনেহরার গাল লাল হয়ে গেল। সে আরও একটু সরে গিয়ে সাদমানের পেছনে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল এবং তার শার্টটা হাত দিয়ে চেপে ধরে বসে রইল।
প্রফেসরও হেসে বললেন,
— আচ্ছা, তাহলে জ্ঞানী মেয়েটার প্রশ্নের উত্তর দিই।
তিনি একটু গম্ভীর হয়ে বললেন,
— হেরিফেলো নামটি সর্বপ্রথম জানতে পেরেছিলেন গোয়েন। তোমরা জানো, সে যে বইটি লিখেছিল, তার নাম ছিল দ্য হেরিফেলো।
প্রফেসর ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন,
— আমাদের গবেষণায় জানা যায়, ষোড়শ শতকে কয়েকজন স্প্যানিশ সৈন্য জাবালি ভ্যালির আশপাশে একজন অদ্ভুত মানুষকে খুঁজে পায়।
লোকটি একটি গাছের নিচে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিল।
তার চেহারা, পোশাক এবং অস্বাভাবিক উজ্জ্বল ত্বক দেখে সৈন্যরা ভীষণ অবাক হয়ে যায়। তাদের কাছে লোকটির সবকিছুই অপরিচিত মনে হয়েছিল।
সৈন্যরা তাকে বন্দি করে নিয়ে যায়।
লোকটি ছিল বেশ বয়স্ক। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় স্প্যানিশ সেনা দপ্তরে।
সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল—
লোকটি স্প্যানিশ ভাষা জানত।
পরে জানা যায়, সে হেরিফেলোদের একজন পণ্ডিত। এমনকি সে হেরিফেলোর রাজদরবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ পণ্ডিত ছিল।
সেই লোকটির কাছ থেকেই পৃথিবীর মানুষ প্রথমবারের মতো হেরিফেলো সম্পর্কে জানতে পারে।
প্রফেসর একটু থামলেন।
তারপর বললেন,
— গোয়েন হেরিফেলো থেকে ফিরে আসার পর বহু মানুষকে তার অভিজ্ঞতার কথা বলেছিল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তার কথা বিশ্বাস করেনি।
কারণ তার গল্প এতটাই অসম্ভব ছিল যে সাধারণ মানুষের কাছে সেটাকে কল্পকাহিনি ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি।
তবে গোয়েন থেমে যায়নি।
সে বছরের পর বছর হেরিফেলো নিয়ে গবেষণা করেছে। বহুবার জাবালি ভ্যালিতে গিয়েছে।
কিন্তু যে গাছের নিচ দিয়ে সে হেরিফেলোতে প্রবেশ করেছিল, সেই গাছ আর কখনো খুঁজে পায়নি।
যেন গাছটি পৃথিবীর বুক থেকেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।
পরবর্তীতে গোয়েন তৎকালীন সময়ের একজন লেখকের কাছ থেকে স্প্যানিশ সৈন্যদের সেই ঘটনার কথা জানতে পারে।
সেখান থেকেই সে প্রথম ‘হেরিফেলো’ নামটি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়।
কিন্তু হেরিফেলোতে প্রবেশের সেই গাছ বা পথের কোনো সন্ধান সে আর কখনো পায়নি।
শেষ পর্যন্ত রহস্যটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে গোয়েন দ্য হেরিফেলো বইটি লিখেছিল।
তবে বইটি সে প্রকাশ করেনি।
বইটি সে নিজের বংশধরদের জন্য রেখে যায়।
তিতলি আর অপেক্ষা করতে না পেরে বলে উঠল,
— দাদু! মাহমুদ দাদা কি সেই গাছ বা প্রবেশপথ খুঁজে পেয়েছিলেন?
