#Our_dark_obsession
#পর্ব_৩
#রওনোক_জাহান_হায়াত
আকাশে তারারা মিটমিট করে জ্বলছে, গোলাকার চন্দ্রের মৃদু আলো ছড়িয়ে আছে ধরণীর বুকে। গাছের সবুজ পাতাগুলো শীতল হাওয়ায় নড়েচড়ে উঠছে।মির্জা বাড়ীতে বিয়ের আমেজ, সকলে অপেক্ষায় আছে কনের। অন্যদিকে নিশান নিজের ঘরের বারান্দায় বউ বেশে দাড়িয়ে আছে। পরনে তার লাল শাড়ি, গহনা আর চুড়ি। বারান্দার রেলিংয়ের সাথে দুটো লম্বা শাড়ি ঝুলানো আছে। নিশান এক ঝটকায় নিজের হাত থাকা লাগেজটা দোতলা থেকে নিচে বাগানে ফেলে দিলো। বাড়িতে মৃদু গান চলতে থাকায় লাগেজ পড়ার শব্দ বাড়ির ভেতরে অবস্থিত মানুষগুলোর কর্ণে পৌছাতে পারলো না। নিশান একটা লম্বা শ্বাস টানলো। ভালো করে বাগানের আশপাশটা বারান্দা থেকে পরক্ষ করে নিলো। নাহ, বাগানে এই মুহূর্তে কেউ নেই। নিশান শাড়ির আঁচল খানা নিজের কোমরে পেঁচিয়ে নিলো। তারপর রেলিংয়ের সাথে বেঁধে রাখা শাড়ি গুলো ধরে ধরে আস্তে আস্তে নিচে নামতে শুরু করলো। খানিকটা সময় পর সে অক্ষত অবস্থায় বাগানে নামলো। নামার পর সে কয়েকটা টানটান শ্বাস ছাড়লো। জীবনে এই প্রথমবার সে এমন কিছু করেছে। বিয়ের থেকে বাঁচাতে নিশান অবশেষে পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিশান যখন নিজের লাগেজটা নিয়ে পিছনে ঘুরলো তখনই ও নিজের জায়গায় স্তম্ভ হয়ে গেলো। ওর সামনে একটি ছয় বছরের মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিশান একটা ঢোক গিললো। ছোট্ট মেয়েটি ওর দিকে এগিয়ে এসে শিশুসুলভ কন্ঠে আওয়ালো,
–”নিশান বুবু! তুমি বউ সেজে কোথায় যাচ্ছো?”
নিশান নিজের কপালের সামনের চুলগুলো দু-হাতে সরিয়ে মেয়েটির সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। মেয়েটাকে নিজের কাছে এনে নিজের ব্যাগ থেকে একটা কিটক্যাট চকলেট বের করে মেয়েটিকে দিয়ে বলল,
–”বুবু তো তোমার জন্য এই চকলেটটা দিতে এসেছি।”
–”তাহলে বারান্দা থেকে এভাবে নামলে কেনো? যদি তুমি পড়ে যেতে? দরজা দিয়েও তো আসতে পারতে?”
নিশান মেয়েটার গালে হাত বুলিয়ে বলল,
–”আমি তো তোমার সাথে লুকোচুরি খেলতে চাইছিলাম, তাই।”
মেয়েটি খুশি হয়ে গেছে। নিশানের গালে হাত দিয়ে খুশি মনে বলল,
–”সত্যি!”
