তোমার নীরবতায় আমি
পর্ব — ৪
✍️ samira
রাতটা মেহরিনের কাছে যেন শেষই হচ্ছিল না।
বিছানার পাশে রাখা ছবিটা বারবার হাতে নিচ্ছিল সে।
ছবিতে তার বাবা।
আর পাশে একজন অপরিচিত পুরুষ।
পেছনে লেখা—
“রায়হান সাহেবের সঙ্গে শেষ দেখা — ১৭ বছর আগে।”
মেহরিনের মাথায় শুধু একটা নাম ঘুরছিল—
সাহরিয়ার রায়হান।
কাকতালীয়?
নাকি এর পেছনে সত্যিই কোনো সম্পর্ক আছে?
সে ফোনটা হাতে নিল।
কন্টাক্ট লিস্টে সাহরিয়ারের নামটা দেখে কিছুক্ষণ থেমে রইল।
কল করবে?
শেষ পর্যন্ত করেই ফেলল।
একবার।
দুবার।
তৃতীয়বারে কল ধরল সাহরিয়ার।
—“হ্যালো?”
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“আপনি ঘুমাচ্ছিলেন?”
—“না।”
—“আমাকে একটা কথা বলতে হবে।”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
—“বলুন।”
মেহরিন ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“রায়হান সাহেব কে?”
সাহরিয়ারের শ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
—“কোন রায়হান সাহেব?”
—“যার সঙ্গে আমার বাবার ছবি আছে।”
এবার দীর্ঘ নীরবতা।
মেহরিন বুঝতে পারল—প্রশ্নটা সাহরিয়ারকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।
—“আপনি জানেন, তাই না?”
সাহরিয়ারের কণ্ঠ এবার খুব নিচু।
—“এই মুহূর্তে আপনার এসব জানার দরকার নেই।”
মেহরিনের চোখে রাগ ফুটে উঠল।
—“আমার বাবার ব্যাপারে আমার জানার দরকার নেই?”
—“আমি সেটা বলিনি।”
—“তাহলে কী বলছেন?”
সাহরিয়ার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“আজ রাতে দরজা-জানালা ভালো করে বন্ধ রাখবেন।”
মেহরিন বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আপনি আবার প্রসঙ্গ বদলাচ্ছেন।”
—“কারণ আমি চাই না আপনি বিপদে পড়ুন।”
—“কিন্তু কেন?”
সাহরিয়ার উত্তর দিল না।
শুধু বলল,
—“কাল অফিসে আসুন। সব বলব।”
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ।”
কল কেটে গেল।
মেহরিন ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
সব বলবে।
কিন্তু সাহরিয়ার কি সত্যিই সব বলবে?
☀️ পরদিন
অফিসে ঢুকতেই নীরা ছুটে এল।
—“মেহরিন!”
—“কী হয়েছে?”
নীরা তার হাত ধরে বলল,
—“তুই গতকাল CEO সাহেবের সঙ্গে কোথায় গিয়েছিলি?”
—“বাড়িতে।”
—“তারপর?”
—“তারপর কিছু হয়নি।”
নীরা চোখ ছোট করে তাকাল।
—“তোর মুখ বলছে হয়েছে।”
মেহরিন বিরক্ত হয়ে বলল,
—“তুই একটু কম detective হ।”
নীরা হেসে বলল,
—“অসম্ভব।”
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ—
—“Detective হলে ভালোই। অফিসে কিছু জিনিস খুঁজে বের করার দরকার আছে।”
দুজনেই ঘুরে তাকাল।
একজন সুদর্শন যুবক দাঁড়িয়ে।
মেহরিন তাকে চিনল না।
নীরা ফিসফিস করে বলল,
—“উনি আরমান। সাহরিয়ারের best friend।”
আরমান হেসে বলল,
—“আমার পরিচয় এত সুন্দর করে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।”
নীরা বলল,
—“আপনিই কি সেই মানুষ যিনি CEO সাহেবকে ভয় পান না?”
—“ভয় পাই।”
নীরা অবাক।
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ। তবে সেটা সাহরিয়ারকে বলবেন না।”
মেহরিন হেসে ফেলল।
অনেকদিন পর অফিসে এসে প্রথমবার নিজের অজান্তে হাসল সে।
ঠিক তখনই লিফটের দরজা খুলল।
সাহরিয়ার বেরিয়ে এল।
তার চোখ প্রথমে মেহরিনের দিকে গেল।
তারপর আরমানের দিকে।
—“আরমান, আমার সঙ্গে এসো।”
আরমান মুচকি হেসে বলল,
—“জ্বি CEO সাহেব।”
যাওয়ার সময় সে নীরার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“পরে দেখা হবে।”
নীরা ফিসফিস করল,
—“লোকটা কিন্তু interesting।”
মেহরিন মাথা নাড়ল।
—“তুই থামবি?”
