#হৃদয়ের_অঙ্গিকার
#মুক্তি_আক্তার_শ্রাবন্তী
#পর্ব_০২
সময়টা সকাল ১১ টা, ভার্সিটির প্রাঙ্গণে বসে আছে মেহরিমা, হিয়া আর দিয়ান। তাদের আজ ক্লাস করার একটুও ইচ্ছে নেই। কারন আজ আদনানের ক্লাস আছে। দিয়ান তাদের তিনজনের জন্য চা নিয়ে আসে। তারপর তিনজনে বসে চা খেতে থাকে।
কিরে হারামি, তুই না কালকে বললি, আনান ভাইয়া বলেছে আদনান স্যার এই বিয়ের ব্যাপারে কিছুই জানে না! তাহলে কালকে জানলো কিভাবে?
দিয়ান চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হতাশা কন্ঠে বলে.........
আনান ভাইয়া কে এই ব্যাপারে কালকে রাতে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,তারপর উনি বললো,,,আদনান স্যার কে নাকি আনান ভাইয়া নিজে বলেছে তার জন্য মেয়ে দেখতে গেছে তার ফ্যামিলি। আর আদনান স্যার তার আম্মুর কাছে মেহরিমা বর্ণনা শুনে রাজি হয়েছে।
হিয়া এবার বেশ আগ্রহ নিয়ে বলে.........
তার মানে কি, আদনান স্যার এখনো জানে না মেয়ে টা কে? আর কার সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে?
আনান ভাইয়া তো বললো,,আদনান স্যার মেয়ের ব্যাপারে কিছুই জানে না। কারন সে মেয়ের নাম, ঠিকান কিছুই নাকি জিজ্ঞেস করে নাই। শুধু তার আম্মুর মুখে বর্ণনা শুনেই রাজি হয়েছে।
এ কেমন হ্যাবলা রে বাবা, মেয়ের খোঁজ-খবর না নিয়েই বিয়েতে রাজি হয়ে গেলো?
আরে, এমনি এমনি রাজি হয়নি বলে। তাসলিমা আন্টি আদনান স্যারের আম্মুর বোন হওয়ার সুবাদে রাজি হয়েছে।
তাদের কথার মাঝেই মেহরিমা বেশ উৎসাহ নিয়ে বলে........
তার মানে ওই খচ্চর বেডা এখনো জানে না, আমার সাথেই তার বিয়ের কথা চলছে?
দিয়ান ফুশ করে শ্বাস ফেলে........
না এখনো জানে না,,,
মেহরিমা একটা হাসি দিয়ে বলে.......
এবার জানবে, আর বিয়ে টাও ভাঙ্গবে।
দিয়ান আর হিয়া এবার ভ্রু কুঁচকে মেহরিমার দিকে তাকায়। মেহরিমা তাদের দৃষ্টির মানে বুজে বলে........
খচ্চর বেডা কি ভার্সিটি তে এসেছে?
দিয়ান আর হিয়া একসাথে মাথা নাড়িয়ে হ্যা বুজায়। মেহরিমা বসা থেকে উঠে দাড়ায়। তার দেখা-দেখি দিয়ান আর হিয়াও উঠে দাড়ায়।
তুই কি করতে চাইছিা মেহু?
জানটুস, আমি খচ্চর বেডার সাথে সরাসরি কথা বলবো।
মেহরিমা কথা শুনে পাশ থেকে দিয়ান বলে.........
তুই পারবি তো?
দিয়ানের কথা শুনে মেহরিমা কিছুটা চুপসে যায়। সে ভাবতে থাকে, আসলেই কি সে পারবে? সে তো ওই খচ্চর বেডার সামনে গেলেই সব গুলিয়ে ফেলে। না তবুও তাকে পারতে হবে। আর যাই হোক ওই বেডা কে সে কোনো মতেই বিয়ে করবে না। মেহরিমা জোড়ে একটা শ্বাস টেনে নেয়।
আমাকে পারতেই হবে,,,
মেহরিমার কথা শুনে দিয়ান আর হিয়া একসাথে বলে............
অল দ্যা বেস্ট, আমরা জানি তুই পারবি।
বন্ধুদের থেকে উৎসাহ পেয়ে নতুন উদ্যোগের ন্যায় ভার্সিটির ভিতরে ডুকতে ডুকতে দিয়ান কে বলে.........