–” সত্যি তো। এখন তুমি গিয়ে বাড়ির ভিতরে লুকিয়ে পড়ো, তারপর আমি তোমাকে খুঁজে বের করবো, কেমন? আর বাড়ির কাউকে আমাদের এই খেলার কথা বলবেনা।”
মেয়েটি খুশিতে ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়লো। তারপর নিশানের গালে একটা চুমু খেয়ে মেয়েটি ছুট লাগানো বাড়ির ভিতরে। তাকে যেতে দেখে নিশান হাফ ছেড়ে বাঁচলো। দ্রুত নিজের বুট গুলো পড়ে নিলো। তারপর লাগেজটা নিয়ে ছুট লাগালো বাড়ির পেছনের গেটের দিকে। সেখানে গিয়ে ঝট করে গেট খুলে দৌড় লাগালো বাড়ির বাহিরে। বেশ অনেকটা দূর যাওয়ার পর সে থামলো। জোরে জোরে শ্বাস ছাড়ছে। সে পিছন ফিরে দূরের আলোকিত মির্জা বাড়ির দিকে তাকালো একঝলক। মনে পড়ে গেলো তার বাবা-মায়ের সাথে কাটানো সেই পুরোনো দিনগুলোর কথা। কতোই না সুখে ছিলো তারা। কিন্তু বাবা-মায়ের মৃ/ত্যুর পর থেকেই এই চাচা-চাচি নামক শয়তানগুলো সম্পত্তির লোভে ওর জীবনকে অতিষ্ঠ করে দিয়েছে। আজ অবশেষে সে এই তিক্ত জীবন থেকে মুক্তি পেতে চলেছে। নিশান হাসতে হাসতে নিজে নিজেই বলে উঠলো,
–”মুই যাইগা পালাইয়া, রওশাইনা। তুই আর তোর আম্মা-আব্বা পাইবি না আমায় খুঁইজা।”
তারপর নিশান একটা সিএনজি ধরে রওনা দিলো
ওর বড় মামার বাড়ির উদ্দেশ্যে। অন্যদিকে এই সম্পর্কে কিছু না জানা মির্জা বাড়ির সবাই আনন্দ উৎযাপন করতে ব্যস্ত। তখনই রুবি বেগম যে মেয়ে গুলোকে নিশানের ঘরে পাঠিয়েছিলো তারা ছুটে নিচে আসে। তাদের মধ্যে একজন হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
–”নিশান আপুর রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। অনেকবার ডাকার পরও সে দরজা খুলছে না।”
মেয়েটির কথা শুনে সবাই অবাক হলো বেশ। রুবি বেগম আর রহিম মির্জা ছুটে গেলেন নিশানের ঘরের দিকে।বেশ কয়েকবার ডাকার পরও যখন কোনো উত্তর এলো না তখন তাদের চোখে মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট হলো। মেয়েটার আবার নিজের সাথে উল্টোপাল্টা কিছু করে বসে নি তো? এই ভেবেই তাদের দুজনার গলা শুকিয়ে এলো। একে অপরের দিকে চিন্তিত নয়নে চোখাচোখী করলো। তখনই রওশনও নিচ থেকে দোতলায় এগিয়ে এলো। বাবা-মাকে নিশানের ঘরের সামনে এমন চিন্তিত ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ভ্রঁ কুঁচকালো। তাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বিভ্রান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো ‘কি হয়েছে?’। রুবি বেগম তাকে বলল নিশান কোনো প্রকার সাড়াও দিচ্ছে আর দরজাও খুলছে না। তার উত্তর শুনে রওশন নিজেও চিন্তিত হয়ে পড়ল। বাবা মাকে দরজার সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে নিজে দাঁড়ালো। আর মৃদু স্বরে নিশানকে ডাকলো,
–”নিশান? এই নিশান, দরজাটা খুল প্লিজ।”
নাহ, তবুও কোন উত্তর এলো না ভেতর থেকে।
তাদের তিনজনের চিন্তা এবার ভয়ে পরিণত হলো। রওশন আরো কোমল স্বরে বলে উঠলো,
–”এই নিশান! আচ্ছা, যা তোকে বিয়ে করতে হবে না। তবুও প্লিজ দরজাটা খুল।”
এবারও কোন সাড়া এলো না। কোন উপায় না পেয়ে রওশন ও রহিম মির্জা দরজাটা কোনমতে ভেঙে ফেলল। রুমে প্রবেশ করতেই; তারা সম্পূর্ণ রুমটি খালি পেল। কোথাও নিশানের কোনো অস্তিত্বই নেই। রুবি বেগম বাথরুমে চেক করলেন, সেখানেও নিশান নেই। তারপর যখন বারান্দা চেক করতে গেলেন তখনই তিনি স্তম্ভ হয়ে গেলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি রওশন আর রহিম মির্জাকে ডাক দিলেন। রবি বেগমের ডাকে তারাও ছুটে গেল বারান্দার দিকে। বারান্দার সামনের রেলিং এর সাথে শাড়ি ঝুলতে দেখে তাদের আর বুঝতে বাকি থাকে না ঠিক কি হয়েছে। রহিম মির্জার কপালে হাত পড়লো, রুবি বেগম ন্যাকা কান্না জুড়ে দিলেন আর রওশন পাথরের নেয় দাড়িয়ে রয়ে রেলিং এর দিকে তাকিয়ে রইল। বেশ খানিকটা সময় পর রওশন ভারি কন্ঠে বলল,
