#স্বর্ণকোমল
#পরিণীতা_আরা_হৃৎ
#পর্ব_২৪
[ বিনা অনুমতিতে কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]
🕊️
শীতের তোপে প্রকৃতির হাওয়া যেনো বেড়ে উঠেছে কয়েকগুণ। চাঁদের আলো এসে লুটিয়ে পড়েছে জলাশয়ের শান্ত স্থির জলে। আশেপাশের ঘনঘটা কুয়াশার বেড়াজাল তৈরি করেছে এক মোহাচ্ছন্ন পরিবেশ । জোৎস্না থইথই করছে চারপাশে। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে সবকিছু। চাঁদের স্নিগ্ধ রূপোলী আলোয় চারপাশ যেনো আরো মোহময়ী আর দীপ্তিময় হয়ে উঠেছে।
কিয়ান আর কোমল শান্ত দৃষ্টিতে সামনের জোৎস্না বিলাশ করা জলরাশির পানে তাকিয়ে আছে। সব কিছু কেমন শান্ত স্থির হয়ে রয়েছে। মনের মাঝে কেমন যেনো একতা সুখ সুখ অনুভূতি হচ্ছে। আচ্ছা এই অনুভূতি কি শুধুই সুখের? নাকি ভালোবাসারও? তার উত্তর জানা নেই ওদের দুজনের কারো।
“আচ্ছা কিয়ান একটা প্রশ্ন করবো?”
কোমলের প্রশ্নে কিয়ান ওর দিকে না চেয়েই শান্ত
স্বরে প্রত্যুত্তর করে,
“হুম।”
“আমাকে তুমি কতদিন ধরে ভালোবাসো?”
“উমমম..? ৬৫৩৩ দিন।”
“এতো ভেঙেচুরে ক্যালকুলেশন কিভাবে করলে?”
“ভালোবাসা থাকলে সব কিছু সম্ভব।
কিয়ানের কাঁধ থেকে মাথা তুলে ওর দিকে সামান্য ঘুরে বসে ওকেও নিজের দিকে ঘুরিয়ে বসায়। নিজের ছোট ছোট হাতের মাঝে কিয়ানের পুরুষালী হাত দুটো নিয়ে কথা বলতে বলতে কেঁদে দিলো,
“আমি যদি কোনোদিন সুস্থ না হই?”
কিয়ান ওর হাত দুটো ছড়িয়ে নিয়ে কোমলের দুই গালে হাত রেখে বলল,
“তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী কোমল। আমার অঙ্গের অর্ধেক। তোমাকে ছাড়া যে আমারও কোনো অস্তিত্ব নেই। তুমি যেমনই হও না কেনো, আমি সেভাবেই তোমাকে ভালোবাসি।”
কোমল ফুঁপিয়ে উঠলো। কিয়ানের হাতে কপাল ঠেকিয়ে বলল,
“আমার জন্য তোমার পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে গেলো কিয়ান। আমার জন্যই তিয়ান ভাইয়া আর নীলির মাঝে ঝামেলা হলো। আমার জন্যই ওরা দুজন মারা গেলো। তুমি আমাকে মাফ করে দাও।”
“তোমার উপর আমার কোনো অভিযোগ নেই জান। ওদের হায়াত শেষ তাই ওরা দুনিয়া ত্যাগ করেছে। এখানে তোমার দোষ আমি দেখি না। আর এমন কথা বলবে না কখ…..”
এমন সময় জলাশয়ের ঘাটে তিন চারটা গাড়ি এসে দাঁড়ালো। দুজনেই গাড়ির শব্দে উপরে তাঁকিয়ে উঠে দাড়ালো ঘাট থেকে। উপরে উঠে দেখলো এলিজা গাড়ি থেকে নামছে। বাকি গাড়ি দুটো থেকে কিছু লোক বেরিয়ে আসলো। কিছু লোক কিয়ানকে ধরলো আর কিছু মহিলা কোমলকে ধরে ফেললো। তবে ওরা দুজন দুজনকে আঁকড়ে ধরায় ওদেরকে টেনে হিঁচড়ে ছাড়াতে লাগলো তারা। তবে দুজনকে ছাড়াতে পারলো না তারা। কোমল না পেরে চিল্লিয়ে উঠলো মায়ের উপর,
“কি করছো মা? ছাড়ো আমাদের। এভাবে টানাহেঁচড়া করছো কেনো?”