🖤 ৩২ তলা
মেহরিন দরজায় নক করল।
—“Come in.”
ভেতরে ঢুকতেই সাহরিয়ার বলল,
—“বসুন।”
মেহরিন বসেনি।
সে সরাসরি বলল,
—“আপনি গতকাল বলেছিলেন সব বলবেন।”
সাহরিয়ার তার দিকে তাকাল।
—“বলব।”
—“তাহলে বলুন।”
সাহরিয়ার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ডেস্কের ড্রয়ার খুলে একটা পুরোনো ফাইল বের করল।
ফাইলটা মেহরিনের সামনে রাখল।
—“এটা আমার বাবার পুরোনো business records।”
মেহরিন ফাইলটা খুলল।
প্রথম পাতায় একটা নাম দেখে তার হাত থেমে গেল।
“A. Ahmed.”
মেহরিনের চোখ বড় হয়ে গেল।
—“এটা… আমার বাবার নাম।”
সাহরিয়ার ধীরে মাথা নাড়ল।
—“হ্যাঁ।”
মেহরিনের গলা কেঁপে উঠল।
—“আমার বাবা আপনার বাবার সঙ্গে কাজ করতেন?”
—“একসময়।”
—“তারপর?”
সাহরিয়ার এবার চোখ নামিয়ে ফেলল।
—“তারপর একটা ঘটনা ঘটে।”
—“কী ঘটনা?”
সাহরিয়ার উত্তর দেওয়ার আগেই তার ফোন বেজে উঠল।
সে ফোনটা হাতে নিল।
ওপাশের কথা শুনে তার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—“কোথায়?”
কয়েক সেকেন্ড পর বলল,
—“আমি এখনই আসছি।”
ফোন রেখে সাহরিয়ার উঠে দাঁড়াল।
মেহরিন অবাক হয়ে বলল,
—“কী হয়েছে?”
সাহরিয়ার তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আপনার বাড়িতে কেউ গিয়েছিল।”
মেহরিনের বুক কেঁপে উঠল।
—“কী?!”
—“আপনার মা এখন হাসপাতালে।”
মেহরিনের হাত থেকে ফাইলটা পড়ে গেল।
—“মা…?”
সাহরিয়ার এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল।
—“আমি আছি। চলুন।”
মেহরিন কিছু বলল না।
শুধু আতঙ্কে সাহরিয়ারের হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল।
সাহরিয়ারও হাত সরিয়ে নিল না।
বরং তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে বলল—
—“ভয় পাবেন না।”
মেহরিন প্রথমবার তার কণ্ঠে আদেশ নয়—
আশ্বাস শুনল।
হাসপাতালের করিডোরে পৌঁছে মেহরিন ছুটে গেল।
তার মা তখন চিকিৎসাধীন।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মেহরিন কাঁপছিল।
সাহরিয়ার কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিল।
মেহরিন হঠাৎ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আপনি আমাকে সত্যিটা বলবেন তো?”
সাহরিয়ার ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এল।
—“হ্যাঁ।”
—“যাই হোক?”
—“যাই হোক।”
মেহরিন চোখের পানি মুছে বলল,
—“তাহলে একটা কথা বলুন।”
—“কী?”
—“আমার বাবার মৃত্যুর সঙ্গে… আপনার বাবার কোনো সম্পর্ক ছিল?”
সাহরিয়ার স্থির হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর তার ঠোঁট নড়ল—
—“ছিল।”
মেহরিনের চোখে পানি জমে উঠল।
—“কী সম্পর্ক?”
সাহরিয়ার এবার আর কিছু বলল না।
ঠিক তখনই হাসপাতালের দরজা খুলে একজন নার্স বেরিয়ে এল।
—“মেহরিন আহমেদ?”
—“জি?”
নার্স একটা ছোট কাগজ তার হাতে দিল।
—“আপনার মা জ্ঞান ফেরার পর এটা আপনাকে দিতে বলেছেন।”
মেহরিন কাগজটা খুলল।
মাত্র এক লাইন লেখা—
“সাহরিয়ারকে বিশ্বাস কোরো না।”
মেহরিন ধীরে ধীরে মাথা তুলে সাহরিয়ারের দিকে তাকাল।
আর সাহরিয়ার বুঝল—
এবার শুধু অতীত নয়, তাদের বর্তমানও ভেঙে পড়তে শুরু করেছে।
চলবে…