–” এখন আর কেঁদে কি লাভ হবে,আম্মু? আমি তোমাদেরকে প্রথম থেকেই বারণ করেছিলাম ওকে এই বিয়েতে জোর না করতে। নিশান বরাবরই নিজের মর্জি মতো চলার মেয়ে। ওকে কোনো কিছুতে জোর করলে ও ঠিক তার উল্টোটাই করে। এখনই মজা বুঝো।”
এই বলেই রওশন আর এক মুহূর্তও সেখানে দাড়ালো না। লম্বা পা ফেলে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো।
____________________
হঠাৎ গু/লির শব্দে নিস্তব্ধ বাগান যেনো কেঁপে উঠলো। একটি গার্ডের নিথর দেহ বাগানের মাটিতে লুটিয়ে আছে। কপাল বেয়ে তাজা রক্ত গলগল করে ঝরছে। বাকি সকল গার্ডরা মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে অগ্নি মূর্তি অভ্রান মেহফিলের সামনে । যে বর্তমানে রেগে বোম হয়ে আছে। ধূসর বর্ণের চোখ জোড়া লালচে হয়ে উঠেছে, কপালের চুলগুলো ঘামের কারণে কপালেই লেপটে আছে, ফর্সা গলা আর হাতের রগ ফুলে ওঠেছে। অভ্রান তার ব্লু শ্যাডোকে খাঁচার ভেতর থেকে বের করতে করতে হুংকার দিয়ে বলল,
–”আর কেউ কি আমার সাথে নেমহারামি করেছ? করে থাকলে স্বীকার করো, নাহলে আমি যদি পড়ে জানতে পারি তাহলে তোমাদেরকে জ্যান্ত ব্লু শ্যাডোর সামনে ছেড়ে দিবো।”
তার হুংকারে আর ব্লু শ্যাডোর গর্জনে সকলেই কেঁপে উঠলো। কারো কিছু বলার মতো সাহস নেই। লিওন কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে শান্ত স্বরে
আওয়ালো,
–”ওকে কেনো শু/ট করা হয়েছে?”
–”এই নেমহারামিটা গতকাল ইলাকে ভিলাতে প্রবেশ করতে সাহায্য করেছি।”
সবাই বেশ অবাক হলো। যেখানে অভ্রানের অনুমতি ব্যতীত ভিলার ভেতর থেকে বাহিরে যেতে আর বাহির থেকে প্রবেশ করতে পারেনা কেউ, সেইখানে এই গার্ডটি কিনা মিস্টার লারসনের বড়কে মেয়েকে ভিলার ভেতরে প্রবেশ করতে সাহায্য করেছে! এতে অভ্রানের রেগে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। অভ্রান হঠাৎই শীতল কন্ঠে আদেশ দিলো,
–”ভিলার সিকিউরিটি আরো বাড়িয়ে দাও। আর যে আমার সাথে বেইমানি করতে চাইবে সে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকে।”
তারপর অভ্রান বিদ্যুতের বেগে বাগান থেকে ভিলার ভেতরে চলে যায়। সকলেই যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচলো। রিকা দ্রুত ব্লু শ্যাডোকে তার খাঁচায় ঢুকিয়ে দিলো। তার লিওনের সাথে মিলে অভ্রানের কাছে যায়। অভ্রান তখন নিজের অফিস রুমে ছিলো। ওরা দুজন দরজায় নক করলে অভ্রান তাদের ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়। দুজনে গিয়েই অভ্রানের সামনে দাঁড়ালো। অভ্রানকে দেখে মনে হচ্ছে রাগটা এখন কমেছে। সেই সুযোগে লিওন স্বাভাবিকভাবেই বলল,
–”বস্, সব অস্ত্র ঠিকভাবে রাশিয়াতে সাপ্লাই করা হয়েছে। আর রাশিয়ার মাফিয়া বস মিস্টার এমিলিও আপনার সাথে ডিল করতে চায়।”
অভ্রান লিওনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। তার ধূসর বর্ণের চোখ জোড়া সম্পূর্ণ শীতল। কিছুক্ষণ আগের লালচে ভাব মিলিয়ে গেছে চোখ জোড়া থেকে। অভ্রানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বরফের নেয় শীতল হাসির রেখা ফুটিত হলো। সে শান্ত স্বরে বলল,
–”আই লাইক ইট। তাহলে তার সাথে সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করো। দিস ডিল ইজ ভেরি ইম্পরট্যান্ট টু আস।”
লিওন আর রিকা সম্মতি সূচক মাথা নাড়লো। অভ্রান বসা থেকে উঠে দাড়ালো। নিজের ব্ল্যাক লেদারের জ্যাকেট টি হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়, তা দেখে লিওন বলে উঠে,
–” আগেইন হিল রেস?”
