পর্ব : ০৬
প্রফেসর ফয়েজ আব্বাসের পুরো কক্ষে হঠাৎ সামান্য নীরবতা নেমে এলো।
ফয়েজ সাহেব তাঁর হুইলচেয়ারে ভর দিয়ে আরেকটু সাদমানদের দিকে এগিয়ে এলেন। কিছুক্ষণ তিনি গভীরভাবে সাদমানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত ভাবুকতা।
হঠাৎ তিনি বললেন,
— হেরিফেলো সম্পর্কে জানতে এসেছ?
সাদমান নিজের দৃষ্টি দৃঢ় করে বলল,
— হ্যাঁ। সেটা আপনি আমাদের দেখেই বুঝতে পেরেছেন।
প্রফেসর খিলখিল করে হেসে উঠলেন।
— সাদমান! একটা কথা জানো?
— কী?
— লোভ! লোভ মানুষকে ধ্বংস করে।
সাদমান কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলল,
— লোভ কে করেছিল, দাদা? আমার দাদা মাহমুদ শেখ?
— হ্যাঁ, সাদমান।
সাদমান মৃদু হেসে বলল,
— দাদা, আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন। আমার দাদা মাহমুদ শেখ জমিদার ছিলেন। যেমনটা বর্তমানে আমরা।
প্রফেসর আবারও খিলখিল করে হেসে উঠলেন।
— সাদমান! একজন সম্রাটের কাছে অঢেল সম্পদ থাকার পরও সে নতুন রাজ্য জয় করতে চায়। কেন জানো?
— কেন?
— আরও খ্যাতি, আরও সুনাম, আরও সম্মান।
সাদমান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আমার দাদাও কি একই লোভ করেছিলেন?
— হুম... কিছুটা তেমনই।
পাশ থেকে সুনেহরা বলে উঠল,
— দাদু! আমাদের হেরিফেলো সম্পর্কে বলুন না।
প্রফেসর মুচকি হাসলেন।
— বলব। তবে আমার একটা শর্ত আছে।
সুনেহরা আগ্রহ নিয়ে বলল,
— কী শর্ত, দাদু?
ফয়েজ সাহেব সাদমানের দিকে তাকালেন।
— সাদমান, শুনছ?
— হ্যাঁ, দাদু। বলুন, আপনার শর্ত কী?
— আমার শর্ত হচ্ছে, এতক্ষণ যে কথাটা বলছিলাম, সেটা।
— মানে?
— মানে লোভ। তোমার দাদার মতো একই ভুল তুমি করতে পারবে না। আমাকে ওয়াদা করতে হবে।
সাদমান উচ্চস্বরে হেসে উঠল।
— দাদা, আপনি নিশ্চিন্তে বলতে পারেন। আপনার শর্ত আমরা মেনে নিলাম।
প্রফেসর কিছুক্ষণ সাদমানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন সেই অভিশপ্ত অতীতের গল্প।
সময়টা ১৯৯০ সাল।
তখন তোমাদের দাদা মাহমুদের কাছ থেকে আমার কাছে একটি চিঠি আসে। চিঠিতে সে আমাকে আমেরিকায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়।
তখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন অধ্যাপক। মাহমুদ চিঠিতে লিখেছিল, আমি যেন চাকরি ছেড়ে তার কাছে চলে যাই। সে নাকি এমন একটি গবেষণায় জড়িয়ে পড়েছে, যেখানে আমার প্রয়োজন।
মাহমুদকে আমি বহু বছর ধরে চিনতাম। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমরা একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি। তাই তার প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস ছিল।
চিঠি পাওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর আমি আমেরিকার টেক্সাসে পৌঁছাই। সেখানে মাহমুদ নিজেই আমাকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করে।
তখন মাহমুদ আমেরিকার একজন খ্যাতিমান গবেষক। সে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গেল।
আমাদের বয়স তখন খুব বেশি ছিল না। প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি।
মাহমুদের বাড়িতে গিয়ে আমি অবাক হয়ে গেলাম। পুরো বাড়িটা যেন অস্বাভাবিক রকমের ফাঁকা।
আমি আশা করেছিলাম সেখানে তোমাদের দাদি এবং তোমার বাবা খাইরুলকে দেখব।
মাহমুদকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করেছিলাম। কিন্তু সে বিভিন্ন কথা বলে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেল।
শেষ পর্যন্ত আমি বললাম,
— আচ্ছা, এবার বল তো মাহমুদ! কী এমন বড় প্রজেক্ট নিয়ে পড়েছিস যে আমাকে চাকরি ছেড়ে এখানে চলে আসতে বললি?
