ফন্ট সাইজ:
থিম:
ফাইযান সিকদার

৪র্থ পর্ব

লেখক: তানজিলা আহমেদ স্পর্শীয়া

#ফাইযান_সিকদার 

পর্ব ০৪
( ১৮+ অ্যালার্ট)
লেখিকা: #তানজিলা_আহমেদ_স্পর্শীয়া 
“ঠিক আছে বউ।”
ফাইযান ঘর থেকে বের হয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে যোগ করল,
“সময় নাও। আমি নিচে আছি।”
ফাইযান নিচে চলে যাওয়ার পর অবনী দীর্ঘক্ষণ আলমারির সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আলমারিভর্তি জামাকাপড়গুলো শুধু কাপড় নয়, এগুলো ফাইযানের বছরের পর বছর জমিয়ে রাখা একতরফা ভালোবাসার দলিল। অবনী একটা হালকা ল্যাভেন্ডার রঙের সুতি কামিজ বেছে নিল। কাপড়টা হাতে নিতেই এক অদ্ভুত মোলায়েম পরশ পেল সে।
শাওয়ার নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল অবনী। ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। ল্যাভেন্ডার রঙটা তার গায়ের উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের সাথে খুব সুন্দরভাবে মানিয়ে গেছে। তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় ফাইযান সবসময় তাকে বলত, “তোর নীল আর বেগুনি রঙে খুব মায়া লাগে রে অবু।”
তখন পাত্তা দেয়নি, কিন্তু আজ বুঝল ফাইযান তার জীবনের প্রতিটা ছোটখাটো পছন্দ-অপছন্দ ডায়েরির পাতার মতো মুখস্থ করে রেখেছে।
নিচে নামতেই দেখল দাদি আর ফুফু অর্থাৎ ফারিহা বেগম সোফায় বসে হাসাহাসি করছেন। ফাইযান ল্যাপটপ নিয়ে এক কোণায় সোফায় বসে কাজ করছে, কিন্তু অবনীর পায়ের আওয়াজ পেতেই সে চোখ তুলে তাকাল। মুহূর্তের জন্য ফাইযানের হাতের আঙুলগুলো কিবোর্ডের ওপর থেমে গেল। অপলক তাকিয়ে রইল, যা অবনীকে বেশ অপ্রস্তুত করে দিল।
ফারিহা বেগম হাসিমুখে বললেন,
“মা অবনী, আয় আমার পাশে বোস। দেখ তো, আমার ছেলেটা তোকে খুব জ্বালাচ্ছে না তো? ছোটবেলা থেকেই ও একটু একরোখা।”
মাহবুবা খাতুন ফোড়ন কেটে বললেন,
“জ্বালাবে কেন? নিজের জানের জানরে কাছে পাইছে, এখন তো চোখে হারাবে। দেখছোস না ফারিহা, সকাল থেকে কাজের বাহানায় কেমনে বউয়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করতেছে!”
ফাইযান ল্যাপটপ বন্ধ করে হালকা হেসে বলল,
“নানু, তুমি কিন্তু বেশি বলছো। যাও, তোমার নাতনিকে নিয়ে নাস্তা করো। ওর আবার সময়মতো না খেলে মাথা ঘোরে, জানোই তো।”
অবনী অবাক হয়ে ফাইযানের দিকে তাকাল। সে যে সকালের খাবার দাবার দেরিতে খেতে অসুস্থ বোধ করে, এই কথাটা সে কাউকেই কখনো বলেনি। ফাইযান জানল কী করে?
……….
সারাদিন বাড়ির হইহুল্লোড়ে কাটলেও রাত বাড়ার সাথে সাথে অবনীর মনের ভেতর আবারও সেই অস্থিরতা ফিরে এল। আলভীর মুখটা মাঝে মাঝে ভেসে উঠছে, কিন্তু ফাইযানের অসীম যত্ন তাকে বারবার বর্তমানে ফিরিয়ে আনছে।
রাতে রুমে ঢোকার পর দেখল ফাইযান বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশভর্তি তারা, আর বসন্তের উদাস হাওয়া বইছে। অবনীকে রুমে ঢুকতে দেখে ফাইযান ধীর পায়ে এগিয়ে এল। রুমের টিমটিমে আলোয় ফাইযানের মুখটা আজ খুব শান্ত দেখাচ্ছে।
ফাইযান অবনীর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। অবনী পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু ফাইযান তার দুই কাঁধ ধরে স্থির করে দিল। নিচু স্বরে বলল,
“আমি জানি তোর মনে এখনো অনেক প্রশ্ন আছে, অবনী। হয়তো তুই ভাবছিস আমি খুব স্বার্থপর, জোর করে তোকে ছিনিয়ে নিয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস কর, তোকে ছাড়া কাটানো প্রতিটা দিন আমার কাছে ছিল নরকের মতো। আমি তোকে আলভীর হাতে তুলে দিতে পারতাম, যদি জানতাম ও তোকে আমার চেয়ে বেশি ভালোবাসে। কিন্তু ও তোকে ভালোবাসেনি।”
অবনীর চোখ ভিজে এল। সে নিচু গলায় বলল,
“কিন্তু আলভী তো আপনার বন্ধু ছিল। ওর সাথে এমনটা না করলেও পারতেন।”
ফাইযান অবনীর চিবুক আলতো করে তুলে ধরে বলল,
“বন্ধুত্বের চেয়েও বড় সত্যি ছিল আমার ভালোবাসা। আলভী জানত তুই আমার দুর্বলতা, তাও ও সুযোগ নিতে চেয়েছিল। কিন্তু আজ থেকে এই চ্যাপ্টার বন্ধ। তুই শুধু আমার, আর আমি শুধু তোর। তুই কি আমাকে একটা সুযোগ দিবি না এই জেদি মানুষটাকে ভালোবাসার?"