অভ্রান কোনো জবাব দিলো না। তাই লিওন আবার বলে উঠলো,
–”আমিও একবার ট্রাই করতে চাই, বস।”
অভ্রান ফিরে থাকলো লিওন আর রিকার দিকে। তার শীতল অভিব্যক্তির কোনো প্রকার পরিবর্তন হলো না। লিওন আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে অভ্রানের দিকে। তার বরাবরই রেসিং এর প্রতি খুব আগ্রহ। কিন্তু কাজের চাপ আর অভ্রানের ভয়ে কখনো তা বহিঃপ্রকাশ সে করতে পারে নি। অভ্রান শীতলী কন্ঠে বলল,
–”লেট'স গো।”
____
আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা আস্তে আস্তে সরু হয়ে আসছে। চাঁদের আলো পাহাড়ের আশপাশ যেমন সৌন্দর্যে মুড়িয়ে দিচ্ছে, ঠিক তেমনই রহস্যময় ও বিপদজ্জনক করে তুলছে। রাস্তার এক পাশে পাহাড়ের দেয়াল; তো অন্য পাশে গভীর খাদ। যার তলদেশ রাস্তা থেকে দেখা যেনো অসম্ভব। হঠাৎই বাতাসের গতিতে দুটো ‘Ducati Panginal v4’ বাইক ফুল স্পিডে চলছে। একটিতে আছে অভ্রান আর আরেকটিতে আছে লিওন। লিওন অভ্রানের স্পিডের সাথে শত তাল মিলিয়ে চালাতেই চাইলেও অভ্রানের বাইক তার আগে অধিক গতিতে পাহাড়ি রাস্তাকে হাওয়ার মতো অতিক্রম করছে। বাইকের ইঞ্জিনের শব্দ পাহাড়ের দেয়ালের সাথে প্রতিধ্বনিত হয়ে পুনরায় ফিরে আসছে। বেশ অনেকটা সময় রাইডিং এর পর অভ্রানের বাইকটি শেষ সীমানা অতিক্রম করে ব্রেক কষলো। লিওন তার পেছনে এসে থামলো। বেচারা হেলমেট টা কোনো রকমে খুলে জোরে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করল।যেন আরেকটু হলে তার প্রাণটাই বেরিয়ে যেতো। ওর এমন অবস্থা দেখে হেলমেটের ভিতরে অভ্রানের ঠোঁটে শীতল হাসি ফুটে উঠলো। লিওন অভ্রানের দিকে তাকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
–”ইট'স টু মাচ রিস্কি, বস।”
অভ্রান নিজের হেলমেটটা খুলে বাইকের উপর রাখলো। নিজের চুল ঠিক করতে করতে ঠান্ডা স্বরে বলল,
–”অ্যান্ড আই’ম অবসেস্ট উইথ রিস্ক।”
–”ইউ আর ক্রেজি, বস। আচ্ছা, আপনার কি কখনো মৃ/ত্যুর ভয় না?”