“তুমি কোনো টেনশন করো না প্রিন্সেস। আমি জানি কিয়ান তোমাকে এখানে কিডন্যাপ করে এনেছে। তুমি এখানে থাকতে চাওনা তাও আমি জানি মা। আমি ওর থেকে তোমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে এসেছি।”
কোমল নিজের ছটফটানি বন্ধ করে স্থির হয়ে দাঁড়ালো।
“আমি ওর সাথেই থাকতে চাই মা। ওর ভালোবাসাকে পায়ে ঠেলে দেয়ার ক্ষমতা যে আমার নেই। প্লীজ ওনাদের বলো ছেড়ে দিতে। আমি কিয়ানের কাছেই ভালো থাকবো।”
এলিজা মেয়ের এমন কথায় গার্ডদের বললেন ওদের ছেড়ে দিতে। দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“বাবার খুনির সাথে থাকতে চাইছো তুমি? কি বলছো একবার ভেবে দেখেছো?”
“হ্যাঁ মা। ভেবেই বলছি। আমি ওকে ভালবাসি।”
এলিজা রেগে গেলেন মুহুর্তেই,
“আমি এই ছেলেকে কিছুতেই তোমার হাজবেন্ড হিসেবে মানি না।”
“তোমার মানা না মানাতে কিছুই যায় আসে না মা। আমি ওর সাথেই থাকবো।”
এলিজা রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেলেন সেখান থেকে। কিয়ান আর কোমল একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো। কিছু মুহূর্তের জন্য ভেবেছিলো হয়তো ওরা আলাদা হয়ে যাবে। কিয়ান কোমলের কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল,
“ভালোবাসি স্বর্ণ।”
“আমিও ভালোবাসি।”
_
তালুকদার বাড়ির ড্রয়িং রুমের সোফায় গায়ে একটা কমফি জড়িয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে তূর্য। জ্বর এসে গিয়েছে বেচারার শরীরে। এই শরীরেই ও বাড়ির সকলের সামনে কাচুমাচু হয়ে বসে রয়েছে। ওর নিজের কাছে মনে হচ্ছে ও এখন এখানে মৌখিক পরীক্ষা দিতে বসেছে।
“তোমার বাড়িতে কে কে আছে?”
অনিল তালুকদারের প্রশ্নে তূর্য তার দিকে তাকিয়ে মিনমিনিয়ে বলল,
“মা।”
অনিল তালুকদারের ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“শুধু মা?”
তূর্য উপর নিচ মাথা নাড়লেন। এবার রাতুল একপ্রকার ক্ষিপ্ত হয়ে বলল,
“আমার বোনের সাথে এমন করলে কেনো তুমি?”
তূর্য অসহায় দৃষ্টিতে বলল,
“ভুল করে ফেলেছি ভাই।”
“এটা কি আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর হলো?”
তূর্য একবার হ্যাঁ আর একবার না বোধক মাথা নাড়লো।
রাতুল ক্ষিপ্ত হয়ে ওর দিকে তেড়ে আসতে নিলে রাইসা রাতুলের পাশ থেকে উঠে গিয়ে আটকে দিলো। মুখে মিটিমিটি হাসি যেনো ওর সরছেই না।
“উফফ ভাইয়া থামো তো। আমার তো কোনো সমস্যা নেই।”
“তুমিই একমাত্র আমার কষ্টটা বুঝলে বউ।”
অনিল তালুকদারের চেতে উঠে বলল,
“দেখেছো? অসভ্য ছেলেটা কিভাবে সকলের সামনে বউ বউ করছে।”
তূর্য মিইয়ে গেলো ওনার ধমকে।
রাফা বেগম খানিক হেঁসে বললেন,
“ওকে রুমে নিয়ে যা রাইসা। ছেলেটার জ্বর বেড়েছে বোধহয় আগের চেয়ে।”
রাইসা তাকিয়ে দেখলো সত্যিই তূর্য কিছুটা কাপাকাপি করছে। রাতুলের সাহায্যে রাইসা তূর্যকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলো।
রাতুল ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে রাইসা ঘরের দরজা লক করে পিছনে ঘোরার সাথে সাথেই তূর্য রাইসাকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। যেনো বুকের ভিতর ঢুকিয়ে ফেলবে একদম। রাইসাও স্বামীর এমন নিবিড় আলিঙ্গনে নিজেকে সপে দিলো সহস্তে। নিজেও দুহাতে জড়িয়ে ধরলো তূর্যকে। তূর্যের বুকের অসহ্যকর ধুকপুকানি টের পেলো রাইসা। কান পেতে দিলো স্বামীর বক্ষে। মন দিয়ে শুনতে লাগলো সেই আওয়াজ।