প্রফেসর তিতলির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— হ্যাঁ মেয়ে। আমি ঠিক সেই দিকেই যাচ্ছি। একটু ধৈর্য ধরো।
প্রফেসর আবার বলতে শুরু করলেন,
— আমরা তিন বছর ধরে হেরিফেলো নিয়ে গবেষণা করেছিলাম। সেই স্প্যানিশ সৈন্যরা যে হেরিফেলোর মানুষটিকে বন্দি করেছিল, তাদের সম্পর্কে তৎকালীন সময়ের অনেক নথি, সেনাদের নাম-পরিচয় এবং মামলার কাগজপত্র স্পেনের সরকারি আর্কাইভে সংরক্ষিত ছিল।
আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আমরা স্পেন সরকারের কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলাম।
তবে পুরো গবেষণাটিই অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে পরিচালিত হয়েছিল।
রবিন তখন প্রশ্ন করল,
— দাদু, ওই হেরিফেলোর লোকটাকে স্প্যানিশ সৈন্যরা পরে কী করেছিল?
প্রফেসরের মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।
— তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
ঘরের পরিবেশ আবার ভারী হয়ে উঠল।
প্রফেসর কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন,
— ১৯৯৩ সালে আমার ছেলে শাওন মারা যায়।
এই কথাটি বলতে গিয়ে প্রফেসরের কণ্ঠে হঠাৎ ভারী বিষাদের ছাপ ফুটে উঠল।
— তার অকালমৃত্যুর খবর শুনে মনে হয়েছিল, আমার বুকের ওপর যেন বিশাল একটা পাথর এসে পড়েছে।
আমি মাহমুদকে বলেই গবেষণা ছেড়ে দেশে ফিরে আসি।
দেশে ফিরে আমি আর হেরিফেলো নিয়ে গবেষণা করতে চাইনি।
অন্যদিকে মাহমুদ ও তার দল আমাজনের জাবালি ভ্যালিতে যায়।
আর সেখানেই...
সে সেই গাছটি খুঁজে পায়।
সাদমান আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে দ্রুত বলে উঠল,
— মাফ করবেন দাদু! দাদা গাছটা কীভাবে খুঁজে পেল?
প্রফেসর সাদমানের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকালেন।
— সাদমান! আমরা স্পেন সরকারের কাছ থেকে যে মূল্যবান তথ্যগুলো পেয়েছিলাম, সেখানেই ওই গাছটির বিস্তারিত বিবরণ ছিল।
সাদমান সঙ্গে সঙ্গে আবার প্রশ্ন করল,
— স্পেন ওই গাছটির বিবরণ কীভাবে জানল? আর যদি তারা জানত, তাহলে স্পেন নিজেরাই হেরিফেলোর খোঁজ করল না কেন?
প্রফেসর এবার মৃদু হাসলেন।
— তোমার প্রশ্নটা খুবই যৌক্তিক, সাদমান। আর এর উত্তরও আমার কাছে আছে।
তিনি বললেন,
— যে হেরিফেলোর মানুষটিকে স্প্যানিশ সৈন্যরা বন্দি করেছিল, তার কাছ থেকে তারা ওই গাছটির বিস্তারিত বিবরণ জেনে নেয়। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল—তারা সেই লোকটিকে শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখেনি।
সাদমান চুপ হয়ে গেল।
প্রফেসর আবার বললেন,
— পরবর্তীতে স্প্যানিশরা জাবালি ভ্যালিতে হেরিফেলোর খোঁজে বহু অভিযান চালায়। কিন্তু তারা সেই গাছটি আর খুঁজে পায়নি।
যুগের পর যুগ স্পেনের শাসক বদলেছে। ক্ষমতা বদলেছে। কিন্তু হেরিফেলোর সেই গাছ ও প্রবেশপথের সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
তবুও তারা সফল হয়নি।
প্রফেসর গভীর শ্বাস নিলেন।
— আমি দেশে ফিরে আসার পর মাহমুদ আমাকে অনেক চিঠি লিখেছিল। গবেষণায় ফিরে যাওয়ার জন্য বহুবার অনুরোধ করেছিল।
কিন্তু আমি আর ফিরিনি।
আমার ছেলের মৃত্যুর শোক আমি বহু বছরেও কাটিয়ে উঠতে পারিনি।
পরে আবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে আবার চাকরি শুরু করি।
ধীরে ধীরে আমার জীবন স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
সময়টা ১৯৯৫ সাল।
সেই বছর আমি এমন একটি তথ্য পেয়েছিলাম, যা মাহমুদের গবেষণার পুরো মোড় বদলে দিতে পারত।
তিতলি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— কী পেয়েছিলেন, দাদু?
