#স্বর্ণকোমল
#পরিণীতা_আরা_হৃৎ
#পর্ব_২৫
[ অনুমতি ব্যতিত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]
🕊️
সকাল সকাল পাখির কিচির মিচির আওয়াজে ঘুম ভাঙলো কোমলের। জানালা গলিয়ে মিষ্টি রোদ এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে ওর গোলাপ রঙ্গা ত্বক। রোদের হলুদ আলোয় তা আরো মোহময় হয়ে উঠেছে।
বিছানা হাতড়ে টের পেলো কিয়ানের অনুপস্থিতি। হয়তো নিচে গিয়েছে সকালের নাস্তা রেডি করতে। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো। হামি দিয়ে এদিক সেদিক চোখ বুলিয়ে নেমে গেলো বিছানা ছেড়ে।
ফ্রেশ হয়ে এসে নিজের ব্যাগে কিছু একটা খুঁজতে লাগলো। তবে কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি খুঁজে পেলো। হন্যে হয়ে ড্রয়র থেকে শুরু করে টেবিল পর্যন্ত সবকিছু খুঁজতে লাগলো। আলমারি খুলে সকল জামাকাপড় ছুঁড়ে মারতে শুরু করলো ফ্লোরে। তবুও সেই জিনিসটি খুঁজে পেলো না। আস্তে আস্তে উত্তেজিত হতে শুরু করলো কোমলের শান্ত মস্তিষ্ক।
এমন সময় ওর চোখ গেলো দরজার ধারে। কিয়ান দরজার সাথে হেলান দিয়ে বুকে হাত ভাঁজ করে দাড়িয়ে আছে। ওকে দেখে কিছুটা শান্ত হওয়ার চেষ্টা করেও যেনো পারলো না কোমল। মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে শুরু করলো। ও চাইলো রেগে না যেতে তবুও যেনো বৃথা সেই চেষ্টা। কিয়ানের দৃষ্টি শান্ত। যেনো কোমলের এমন উভ্রান্তের মতো আচরণও ওর ঐ শান্ত দৃষ্টিকে নড়াতে সক্ষম নয়।
কিয়ান একহাত উচু করে একটা ছোট কাচের সিসি আঙুলের ডগায় ধরে ওকে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“এটা খুঁজছো স্বর্ণ?”
কিয়ানের হাতে নিজের কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি দেখেই ছুটে আসে কোমল। তবে ওর নাগালের বাহিরে হাত উচু করে ধরে কিয়ান। যার দরুন সিসিটি ধরেও ধরতে পারলো না কোমল।
“ওটা আমাকে দাও কিয়ান। এটা আমাকে শান্তি এনে দিবে। তুমি তো চাও আমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাই তাহলে এটা দিয়ে দাও প্লীজ। এটা খেলেই আমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবো। দাও একটা আমাকে।”
কথা বলতে বলতে এক প্রকার লাফ ঝাঁপ শুরু করে দিলো কোমল। তবুও সেটির নাগাল পেলো না বেচারি।
কিয়ান তবুও নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো। আর কোমল ছটফটাতে লাগলো সেটা নেয়ার জন্য। এক পর্যায়ে গিয়ে কিয়ান কৌশলে কোমলকে একটা ঘুমের ইনজেকশন পুশ করে দিলো। কোমল সেন্সলেস হয়ে গিয়ে পরে যেতে নিলে কিয়ান ওকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে। কপালে একটা শুকনো চুমু খেলো। চোখটা জ্বলছে ভীষণ। তবে কেন? কোমলের এমন করুণ অবস্থা দেখে নাকি ওর নিজের দোষেই কোমলের এই অবস্থা এই কারণে? দু ফোঁটা তপ্ত নোনা জল গড়িয়ে পরলো চোখ থেকে।
_
ডক্টর মালিথার চেম্বারে বসে রয়েছে কিয়ান। পাশেই একটা বেডে শুইয়ে রেখেছে কোমলকে। ডক্টর মালিথা কাচের সেই সিসিটা হাতে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল,
“খুবই কৌশলের সাথে এই কাজটা করা হয়েছে মিস্টার কিয়ান। চকলেটের নামে কোমল এতোদিন ড্রাগ নিয়ে এসেছে। কিন্তু এই কাজ করেছে কে সেটা একমাত্র কোমলই আমাদের বলতে পারবে।”
“কিন্তু ম্যাম সেদিনইতো ওকে.. আজকে আবার…”
“সেদিন ও আমাদের ওর সাথে ঘটা পুরো ঘটনা বলেনি। তাই আজকে সেটা আমাদের জানতে হবে। বুঝতে হবে আপনাকে কোমলের হাতে এই পর্যন্ত ১০৩ টা খুন হয়েছে। এসবের পিছনের পরোক্ষ ভাবে দায়ী যারা তাদের তো খুঁজে বের করতে হবে। আমি জানি ও অসুস্থ তবে আমাদের জানতে হবে এর পেছনে কারা রয়েছে
“চিন্তা করার কোনো দরকার নেই মিস্টার কিয়ান। কোমলের কোনো ক্ষতি হবে না এতে। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।”
ডক্টর মালিথা আর কিয়ান কোমলকে কোলে তুলে নিয়ে দুজনেই মিলে এই চেম্বার থেকে বেরিয়ে পাশের কেবিনে চলে গেলো। সেখানে বেডে কোমলকে শুইয়ে দিয়ে কিয়ান শক্ত করে ওর হাত আঁকড়ে ধরলো।বিওসকল যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক করে ডক্টর মালিথা কোমলকে জিজ্ঞাসা করলো,
“কোমল? কোমল শুনতে পাচ্ছো? তোমাকে কে চকলেট দিয়েছিলো? কে তোমাকে বলেছে এই চকলেট খেলে তোমার কষ্ট কম হবে? উত্তর দাও কোমল।”
কিছুক্ষণ পিনপতন নীরবতা চলল। কোমল কোনো কথা বলল না প্রথমে। তবে কিছুক্ষন পর নিজেই ঠোঁট নাড়িয়ে বলতে শুরু করলো,
“সেবার আমার জন্মদিনে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনার পর থেকে আমি প্রচন্ড হীনমন্যতায় ছিলাম। আগে যাও একটু লোকের সাথে মেলামেশা করতাম। সেই ঘটনার পর থেকে আগের চেয়েও বেশি ইন্ট্রোভার্ট হয়ে গেলাম। সারাদিন রুমে শুয়ে বসে থাকতাম। আইলিন আন্টি রুমে খাবার রেখে যেতো মাঝে মাঝে খেতাম আবার মাঝে মাঝে প্লেটের খাবার প্লেটেই পরে থাকতো। ছুঁয়েও দেখা হতো না সেই ভাতের প্লেট। সারাদিন শুধু কান্না করতাম একা একা রুমের ভিতরে। মনে হতো বাহিরে বের হলেই বোধহয় জ্যাক আবার আমার উপর ঝাঁপিয়ে পরবে। আমাকে ছিঁড়ে খেতে চাইবে। ওই অমানুষ গুলোর সাথে আমি আর কোনো রকম দেখা সাক্ষাৎ না হওয়ার দোয়া করতাম মনে মনে।
এমনই একদিন আইলিন আন্টি আমার রুমে আসলো। তখন ঠিক কত সময় ছিলো জানতাম না। ঘরের ভিতরে আলোর ছিটেফোটাও থাকতো না বিধায় সময় টা ঠিক আমার বুঝে আসেনি। আমি তখন খাটের সাথে হেলান দিয়ে ফ্লোরে বসেছিলাম। উনি এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আমি ওনার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম। একমাত্র আইলিন আন্টি আর মিসির আংকেলই আমার বিশ্বাসের, ভরসার একমাত্র স্থান ছিলো। ছোট বেলা থেকে তাদের কাছেই মানুষ হয়েছিলাম তো তাই হয়তো এতো মায়া তাদের আমার প্রতি। আমার বাবা মা সমতুল্য ছিলেন তারা দুজন।
বেশ কিছুক্ষণ পর উনি আমাকে ডাকলেন,
“মা? কোমল মা?”
“হুঁ?”
“উঠে বসতো মা। তোমাকে কিছু দেয়ার আছে আমার।”
আন্টির কোথা শুনে আমি উঠে বসলাম। তখন তিনি নিজের কাপড়ের একটা গিট খুলে সেখান থেকে একটা চকলেটের সিসি এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“তোমার খুব কষ্ট হয় তাই না মা? খুব একা লাগে তোমার। বুকের ভিতর ব্যথা অনুভব করো। সেজন্য আন্টি তোমার জন্য একটা বিশেষ চকলেট এনেছি। এই চকলেট তোমার মিসির আংকেল তার এক ডক্টর বন্ধুর কাছ থেকে পার্সোনালি তোমার জন্য কাস্টোমাইজ করে এনেছে। এটা খেলে তোমার সকল দুশ্চিন্তার অবসান ঘটবে।”
আমি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালাম তাঁর দিকে। একটা সামান্য চকলেট আমার সব কষ্ট দূর করে দেবে ভাবতে পারিনি। আস্তে আস্তে প্রথমে একটা তারপর দুইটা পরেরদিন তিনটা। আস্তে আস্তে চকলেটের প্রতি একটা নেশা হয়ে গেলো আমার। আর আমাকে সমস্ত চকলেট আন্টিই এনে দিতো আমাকে। তবে সত্যি এটাই যে আস্তে আস্তে সেই খারাপ মুহূর্তের কথা আমার মনে পড়লেও চকলেট খেলে সেটার কোনো প্রভাব পরতো না আমার উপর।
আমার মা এই সব সম্পর্কে অনাগত ছিলো। কারণ আমি নিজেই আমার সাথে ঘটা এই মর্মান্তিক ঘটনার কথা মাকে জানাতে চাইনি। মা আমাকে খুব ভালোবাসতো। ইভেন এখনো বসে। তবে সময়ের অভাবে আমার ঠিকমতো দেখা শোনা করতে পারে না। নাহলে আমার মা বেস্ট মাদার ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড।
ওই চকলেটের কারণে মাস দুয়েকের মাঝে আমি কিছুটা স্বাভাবিক হই। আইলিন আন্টি আমাকে জোর করে স্কুলে পাঠান।”
থেমে গেলো কোমল। কিয়ান যেনো বিশ্বাস করতে পারছে না। যাদের কোমল নিজের বাবা মার স্থানে বসিয়েছে তারাই ওর এতো বড় একটা ক্ষতি করলো। কোমল কেমন রিয়েক্ট করবে এট জানার পর? ডক্টর মালিথা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তবে তাকে খানিকটা কৌতূহলী লাগলো বটে। হয়তো জানার একটা সুপ্ত প্রয়াস রয়েছে তার মাঝে। কারা করেছে এমন? কোমলের সাথে কার এমন শত্রুতা থাকতে পারে যে ওর ক্ষতি এভাবে করবে? নাকি এর পিছনেও লুকিয়ে রয়েছে অন্য কোনো কাহিনী?
#চলবে
[ প্রণয়কাহনের প্রিয়বতী এখনো লেখা শেষ করতে পারিনি। কালকে পেয়ে যাবে। আজকে এটাই দিতে পারলাম। ]