খানিকক্ষণ পর তূর্য হাতের বাঁধন আলগা করলেও ওকে পুরো পুরি ছাড়লো না। কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো।
“আমি জানতাম তুমি আমাকে ভালোবেসে ঠিক একদিন ফিরে আসবে। আমার চোখের পানি বিফলে যায়নি তূর্য। আমার দোয়া আল্লাহ্ কবুল করেছেন।”
“আমি সরি বউ। আমি অনেক সরি। তোমাকে এভাবে ফেলে রেখে যাওয়া আমার উচিত হয়নি একদম। সরি বউ।”
রাইস ওকে আশ্বস্ত করে বলল,
“ইটস ওকে তূর্য। এতবার সরি বলার প্রয়োজন নেই। আমি জানি তুমি ভুল করেছো। তবে সেই ভুলের জন্য তোমার রিগ্রেট ফিল হচ্ছে এটাই অনেক। আর সরি বলার দরকার নেই।”
তবুও যেনো শান্ত হতে পারছে না তূর্য। ওদিকে ওর শরীরে জ্বর কমার নাম নেই। রাইসা ওর শরীরের সাথে লেপ্টে থাকায় স্পষ্ট তের পাচ্ছে ওর শরীরের তাপ। এবার খানিকটা উচু গলায় বলল,
“চর্বি তুমি আমাকে? তোমার জ্বর বেড়েই চলেছে। আর তুমি আমাকে জাপটে ধরে দাঁড়িয়ে আছো এই শরীরেও।”
“ওহহ তাহলে দাঁড়িয়ে থেকে যাবে না। ঠিক আছে!”
রাইসাকে কিছু বুঝে উঠার সুযোগ না দিয়েই তূর্য কে নিয়ে গিয়ে বিছানায় ধাপ করে শুয়ে পড়ল। রাইস হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষন পড়ে রইলো তূর্যের বাহুতে। ব্যাপারটা ওর বোধগম্য হতেই সাপের মতো মোড়ামোড়ি শুরু করে দিলো ।
“ছাড়ো। ছাড়ো বলছি। এভাবে আমাকে নিয়ে শুয়ে পড়লে কেনো? সবাই কি ভাববে? ছাড়ো বলছি আমাকে।”
“আজব নিজের বউকে জড়িয়ে ঘুমাচ্ছি টেট মানুষ কি বলবে? আর যা বোলার বলুক। তা আমি গায়ে মাখবো না।”
“লোকে বলবে দেখো ছেলে মেয়ে দুটোর শরম লজ্জা নেই একসাথে হতে না হতেই দরজা লাগিয়ে দিয়েছে।”
“প্লীজ বউ জ্বালিয়ো না তো। গত কিছু ঘন্টা অনেক ধকল গিয়েছে। প্লীজ একটু ঘুমাতে দাও।”
রাইসা আবার চুপ হয়ে গেলো। ঘাপটি মেরে পরে রইলো তূর্যের বহুর মধ্যে। নিজেও আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো তূর্যকে।
_
আবছা অন্ধকার একটি কক্ষ। একটা টেবিলের ঠিক দুহাত উপরে একটা হলদে বাতির নিয়ন আলোয় মৃদু আলোকিত রয়েছে রুমের চারপাশ। সেই আলোয় যতটুকু বোঝা যায় ঘরটি একটি আঁধভাঙ্গা দেয়ালের। জাগায় জাগায় রং উঠে বিচ্ছিরি অবস্থা হয়ে রয়েছে।
সেই টেবিলের উপর দুজন বয়স্ক মহিলা এবং পুরুষ বসে আছে। তাদের কলিজায় পানি শুকিয়ে গিয়েছে। দুজনের চিন্তার বিষয় একই। কিছুতেই মাছ হাতছাড়া করা চলবে না। তাহলে যে ওদের ভীষণ লোকশান।
মহিলাটি ভয়ে ভয়ে বলল,
“যদি কোমল সত্যি সত্যি সুস্থ হয়ে যায় তো? আমাদের এতদিনের করা সকল পরিশ্রম বৃথা। কিছুতেই ওকে ড্রাগ নেয়া হতে বিরত রাখা যাবে না।”
“তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি। তবে ওকে তো খুঁজেই পাচ্ছি না। কিভাবে বুঝবো ও ঠিকমতো সেটা সেবন করছে নাকি?”
দুজনেই বেশ চিন্তিত সেটা তাদের কথা শুনেই বোঝা যাচ্ছে। বৃদ্ধ লোকটি আবার বললেন,
“ওই ছেলেটিকেই আগে সরাতে হবে। ওই সব নষ্টের মূল। না জানি কোথায় নিয়ে গেছে কোমলকে। ওকে কিছুতেই হাত ছাড়া করা যাবে না ।”
#চলবে
[ গাড়িতে বসেও গল্প দিতাছি 😩 ]