প্রফেসর বললেন,
— একদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিটিশ আমলের একটি পুরোনো গ্রন্থাগারে গিয়েছিলাম। সেখানে সচরাচর কেউ যেত না। বেশিরভাগ সময়ই গ্রন্থাগারটি তালাবদ্ধ থাকত।
আমি ভেতরে গিয়ে পুরোনো বইগুলোর তাক ঘাঁটতে শুরু করি।
ধুলোর মোটা আস্তরণ সরিয়ে কয়েকটি ব্রিটিশ আমলের বই খুঁজে পাই।
বইগুলো ছিল মূলত স্প্যানিশ ভাষার পুরোনো গ্রন্থ, যেগুলো পরবর্তীতে ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছিল।
তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ছুটি চলছিল।
তাই ভাবলাম, ছুটির সময় বইগুলো পড়ে দেখব।
সেগুলোর মধ্যে আমাজন অরণ্য নিয়ে একটি বই ছিল।
বইটির নাম—
দ্য ফেইল্ড অব আমাজন।
বইটিতে একটি অধ্যায় ছিল—
Extrañando a Herifelo
যার ইংরেজি অর্থ দাঁড়ায় Missing Herifelo—বাংলায় বলা যায়, নিখোঁজ হেরিফেলো।
আমি সেই অধ্যায়টি পড়তে শুরু করি।
আর সেখানেই এমন একটি তথ্য পাই, যা আমার পুরো চিন্তাধারা বদলে দেয়।
Extrañando a Herifelo
---- আমাজনের গভীর অরণ্য পৃথিবীর এমন এক রহস্য, যার সবটুকু আজও মানুষের জানা হয়নি। বিশাল এই অরণ্যের কোথাও কোথাও এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে, যেখানে মানুষের পদচিহ্ন প্রায় নেই বললেই চলে। সেখানে এমন কিছু গাছ, নদী, গুহা ও অজানা পথ রয়েছে, যেগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কখনো জানতে পারেনি।
কিন্তু আমাজনের সবচেয়ে বড় রহস্য কোনো গাছ, নদী কিংবা গুহা নয়।
তার নাম— হেরিফেলো।
হেরিফেলোকে পৃথিবীর প্রচলিত কোনো উপজাতির সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তারা নিজেদের একটি পৃথক জাতি হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের রয়েছে নিজস্ব রাজ্য, নিজস্ব আইন, নিজস্ব সামাজিক ব্যবস্থা, নিজস্ব ভাষা এবং নিজস্ব মুদ্রা। তাদের রাজ্য কোনো প্রচলিত মানচিত্রে চিহ্নিত করা হয়নি।
তাদের অবস্থান সম্পর্কে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তার প্রায় সবই এসেছে এমন কিছু মানুষের কাছ থেকে, যারা দুর্ঘটনাক্রমে তাদের জগতের সন্ধান পেয়েছিল।
তাদের কেউ আর ফিরে আসেনি।
কেউ ফিরে এসে আর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেনি।
আর যারা তাদের সম্পর্কে লিখে গেছে, তাদের অধিকাংশের লেখাকে পরবর্তীতে কল্পকাহিনি বলে ধরে নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু পুরোনো নথি, সাক্ষ্য এবং বিভিন্ন সময়ের বিচ্ছিন্ন তথ্য একত্র করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
হেরিফেলো বাস্তব।
তারা আমাজনের জাবালি ভ্যালির আশপাশে বসবাস করে বলে ধারণা করা হয়। তবে তাদের রাজ্যের সঠিক অবস্থান আজও অজানা।
হেরিফেলোদের সভ্যতা পৃথিবীর প্রচলিত সভ্যতার তুলনায় অনেক আলাদা। তাদের স্থাপত্য, পোশাক, চিকিৎসাব্যবস্থা, অস্ত্র এবং যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে যেসব বর্ণনা পাওয়া গেছে, তার কিছু এতটাই উন্নত যে সেগুলোকে বহু শতাব্দী আগের কোনো মানবসভ্যতার সঙ্গে মেলানো কঠিন।
তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের রাজবংশ।
