তোমার নীরবতায় আমি
পর্ব — ৩
✍️ samira
সাহরিয়ারের কথাটা শুনে মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—“আজ রাতে আপনি আমার সঙ্গে যাবেন।”
মেহরিন ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
—“আমি একা যেতে পারব।”
সাহরিয়ার শান্ত গলায় বলল,
—“জানি।”
—“তাহলে?”
—“তবুও একা যাবেন না।”
মেহরিন বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আপনি সবসময় এভাবে আদেশ করেন?”
সাহরিয়ার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
—“শুধু যখন প্রয়োজন হয়।”
—“আর যদি আমি না শুনি?”
সাহরিয়ার কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—“তাহলে আমাকে আপনার সঙ্গে যেতে হবে।”
মেহরিন অবাক।
—“কেন?”
—“কারণ আমি নিশ্চিত নই, যে মানুষটা আপনাকে অনুসরণ করছে সে শুধু ভয় দেখাতে চায়।”
মেহরিনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
🌧️
অফিস থেকে বেরিয়ে পার্কিংয়ে আসতেই মেহরিন সাহরিয়ারের কালো গাড়িটা দেখতে পেল।
ড্রাইভার দরজা খুলে দিল।
মেহরিন পেছনের সিটে যেতে চাইলে সাহরিয়ার বলল,
—“সামনে বসুন।”
—“আমি পেছনে বসব।”
—“আমি একা পেছনে বসে কথা বলতে পছন্দ করি না।”
মেহরিন তার দিকে তাকাল।
—“আপনি কি আমার সঙ্গে কথা বলবেন?”
—“প্রয়োজনে।”
বিরক্ত মুখে মেহরিন সামনে গিয়ে বসল।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ শুধু বৃষ্টির শব্দ।
হঠাৎ মেহরিনের ফোন বেজে উঠল।
Nira Calling…
—“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে নীরার উত্তেজিত কণ্ঠ—
—“তুই কোথায়?”
—“গাড়িতে।”
—“কার গাড়িতে?”
মেহরিন একটু ইতস্তত করে বলল,
—“স্যারের।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর—
—“কীইই?! CEO সাহেবের গাড়িতে?!”
মেহরিন চোখ বন্ধ করে ফেলল।
—“নীরা, চুপ কর!”
সাহরিয়ারের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
নীরা আবার বলল,
—“মেহরিন, কাল অফিসে পুরো তদন্ত চাই!”
মেহরিন তাড়াতাড়ি কল কেটে দিল।
সাহরিয়ার বলল,
—“আপনার বান্ধবী বেশ সাহসী।”
—“ও একটু বেশি কথা বলে।”
—“সেটা বুঝলাম।”
মেহরিন তার দিকে তাকাল।
—“হাসছেন কেন?”
—“আমি হাসছি?”
—“জি।”
—“অনেকদিন পর হাসলাম হয়তো।”
মেহরিন একটু থেমে গেল।
কথাটা কেন যেন তার মনে আটকে রইল।
কিছুক্ষণ পর মেহরিন জানালার বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ বলল,
—“ওই গাড়িটা…”
সাহরিয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামনে তাকাল।
একটা কালো গাড়ি তাদের পেছনে আসছে।
সাহরিয়ারের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—“গাড়ি ঘোরাও।”
ড্রাইভার দ্রুত অন্য রাস্তায় ঢুকে গেল।
মেহরিন এবার নিচু গলায় বলল,
—“ওরাই?”
—“সম্ভবত।”
তার হাত দুটো অজান্তেই শক্ত হয়ে গেল।
সাহরিয়ার সেটা লক্ষ্য করল।
কিছুক্ষণ পর নিজের হাতটা সেন্টার কনসোলের ওপর রাখল—মেহরিনের হাতের খুব কাছে।
স্পর্শ করল না।
শুধু বলল,
—“ভয় পাচ্ছেন?”