দিয়ান খচ্চর বেডা কোথায় রে এখন?
দিয়ান একটু ভেবে বলে.......
এখন তো উনার কেবিনেই থাকার কথা,,,,
ওকে চল,,,
_______________________
তারা তিনজন দাড়িয়ে আছে আদনানের কেবিনের সামনে। আদনান কেবিনের ভিতরে কারো সাথে ফোনে কথা বলছে। মেহরিমা এতক্ষণ যতটা সাহস নিয়ে এসেছিলো, এখানে এসে যেনো সব হাওয়া বের হয়ে গেলো। সে বার-বার দোয়া-দরুদ পড়ছে আর শুকনো ঢোক গিলছে। তাকে এভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে দিয়ান, হিয়া বিরক্ত হয়।
আরে বা*ল যা,,
হিয়ার কথায় মেহরিমা ঠোট উল্টায়। তা দেখে দিয়ান বলে.......
বোইন বিয়া ভাঙ্গতে চাইলে সাহস যোগা, তাড়াতাড়ি কাজ কমপ্লিট কর। তারপর আমরা তিনজন মিলে কাচ্চি খাইতে যামু।
দিয়ানের কথা শুনে মেহরিমার চোখ চকচক করে উঠে। সে এবার বুক ফুলিয়ে জোড়ে একটা নিঃশ্বাস নেয়। তারপর আবারো একটা ঢোক গিলে দরজায় নক করে।
মে আই কামিং স্যার?
আদনান চোখ তুলে এক পলক দরজার দিকে তাকিয়ে বলে.........
কামিং,,,
অনুমিত পেয়ে মেহরিমা বুকে থুতু দিয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে ভেতরে ডুকে পরে। আদনান একবার চোখ তুলে তাকায় মেহরিমার দিকে। মেহরিমা দাড়িয়ে দাড়িয়ে দুই হাতে কচলাচ্ছে। তাকে এমন করতে দেখে আদনান নিজেই জিজ্ঞেস করে.........
কিছু বলবে?
আদনানের কথা শুনে মেহরিমা আমতা আমতা শুরু করে। সে কি দিয়ে কি বলবে বুজতে পারছে না। তবুও নিজেকে স্বাভাবিক করে শুকনো ঢোক গিলে..........
জ..জ্বী স্যার, আ..আপনাকে আমার ক..কিছু বলার আছে।
আদনানের এবার পুরো মনোযোগ মেহরিমার দিকে দেয়.......
বলো কি বলবে?
মেহরিমা বা হাতে কপালের ঘাম টুকু মুছে আদনান কে বলে.......
স্যার একটু পানি খাবো,,,
আদনান মেহরিমার অবস্থা দেখে তার সামনে টেবিলে রাখা পানির গ্লাস টা মেহরিমার দিকে এগিয়ে দেয়। মেহরিমা গ্লাস টা নিয়ে ঢকঢক করে পুরো পানি টা খেয়ে নেয়। আদনান মেহরিমা কে অস্থির হতে দেখে বলে..........
রিল্যাক্স, যা বলার বসে বলো। আর এতো অস্থির হচ্ছো কেনো? শান্ত হয়ে বসে বলো, কি বলবে?
মেহরিমা যেনো একটু প্রশয় পেলো, সে নিজেকে সামলে বলে.........
স্যার আপনি কি জানেন, কাল আমাকে ছেলে পক্ষ দেখতে এসেছিলো আর বিয়েও ঠিক হয়েছে?
মেহরিমার কথায় কোনো হেলদোল দেখা গেলো না আদনানের মাঝে। সে ঠান্ডা গলায় বলে.........
জানি,,,
আদনানের মুখে "জানি" কথা টা শুনে মেহরিমা বেশ অবাক হয়। সে মনে মনে ভাবতে থাকে,,, তাহলে কি সে জানে আমার জন্য ঠিক করা পাত্র উনি নিজেই? মেহরিমা চোখ বন্ধ করে জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিয়ে আবারো প্রশ্ন করে..........
কিভাবে জানলেন?
আদনানের ঠান্ডা উত্তর........
সেটা মেটার করে না, তুমি কি বলতে চাও সেটা বলো।
মেহরিমা এবার আর কোনো ভনিতা না করেই বলে........