হেরিফেলোদের বিশ্বাস, তাদের রাজবংশের মানুষের শরীরে একটি বিশেষ রক্তধারা রয়েছে।
তারা এই রক্তধারাকে বলে—
রাজরক্ত।
রাজরক্ত শুধু বংশপরিচয়ের বিষয় নয়। তাদের কাছে এটি রাজত্বের অধিকার।
হেরিফেলোদের সিংহাসনে যে ব্যক্তি বসবে, তার শরীরে অবশ্যই সেই রাজরক্ত থাকতে হবে।
একজন সাধারণ মানুষ যত শক্তিশালী কিংবা জ্ঞানীই হোক না কেন, সে তাদের রাজা হতে পারবে না।
রাজরক্তের সঙ্গে সম্পর্কিত সবচেয়ে রহস্যময় বস্তু হলো হেরিফেলোদের রাজার মুকুট।
এটি কোনো সাধারণ রাজমুকুট নয়।
মুকুটটি একটি নির্দিষ্ট রাজবংশের মানুষের জন্য তৈরি। অন্য কেউ এটি ধারণ করার চেষ্টা করলে কী ঘটে, তার নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে প্রাচীন নথিতে এমন কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ আছে, যেখানে রাজরক্তের অধিকারী ছাড়া অন্য কেউ মুকুট স্পর্শ করার পর ভয়ংকর পরিণতির শিকার হয়েছে।
হেরিফেলোদের রাজমুকুটের সবচেয়ে অদ্ভুত ক্ষমতার কথা পাওয়া যায় তাদের পুরোনো রাজদরবারের নথিতে।
সেখানে বলা হয়েছে, মুকুটটি মৃত মানুষের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে।
এমন ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায় যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত কয়েকজন রাজসৈন্যকে রাজদরবারে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। রাজা তাদের সামনে মুকুট নিয়ে দাঁড়ান এবং নির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুকুটের শক্তি প্রয়োগ করেন।
এরপর মৃত সৈন্যদের শরীরে আবার প্রাণের লক্ষণ দেখা যায়।
এই ঘটনা সত্য কিনা তা পৃথিবীর কোনো বিজ্ঞানী নিশ্চিত করতে পারেনি।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, একই ধরনের ঘটনার উল্লেখ হেরিফেলোদের একাধিক পুরোনো নথিতে পাওয়া যায়।
তাই ধারণা করা হয়, মুকুটের সঙ্গে হেরিফেলোদের জীবনশক্তির কোনো গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
তবে মুকুটের ক্ষমতা এখানেই শেষ নয়।
হেরিফেলোদের সঙ্গে পৃথিবীর বাইরের কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর যোগাযোগ ছিল বলে যে ধারণা করা হয়, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণও এই মুকুটের সঙ্গে সম্পর্কিত।
পুরোনো নথিতে আকাশ থেকে আসা কিছু অদ্ভুত প্রাণী ও উড়ন্ত যানের উল্লেখ পাওয়া যায়।
তাদের কোনোটি পৃথিবীর পরিচিত কোনো প্রাণীর সঙ্গে মেলে না।
তাদের যানগুলোও পৃথিবীর কোনো প্রচলিত প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তারা হেরিফেলোদের সঙ্গে যোগাযোগ করত এবং তাদের বিভিন্ন ধরনের জ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রদান করত বলে ধারণা করা হয়।
হেরিফেলোদের উন্নত চিকিৎসা, অদ্ভুত অস্ত্র, শক্তির উৎস এবং কিছু বিশেষ প্রযুক্তির পেছনে এই অজানা প্রাণীদের অবদান ছিল বলে পুরোনো নথিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
কিন্তু তারা কেন হেরিফেলোদের সাহায্য করত, তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
হেরিফেলোরা তাদের কী নামে ডাকত, সেটিও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
তবে কিছু অনুবাদিত নথিতে তাদের বলা হয়েছে—
আকাশের অতিথি।
হেরিফেলোদের আরেকটি রহস্য তাদের আধ্যাত্মিক জ্ঞান।
তারা এমন কিছু আচার ও প্রাচীন বিদ্যার চর্চা করত, যা পৃথিবীর প্রচলিত বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
তাদের কিছু পণ্ডিত বিশ্বাস করত, মানুষের শরীর ও পৃথিবীর দৃশ্যমান জগতের বাইরেও কিছু অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্ব রয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু আচার ও পদ্ধতির মাধ্যমে সেই শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব।
পৃথিবীর মানুষ পরবর্তীতে এসবকে কালো জাদু বলে অভিহিত করেছে।
কিন্তু হেরিফেলোদের কাছে এটি ছিল একটি বিশেষ জ্ঞান।
তাদের প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে এ বিষয়ে একটি সতর্কবার্তা পাওয়া যায়—
“যে শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, একদিন সেই শক্তিই তাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।”
হেরিফেলোদের ইতিহাসে সবচেয়ে রহস্যময় বিষয় হলো তাদের রাজমুকুটের ভবিষ্যৎ।
একটি পুরোনো পাণ্ডুলিপিতে লেখা আছে—
“যেদিন বাইরের রক্তধারার কেউ রাজমুকুটের অধিকার দাবি করবে, সেদিন হেরিফেলোর দ্বার পৃথিবীর জন্য উন্মুক্ত হবে।”
এই বাক্যের অর্থ কী, তা কেউ জানে না।
তবে তার পরের কয়েকটি লাইন আরও রহস্যময়।
“রাজরক্ত ফিরে আসবে।
মুকুট তার অধিকারীকে চিনবে।
আর তখন হেরিফেলোর ভাগ্য পরিবর্তিত হবে।”
কে সেই রাজরক্তের উত্তরাধিকারী?
কোথা থেকে সে আসবে?
আর কেন তার আগমনের সঙ্গে হেরিফেলোর ভাগ্য পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে?
এর কোনো উত্তর নেই।
হেরিফেলোর সন্ধানে বহু মানুষ আমাজনে প্রবেশ করেছে।
কেউ নিখোঁজ হয়েছে।
কেউ আর কখনো ফিরে আসেনি।
কেউ ফিরে এসে শুধু একটি কথাই বলেছে—
“ওরা আমাদের দেখছে।”
একজন স্প্যানিশ সৈন্যের বহু পুরোনো নথিতে লেখা আছে—
“আমরা অরণ্যের মধ্যে একটি অদ্ভুত গাছ দেখতে পেয়েছিলাম। গাছটির নিচে কোনো সাধারণ গর্ত ছিল না। মনে হচ্ছিল, মাটির নিচে একটি পথ চলে গেছে। পথটির শেষ কোথায়, আমরা জানতাম না।
আমরা সেই পথ দিয়ে এগিয়ে যাই।
কিছু দূর যাওয়ার পর চারপাশের পৃথিবী বদলে যায়।
আকাশের রং বদলে যায়।
মাটির রং বদলে যায়।
আর আমরা এমন এক নগরী দেখতে পাই, যা পৃথিবীর কোনো নগরীর সঙ্গে তুলনা করা যায় না।
সেখানে যারা বাস করত, তারা আমাদের মতোই দেখতে ছিল।
কিন্তু তারা আমাদের মতো ছিল না।”
এরপর নথির ভাষা অস্পষ্ট হয়ে গেছে।
শেষের দিকে মাত্র কয়েকটি বাক্য পড়া যায়—
“তারা আমাদের ভাষা বোঝেনি।”
“তাদের কাছে এমন অস্ত্র ছিল, যার সামনে আমাদের অস্ত্র অর্থহীন।”
“তাদের রাজা এসেছিলেন।”
“তার মাথায় ছিল সেই মুকুট।”
এরপর দীর্ঘ সময় কোনো লেখা নেই।
শেষ পাতার নিচের দিকে কাঁপা হাতে লেখা কয়েকটি বাক্য পাওয়া যায়—
“হেরিফেলোকে খুঁজো না।”
“যদি প্রবেশপথ খুঁজে পাও, ফিরে এসো।”
“রাজমুকুট পৃথিবীতে নিয়ে আসা যাবে না।”
তারপর যেন বহু বছর পরে অন্য কেউ সেই পাতায় আরও একটি বাক্য লিখেছিল—
“কিন্তু যদি রাজরক্ত ফিরে আসে?”