মাহমুদের চোখে তখন তীব্র আনন্দের ঝলক দেখতে পেয়েছিলাম।
সে বলল,
— ফয়েজ, তোকে চিঠিতে পুরো ঘটনা বলা সম্ভব ছিল না। কিন্তু শোন! আমি এমন কিছুর খোঁজ পেয়েছি, যা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে সক্ষম।
আমি ভীষণ অবাক হয়েছিলাম।
আমার জানা মতে মাহমুদ কখনো কোনো গবেষণা নিয়ে অযথা পাগলামি করত না। কিন্তু সেদিন তার চোখে আমি অন্য কিছু দেখেছিলাম।
সে যেন নিজের আবিষ্কারের উত্তেজনায় নিজেকেই সামলাতে পারছিল না।
আমি বললাম,
— কী খোঁজ পেয়েছিস মাহমুদ? আমাকে বল।
মাহমুদ সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর আমাকে নিয়ে গেল তার গবেষণাকক্ষে।
গবেষণাকক্ষের চারপাশ ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলাম। দেয়ালজুড়ে অসংখ্য পুরোনো মানচিত্র, বই, নথি আর অচেনা কিছু চিহ্ন আঁকা কাগজ ঝুলছিল।
মাহমুদ দরজা বন্ধ করে আমার দিকে তাকাল।
তারপর বলতে শুরু করল,
— শোন ফয়েজ! গত মাসে আমি পেরুর ইকিটোস শহরে গিয়েছিলাম ছোট একটা গবেষণার কাজে। গবেষণার বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে স্থানীয় একজন বয়স্ক লোকের কাছে যাই। তার নাম লুইস।
প্রফেসর একটু থামলেন।
সবার মনোযোগ তার দিকে আছে কি না একনজর দেখলেন।
তিনি আবার বললেন,
— লুইসের বয়স প্রায় একশ বিশ বছরের কাছাকাছি। আমার ঊর্ধ্বতনদের কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম, লোকটি বহু বছর ধরে আমাজনের গভীর অরণ্যে বিভিন্ন গবেষণা করেছে। এমনকি সে আমাজনের সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলগুলোর একেবারে গভীর অংশ পর্যন্ত গিয়েছিল বলে জানা যায়।
লুইসের সঙ্গে আমি অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। একপর্যায়ে সে আমাকে হেরিফেলোর কথা বলে।
লুইস জীবনে বহু প্রাচীন উপজাতির সঙ্গে সরাসরি দেখা করেছে। এমনকি কয়েকবার তাদের হাতে বন্দি হওয়ার অভিজ্ঞতাও তার হয়েছিল।
কিন্তু হেরিফেলোর খোঁজ সে কখনো পায়নি।
তবে সে আমাকে একটি বই দিয়েছিল।
দ্য হেরিফেলো।
লুইস বলেছিল, বইটি তার দাদা গোয়েনের লেখা।
লুইস তখন জীবনের শেষ প্রান্তে। তাই সে চেয়েছিল, কেউ যেন এই রহস্যের উদ্ঘাটন করে।
মাহমুদ আমাকে সেই বইটি দেখাল।
আমি মন দিয়ে তার সব কথা শুনছিলাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— মাহমুদ! তাহলে এই বইয়ে তুই কী পেলি?
মাহমুদ বলল,
— বইটা স্প্যানিশ ভাষায় লেখা। আমার বন্ধু মার্ককে দিয়ে আমি লেখাগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করিয়েছি।
ইকবাল তখন আর নিজেকে সামলাতে না পেরে প্রফেসরকে থামিয়ে দিল।
— মাফ করবেন, দাদু! আমার কৌতূহল একটু বেশি। মাহমুদ দাদা কি সত্যিই হেরিফেলোর খোঁজ পেয়েছিলেন?
প্রফেসর মৃদু হাসলেন।
— তোমার নাম কী?
— ইকবাল।
— ইকবাল! তোমার কৌতূহল খুবই স্বাভাবিক। আমি বলছি। মন দিয়ে শোনো, তাহলে সব বুঝতে পারবে।
প্রফেসর আবার তাঁর গল্পে ফিরে গেলেন।
মাহমুদ তখন বলেছিল,
— হ্যাঁ ফয়েজ, আমি বইটার কিছু অংশ পড়েছি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— তো কী পেলি পড়ে?