অবনী কোনো উত্তর দিতে পারল না। তবে ফাইযানের বুকের ধুকপুকানি তাকে এটা বুঝিয়ে দিল যে, এই মানুষটার পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু কেবল সে নিজেই। অবনী ধীরে ধীরে তার মাথাটা ফাইযানের চওড়া বুকের ওপর রাখল। হয়তো এই বন্ধনটাই তার ভাগ্যে ছিল।
ফাইযান অবনীকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। বসন্তের এই রাতে পুরোনো সব ক্ষত যেন ধীরে ধীরে শুকোতে শুরু করল।
রাত গভীর হয়েছে। বসন্তের দখিনা বাতাস জানালার পর্দাগুলোকে উড়িয়ে দিয়ে ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত মাদকতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। বারান্দার দিক থেকে আসা ফুলের মিষ্টি গন্ধে ম-ম করছে চারপাশ। ঘরে নীলচে রঙের জিরো ওয়াট বাতি জ্বলছে, সেটা পরিবেশটাকে আরও বেশি মায়াবী করে তুলেছে।
ফাইযান ঘর গুছিয়ে এসে অবনীর পাশে বসল। অবনী বিছানার এক কোণায় কুঁকড়ে বসে আছে, তার লম্বা চুলগুলো পিঠের ওপর মেলে দেওয়া। ফাইযানের উপস্থিতিতে সে অবচেতনভাবেই একটু শিউরে উঠল।
ফাইযান কোনো কথা না বলে অবনীর খুব কাছাকাছি সরে এল। অবনীর ঘাড়ের কাছে ফাইযানের তপ্ত নিঃশ্বাসের স্পর্শ লাগতেই অবনী চোখ বন্ধ করে ফেলল। ফাইযান তার আঙুল দিয়ে অবনীর কানের পাশে ঝুলে থাকা কয়েকটা অবাধ্য চুল সরিয়ে দিল। তার কণ্ঠস্বর এখন অনেক বেশি গম্ভীর এবং আবেগপ্রবণ।
“কত রাত আমি একা একা এই দিনটার কথা ভেবেছি, তুই কি জানিস অবনী? প্রতিটা মুহূর্ত আমি শুধু তোর অভাব অনুভব করেছি। আজ যখন তুই সত্যি আমার সামনে, আমার পাশে... মনে হচ্ছে স্বপ্নটা সত্যি হয়েছে।”
ফাইযান আলতো করে অবনীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। অবনীর হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। ফাইযান নিজের হাতের উষ্ণতায় সেই ঠান্ডা হাতটাকে গরম করার চেষ্টা করতে করতে ফিসফিস করে বলল,
“এখনও কি আমাকে পর ভাবছিস? তোর এই কাঁপাকাঁপি বলে দিচ্ছে তুই এখনো আমাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারিসনি।”
অবনী মাথা নিচু করেই কাঁপা গলায় বলল,
"আমি... আমি শুধু সময় নিচ্ছি। সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল যে..."