এর নিচে কোনো উত্তর নেই।
শুধু একটি প্রতীক।
একটি মুকুট।
মুকুটটির নিচে অজানা ভাষায় লেখা একটি বাক্য।
অনুবাদ করলে যার অর্থ দাঁড়ায়—
“হারিয়ে যাওয়া রাজা ফিরে আসবে।”
আর তারও নিচে ছিল শেষ একটি সতর্কবার্তা—
“যেদিন সে ফিরে আসবে, সেদিন হেরিফেলোর দরজা আর বন্ধ থাকবে না।”
তারপর—
আর কোনো লেখা নেই।-----
এই ছিল Extrañando a Herifelo নামক অধ্যায়টি।
সুনেহরা আর অপেক্ষা করতে পারল না।
— সরি দাদু! দ্য ফেইল্ড অব আমাজন বইটা কি এখনো আপনার কাছে আছে?
প্রফেসর মুচকি হাসলেন।
— সুনেহরা, একটু ধৈর্য ধরো। সব জানতে পারবে।
তারপর তিনি রহিমা খাতুনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
— বাচ্চাদের জন্য একটু চা-নাশতা নিয়ে আসো।
রহিমা খাতুন উঠে চলে গেলেন।
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এলো।
প্রফেসর সাদমানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— সাদমান, তোমার হাতে যে চিঠিটা আছে, সেটা আমি তখনই লিখেছিলাম।
সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাল।
এবার যেন চিঠিটির আসল রহস্য কিছুটা পরিষ্কার হতে শুরু করল।
সাদমান বলল,
— দাদু, ওই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা কী ছিল?
কিছুক্ষণ পর রহিমা খাতুন চা ও নাশতা নিয়ে ফিরে এলেন।
এক কাপ চা প্রফেসরের হাতে দিয়ে তিনি একে একে সবার হাতে চা তুলে দিলেন।
প্রফেসর চায়ে চুমুক দিয়ে ধীরে ধীরে বললেন,
— আমি Extrañando a Herifelo অধ্যায় থেকে আরো জানতে পারি, হেরিফেলোর রাজার মুকুট চুরি করা সম্ভব।
পুরো ঘর যেন মুহূর্তের জন্য জমে গেল।
সবার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
প্রফেসর আবার চায়ে চুমুক দিলেন।
— আমি আরো বিভিন্ন পুরো নথি ঘেটে দেখি ওই মুকুটের ক্ষমতা সাধারণ কোনো রাজমুকুটের মতো নয়। সেটির সাহায্যে পৃথিবীর বাইরের প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব বলে ওই বইয়ে উল্লেখ ছিল।
তিনি একটু থেমে বললেন,
— তবে মুকুটটি চুরি করা এত সহজ নয়, বাচ্চারা।
রবিন বলল,
— কঠিন হবে, সেটা তো আমরাও বুঝলাম দাদু। তবে সত্যিই কি এলিয়েনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব ছিল?
প্রফেসর বললেন,
— আমাদের কাছে থাকা তথ্য অন্তত সেটাই ইঙ্গিত দেয়।
রবিন আবার প্রশ্ন করল,
— আর নানা মাহমুদ? আপনার চিঠি পাওয়ার পর কি তিনি দেশে ফিরেছিলেন?
— হ্যাঁ।
প্রফেসর বললেন,
— আমার চিঠি পাওয়ার কিছুদিন পরই মাহমুদ দেশে ফিরে আসে।
আমি তার সঙ্গে দেখা করতে যাই তোমাদের শেখ নিবাসে।
সেখানে গিয়ে আমি তাকে পুরো ঘটনা খুলে বলি।
দ্য ফেইল্ড অব আমাজন বইয়ে একটি ‘রাজরক্ত’-এর কথা বলা হয়েছিল।
আর একটি ভয়ংকর বিষয়ও সেখানে উল্লেখ ছিল—
হেরিফেলোরা অন্ধকার আচার ও কালো জাদুর চর্চায় অত্যন্ত দক্ষ ছিল।
এই তথ্যটিও আমি আরি বিভিন্ন নথি থেকে জানতে পারি।
আমি মাহমুদকে সব খুলে বলি।
এরপর রাজরক্তের বিষয়টি নিয়ে কয়েক মাস গবেষণা করি।
পরে জানতে পারি, এই ‘রাজরক্ত’ বলতে কোনো এক বিশেষ রাজবংশের বংশধারাকে বোঝানো হয়েছে।
কিন্তু সেই রক্তের প্রকৃত ক্ষমতা কী, সে সম্পর্কে তখনও আমাদের কোনো পরিষ্কার ধারণা ছিল না।
এরপর আমি আর মাহমুদ দেশেই গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে থাকি।
কিন্তু তখন মাহমুদের মাথায় নতুন একটি পরিকল্পনা আসে।
প্রথমে আমি সেটা বুঝতে পারিনি।
পরে বুঝলাম—
মাহমুদের মাথায় হেরিফেলোর রাজার মুকুট চুরির পরিকল্পনা ঘুরছে।
আমি তাকে বহুবার নিষেধ করেছিলাম।
আমি বলেছিলাম,
— আমরা গবেষণা করছি। গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করব, প্রবন্ধ লিখব, সম্মাননা পাব—আমাদের সবকিছু কাগজে-কলমেই হবে। আমরা সরাসরি কোনো চুরির সঙ্গে জড়াতে পারি না মাহমুদ।
কিন্তু তখন মাহমুদের মনে লোভ ঢুকে গেছে।
সে আমাকে বিভিন্নভাবে বোঝাতে লাগল যে আমাদের এই কাজটা করতেই হবে।
আমি মাহমুদকে খুব ভালো করেই চিনতাম।
সে কোনো সিদ্ধান্ত একবার নিয়ে ফেললে সহজে পিছিয়ে আসত না।
আমি তাকে বললাম,
— বন্ধু, শোন। কাজটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমি বলব, সেখানে যাওয়া তোর ভুল সিদ্ধান্ত হবে। হেরিফেলোদের কাছে অনেক উন্নতমানের অস্ত্র রয়েছে। তোরা তাদের সামনে এক মুহূর্তও টিকতে পারবি না।
মাহমুদ তখন বড় করে এক অদ্ভুত হাসি হাসল।
তারপর বলল,
— ফয়েজ! আমি এমন কিছু পেয়েছি, যা সম্পর্কে তুই এখনো জানিস না।
আমি অবাক হয়ে বললাম,
— কী পেয়েছিস মাহমুদ?
মাহমুদ বলল,
— তোর চিঠি পাওয়ার প্রায় এক বছর আগে আমি আর আমার দল জাবালি ভ্যালিতে গিয়েছিলাম।
আমরা সেই গাছটা খুঁজে বের করেছিলাম।
কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করার সাহস পাইনি।
আমরা সেখানে কয়েকটি চিহ্ন রেখে ফিরে আসি।
এরপর আমি হেরিফেলো নিয়ে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখেছিলাম।
প্রবন্ধটি জমা দেওয়ার আগের দিনই তোর চিঠি পাই।
তারপর তোকে অনুসরণ করে আমি এখানে চলে আসি।
আর তোর কাছ থেকে মুকুটের কথা শোনার পর আমি বিষয়টা নিয়ে আরও গবেষণা করি।
মাহমুদ আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ফয়েজ, আমি এমন কিছু জানতে পেরেছি, যা শুনলে তুই আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে যাবি।
আমি অবাক হয়ে শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
— কী জানতে পেরেছিস তুই?
মাহমুদ আবার উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করল।
তারপর বলল,
— ফয়েজ! আমি হব হেরিফেলোর পরবর্তী রাজা।
আমার মনে হলো, যেন মুহূর্তের মধ্যে আকাশটা আমার মাথার ওপর ভেঙে পড়েছে।
আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— মানে? কী আবোল-তাবোল বলছিস তুই?
মাহমুদ শুধু হাসতেই থাকল।
তার হাসির মধ্যে তখন এমন কিছু ছিল, যা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল।
আমি বললাম,
— মাহমুদ, প্লিজ বল! কী জানতে পেরেছিস তুই? আর কীভাবে হেরিফেলোর রাজা হবি?
অবশেষে মাহমুদ হাসি থামাল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— আমি তোর বলা সেই রাজরক্ত নিয়ে অনেক খোঁজ করেছি।
সে আমার চোখের দিকে তাকাল।
— ওই রাজরক্ত আমার শরীরেও আছে।
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম,
— তাতে কী?
মাহমুদ বলল,
— আমি জমিদার বংশের উত্তরসূরি। আমার রক্তেও সেই রাজবংশের উত্তরাধিকার রয়েছে।
আমি তখনও কিছু বুঝতে পারছিলাম না।
মাহমুদ আবার বলল,
— আমাকে একটা বিশেষ আচার সম্পন্ন করতে হবে। সেই আচারের মাধ্যমে হেরিফেলোর পুরোনো শক্তির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করা সম্ভব হবে। তারপর আমি হেরিফেলোতে গিয়ে নিজেকে রাজবংশের উত্তরসূরি হিসেবে দাবি করতে পারব।
আমি স্তব্ধ হয়ে তার কথা শুনছিলাম।
তারপর বললাম,
— আচ্ছা, ধরলাম তোর কথা সত্যি। কিন্তু তুই হেরিফেলোতে প্রবেশ করলেই ওরা তোকে হত্যা করবে। তুই তাদের ভাষাও জানিস না। কীভাবে তাদের রাজা হবি?
মাহমুদ শান্তভাবে বলল,
— বন্ধু ফয়েজ, সবকিছুই ওই আচার আর রাজরক্তের ওপর নির্ভর করছে। যদি আমার ধারণা ঠিক হয়, তারা আমাকে রাজবংশের উত্তরসূরি হিসেবে গ্রহণ করবে।
আমি বললাম,
— আচ্ছা, ধরলাম সবকিছু তোর পরিকল্পনা অনুযায়ী হলো। তুই হেরিফেলোর রাজাও হয়ে গেলি। তারপর?
মাহমুদ মৃদু হেসে বলল,
— ফয়েজ, এখানে আমার ধনসম্পদের কোনো অভাব নেই। কিন্তু আমি পৃথিবীর জন্য এমন কিছু করতে চাই, যার কারণে মানুষ আমাকে চিরকাল মনে রাখবে।
— মানে? বুঝলাম না।
— মানে, আমি রাজা হওয়ার পর সেই মুকুটটা নিজের করে নেব। তারপর সেটা পৃথিবীতে নিয়ে এসে পৃথিবীর বাইরের প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগ করব।
আমি এতক্ষণ ভেবেছিলাম, মাহমুদ শুধু রাজা হওয়ার লোভে হেরিফেলোতে যেতে চায়।
কিন্তু না।
তার লক্ষ্য ছিল আরও বড়।
সে পৃথিবীর বাইরের প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছিল।
সুনেহরা হঠাৎ বলে উঠল,
— তার মানে আমার নানা কি সত্যিই হেরিফেলোর রাজা হয়েছেন? তিনি কি এখনো বেঁচে আছেন?
প্রফেসর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— সেই সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই, সুনেহরা।
ঘরের পরিবেশ আবার ভারী হয়ে উঠল।
ইকবাল এবার বলল,
— দাদু, আপনি যে চিঠিটা নানা মাহমুদকে লিখেছিলেন, সেখানে বলেছিলেন আপনার গবেষণাগার থেকে কিছু কাগজপত্র চুরি হয়েছে। তার মানে কি আরও কেউ হেরিফেলো সম্পর্কে জেনে গিয়েছিল?
প্রফেসর মৃদু হাসলেন।
— না, ইকবাল। সেটা আমার ভুল ছিল। কিছু কাগজপত্র হারিয়ে গিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো কেউ হেরিফেলোর ব্যাপারে জেনে গেছে। কিন্তু পরে সেই কাগজগুলো আমি নিজেই খুঁজে পাই।
সাদমান এবার আর অপেক্ষা করল না।
সে সামনে ঝুঁকে বলল,
— দাদু, তারপর কী হয়েছিল?
প্রফেসরের চোখে তখন অদ্ভুত এক ছায়া।
সাদমান আবার জিজ্ঞেস করল,
— দাদা কীভাবে হেরিফেলোতে গিয়েছিলেন? আপনিও কি সেখানে গিয়েছিলেন?
প্রফেসর দীর্ঘ একটা শ্বাস নিলেন।
কিছুক্ষণ তিনি সবার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
— সেই গল্পটাই সবচেয়ে কঠিন, সাদমান...
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
প্রফেসর আবার বলতে শুরু করলেন—
[চলবে...]