লিওনের প্রশ্নে অভ্রান নিজের ধূসর বর্ণের চোখ জোড়া খালি খাদের দিকে নিক্ষেপ করলো। আর অনুভূতিহীন ভঙ্গিমা বজায় রেখে শীতল স্বরে বলল,
–” মৃত্যুর ভয় তাদেরই থাকে; যাদের পিছুটান থাকে। আর এই আভিজাত্যের শহরে গ্যাংস্টার অভ্রান মেহেফিলের কোনো পিছুটান নেই।”
মাহফিলের কঠোর শব্দ গুলোর অর্থ বুঝতে পেরে লিওন আর প্রত্যত্তুর করল না।
_______________________
সিকদার বাড়ির সাথে সামনে এসে সিএনজি থামতেই নিশান নেমে পড়লো। ভাড়া পরিশোধ করে বাড়ির গেটের দিকে এগিয়ে গেলো। দারোয়ান ওকে দেখে মৃদুভাবে স্বাগতম জানিয়ে গেট খুলে দেয়। নিশান দ্রুত পায়ে হেঁটে বাড়ির মেইন ডোরের সামনে গেলো। দরজা খুলা পেয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই তার মামি মরিয়ম বেগমকে দেখে ছুট গেলো সে মামির কাছে। মরিয়ম বেগমও ওকে দেখে জরিয়ে ধরলেন। আর স্নেহের স্বরে শুধালেন,
–”তুই ঠিক আছি তো, মা?”
–”আমি একদম ঠিক আছি মামি। মামা কোথায়?”
নিশানের কথা শেষ হওয়া মাত্রই সোহেল সিকদার
নিচে নেমে এলেন। এসে নিশানকে স্নেহের সাথে বুকে জড়িয়ে নিলেন। নিশান মামাকে জড়িয়ে ধরলো। অন্য কোনো মেয়ে হলে হয়তো আবেগের বশে এখনই কান্না করে দিতো, কিন্তু নিশান তো নিশানই। কান্না করার বদলে তার আজ আনন্দ হচ্ছে। অবশেষে সে ওই বাড়ি নামক জাহান্নাম থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। সোহেল সিকদার স্বস্থির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন,
–”তোর আসতে আর একটু দেরী হলে আমি নিজেই ওই বাড়িতে যেতাম। তবুও এই বিয়ে আমি কিছুতেই হতে দিতাম না। আচ্ছা, তুই এলি কিভাবে?”
নিশান বাঁকা হেসে বলল,
–”বারান্দা বেয়ে পালিয়ে এসেছি।”
সোহেল সিকদার আর মরিয়ম বেগম অবাক কন্ঠে বললেন,
–”কি? কিভাবে?”
তারপর নিশান তাদের সব বলল ও কিভাবে বারান্দা বেয়ে পালিয়ে এসেছে। সব শুনে ওনারা অবাক হলেও নিশানের প্রতি গর্বিত হলেন। মরিয়ম বেগম নিশানের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
–”তোর মাও এমন ছিলো। বিপদ যতই বড় হোক না কেনো, ও কখনো ভয় পেতো না। সবসময় সাহসের লড়াই করে যেতো।”
কথাটা শুনে নিশান মুখখানি একটু মলিন হয়ে গেলো। কিন্তু এই ভেবে ভালো লাগলো যে ও মায়ের মতো হয়েছে। আর রাগটা ঠিক ওর বাবার মতো পেয়েছে। সোহেল সিকদার ঘড়ির দিকে তাকাতেই তার মুখের ভঙ্গিমা শক্ত হয়ে গেলো। নিশানকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে সিরিয়াস স্বরে বললেন,
–”এই নে তোর পাসপোর্ট, ভিসা আর টিকিট।
ভাগ্য ভালো যে তোর পাসপোর্ট আর ভিসা আমার কাছেই ছিলো। এখন শুন তোর ফ্লাইট ছাড়াতে আর ২ ঘন্টা ৪৮ মিনিট আছে। মানে রাত ১২ টা ৩৫ ছাড়বে। এখান থেকে যেতে আমাদের পনেরো মিনিটর বেশি সময় লাগবে না। আর তোকে ইতালির এয়ারপোর্ট থেকে নিতে নিজাম আসবে।”
নিশান মাথা নাড়লো। তারা গতকালই মামা ভাগ্নি মিলে এসব প্ল্যান করে রেখেছিলো। সোহেল সিকদার নিশানের লাগেজ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের গাড়ির দিকে গেলেন। মরিয়ম বেগম নিশানের কপালে একটা চুমু দিয়ে বললেন,
–”সাবধান থাকবি কেমন? আর কোনো সমস্যা হলে তোর ছোট মামা-মামি বলবি। তাদের না বলতে পারলে আমায় ফোন করে বলবি কেমন?”