স্যার, আপনি কি জানেন,,,আমাকে যারা দেখতে এসেছিলো, তারা আর কেউ না আপনার ফ্যামিলির লোক। আর আপনার সাথেই আমার বিয়ে ঠিক করেছে।
আদনানের এবারো ঠান্ডা উত্তর..........
জানি,,,,
আদনানের সহজ-সরল স্বীকারোক্তি তে যেনো মেহরিমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে। আদনান মেহরিমার কথা জেনেও এতটা শান্ত কিভাবে আছে? সে তো তাকে পছন্দ করে না, তাহলে কেনো রাজি হয়েছে বিয়ে করতে? আর গতকাল তো সে নিজেই আদনান কে ফোন করে উল্টা-পাল্টা কথা বলেছে। সে ভয়ে ভয়ে চোখ তুলে তাকায় আদনানের দিকে। কিন্তু আদনানের দৃষ্টি শান্ত। মেহরিমা ঢোক গিলে বলে.......
আপনি আমার কথা জেনেও বিয়ে তে রাজি হয়েছেন?
হুমম,,,
মেহরিমা কান্না পাচ্ছে, এই খচ্চর বেডা তার কথা জেনেও বিয়েতে রাজি হলো কিভাবে?
কেনো রাজি হলেন? আপনি তো আমাকে দেখতেই পারেন না। তারচেয়ে বড় কথা আমি আপনার স্টুডেন্ট। আপনি শিক্ষক হয়ে আমাকে বিয়ে করলে মানুষ আপনাকে খারাপ বলবে। তারচেয়ে ভালো হয় আপনি বিয়ে টা ভেঙ্গে দিন।
রিজন?
মেহরিমা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আদনানের দিকে তাকায়........
কিসের রিজন?
বিয়ের ভাঙ্গার রিজন টা কি?
আরে, আপনি বুজতে পারছেন না? আমাদের এই সমাজে শিক্ষক-স্টুডেন্টের সম্পর্ক ভালো-ভাবে নেয় না। শিক্ষক পিতার সমতুল্য, সেখানি আমি স্টুডেন্ট হয়ে আমার পিতার সমতুল্য কাউকে কিভাবে বিয়ে করতে পারি বলুন? আর তারচেয়ে বড় কথা আমি আপনার কত ছোট, একদম আপনার মেয়ের মতো।
সাট আপ,,,আমাকে তোমার বাবার বয়সি মনে হয়?
মেহরিমা দাত কেলিয়ে হেসে বলে......
একদমি না, আপনাকে আমার চাচার বয়সি লাগে,,,
থাপ্পড়ে সব দাত ফেলে দিবো স্টুপিড। কাল কি যেনো বলেছিলে আমাকে? আমি সময় মতো বিয়ে করলে তোমার মতো চার-পাচটা গেদা-গেদি থাকতো, তা না করে আমার মেয়ের বয়সি তোমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছি? রাইট, এটাই তো বলেছিলে।
মেহরিমা ইনোসেন্ট ফেইস করে বলে........
আস্তাগফিরুল্লাহ্ স্যার এসব আমি বলিনি, হয়তো আমার আত্মা বলেছে।
স্টুপিড, থাপ্পড়ে সিধে করে ফেলবো। আর কান খুলে শুনো কোনো বিয়ে ভাঙ্গবে না, এখন তোমার যদি ইচ্ছে হয় বিয়ে ভাঙ্গার তাহলে তুমি নিজ দায়িত্বে ভাঙ্গবে। আমার ফ্যামিলি কে আমি কিছু বলতে পারবো না, কজ তোমাকে তাদের পছন্দ হয়েছে। আর আমি আমার ফ্যামিলি কে কষ্ট দিয়ে কখনো কিছু করি না আজও করবো না।
আদনানের কথা গুলো শুনে মেহরিমার ইচ্ছে করছে তার সামনে টেবিলে রাখা গ্লাস টা দিয়ে আদনানের মাথা ফটিয়ে দিতে। তবুও নিজেকে দমিয়ে রাখলো মেহরিমা। মেহরিমা কিছু বলবে তার আগেই আদনান বলে.........
আর কিছু বলার না থাকলে ক্লাসে যাও, আর ৫ মিনিট পর ক্লাস শুরু হবে।
মেহরিমা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ায়। তারপর টেবিলে দুইহাতে ভর দিয়ে আদনানের দিকে কিছুটা ঝুকে বলে.......