মেহরিন মাথা নাড়ল।
—“না।”
—“মিথ্যা বলছেন।”
মেহরিন তার দিকে তাকাল।
—“আমি ভয় পেলেও কাউকে দেখাই না।”
সাহরিয়ার কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় বলল,
—“তাহলে আজ দেখানোর দরকার নেই।”
মেহরিনের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
কেন জানি না, এই মানুষটার পাশে বসে থাকলে ভয়টা একটু কম মনে হচ্ছে।
🏠
বাড়ির সামনে গাড়ি থামল।
মেহরিন দরজা খুলে নামতে যাচ্ছিল।
সাহরিয়ার বলল,
—“এক মিনিট।”
সে একটা কালো কার্ড এগিয়ে দিল।
—“এটা রাখুন।”
মেহরিন কার্ডটা হাতে নিয়ে দেখল।
Sahriar Rayhan — Personal
মেহরিন অবাক হয়ে বলল,
—“আপনি সবাইকে personal number দেন?”
—“না।”
—“তাহলে আমাকে কেন?”
সাহরিয়ার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“কারণ আপনার ক্ষেত্রে অফিসের নম্বর যথেষ্ট নাও হতে পারে।”
মেহরিন আর কিছু বলল না।
কার্ডটা ব্যাগে রেখে গাড়ি থেকে নামল।
কয়েক পা যাওয়ার পর হঠাৎ পেছন ফিরে তাকাল।
সাহরিয়ার এখনও তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
দুজনের চোখে চোখ পড়তেই মেহরিন দ্রুত ভেতরে চলে গেল।
গাড়ি চলে যাওয়ার পর সাহরিয়ার ফোন বের করল।
একটা মেসেজ এসেছে।
“তুমি ওকে বাঁচাতে পারবে না, সাহরিয়ার। কারণ মেহরিন নিজেই জানে না—তার বাবার সঙ্গে তোমার বাবার কী সম্পর্ক ছিল।”
সাহরিয়ারের চোখ কঠিন হয়ে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল,
—“এবার আর কাউকে হারাতে দেব না।”
🌙
নিজের ঘরে বসে মেহরিন সাহরিয়ারের দেওয়া কার্ডটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ ফোনে একটা মেসেজ এল।
Unknown Number:
“আপনি যাকে বিশ্বাস করছেন, সে আপনাকে সত্যিটা বলছে না।”
মেহরিনের বুক কেঁপে উঠল।
ঠিক তখনই—
ঠক… ঠক…
দরজায় শব্দ।
মেহরিন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
কেউ দরজা খুলল না।
কিছুক্ষণ পর দরজার নিচ দিয়ে একটা সাদা খাম ভেতরে ঢুকে এল।
খামের ওপর লেখা—
“মেহরিন আহমেদ।”
কাঁপা হাতে খামটা খুলতেই একটা পুরোনো ছবি বেরিয়ে এল।
ছবিতে—
তার বাবা।
আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অপরিচিত মানুষ।
মেহরিন ছবিটা উল্টে দিল।
পেছনে লেখা—
“রায়হান সাহেবের সঙ্গে শেষ দেখা — ১৭ বছর আগে।”
মেহরিনের চোখ স্থির হয়ে গেল।
—“রায়হান সাহেব…?”
তার মনে পড়ল সাহরিয়ারের কথা।
সাহরিয়ার রায়হান।
তাহলে—
তার বাবার সঙ্গে সাহরিয়ারের পরিবারের সম্পর্ক কী?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
কে তাকে এই ছবি পাঠাল?
অন্যদিকে, শহরের অন্য প্রান্তে সাহরিয়ার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার হাতে ঠিক একই ছবির আরেকটি কপি।
সে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করল—
—“মেহরিন, তুমি যদি সত্যিটা জানতে পারো… তুমি আমাকে আর কখনো ক্ষমা করবে না।”
চলবে…