মাহমুদ তখন আমাকে হেরিফেলো সম্পর্কে বলতে শুরু করল।
— হেরিফেলো হচ্ছে আমাদের মতোই একটি জাতি। তারা ব্রাজিলের আমাজনের বিখ্যাত জাবালি ভ্যালির আশপাশে কোথাও বসবাস করে। তবে ঠিক কোন জায়গায় তাদের বসতি, সে সম্পর্কে কারও নিশ্চিত ধারণা নেই। শোনা যায়, হেরিফেলোদের নিজস্ব একটি রাজ্য রয়েছে।
মাহমুদ কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল,
— ‘দ্য হেরিফেলো’ বইটি লিখেছেন লুইসের দাদা গোয়েন। লুইসের কাছ থেকে জানা গেছে, গোয়েন হেরিফেলোদের সেই রাজ্যের খোঁজ পেয়েছিলেন।
গোয়েন ছিলেন তৎকালীন পর্তুগিজ সামরিক বাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
তার নেতৃত্বে একসময় জাবালি ভ্যালির আশপাশে একটি বড় অভিযান পরিচালিত হয়।
এর কিছুদিন আগে কয়েকজন গবেষক জাবালি ভ্যালির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু এক মাস পেরিয়ে গেলেও তারা আর ফিরে আসেনি।
পর্তুগিজ গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে খবর আসে, স্থানীয় কোনো উপজাতি হয়তো তাদের বন্দি করেছে। এমনকি তাদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে আরও ভয়ংকর কিছু ঘটনার আশঙ্কাও করা হয়েছিল।
গোয়েন প্রায় এক হাজার সেনা নিয়ে অভিযানে বের হন।
সেই অভিযান খুব দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়।
বিভিন্ন উপজাতির সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ প্রাণ হারায়। আধুনিক অস্ত্রের সামনে স্থানীয় যোদ্ধারা খুব বেশি সময় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।
অবশেষে গোয়েনের বাহিনী জাবালি ভ্যালির আরও গভীরে প্রবেশ করতে থাকে।
একপর্যায়ে তার একজন সৈন্যের পা একটি বিশাল গাছের শিকড়ে আটকে যায়।
সৈন্যটি শিকড় থেকে পা ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই হঠাৎ চারপাশ কেঁপে উঠল।
মনে হলো যেন মাটির নিচে কোনো বিশাল শক্তি জেগে উঠেছে।
তারপর—
বিশাল গাছটি ধীরে ধীরে একপাশে সরে গেল।
গাছটির নিচে দেখা গেল একটি অন্ধকার গর্ত।
না...
গর্ত বলা ঠিক হবে না।
ওটা যেন মাটির নিচে চলে যাওয়া একটি প্রাচীন পথ।
সব সৈন্য হতভম্ব হয়ে গেল।
গোয়েন প্রথমে কাউকে ভেতরে যেতে দিতে চাইছিল না। কিন্তু কৌতূহল আর অভিযানের নেশা শেষ পর্যন্ত ভয়কে হার মানাল।
একজন একজন করে সৈন্য সেই অন্ধকার পথের ভেতরে প্রবেশ করতে লাগল।
সবশেষে গোয়েন নিজেও সেখানে ঢুকল।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর তারা এমন এক জায়গায় পৌঁছাল, যা পৃথিবীর কোনো পরিচিত ভূখণ্ডের সঙ্গে মেলানো সম্ভব নয়।
চারপাশ ঘন কুয়াশায় ঢাকা।
কিন্তু তারা যতই সামনে এগোতে লাগল, কুয়াশা ততই পাতলা হতে শুরু করল।
আর তারপর...
তারা যা দেখল, তা দেখে গোয়েনের পুরো দল স্তব্ধ হয়ে গেল।
আকাশের রং হালকা হলদেটে।
মাটির রং লালচে।
দিগন্তজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল অট্টালিকা—অচেনা স্থাপত্য, অদ্ভুত নকশা এবং এমন সব কাঠামো, যা গোয়েনের দেখা কোনো সভ্যতার সঙ্গে মেলে না।
মনে হচ্ছিল, তারা যেন পৃথিবীর ভেতর লুকিয়ে থাকা অন্য কোনো পৃথিবীতে এসে পড়েছে।
গোয়েন দ্রুত তার সৈন্যদের নির্দেশ দিল,
— যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকো সবাই।
সৈন্যরা অস্ত্র সামনে তাক করে ধীরে ধীরে এগোতে লাগল।
হঠাৎ তারা সামনে কিছু তরুণকে দেখতে পেল।
তাদের চেহারা ছিল আশপাশের পরিচিত উপজাতিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের পোশাকও ছিল অদ্ভুত—গোয়েন কিংবা তার সৈন্যদের কেউ আগে এমন পোশাক দেখেনি।
তাদের হাতে থাকা অস্ত্রও ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত।
গোয়েন হাত তুলে সৈন্যদের থামাল।
— যতক্ষণ না তারা আক্রমণ করছে, তোমরা কেউ আক্রমণ করবে না।
তরুণদের একজন এগিয়ে এসে অদ্ভুত এক ভাষায় কিছু বলল।
কিন্তু গোয়েনদের কেউই সেই ভাষা বুঝতে পারল না।
হঠাৎ পরিস্থিতি বদলে গেল।
তরুণগুলো আক্রমণ শুরু করল।
গোয়েন তার সৈন্যদের পাল্টা আক্রমণের নির্দেশ দিল।
কিন্তু খুব দ্রুতই গোয়েন বুঝতে পারল, তাদের হাতে থাকা অস্ত্রগুলো সাধারণ কোনো অস্ত্র নয়।
সংখ্যায় অনেক কম হয়েও সেই তরুণরা গোয়েনের বিশাল বাহিনীকে অল্প সময়ের মধ্যে বিপর্যস্ত করে ফেলল।
তারপর তারা ব্যবহার করল আরও ভয়ংকর কিছু।
চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল নীলচে ধোঁয়া।
ধোঁয়াটি বাতাসে ছড়িয়ে পড়তেই একে একে গোয়েনের সৈন্যরা জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যেতে লাগল।
গোয়েন পরিস্থিতি বুঝতে পেরে দ্রুত পিছু হটতে লাগল।
সে মুখ ঢেকে কোনোভাবে সেই ধোঁয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করল এবং একটি ছোট গর্তের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর ধোঁয়া কেটে গেল।
সৈন্যরা তখনও অচেতন।
অচেনা সেই তরুণরা এগিয়ে এসে গোয়েনের সৈন্যদের বেঁধে ফেলল।
ঠিক তখনই চারপাশে শোনা গেল ঢাক-ঢোলের শব্দ।
কিছুক্ষণ পর দূর থেকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল এক অদ্ভুত বিশাল প্রাণীকে। দেখতে অনেকটা হাতির মতো, কিন্তু পৃথিবীর কোনো পরিচিত প্রাণীর সঙ্গে তার পুরোপুরি মিল নেই।
তার পিঠে বসে ছিলেন মুকুট পরা এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি।
তার সঙ্গে ছিল শত শত মানুষ।
তাদের চেহারা, পোশাক এবং চলাফেরা—সবকিছুতেই ছিল এক অদ্ভুত অপরিচিতি।
মুকুট পরা ব্যক্তিটি সামনে আসতেই তরুণরা তাদের নিজস্ব ভাষায় তাকে কিছু বলল।
লোকটির মুখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল।
গোয়েন বুঝতে পারল, তার সৈন্যদের ভাগ্যে ভালো কিছু অপেক্ষা করছে না।
এরপর যা ঘটেছিল, সেটাই গোয়েনের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা।
বন্দি সৈন্যদের নিয়ে শুরু হলো এক অদ্ভুত আচার।
চারপাশে মানুষ জড়ো হতে লাগল।
ঢাক-ঢোলের শব্দ আরও জোরালো হলো।
অচেনা রাজা এগিয়ে গিয়ে তার মৃত তরুন যোদ্ধাদের সামনে দাঁড়ালেন।
তারপর মাথা থেকে মুকুটটি খুলে একে একে তাদের শরীরের কাছে ধরলেন।
গোয়েন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
মুহূর্তের মধ্যেই অসম্ভব এক ঘটনা ঘটল।
যে যোদ্ধাদের সে কিছুক্ষণ আগেই মৃত অবস্থায় দেখেছিল, তারা আবার নড়েচড়ে উঠল।
গোয়েনের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
এটা কীভাবে সম্ভব?