মরিয়ম বেগম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে ফেললেন। জুঁই বেগম তার একমাত্র ননদ হওয়ায় জুঁই বেগমের প্রতি তার স্নেহ-মমতা অত্যধিক ছিলো। আর নিশান তো তারই অংশ, দেখতেও একদম মায়ের মতো হয়েছে। তাই ওর প্রতি মরিয়ম বেগম স্নেহ-মমতাও ঠিক একই রকম। নিশান মামিকে সামলে দৃঢ়ভাবে বলল,
–”আজ আমি যাচ্ছি ঠিক। কিন্তু আমি আবার ফিরে আসবো, মামি। ওই শয়তান গুলোকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য হলেও আমি আবার ফিরবো।”
–”আমি সবসময় তোর জন্য দোয়া করবো। ভালো থাকিস।”
তারপর নিশান মামির থেকে বিদায় নিয়ে মামার সাথে বেরিয়ে পড়লো এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। প্রায় পনেরো মিনিট পর তারা এয়ারপোর্ট পৌঁছায়। গাড়ি থেকে নেমেই নিশান মামাকে বলল,
–”বাকিটা পথ আমি একাই যেতে পারবো, মামা।”
সোহেল সিকদার ওর মাথায় হাত বলিয়ে বললেন,
–”নিজের খেয়াল রাখিস কেমন? আমি নিজামকে বলে দিয়েছি তুই গেলে ও তোকে ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে দিবে।”
–”থ্যাংক ইউ, মামা।”
সোহেল সিকদার ওর কপালে একটা স্নেহভরা চুমু দিলেন। তারপর নিশান নিজের লাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্টে ভিতরে চলে গেলো। ও যতক্ষণ না পর্যন্ত ভিতরে মিলিয়ে গেলো ততক্ষণ পর্যন্ত সোহেল সিকদার বাহিরেই দাড়িয়ে রইলেন। তারপর তিনি একটা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে গাড়িতে উঠে বসলেন আর বাড়ির উদ্দেশ্যে ফির রওনা দিলেন। অন্যদিকে নিশান সকল ফর্মালিটিজ শেষ করে অবশেষে প্লেনে উঠে নিজের সিটে বসলো। একটা স্বস্থির শ্বাস ছাড়লো। জানা নেই কতক্ষণ যাবত এই শ্বাস তার মধ্যে আটকে ছিলো। নিজের চোখ দুটো বন্ধ করলে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু-ফোঁটা উষ্ণ নোনা জল। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্লেন ছাড়লো,রওনা দিলো ইতালির উদ্দেশ্যে। নিশান চোখ খুললো। পাশ ফিরে জানালার বাহিরে তাকালো সে। প্লেন আস্তে আস্তে আকাশ পথে পাড়ি জামাচ্ছে, মিশে ফেলে যাচ্ছে চিরচেনা সেই শহর। জানালার গ্লাসে হাতে রেখে নিশান গভীর স্বরে বলল,
–” আজ যেই বাড়ি থেকে আমাকে পালিয়ে আসতে হয়েছে; একদিন সেই বাড়িতেই স্ব-সম্মানে আমি আবার ফিরে যাবো। আর তোমাদের উচিত শিক্ষা দেবো, মাই ডিয়ার চাচা-চাচি।”
শেষের কথাটুকুয় নিশানের রাগ,জেদ আর ক্ষুব্ধতা স্পষ্ট হলো। কালো চোখ জোড়া জানালার বাহিরে নিবদ্ধ রাখলো সে। আজ থেকে তার জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। একটি নতুন দেশ, একটি নতুন শহর, কিছু চেনা-পরিচিতি মানুষ,তো আর সব অপরিচিত। তবুও মনে-প্রাণে নতুন করে বাঁচার একটি নতুন সুযোগ। তার ঠোঁটের কোণে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নেয় মিহি হাসির স্ফটিক স্পষ্ট হলো।
চলবে.....
________________________________________