আমাকে বিয়ে করবেন তাই না? আপনার বিয়ের সাধ আমি ঘুছিয়ে দিবো। কচি মেয়ে দেখেই বিয়ে করতে লাফাচ্ছেন না? বিয়ে টা খালি হোক আমি বিয়ের রাতেই আমার বয়ফ্রেন্ড নিয়ে পালাবো, দেখে নিয়েন।
মেহরিমা কথা গুলো বলেই ব্যাগ নিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আদনানের কেবিন থেকে বেড়িয়ে যায়। মেহরিমা চলে যেতেই আদনান চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বসে বিড়বিড়িয়ে বলে.........
আমিও দেখি তোমার সাহস কতটুকু,,,আদনান মল্লিক একবার যা বলে তা করেই দেখায়। তাই আমার কথার হেরফোর হবে না মিস মেহরিমা দেওয়ান।
______________
বা*ল এই আদনান স্যার সব জেনেও তোকে বিয়ে করতে রাজি হলো কেনো রে?
হিয়ার কথা শুনে মেহরিমা দাত কটমট করে তার দিকে তাকিয়ে বলে........
কারন উনি মাম্মি কি পাডা,,,
মেহরিমার কথা শুনে হিয়া আর দিয়ান কেশে উঠে, দিয়ান চোখ ছোট ছোট করে মেহরিমার দিকে তাকায়......
সারাজীবন শুনলাম পাপা কি পারি, আর আজ তোর কাছে শুনলাম মাম্মি কি পাডা। কেইশ টা কি খুলে বল বোইন।
মেহরিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আদনানের বলা কথা গুলো এক এক করে সব বলে তাদের। সব কথা শুনে হিয়া আর দিয়ানের মাথায় হাত। আদনান স্যার, যে কিনা মেহরিমা কে দুই চোখে দেখতে পারে না, এখন তাকেই কিনা সব জেনে-শুনে বিয়ে করছে? হাউ ইস দিজ পসিবল? তাদের মাথা কাজ করছে না। তাদের ভাবনার মাঝে একটা ছেলে এসে তাদের সামনে দাড়ায়। তারা তিনজনেই মাথা উঁচিয়ে ছেলেটার দিকে তাকায়। ছেলেটা তাদের এক ব্যাচ সিনিয়র মিয়াদ। মিয়াদ কে দেখে তারা তিনজন ভ্রু কুঁচকে একে অপরের দিকে তাকায়। দিয়ান নিজেই মিয়াদ কে জিজ্ঞেস করে.........
কিছু বলবেন?
মিয়াদ একটা হাসি দিয়ে বলে........
হুম বলবো, তবে সেটা মেহরিমা কে।
কথা শুনেই তিনজনে অবাক হয়। মেহরিমা কপাল কুঁচকে মিয়াদ কে জিজ্ঞেস করে.........
আমাকে বলবেন?
মিয়াদ মৃদ হেসে বলে........
হুম,,,তোমাকেই বলবো।
কি বলবেন বলুন?
একটু সাইডে আসো, এখানে বলা যাবে না।
ওকে তাহলে বলা লাগবে না, আর যদি বলতে ইচ্ছে হয় তাহলে এখানেই বলুন।
আচ্ছা তুমি যখন চাইছো তখন এখানেই বলি,,,
হুম বলুন,,,
মিয়াদ একটু গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে মেহরিমার দিকে তাকিয়ে ঠোটে হাসি রেখে বলে.........
আই লাভ ইউ মেহরিমা,,,
মিয়াদ কথাটা বলতেই মেহরিমা, হিয়া, দিয়ান একসাথে তিনজনে চেঁচিয়ে উঠে.......
কিহহহহহ্???
তাদের চেঁচানো তে মিয়াদ দুই কানে আঙ্গুল গুঁজে ফেলে, আর এইদিকে ভার্সিটির অনেকে তাদের দিকে চোখ ঘুড়িয়ে তাকায়। মিয়াদ কপাল কুঁচকে ধমকের স্বরে বলে.........
কি সমস্যা, চেঁচাচ্ছো কেনো তোমরা? প্রপোজ করলে বলে কেউ এভাবে চেঁচায়?
তারা তিনজন কিছু বলবে তার আগেই কেউ মিয়াদের পিছন থেকে বলে উঠে........
কি হচ্ছে এখানে?
চলবে..................