মানুষ কি সত্যিই মৃত্যুর পর ফিরে আসতে পারে?
নাকি ওই মুকুটের ভেতরে লুকিয়ে আছে এমন কোনো প্রযুক্তি, যার অস্তিত্ব পৃথিবীর মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি?
গোয়েনের ভয় তখন আরও বেড়ে গেল।
ঠিক সেই সময় আকাশে অদ্ভুত শব্দ শোনা গেল।
সবাই আকাশের দিকে তাকাল।
মেঘের ফাঁক দিয়ে নেমে এলো কয়েকটি ছোট উড়োজাহাজ।
কিন্তু সেগুলো পৃথিবীর কোনো পরিচিত উড়োজাহাজ ছিল না।
সেগুলোর গঠন এমন, যা গোয়েনের সময় তো নয়ই—তার বহু পরের পৃথিবীতেও দেখা যায়নি।
উড়োজাহাজগুলো থেকে কয়েকটি অদ্ভুত প্রাণী বেরিয়ে এলো।
তারা সরাসরি সেই রাজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
গোয়েন লক্ষ করল, প্রাণীগুলো রাজার সঙ্গে কোনো এক অজানা ভাষায় যোগাযোগ করছে।
চারপাশে তখন অদ্ভুত এক গান শুরু হয়েছে।
তরুণ-তরুণীরা নাচছে।
ঢাকের শব্দ, অচেনা ভাষার গান আর সেই অদ্ভুত উড়োজাহাজ—সব মিলিয়ে জায়গাটিকে যেন বাস্তব পৃথিবীর বাইরের কোনো দৃশ্য বলে মনে হচ্ছিল।
গোয়েন তখন বুঝতে পারছিল না সে কোথায় এসে পড়েছে।
হেরিফেলোরা কি সত্যিই পৃথিবীর মানুষ?
নাকি তারা এমন কোনো সভ্যতার অংশ, যারা হাজার বছর ধরে পৃথিবীর মানুষের চোখের আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রেখেছে?
বড় বড় কড়াই আনা হলো সেখানে এর পর বড় বড় চুলায় সেগুলা বসানো হলো। এর পর কড়াই গুলোতে এক ধরনের রতল ঢালা হল যা সম্পর্কে গোয়েন অজানা। এর পর গোয়েনের সকল সেনার জ্ঞান ফিরিয়ে আনা হলো। তার পর তাদের সেই কড়াইয়ের ফুটন্ত তরলে ফেলে মেরে ফেলা হল। এক কথায় তাদের রান্না করা হল। রান্না শেষে আনন্দের সাথে সবাই গোয়েনের সব সেনার মাংস খেয়ে ফেলল।
গোয়েন আর সহ্য করতে পারলোনা এসব দৃশ্য।
গোয়েন আর অপেক্ষা করল না।
সবাই যখন উৎসব আর আচার-অনুষ্ঠানে ব্যস্ত, তখন সে সুযোগ বুঝে ধীরে ধীরে সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করল।
তারপর যেদিক দিয়ে এসেছিল, সেদিকেই দৌড়াতে লাগল।
অন্ধকার পথ।
ঘন কুয়াশা।
অজানা শব্দ।
সবকিছুকে পেছনে ফেলে অবশেষে সে আবার পৃথিবীর মাটিতে ফিরে এল।
সেই আমাজন অরণ্যে।
মাহমুদ এতটুকু বলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর এক গ্লাস পানি পান করল।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
— এটা কি সত্যি ঘটনা? নাকি লুইস আর গোয়েনের বানানো কোনো গল্প?
মাহমুদ তখন শান্তভাবে বলেছিল,
— হয়তো বানানো গল্প। অথবা হয়তো সত্যি। তবে আমার এত বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, ঘটনাটি বাস্তব হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
সে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
— তোকে এই কারণেই ডেকেছি, বন্ধু। আমরা একটা দল বানাব। তারপর হেরিফেলো নিয়ে গবেষণা করব।
মাহমুদের আত্মবিশ্বাস দেখে আমিও ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম যে ঘটনাটি সত্যি হতে পারে।
কারণ আমি মাহমুদকে চিনতাম।
সে কখনো অহেতুক কোনো বানোয়াট কাহিনির পেছনে ছুটত না।
প্রফেসরের কথা শেষ হতেই তিতলি বলে উঠল,
— দাদু! যদি হেরিফেলো নামে সত্যিই কোনো জাতি বা রাজ্য থেকে থাকে, তাহলে আমরা তাদের সম্পর্কে জানি না কেন? এখন তো ২০২৪ সাল। পৃথিবী এত আধুনিক হয়েছে, বিজ্ঞান এত দূর এগিয়েছে। এতদিনে তো আমাদের সবকিছু জানার কথা!
প্রফেসর মৃদু হাসলেন।
— মেয়ে, সবকিছু সবসময় সাধারণ মানুষের জানার জন্য প্রকাশ করা হয় না। অনেক বিষয়ই উপরমহলের নির্দেশে গোপন রাখা হয়। হেরিফেলো সম্পর্কেও খুব অল্প মানুষ জানে।
তিনি একটু থেমে বললেন,
— গোয়েন বইটি লিখে মারা যায়। তার বংশধররা ছাড়া বাইরের খুব অল্পসংখ্যক মানুষই এই রহস্য সম্পর্কে জানত। আর যারা জানত, তাদের অধিকাংশই কখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
রবিন এবার প্রশ্ন করল,
— দাদু, সেই ছোট ছোট উড়োজাহাজ সম্পর্কে আপনারা পরে কী জানতে পেরেছিলেন?
— খুব বেশি কিছু জানতে পারিনি। তবে গবেষণা করতে গিয়ে আমরা নিশ্চিত হয়েছিলাম, সেগুলো পৃথিবীর কোনো প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি নয়। বরং ধারণা করা হয়েছিল, সেগুলো পৃথিবীর বাইরের কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর সঙ্গে সম্পর্কিত।
রবিন বিস্মিত হয়ে বলল,
— মানে এলিয়েন?
প্রফেসর মাথা নাড়লেন।
— বলা যায়। আর আমাদের গবেষণা থেকে আরও একটা বিষয় ধারণা করা হয়েছিল—হেরিফেলোরা তাদের প্রযুক্তির সাহায্য পেয়েছিল।
ঘরের সবাই আবার নীরব হয়ে গেল।
এবার সুনেহরা প্রশ্ন করল,
— দাদু! রাজার মাথায় থাকা সেই মুকুট দিয়ে কি সত্যিই মৃত মানুষকে জীবিত করা যেত? আপনারা গবেষণা করে কী পেয়েছিলেন?
প্রফেসর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— হ্যাঁ। আমাদের গবেষণা অন্তত সেটাই নির্দেশ করে।
তিনি ধীরে ধীরে যোগ করলেন,
— তবে ওই মুকুটের আরও অনেক ক্ষমতা ছিল বলে ধারণা করা হয়। সেগুলো সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুকুটটি যে কেউ ব্যবহার করতে পারত না। নির্দিষ্ট একটি রক্তধারা বা বংশের মানুষই সেটি ব্যবহার করতে পারত। আর সেই বংশের মধ্য থেকেই তাদের রাজা নির্বাচিত হতো।
সবার প্রশ্নের উত্তর প্রফেসর ধীরে ধীরে দিয়ে গেলেন।
কিন্তু সাদমান পুরো সময়টা অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ ছিল।
তার চোখে ছিল গভীর চিন্তার ছাপ।
প্রফেসর বিষয়টি লক্ষ করলেন।
তিনি বললেন,
— সাদমান, তোমার কোনো প্রশ্ন নেই?
সাদমান যেন গভীর চিন্তা থেকে ফিরে এল।
সে ধীরে ধীরে বলল,
— না, দাদা। এখনো নেই।
তারপর একটু থেমে যোগ করল,
— আগে আপনি পুরো অতীতটা শেষ করুন। এরপর আমি সব প্রশ্ন একসঙ্গে করব।
প্রফেসর সাদমানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— এটাই তোমার সবচেয়ে বড় গুণ, সাদমান। অন্যরা যেখানে একটি প্রশ্নের উত্তর পেয়েই থেমে যায়, তুমি সেখানে পুরো ছবিটা দেখতে চাও।
সাদমান কোনো উত্তর দিল না।
প্রফেসর আবার অতীতের দিকে ফিরে গেলেন।
আর সাদমানের চোখে তখন একটাই প্রশ্ন—
হেরিফেলো আসলে কী?
একটি হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা?
নাকি পৃথিবীর বুকেই লুকিয়ে থাকা এমন এক সত্য, যা জানার পর মানুষের পুরো ইতিহাসটাই বদলে যেতে পারে?
[চলবে...]