ফাইযান অবনীর কথার মাঝখানেই তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। দুই হাতে অবনীর মুখটা তুলে ধরে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আজ কোনো রাগ নেই, আছে এক সমুদ্র তৃষ্ণা আর অধিকারবোধ।
“ কিন্তু এই মুহূর্তটা শুধু আমাদের। তোর হৃদপিণ্ডের ধকধকানি আমি শুনতে পাচ্ছি অবনী। ভয় নয়, এবার একটু ভালোবাসার অধিকার দে।”
বলেই ফাইযান ধীরে ধীরে অবনীর কপালে তার উষ্ণ ওষ্ঠের স্পর্শ দিল। সেই স্পর্শে যেন একটা জাদুকরী শক্তি আছে। অবনীর শরীরের সমস্ত জড়তা এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। সে অবচেতনভাবেই ফাইযানের পাঞ্জাবিটা শক্ত করে চেপে ধরল।
ফাইযান আরও গভীর করে অবনীকে জড়িয়ে ধরল। অবনীর চিবুক থেকে চুইয়ে পড়া এক ফোঁটা অশ্রু ফাইযানের কাঁধে গিয়ে পড়ল। তবে এই অশ্রু দুঃখের নয়, বরং এক অদ্ভুত স্বস্তির। ফাইযান তার ঠোঁট অবনীর কানের কাছে নিয়ে গিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
“তুই শুধু আমার অর্ধাঙ্গিনী নোস, তুই আমার অস্তিত্ব। আজ থেকে আমাদের মাঝে কোনো আলভী নেই, কোনো অতীত নেই। আছে শুধু তুই আর আমি।”
ফাইযান কোনো ভূমিকা ছাড়াই অবনীর কাছে সরে এল। তার বলিষ্ঠ হাতটা বাড়িয়ে অবনীর কোমরের পাশ দিয়ে জড়িয়ে ধরল। অবনী চমকে উঠল, কিন্তু বাধা দেওয়ার শক্তি পেল না। ফাইযানের তপ্ত নিঃশ্বাস এখন অবনীর গলার কাছে আছড়ে পড়ছে। ফাইযান নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“সারাদিন সবার সামনে নিজেকে সামলে রাখাটা যে কতটা কষ্টের ছিল, তুই জানিস না অবনী। এই যে তুই এখন আমার এত কাছে, একদম আমার নিজের হয়ে এই মুহূর্তটার জন্য আমি কয়েকটা বছর অপেক্ষা করেছি।”
ফাইযান তার ঠোঁট অবনীর কানের লতির খুব কাছে নিয়ে গিয়ে কামড় দেওয়ার মতো করে স্পর্শ করল। অবনী চোখ বুজে ফাইযানের কাঁধের শার্টটা খামচে ধরল। তার সারা শরীরে এক তীব্র শিহরণ খেলে গেল।
ফাইযান অবনীকে আলতো করে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। ল্যাম্পের আলোয় অবনীর মুখটা এখন রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। ফাইযান তার হাত দিয়ে অবনীর গালদুটো আগলে নিল। তার বুড়ো আঙুল অবনীর কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ওপর বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“তোর এই লজ্জা আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। বল না অবনী, তুই কি আমাকে একটুও অনুভব করছিস না?”
অবনী শুধু একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিল। কোনো শব্দ বের হলো না তার গলা দিয়ে। ফাইযান আর দেরি করল না। সে ধীরে ধীরে মাথা নামিয়ে অবনীর ওষ্ঠে নিজের ওষ্ঠের গাঢ় স্পর্শ দিল। প্রথমে খুব আলতো, তারপর ক্রমেই তা গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল। অবনী প্রথম দিকে আড়ষ্ট থাকলেও, ফাইযানের ভালোবাসার তীব্রতায় সে নিজেকে সঁপে দিল।
ফাইযানের হাতের বাঁধন আরও শক্ত হলো। সে অবনীকে নিজের বুকের সাথে এমনভাবে মিশিয়ে নিল।
ফাইযান অবনীর ঘাড়ের কাছে নিজের মুখ ডুবিয়ে দিল। অবনীর গায়ের মিষ্টি সুগন্ধ আর চুলের ঘ্রাণ তাকে আরও বেশি উন্মাদ করে তুলল। সে মৃদু কণ্ঠে বলল,
“আজ থেকে তুই শুধুই আমার। তোর প্রতিটা নিঃশ্বাস, তোর প্রতিটা অনুভূতি এখন থেকে আমার দখলে।”
ফাইযান আলতো করে অবনীকে বিছানায় শুইয়ে দিল। নীল আলো আর বসন্তের রাতের নিস্তব্ধতায় দুজন মানুষের নিঃশ্বাস এক হয়ে মিশে যেতে লাগল। অবনী আজ প্রথমবার অনুভব করল, ফাইযানের এই উগ্র অধিকারবোধের আড়ালে এক বিশাল ভালোবাসার পাহাড় লুকানো ছিল, যা আজ আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে বেরোচ্ছে।
বাইরে চৈত্রবেলার বাতাস আরও জোরালো হলো, যেন প্রকৃতিও এই নতুন দম্পতিকে স্বাগত জানাচ্ছে।
চলবে?
বিঃদ্রঃ ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন গুছিয়ে লিখতে পারিনি হয়তো। ( আজকের পর্ব লিখতে গিয়ে আমি নিজেও লজ্জায় শেষ।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন